অন্তঃবৃত্ত (রোমান্টিক গল্প)

অন্তঃবৃত্ত (রোমান্টিক গল্প)

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

শুকনো পাতার খসে যাওয়া দিন! আকাশে মেঘের গুরুগম্ভীরভাব। পথের ধার ঘেসে হাটা মানুষের বেশিরভাগের মাথাতেই এলোপাথারি চিন্তাভাবনা ঘোরে। রাশেদ ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই ভাবুকে, অন্যমনষ্কা যাকে আঁদর করে কাব্যিক বলে কেউ কেউ। ফুটপাথ ধরে হাটছিলো, কারণ আজ থেকে তার চাকরী নট করে দিয়েছে অফিসের বস। কারণটা খুবই সামান্য, রাশেদ সময় মতো অফিসে আসে না। অফিসের অ্যাসাইনমেন্ট সঠিকভাবে সাবমিট করে না। বস খেয়াল করেছে কি একটা হয়েছে ছেলেটার। চাকরী নেই তাতে রাশেদের বয়েই গেলো এমন একটা অবস্থা। বস অবশ্য হাসিমুখে বলেছে দু’মাসের অবকাশ যাপন শেষে রাশেদ যেন আবার জয়েন করে। তবে রাশেদ এখনো ঠিকভেবে পাচ্ছে না সে জয়েন করবে কি না। যাক গে আপাতত সেসব চিন্তা উড়িয়ে দেয়াই ভালো। পথ ধরে অন্যমনস্ক হয়ে হাটছিলো, হঠাৎ করে তার সামনের ঝোপটা নড়ে ওঠে খানিকটা। রাস্তা অন্ধকার নয় বটে, স্ট্রিট লাইটের আলো পড়েছে, মিষ্টি একটা আলো। ঝোপটা কিছুক্ষণ নড়তে থাকে। রাশেদ কিঞ্চিত বিহ্বল হলেও সাহস হারায়নি, এতটুকু কারণে সাহস হারানোর কোন মানেই হয় না। কিছুক্ষণ বাদে সন্দেহের সব মেঘ উড়িয়ে দিয়ে ঝোপ দিয়ে বের হয় ফুঁটফুঁটে একটা শাদা কুকুর। জিব বের করে রাশেদের চারপাশে ঘুরতে থাকে। কুকুরটা ঠিক কোন জাতের সেটি আপাতত বুঝতে পারেনা রাশেদ। কুকুরের গলায় একটি বেল্ট পড়ানো, বেল্টে লেখা কিডো। রাশেদ গুরুত্ব না দিয়ে হাটতে থাকে ফুটপাত ধরে, কিডো নামের সেই কুকুরটি পিছু নেয় রাশেদের। বেশ ভালো যন্ত্রণায় পড়া গেলো! রাশেদ কুকুরটির কাছে আসে। কুকুরটিকে কোলে নিয়ে একটি চাঁয়ের দোকানে গিয়ে বিস্কিট কিনে একটা একটা খাওয়ায় কুকুরটিকে। কুকরটি এতটাই সুন্দর যে পাশে দাঁড়ানো কিছু পথচারীও তাকে আদর করতে ক্ষাণিক দ্বিধা বোধ করে না।

*
রাশেদ ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে রাশেদ দেখতে পায় দেশের নামকরা এক অভিনেত্রীর একটি  কুকুর হারিয়ে গিয়েছে তাই নিয়ে রীতিমতো নিউজ চ্যানেলগুলো একটার পর একটা প্রতিবেদন করছে। সেই অভিনেত্রীর নাম অর্পা। আর অর্পার কুকুরের নাম কিডো। যার ছবির সাথে রাশেদের পাশে শুয়ে থাকা কিডোর মিল পাওয়া যায়।সেই অভিনেত্রী এমনটা ঘোষণা দিয়েছে তার পোষ্যকে যে তার কাছে ফিরিয়ে এনে দিতে পারবে তাকে পুরুস্কৃত করা হবে। সেদিন রাতেই নম্বর জোগাড় করে ফোন দেয় সেই অভিনেত্রীকে কিন্তু ফোন ধরা তো বালাই অন্তত দশ বার ফোন দিয়েও সেই নম্বরে কাউকে পাওয়া যায়নি। এরপর বাধ্য হয়ে শুয়ে পড়ে সেদিনের মতো। পরের দিন সকাল বেলা কিডোই টেনে ঘুম থেকে তোলে রাশেদকে। কারণটা অজানা নয়, তার ক্ষিধে লেগেছে। সকাল সকাল উঠে ফুটপাথে বসে কিডোকে পাশে নিয়ে টং দোকানের চা খায়, সেই সাথে কিডোর জন্য পাউরুটী জাতীয় কিছু একটা খাওয়ায়। ঠিক সেসময়েই রাস্তা দিয়ে একটি গাড়ি কিছুদূর গিয়ে থেমে আবারও ফিরে আসে পিছন গিয়ারে। রাশেদের সামনে এসে দাঁড়ায় কালো কালারের একটি টয়োটা এসইউভি। গাড়ি থেকে নামেন এক তরুণী, তার রূপের লাস্যময়ে কিঞ্চিত বুঁদ হয় রাশেদ। তার হাতে থাকা  চাঁয়ে ডোবানো বিস্কিট টুপ করে পড়ে যায় চাঁয়ের কাপে। মেয়েটি এসে রাশেদের পাশে বসা কুকুরটিকে আঁদর করে, মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে কোলে নেয়। মেয়েটি কুকুরটিকে হাতে নিতে আঁদর করতে করতে রাশেদকে বলে, কোথায় পেলো তার কুকুরটিকে। রাশেদ কোন জবাব না দিয়ে চুপ করে বসে ছিলো, মেয়েটি আরো একবার প্রশ্ন রিপিট করলে রাশেদ বলে, “ওটা আপনার কুকুর নয়” মেয়েটি হুট করে রেগে গিয়ে বলে। “কুকুর কেন বললেন?” ওর একটা নাম তো আছে না কি? ওর নাম কিডো!

