সেরা আঠারো (প্লাস) অণুগল্প

সেরা আঠারো (প্লাস) অণুগল্প

সাহারা
আকাশে দূর্ণিবার ঝড় উঠেছে, ঝড় শুরু হওয়ার আগেই একটি গাড়ি এসে দাঁড়ালো অ্যাপার্টমেন্টের নিচতলায়। কার্ড প্রেস করে সে ঢুকলো ঘরের ভিতরে, কাউচে হেলান দিয়ে বসতেই কেউ এসে সন্তপর্ণে দাড়ালো তার পিছনে। ঘাড় ঘু্রাতেই সে অবাক হলো খানিকটা, আকাশে জড় হওয়া মেঘেরা তুফান শুরু করেছে, অ্যাপার্টমেন্টের কাঁচ ঘেরা জানলায় ধরা দিলো বৃষ্টির ফোঁটা। গোটা শহরে শুরু হয়েছে তোড়জোর, বাতাস বৃষ্টির চুম্বনে প্রতিটি ফোঁটার শিহরণ অনুভব করতে লাগলো নিপীড়িত। গিটারের তারে বাজলো অদ্ভুত এক গাণ, চুম্বনের শব্দে ঘোর ফিসফিস।চাবুকের কড়াল চাপটে, শিৎকারে ধরা গললো সুপ্ত মেঘ। বাইরে আকাশ মেঘে বজ্রগর্জন। গলা বেয়ে নামে পিপাসার ঠোট, বুঁক অব্দি পৌছানোর সাথে সাথেই শুরু হয়েছে বৃষ্টির মাদল দোল। সবুজের শস্যক্ষেত দোলে বৃষ্টির স্পর্শের কম্পনে, আকাশে মেঘ কাঁটার আগেই ঝুম বর্ষায় ভিজে যায় পথঘাট। অ্যাপার্টমেন্টের জানলায় বেয়ে পড়ে সবটুকু ভালোবাসা। কল্পনার ক্যানভাসে, দু-কাপ কফি আর সম্মোহনীয় শরীর জুড়ে ছিটে পড়ে ভালোবাসার অদ্ভুত এক তেজ! পৌরষ্যের তেজ সবটুকু গ্রাস করে ফুলের নগ্নতা! সাহারার বুকে উত্তপ্ত বালির মতো।

*

প্রীতির গায়ের গন্ধ (চরম উত্তেজনার ভালোবাসার রোমান্টিক গল্প)

“প্রণয় নদীর ঢেউ”

“আমার বুকের মধ্যে মস্ত বড় দুঃখের পাহাড় জমেছে। এই পাহাড়ের অস্তিত্ব টের পেয়েছি কিছুদিন আগে। এই পাহাড়ের গা বেয়ে যে জলপ্রপাতের অস্তিত্ব। সেই জলপ্রপাতকে আমি নিদারুণ ভয় পাই। এই জলপ্রপাতের টলমলে জলে নিজেকে শুদ্ধ করতে পারি না। আমি ভিজেছি কত মায়া জ্বালের অথৈ জলে ।”

নিজের মনের কথা গুলো ডায়েরিতে লিপিবদ্ধ করে রাখে মাহমুদ। ডায়েরি লেখার পরে অদ্ভুত রকমের সুখ সুখ যন্ত্রণা হচ্ছে। মাহমুদের মনে হচ্ছে, ইশশ! এই কথা গুলো যদি কেউ জেনে যায়? কেউ যদি পড়ে ফ্যালে.. মানুষ কি ভাববে? ইশশ! এই ভাবনার অন্তিম রেখা টেনে টুপ করে ডুব দেয় জলধি কল্পনায়। ললাটে যা লেখা থাকুক, কল্পনায় ডুবলে তার ভালো লাগে। এই ধরুন না, পরিক্ষার আগে; নবারুণের বিস্তীর্ণ শশান নিজের কৃতকার্য হওয়ার অগাধ কল্পনা। বাধ ভেঙে ঢাল নেমে, শশান তলিয়ে গেছে। সেই শশানে একা একা বসে গগণে একা শশাঙ্ককে সাক্ষী রেখে একদিন সে হেটে যাবে গগনপাণে এ তো তার অনেকদিনের বাসনা।
বুকের পাহাড়টা একটু একটু করে বাড়তে থাকে। সিগারেটে লম্বা টান দেয়, দম বন্ধ হওয়ার উপক্রম। হৃদয় পোড়ার সুঘ্রাণ, মৃত্যু ভয় আকড়ে ধরে তাকে। মৃদু ঠান্ডা বাতাস এসে চুলগুলো নাড়িয়ে দিয়ে চোখের কোণে ফেলে। চোখ চুলকে ওঠে, তর্জনী আর বুড়ো আঙুলের দ্বৈত চাপে চয়ন ওষ্ঠাগত হওয়ার পালা।
যাকে সহজ বাংলায় বলে,”নিদারুণ ডলাডলি।”
কানের পাশ থেকে পোঁ করে প্লেন উড়ে যায়। প্লেন না ঠিক, শহরের বর্জ্য পানিতে জন্ম নেয়া পতঙ্গ। মশা কি পতঙ্গের মধ্যে পড়ে? অবচেতন মনের এ প্রশ্ন খুঁজতে গিয়ে, মশা ঝোপ বুঝে কোপ দেয় কানের লতিতে। মশা যেন তার ললিত প্রান্তর পেয়েছে। সে পোঁ শব্দে বলছে, এ নরম প্রান্তর আমার। তুই কোন শুয়রের বাচ্চা? অবচেতন মনের এই অদ্ভুত প্রশ্নে
কিছুটা বিমর্ষ হয়ে পড়ে মাহমুদ। নিজেকে মাঝেমধ্যে পাগল মনে হয় তার। শেষ রাতে বিছানায় গিয়ে গা এলিয়ে দেয়। ঘুম ধরা দেয় না দু চোখে তার। রাস্তার ধারে বিলবোর্ডে টাঙানো ছবির আলোয় তার মুখ ঝলসে দেয়। তার অবচেতন মন তাকে কানে কানে ফিসফাস করে বলে, মেয়েটির বয়স একুশ বছর।
২.
সকাল বেলা বিশ্রি অনুভূতিতে ঘুম ভাঙে তার। নিচে গান চলছে, তখন তোমার একুশ বছর বোধয়….।এটি মূলগান না। বিশ্রি রকমের কভার করা গান। তার মাথায় রাগ চেপেছে, সে ভাবছে এই গানগুলোর মূল সত্ত্বাধিকারী, শিল্পিদের উচিত এইসব গানের কভার করা নিষিদ্ধ করা। সত্ত্বাধিকারীর অনুমতি ছাড়া কেউ এই গান কভার করলে সেটির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা নেওয়া। মাহমুদ ধ্যাত বলে ওঠে, সকাল বেলা এরকম বিশ্রি ভাবনা নিয়ে দিন শুরু হবার কোন মানেই হয় না। মশারির কোনে একটা মশা রক্ত খেয়ে আষ্টেপৃষ্টে টইটম্বুর হয়ে আছে।
মাহমুদ সকালের ক্ষোভ তালি দিয়ে মেটালো। মশা মাড়তে গিয়ে কয়েকটা তালি দিয়ে হলো। হাত রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে৷ নিজের রক্ত মশার পেটে ছিলো। সেই রক্ত এখন তার হাতে। তার গা ঘিন ঘিন করছে। এই গা ঘিন ঘিন থেকে মুক্তি পাবার সবচে ভালো পন্থা গোসল করা। মাহমুদ গোসল খানায় ঢুকলো সিগারেট নিয়ে। বের হলো দুই আঙুলের ফাকে ভেজা সিগারেট আর অর্ধ-উলঙ্গ হয়ে ।
বালিশের নিচে ফোনটা ভোঁ ভোঁ করে বাজছে। ভেজা হাত গামছায় মুছে ফোন ধরতেই ওপাশ থেকে ঝাঝালো কন্ঠ ভেসে আসলো। মাহমুদ হন্তদন্ত হয়ে বাথরুমে ঢুকে অসম্পূর্ণ গোসল সম্পুর্ন করে বেড়িয়ে গেলো। সিড়িতে নামার পরে তার। মনে হলো তার চুল আছড়ানো হয়নি। আবার ফেরত গেলো ঘরের ভেতরে।
মাহমুদের বন্ধু অমল সোম। বরিশালে পড়তে এসেই দুজনার সাথে পরিচয়। অমল বলল, তোকে একটা ইমার্জেন্সি ইম্পর্ট্যান্ট কাজে ডেকেছি। মাহমুদ সিগারেটে টান দিয়ে মাথা ঝাকালো। অমল খেয়াল করলো না। অমল তিক্ত হয়ে বলল, শুনেছিস? মাহমুদ সিগারেটের ধোয়া ছাঁড়তে ছাড়তে বললো, হ্যাঁ। অমল বলল, তাহলে চল এয়ারপোর্টের দিকে যাই। মাহমুদ সিগারেটটা চটির নিচে পিষে বললো, হঠাৎ এয়ারপোর্টের দিকে যাবি কেন?
মাহমুদের ধ্যান ভাঙলো প্লেনের বিকট আওয়াজে। প্লেন এসে রান ওয়েতে নেমেছে। এতক্ষণ আনমনা ছিলো মাহমুদ। আঙুল ফাকে বিড়ি নিয়ে কি একটা ভাবছিলো। আনমনা, উদাসীন হওয়ার রোগ তাকে বহুকাল থেকেই তাড়া করছে। অমল বলল, তুই থাক এখানে। আমি গেটে দিকে এগিয়ে যাই। মাহমুদ আবারো উদাসীন হলো, ভুলোমনের স্বভাব তাকে আবারো আকড়ে ধরলো।
পেছন থেকে কাধের ওপর মৃদু চাপড় দিলো কেউ। মাহমুদ ঘুরতেই মাথা চক্কর দিয়ে উঠলো তার। সকাল থেকে ভালো করে খাওয়া হয়নি, সেই সাথে এতগুলো সিগারেট শেষ করে ফেলেছে। হৃৎস্পন্দন বেড়ে যাওয়ার আরেকটা কারন, অমলের পাশে সুন্দরী এক তরুণী দাঁড়িয়ে আছে।
৩.
মেয়েটির নাম নিশি।কলকাতা থেকে এসেছে । অমলের পিসির বান্ধবীর মেয়ে। অমলদের বাড়িতেই আছে। তবে মেয়েটিকে অমলদের বাড়ি ছাড়তে হলো কয়েকদিনের মধ্যেই। অমল একদিন বিকেলে আমাকে ডেকে বললো, বন্ধু একটা বিপদে পড়েছি রে!
মাহমুদ বলল, কি বিপদ?
“নিশির থাকার জায়গা নিয়ে ঝামেলা হয়ে গিয়েছে।”
‘কেনো?’
“আমার ঠাকুর দাদার শ্রাদ্ধ। আমরা গ্রামের বাড়িতে যাচ্ছি। তবে নিশি যেতে চাচ্ছে না৷ জীবনানন্দ দাশকে নিয়ে একটা ডকুমেন্টারি বানাবে। বরিশালেই থাকতে হবে৷ এদিকে মা আবার নিশিকে একা একা বাড়িতে রাখতে চাচ্ছে না।” মাথা চুলকে চুলকে বললো অমল।
মাহমুদ তার বন্ধুর এই বিপাকে পড়া দেখে হতভম্বের মত আচারণ করলো। কপাল চুলকালো। গলা চুলকালো। অমল বললো,কোন একটা উপায় দে শালা।তোর পরিচিত কোন জায়গা আছে?
মাহমুদ কিছুক্ষণ গাম্ভীর্য ধরে রেখে বললো, “আমার চিলেকোঠায় থাকতে পারবে?”
অমল দাঁতে দাঁত চেপে বলল, ওরে শালা। তোর ইচ্ছে তো দেখছি কমনা।
মাহমুদ হাসলো, অমল চাপড় দিলো মাহমুদের পিঠে।
৪.
নিশি এখানকার একটি হোটেলে উঠেছে। উঠেলটি বেশ উন্নত। তবে হোটেলের সম্পুর্ন খরচ বহন করতে হচ্ছে অমলকে।
মাহমুদ কানে ফোন শুনতে পেলো, “মাহমুদ সাহেব, কেমন আছেন? ”
নারীর কন্ঠ শুনে মাহমুদ হকচকিয়ে উঠলো। পুরনো কোন প্রেমিকা? না তাদের তো ফোন দেবার কথা নয়৷ মাহমুদ ঘুম জড়ানো গলায় বলল, “কে? চিনতে পারিনি।”
ওপাশ থেকে মিষ্টি গলায় আওয়াজ এলো, “আমি নিশি চট্টোপাধ্যায়। ফ্রম কোলকাতা। ”
মাহমুদ সিড়ি থেকে হুড়মুড়িয়ে নামতে গেলো, তার গায়ে কড়া পারফিউমের গন্ধ। গায়ে সাদা পাঞ্জাবি, চোখে কালো রঙের চশমা। চুল গুলো লম্বা। সিড়ির নিচে বিড়ির দোকান থেকে একটা সিগারেট নিয়ে রিক্সায় উঠে বসলো।
নিশির সামনে গিয়ে দাঁড়াতে। সে মাহমুদ কে ইগনোর করলো। মাহমুদ চশমা খুলে মৃদু হেসে বললো, আমি মাহমুদ ফ্রম বাংলাবাজার।
নিশি হকচকিয়ে বলতে গিয়ে ক্ষাণিক হেসে বললো,’ ও আপনি মাহমুদ সাহেব? আমি তো খেয়ালই করিনি। ‘
মাহমুদ চশমাটা বুকের ওপর ঝুলিয়ে রাখতে রাখতে বললো, “প্লিজ কিছু মনে করবেন না। দেরী হয়ে গেলো। ”
৫.
“এই শহর নিয়ে কত কথা। এই শহরের প্রতিটি দেয়াল, মোড়ের চায়ের দোকান। মুদি দোকানের ঘ্রাণ, সকালের কুয়াশা, শঙ্খচীল । ঘুম ভাঙা কাক মনে রেখেছে জীবনানন্দকে। এই শহরে অলি গলি রিক্সার টুংটাং শব্দে যে শব্দের সৃষ্টি হয় সেই শব্দের সৃষ্টি, পাখিদের কোলাহল, লঞ্চের ভেঁপু কীর্তনখোলার কলকল বয়ে চলার শব্দে ভরদপুর বেলা হেটে হেটে জীবনানন্দ দাশ একদিন কবিতা লিখেছিলেন।”, মাহমুদ এই কথাগুলো খুব গুছিয়ে বললো। নিশি গালে হাত দিয়ে শুনলো তার কথা। মাহমুদ মেয়েটির চোখের দিকে তাকালো। বুকের মধ্যে অদ্ভুত সেই অনুভূতি আবারো কড়া নেড়েছে৷ অবচেতন মন থেকে ভালো প্রত্যুত্তরে। আবার সাবধানীবার্তা। এই চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকালে তারা প্রেমে পড়ে যাবে। দুজনেই চোখ সরিয়ে ফেললো ।
দুপুর শেষে বিকেল গড়িয়ে সন্ধে নামার আলোয় কীর্তনখোলায় কমলা রকেটের আদ্ভুত আভায় তারা দুজন তাকিয়ে থাকে। নিশি আনমনে ভাবতে থাকে। গত চারদিনে এ শহর তার প্রিয় হয়ে উঠেছে। মাহমুদকেও তার ভালো লেগেছে। এই ছেলেটি প্রাণ খুলে কথা শুনতে পারে। বলতে পারে কাব্যিক সুরে।
নিশির খারাপ লেগেছে, মাহমুদের কেউ নেই। সে একা। ভীষণ একা। আপন বলতে তার অমলই আছে। কলেজ জীবনের বন্ধু।
নিশি জিজ্ঞেস করে, মাহমুদ সাহেব আপনার কোন বন্ধুবান্ধব নেই? মাহমুর জবাব দেয়, অমল ছাড়া এ শহরে তার কাছের মানুষ কেউ নেই।
তারা দুজন বসে আছে কীর্তনখোলার পাড়ে বসে কীর্তনখোলার বয়ে চলার শব্দে নিশ্চুপ হয়ে থাকে।নিশ্চুপ নিরাবতা কাটিয়ে কথা বলে মাহমুদ। কথা হয় জীবনান্দকে নিয়ে৷
নিশি জানতে চায়, মাহমুদ আপনি প্রেম করেন?
মাহমুদ চুপ করে থাকে। মৃদু হেসে জবাব দেয়, প্রেম করলে আপনার সাথে বসার সুযোগ হতো?
নিশি হেসে জবাব দেয়, প্রেম করেননি কখনো?
মাহমুদ স্মিত হেসে জবাব দেয়,
এ শহর আমার কাছে বড্ড অচেনা।আমি কিছুদিন পর পর মানুষের সাথে যোগাযোগ কমিয়ে দেই। মানুষের সাথে সম্পর্ক কমিয়ে দেই, অথবা ছোট হই। তবে একটা কথাই জেনেছি; শিখেছি৷ দূরে থেকেও ভালোবাসা যায়, মঙ্গল কামনা করা যায়৷ অভিশাপ! সে তো প্রকৃতির বিষয়!
নিশি কোন জবাব দেয় না। তাকিয়ে থাকে নদীর দিকে। মাহমুদ বিব্রত হয়, এরকম বোকার মতো কথা বলা তার উচিত হয়নি। বিব্রত পরিস্থিতি এড়াতে মাহমুদ বলে, নিশি আপনি খুব সুন্দর ভঙ্গিমায় কথা বলেন। নিশি ঠোটকাটা জবাব দেয়, সুন্দর করে বাংলা কি শুধু আপনারা বাংলাদেশিরা বলতে পারেন নাকি? নিশি মৃদু হাসলো। মাহমুদ তার নিজের প্রশ্নে বিব্রত হলো আরো একবার।
নিশি বললো, মাহমুদ সাহেব আপনি কি কলকাতায় যাবেন?
মাহমুদ উৎফুল্ল গলায় জবাব দিলো, কলকাতা আমার প্রিয় শহর। যাবো নসিবে থাকলে কোন একদিন। বর্ষার সময়ে, একেবারে দুর্গাপূজো কাটিয়ে আসবো।
নিশি ব্যাগ থেকে কিছু একটা বের করতে করতে মাহমুদকে বললো, চলুন ওঠা যাক। তাদের আজ একসাথে গোধূলি দেখা হলো না। নিশি মাহমুদের কাছ থেকে চলে যাওয়ার আগে মাহমুদকে একটা বক্স দিয়ে যায়। নিশি জানায় তার মা অসুস্থ হয়ে পড়েছে। সে বাংলাদেশ থেকে চলে যাচ্ছে আগামীকাল । মাহমুদ জানালো সে আগামীকাল নিশিকে এয়ারপোর্টে পৌছে দিয়ে আসবে৷ নিশিও সায় জানায়।
৬.
সকাল বেলা ঘুম থেকে উঠে হাতরে হাতরে মোবাইলটা খুঁজে সময় দেখে মাহমুদ। সকাল দশটা বাজে। অথচ নিশির সাথে তার দেখা করার কথা ছিলো সকাল দশটায়। মাহমুদ কয়েকবার ফোন দিলো নিশির নাম্বারে। নিশি ফোন ধরলো না।
আরো একটি অপ্রত্যাশিত সকাল। সিড়ির নিচে বিড়ির দোকান থেকে পাঁচটা সিগারেট কিনে আনে সে। ফোন দেয় বন্ধু অমলকে। জানতে চায়, তার পিসির শ্রাদ্ধ্য সম্পন্ন হয়েছে কি না। বরিশালে কবে ফিরবে?
অমলের উত্তরে থতমত খেয়ে যায় সে। অমল পাঁচ বছর ধরে আমেরিকায় আছে। সে নিশি নামে কাউকে চেনে না। মাহমুদ অপ্রত্যাশিত ধাক্কা খায়৷ তার মনে হয়, সবাই তাকে মিথ্যা বলছে। নিশির নাম্বার তার ফোনে এখনো সেভ করস আছে।
বাথরুমে গিয়ে সিগারেট ধরিয়ে, ঝরণাটা খুলে দেয়। ঠান্ডা পানি ভিজিয়ে দেয় তাকে। মাহমুদ চোখ বন্ধ করে। সিগারেট পানিতে ভিজে নেতিয়ে পরে যায়। মাহমুদ ঝরনার পানির প্রত্যেকটা ফোঁটা অনুভব করে। কল্পনায় প্রণয় নদীর ঢেউ তাকে গ্রাস করে নেয়৷ মাথায় ঘোরে গানের কথা,
“হায় গো প্রান বন্দের পিরিতে আমায়
পাগল করেছে,
দেওয়না বানাইছে,
কী যাদু করিয়া বন্দে মায়া লাগাইছে”