রাশেদ চায়ের কাপ পাশে রেখে উঠে বলে, “ও আপনার কিডো নয়” ওর নাম “লিলি”। তৎক্ষণাত মেয়েটি ফস করে রাগে দ্বপ করে জ্বলে উঠে বলে, ‘আপনি মিথ্যা কথা বলছেন। ওই আসলে কিডো।“ রাশেদ না সূচক মাথা নাড়ায়, ‘না ও কিডো নয়। ও লিলি’। এ নিয়ে কিছুক্ষণ কথাকাটাকাটি হয় অর্পা আর রাশেদের মধ্যে। যদিও এখানে সেরকম উত্তেজিত কিছুই ছিলো না। এরপর ঝগড়া করতে করতে মেয়েটি হাঁপিয়ে যায়! বসে পড়ে ফুটপাতে! অর্পার ছোটবেলা থেকেই শ্বাস-কষ্ট আছে। তা ছাড়া ঢাকার শহরে আসার পর থেকে ধীরে ধীরে তার শ্বাসযন্ত্র আরও বিকল হওয়ার পথে। একটু উত্তেজিত হয়ে কথা বললেই হাঁপিয়ে যায়, দম বন্ধ লাগে। চারদিকে মনে হয় ঘুরছে। অর্পার এমন কান্ড দেখে, রাশেদ বিভ্রান্ত হয়ে পড়ে। এমন কোন পরিস্থিতির সম্মুক্ষিণ সে আগে কখনো হয়েছে কি না সেটি মনে করতে পারছে না। অর্পা হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে বলে, “এক্সকিউজ মি! আপনি একটু গাড়ি থেকে আমার ইন…..এতটুকু বলতে পারে সে এরপর কাঁশিতে ফেটে পরে। রাশেদের তৎক্ষণাৎ উপস্থিত বুদ্ধি সায় দেয়, অর্পা কোন বস্তুটির কথা আসলে বলেছে। দৌড়ে গিয়ে গাড়িতে ইনহেলার খুঁজে। গাড়ির ভেতরে একটি ইনহেলার দেখতে পায়, সেটি নিয়ে এসে ঝাকিয়ে অর্পার হাতে দিতেই অর্পা ইনহেলার প্রেস করে কিছুক্ষণ বসে থাকে। রাশেদের চোখমুখে কাচুমাচু অবস্থা, কিডো এসে বসেছে অর্পার পাশে। রাশেদ অর্পাকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো, “পানি খাবেন?” অর্পা মাথা নাড়ায়। এরপর দৌড়ে গিয়ে ফুটপাথের দোকান থেকে একটি মিনারেল ওয়াটার বোতল কিনে নিয়ে আসে।

 

এতক্ষণের এই অপরিচিত যুবকের প্রতি অর্পার মনের আকাশে ঘৃণার মেঘ জমলেও সেই মেঘে বাতাস লেগেছে। সেই মেঘ গলে বৃষ্টি শুরু হয়েছে তার হৃদয়ের গহীনে। দেশ সেরা অভিনেত্রী সে, তা যেন বোঝার লেশ মাত্র নেই। গ্ল্যামারের দিক দিয়ে ঠিক আছে কিন্তু, ছোটবেলা থেকেই অর্পা অহংকারী স্বভাবের নয় মোটেও। যেটুকু অ্যাটিটিউড দেখাতে হয় সেটি শুধু মাত্র ক্যামেরার লেন্সে। রাশেদ একপ্রকার ছুটতে ছুটতে পানির বোতল নিয়ে আসে। অর্পা পানি খেয়ে কিছুক্ষণ বসে থাকে, রাশেদ কিডোকে কোলে নেয়। যদি এই পুতুল সাদৃশ্য কুকুরটই যে অর্পার কিডো সেটি একমাত্র রাশেদই জানে। অর্পা রাশেদের চোখে তাকিয়ে বলে, “আপনি কি সত্যি বলছেন? ও কি আমার কিডো নয়?” একটু আগে অসুস্থ হওয়া  মেয়েটি রাশেদকে যে প্রশ্নটি করেছে তাতে রাশেদ আর কিছু না হোক বিব্রত বোধ করেছে।  রাশেদ কি বলবে বুঝে উঠতে পারে না। মেয়েটির চোখে এবার যেন শ্রাবণের বৃষ্টির মতো জ্বল আসে, চোখের জ্বল গাল বেয়ে টপটপ করে পড়তে থাকে। রাশেদ এবার নিজেকে অপরাধী মনে করে কিছুটা। সে কাচুমাচু খেয়ে বলে, “না মানে ও আসলেই আপনার কিডো নয়। ওর নাম লিলি। এটা আমার কুকুর”। রাশেদের এমন উত্তরেই যেন মনে মনে আশা করছিলো অর্পা। এবার সে আর কথা বাড়ালো না, বসা থেকে উঠে দাড়ালো। শেষবারের মতো কুকুরটিকে আঁদর করে গাড়ির দিকে হাটা দিলো। গাড়ির দরজা খুলে ভেতরে প্রবেশ করতে যাবে এমন সময় রাশেদ পিছন থেকে তাকে ডাকলো, ‘অর্পা! শুনুন’। অর্পা অবাক হলো না! ছেলেটির সাথে তার যতক্ষণে দেখা হয়েছে ততক্ষণে তাকে সে তার নামটিও বলেনি। ছেলেটি কিভাবে তার নাম জানলো তা বলার আর অপেক্ষা রাখে না। অর্পা দেশের জনপ্রিয় অভিনেত্রী, তার নাম জানেনা এমন খুব কম মানুষই আছে’ রাশেদ এগিয়ে যায় অর্পার দিকে। রাশেদের কোলে কিডো কিংবা লিলি নামের সেই কুকুরটি। ভণিতা না করে রাশেদ বলে, “আপনাকে দেখে বেশ বিদ্বস্ত মনে হচ্ছে! আপনি লিলিকে আপনার সাথে নিয়ে যেতে পারেন। কিডোকে যেভাবে যত্নে রেখেছেন ওকেও সেভাবে যত্নে রাখতে পারেন। কিন্তু একটি শর্ত! সপ্তাহের অর্ধেক ও আপনার সাথে থাকবে আর বাকি অর্ধেকটা ও থাকবে আমার কাছে’ অর্পার ঠোটের কোণে কিঞ্চিত মৃদু হাসি যেন আষার আকাশে রোদের মতও ঝিলিক ছড়ালো। রাশেদ কোল থেকে কিডো কিংবা লিলি নামের কুকুরটিকে অর্পার কোলে বসিয়ে দিলো। অবাক করা বিষয় হচ্ছে সেই কুকুরটি কি এক অদ্ভুত কারণে রাশেদকে পছন্দ করে ফেলেছে। অবশ্য প্রভুভক্ত প্রাণি কুকুরের এই ধর্ম নতুন কিছু নয়। ‘কুকুরই বোধয় একমাত্র প্রাণী, যাদের উপকার করলে তারা কখনো সেই উপকারকারীকে ছেড়ে যায় না। অথচ মানবজাতির মধ্যে এমন উদাহরণও আছে কাউকে উপকার করলে সেই উপকারের প্রতিদান দিতে সেই মানুষটি ভুলে যায়। মানুষ বেইমানে করে, কিন্তু কুকুর কখনো বেইমানি করে না। সে কারণেই হয়ত মানুষ রাগের মাথায় আরেকজন মানুষকে কুত্তার*চ্চা বলে গালি দেয়’ রাশেদের সামনে থেকে বেড়িয়ে গেলো গাড়িটি। কিছুদূর যাওয়ার পরে জানলা দিয়ে মুখ বাড়ালো কুকুরটি। সেই সাথে কুকুরটির পিছনে অর্পা। এমন দৃশ্য বোধয় সিনেমার পর্দায়ও দেখা যায় না।

 

কিছুদূর যাওয়ার পরে গাড়ির ভেতরের দৃশ্য, অর্পা আদর করছে তার কুকুরটিকে। ছেলেটিকে তার মন্দ লাগেনি, তবে এই কুকুরটি যে অর্পার সেটিতেও তার কোন সন্দেহ নেই। কিডো তার মালিককে চিনে ফেলেছে, সে মালিকের সাথে বন্ধুসুলভ আচারণও করছে। কিন্তু অর্পার মনে প্রশ্ন একটাই, কিডো কেন তাকে দেখে দৌড়ে এলো না। অবশ্য ছেলেটিকে পেয়ে অর্পার একদিকে ভালই হয়েছে। মূলত কিডোকে ঘর থেকে বের করে দেওয়া হয়েছে। বের করে দিয়েছে অর্পার বাবা সাবেক আর্মি অফিসার লিয়াকত আলী। লোকটা ভীষণ বদমেজাজী, আর্মিতে যখন ছিলেন তখন তার গর্জনে বাকি সদস্যরা থ থ করতো। আর্মি অফিসার লিয়াকত আলী’র বড় টেনশন তার মেয়ে অর্পাকে নিয়ে। অর্পা যে মডেলিং করুক কিংবা অভিনেত্রী হোক সেটি সে কখনোই চাননি। মেয়েটা ডাক্তারি পাশ করেছে, কোথাও ডাক্তারি করবে সেবা করবে তা না, সপ্তাহ অন্তর তাকেই ডাক্তারের কাছে যেতে হয়। অর্পার অ্য্যলার্জেটিং সমস্যা আছে, বিড়াল কিংবা কুকুরের লোমে তার শ্বাস কষ্ট হয়, তবুও কিডোকে তার ভালো লেগেছে। জোড়পুর্বক তাকে বাসায় নিয়ে আসা হয়েছে। কিন্তু বাসায় নিয়ে এসেও বিপত্তি বেঁধেছে, কিডোর কারনে সে বেশিরভাগ সময়ই অসুস্থ হয়ে পড়ে।

২.

মেয়েটি অভিনেত্রী হলেও রাশেদ কিন্তু মেয়েটিকে সেরকমভাবেনি। রাশেদও কম কিসে? রাশেদের সুদর্শণ চেহারা নিঃসন্দেহ কোন নায়ককে হার মানিয়ে দিতে বাধ্য। মেয়েরা এমন করে তাকে কাছে চাইতো যেন, তাকে একেবারে উগড়ে ফেলবে। রাশেদ পরাধীনতায় বিশ্বাসী না। সে চায় স্বাধীনতা, এতটাই স্বাধীনতা চায় যে মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানির মোটা বেতনের চাকরী ছেড়ে সে সন্যাসী হয়েছে। অর্পা মেয়েটিকে মন্দ লাগেনি রাশেদের। গোলগাল চেহারা, এর আগে কখনো টিভিতে দেখেছে কিনা মনে পড়ছে না। তবে মেয়েটিকে অন্য কোন মেয়ের চেয়ে ভালো লেগেছে। রাশেদ কি মেয়েটির প্রেমে পড়েছে? না সেটি আপাতত রাশেদ বিশ্বাস করতে চায় না। কারণ বুদ্ধিমান পুরুষ কোন মেয়ের প্রেমে পড়লেও সেটি সহজতর প্রকাশ করতে চায় না। তারা চায় মেয়েটির সাথে মাইন্ড গেম খেলতে। যাতে মেয়েটি বুঝতে পারে এই ছেলেটি তার প্রেমে পড়েনি, তাকে যেভাবেই হোক প্রেমে ফেলতে হবে। কিন্তু আগেই যদি সেই পুরুষ মেয়েটির কাছে দূর্বল হিসেবে ধরা দেয় সেখানে বরং প্রেম আর বেঁচে থাকে না। সেখানে নতুন করে জন্ম নেয় দয়া, আর এই দয়ার খাতিরে যে প্রেম হয় না ব্যাপারটি এমন না। তবে সেই প্রেম বেশি দিন টিকে না”। রাশেদকে এমন কথাই বলেছিলো তার এক বন্ধু। যদিও রাশেদের মাইন্ডসেটও কম ভালো নয়।

*

শর্ত অনুযায়ী আজ অর্পার কাছ থেকে সেই কুকুরটিকে আনার কথা রাশেদের। রাশেদ অবশ্যি কুকুরকে প্রাধান্য না দিয়ে এখন অর্পাকেই প্রাধান্য দিচ্ছে। কারণ মেয়েটি তার মনে একটু হলেও জায়গা করে নিয়েছে। অর্পার গোলগাল মুখের সাথে কিঞ্চিত লাইট লিপস্তিক, পরিস্কার দাঁত, গলার ভাঁজ, উলের মতো ফিনফিনে কেশরাশি সবকিছুই সেদিন রাশেদের মাথায় গেঁথে গিয়েছে। সেই সাথে বাসায় আসার পর রাশেদ আরও একটি ব্যপার গভীরভাবে উপলব্ধী করেছে। মেয়েটির শরীর থেকে ভেঁসে আসা সুবাসিত পারফিউমের ঘ্রাণ। লেকের পাড়ে এসবভাবতে ভাবতে আনমনে সিগারেট হাতে নিয়ে ছোটছোট পায়ে হাটছিলো রাশেদ। অর্পাকে আসতে দেখে সিগারেটটি ফেলে টুপ করে পকেট থেকে একটি চুইঙ্গাম পুরে নেয়। অর্পা রাশেদের কাছে আসে, অর্পার কোলে তার কুকুর। মুখে মাস্ক থাকার কারণে বোঝার সাধারণত বোঝার উপায় নেই এই মেয়েটিই অর্পা। তবে সেদিন অর্পাকে নিভৃতে এতটাই পর্যবেক্ষণ করেছে রাশেদ যে তার আর বুঝতে বাকি থাকে না এই মেয়েটিই অর্পা। অর্পার মাথায় কালো রঙের ভেতরে লালচে রঙের স্কার্ফ। সামনের দিক থেকে চুল বের করে, চুলগুলো একপাশে সিতি কাটা। গতবারের চেয়ে এবার অর্পার চুল আরও চিকচিকে কালো। অর্পা কাছে দাড়াতেই তার শরীর থেকে ভেসে আসা স্নিগ্ধ সুবাসিত গন্ধ রাশেদকে আরও একবার সম্মোহনে ডুবিয়ে দিলো। কিন্তু ততক্ষণে কিডো রাশেদের কোলে যাওয়ার জন্য তোড়জোড় শুরু করেছে। কিডোকে কোলে নিয়ে, কিডোর মাথায় চুমুকে অর্পার দিকে আবারও তাকালো রাশেদ। ঠিক অর্পার দিকে না, সরাসরি অর্পার চোখের দিকে। সে চোখ দিয়ে অর্পাকে বধ করতে চায়। কিন্তু একজন পুরুষ যতই শক্তিশালী হোক না কেন, সে একজন নারীর চোখের কাছে হেরে যায়। অর্পার চোখের আইলেশ, নীল পরিস্কার চোখের মণিতে যেন রাশেদ দেখেছে স্বর্গের সুখ। ভ্রম ভেঙে রাশেদ প্রশ্ন করে অর্পাকে, “কেমন আছেন?” অর্পা হেসে মিষ্টি কন্ঠে জবাব দেয়, “ভালো আপনি?’’ রাশেদ এতক্ষণ ভালো ছিলো কি না সেটি ঠিক বলতে পারছে না। অর্পা আসার আগ পর্যন্ত তার সময়টি কেটেছে উৎকন্ঠায়। আজকে অর্পাকে ভীষণ ভালো লাগছে, মুখ ঢাকা কিন্তু অর্পার চোখের চাহনী রাশেদকে যে ভ্রমের মধ্যে ডুবিয়েছে তা বোধয় এর আগে কখনো কেউ পারেনি।