*

তাল তমালের বনে (রোমান্টিক ভালোবাসার গল্প)

নেই

সন্ধ্যে হয়েছে। আকাশটা টক টকে লাল হয়ে আছে৷সেই লাল আভায় শহরটা যে পুরো রঙিন হয়ে গিয়েছে৷ কেন যেন এই সময়টাতেই মন খারাপ হয়। মেসের এর সিঙ্গেলে একটি খাটে শুয়ে আছে রাশেদ৷ তন্দ্রা-তন্দ্রা ভাব এসেছে শরীরের মধ্যে৷ তাও ভালো লাগছে। দুপুরে খাওয়া হয়নি দেখে পেটটা যেন বিষ হয়ে গিয়েছে ব্যথায়। আকাশ অন্ধকার হয়ে আসছে বৃষ্টি নামবে হয়ত,সন্ধ্যে হয়েছে বলে রাস্তার আলো জ্বালানো হয়েছে।সেই আলোয় ঘর আলোকিত হচ্ছে৷মশা ভণভণ করছে। কামড়াচ্ছে নাকি কে জানে।
ছোটবেলায় বাবা-মাকে হারিয়েছে রাশেদ।বড় হয়েছে চাচার কাছে থেকে। রাশেদের চাচা কৃষক৷ তার কোন সন্তান নেই বলে রাশেদকে নিজের সন্তানের মতো মানুষ করেছেন। রাশেদ এখন ভার্সিটিতে লেখাপড়া করছে। তার চাচা এইচএসসি পাশ পর্যন্ত তার সব খরচ বহন করেছেন। কিন্তু, বার্ধক্যজনিত রোগে তার শরীরটা বিকল হয়ে যাওয়ায় তিনি আর রাশেদের খরচ বহন করতে পারেন না। রাশেদেরা পদ্মাপাড়ের মানুষ৷

লেখাপড়ার সুবাদে রাশেদ এখন ঢাকায় থাকে৷ লেখাপড়ার পাশাপাশি টিউশনি করায়৷ সেটা দিয়ে নিজে খরচ বহন করে এবং তার বড় চাচাকে কিছু টাকা পাঠায়। এ পৃথিবীতে আপন বলতে শুধু বড় চাচা এবং চাচি।
প্রতিদিনের মতো আজও টিউশানি করাতে যাচ্ছে রাশেদ। তবে আজ নতুন স্টুডেন্টকে পড়াতে যাচ্ছে সে৷ রাশেদ ঠিকানামতো চলে গেল সেখানে৷ বাড়িটা বেশ সুন্দর এবং বিলাস বহুল। রাশেদের বুক ধুকপুক করতে লাগলো কেন জানি তার ভয় হতে লাগল৷
রাশেদ বাড়ি থেকে বেড়িয়ে এলো। কাল থেকে পড়াতে আসবে এ বাড়িতে। বেতনটাও ভালো। খুশি মনে এগিয়ে গেল চায়ের দোকানের দিকে।

২.
‘ এই যে শুনুন! ‘ রাশেদ হেটে যাচ্ছিলো। পিছন থেকে ডাক এলো এক তরুনীর রাশেদ ঘুরে দাঁড়ালো। রিক্সা থেকে একজন তরুনী নেমে বলল,’আপনি শ্রাবনীকে পড়ান না?’ রাশেদ বলল কাচুমাচু হয়ে বলল,’হ্যা। ‘
‘কোথায় যাচ্ছেন?’, বলল সেই তরুনী।
রাশেদ বলল,’শ্রাবনীকে পড়াতে যাচ্ছি। ‘ তরুনী বলল আসুন তাহলে। আমি শ্রাবনীর বড় বোন। মেয়েটি রাশেদের হাত ধরে রিক্সায় উঠলো। রাশেদের বুক শুকিয়ে এলো। কোন মেয়ের সাথে রিকশায় উঠেছে জীবনের প্রথম। তা ছাড়া এমনিতেও রাশেদ রিকশায় চলে না কখনোই।
রাশেদের প্রচন্ড অস্বস্তি লাগছে। রিক্সা ওয়ালা বয়স্ক৷ রিক্সা চলছে ঝিমিয়ে ঝিমিয়ে।রিক্সা এখন জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে। রাশেদের পাশে বসে আছে সুন্দরী,রূপবতী এক তরুনী৷ আর রাশেদ? তার গায়ে তিল পড়া সাদা শার্ট, চুলগুলো তেল ছিপছিপে। মুখজুড়ে তেল। গায়ে ঘাম। মেয়েটা কানে হেডফোন গুজে আনমনে গান শুনছে। রাশেদের বড় অস্বস্তি লাগছে৷

মেয়েটির নাম ঈশিতা। রাশেদের সাথে ঈশিতার পরিচয়টা আজ থেকে তিন মাস আগে। ঈশিতা বড় ঘরের মেয়ে, বাবা কোটিপতি।
সময় চলে যায়,রাশেদের সাথে ঈশিতার ভাব জমে যায়।কেমন অজানা এক টান অনুভব করে ঈশিতার জন্য। সে কি ঈশিতাকে ভালোবেসে ফেলেছে? ঈশিতাও আনমনে থাকে আজকাল। কে জানে প্রেমে পড়েছে কি না।
আজকাল রাতে ঘুমাতে পারে না রাশেদ। বুকটা ধড়ফড় করে করে। কখনো ভালো লাগে৷ আবার কখনো ভয় হয়৷ঈশিতার আরো একটি পরিচয় আছে সে রাশেদের ছাত্রী শ্রাবনীর বোন।

৩.
সময়ে পেরিয়ে ঈশিতার সাথে মন বিনিময় হয় রাশেদের। দুজন দুজনকে ভালোবাসে৷তবে এই ভালোবাসা ঈশিতার বাবার চোখ এড়ালো না। একদিন জ্যামে বসে দেখলো- ঈশিতা আর রাশেদ রিকশায় বসে আসে। ঈশিতা হাসছে খিলখিল করে। রাশেদ ঈশিতার কপালের কোনে চুল পড়ছে,রাশেদ হাত দিয়ে ঠিক করে দিচ্ছে চুলগুলি।

ঈশিতার বাবা আনোয়ার সাহেব রাশেদকে ফোন করে ডেকেছেন তার অফিসে। রাশেদ খুশি মনে অফিসের দিকে রওনা হলো, ‘আজ মাসের প্রথম তারিখ। আজ হয়ত মাসের বেতন-টেতন দিতেই ডেকেছেন।রাশেদ ভাবল, কিছু টাকা পাঠাবে বাড়িতে। কিছু টাকা রাখবে নিজের কাছে৷ বাকি টাকা দিয়ে ঈশিতাকে নিয়ে ঘুরবে ।
আনোয়ার সাহেবের অফিস থেকে রাশেদ বের হলো মুখ কালো করে। অজানা এক ভয় জাপটে ধরেছে তাকে। হঠাৎ পকেটে থাকা মুঠফোন বেঁজে উঠলো। কেউ একজন কাঁদতে- কাঁদতে বললো, ‘তোর চাচা আর নেই। ‘ রাশেদের চোখ থেকে জল গড়ালো। আকাশ ভেঙে বৃষ্টি নামলো। রাশেদের কান্না দেখলো না কেউ।

তিন বছর পরে ঘটনা, রাশেদ একটি অফিসে ম্যানেজার পদে চাকরী করছে।ঢাকায় ছোট একটি ফ্লাট নিয়ে থাকে।

রাশেদ এখন দাঁড়িয়ে আছে নদীর পাড়ে। এই তিন বছরে রাশেদের জীবন থেকে সব আপন মানুষ চলে গিয়েছে।চাচা মারা যাওয়ার এক বছরের মাথায় মারা গিয়েছেন রাশেদের চাচী। এ পৃথিবীতে রাশেদের আপন বলতে আর কেউ নেই৷ নেই কোন ভিটেমাটি।সবকিছু পদ্মার ভাঙনে বিলীন হয়ে গিয়েছে। রাশেদের বাবা,মা,চাচা,চাচী সবার কবর সবকিছু সর্বনাশা পদ্মার ভাঙনে বিলিন হয়ে গিয়েছে। রাশেদের কিছু নেই,কেউ নেই।
রাশেদ তাঁকিয়ে আছে নদীর দিকে।খরস্রোতা নদী বয়ে যাচ্ছে৷ একটু একটু করে ভাঙছে নদীর পাড়।

*

যাবজ্জীবন

সারাদিন পথে পথে ঘোরা হয়েছে অনেক; শুধু আজকের দিন না বিগত বছর খানেক এভাবেই ঘুরতে হয়েছে তাকে। গ্রীষ্মের উত্তপ্ত দিন থেকে শুরু করে মাঘের শীত বাঘের গায়ে লাগে এমন দিনগুলোতে। তবুও তিনি হাল ছাড়েননি…জীবনের বাস্তবিক পরিস্থিতি মানুষকে কত নিচে ঠেলে দেয়..মাঝেমধ্যে জীবন নিয়ে হাফিয়ে ওঠেন। বিষম খেয়ে আবারও গা ভাসিয়ে দেন জীবনের উজনে!

ভাগ্যের জোরে একটা সরকারী অফিসের কেরানীর চাকরী জুটেছিলো। মুখ বুজে সেই চাকরী করে গেছেন…সারাদিন কলম খোঁচার চাকরি। এর থেকে জীবনে আর বড় কিছুর দরকার নেই! দুটো পেটে-ভাতে খেয়ে জীবনটা পাড় করে দিতে পারলেই বুঝে এই অনন্তকালের শান্তি। মাঝেমধ্যে অশনি/অপঘাতের কথা ভাবতেন জাহিদ। তবে তিনি এরকম ছেলেমানুষী কান্ড ঘটিয়ে বসলে তার পরিবারটা যে একেবারে পথে বসে যাবে। ছেলেটা বড় হয়েছে। এই মুহুর্তে তার যদি কিছু হয়ে যায় তবে তিনি নিজেকে কোনভাবেই ক্ষমা করতে পারবেন না! তবে জন্ম থেকে মৃত্যু, মৃত্যু থেকে জন্মান্তর কোন কিছুর নিয়ন্ত্রণ মানুষের হাতে নেই।
জৈষ্ঠের ভ্যাপসা গরম..আকাশে কালো মেঘ করে এসেছে। বৃষ্টি নামার তোড়জোড় শুরু হয়ে আছে। ঠান্ডা হাওয়া শুরু হয়েছে, সেই বাতাসের তোড়ে ভেসে আসছে কোত্থুকে যেন দোলখেলানো একটা বিকট পঁচা গন্ধ। সারাদিন কিছু খাননি..তিনি ক্ষুধাকে সহ্য করতে জানেন। যারা এই জিনিস করতে পারে তারাই বোধয় সবথেকে ধৈর্য্যশীল মানুষ হন। তবুও পাকখেলানো ড্রেনের উটকো পচা গন্ধে পেটের মধ্যে কেমন যেন করে ওঠে। ফুটপাতে দাঁড়িয়ে আছেন, পেছনে একটা চায়ের দোকান। বৃষ্টিও শুরু হয়েছে গুড়ি গুড়ি।
মানুষের ক্ষুধার সীমা নেই! পেটের ক্ষুধার চেয়েও লালসার ক্ষুধা বড় সে কথা জানতেন জাহিদ। কিন্তু তাও এক ধরা গলার বর্ষামুখর সন্ধ্যায় তিনি হাজির হয়েছিলেন এমন এক জায়গায় যেখানে নিষিদ্ধ শব্দটির তোড়জোড় হয়। তিনি কখনো এ ধরণের কাজ আগে করেননি। কয়েকদিন আগে ফোনে জুয়া খেলে কয়েকটাকা জিতেছিলেন। সেই টাকা বিলাতেই আজ এসেছেন নিষিদ্ধ পল্লিতে। তার সামনে একটি জুয়ান মেয়ে, তার ছেলের বয়সী। মেয়েটি ব্লাউজের বোতাম খুলতে যাবে, এতক্ষণ একদৃষ্টিতে তাকিয়েছিলো জাহিদ সাহেবের দিকে। জাহিদ সাহেবের হাটু কাঁপছে, তার মধ্যে একই সাথে লালসা ও আত্মার সাথে দৌরত্ম ঘটেছে। সে সাহস করে কাঁপা গলায় মেয়েটিকে বাঁধা দিলো, মেয়েটিও অদ্ভুত হলো এমন খদ্দের পেয়ে। পাওনা টাকা বুঝিয়ে দিয়ে আরও দুশো টাকা বখশিস দিলো মেয়েটিকে। আসার আগে মেয়েটির চোখ ভিজে গেলো অদ্ভুত কারণে, সেটা খেয়াল করলেন না জাহিদ সাহেব। নিষিদ্ধ পল্লী থেকে বেরোবার গলিতেই এক অদ্ভুত কান্ড তার সাথে ঘটে গেলো। যেটার জন্য ইহকালে তিনি প্রস্তুত ছিলো না। গলির মোড়েই নিষিদ্ধ পল্লীর রাতের রানীর সাথে আলাপ-আলোচনায় মত্ত তার ছেলে। সেই রাতের রানী তার ছেলের গায়ে ঢলে পড়ছে। ছেলের হাতে সিগারেট। এই দৃশ্য দেখে হতভম্ব হয়ে গেলো জাহিদ সাহেব। তৎক্ষণাত বিদ্যুৎবেগে তার ছেলেও তার দিকে তাকিয়ে ভূত দেখার মতো চমকে উঠলো। তার ছেলের মস্তিষ্ক জুড়ে এতক্ষণ যে লালসা বাণ কাজ করছিলো সেটি উড়ে গিয়ে তাকে ঘিরে ধরলো পিতৃভক্তির চরম শ্রদ্ধা। সেই সাথে এক দলা প্রশ্ন, “বাবা এখানে কি করে?”
বাসের সিটে পাশাপাশি বসা দু’জন। কন্ডাক্টর এসে ফ্যাঁসফ্যাসে তবুও মোটা গলায় বললো, “ভাড়াটা দেন” জাহিদ সাহেব পকেট থেকে ভাড়ার অধিক টাকা বের করে দিলো। অন্যকোন দিন হলে ভাড়া নিয়ে এতক্ষণে কন্ডাক্টরের সাথে এক পশলা তর্কাতর্কি হয়ে যেতো। কিন্তু আজ, কন্ডাক্টর টাকা ফেরত দিতে গেলে জাহিদ সাহেব ইশারায় বুঝিয়ে দেন পুরোটাই রাখো। তার ছেলে তার পাশে বসে এক অদ্ভুত নিস্তব্ধ কান্নায় ভেঙে পড়ছে। তার হৃদয়ের গহীনে একই সাথে প্রশ্নের বান ও নিষিদ্ধ পল্লীতে বাবার সাথে দেখা হওয়ার দ্বিধা ঘুরছে। জাহিদ সাহেবের মাথায়ও ঝড় বইছে। তারা এতটাই অন্য মনস্ক ছিলো যে খেয়ালই করেনি বাসার সাথে দুম করে একটি শব্দ হয়েছে। বাসজুড়ে হইচই পড়ে গিয়েছে, ড্রাইভার জানলা দিয়ে পালিয়েছে। একটু আগে ভাড়া চাইতে আসা কন্ডাক্টর হাতের টাকা পয়সা ছুড়ে দিয়ে পালিয়েছে। তার একটি নোট পড়লো জাহিদ সাহেবের কোলে, যে নোটটি একটু আগে তিনি দিয়েছিলেন। তার ছেলে আসিফ ঔদ্ধত্ব হয়ে উঠতেই বাবাকে হ্যাচকা টান দিয়ে বাস থেকে নেমে পরে বাসের সামনে যেতেই দেখে একটি নারী দেহ বাসের চাকার সাথে পিষ্ট হয়ে আছে! নারীটির মুখ বোজা যাচ্ছে না। বোরখা পড়া। চাঁকার নিচে রক্তে লাল হয়ে গিয়েছে। জাহিদ সাহেবকে তার ছেলে হাত ধরে টেনে নিয়ে আসে। ততক্ষণে বাসের সামনে একটা জটলা বেঁধেছে। সবাই গোল দিয়ে দাঁড়িয়ে দেখছে! ভীড় ঠেলে জাহিদ ও তার ছেলে আসিফ বেরোতে যাবে এমন সময় লোকজন বাসটিকে পিছনে ঠেলে নারীদেহটিকে চাঁকার তল থেকে বের করে আনলো, মুখটি অক্ষতই আছে কপাল ফেঁটে রক্তমাখা বিবর্ণ হাহাকারের মুখটি দৃষ্টি এড়ালো না জাহিদ সাহেবের। তিনি এক চিৎকার দিলেন, এই মুখটি তার অপরিচিত নয়। আজ সকালেও ঘুম থেকে উঠে বিছানায় শুয়ে তিনি অপরপাশে এই মুখটিই দেখেছেন।

একটি নষ্ট গল্প -রোমান্টিক গল্প ২০২৪

*

আহত শব্দের কান্না

ডায়েরির পাতা জুড়ে লিখে যাচ্ছে সে, একটি মৃত ফুলের চিরচিরে গন্ধ তার নাকের ভেতরে গিয়ে শরীরটাকে স্তব্ধ করে দেয়, সে বিষণ্য মুখে শুকনো গলায় কাঁপা কাঁপা হাতে লিখতে থাকে ‘আই ওয়ান্ট টু ডাই, আই ওয়ান্ট টু ডাই’ কলম থামিয়ে গলার শ্লমা ছাঁড়িয়ে অ্যাকুরিয়ামের দিকে তাকায় সে, মাছটা মরে ভেসে উঠেছে এই তো কিছুক্ষণ আগেও সে জীবত ছিলো কেমন পানির ভেতরে সাতার কাটছিলো সৌন্দর্য ছড়িয়ে। অ্যাকোনাইটের কয়েকটি নীল পাপড়ি পানির মধ্যে ছেড়ে দিতেই মাছটা কিছক্ষণ একুরিয়ামের এ প্রান্ত থেকে ও প্রান্তে ছুটে বেড়ায় তারপর থেমে যায় তার ছোটাছুটি!

নিজের ভোতা শরীরটা নিয়ে চেয়ার ছেড়ে উঠে দাঁড়াতে যাবে এমন সময় মাথা ঘুরে ওঠে, পুরো রুমের ভেতর কি একটা চক্কর দেয় এ দেয়াল থেকে ও দেয়াল..শরীরটা মেঝেতে লুটিয়ে পড়ের ক্ষাণিকটা আগে সে গরম বাতাসে বিদগ্ধ নিঃশ্বাসের শব্দ শুনতে পায়। ফিসফিস করে কেউ একজন বিশ্রিভাবে তাকে বলে, ‘মৃত্যু অবধারিত! সাধ নাহি মিটিলো তবে অগাধ মৃত্যুর স্বাদ!