 

-‘আজকে ফ্রি আছেন আপনি?’ কিছুটা হাস্যজ্বল এবং স্বহৃদয়ে বললো অর্পা। মুখ মাস্ক দিয়ে ঢাকা থাকলেও মেয়েদের যে চাঞ্চল্যতা কাজ করে সেটি একটু বুদ্ধিখাটিয়েই ধরে ফেলা যায়। রাশেদের দৃষ্টি এড়ালো না এসব। রাশেদ একটু গলা ঠিক করে ভরাট গলায় বললো,  “হ্যাঁ। আজকে আমি ফ্রি আছি” অর্পা বললো, “ তাহলে চলুন আজকে কিডোকে নিয়ে একটু ঘুরে আসা যাক” চলুন……..!

 

গাড়ি চালাচ্ছে অর্পা, সামনের সিটে অর্পার পাশে বসা রাশেদ। অর্পা এত স্মুদ ড্রাইভ করছে যে রাশেদের মনেই হচ্ছে না তার পাশে যিনি বসে আছেন তিনি একজন নারী। এত ভালো করে রাশেদও গাড়ি চালাতে পারে না। গাড়িতে ওঠার পরে গাড়ির দরজা ধপ করে লাগিয়ে মুখ থেকে মাস্ক নিয়ে প্রথমে একটি লম্বা নিশ্বাস ছাড়ে অর্পা। যেন এতক্ষণ পর সে হাফ ছেড়ে বসেছে। ঢাকা শহরের জ্যাম ভেঙে তারা মহাসড়কে উঠলো, কিছুদূর যাওয়ার পরেই নদীর পাড় ঘেসা একটি ভিআইপি রেস্টুরেন্টের সামনে দাড়ালো গাড়িটি। গাড়ি থেকে নেমে লিফট ধরে সোজা রেস্টুরেন্টের রুফটপে একটি বিশেষ জায়গায় গেলো তারা। পড়ন্ত বিকেলে সূর্য প্রায় ডোবে ডোবে ভাব, নদীর মাঝখানে টিমটিমে লাইট জ্বলছে, ওপারে গাড় কুয়াশা। টেবিলে বসে ফোনটা বের করে কিছুক্ষণ আনমনে স্ক্রল করার পরে তারা দু’জনই উপলব্ধি করলো তাদের একে অপরকে কিছু বলা দরকার। কিডো কিন্তু এতক্ষণ সুস্থভাবে বসে নেই। এদিক ওদিকে ঘোরাঘুরি করছে। নিরাবতা ভেঙে অর্পা রাশেদকে জিজ্ঞেস করলো,

-‘আপনি কি করেন’ অপ্রস্তুত এমন প্রশ্নে রাশেদের স্বাভাবিকভাবে বিচলিত হওয়ার কথা না থাকলেও সে বিচলিত হয়ে পড়লো। অপ্রস্তুতভাব কাটিয়ে অর্পাকে বললো,

“জ্বী। একটি মাল্টিন্যাশনাল কোম্পানিতে চাকরী করতাম ছেড়ে দিয়েছি।“

“ছেড়ে দিয়েছেন?’ একটু ঝুঁকে রাশেদের দিকে এগিয়ে বললো অর্পা।

“হ্যাঁ ছেড়ে দিয়েছি। আসলে আমার চাকরী করতে একদমই ভালো লাগছিলো না। আপাতত চাকরী থেকে বেরিয়ে বিদেশে কোথাও ঘুরে আসি। জীবনকে বদ্ধ কারাগর মনে হচ্ছিলো আমার”

অর্পা মাথা ঝাকিয়ে একটু ব্রিলিয়ান্ট ওয়েতে বললো, “স্ট্রেইঞ্জ”। বাসায় কে কে আছে আপনার?

“বাসায় সেরকম কেউ নেই!  আসলে মা’কে ছোটবেলা হারিয়েছি। বাবাকেও গত বছর দুই আগে হারালাম। এখন আমার বলতে শুধু আমিই আছি। আর আত্মীয়স্বজন এই  আরকি!

 

হঠাৎ করে অর্পার মায়া হয় রাশেদের  জন্য। সে ব্যাথিত হয়েছে এমন ভঙ্গিতে বলে, য়্যাম এক্সট্রেমলি সরি” এরপর রাশেদও অর্পার সম্পর্কে জিজ্ঞেস করে। পারিবারিক আলোচনা শেষ হওয়ার পরে কিছুক্ষণ চুপ করে থাকে। অর্পার মাথায় বেশ কিছুক্ষণ ধরে একটি কথা ঘুরপাক খাচ্ছে। রাশেদকে সেই কথাটি সে বলবে কি না এমন চিন্তিত আছে। রাশেদ আগবাড়িয়েই বললো, “আপনাকে দেখে মনে হচ্ছে আপনি কিছু বলতে যাচ্ছেন। কিছু বলবেন?” রাশেদ ছেলেটাকে অর্পার শুরু দিন থেকেই বেশ স্মার্ট মনে হয়েছিলো অর্পা আজকে আবার আরেকবার রাশেদের প্রমাণ পেলো। ছেলেটা সত্যিই স্মার্ট। স্মিত হেসে নিজের মনের কথা বললো রাশেদকে, “আসলে কিডোকে আমার ফ্যামিলি মেম্বাররা বাসার বাইরে রেখে এসেছিলো প্রথমে অবশ্য চেষ্টা করেছিলো কোথাও অ্যাডপ্ট দেওয়া যায় কি না। কিন্তু আমি কিডোকে ভীষণ ভালোবাসি। কিডো আমার বন্ধু হয়ে গিয়েছে, একদিন বিকেলে আমি ঘুমিয়ে উঠে জানতে পারি কিডো বাসায় নেই। তাকে কোথাও পাওয়া যাচ্ছে না। চারদিকে খুঁজলাম কোথাও পাইনি। ঢাকার এমন কোথাও নেই যে ওকে খুঁজিনি। কিন্তু পাইনি কোথাও। শেষমেষ বাবা/মায়ের ওপর বকাবকি করলাম, আমার সন্দেহ তারাই হয়ত কিডোকে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গিয়েছে। আপনিই বলুন এটা কি কোন কথা? এরকম একটা নিষ্পাপ বাঁচ্চার সাথে কেউ এমনটা করতে পারে? ‘তারপর যখন জিজ্ঞেস করেছি তখন বলেছে, না তারা এমনটা করেনি। আসলে তারা তো আমার নিজের বাবা মা তাই কিছু বলতে পারি না। রাশেদ অর্পার দিকে এগিয়ে বলে, “আপনি হয়ত ভুল-ভাবছেন। কিডো একা একাও তো বের হয়ে যেতে পারে। অর্পা একটু রাগন্বিত হয়ে বললো, “না আমি ভুল বলছি না। আসলে তারাই কিডকে বের করে দিয়েছে।‘

 

আসলে বেশ কয়েকবছর ধরে আমার অ্যালার্জি ও শ্বাসকষ্টের সমস্যা আছে। যে কারণে কিডোর পশম আমার নাকে গেলে আমার কিছুটা শ্বাসকষ্ট কিংবা অ্যালার্জি জাতীয় সমস্যা হয়। কিন্তু আমি তো বাচ্চাটাকে ভালোবেসে ফেলেছি। ওকে ছাড়া আমি কিভাবে থাকবো। অর্পার চোখ ভিজে আসে, স্নেহের পোষ্যকে মানুষ এভাবেই ভালোবাসে। অর্পাকে সান্ত্বনা দেয় রাশেদ। “প্লিজ আপনি মন খারাপ করবেন না”। আপনার যেমন কিডোকে নিয়ে চিন্তা, ঠিক তেমনি আপনার বাবা-মায়েরও আপনাকে নিয়ে চিন্তা।

 

অর্পা আনমনে কিছু একটা ভেবে তারপরে রাশেদকে বলে, “আসলে আমি দুঃখিত। আমি আপনার লিলিকে আমার কিডো ভেবেছিল। ও না দেখতে একদম কিডোর মতো” রাশেদ এবার অট্টহাসি দেয়। আসলে ওই আপনার কিডো। ব্যাপারটা হচ্ছে আমি যখন শুরুতে ওকে পাই তখন এত সুন্দর কুকরটিকে দেখে তার মালিককে ভীষণ গালি দিতে ইচ্ছা করছিলো। অর্পার চোখের দিকে রাশেদের চোখ যেতেই অর্পার রাগন্বিত চোখ দেখে রাশেদ বুঝতে পারে, হঠাৎ করেই অর্পা কিঞ্চিত অভিমান করেছে। কথা ঘুরিয়ে না মানে বাচ্চাটিকে দেখে তার মালিককে বকা দিতে ইচ্ছে করছিলো। এতসুন্দর একটি বাচ্চাকে কেন যে তার মালিক এভাবে রাস্তায় ফেলে দিয়ে গিয়েছে কে জানে। ‘আমি তো জানতাম না এটি আপনার পেট। পরে ফেসবুকে স্ক্রল করার পরে জানতে পারি যে বাচ্চাটি আপনার। এরপর অবশ্য আপনার সাথে যোগাযোগ করার চেষ্টা করলেও সেটি পরে আর হয়ে ওঠেনি’ কথা থামায় রাশেদ। অর্পা রাশেদের দিকে ঝুকে বলে, ‘আপনি প্লিজ আমার একটি কথা রাখবেন?’

রাশেদ স্মিত গলায় বলে, ‘বলুন’। আপনি প্লিজ কিডোকে আপনার কাছে রাখবেন? দরকার হলে ওর সব খরচ আমিই আপনাকে দেবো। অর্পার এমন অবান্তর কথা শুনে রাশেদ কিছুটা হাসে। আচ্ছা রাখবো! তবে একটি শর্ত আছে। ‘অর্পার চোখ আনন্দে জ্বল জ্বল করে উঠেছে। সে আনন্দধরা গলায় বললো,’বলুন কি শর্ত?’ ‘ও আমার কাছে থাকবে আমার খরচে।‘ আপনাকে কোন খরচ করতে হবে না।

*

প্রেম করতে হলে যে মানুষকে যন্ত্রণা সহ্য করতে হয় তার জ্বলন্ত উদাহরণ রাশেদ। খুব করে বলেছিলো কিডোকে তার কাছে রাখবে যাতে তার মালিককে পটাতে সুবিধা হয়। এতে অবশ্য লাভ হয়েছে বটে তবে কিডো আসার পর থেকে আবারও রাশেদের ঘুম উড়ে গিয়েছে। সে সারাদিন কিডোকে নিয়ে ঝাপাঝাপি। কিডোকে অবশ্য সমস্যা বললে চলে না, বলতে হয় মধুর সমস্যা। মানে মধু মিশ্রিত সমস্যা। কিডো দুষ্টুমি করে, আর বকা দেয় রাশেদ। ব্যাস চুপ করে বসে পড়ে। মাঝেমধ্যে ভিডিও কল দেয় অর্পা। সেদিনের শর্তের সাথে আরও একটি শর্ত অবশ্য অর্পা জুড়ে দিয়েছিলো। প্রতি সপ্তাহে অন্তত তিনদিন কিডো, অর্পা আর রাশেদ ঘুরতে বের হবে।

*

অর্পারও যে রাশেদকে ভালো লাগে তা রাশেদ জানে না। আর রাশেদও যে অর্পাকে পছন্দ করে সেটিও রাশেদ জানে না। প্রেমের সবচেয়ে মধুর তম ব্যাপার, যখন একে অপরকে উভয়ই পছন্দ করে কিন্তু কেউ কারও কাছে ধরা না দেয়। গোপনে ভালোবাসা সর্বোত্তম ভালোবাসা। তবে এই দু’জনার এই গোপন ভালোবাসা বেশিদিন তাদের অন্তরে রইলো না। অর্পা একদিন হুট করেই বাসা থেকে বেরিয়ে এলো, রাশেদকে ফোন দিয়ে জিজ্ঞেস করলো, “কোথায় আপনি?” রাশেদ অর্পার তেজী কন্ঠ শুনে বললো, “আমি বাসায়” অর্পা বললো, “বাসার নিচে আসুন”

-“আমি আর ঐ বাসাতে যাব না” বললো অর্পা।

-রাশেদ নিজের মাথায় হাত দিয়ে কপাল ঘষতে ঘষতে বললো, ‘বাসায় যাবেন না কেন?’

-ঐ বাসার সবাই পঁচা। একেবারে বাচ্চা মেয়েদের মতো করে বললো।

রাশেদ মুখ টিপে হাসতে যাবে অমনি এই বিষয়টি দৃষ্টি এড়ালো না অর্পার। সে রাশেদের দিকে গম্ভীর দৃষ্টিতে তাকিয়ে রইলো। অর্পার চোখে রাশদের চোখ পড়তেই রাশেদ বুঝলো এ চোখে এখন রাগের আগুন জ্বলছে। রাশেদ মিন মিন করে বললো, “না মানে! মানে বাসায় যাবেন না তাহলে কোথায় যাবেন?’ এবার অর্পা গম্ভীর গলায় দাঁতে দাঁতে পিষে বললো, “আপনার বাসায়” রাশেদ বিড়ম্বনার হাঁসি অন্তরে চেপে বললো,’ আমার বাসায়?’ হুঁ হুঁ। অর্পার রাগ এবার মিসাইলের মতো বিস্ফোরণ হলো, বিস্ফোরিত হওয়ার আগেই যেমন ভাব করে তেমন ভাব করে অর্পা  কঠিন গলায় বললো, ‘আপনার বাসায় থাকতে আপনার কোন অসুবিধা আছে?’ এবার একেবারে নির্দোশের মতো নিজেকে জাহির করলো রাশেদ, “না না অসুবিধা কিসের?” চলুন………