*

ছন্দপতন

যতদূর চোখ যায় সাগরের নীল জলরাশি। রোদে পানি চিক চিক করছে। যাকে কাব্যিক ভাষায় বলা যায়, ‘টলমলে জলে ঝিলমিল রোদ হাসছে সমুদ্রের নোনা জলে’ কি একটা এলোপাতাড়ি ভাবনায় বুঁদ হয়ে আছে সে, গালের দাড়ি গলা বেয়ে নেমেছে। নাকের নিচে মোটা গোফের আস্তরণ, হাতের আঙুলের ফাকে একটা সিগারেট। খালি গা…ক্ষাণিক চোখ বুজলো সে। চৈত্র মাসের শেষ শেষ বৈশাখের ঝড়ের আভাস! দক্ষিণ দিক থেকে এক ঝাপটা দমকা হাওয়ায় চোখ দুটোর পাতা যেন আরও স্থির হয়ে এলো। ক্ষাণিক অসাড়তায় তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘোরে সে হারিয়ে গিয়েছিলো কোথায় একটা। সমুদ্রের নোনা জলের গর্জন, শো শো ঠান্ডা বাতাস এসব মিলেমিশে যে সুখের ঢেউয়ে ভাসছিলো

মেঘের দলা সূর্যের ওপর থেকে সরে গেলে। রৌদ্রের ঝললে তেলরাঙা পিঠটা ঝলমলিয়ে উঠলো। ঝলসানোপ্রায় উত্তপে পিঠটা পুড়ে যাওয়ার উপক্রম।

সমুদ্র বালুতীর থেকে থেকে উঠে লোকলয়ের দিকে হাটলো সে, তার পায়ে একজোড়া চটি। বাম হাতে একটা ফিনফিনে হাওয়াই শার্ট। সেটাকে কাধে রেখে.. পা বাড়ালো বালুতীর ধরে, চৈত্রের উত্তাপে।

*

অ-নিত্যবৃত্ত

আমার কাছে যদি জানতে চান, যে আমি জীবনে আসলে কি চাই? আমি বলবা আমার জীবনে আমি এক পশলা ঝেপে বৃষ্টি চাই। কোন উদাহরণ টেনে নয়, আমার জীবনে দেউলিয়া হওয়ার প্রবণতা ভীষণ। দেউলিয়া শব্দের থেকে ‘ভবঘুরে’ শব্দটির ব্যবহার হওয়া বোধয় সমীচীন। কারো প্রতি কোন ক্ষোভ, রাগ, বিভেদ তাৎক্ষণিক হলেও। জগৎ সংসারের মোহে সেটিকে কাঁটিয়ে ওঠার বাতিক আমার আছে। বটগাছের নীচে কোন এক অলৌকিক ব্যক্তির সন্ধ্যান, তাকে খুঁজে বেড়ানোর তাড়া আমায় ভীষণ টানে। পাপ-ক্ষোভ, রক্তের দাঁগের পঁচে ওঠা গন্ধ আজীবন আমার তটে বয়ে বেড়িয়েছে। আমি আসলে আমার কথা বলছি.. আমার ভেতরে তোরজোড় করে শাষাণোর মিথ্যে বানোয়াট ফুলঝুরি। অথবা উচ্চ কোন পরিবর্তন। আমি আসলে একটি বানোয়াট মঞ্চ। যেখানে নিজেকে নিয়ে কথা বলতে আমার ভীষণ ক্ষোভ হয়। একেকটি বারুদ যেভাবে ফুঁসে উঠেছিল আমার অন্তর্দহনে, রক্তের ক্ষোভে জ্বলে উঠেছিলো যে বিক্ষোভের আগুন সেসব নচেৎ বিভীষিকাময়ী ঝংকার অগ্নীস্রোতে ভেসে যাওয়া ঝা ঝা দুপুর। আমার ভীষণ ভয় হয় জানেন, কোন দিন যেন ফাঁক ফোকড় দিয়ে হয়ে গেলাম ভবঘুরে। আমাকে বশ করলো কোন অশুভ শক্তি, ছারখার করে দিলো আমায় সেই বিভেষিকার দিন বোধয় আমি পেড়িয়ে এসেছি। আমাকে আর কারও আটকাবার সাধ্য নেই। তবে আমার শরীরের জৌলুশে, দাপুটে অহংকারে একদিন হারিয়ে যেতে হবে। সে কথা বোধয় আমার খেয়াল নেই।

আমার ভেতরে প্রাণ মরে, গর্জে ওঠে দাবানল। তবে সে দাবানল কোথাও গিয়ে সীমাবদ্ধ হলেও ছাড়খাড় করে দেয় প্রাণের স্পন্দন। প্রকৃতি বাধ্য হয় থামিয়ে দিতে। কোথাও কোথাও গিয়ে তো থামতে হয়। প্রাণের সাথে প্রাণের যে স্পন্দনের ছারখার হয়ে গেলো। নরক রাস্তায় পিশে মরলো কত প্রাণ, সেসবের কথা লিখতেও ভীষণ ভয় হয়। আমার ভয় পাওয়ার বাতিক আছে।

২.
আনমনে কিছুক্ষণ কি একটা ভাবছিলাম। বোধয় এসবই.. বৃষ্টিস্নাত দুপুর, গল্প বলা, শোনা, লেখার অসামান্য দিন বটে। এদিনে কারও কাছ থেকে গল্প শুনতে ইচ্ছা করে খুব। উঠে জানালার কাছে গেলাম, চোখ ঘুম ঘুম; শরীর জুড়ে ঢুলু ঢুলু ভাব। বাইরে থেকে পাক খেয়ে বাতাসের সাথে ভেসে আসছে ড্রেনের পঁচা গন্ধ.. বৃষ্টির গন্ধের সাথে এসব মিলেমিশে কেমন একটা নাক সওয়া গন্ধের সৃষ্টি হয়েছে ক্ষণ…যে জানলার সামনে দাঁড়িয়ে আছি সে জানলার প্রতি আমার অদ্ভুত ভয়। প্রতি রাতে ভয়ানক কিছু না ঘটলেও.. ঘুম না আসলেও জানলার দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে ভয় পেয়ে ঘুমানোর চেষ্টা করি। তাতেও যদি একটু আধটু ঘুমটুম হয়। না হলে বোধয় আমার কাছে ঘুমটা অফিসের মাস শেষে মাইনের মতো। আসতে ভীষণ দেরী হয় বৈকী।

এমন বৃষ্টিদায়ক দিনে ঘরে বসে বিছানায় গড়াগড়ি খেতে আর মন চায় না। মেসের দরজা থেকে বেরোনোর সময় নিচতলার এক ভদ্রলোক জিজ্ঞেস করলেন, এই ঘনঘোর বরিষায় কোথায় যাচ্ছেন মশাই? আমি ফিকে হেসে বললাম, ঘরের সাথে মনের কোন্দল লেগেছে..ঘরে থাকা কি আর ভালো লাগে বলুন। ভদ্রলোক বিছানা থেকে উঠে গায় ফতুয়া জড়িয়ে বললেন, চলুন আপনার সঙ্গী হওয়া যাক তবে।

ভদ্রলোকের নাম সৌমক। মেসে উঠেছেন মাস কয়েক হলো। শহরের একটি স্কুলে শিক্ষকতা করেন। তার চেহারায় মাস্টার মশাই ভাবও আছে একটু আধটু। ক্লাসে বাংলা পড়ান বলে মুখের শব্দের আড়ষ্টতা নেই..কথা বলেন পরিস্কার গলায়।

মেসের গেট থেকে বের হতেই আকাশে গুরুম গুরুম শব্দ হলো..সৌমক আমাকে উদ্দেশ্য করে বললো,’দেখেছেন মশাই..বাইরে নামলাম আর বৃষ্টি আরও ঝেপে আসার তোড়জোড় শুরু হলো। আমি স্বল্পভাষী..মুচকি হেসে পা ফেলে ছপ ছপ করতে করতে হাটলাম চায়ের দোকানের দিকে। বৃষ্টির দিনে কাক ভেজা হয়ে চা খেতে আলাদা একটা মজা আছে বৈকী।

৩.
চা খেতে এসে তোড়জোড় করে মুখ পুড়িয়ে ফেললেন সৌমক বাবু। ঝড়বাদলার দিন.. বজ্রপাত হলো বিকট শব্দে। কানে তালা লেগে যাওয়ার মত অবস্থা। রাস্তা দিয়ে দ্রুত গতিতে একটা রিকশা এসে দাঁড়ালো। রিক্সা থেকে হন্তদন্ত হয়ে নামলেন এক ভদ্রলোক। ক্ষাণিক ভিজলেনও বটে..রিক্সাওয়ালা এই ঝড় বৃষ্টির মধ্যেও দাঁড়ালেন না। ভদ্রলোক দোকানীর কাছে চা চেয়ে, পকেট থেকে আধভেজা অবস্থার একটা সিগারেট বের করে টানতে রইলেন।

ভদ্রলোক বেশ মেদবহুল নয়.. শরীরের গঠন মাঝারি ঘোচের। চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে আমার চোখ তার দিকে৷ তার সাথে চোখাচোখি হওয়ায় কিছুটা বিব্রত হলাম। মাঝেমধ্যে আমরা কারও দিকে অপ্রাসঙ্গিক কারণে তাকিয়ে থাকি, একে বলে অবজার্ভেশন৷ সেই মানুষটা টের পেয়ে গেলে কিছুটা বিব্রত হতে হয় বৈকি।

বৃষ্টি থামছে না..বৃষ্টি আর বাতাসের বেগ ক্রমশ বাড়তে রইলো। রাস্তা দিয়ে কোন গাড়ি যাচ্ছে না.. বৃষ্টির ফোটায় ফোটায় রাস্তা তলিয়ে যাওয়ার উপক্রম। বাইরের শীতল বাতাসে কিছুক্ষণ বাদে ঠান্ডা লেগে গেলো। সেই হুট করে আসা ভদ্রলোকের সাথে আলাপচারিতায় জড়াতে হলো ক্ষাণিক বাদে। ভদ্রলোক সেধেই বললেন,

-‘আজ যা ঝড় বৃষ্টি শুরু হয়েছে। এসব আর বোধয় আজ আর থামবে না। আপনারাও কি আমার মত আগন্তুক? ‘
-সৌমক একগাল অপ্রস্তুত হেসে জবাব দিলো, ‘ তা যা বলেছেন! এই বাদলার সমাপ্তি আপাতত হচ্ছে না। তবে আমরা আগন্তুক নই’

ভদ্রলোকের সাথে আড্ডা হলো বেশ ক্ষাণিকক্ষণ। ভদ্রলোক বললেন তিনি পেশায় একজন কেরানি। তবে তার হাত দেখার বাতিক আছে। কলেজ জীবনে নাকি ভবঘুরে ছিলেন। তন্ত্রসাধনা করেছেন প্রায় পনেরো বছরের মতো। তবে তিনি সাধারণ ঘোচের তান্ত্রিক হতে চাননি। তান্ত্রিক হওয়ার জন্য শ্মশানে শ্মশানে ঘুরেছেন বহুকাল। এসব তার মুখ থেকেই শোনা। সৌমক বাবু হাতটা বাড়িয়ে দিলেন ভদ্রলোকের দিকে, নিন মশাই আপনার পরিচয় হয়ে যাক।

ভদ্রলোক হেসে বললেন, কি যে বললেন! আমি একজন সাধারণ ঘোচের মানুষ। আমি একজন বিশ্বাসী। জগৎসংসারে বিশ্বাস অবিশ্বাস দুটো সুত্রে গাঁথা হলেও বিংশ শতাব্দিতে দুটো বিষয়ই যেন আমাদের বেঁচে থাকার পরিপূরক।

ভদ্রলোক সৌমক বাবুর হাতটা ভালোভাবে দেখলেন। কিছুক্ষণ বাদে চোখ বুজে কি একটা বিড়বিড় করে বললেন, ‘আপনার দিন ভালো যাচ্ছে। তবে সামনে একটা বাধা আছে.. সে বাধা দৈবশক্তির প্রভাবে আপনা আপনি কেটে যাবে’ স্বভাবে শান্ত হলেও কিছু ঘটনায় অতিরিক্ত বিচলিত হয়ে পড়েন৷ আপাতত এটুকুই বলতে পারবো।

সৌমক বাবুর চোখ মুখ হা হয়ে গেলো। তিনি যে ক্ষাণিক বিচলিত হয়ে পড়েছেন তা তার চোখমুখে স্পষ্ট।

৪.
সে রাতে দৈবক্রমে ভদ্রলোক আমাদের সাথে মেসে চলে এলেন। বর্ষার দিনে সন্ধ্যা নেমে আসে খুব দ্রুত। ইলেকট্রিসিটি নেই। মোমবাতি জ্বালিয়েই আড্ডা শুরু হলো। সেই আড্ডা যোগ দিলেন আরও কয়েকজন। সত্যিই..বর্ষার ঘোরলাগা সন্ধ্যা..অপরিচিত ভদ্রলোকের সাথে আড্ডা.. সঙ্গে মুড়িমাখা এসব যেন..কাকতালীয়।

ভদ্রলোকের রাতে ঘুমানোর জায়গা হলো আমার ঘরে। আমি একটা ঘর নিয়েই দোতালায় থাকি। রুমে ঢুকেই ভদ্রলোক বললো, আপনার ঘরের শুভ লক্ষণ আছে। জানলার ঠিক পাশে ঘড়িটা আপনার সময় বদলে দেবে। আমি ভদ্রলোকের কথা বেশ ভালো একটা বুঝতে পারলাম না।

ভদ্রলোককে ক্ষাণিক মনের খচখচানিতে বললাম, আপনি কিন্তু ভাগ্য গণনা করলেন না। ভদ্রলোক হেসে বললেন, আমি আর ভাগ্য গণনা করার কে। ভাগ্য তো নির্ধারণ করা থাকে আমাদের। দেখি আপনার হাতটা দিন। কি একটা হিসাব কষার ভঙ্গিতে কিছুক্ষণ মুখ গম্ভীর রেখে ভদ্রলোক বললেন,’ আপনাকে আগামীকাল সকালে আপনার ফলাফল জানাবো। ‘

সে রাত্তিরে ভদ্রলোক আমার কাছে বেশ কিছু প্রশ্ন করলেন। মুষলধারে বৃষ্টি রাতে।

রাতে ঘুমাতে বেশ দেরী হওয়ায় এবং শীতল আবহাওয়ায় ঘুম গাঢ় হওয়ায় সকালবেলা ঘুম থেকে উঠলাম বেশ দেরীতে। সেদিন অফিস নেই.. ঘুম থেকে ওঠার তাড়াও নেই। কি যেন মনে করতে বালিশের তলায়। মানিব্যাগটা ঠিক যায়গাতেই আছে। ভেতরে টাকাও আছে। আমার ঘর থেকে নেবার মতো তেমন কোন বিশেষ কিছু নেই। ভদ্রলোকের প্রতি আমার নেতিবাচক ভাবনায় নিজেই কিছুটা বিব্রত হলাম। খাট থেকে নেমে টেবিলের ওপর একটা কাগজ পেলাম। অস্পষ্ট প্যাঁচানো হাতের লেখায় যা লেখা তা পড়তে বেশ কিছুক্ষণ লাগলো। চিরকুটে লেখা-

আপনার ভাগ্য ভীষণ শুভ। ভাগ্যের জোড়েই হয়ত এতদিন বিচারহীন আছেন৷ এমনই কাটাতে পারবেন আজন্মকাল। তবে সব কিছু শেষ আছে..শুরুও আছে। আপনি যে জীবন পাড় করে এসেছেন তা বেশ ভয়াবহ। আপনার হাতে যেসব প্রাণের সমাপ্তি ঘটেছে সে সব প্রাণ আপনাকে অভিশাপ দিচ্ছে। নৈঋত ঝড়ে বিভৎস নরকের ক্ষুদ্ধ দহণে আপনি পুড়তে চলেছেন। আপনার ভাগ্যের রেখা নিত্যবৃত্তের করুণ দহণে পুড়ছে..গন্ধ পাচ্ছেন? সাবধানে থাকবেন। আপনার সাথে আবার দেখা হবে নৈবদ্য গোধূলী লগ্নে!

আমি ক্ষাণিক বিচলিত মুখে জানলার বাইরের দিকে তাকিয়ে রইলাম। বাতাসে ভেজা গন্ধ..দক্ষিণ আকাশে কালমেঘ দেখে আমার বরাবরই বেশ আনন্দ হয়। তবে মনে চিঠিটা পড়ে মনের ভেতরে যে কালো সৃষ্টি হয়েছে। লোকটির সাথে গতকাল বর্ষামুখর বিকেলে দেখা। লোকটাকে আমার বিশ্বাস হচ্ছিলো না গতকাল বিকেল থেকে।তিনি আমার অতীত, ইতিহাস, ভবিষ্যত সম্পর্কে এত বিস্তর কিভাবে জানতে পারলেন? লোকটি কে? তিনি কি আমার পূর্বপরিচিত?