*

রাশেদের বাসায় গিয়ে অর্পা বেশ খানিকটা মুগ্ধ হলো বটে। বাসাটি পরিপাটি, ছেলেদের ঘর এতোপরিপাটি থাকতে পারে সেটি যেন কল্পনার বাইরে ছিলো। অর্পা তার নিজের ভাইকে দেখেছে, তার খাওয়া আর শোওয়া ছাড়া কোন উপায় নেই! তবে রাশেদের ঘরে গিয়ে ছেলেদের ঘরগোছানো দেখে মাথা নষ্ট হয়েছে। রাশেদ যে ফ্লাটটিতে থাকে সেটিও বেশ চমৎকার! দক্ষিণ দিকে বেশ বড়  একটি  ব্যালকনি, সেখানেও কিছু লতাপাতা  টাইপের গাছ, সেই সাথে একটি হাসনা হেনাও লাগিয়েছে। সাথে গাঁদা, গোলাপের চারাও আছে। গোলাপ গাছটিতে একটি ফুলের কলি ফুঁটেছে। তাই অর্পার অবাক দৃষ্টি ও প্রস্ফুটিত মন রাশেদের প্রশংসা করতে ভুললো না। অর্পা মুগ্ধ হয়ে দেখছিলো ব্যালকনি, সেখানে একটি ঝুলানো দোলনা আছে। সেখানে বসে ছিলো অর্পা, পাশে তার প্রিয় কুকুর। এতক্ষণে অবশ্য বাসায় আসা নতুন অতিথির জন্য কফি আর বিস্কুট নিয়ে হাজির রাশেদ। অর্পার দিকে কফির ট্রে এগিয়ে দিতেই, কফি হাতে নিতে নিতে অর্পা বললো, “ইউ-আর ভেরি পোলাইট’ আপনার বাসায় না আসলে জানতামই না যে ছেলেরা এত গোছানো হয়। আমার মনে হচ্ছে আমি শুটিং স্পটে আছি। আসলে শুটিং স্পটও এতটা গোছানো হয় না।

রাশেদ মুচকি হেসে, নিজের প্রশংসা শুনে অর্পাকে বললো, “থ্যাংক ইউ” এভাবে গড়িয়ে গেলো সারাদিন। অর্পাকে রাশেদের রুম ছেড়ে রাশেদের আশ্রয় হলো তার রিডিং রুমে। তার রিডিং রুমে। রিডিং রুমে ছোট্ট একটি খাটে শুয়ে দক্ষিণের জানলা দিয়ে ফিনফিনে বাতাসে রাশেদ পড়াশোনা করে। এই পড়াশোনার কারণেই সে চাকরী ছেড়ে দিয়েছে। কিছুক্ষণ দরজায় টোকা পড়লো, বইয়ের ভেতরে ডুবে থাকার দরুণ সে এতক্ষণ ভুলেই গিয়েছিলো যে, তার বাসায় সে ছাড়াও আরও এউ আছে। অর্পা বাইরে থেকে বললো, “আসব”? রাশেদ ধড়মড় করে উঠে বসে দরজা খুলে অর্পাকে ভেতরে আসতে দিলো। রুমটার চারদিকে বুকশেলফ। এক কোণে শুধু মাত্র একটি রোলিং চেয়ার ও একটি রিডিং টেবিল। অর্পা আসলো, চারদিকে মন্ত্র মুগ্ধের মতো ঘুরলো। জিজ্ঞেস করলো, “এত বই আপনার সংগ্রহে?” রাশেদ মাথা নাড়ালো। অর্পা রোলিং চেয়ারটিতে বসতে গিয়ে কোন এক অদ্ভুত কারণে, পায়ে ব্যাথা পেয়ে কাঁকিয়ে উঠে রাশেদের কোলে ঢোলে পড়লো। ততক্ষণে অর্পা ও ঘর থেকে নিজের জামাকাপড় ছেড়ে রাশেদের একটি ট্রাউজার ও একটি গেঞ্জি পড়েছে। অর্পার ঠোটে লাল লিপস্টিক, শরীর থেকে ভেসে আসছে অদ্ভুত এক সম্মোহিত ঘ্রাণ, যে ঘ্রাণের কারণে পুরুষসত্ত্বা জাগ্রত হয়ে হিংস্র হয়ে ওঠে বাঘের মতো। অর্পার চোখ পড়লো রাশেদের চোখে, রাশেদ বুকের ভেতরে অদ্ভুত মাদল দোলে জাগ্রত হলো, অর্পাকে সমেত নিজের ভর যেন শত চেষ্টাতেও ধরে রাখতে পারলো না তাই উপায়ন্তুর হয়ে অর্পাকে সমেত পড়ে গেলো বিছানায়, এভাবে বিছানায় একে অপরের উপর শুয়ে তারা যেন কোন কাজের আদেশের জন্য অপেক্ষা করছে। নর-নারী দুটি শরীরই চাইছে একে অপরকে প্রবলভাবে আকৃষ্ট করতে, তারা চাইছে তাদের শরীর সম্মোহণে সংযুক্ত হতে যেমনটা হয় নদীর এপাড় ওপার। অর্পার সিল্কি চুলে ঢেকে গিয়েছে রাশেদের মুখ, বুক জুড়ে দুরুদুরু ভাব। অর্পাও পরম ভালোবাসার ঠাই পেয়েছে রাশেদের চোখে, ‘মেয়েরা যখন নিজেদের ভালোবাসার তোরে অন্যের মোহে আকৃষ্ট হয় তখন বুঝি মনে হয় সে পৃথিবীর সবটুকু উজার করে তার অর্ধাঙ্গের জন্য ভালোবাসবে, সে নিজেকে উজাড় করে দেবে সেই পুরুষটির জন্য যাকে সে প্রকৃত অর্থে ভালোবেসেছে। দক্ষিণের জানলা দিয়ে আসা ফিনফিনে বাতাস, আকাশে কালো মেঘ জমেছে! মেঘের গর্জনে তাদের একে অপরের প্রতি সম্মোহন ভাঙলো, তারা আবিস্কার করলো একে অপরের ওপর আছে। ধড়মড় করে উঠে অর্পা বসে পড়লো, অর্পার মুখ লজ্জায় লাল হয়ে গিয়েছে। রাশেদও বেশ বিব্রতকর অবস্থায় ভুগছে! অর্পা কিছু না বলেই উঠে ওপাশের ঘরে উঠে গেলো। রাশেদের মাথায় ঝড় শুরু হওয়ার আগেই বাইরের ঠান্ডা বাতাস জানান দিলো ঝড় আসছে। সেই ঝড় আসলো ক্ষাণিকবাদে, এরপর শহরজুড়ে মুষলধারে বৃষ্টি। রাশেদ আরও এককাপ কফি নিয়ে অর্পার ঘরে গেলো, একটু আগের ঘটনার দরুন অর্পা কিছুটা লাজুক স্বভাবের হয়ে গিয়েছে। মেঘে মেঘে বৃষ্টি নেমেছে শহর জুড়ে। ব্যালকনিতে আসা বৃষ্টির ঝাপ্টা ও ঠান্ডা বাতাসে অর্পা আর রাশেদ একে অপরের পাশে দাঁড়িয়ে। বৃষ্টিতে রাশেদের ব্যলকনিটা যেন আরও সবুজ হয়ে উঠেছে কয়েকগুণ। দুপুরের খাবারের পর, তারা যে যার নিজের ঘরেই থেকেছে। মেঘ কেটে বিকেলের নগ্ন নরম সূর্য্যের আভা জানান দেয়, শহরে নতুন করে প্রেম এসেছে। সন্ধ্যে নাগাদ বাইরে বেরিয়ে বৃষ্টি ভেজা শহরের পথঘাট ঘুরে বেড়ালো অর্পা। প্রথমে রাশেদের বাইক বের করার কথা থাকলেও অর্পার ইচ্ছে ছিলো সে রিকশায় ঘুরবে। প্রথমে তারা ছন্নছাড়াভাবে শহরে ঘুরলো, এরপর শপিং মল থেকে অর্পা নিজের প্রয়োজনীয় জামাকাপড় কিনলো। আর রাশেদকেও কিছু উপহার দিলো, প্রায় লাখটাকার শপিং শেষে বাসায় ফিরলো পেট পুরে রেস্টুরেন্ট থেকে খেয়ে। এরপর বাসায় এসে সেই জামাকাপড় গুলোর তোড়জোড়, রাশেদ ভেবে পেলো না। এই মেয়েটি এত জামাকাপড় কিনেই বা কি করলো? রাশেদ ছিলো পাশের ঘরে আর অর্পা রাশেদের শোবার ঘরে। রাত গভীর হয়, অর্পার শুরুর দিকে এ বাসায় ভালো লাগলেও রাশেদ যে এমন ইন্টোভার্ট প্রকৃতির সেটি আগে বোঝেনি তাই অলস সময় কাটাতে অর্পা রাশেদের পড়ার ঘর থেকে কয়েকটি বই এনে পড়তে শুরু করে। রাত যত গভীর হতে থাকে, ততই যেন কেমন একটা ভয় কাজ করে অর্পার। অর্পা বিরক্ত হয়, উঠে গিয়ে রাশেদের ঘরে যায়। রাশেদকে কঠিন গলায় বলেম, “আপনি যে এতটা ইন্ট্রোভার্ট সেটি জানলে আপনার ঘরে আসতাম না।“ রাশেদ ভ্যাবাচ্যাকা খেয়ে যায় অর্পার এমন কথায়। অর্পা রাশেদকে ধমকের সুরে বলে, “আমি একা একা ঐ ঘরে ঘুমাতে পারবো না।  আমার ভয় করছে” রাশেদ এবার আরও ভ্যাবা চ্যাকা খেয়ে যায়। অর্পা নিরবতার সুর ভেঙে আবারও বলে, “আপনি আমার সাথে ঐ আসুন। আমি একা একা ঐ ঘরে ঘুমাতে পারবো না” রাশেদ আর কিছু বললো না, পড়ার ঘর থেকে বেড়িয়ে শোবার ঘরে চলে  গেলো।  নিচে একটি ম্যট্রেস পেতে তাতেই শুয়ে পড়লো রাশেদ। সৌজন্যতা বোধ দেখাতে অর্পা বললো, “আপনি খাটে শোন। আমি নিচে শুচ্ছি। কিন্তু রাশেদ বললো, “আরে না না। আপনি আমার গেস্ট। আমি নিচে কেনো শোব?” এভাবেই কেটে যায়। দু’জনের ঘুমাতেই অবশ্য কিছুটা সমস্যা হচ্ছে। তারা প্রেমিক-প্রেমিকাও নয়। তাছাড়া দু’জন দুজনকে পছন্দও করে। অর্পা রাশেদের দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে রইলো, রাশেদ ঘুমায়নি চোখ বুজে এলোপাতারি চিন্তা করছে। কখন যে তার শীত লাগতে শুরু করেছে তা টেরই পায়নি। রাশেদের জ্বর উঠেছে প্রবল ভাবে, অর্পা নিজের কাঁথাটি রাশেদের গায়ে দিয়ে আসতে শু’তেই তারও শীত লাগতে শুরু করেছে অর্থাৎ তারও জ্বর এসেছে। এরপর উপায়ন্তুর হয় রাশেদের পাশেই এককাঁথার তলে শুয়ে পড়ে। প্রচণ্ড জ্বরে আড়াম পেতে কোলবালিশভেবে রাশেদ ঘুমের ঘোরে জড়িয়ে ধরে অর্পাকে। অর্পাও ঘুমের ঘরে রাশেদের বুকে মাথা রেখে ঘুমায়। সকাল বেলা পুরুষের অদ্ভুত জ্বালাতনের খবর শুধু পুরুষরাই জানে, সকালের সাথে সাথে পুরুষের শরীরও বেশ তরতাজা হয়ে ওঠে। কোলবালিশ ভেবে রাশেদ এতক্ষণ যার সাথে ক্রোধের আগুনে প্রস্ফুটিত হয়েছে, রাশেদ বিন্দুমাত্র খেয়াল করেনি এ অর্পা। অর্পা অবশ্য তার কিছুই অনুভব করতে পারেনি। প্রথমে ঘুম ভাঙে রাশেদের, রাশেদ খেয়াল করে তার বুকে গুটিশুটি মেরে শুয়ে আছে এক যুবতী নারী। সেই নারী আর কেউ নয়, অর্পা। রাশেদ এই পরম সুখ পেতে আবারও ঘুমের ভান করে, কিছুক্ষণ পরে ঘুম ভাঙে অর্পার। রাশেদ তাকে জড়িয়ে ধরে আছে, অর্পা নিজেকে ছাড়াতেও চায় না। কারণ সে এই বুকের ভেতরে অদ্ভুত এক সুখ খুঁজে পেয়েছে। যে সুখের পরশের প্রতিটি স্পন্দন অর্পাকে আরও সতেজ করে তুলছে। অর্পা এই শরীরের গন্ধ পছন্দ করেছে। রাশেদ অর্পার কপালে ছোট করে একটি চুমু খায়। অর্পা ঘুমে বিভোল নয় এসব টেরপায়। এভাবে কতক্ষণ চলেছে তা তারা জানে না।তারা জানে শুধু শুভ্রঘ্রাণের প্রতিটি সময়ের স্পন্দন অনুভব করতে।

 