*

নতুন মুখ
গতকাল মাঝরাত্তিরে বিদ্যুৎ চলে গিয়েছিলো। ভ্যাপসা গরম পড়েছে বেশ।গা টা ভিজে জবজবে হয়ে গিয়েছে ঘামে। পিঠ ভিজে উঠেছে। ঘুমের ঘোরে ভাবতে রইলাম যদি একটু ঝড় টড় ছোটে। পেটে ছু্ঁ ছুঁ ডাকছে অসহ্য ক্ষুধা। রাতে বাড়িতে ফিরে দেখি ডাল টকে গিয়েছে। তার থেকে আরো জঘন্য কথা হচ্ছে,ডালের মধ্যে মরা তেলাপোকা, হড় হড় করে বমি করে দেওয়ার কথা ছিলো। বমি করলাম না, পেট গুলিয়ে এলো।ঢক ঢক করে কয়েক গ্লাস পানি খেয়ে, মুখে পান গুজে দিয়ে ঘুমুতে গেলাম। পকেটে একটি সিগারেট ছিলো সেটি জ্বালালাম৷ আপাতত ক্ষুধার কথা ভুলে থাকলেও চলবে৷ পেটে ক্ষুধা নেই৷ মুখ থেকে পান ফেলে পানি দিয়ে কুলকুচি করে নিলাম।
কাল সকালে এ মুখ বিশ্রি রকমের হয়ে যাবে জ্বলবে শক্ত হয়ে কাঠ যাবে। বিছানায় গা এলিয়ে দিতেই মাথাটা নাড়াচাড়া দিয়ে উঠলো। নাহার বাপের বাড়িতে গিয়েছে সপ্তা খানেক হবে। ব্যস্ততার কারনে কারনে ফোনে কথা বলা হয়ে ওঠে না ঠিক৷ আনতে যাবো যাবো করে যাওয়া হয় না। সারাদিনের হৈ-হুল্লোড়ে ভুলে যাই সব।
মশারির চারপাশে মশা ভন ভন করছে। আমার কাছে মশার এও ভন ভন শব্দ বড্ড কুৎসিত লাগে। মশারির ভেতরে আর থাকতে পারলাম না। উঠে গিয়ে বসলাম জানালার কাছে। সিগারেট পাওয়া গেলে বেশ হতো। ফোনের আলো জ্বালিয়ে খুঁজলাম। পেলাম একটা অবশ্য৷ এইসব মধ্যরাত আমার বড্ড প্রিয়! বেশ লাগে একা একা আনমনে ভাবতে। শুধু মশার কামড়টা বেশ বিরক্তিকর৷
২.
নাহারদের বাড়িটা সরু একটি গলির মধ্যে। গলির মুখেই আবর্জনার স্তুপ৷ বিশ্রি গন্ধে রাতের না খাওয়া পেটটা মুচড়ে উঠলো৷ নাক চেপে হাটলাম। মোড়ের মাথায় একটা দোকান থেকে সিগারেট নিলাম। সকালের রোদে চোখ ঝলসে যাওয়ার মতো অবস্থা। সিগারেটে টান দিতেই মাথা চক্কর দিলো। এই সময়ে সিগারেট ধরানো উচিত হয়নি। হাত থেকে ফেললাম না সেটা। টাকা-পয়সা এমনিতেও নেই৷
নাহারদের বাড়িতে ঢুকতেই শুনতে পেলাম নাহারের মা চেচাচ্ছে,’জামাই পাইছি একখান;অকর্মা ঢেকি কোথাকার। ‘
আমাকে দেখে চমকে উঠলেন। গলায় মধুর সুর এনে বললেন,’জামাই বাবাজি নাকি? আসেন আসেন। নাহারকে ডাক দিয়ে তিনি হাটলেন রান্না ঘরের দিকে। আমি জলচৌকি টেনে বসলাম। নাহারকে দেখলাম অনেকদিন বাদে। মুখ খানা শুকিয়ে গিয়েছে৷ তবে শরীরে পরিবর্তন। আমি নাহারের ঘরে গিয়ে বসলাম। নাহার ঘোমটা টানতে টানতে বলল,’সকালে খেয়েছেন কিছু?’
আমি বলতে চাইলাম খেয়েছি। ক্ষুধা পেটটা বলল,’খাইনি। ‘ নাহারের দিকে ক্ষুধার্ত দৃষ্টিতে তাকালাম। ‘ নাহার বলল,’দু মুঠো পান্তা ভাত ছিলো। খেয়ে নিন।’ সাথে একটা ডালের বড়াও দেখতে পেলাম।
দুপুরবেলা ঘুম ভাঙলো! বাইরে তর্কা তর্কি চলছে,ভাঙচুরের শব্দ পাচ্ছি৷ মাথাটা ধরে আছে৷ মাথার উপর খট খট করে ফ্যান ঘুরছে। নাহার ঘরে ঢুকলো। আমি তখন ঘুমের ভান করে চোখো টিপিটিপি করে তাঁকিয়ে ছিলাম। নাহার চুল থেকে গামছা খুলে চুল ঝাড়া দিলো। চুলের বিন্দু বিন্দু পানি এসে পড়লো আমার চোখে মুখে। শ্যাম্পুর ঘ্রানে ঘর ভরে গেলো। আমি আবার চোখ বুঝলাম,পেট জুড়ে ক্ষুধা৷
৩.
অফিসের বসকে চিন্তিত দেখাচ্ছে। সে পায়চারী করছে। আমার কাছে সে বলল,’সিগারেট আছে তোমার কাছে? আমি ভ্যাবলার মতো তাকিয়ে রইলাম। আমি যে সিগারেট খাই সে সিগারেটের উপর দিয়ে তিনি কখনো পা মাড়িয়েছেন কি না সন্দেহ। পকেট থেকে বের করে সিগারেট দিলাম। বস হাত বাড়িয়ে নিলেন।
জৈষ্ঠের উতপ্ত দুপুর!
আমি বসে আছি পুলিশের গাড়িতে। আমার হাতে হ্যান্ডকাফ পড়ানো। গাড়ি জ্যামে দাঁড়িয়ে আছে। আশেপাশের মানুষ দেখছে। অফিস থেকে আসার আগে বস কানে কানে বলে দিয়েছিলো,’কয়েকদিন না হয় অফিসের কাজে জেল থেকে ঘুরে এসো। ভয় নেই তোমার চাকুরী যাবে না। জেল থেকে ফেরার পর প্রমোশন হবে। আমি বুঝেছিলাম আমাকে ফাঁসানো হচ্ছে। তবুও গলায় জোড় ছিলো না। গোটা অফিসের লোকজন আমার দিকে তাকিয়ে ছিলো।
নাহারের কথা খুব মনে পড়ছে। আপাতত আমাকে একটি থানার জেল খানায় রাখা হয়েছে৷ এর পর কোর্টে চালান দেওয়ার কথা৷ এককোনে মাখানো ভাত পড়ে রয়েছে, পিপড়ায় ধরেছে সে গুলো।পেটে দারুন ক্ষুধা লেগেছে।
বছর খানেক জেল খেটে বের হলাম। নিজেকে মুক্ত পাখির মতো লাগছে৷
নাহারদের বাড়িতে ঢুকতেই নাহারের বড় ভাই তেড়ে এলো। আমি কিছু বুঝে উঠতে পারলাম না।
আমার শাশুরিও বিড়বিড় করে আওরালেন।
আমি জেল খেটেছি প্রায় এক বছর। জেলে বসে মশার কামড় খেয়েছি। কত রাত নির্ঘুম কাটিয়েছি৷ মুখ শুকিয়ে গিয়েছে। চোখের নিচে গর্ত হয়ে গিয়েছে। গায়ের হাড়-চামড়া এক হয়ে গিয়েছে৷
নাহার সেদিন আমাকে বলতে চেয়েছিলো তার শরীরে আরো একজনের উপস্থিত টের পেয়েছে সে। সে আমাকে বলতে পারেনি। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে ছুটতে হয়েছে অফিসে। তারপর এক বছরের জন্য হাজতবাস। খুব কষ্ট করে কেরানীর চাকরি টা পেয়েছিলাম। ইচ্ছে ছিলো এখান থেকে ক’টা টাকা জমিয়ে গ্রামে গিয়ে দোকানপাট তুলবো। ধার দেনাও করতে হবে। এ ছিলো নেহাত স্বপ্ন।
নাহারকে ভালো রাখতে পারিনি। তাও দুজনের সংসারে খেয়ে পড়ে ভালো ছিলাম। নাহার মেয়েটি স্ত্রী হিসেবে অসাধারণ। ওর চোখটা ভীষণ মায়াবী। চেহারা শ্যামলা বর্নের। মুখে সারাক্ষণ হাসি না লেগে থাকলেও ঠোটের কোনে হাসি ফুটলে দারুন লাগে৷
নাহার যেদিন অসুস্থ হয়ে পড়ে সেদিনও ছিলো বৃষ্টি। প্রচন্ড বৃষ্টিতে ওকে হাসপাতালে নিয়ে যাওয়া হলো। ফজরের আযান হওয়ার আগে নাহার চোখ বুঝলো শেষবারের মতো। তখন বৃষ্টি থেমে গেলো। আরেকটা চোখ খুললো। সে পিটপিট করে তাকায়। চোখে আলোর ঝাপটা লাগে। আবার চোখ বুজে ফেলে।তারপর গুঙিয়ে গুঙিয়ে জীবনের প্রথম কাঁদা কাঁদে।
মেয়েটি চোখ পিটপিট করে তাকায়। আমি কোলে নেই মেয়েটিকে। এ যে আমার নাহারের রেখা যাওয়া ফুল! চোখ দুটো হয়েছেও মায়ের মতো। কী সুন্দর আঁখি যুগল।মেয়েটর চেহারা ফুলের মতো।নরম কোমল সুন্দর! বাচ্চাটাকে খাটের ওপর শুইয়ে রেখে আমি হাঁটি কাঁদা পানি মাড়িয়ে পা ফেলে ছপ ছপ করে।
মোড়ের স্তুপ করা আবর্জনা থেকে বিশ্রি গন্ধ নাকে আসে। ক্ষুধার্ত কুকুর নির্লিপ্ত মুখ করে তাকায়। আমি হেঁটে যাই, সিগারেট টানতে টানতে— গুড়ি গুড়ি বৃষ্টি মাথায় নিয়ে।

*

প্রহর শেষে
আজ রোববার৷ এখন বাজে বিকেল সাড়ে চারটা৷ রমনা পার্কে দাঁড়িয়ে অপেক্ষা করছে এক তরুনী। তার পড়নে নীল শাড়ি, হাতে কাঁচের চুড়ি। খোপায় বাধা শিউলি ফুল। সে এখানে এসেছে প্রায় ঘন্টা খানেকের মতো হবে। মেয়েটির নাম নীরা। সে অপেক্ষা করছে সৌরভের জন্য৷ ছ’মাস হয়েছে সৌরভের সাথে ভালোবাসার সম্পর্কে জড়িয়েছে সে।তারা দুজন ভার্সিটিতে এক ক্লাসেই পড়ে। তাদের প্রথম পরিচয় হয় ভার্সিটিতে ,সেখান থেকে মন বিনিময় করে তারা দুজন ৷ ছেলেটা একটু অগছলো। শুধু একটু নয়,অনেকটাই অগছলো। সৌরভ ভালো কবিতা লেখে। কবিতার ছন্দ সাজিয়ে নীরাকে শোনায়৷ নীরা মনযোগ দিয়ে শোনে সৌরভের কবিতা আবৃতি৷ এই অগছলো ছেলেটার প্রেমে নতুন করে হাবুডুবু খায় সে। ভার্সিটিতে পড়াশোনা শেষ হবার পালা। নীরার অনেক স্বপ্ন, ভার্সিটি শেষ করে দুজন পালিয়ে বিয়ে করবে৷তারপর,চাকরী করে নিজেদের সংসার বুনবে৷ প্রতি রাতেই নীরা কেমন যেন মায়া হয় ছেলেটার প্রতি।
সৌরভকে একটি ব্যাগ কাধে ঝুলিয়ে আসতে দেখা গেলো।গায়ে সাদা রঙের পাঞ্জাবি,পড়নে কালো প্যান্ট। পায়ের জুতো জোড়ায় বোধ সেলাই করার জায়গা নেই।  সৌরভ এসে নীরার সামনে দাঁড়িয়ে নিশ্বাস ফেলে নীরাকে বলল,’দেরী করে ফেলেছি বোধয়!’ নীরা মুখে ভেংচি কাটলো৷ সৌরভ ক্যাবিক ভাষায় বলল,
‘শিউলি ফুলের মালা দিয়েছো খোপায়,
যতন করে বেধে রেখো আমায়।
ওগো আমার শিউলি ফুল! ‘
নীরা হাসলো খিল খিল করে৷সৌরভের প্রতি অভিমান জমিয়ে রাখতে পারে না সে,বড্ড ভালোবাসে ছেলেটাকে।
২.
সৌরভ একটি পাবলিক বিশ্ববিদ্যালয়ে কম্পিউটার ইঞ্জিনিয়ারিং নিয়ে লেখাপড়া করছে৷ তার পাশাপাশি সাহিত্যের প্রতি রয়েছে তার দারুণ আগ্রহ। সৌরভের মা নেই৷ দশ বছর বয়সে তার মা মারা যায় ক্যান্সারে আক্রান্ত  হয়ে। তার বাবা প্রাইমেরি স্কুল শিক্ষক। সৌরভ ছোটবেলা থেকে বড় হয়েছে তার সৎ মায়ের কাছে। সৎ মা সৌরভকে মানুষ করেছে নিজের ছেলের মতো। কারন,সৎ মায়ের কোন সন্তান নেই।
সৌরভ আর নীরা বসে আছে পার্কের বেঞ্চে। নীরা কেমন করে তাকিয়ে সৌরভকে দেখছে। সৌরভের সেদিকে খেয়াল নেই। তার খেয়াল পার্কের ঐ প্রান্তে টোকাই ছেলেটার দিকে। সৌরগ ভাবছে, ‘ছেলেটার জীবনের কী দূঃখ! আহা!  সেও তো জন্ম নিতে পারতো বড় লোকের কোন ঘরে৷ তার মা তাকে খাওয়াতে জোড় করতো। খাওয়ানোর সময় এটা ওটা দেখিয়ে বলতো,খাও না হলে তোমাকে এসে গিলে খাবে। শোনাতো কত রূপকথার কাহিনী। সৌরভের চোখ ভিজে এলো। বেচারা সারাদিন খায়নি হয়তি,এ জগৎ সংসারে কেউ কেউ পেটের দায়ে খাটে৷ তাদের কাছে পেট ভরা মানে পৃথিবীর যত সুখ। ক্ষিদা দারূন কষ্টের ব্যাপার।
এদিকে নীরা তাকিয়ে আছে সৌরভের দিকে।  সে ভাবছে সৌরভকে নিয়ে সৌরভ ভাবছে টোকাই ছেলেটাকে নিয়ে।
মানুষের উপর সর্বদাই কেউ না কেউ নজর রাখে৷ নজর রাখতে হয়,কখনো কখনো নজর শুভ হয় আবার কখনো নজর অশুভ হয়। ছোটবেলায় বাচ্চাদের কপালের কোনে কালির ফোটা দেওয়া হয়, যাতে নজর না লাগে। কিন্তু,বড় হলে কেন বড়দের টিপ দেয় না? কে জানে।
সৌরভ এবং নীরা পার্কে বসে আছে অনেকক্ষণ ধরে। বেশ কিছুক্ষন ধরে নীরা চুপচাপ। নীরা বলে উঠলো, গ্রাজুয়েশন তো শেষের দিকে। গ্রাজুয়েশন শেষ করে কি করবে ভাবছো? সৌরভ বলে,’ দেখি! হয়ে যাবে কিছু একটা। ‘
নীরা বলল,’তোমার চুলগুলো বেশ বড় হয়ে গিয়েছে। দাড়ি ও কাটো না বোধয় বেশ কিছুদিন ‘ সৌরভ, ‘হুম বলে। ‘
নীরা তার খোপায় বাধা চুলগুলো খুলে দেয়। সৌরভের নজর পরে সেদিকে। নীরা বলে, ‘এভাবে দেখছো কেন?’ সৌরভ বলে,’তোমার চোখ কেন এত সুন্দর?’ নীরা বলে,’কে বললো আমার চোখ সুন্দর?’ সৌরভ বলে, ‘কেন আমি বললাম?’ নীরা বলে, ‘কী দেখেছো আমার চোখে?’ সৌরভ বলে,’প্রহর শেষের আলোয় রাঙা সেদিন চৈত্রমাস,তোমার চোখে দেখেছিলাম আমার সর্বনাশ। ‘
নীরা হি হি করে হাসে। তার হাসি যেন ঝরে পড়ে মুক্তোর মতো।
৩.
নীরা বড় ঘরের মেয়ে। তার বাবা আমজাদ সাহেব একটি বড় কোম্পানির মালিক। নীরাকে দেখার জন্য পাত্রপক্ষ দেখতে আসবে। নীরা এখন বসে আছে বেলকুনিতে  বেলকুনিতে দোলনায় বসে হেলান খাচ্চে সে। তার হাতে বই,অন্য হাতে চায়ের কাপ৷নীরা কোন ভাবেই বইয়ের পাতায় মনযোগী হতে পারছে না। একটু আগেই মা এসে ‘ পাত্রপক্ষ তোকে দেখতে আসবে’ বলে গিয়েছে। নীরা সৌরভকে ফোন দিয়েছে। সৌরভকে ফোনে পাওয়া গেলো না।নীরাকে বেশ চিন্তিত দেখা গেলো।
পনেরো দিন পরে ঘটনা,’নীরা বিকেলে বাসা থেকে বের হয়ে রিক্সায় উঠেছে৷ নীরা যাচ্ছে রমনা পার্কে। এই পনেরো দিনে নীরার অনেক কিছুই পাল্টে গিয়েছে। পাত্রপক্ষ তাকে আংটি পড়িয়ে গিয়েছে৷ পাত্র নীরার বাবার বন্ধুর ছেলে।
তাতে কিছুই হয়নি! নীরা আংটিটি খুলে রাস্তায় ফেলে দিলো। আজই সৌরভের সাথে পালাবে সে। সৌরভ পালাতে পারবে কি না কে জানে৷ সৌরভ না পালালে নীরা সৌরভকে নিয়ে পালাবে। কারন, বাবার পছন্দের জুয়ারি ছেলেকে সে কখনোই বিয়ে করতে পারবে না। আর তা ছাড়া নীরা সৌরভকে পছন্দ করে;ভালোবাসে দুজন দুজনকে।
নীরা অনেক্ষণ ধরে অপেক্ষা করছে সৌরভের জন্য। ওপারে সৌরভকে দেখা যাচ্ছে। সৌরভকে বেশ খুশি খুশি লাগছে আজ।মাথা চুলগুলো কেটেছে,দাড়িতে শেভ করে দাড়ি গুলোতে সুন্দর কাট দিয়েছে। তার পড়নে এখন আর জায়গায় জায়গায় সেলাই করা জুতোটার বদলে এখন তার পায়ে কালো সু। সৌরভ রাস্তা পার হতে গেলো৷ হঠাৎ করে একটি বাস এসে ধাক্কা দিলো তাকে। সৌরভ ছিটকে গেলো। নীরা রাস্তার ওপার থেকে চিৎকার দিলো!
গাড়ি গুলো থেমে গেলো। মানুষ জটলা পাকিয়েছে রাস্তায়৷ সৌরভের নিথর দেহ পড়ে আছে । এই তো কিছুক্ষণ আগেই, সে বেঁচে ছিলো। সময়টা ছিলো হয়তো ছেলেটার জীবনের শ্রেষ্ঠ সময়।
নীরা কাঁদছে! সৌরভের রক্তমাখা হাতে একটি সাদা খাম। খামের ওপর লেখা এপোয়েন্টমেন্ট লেটার।

*

হাওয়ার উপর চলে গাড়ি

এখন কার্তিক মাস,আকাশে কটকটে রোদ উঠেছে৷
উত্তর দিক থেকে ঠান্ডা হাওয়া আসছে৷ ঠোট কেমন ফেটে যাচ্ছে৷ত্বক হয়ে যাচ্ছে খসখসে। গা’ঘামলে ঠান্ডা লাগছে৷
মোড়ের ছোট্ট একটা চায়ের দোকানে মোবাইলে গান বাজছে-
“হাওয়ার উপর চলে গাড়ি,
হাওয়ার উপর চলে গাড়ি
লাগেনা পেট্রোল ডিজেল,
মানুষ একটা দুই চাকার সাইকেল”
‘কি গো রুস্তম মিয়া, দিনকাল কেমন যায়?’,চায়ের কাপে চামচ দিয়ে নাড়তে নাড়তে বলল চায়ের দোকানদার হাশেম৷
‘আমগো মতো গরিব মাইনষ্যার আবার দিনকাল। তিন চাকার জীবন আমগো। দিন আনি দিন খাই৷ ‘
হাশেম মিয়া হাসতে হাসতে জবাব দিলো,’তুমি তো দেহি আইজকাইল বড় বড় কথা কও ‘
‘আমি মানুষটা ছোড হইলো হইব কি, আমাগো কি বড় কথা কইতে কেউ মানা করছে নাকি?’
হাশেম  কিছু বলল না৷ রুস্তুম মিয়া হাশেমকে চা’দিয়ে বলল। চায়ের সাথে একটা পাউরুটি খাওয়া যায়৷ আজ ভালো খ্যাপ গিয়েছে। পাউরুটি আর চা মুখে দেওয়ার সময় রুস্তম মিয়ার মেয়েটার কথা মনে পড়ে গেলো। মনে মনে বলল,’আহারে মাইয়াডা কি সকাল থেইকা কিছু খাইছে! কেডা জানে সকাল থেইকা ওর মায়ের লগে লগে এ বাসা থেইকা ও বাসায় ঘুরতে ঘুরতে কিছু খাইছে কি না, মাইয়াডার লইগা যাওয়ার পথে হাফ প্লেট বিরিয়ানী লইয়া যামু৷ অনেকদিন ধইরা-ই মাইয়াডা আমার বিরিয়ানী খাইতে চায়৷ ”
অনেকক্ষণ ভাবনা চিন্তার পরে রুস্তম মিয়া রুটিটায় কামড় দিলো।। সকাল থেকে কিছু খাওয়া হয়নি। চা রুটি শেষ করে বিড়ি ধড়ালো। উদাস মুখে বিড়ি টানছে। শরীরটা কেমন ছেড়ে দিয়েছে৷আজকে আর রিক্সা চালাতে মন চায় না৷ ”
রুস্তম উঠলো চায়ের দোকান থেকে৷ চায়ের দোকানদার কে টাকা দিয়ে বলল,’যাই গো হাশেম মিয়া। ‘
রিক্সায় প্যাডল মাড়ছে৷গা থেকে ঝোল দিয়ে ঘাম পড়ছে। ঘামে গায়ের গেঞ্জি ভিজে গেছে রুস্তমের।
২.
‘কই গো! জোসনার মা। আমরে দুই চাইরডা খাওন দাও! “,রোকেয়া বানুকে বলল রুস্তম। ”
রোকেয়া গরম ভাতের গাবলা আনতে আনতে বলল,”আফনারে না কতবার কইসি।এইরকম কইরা কথা না কইতে। ”
রুস্তম বিচলিত হয়ে বলল,’আমি আবার কি কইলাম। দুইডা খাওন-ই তো চাইছি। ‘
“এইভাবে খাওন চাওনের স্বভাব আফনার গেলো না। মাইয়াডা বড়ো হইতাসে। ওর সামনে এইরকম কইরা কথা কইলে হইব না। আমগো এহন ভালো মাইনষ্যের মত কথা কওন লাগবো। ”
‘আমরা কি খারাপ মাইনষ্যার মতো কথা কইতাছি নাকি?’
“আফনার লগে কথায় পারোন যাইবো না বাবা! নেন এহন বইয়া ভাত খান। ”
রোকেয়া রাগন্বিত হয়ে রান্নাঘরের দিকে গেল তরকারি আনতে।”
রুস্তম আর তার মেয়ে জোসনা একসাথে ভাত খাচ্ছে৷ মেয়েটার গায়ের  রঙ মায়ের মত শ্যামলা হয়েছে৷ তবে মা ও মেয়ে দুজনের চেহারের মধ্যে অদ্ভুৎ এক মায়া লুকানো আছে৷
জোসনার বয়স ছয় বছর। এবার ক্লাস ওয়ানে ভর্তি করানোর কথা থাকলেও ভর্তির টাকা জোগাড় হয়নি বলে ভর্তি করাতে পারেনি রুস্তম। ভাবছে এবার মেয়েটাকে স্কুলে ভর্তি করানো দরকার৷
৩.সকাল হলেই রিক্সা নিয়ে বেড়িয়ে পড়তে হয় রুস্তমকে৷ আর রোকেয়া বানু তার মেয়েকে নিয়ে বাসায় গিয়ে কাজ করে৷ মেয়েটাকে ঘরের এক কোণে বসে রেখে তাকে কাজ করতে হয়। যে বাসায় কাজ করে সে বাসা থেকে নিষেধ করে দেওয়া হয়েছে-যাতে রোকেয়া বানু  তার মেয়েকে নিয়ে কাজে না যায়৷ রোকেয়া বানু বলে,’এতটুক একটা মাইয়া আমার। অরে একলা একলা বাসায় কেম্নে রাইখা আমু আফা? ‘
“সেটা আমি কিভাবে জানবো? তোমারা বস্তিতে থাকো। তোমাদের কালচার আর আমাদের কালচার এক না। তোমার মেয়ের কাছ থেকে আমার মেয়ে গালি দেওয়া শিখেছে৷ ” ,বলল রেহানা। ‘জোসনা বানু বলল,” এয়া আফনে কি কন আফা। আমার মাইয়া তো গালি দিতে জানে না।
” রেহানা গরম গলায় বলল,”হয়েছে হয়েছে৷ বস্তিতে থাকো আবার গালি জানো না! ”
রোকেয়ার মুখ কালো হয়ে গেলো৷ সে বিষণ্য মুখ নিয়ে ঘর মুছতে লাগলো। জোসনা বসে আছে৷ তার ক্ষিদে লেগেছে অনেক। সকালে দুটো বিস্কিট খেয়ে এসেছে;এখন বাজে দুপুর বারোটা৷ ক্ষিদে লাগারই কথা৷ জোসনা পেটে হাত দিয়ে বসে আছে। রোকেয়া ঘর মুছছে।
পাশের রুমে রেহানা তার মেয়েকে সামলাচ্ছে। রেহানার মেয়ে সুহা ঘরের এটা ওটা এদিক সেদিক ছুঁড়ছে।
আজকে দিনটা ভালো যাচ্ছে না রুস্তমের। আকাশে মেঘের ছিটে ফোটা নেই কটকটে রদ্দুরে মাথা ফেটে যাওয়ার উপক্রম। এই রোদে রুস্তম রিক্সায় একের পর এক প্যাডেল মারছে৷ তার রিক্সায় উঠেছে মোটাসোটা এক লোক৷ সে লোক কিছুক্ষণ পরপর রুস্তমকে ধমকাচ্ছে। ‘আরে মিয়া তুমি এত ধীরে ধীরে রিক্সা চালাও৷ তোমার রিক্সায় ওঠাই আমার ভুল হয়েছে৷ রৌদ্রে ঘেমে যাচ্ছি আর তুমি আস্তে আস্তে রিক্সা চালাচ্ছো। তুমি তো মিয়া আমার চাকরী খাবা৷ ” রুস্তম গায়ের সর্ব শক্তি দিয়ে রিক্সায় প্যাডেল মারছে৷ রুস্তমের সারা শরীর থেকে ঝোল দিয়ে ঘাম ঝরছে। সে প্রায় দশ বছর ধরে রিক্সা চালায়। তার এত কষ্ট আর কোন দিন হয়নি৷ রুস্তমের বুক ফেটে যাচ্ছে পা দুটো যেন অবশ হয়ে যাচ্ছে। মোটাসোটা ভদ্রলোক বলল,’এই রিক্সা থামাও তো তুমি। রুস্তম রিক্সা থামালো। ভদ্রলোক হাটাদিলো হনহন করে। রুস্তম তার পিছন পিছন গেল। ‘স্যার আমার ট্যাকাটা দিয়া যান। ‘ মোটাসোটা ভদ্রলোক বলল,’টাকা?  কিসের টাকা দেব তোকে? এখান থেকে এখানে এসেছি। এক কিলোমিটারো হয়নি। আর তোকে টাকা দিব? কেন? কোন কারনে। তুই রিক্সায়ই চালাতে পারিস না। রুস্তম করুণ গলায় বলল,’স্যার আফনে আমার রিক্সায় উইঠা বসেন। আমি আফনারে আফনার অফিসে পৌছায়ইয়া দিমু৷ ‘ ভদ্রলোকের সাথে এক কথায় দুই কথায় রুস্তমের গালে কষে থাপ্পড় মারলেন মোটাসোটা জল্লাদের মতো ভদ্রলোক। তারপর হন হন করে হাটা দিলো।
৪.
আজ রুস্তমের বড্ড খাটনি হয়েছে৷ সে কিছুক্ষণ আগে ঘরে ফিরেছে৷ রোকেয়া এসে রুস্তমের পাশে বসল৷জোসনা করুন গলায় বলল,”আফনারে আইজ বড্ড হয়রান লাগছে৷ আইজক্যা খাটুনি বেশি হয়েছে না? আফনে বইসা বিশ্রাম করেন আমি আফনার জন্য লেবুর শরবত নিয়া আহি৷” রোকেয়া খাট থেকে উঠে শরবত বানানোর জন্য যাওয়ার সময় রুস্তম খট করে জোসনার হাতটা ধরে ফেলে৷ ‘হাঙ্গা দিন পর এহন ঘরে আইলাম৷ আর তুমি একটু আমার পাশে বহো৷ আমার শরবত টরবত কিচ্ছু লাগবে না৷ তুমি আমার পাশে বইল আমার পরাণ ডা জুড়াইয়া যায়। রোকেয়া রুস্তমের এই কথা শুনে লজ্জায় লাল হয়ে যায়৷’যাহ আফনে যে কি বলেন। ‘ রুস্তম উৎফুল্ল ভঙ্গিমায় বলে। ‘আমার বউডার লজ্জা লাগে নাহি! দেহি আমার বউডারে দেহি৷ ‘ রুস্তম হাত বাড়ায় রোকেয়ার দিকে।
এর মধ্যে জোসনা এসে পড়ে। দুজন লজ্জার ভঙ্গিতে দূরে সরে যায়। জোসনা দু হাতে তালি দিতে দিতে বলে,” আমি দেখছি, আমি দেখছি!  ” রুস্তম মেয়েকে বলে, ‘কি দেখছোস ছেমড়ি? আয় দেহি আমার কাছে৷ এই দ্যাখ তোর লইগা লজেন্স নিয়া আইছি৷ ‘ জোসনা তার বাবার লাছে যায়। লজেন্স লুফে নেয়৷
কুপি জ্বলছে৷ কুপির আলোতে একটি পরিবার রাতের খাবার খাচ্ছে৷ আজ রান্না হয়েছে আলু ভর্তা আর ডাল। রুস্তম পোড়া মরিচে কামড় দিচ্ছে৷ জোসনা ভাত মাখিয়ে বসে আছে৷ ভাতের থালায় আঙুল দিয়ে ঘোরাচ্ছে৷
রোকেয়া তার মেয়েকে ধমক দিয়ে বলছে,’অই ছেমড়ি খাস না কেন? খা জলদি! ‘ জোসনার মুখ কালো হয়ে গেলো৷ সে অভিমানে ভাতের থালা ছেড়ে উঠে গেলো। রুস্তম বলল,’মাইয়াডারে এইরম ধমক দিলা কেন? তুমি কামডা ঠিক করলা? ‘ রুস্তমও ভাতের থালা রেখে উঠে গেলো৷ রোকেয়া বলল,’তোমরা বাপ-মাইয়া আমার লগে আর কথা কইবা না। ঘর থেকে রুস্তম আর জোসনা বলে উঠলো,’তোর লগে কথা কওনের সময় আমগো নাই৷ জোসনা খিল খিল করে হাসছে৷ রুস্তমও হাসছে৷ এ যেন মধুর দৃশ্য৷
এখন মধ্যরাত৷ চারদিকে নিস্তব্ধতা । শুধু শোনা যায় দূর থেকে কুকুরের ডাক৷ রুস্তম দু চোখের পাতা এক করতে পারছে না। তার ঘুম আসছে না। রোকেয়াও জেগে আছে। সে রুস্তমের পিঠে হাত রেখে বলল, ‘আফনে এহনো ঘুমান না কেন? রাইত তো ম্যালা হইছে৷ কাইল্ক্যা সকালে না কামে যাইতে হইবো?’ রুস্তমের চোখের কোনে পানি এসেছে৷ শেষ কবে কেঁদেছে সেটা তার মনে নেই। আজ থেকে বারো বছর আগে রুস্তম কেঁদেছিলো৷ তার বাবা মারা গিয়েছিলো যখন৷ রুস্তম রোকেয়াকে বলল,’আমগো মাইয়াডার মাথায় আল্লায় ম্যালা বুদ্ধি দিছে৷ ওরে আমি শিক্ষিত করুম। ডাক্তার বানামু আমগো মাইয়াফারে। রোকেয়া শীতল গলায় বলল,’আমারো হেইডা ইচ্ছা৷ আমগো মাইয়াডা ডাক্তার হইব৷ মানুষের চিকিৎসা করব। আমগো বুড়া বয়সে আর কষ্ট থাকবো না৷ এভাবে শুরু হলো তাদের আশার কথা৷ রাত বাড়ছে৷ গভির রাতে যখন গোটা শহর ঘুমে কাতর তখন জেগে জেগে এরা স্বপ্ন দেখছে। ভবিষ্যতের স্বপ্ন,আলোর স্বপ্ন,আশার স্বপ্ন৷।
৫.
কাল সারারাত ঘুম হয়নি রুস্তমের শরীরটা কেমন ঝিম মেরে আছে৷ একটা বিড়ি জ্বালাতে হবে ৷ বিড়ি জ্বালালে শরীরটা চাঙ্গা হবে৷ রুস্তম দোকান কে একটা বিড়ি নিয়ে দু ঠোটের মাঝখানে রেখে জ্বালালো।ফুরফুর করে বিড়ি টানতে লাগলো৷ শরীরের ঝিমুনা ভাবটা কেটে গেলে বোধয়৷ রিক্সা নিয়ে আবার ছুটলো৷ আজকে রিক্সার যাত্রী পওয়া যাচ্ছে না৷ যাদের পাওয়া যাচ্ছে তাদের গন্তব্য দূরে দূরে।কাল  রাতে ঘুমানো হয়নি বলে শরীরটা ক্লান্তিতে ছেড়ে দিচ্ছে।
রুস্তম এখন খালি রিক্সা নিয়ে ছুটছে৷ তার পাশ দিয়ে সাঁই সাঁই ছুটছে বাস,গাড়ি,ট্রাক৷ রুস্তমের চোখে জ্বালা করছে৷শরীরটা কেমন যেন লাগছে। মনে হচ্ছে এখনই ঘুমে তলিয়ে যাবে৷ রুস্তমে হাত-পা সবকিছু অবশ হয়ে আসছে।হঠাৎ পিছন থেকে আসা পিকাপ-ভ্যান সজোড়ে আঘাত করল রিক্সাটিকে৷ রিক্সাটি দুমড়ে মুচড়ে গেলো৷ রুস্তম ছিটকে গিয়ে পড়ল রিক্সা থেকে খানিকটা দূরে।চারদিকে সবকিছু যেন স্তব্ধ হয়ে গেলো৷ চায়ের দোকান থেকে ছুটে এলো লোকজন৷ রুস্তমের মাথার বামপাশটা থেতলে গেছে৷ ঝোল দিয়ে রক্ত পড়ছে সেখান থেকে৷ রুস্তম আস্তে আস্তে করে চোখ বুঝলো৷ আবার চোখগুলো খুলল। বড় বড় চোখে তাকিয়ে রইলো৷
রুস্তমক ঘুরে মানুষজন জড়ো হয়েছে৷ একটা ভ্যান জোগাড় করা হয়েছে। রুস্তমকে ভ্যানে ওঠানো হয়েছে। মানুষজন তাকে নিয়ে ছুটছে হাসপাতালের উদ্দেশ্যে। ভ্যান চলছে রুস্তমের মাথা ফেটে রক্তের ফোটা পড়ছে রাস্তায়।