এরপর দু’জনই ঘুম থেকে জেগে উঠে। অর্পা এলো চুলগুলো বাঁধে। ঘুমের ভঙ্গতে রাশেদ অর্পার কোলে মাথা রাখে, অর্পাও সেই মাথায় এলোমেলো চুলগুলোয় আঁদর করে। ঘুম থেকে উঠে রাশেদ প্রবল পৌরষবোধ অনুভব করে অর্পাকে জড়িয়ে ধরে সে। এরপর জরাজর ভেঙে অর্পাকে জানায় তার ভালোবাসার কথা। অর্পাও সেই ভালোবাসার প্রস্তাবে সাড়া দেয়। সেই সাত সকালে অর্পার ঘুম শীতল মুখ রাশেদকে প্রবলভাবে আকর্ষণ করে, উঠে গিয়ে ব্যালকনি থেকে একগুচ্ছ গোলাপ এনে অর্পার সামনে হাটুগেড়ে অর্পাকে প্রস্তাব জানাই। “তুমি কি জন্মান্তরে আমার হবে অর্পা?” অর্পা  স্নিগ্ধ শীতল গলায় বলে, “তুমি যদি চাও তবে” এরপর তারা দু’জন দু’জনকে আলিঙ্গন করে প্রবল ভালোবাসার তোড়ে। বাইরে বৃষ্টি একনাগারে তাদের ভালবাসার সায় দিচ্ছে, রিমঝিম সুর ধরে বৃষ্টির তোড়  বাড়ছে আবার কমছে।  সাঝ সকালে একে অপরকে চুমু খায় নগ্ন বৃষ্টির স্নিগ্ধ ভালোবাসার তোড়ে।

বছর দুই পরে,

অর্পা লালশাড়িতে দাঁড়িয়ে আছে ব্যালকনিতে। অর্পাদের সেই ছোট্ট পোষা প্রাণিটি কিছুদিন আগেই মারা গিয়েছে। সেই শোক সামলাতে উঠতে গিয়ে অর্পা আরও একটি দুঃসংবাদ পেয়েছে। সেই দুঃসংবাদের আগে অর্পা পেয়েছে বহু সুঃসংবাদ। রাশেদ অর্পাকে বিয়ে করেছে, তাদের সাংসারিক প্রত্যেকটি দিন তারা একে অপরকে ভাগাভাগি করে কাটিয়েছে। অসুস্থতার সময় অর্পা পেয়েছে রাশেদের চরম ভালোবাসার পরশ। প্রতিমাসে পিরিয়ড শুরু হওয়ার আগেই রাশেদ ঘরে এনে রেখেছে প্যাড। সেই অচেনা যুবকটির অর্ধাঙ্গিনি হয়েছে অর্পা। দেশে ঘুরেছে-বিদেশে ঘুরেছে। বিছানায় রাশেদকে এতটাই প্রবলভাবে অনুভব করেছে অর্পা যে কোন নারী স্বাভাবিকভাবে সেই সুখটুকু পায় না, অর্পা যখন থামতে বলেছে রাশেদ থেমেছে। রাশেদ কোন কিছুতে জোরাজুরি করেনি। যাকে সে ভালোবেসে সেই পুরুষটি অর্পার কাছে বইয়ের পাতায় গল্পের মূল চরিত্রের মতো। এই দু’বছরে তাদের ভালোবাসা এতটুকুও কমেনি বরং প্রতিদিন বেড়েছে কয়েকগুন। রাশেদ অর্পাকে শেষ চুমু খেয়েছিলো গত রোববারে। গতকাল অর্পা জানতে পেরেছে রাশেদের ক্যান্সার। শুধু ক্যান্সার নয়! বরং ক্যান্সারের লাস্ট স্টেজ। নিজের শরীরে ধরা দেওয়া এমন রোগের কথা প্রথমে অর্পাকে জানায়নি রাশেদ। কিন্তু জোড় করে অর্পা জানতে পেরেছে। আজ তাদের বিবাহবার্ষিকী। রাশেদ বিষণ্য নয় একটুও।

দুই বছর ছয় মাস পর,

রাশেদের কেমোথেরাপি চলছে। শুকিয়ে সে বিবর্ণ আকাড় ধারণ করেছে। অর্পা এই সময়টুকুতে রাশেদের পাশে থাকতে চায়। অর্পার বিশ্বাস রাশেদ সুস্থ হয়ে উঠবে, অর্পা জানতে  পেরেছে সে গর্ভধারণ করেছে। রাশেদকে এ খবর জানাতেই মলিন মুখে স্নিগ্ধ হাসি হেসেছে রাশেদ। রাশেদের এ মলিন হাসি হাসার কারণ, সে জানতে পেরেছে সে আর বেশিদিন রইবে না। তবে অর্পা বিশ্বাস করে, রাশেদ আবার সুস্থ হয়ে উঠবে। রাশেদ আর অর্পার ভালোবাসা জমবে অন্তঃবৃত্তে । প্রিয় পাঠক, আপনারাও কি তাই মনে করেন?

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
গল্প: কে চোর?

গল্প: কে চোর?

আহসান হাবিব আরাফ ১ ‘অপয়া কি মা?’ ভেজা চোখ নিয়ে মাকে প্রশ্ন করে খুকু। মায়ের শুকনো মুখে কোনো জবাব নেই।’নিশির মায়ে আমারে কয় চোরের মাইয়া।মা ...
হালচালে সত্য পাপ

হালচালে সত্য পাপ

গোলাম রববানী    আমি অনেকবার চেয়েছি ন্যায্য কথাটি বলে ফেলি ঠিক যতবার ভেবেছি আমি অই শব্দগুলো হারিয়েছি হারিয়েছি ঠিক বলব না হয়তো ব্যবহার করা হয় ...
ফাগুন প্রেয়সী

ফাগুন প্রেয়সী

শুভ্র শোভন রায় অর্ক নীল সমুদ্রের সীমাহীন গর্জন পিছে রেখে, প্রবালের বাঁধা পেরিয়ে ডোরাকাটা লালচে বালুচর আর সবুজে মন ফিরে যায় । দ্বীপজুড়ে সারি সারি ...
বইমেলার বই: মায়াবী ফাঁদ

বইমেলার বই: মায়াবী ফাঁদ

কবি’র নাম : গোলাম কবির ঠিকানা : ১৭/১৮, তাজমহল রোড, ব্লক – সি, মোহাম্মদপুর, ঢাকা – ১২০৭। মোবাইল # ০১৭১৫৮৮৫৩৬৫ প্রাসঙ্গিক তথ্য : এই কাব্যগ্রন্থটি ...
জীবনের আয়োজন (রোমান্টিক গল্প)

জীবনের আয়োজন (রোমান্টিক গল্প)

আশিক মাহমুদ রিয়াদ সেবার রুপাকে কাঁদতে দেখে আমি হেসেছিলাম। বার্ষিক পরিক্ষার ফলাফল প্রকাশ হলো। আমি ফার্স্ট হলাম আর রুপা সেকেন্ড।সারাপথ ওকে ব্যঙ্গ করতে করতে বাড়িতে ...
শাকিব খানের নতুন নায়িকা এত হট?  Sonal Chauhan Indian actress and singer

শাকিব খানের নতুন নায়িকা এত হট? Sonal Chauhan Indian actress and singer

শাকিব খানের সাথে চুটিয়ে অভিনয় করছেন ইমরান হাশমির একসময়ের নায়িকা সোনাল চৌহান। ২০০৮ সালে মুক্তি পাওয়া বলিউড ব্লকবাস্টার জান্নাত সিনেমায় ইমরান হাশমীর বিপরীতে ছিলেন সোনাল। ...