*

আগন্তুক
গাছের মগডালে হুতুম পেঁচা ডাকছে।নভেম্বার মাসের শেষ।শীত শীত লাগছে। চারদিকে নিস্তব্ধতা। নিশ্বাসের শব্দ শোনা যায়।  গ্রামের পথে পথে হাটছে আফজাল ডাকাত আর তার সহযোগীরা। ধানভাঙা গ্রামের কুদ্দুস মেম্বারের বাড়িতে আজকে ডাকাতি করবে। কুদ্দুস মেম্বারের ছোট ছেলে কয়েকদিন আগে বিদেশ থেকে দেশে ফিরেছে৷ অনেকদিন পরে এত বড় একটা সুযোগ মিললো আফজাল ডাকাত দলের। ডাকাত দলের প্রধান আফজাল মিয়া ডাকাতি জীবন শুরু করেছে বছর বিশেক আগে থেকে। গায়ের লোক তাকে এক নামে চেনেআফজাল ডাকাতের নাম শুনলেই মানুষ কেমন আতংকিত হয়ে ওঠে
অনেকটা পথ পেরিয়ে আফজাল মিয়া এখন কুদ্দুস মেম্বারের প্রধান দরজার সামনে । দরজার কায়দা করে খোলা হচ্ছে৷ এই কায়দা করে দরজা খোলার কাজটি করছে শানু। সে এসব কাজ ভালো ভাবে করতে পারে। দরজা খোলার পরে আস্তে আস্তে করে ডাকাত দলটা ঢুকলো ঘরের ভিতরে। সবাই ঘুমে বিভোর কেউ জেগে নেই।
তখনো জেগেছিলো বিলেত ফেরত মোকাদ্দেস। সে ফিসফিস আওয়াজ শুনতে পেলো। সাথে পা টিপে টিপে হাটার শব্দ। কৌতূহল বশত দরজাটা একটু ফাক করে দেখলো। ভড়কে গেলো কিছুটা, এ তো ডাকাত দল! মোকাদ্দেস তার বাড়ির পাশের বন্ধুকে খবর দিলো। সে পুলিশে চাকরী করে৷ ছুটিতে গ্রামে এসেছে৷
কিছুক্ষণের মধ্যে পুলিশের বাশির শব্দ পাওয়া গেলো।ইদ্রিস সাহেবের বাড়ি ঘিরে রেখেছে পুলিশ। আফজাল মিয়া ঠোটে কামড় দিলো। বুদ্ধি বের করতে হবে একটা। কোন ভাবেই পুলিশের হাতে ধরা খাওয়া যাবে না।ধরা খেলেই জেল খাটতে হবে,এক বছর দুই বছর কিংবা তারও বেশি। সে কায়দা করে বাড়ির পিছন থেকে বের হলো গোটা দল নিয়ে৷আফজাল মিয়ার সহযোগী ঝন্টু বলল, ‘পুলিশ তো বেশি নাই ওস্তাদ!’ লোকজন আছে বেশ কয়েকজন। আফজাল মিয়া আকাশে ফাকা গুলি ছুড়লো কয়েকটা। বাড়ি জুড়ে থম থমে অবস্থা৷ তারপর সুপাড়ি বাগান চিড়ে দৌড় দিলো আফজাল মিয়া আর তার দলবল।আফজাল মিয়া দৌড়াচ্ছে,বাকিদের কথা আপাতত না ভাবলেও চলবে। নিজে বাঁচলে বাপের নাম।
গ্রামবাসী মশাল জ্বালিয়ে ডাকাত ধরতে নেমেছে। এ যেন ডাকাত ধরার মহাৎসব।বাচ্চারাও জেগে আছে। তাদের মধ্যে আনন্দ আর কৌতূহল খেলা করছে। আফজাল মিয়া এখন বসে আছে কবরস্থানের ভিতরের একটা ঝোপে।আশেপাশে মানুষজনের আনাগোনা  নেই৷ এই ঝোপের মধ্যে সাপ-কোপ আছে নাকি কে জানে৷  তার পা’টা কেমন কুটকুট করছে৷ জোঁকে ধরেছে কি না কে জানে। পায়ের উপর দিয়ে ঠান্ডা কিছু একটা চলে গেলো। সাপ! অন্ধকারে বোঝা যায় না৷ কি সাপ! কে জানে! নড়াচড়া করা যাবে না। গাছের মগডালে কুহপাখি ডাকছে! আফজাল মিয়া বসে আছে নিরবে। সাপটা চলে গেছে তার পায়ের উপর দিয়ে৷ কেমন যেন শব্দ শোনা গেল!  বাচ্চার কান্নার আওয়াজ না? বাচ্চা কাঁদে হঁ্যা হ্যাঁ!  বাচ্চার কান্নার আওয়াজ। না! না! আফজাল মিয়ার মাথা টাথা খারাপ হয়েছে৷ আশেপাশে ঘরবাড়ি ও তো নেই। তাহলে বাচ্চার কান্নার শব্দ কোত্থকে আসবে? নাকি ভূত-প্রেত। আফজাল মিয়া ভূতে ভয় পায় না। আফজাল মিয়া কবর স্থান থেকে বেরিয়ে রাস্তার কাছে এসে পূর্নিমার আলোতে দেখলো একটা ফুটফুটে নবজাতক শিশু রাস্তার পাশে পড়ে আছে আফজাল আশপাশটা ভালো করে দেখলো! কোথাও কেউ নেই! আফজালের ভয় হলো। এ কেমন ভূতুড়ে কান্ড। আফজাল মিয়া হন হন করে হাঁটা দিলো।
২.
মোরগ ডাকছে! সকাল হয়েছে। রানু বেগম বসে আছে খাটে।কাল রাতে আফজাল মিয়া কোত্থুকে এক শিশু নিয়ে এসেছে৷ রানু বেগমকে ঘুম থেকে তুলে নবজাতককে কোলে দিয়েছে আফজাল।রানুর কোন সন্তান নেই। আফজালের ওপর মানুষের অভিশাপ লেগেছে হয়তো৷ তাই উপরওয়ালা রানুর পেটে কোন সন্তান দেন না৷
রানুকে ভীষন চিন্তিত দেখাচ্ছে৷ এতটুকু একটা নবজাতক শিশু কোত্থকে আনলো আফজাল? কার সন্তানকে কেড়ে এনেছে? আফজাল মরার মতো ঘুমাচ্ছে৷ রানু আফজালকে ডাকলো। আফজাল ঘুম থেকে উঠে হতভম্ব হয়ে গেলো। চোখ কচলাতে কচলাতে বলল,’এই বাচ্চা আইলো কই দিয়া,এইডা কার বাচ্চা? ‘ রানু বলল,’ঘুম থেইকা উইঠা বাচ্চা দেইখা মনে হয় ডরাইছেন? বাচ্চা আইলো কই দিয়া হেইডা আমি কেমনে কমু? কালকে রাইতেই না আফনা বাহির থেইকা আইয়া আমার এই বাচ্চাডারে আমার কোলে দিলেন? এর মইদ্দে ভুইলা গেলেন কেমনে?’ আফজাল চোখ কচলালো।রানু অনবরত প্রশ্ন করতে লাগলো৷ বাচ্চা কার কই দিয়া আইলো?’
আফজাল সব ঘটনা খুলে বলল। রানুকে বেশ চিন্তিত দেখা গেলো৷ এটা কার বাচ্চা? মানুষের? নাকি জিন পরি কবরস্থানে ফেলে গিয়েছে। না না  এটা কোন মানুষের কাজ হতে পারে না। একটা মানুষ কখনো একটা শিশুকে  কনকনে ঠান্ডায় কবর স্থানে ফেলে যেতে পারে না।
বাচ্চাটার নাক থেকে অনবরত পানি ঝরছে৷ হাতপা ঠান্ডা হয়ে যাছে৷ বাচ্চাটা কাদছে৷ রানু কান্না থামাতে পারছে না।
আফজাল হাটের দিকে রওনা হলো। শানু ডাক্তারকে খবর দিতে হবে। বাচ্চাটার জন্য কিছু কাপড় কিনতে হবে। হাজার হোক তাকে কেউ ফেলে গিয়েছে,এমন একটি ফুটফুটে শিশুকে কে কবরস্থানে ফেলে গেলো? সে মানুষ নয়;অমানুষ।
৩.
রাশেদের সাথে সুনিতার মাত্র দু বছরের সম্পর্ক। সুনিতা অনার্সে পড়ে। রাশেদের সাথে তার পরিচয় হয় কলেজে৷ ছেলেটা ভদ্র নম্র। সুনিতার পছন্দ হয়ে যায় রাশেদকে৷ সুনিতার টানা টানা চোখ, সাদা ধবধবে মুখ। এমন রুপবতী মেয়েকে ভালোবাসা বড় ভাগ্যের ব্যাপার। রাশেদও পছন্দ করে ফেলে তাদের মধ্যে সম্পর্ক তৈরী হয় ; বুকজুড়ে আবেগের ভাসাভাসি। সুনিতা রাশেদকে শুধু ভালোবাসে না;বিশ্বাসও করে।
সেই  বিশ্বাসের প্রতিদান রাশেদ দেয়নি।রাশেদের সাথে সুনিতার ঘনিষ্ঠতা বাড়তে থাকে। ভালোবাসার সম্পর্ক রূপ নেয় অবৈধ সম্পর্কে।
সুনিতা যখন বুঝলো তার শরীরে সে ছাড়াও আরেকজন আছে তখন রাশেদকে বলেছিলো সে কথা৷ রাশেদ সোজা সাপ্টা ভাষায় বলে দিয়েছে,’সে এ ব্যাপারে কিছুই করতে পারবে না।বাচ্চাটাকে নষ্ট করে ফেলতে হবে ‘ জীবনে কখনো কখনো সীমাবদ্ধতা চলে আসে, কিছু কিছু বেড়াজাল টপাকানোর পড়ে হাজারটা প্রশ্নের সম্মুক্ষিন হতে হয়৷বাস্তবতা কঠিন হয়ে পড়ে। ঠিক তখনই কাছের মানুষগুলো বোঝা ভাবতে শুরু করে। জীবন পরে যায় কষ্টের দোলাচলে।” সুনিতার বাবা-মা জানে,তার মেয়ে কেলেঙ্কারি বাধিয়ে ফেলেছি৷ তারা রাশেদের পরিবারের সাথে কথা বলে। রাশেদের বাবা কোন ভাবেই মেনে নেয় না সুনিতার বাবার এমন প্রস্তাবকে।  মানুষজন এ ব্যাপারে জানা জানি হয়ে গেলে মান ইজ্জত কিচ্ছু থাকবে না।
থানা পুলিশের ভয়ে রাশেদের পরিবার রাজি হয়৷ কিন্তু শর্ত একটাই সুনিতার এবশন করাতে  হবে৷ কিন্তু নির্ধারিত সময় অতিবাহিত হওয়ায় সেটা আর সম্ভব হয়না। যে কারনে রাশেদের পরিবারও রাজি হয়না। সুনিতা গর্ভধারন করে। তাকে নিয়ে যাওয়া হয় তার মামার বাড়িতে। জন্ম নেয় একটা ফুটফুটে নবজাতক। সুনিতার বাবার কথা মতো সুনিতার মামা রাতের আধারে তাদের দুই গ্রাম পরে বাচ্চাটিকে কবর স্থানে ফেলে রেখে যায়। সুনিতা কাঁদে ;পাগলের মতো ছটফট করে।
দু মাস পরে রাশেদও মারা যায় রোড এক্সিডেন্টে। সুনিতা মানসিক ভারসাম্যহীন হয়ে পড়ে।
তিন বছর পরে সুনিতার বিয়ে হয়ে যায়। সে ধীরে ধীরে এসব কাটিয়ে উঠতে থাকে।
৪.
বিশ বছর পরের ঘটনা, আফজাল মিয়া ডাকাতি জীবনকে বিদায় জানিয়েছেন। গ্রাম থেকে তিনি চলে এসেছেন শহরে। এখন তিনি সিএনজি চালিয়ে রোজকার করেন। তার স্ত্রী রানু মারা গিয়েছেন পাঁচ বছর আগে।
আজ তার বড় আনন্দের দিন। তার ছেলে মেডিকেল থেকে পাশ করে বেড়িয়েছে। তার চোখ থেকে পানি ঝরছে। আজ যদি রানু বেঁচে থাকতো।
বিশ বছর আগে তিনি ডাকাতি করতে গিয়ে কবরস্থানে পেয়েছিলেন একটি ফুলকে সেই ফুলকে তিনি বুকে টেনে নেন। বহু ঝড়ঝাপ্টা পার করে তিনি সেই ফুলকে বড় করেন তার ছেলে হিসেবে। সেদিনের সেই কুড়িয়ে পাওয়া ফুলটি আজ ডাক্তার। তার নাম ইরফান। দেখতে সুদর্শন। মাঝেমধ্যে আফজাল সাহেব অবাক হন৷ এই রাজপুত্রের মতো ছেলেটিকে বিচিত্র কারনে তিনি কবর স্থান থেকে পেয়েছিলেন।
আফজাল সাহেব ইরফানকে কোন দিনও কিছু জানতে দেননি। জানতে দেবেনই বা কেন? দেওয়ার কি দরকার?
ইরফান তো তারই ছেলে। আফজাল মিয়ার চোখ থেকে পানি গড়াতে থাকে। ইরফান এসে বলে,’আব্বা! আপনি কাঁদছেন কেন?’ আফজাল মিয়া বলে,’আজ বড়ই আনন্দের দিন রে বাবা! আজ যদি তোর মা বেঁচে থাকতো  ‘ ইরফান আফজাল মিয়াকে আলিঙ্গন করে। ইরফানও কাঁদে তার বাবার সাথে।
অতিবাহিত হয় আরো পাঁচ বছর,ইরফান এখন হাসপাতালের বড় ডাক্তারদের একজন। সুনিতার আর কখনোই কোন সন্তান হয়নি। সুনিতা বয়সের সাথে সাথে পাল্টে গিয়েছে। তার চোখ দুটোর নিচে কালশিটে পড়েছে। চামড়ায় পড়েছে বয়সের দাগ, মাথার চুলগুলো হয়েছে সাদা। সুনিতা এখন শুয়ে আছে হাসপাতেলের বেডে। একজন অল্প বয়সের ডাক্তার তাকে চেক-আপ করছে। সুনিতা তাকিয়ে আছে ছেলেটার দিকে৷ছেলেটার চোখে চশমা।ফর্সা মুখ জুড়ে খোঁচা খোঁচা দাড়ি।ছেলেটার প্রতি মায়া হলো সুনিতার।ছেলেটার নাম ইরফান।

*

বিচার
চোর ধরা হয়েছে৷ গতরাতে লালু সরদারের বাড়িতে চুরি করার সময় এক চোরকে হাতেনাতে ধরা হয়েছে৷ উৎসুক জনতা এসে ভীড় করেছে  একজন বলে উঠলো,’হারামজাদার চোখ গাইল্লা দেওন উচিত, যাতে চুরি করার আর সাহস না পায়। ‘ চোরের নাম মফিজ।
মফিজকে ঘিরে গোটা গায়ে উত্তেজনা ছড়িয়েছে৷ গ্রামের শিশু থেকে বৃদ্ধ সবাই এসে ভীড় করছে লালু সরদারের বাড়িতে।
হেমন্তের শেষ শেষ। শীত নেমেছে কুয়াশার চাদর নিয়ে৷এখন বাজে সকাল আটটা। গতরাতে লালু সরদারের বাড়িতে চুরি করার সময় হাতে নাতে ধরা হয়েছে মফিজকে। লালু সরদার খুব কায়দা করে এলাকার বিজ্ঞ মানুষদের কাছে  গতরাতে চোর ধরার কাহিনী শোনাচ্ছে।এক কাহিনী সেই সকাল থেকে বলতে হয়েছে প্রায় পাঁচবার-ছ’বার।  লালু সরদার তার গতরাতের চোরধরার কাহিনী বলতে গিয়ে কাহিনীর সাথে সংযোজন,সংশোধন এবং রদবদল করছে৷ এতে গা’য়ের মানুষের মধ্যে তৈরী হয়েছে ভিন্নমত। কেউ কেউ গোটা কাহিনী বার বার শুনছে লালুর কাছ থেকে৷
বাচ্চারা এসে মফিজের সাথে মজা করছে৷ বাচ্চাদের মধ্যে একজন বলছে,’মফিজ্জ্যা চোরা মফিজ্জ্যা! ‘ মেম্বার সাহেব এসেছেন। শালিসি  বসানো হয়েছে,মেম্বার সাহেব চিৎকার দিয়ে বলছেন,”হারামজাদারে আগে একশো বেত্রাঘাত কর। তারপর হবে শালিস। ” বেত্রাঘাত করা হলো মফিজের ঠোট কেটে রক্ত পড়ছে, শরীর লাল হয়ে গিয়েছে। পিঠে পড়েছে লাল লাল দাগ৷
২.
মাটির ঘরে ঢালা বিছানায় ব্যথায় কাতরাচ্ছে বিউটি বেগম।বেশ কয়েকদিন ধরেই সে অসুস্থ৷ ডাক্তার বলেছে লিভারে সমস্যা হয়েছে। সে কাতর গলায় বলছে,’মফিজ! অই মফিজ্জ্যা অই ছ্যাড়া! হুনছোস? আমার একগ্লাস পানি দে৷ ব্যথায় মইরা গেলাম। ‘
এদিকে  বিচারকার্য শেষ হয়েছে, মফিজকে জুতার মালা পড়িয়ে ঘোরানো হচ্ছে গ্রামের পথে পথে।মফিজকে বেধড়ক পেটানো হয়েছে৷ পেটানোরই কথা।চুরি করেছে তার শাস্তি তো তাকে পেতেই হবে৷
মফিজ তার মা’কে নিয়ে সুদুরপুর গ্রামের একটি মাটির ঘরে থাকে।মফিজের বাবা নেই। মফিজের যখন পাঁচবছর তখন তিনি মারা গিয়েছেন  বজ্রপাতে। ছোটবেলা থেকেই মফিজকে বড় করেছেন বিউটি বেগম। মফিজ ক্লাস এইট পর্যন্ত লেখা পড়া করেছে৷ কিন্তু,তার মায়ের এমন অবস্থায় সে আর লেখা পড়া চালিয়ে যেতে পারেনি৷ বিউটি মানুষের বাড়িতে কাজ করে মফিজ আর নিজের জন্য অন্ন জুটিয়েছিলেন তিনি।কিন্তু বার্ধক্য জনিত কারনে অসুস্থ হয়ে পড়ে বিউটি৷ মফিজ কাজ শুরু করে একটি খাবার হোটেলে।সেখানে কাজ করে প্রায় দু বছরের মতো৷ কিন্তু এদিকে বিউটি বেগমর চিকিৎসার অভাবে আরো বেশি অসুস্থ হয়ে পড়ে৷
বিউটি বেগম এখন বিছানায় পড়ে আছে৷ ক্লান্ত গলায় চিৎকার করছে৷ ‘অ মফিজ? হুনছোস? আমারে এক গেলাস পানি খাওয়া, গলাডা কেমন হুগাইয়া আইলো,বুকটা কেমন ব্যথা করতাছে’ এরকম করে সে চিৎকার করলো প্রায় মিনিট দশেক। কোন সারা শব্দ পাওয়া গেল না। মফিজ বিচার কার্য শেষে ফিরেছে। গ্রামের গণ্যমান্য ব্যক্তিরা তাকে শেষবারের মতো সুযোগ দিয়েছে। সে ঢলতে ঢলতে ঘরের কোনে এসে বসলো। ‘মায়ের কি খবর কে জানে’ মফিজ ঘরের খুটি ধরে উঠলো। ঠোট কেটে রক্ত জমাট বেধেছে সেখানে৷ চোখে কালসিটের দাগ৷ ঘরের ভিতর ঢুকে কাতর গলায় মফিজ বলল ‘মা ও মা? হুনছো? এত বেলা কইরা ঘুমায় কেউ? উঠো মা ‘ মায়ের কোন সারা শব্দ পাওয়া গেলো না।
মফিজ গিয়ে মায়ের কপালে হাত রাখলো। বরফের মতো ঠান্ডা হয়ে আছে। মফিজ বুক ফাটিয়ে চিৎকার দিলো। গাছের ডাল থেকে উড়ে গেলো এক ঝাক পাখি। গোটা পৃথিবী জানলো মফিজের কেউ নেই। মফিজ একা,শুধুই একা।
৩.
দশ বছর পরের ঘটনা,চোরের বিচারকার্য করার জন্য চেয়ারম্যান সাহেবের জন্য অপেক্ষা করা হচ্ছে।চেয়ারম্যান আসলেই বিচার শুরু হবে জব্বারের। শোনা যাচ্ছে তাকে চ্যাঙ দোলা করে গাছের সাথে দড়ি বেধে ঝুলিয়ে রাখা হবে। তারপর পুলিশের হাতে দেওয়া হবে জব্বারকে। এই গ্রামে এই একটি মাত্র চোরের উপদ্রব৷ চেয়ারম্যান সাহেব এলেন। বিচার কার্য শুরু হলো চেয়ারম্যান রাসেলদের বাড়িতে ঢোকার সাথে সাথেই স্লোগানে মুখোরিত হলো চারপাশ। মফিজ ভাইয়ের আগমন, শুভেচ্ছা স্বাগতম৷
চেয়ারম্যান বিচার কার্য শুরু করলেন। জব্বার কৌতূহলী হয়ে রইলো। গা’য়ের মানুষ ভীড় জমালো।সেদিনের চোরা মফিজ নামে মানুষের মুখে রটে যাওয়া মানুষটি আজকের চেয়ারম্যান মফিজ। গত দশ বছরে সে জীবনের চাকা পাল্টে ফেলেছে। নিজের বুদ্ধি,ক্ষমতা আর পরিশ্রমে সে নিজের ভাগ্যের চাকা বদলে আজ নিজেই তার গ্রামের চেয়ারম্যান বনে গিয়েছে৷লোকজনের মুখে এখনো গুঞ্জন শোনা যায়। চায়ের দোকানে চা খেতে খেতে মানুষজন বলে,’আমগো চেয়ারম্যান নাকি আগে চোর ছিলো। তারপর একেরপর এক গুঞ্জন,গল্প-গুজবে মুখরিত হয় চায়ের দোকান গুলো।
মফিজ নিজের ভাগ্যের চাকা বদল করলেও সে হারিয়েছে তার মাকে। তার মায়ের নামে করেছে একটি এতিমখানা। গ্রামে তার জনপ্রিয়তাও দিন দিন বৃদ্ধি পাচ্ছে।
জব্বারের বিচার হলো। জব্বারকে পুলিশের হাতে দেওয়া হয়েছে। চেয়ারম্যান তার মটরসাইকেল স্ট্যার্ট করে ছুটলো জব্বারের বাড়ির দিকে। জব্বারের মেয়েটা খুব অসুস্থ৷জব্বারের মুখ থেকে শুনেছে কিডনিতে সমস্যা নাকি তার।  তাকে হাসপাতালে নিতে হবে এখনি। হঠাৎ মফিজের বুকে চিড়ে চিনচিন ব্যথা শুরু হয়৷ এভাবেই তো একদিন সে তার মাকে হারিয়েছিলো। চুরি করার অপরাধে!  চোরেরও বিচার করা হয়েছিলো সেদিন৷

*

সাঁঝদুয়ারী
সন্ধ্যে নামার আগেই গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেছে চারপাশ। বুনো মশার বুন বুন শব্দ। বারান্দায় নামাজ পড়ছেন আব্বা। সুর করে সূরা পড়ছেন। দাদীর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম তিনি সেজদায় গিয়েছেন। মা বাইরে হাস মুরগীকে খোপে ঢোকাচ্ছে। রুনু বুবু মায়ের সাথে আছে। রুনু বুবুর চুল খোলা, মা রুনু বুবুর মাথায় চাটি মারলো। দাঁতে দাঁত পিষে রুনু মা রুনু বুবুকে বলল,’সন্ধ্যে বেলা শাকচুন্নির মতো চুল খোলা কেন তোর? ঘরে যা ! আমাকে নজরদারী করতে হবে না। ‘ রুনু বুবু মাঠিতে হাত-পা ছেড়ে ছেড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। ঘরে ঢোকার আগে আমার গাল ধরে টেনে গেলো। আমি বিরক্ত হয়ে মুখ থেকে- উফফ করে শব্দ করলাম। মা আমার দিকে তাকালেন।আমি খুটি ধরে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাকে বললাম-মুরগি কি ডিম দিয়েছে? মা উঁচু গলায় বললেন- আরেকজন আসছে খবরদারী করতে। যা ঘরে যা।
আমি ঘরে গেলাম না, রান্নাঘরের খুটি ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।ঘুট ঘুটে অন্ধকারে মধ্যে ফয়সাল ভাইয়াকে দেখতে পেলাম। সে ঘরে ঢোকার আগে আমার মাথায় চাটি মেরে গেলো। আমি ফয়সাল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। রাগ করতে শুরু করলাম। ফয়সাল ভাইয়াকে আমার মোটেও ভালো লাগে না। আমাকে দেখতে পেলেই শুধু শুধু মারে আমাকে।
আমাদের ছোট একটি পরিবার।আমরা তিন ভাই বোন। আমি ক্লাস এইটে পড়ি। রুনু বুবু কলেজে উঠেছে। কিন্তু তার স্বভাব এখনো ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া মেয়েদের মতো। ফয়সাল ভাইয়া আর রুনুবুবু একক্লাসেই পড়ে। তবে ফয়সাল ভাইয়া রুনুবুবুর থেকে বয়সে বড়। রুনু বুবু আর ফয়সাল ভাইয়া প্রায়ই ক্লাসে ফেল করে। আমি এখন পর্যন্ত একটি ক্লাসেও ফেল করিনি। তাই আব্বা আমাকে ভালোবাসে।
২.
সন্ধ্যেবেলায় পাশের বাড়ি থেকে ঝুমুরের রুম ঝুম শব্দে আমার আর পড়ায় মনোযোগী হওয়া ওঠে না। আমি চিন্তায় মগ্ন হয়ে ঝুমুরের রুমঝুম শুব্দ শুনি। এ ঝুমুরের শব্দ আসে যার পা থেকে তার নাম মৃণাল।
মৃণালদা দেখতে কিছুটা মেয়েদের মতো স্বভাব-চরিত্রও কিছুটা মেয়েদের ছাপ পাওয়া যায়। মৃণালদা ভালো মানুষ,নরম মনের মানুষ। আমাকে দেখলেই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মৃণালদা মাঝেমধ্যেই আমাদের বাড়িতে আসে। বুবুর সাথে গল্প করে। দাদী এতে তার গাম্ভীর্য প্রকাশ করেন।ভুরু কুঁচকে বলেন,আমার বয়স হয়েছে। আমি কি আর এসব বুঝি? দুদিন পরে যাব কবরে। রুনু বুবু দাদীকে ভেঙচি দেয়। দাদী এতে রেগে যান- রগরগে গলায় মৃণাল দা’কে বলেন ,ছেলেটাও হয়েছে ঢের। হলে রগরগে পুরুষ মানুষ হতি। হয়েছিস পুরুষ মানুষ,ঢং মেয়েদের মতো।
মৃণালদা গলায় আহ্লাদের সুর এনে বলেন,কেন গো?
পুরুষ মানুষ হলে আমায় বিয়ে করতে বুঝি? বুড়ো বয়সে বিয়ে হতো? মৃণাল দা আমাকে বলল,এই শুভ তুই আজ থেকে আমাকে দাদা বলে ডাকবি।
দাদী মুখ ভেঙচি দিয়ে বলেন,উহহহ! মরণ। তা কোন খাতিরে এ বাড়িতে আসিস? বুঝি না বুঝেছিস।
রুনুবুবু, দাদীর উদ্দেশ্য গরম কথা বলে। মৃণাল দা’কে নিয়ে চলে যায়। চলে যাওয়ার মৃণালদা দাদীকে মুখ ভেঙচি দেয়। আমি খিলখিল করর হাসি।
দাদী আমাকে ধমক দিয়ে বলে,তুই হাসছিস কেন
চোখের সামনে থেকে বিদেয় হ?
৩.
ফয়সাল ভাইয়া মৃণালদাকে দু চোখে দেখতে পারে না। মৃণালদা আর ফয়সাল ভাইয়া একই বয়সের। মৃণালদা লেখাপড়ায় ভালো হওয়াতে বাবা প্রতিদিনই ফয়সাল ভাইয়াকে ধমক দিয়ে বলে- যা- গিয়ে মৃণালের পাধোয়া পানি খা। সারাদিন টইটই করে ঘুরবি, বদ ছেলেদের সাথে মিশে বিড়ি-সিগারেট খাবি,লেখাপড়া ভালো হবি কিভাবে? বদ পয়দা করছি একটা।
মৃণালদা বাইরে বসে বাবার কথা শুনে হাসে।ফয়সাল ভাইয়া মুখ কালো করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। মৃণালদাকে হাসতে দেখে দাঁত খিচিয়ে অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বলে, হাটা দেয়। মৃণালদা হাত নাড়িয়ে বলে- আমি আজ হাসতে হাসতে মরে যাব।
৪.
শরতের স্নিগ্ধতা;টিনের চালে ট্যাপড় ট্যাপড় শব্দ। কাঁচা ঘুম ভেঙেছে সবে। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সকাল হতে এখনো অনেক বাকি। মুরগির খোপে মুরগির ডাকাডাকি। আমি চোখ বুজে তন্দ্রার মতো পড়েছি। সকালবেলার ঘুম, মধুর ঘুম। ঘুম ভাঙে যখন,তখন সূর্য উঠেছে সবে। টিনের ফুটো দিয়ে রোদ এসে পড়েছে আমার মুখে। অসহ্য গরম লাগছে। গলাটা ব্যথায় টনটন। পাশের বাড়িতে ভাঙাচোরার শব্দ। হঠাৎই ভেসে আসে কান্নার সুর। আমি ধড়মড়িয়ে উঠি। আব্বা কাঠের দরজা খুলে দৌড়ে যায়। আমিও বিছানা ছেড়ে সদর দরজার সামনে গিয়ে দাড়াই। মৃণালদার গলায় দড়ি। গলাটা লাল হয়ে আছে। মৃণালদার শরীর ঝুলে আছে।হাতের মুষ্টি শক্ত করে লেগে আছে! নিচের চেয়ারটা উল্টে পড়ে আছে। মৃণালদার দিকে তাকাতে পারলাম না। বিভৎস দৃশ্য।
৫.
আব্বাকে কিছুদিন দুশ্চিন্তায় থাকতে দেখা গেলো। মায়ের সাথে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করতে দেখা গেলো। আমি কান পেতে শুনলাম কিছু কথা- এমন ছেলে কেন পয়দা করেছো? সব শেষে এই কাজ? ছিহ! ভাবতেই লজ্জা লাগে৷ আব্বা বসে আছেন বারান্দায়। তার মাথায় হাত। চোখে চশমা। আমি বাবার শরীরে হাত রাখলাম। বাবা ধমকের সুরে বললেন-ভেতরে যা।
বিকেল বেলায় আমি আর রুনুবুবু মৃণালদাদের বাড়িতে গেলাম। মৃণালদার মা মুখে খাবার দাবাড় তুলছে না।রুনুবুবু ভাতের থালা নিয়ে মৃণালদার মাকে ভাত খাওয়াতে গেলো। তিনি কাঁদছেন। পুত্র হারানোর শোক কত বেদনার? এক বুক পাহাড় ধ্বসের মতো? এ পৃথিবীর সব দুশ্চিন্তা, উৎকন্ঠা, দূঃখ মায়ের বুকে। সব মায়েরাই চান, তাদের সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। মৃণালদার মা রুনুবুবুর হাত থেকে ভাত মুখে নিলো। শুধুই সাদা ভাত। তারপর হু হু করে কাঁদতে শুরু করে দিলো।আমারও মন খারাপ হয়ে গেলো। আমার দুচোখে কান্নার জল চলে এলো। কান্না লুকাতে আমি সরে এলাম ওখান থেকে। মৃণালদাদের বাড়ি বেশ বড়। হাটতে হাটতে মৃণাল দার ঘরের সামনে গেলাম। ঘরে উঁকি দিতেই অজানা কারনে গা ছমছম করতে লাগলো।
একটু হেটে সদর দরজার দিকে এগোলাম। বারান্দায় এসে এ দৃশ্যপট দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না। আব্বা মৃণালদার বাবা অনীল কাকুর কাছে হাত জোড় করে মিনতি করছে। আমি অবাক হলাম।
বাবা হাত জোড় করতে করতে অনীল কাকুর পায়ের কাছে পড়ে গেলো-
বাবা কান্নাজড়ানো কন্ঠে বলল,’দাদা আমার ছেলেটাকে মাফ করে দিন। ওর পরিচয় দিতে আমার লজ্জা লাগে। দাদা ওকে থানা পুলিশে দেবেন না। ‘
অনীল কাকু আব্বাকে পায়ের কাছ থেকে তুলে আনলো- হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,’আমার ছেলেটাকে হারিয়েছি। তুমি কি বুঝবে আমার ছেলে হারানোর কষ্ট?।তিনি আব্বাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমার মন আরো খারাপ হয়ে গেলো। আমিও হুহু করে কেঁদে ফেললাম।
বাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে আসলো। ধালাবাসন ভাঙাচোরার শব্দ শোনা গেলো। মৃণালদার মা থালাবাসন ছুঁড়ছে। রুনুবুবুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। রুনুবুবুর কপাল ফেঁটে গিয়েছে। মাকড়শার পায়ের মত রক্ত ছড়িয়ে গিয়েছে কপাল জুড়ে।
৬.
ফয়সাল ভাই মৃণালদার মৃত্যূর সাথে কোন ভাবে জড়িত। ফয়সাল ভাইকে বাড়িতে দেখতে পেলাম না বেশ কয়েকদিন। তার পর একদিন এসে উপস্থিত হলো বাড়ির দরজায়। বাবা তার বানানো মোটা লাঠি দিয়ে ফয়সাল ভাইকে মারলেন। ফয়সাল ভাইয়ের কপাল ফেঁটে গেলো।অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলেন বাড়ির সামনের উঠোনে। রক্ত গড়ালো উঠোন জুড়ে। মা উঠোনে এসে পাগলে মতো কাঁদলেন। ফয়সাল ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হলো।
ফয়সাল ভাই হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরলেন কয়েকদিন পর। তার মাথায় ব্যান্ডেজ। কারো সাথে কথা বলেন না। একদিন বিকেলে উঠোনে বসে আমি আর রুনুবুবু কথা বলছিলাম। হঠাৎ হকচকিয়ে উঠলাম। ফয়সাল ভাই শাড়ি পড়েছেন। কপালে বড় একটি টিপ। বাবা ফয়সাল ভাইকে আবারো মারলেন।
এক বছর পরের ঘটনা,
এভাবে কেঁটে গেলো কতদিন। দুর্গোপূজো এলো। মৃণালদাদের বাড়িতে প্রতি বছর ধুমধাম করে পূজো হয়৷ আমরা যেতাম, কত আনন্দ হতো। মৃণালদা কাশফুল নিয়ে ছুঁটে বেড়াতো। ঢোল বাজাতো। ধুনুচি নাচতো। একদিন সাত-সকাল বেলা আমার ঘুম ভেঙে গেলো। শরৎ এর সকাল। মিষ্টি গন্ধ। টিনের চালে টুপটুপ আওয়াজ। আমি জানলা খুলে বাহিরে তাকালাম। সেই সকালটি ছিলো আমার জীবনের আরো একটি বেদনাময় সকাল। ফয়সাল ভাই ঝুলে আছে ছবেদা গাছে। তার পড়নে মায়ের বিয়ের শাড়ি। আমি কেন যেন অবাক হলাম না। বাবার দোর খোলার শব্দ কানে আসলো। বাবার চিৎকারে জামরুল গাছ থেকে উড়ে গেলো দুটো হলদে পাখি।

*

সে একা 

নিশ্চুপ নীরবতার চারদিকে।ঘোঙর ঘোঙর ব্যাঙ ডাকার শব্দ। এত বড় শহরে ব্যাঙ আছে? এই শোষণ-দুষণের শহরে। ভাবনা থেকে ফিরে আসে রনি।চোখ খুলে তাকায়। সে মশারীতে মধ্যে। মশারি খাটের তুলনায় ছোট। গরমে হাসফাস করে। কিসের যেন একটা বিরক্তি তার শরীরে।
চোখ বুজে থাকে। আবার কিছুক্ষণ পর চোখ খোলে।বাইরে থেকে চাঁদের আলো এসে পড়েছে রৌদ্রের তাপে ফেঁটে যাওয়া কাঠের জানলার ফাক দিয়ে।চাঁদের আলোয় সে মশারীর ফুটো গুনতে থাকে। তার বিভ্রম কাটছে না। রনির এখন খুব করে ইচ্ছে হচ্ছে বারান্দায় গিয়ে চাঁদের আলোয় ফুর ফুর করে সিগারেট টানতে। সে আগে কখনো সিগারেট টানেনি। সে আবারও চোখ বোজে..চোখ বুজে ভাবতে থাকে। এমন যদি হয় সে এখন কবরের মধ্যে? না না.. এমন যদি হয় তার মশারীর ওপরে বড় একটা গোখরো সাপ ফণা তুলে আছে…! না না এ হতে পারে না। রনি চোখ খোলে। মশারীর ওপরে লক্ষ্য করে তার মশারীর ওপরে একটা গোখরো সাপ। সত্যি? বিশ্বাস হচ্ছে না। এ তার ছোট থেকে বড় হওয়ার…ভয়ংকর কল্পনা। এসব নিছক হ্যালুসিনেশন। তবুও মনকে সায় দিতে পারছে না সে। তার দম বন্ধ হয়ে যাচ্ছে।

সে কি মরে যাচ্ছে? কেউ তাকে বাঁচাবে? তার কানে ঝিম শব্দ হয়। তার আশেপাশে ঝিঁঝিপোকা ডাকছে। বিশ্রি রকমের অস্বস্তি লাগছে। রনি হাত পা নাড়াতে পারছে না। সে খেয়াল করছে… কেউ ধীর পায়ে হেঁটে  আসছে। সেই কেউ কে সে জানে…সেই কেউ যদি তার দরজায় এসে কড়া নাড়ে.. সে এই গোলকধাঁধা থেকে মুক্ত হবে। সেই কে রনি জানে..সেই কে রনি নিজেই।

*

নীপবন
রান্নাঘর থেকে চেচাচ্ছেন রহিমা খাতুন। বারান্দায় বসে পত্রিকা পড়ছেন আসগর সাহেব।ঘরে বসে খাটের কোনে বসে আয়ে আলতা দিচ্ছিলো নীলু । শফিক বসে আছে বারান্দার টুলে,সকালের এক ফালি রোদ এসে পড়েছে তার পায়ের কাছে৷ এখন শীতকাল তাই রোদ ভালো লাগছে শফিকের।

রহিমা খাতুন চেচাচ্ছেন আর বাসন-কোসন নাড়াচাড়া করচেন। বাসন-কোসন এবং চেচামেচিতে বিরক্ত হচ্ছেন আসগর সাহেব। তিনি একটু পর পর পত্রিকার পাতা থেকে চোখ সরিয়ে রান্নাঘরের দিকে তাকাচ্ছেন।আবার পত্রিকা চোখ বোলাচ্ছেন।আসগর সাহেব শফিককে বলছে, ‘তোর মামিকে চেচামিচি থামাতে বলতো।আসগর সাহেব আবার পত্রিকায় মন দিলেন। শফিক কৌতূহলী হয়ে বসে রইলো। এতক্ষণ তার মাথায় কোন চিন্তা ছিলো না, কিন্তু এখন নতুন চিন্তা উদয় হয়েছে। নতুন চিন্তা তার মাথায় ঢুকিয়ে দিয়েছে তার মামা। শফিক ভাবছে তার মামিকে চেচামিচি থামাতে বলবে কি না। শফিক একবার তার মামার দিকে এবং পরে রান্নাঘরের দিকে তাকাচ্ছে। তার মুখ জুড়ে রাজ্যের কৌতূহল।
আসগর সাহেব দারুন বিরক্ত হয়ে শফিককে ধমক দিলেন। ধমকে রান্নাঘর থেকে রহিমা খাতুনের চেচামিচি থেমে গেলো। শফিক আচমকা ধমক খেয়ে নির্বিকার হয়ে বসে রইলো। এবার রান্নাঘর থেকে আরো বেশি করে চেচামিচি শুরু করলেন রহিমা খাতুন। আসগর সাহেবও পাল্টা জবাব শুরু করলেন।
এতক্ষণ গুনগুনিয়ে গান গাচ্ছিলো আর পায়ে আলতা দিচ্ছিলো নীলু। বাবা-মায়ের বাক যুদ্ধে মনোযোগে বিঘ্ন ঘটলো নীলুর। বেখেয়াল বসত হাতের স্পর্শে আলতার বোতল পড়ে গেলো মেঝেতে। মেঝেতে আলতা গড়াচ্ছে। লাল রঙা হয়ে গেছে মেঝে। যেন রক্ত,কেউ রক্তাক্ত হয়েছে। নীলুর ভীষণ মেজাজ খারাপ হয়ে গেলো। নীলু ঘর থেকে বেরিয়ে বাবা-মায়ের উদ্দেশ্যে রাগী গলায় কথা বলে আবার ঘরের ভেতরে চলে এলো। নীলুর ভীষণ মন খারাপ হয়েছে। আলতা গড়িয়েছে মেঝেতে। নীলুর চোখে গড়িয়েছে জল।

২.
একটি সড়ক দূর্ঘটনায় শফিক তার বাবা মাকে হারায়। তখন শফিকের সাত বছর বয়স। শফিকের আশ্রয় হয় তার মামার বাড়িতে। আসগর সাহেব তার ভাগ্নেকে নিজের ছেলের মতো মানুষ করেন। ছোটবেলা থেকে শফিককে আদর স্নেহ দিয়ে বড় করে তুলেছেন। শফিককে লেখাপড়া করিয়েছেন। কোন কিছুতে ত্রুটি-বিচ্যুতি করেননি তিনি।
শফিক লেখাপড়া শেষ করেছে এলাকার কলেজ থেকে। চাকরী পাচ্ছে না বেচারা।চাকরীর জন্য চেষ্টাও করেছে।ঢাকায় গিয়েছে, কিন্তু চাকরী জোগাড় করতে পারেনি। সেদিন বিকেল বেলায় শফিক বাজার থেকে নীলুর জন্য আলতা আর কাচের চুড়ি নিয়ে এলো। নীলুর মন খারাপ কেটে গেলো।নীলু ঠোট কেটে শফিককে বলল,’এসব আনার কি দরকার ছিলো? আপনি টাকাগুলো জমিয়ে আপনার প্রেমিকাকেই কিছু কিনে দিতে পারতেন’। গভীর রাতে নীলু ডায়েরি খুলে বসলো। নীলু লিখছে-
‘শফিক ভাই! আপনাকে ধন্যবাদ। জানেন আপনি যখন আজ আমার জন্য আলতা আর কাচের চুড়ি নিয়ে এলেন। আমি দারুন খুশি হয়েছি।আপনি জানেন আপনার জন্য আমার অন্য এক অনূভুতি হয়। এ অনুভূতি ভাষায় প্রকাশ করার না। আপনি জানেন আমি আপনাকে ভালোবেসে ফেলেছি।আপনার গালে যখন খোচা খোচা দাড়ি উঠে তখন আপনাকে দেখতে খুব সুন্দর লাগে? শফিক ভাই আমি আপনাকে ভালোবাসি। ‘
নীলু ডায়েরি লেখার পরে বেশ কিছুক্ষণ ডায়েরি পড়লো।লজ্জায় তার মুখ লাল হয়ে গেলো। সে ডায়েরির লেখা কেটে দিলো।
শফিক খাতা পত্র উল্টাচ্ছিলো। কোথায় যে রেখেছে টাকা গুলি সেগুলোর হদিস পাওয়া যাচ্ছে না।শফিক ক্ষীণ গলায় বলল,’ধুর! আজকাল কোথায় যে কি রাখি। শফিক বইপত্র উল্টাতে উল্টাতে একটা খাম পেলো। তড়িঘড়ি করে খামটি খুললো। ভেবেছিলো এটার বোধয় টাকার খামছিলো। শফিক চিঠিটা ফেলে দিলো। একপর্যায়ে শফিক টাকাগুলো পেলো। কিছুক্ষণ পরে শফিকের খেয়াল এলো একটা চিঠি পড়ে আছে মেঝেতে।শফিক চিঠিটি মেঝে থেকে তুলে নিয়ে পড়তে শুরু করলো,শফিকের দুজোড়া ভুরু কুচকে আছে।
নীলু কলেজ থেকে ফিরে এসে হণ্যে হয়ে ডায়েরি খুজছে। কিন্তু তার ডায়েরি খুজে পাচ্ছে না। বিছানা উল্টাচ্ছে, বালিশ উল্টাচ্ছে। তবুও পাওয়া যাচ্ছে না ডায়েরিটা।

৩.
বাজার থেকে ফিরেছে শফিক। সে দারুন ক্লান্ত। বাজারের ব্যাগ রান্না ঘরে দিয়ে শফিক তার নিজের ঘরে চলে গেলো৷ নীলুর ডায়েরি পাওয়া গিয়েছে। নীলু তার ঘরে বসে ডায়েরি লিখছি।যেসব কথা কাউকে বলা যায় না, সেসব কথা নীলু ডায়েরির পাতায় তুলে রাখে৷ এতে সে দারুন আনন্দ পায় ৷
সকাল হয়েছে! মোরগ ডাকছে। কুয়াশায় মাখা চারপাশ। বেলা বাড়লো৷ শফিককে ঘরে পাওয়া গেলো না।
জীবনে অনেক কথা থাকে যেগুলো লেখা যায় না,কিংবা কাউকে বলাও যায় না৷ খুব কাছের কেউ? বাবা,মা কিংবা বউ৷ এই কথা কাউকে বলা যায় না। এই না বলা কথা একসময় পোড়ায়। ভেতরটা পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দেয়৷ মাঝরাতে যেমন ক্ষুনপোকা কটরকটর করে কাঠ কাটে৷ ঠিক তেমনি জীবন বিরহের পোকাগুলোও সময় কেটে নেয়,রাত জাগায়,চোখের নিচে কালি ফেলে দেয়। এই কথা কাউকে বলা যায় না,তিলে তিলে জ্বলতে হয়। এই কথা খুব গোপন৷ খুব খুব খুব গোপন। নীলু এই কথাগুলো ডায়েরিতে লিখলো। লিখে আবার কেটে দিলো। পৃষ্ঠা ছিড়ে আগুন দিয়ে পুড়িয়ে দিলো।
টিনের চালে টপ,টপ শিশির ফোটার আওয়াজ। নীলুর চোখ থেকে জল গড়ালো। দুদিন পার হয়ে গেলো শফিককে আর খুঁজে পাওয়া গেলো না। এভাবে কেটে গেলো কতদিন।
পাঁচ বছর পরের ঘটনা,নীলুদের বাড়ির সামনে একটি সাদা রংয়ের প্রাইভেট কার দাঁড়িয়ে আছে।সন্ধ্যে হয়েছে। মশাদের দল ভন ভন আওয়াজ শুরু করেছে। নীলু বসে আছে খাটের কোনে। পায়ে আলতা দিচ্ছে। হঠাৎ নীলুর মা নীলুর ঘরে এসে নীলুকে ডাক দিলো। নীলু আচমকা চমকে গেলো। হাতের ধাক্কায় আলতার রঙ মেঝেতে গড়ালো।
নীলুর মা নীলুকে বলল,’ও নীলু শোন! দেখে যা কে এসেছে!” নীলু আলতা মাড়িয়ে ঘর থেকে বের হলো মেঝেতে পায়ের লাল রঙা ছাপ পড়ে রইলো মুখ থেকে অস্ফুটস্বরে বলল, ‘শফিক ভাই! ‘
পাঁচ বছর পরে শফিক আবার বাড়িতে ফিরে আসে। শফিক সেদিন নীলুর ডায়েরিটা শফিক তার ঘর থেকে নিয়ে লুকিয়ে পড়েছিলো। নীলুর এমন আবেগকে প্রশ্রয় না দিতে সেদিন কুয়াশা মাখা ভোরে শফিক বাড়ি ছেড়ে ঢাকায় এসেছিলো। আজ পাঁচ বছর পর শফিক বাড়িতে ফিরে এলো।শফিক শুধু একা ফেরেনি শফিকের সাথে ফিরেছে শফিকের বিবাহীত স্ত্রী এবং তাদের সন্তানকে নিয়ে।
শফিক তার মামার খাটের কোনে বসে আছে৷ শফিকের স্ত্রী তার মামীর সাথে রান্না ঘরে সাহায্য করছে৷ শফিকের ছেলে তার মামার কোলে হুটিপুটি করছে। আসগর সাহেব আজ দারুন খুশি।
আনীলু তার ঘরে বসে আছে সন্ধ্যে মিলিয়ে আসছে। নীলু কদম ফুলের ঘ্রান পাচ্ছে। এখন শীতকাল, কদম ফুল ফোটার কথা না৷ তবুও পাচ্ছে,নীলুর চোখ ভীজে আসছে৷ সে কাঁদছে নিরবে নিভৃতে।

*

ছোকড়া

রোদ্রের উজ্জ্বলতা তীব্র৷ প্রবাহীত কীর্তনখোলা সূর্যের আলোয় চিক চিক করছে৷ নদীতে চলছে ছোট বড় স্টীমার লঞ্চ আর ট্রলার। লঞ্চঘাট এখন জনশূন্য৷ সন্ধ্যে হলেই মানুষের পদধূলি বাড়তে থাকে এখানে।কত মানুষ আসে যায়! কেউ কেউ আসে বিদায় দিতে, কেউ যায় বিদায় নিয়ে। রাত নটা বাজতেই লঞ্চগুলো সাইরেন বাঁজিয়ে চলে যায়৷ আবার জনশূন্য হয়ে পড়ে লঞ্চঘাট। দিনে চলাচল করে ছোট লঞ্চগুলো। যাকে স্থানীয় ভাষায় বলে টেডি লঞ্চ। এইগুলো ছেড়ে যায় ভোলা,ঝালকাঠির উদ্দ্যেশ্যে। মানুষ গন্তব্যে ছুটছে! কেউ আসছে, কেউ যাচ্ছে। কুলিরা কেউ কেউ মাথায় জিনিস পত্র বহন করছে।কয়েকটা ছোট ছোট ছেলে পুলে নদীতে ঝাপাঝাপি করছে!

এই বাদেম! বাদেম! লইয়া যান বাদেম! খাইয়া লন বাদেম-
লঞ্চঘাটে বসে বাদাম বিক্রি করছে রহমত মিয়া।তার পাশে ভিক্ষা করছে মঞ্জুর আলী। চৈত্রমাস মাথার উপর সূর্যটা খাড়া হয়ে আছে।পল্টুন থেকে তাপ উঠছে।বড় বড় দালানের ন্যায়ে লঞ্চগুলো পল্টুনের সাথে নোঙর করা। এখন মোটামুটি শান্ত লঞ্চঘাট৷ সন্ধ্যে হওয়ার সাথে সাথে এখানে ভীড় বাড়তে থাকে। রাত নটা থেকে লঞ্চগুলো সারিবদ্ধভাবে একে একে ছুটে চলে রাজধানীর উদ্দ্যেশ্যে।
জোয়ার এসেছে। জোয়ারের পানিতে বরিশালের বুক চিরে যাওয়া কীর্তনখোলা ফুলে ফেঁপে উঠেছে। পল্টুনের এক কোনে বসে টাকা গুনছিলো মঞ্জুর আলী।একজনকে আসতে দেখে মঞ্জুর আলী টাকা গুলো লুঙ্গির আড়ালে লুকিয়ে ফেললো।গলাটা একটু কেঁশে বলল,’ভাইজান কিছু দিয়া যান। আল্লায় আমনের ভালো হরবে। ‘ ভদ্রলোকের চোখের চশমা। চশমা খুলে পকেটে হাত দিয়ে মানি ব্যাগ বের করে টাকা খুঁজতেই আরেকটা ছোট হাত তার সামনে এলো। ‘স্যার!মোরেও কিছু দ্যান। ‘ ভদ্রলোকের মানিব্যাগে খুচরো টাকা নেই। একশো টাকার একটি নোট বের করে মঞ্জুর আলীর কাছে দিয়ে বলল,’ আপনার কাছে খুচরো পঞ্চাশ টাকা আছে? ‘ মঞ্জুর আলী বিষাদ জড়িত কন্ঠে বলল,’হইব না বাজান! সকাল থেইকা তেমন ভিক্ষ্যা পাই নাই ‘ পাশ থেকে ছোট হাতটা বলছে,’স্যার মোরে দেন না৷ খাই নাই কিছু। দেন কিছু।দুইডা খাওন খাই। ‘ ভদ্রলোক বিরক্তের সুর এনে বলল,’আহ! দিচ্ছি তো৷ একটু সবুর করা যায় না? টাকা একা নিবি নাকি?’
ভদ্রলোক এক পর্যায়ে বিরক্ত হয়ে টাকাটা মঞ্জুর আলীর কাছে দিয়ে বলল,’এই একশ টাকা রাখুন। দুজনে পঞ্চাশ পঞ্চাশ করে ভাগ করে নেবেন। ‘ মঞ্জুর আলী মাথা ঝাকিয়ে বলল,’আচ্ছা! স্যার।আল্লায় আফনার ভালো হরুক ‘
২.
নদীর পানি পল্টুনে ছলাৎ ছলাৎ করে বাড়ি খাচ্ছে। দক্ষিন দিক থেকে ঠান্ডা বাতাস আসছে। ছেলেটার পড়নে হাফপ্যান্ট। তাকে এর আগে কখনো লঞ্চঘাটে দেখেনি মঞ্জুর আলী। মঞ্জুর আলী এই পল্টুনে ভিক্ষা করে প্রায় দুই বছর। কত ভিক্ষুক এলো গেল তারা কেউ টিকলো না। মঞ্জুর আলী টিকে গিয়েছে। তার মতে, এই লঞ্চঘাটে ভিক্ষা করে এক ধরনের শান্তি আছে। কত মানুষ আসে যায়। রোজগার ও ভালো হয়।
মঞ্জুর আলি টাকা গুনে ছেলেটার দিকে তাকিয়ে বলল,’নাম কি? ‘ ছেলেটা মৃদূ হেসে বলে,’নাম দিয়া কাম কি?’ মঞ্জুর ফিসফিসিয়ে কি যেন বলে। কমল বুঝতে পারে,’এইরকম বাজে কথা কইতে নাই। উপর ওয়ালা পাপ দেয়। অহন মোর ট্যাহা কয়ডা দেন। ‘ মঞ্জুর আলী ছেপ দিয়ে দুই টাকার নোট গুনতে গুনতে বলে,’আগে নাম ক। ‘ ছেলেটা বলে,’কমু আনে। আগে ট্যাহা কয়ডা দেন। ‘ মঞ্জুর আলী টাকা গোনা বন্ধ কইরা বলে, ‘হোন! তোরে একটা কথা কই৷ তোরে আমি পঞ্চাশ না। একশ ট্যাকা দিমু। তুই এই লঞ্চঘাট দিয়া কাইট্টা পড়বি। ‘ ছেলেটা ভুরু কু্ঁচকে বলে,’এই লঞ্চঘাটের মালিক কি আফনে? নাকি আফনার বাপে। ‘ এতটুকু ছেলের এমন কথায় মঞ্জুর আলী অপমানিত বোধ করে। সে রেগে চড় দেয়ার জন্য হাত উঠিয়ে বলে,’এক্কালে এমন একটা থাপ্পড় দিমু ছিটকা যাইয়া নদীতে পইরা ভাইসা যাবি। ‘
ছেলেটা পাল্টা জবাব দিয়ে বলে,’ভাইসা যামু ক্যা? মুই হাতার জানি। হাতরাইয়া কূলে উইঠ্যা হেরপর আমনেহরে…’ ‘হেরপর কি? মারবি আমারে? ‘,ক্ষিপ্ত হয়ে বলে মঞ্জুর আলী। তোর ট্যাহা দিমু না। যা করবি কর যাইয়া। ‘
‘দেবেন না তো? আইচ্ছা লাগবো না।’ ছেলেটা উঠে হাটা দেয়৷ হঠাৎ করে পিছন ফিরে একশ টাকার নোটটা মঞ্জুর আলীর লুঙ্গির নিচ থেকে ছোঁ মেরে দৌড় দেয়। এক দৌড়ে সে লঞ্চঘাটের বাইরে চলে আসে।
মঞ্জুর আলী মুখ কালো। সে উদাস হয়ে বসে আছে। আজকে কার মুখ দেখে ঘুম থেকে উঠেছিলো সেটা নিয়ে সে দারুন চিন্তিত। অবশ্যি প্রতিদিন লঞ্চঘাটে কত মানুষ আসে যায়। তাদের মুখ দেখে চিনে রাখে সম্ভব না।
এই নতুন বাঁদর ছেলেটাকে নিয়েও সে দারুন চিন্তিত। ছেলেটি শুধু বাঁদর না। হারামির ঢেড়। কোথা থেকে হাজির হয়ে টাকা নিয়ে ছোঁ মেরে দৌড়ে পালালো। একবার হাতের কাছে পেলে কনুই দিয়ে এমন মাইর দেবে মাইরের নামে তার বাপের নাম ভুলে যাবে এমন অবস্থা হবে। বরিশালের ভাষায় এই মাইরের নাম,’ঘোডা কেনু। ‘
৩.
বৃষ্টিস্নাত সকাল! আকাশে মেঘ ডাকছে। টিকিট কাউন্টারের এক কোনে শুয়ে আছে মঞ্জুর আলী। এই ঠান্ডা ঠান্ডা আবহাওয়ার মধ্যেও তার কেন যেন গরম লাগছে। সে হঠাৎ করে লক্ষ্য করলো তার ছেড়া কাঁথার মধ্যে সে একা না। আরো একজন আছে। গতকালকের সেই দুষ্ট ছোকরা। সকাল সকাল মঞ্জুর আলীর এই ছোকরার মুখ দেখে ঘুম ভেঙেছে বলে সে মুখে বিড়বিড় করে কী যেন বলল।
তার এখন প্রচন্ড ইচ্ছে করছে এই ছোকরাটাকে হারামজাদা বলে কান ধরে টেনে ঘুম থেকে ডেকে তুলতে। আবার কেন যেন সেই ইচ্ছাও মরে গিয়েছে। আহ! ছেলেটা কী মায়া মায়া মুখ। ঘুমাচ্ছে ঘুমাক না। মঞ্জুর আলী উঠলো। ছেলেটার গায়ে কাঁথা জড়িয়ে দিলো। ছেলেটি কাঁথার সবটুকু অংশ গায়ে টেনে নিলো পরম মমতায়।
মঞ্জুর আলী ছেলেটাকে জিজ্ঞেস করলো,’রাত্তিরে বাড়িত যাস নাই?’ ছেলেটি পাউরুটি মুখে পুরতে পুরতে জবাব দিলো,’বাড়ি থাকলে তো যামু। ‘ মঞ্জুর আলি কতক্ষণ ঝিমিয়ে বললেন,’তোর নামডাও তো কইলি না? বাড়ি কই? আইছস কই দিয়া?’ ছেলেটি বলল,’বাড়ি রাঙ্গাবালি! ‘ মঞ্জুর আলী বললেন,’তাইলে আইজক্যা থেইকা তোরে মুই রাঙ্গা কইয়া ডাকমু। তোর আপত্তি নাই তো?’ পাউরুটির পুরোটা শেষ করে বলল,’নাই। ‘
-মঞ্জুর আলী বলল,’তোর বাড়িত কে আছে?’
-‘কেউ নাই’,বলল ছেলেটি।
-ছেলেটি বলল,’আমারে মায়ে ডাকত কমল।’বাপে ডাকত ‘কামাল’ দাদী ডাকত, ‘কমলা। ‘বন্ধুবান্ধবে, ‘কামলা। ‘
মঞ্জুর আলী হাসলেন। ‘গাও গেরাম,বাপ মা ছাইড়া আইলি ক্যা? তোর বয়স তে বেশি না। বাপ-মায়ের লগে ঝগড়া কইরা আইছোস?’ কমল হঠাৎ করেই থমকে গিয়ে বলল,’চাচার লগে আব্বার জায়গা জমি লইয়া ঝামেলা হইছিলো। একদিন ঝামেলা করতে করতে বাপে চাচার উপরে দাঁ নিয়া উঠে। আর চাচা উঠে কুড়াল নিয়া৷ এর মধ্যে দাদী আইয়া হেগোরে ঠ্যাহাইতে যাইয়া গলায় কোপ খাইয়া ঐ যায়গায় মইরা যায়। হেইরপর পুলিশ আইয়া বাপের ধইরা লইয়া যায়।বাপের জেল হয়। হেইর কয়দিন পর মায়ের আরেক জায়গায় বিয়া হইয়া। মায়ের যার লগে বিয়া হইছে৷ হেই লোক আমারে তাড়াইয়া দিছে।মাও তাড়াইয়া দিছে। ‘
মঞ্জুর আলী চোখে হঠাৎ করেই জল এসে যায়।আহহারে কি জীবন! এখন যাবি কই? খাবি কি? ছেলেটি বলে,’জানা নাই। উপরে জিনি আছেন তিনি দেখবেন। ‘। সে ছেলেটিকে বুকে জড়িয়ে ধরে। কাইল্ক্যা তোর লগে মন্দ ব্যবহার করছি। তুই ক্ষমা কইরা দে আমারে। ‘ছেলেটি বলে, ‘আফনে এই কথা কেন কইতাছেন? আফনে আমার দাদার মতো। আইজক্যা থেইকা আমি আফনারে দাদা কইয়া ডাকুম।’
সময় গড়ায়! কীর্তনখোলা বয়ে চলে। নিয়ম করে পদুচারণায় মুখর হয়ে ওঠে লঞ্চঘাট। আবার শান্ত হয়,নিরিবিলি হয়ে যায়। দিন গড়িয়ে রাত হয়। রাত গড়িয়ে সকাল। কারো জন্য নতুন সকাল, কারো জন্য একঘেয়েমিতার,কারো কাছে ভাগ্য বদলের । আবার কারো কারো কাছে এই সকালের কোন অর্থ নেই।অর্থহীন টিকে থাকার সকাল!

*

আলোর ইশকুল 

বাইরে রোদ। তাপে খাঁ খাঁ করছে সব । পলাশ হাতে ছাতা নিয়ে হেঁটে যাচ্ছে। রোদে গা পুড়ে যাচ্ছে। সে আগে জানতো শুকনো মানুষের গায়ে গরম লাগে না। এই ধারণা ভুল। শুকনো মানুষের গরম লাগে।

হাঁটতে হাঁটতে রাস্তায় পলাশ  একটি স্লেট দেখতে পায়। স্লেটটি মাটি থেকে হাতে তুলে নেয়। স্লেটে লেখা- “ই”। পলাশ ভুরু কুঁচকে তাকায়। আশপাশটা দেখে নেয়। আশেপাশে কেউ নেই। আরেকটু হেঁটে যাওয়ার পরে সে আরেকটি স্লেট পায়। তাতে লেখা “শ”। এভাবে হেঁটে যাওয়ার পরে সে পর পর আরও দুটি স্লেট পায়। স্লেট গুলো এক করলে একটি শব্দ দাঁড়ায়। ” ই শ কু ল “। পলাশ খানিকটা অবাক হয়। চিন্তামগ্ন হয়ে ছাতা বুজিয়ে ফেলে। দুপুর বেলার কটকটে রোদ এসে পড়ে তার মুখে। সে বাম হাত চোখের ওপর দিয়ে তাকিয়ে থাকে।

আরেকটু হাঁটলেই একটা গলি। গলির মাথায় পলাশ একটি বাড়ির চিলে কোঠায় থাকে। পলাশ হেঁটে হেঁটে গলির মুখে ঢুকতেই। ফিস ফিস শব্দ পায়, ‘এই আইছে আইছে…’ একদল কচিকাঁচা এসে তাকে ঘিরে ধরে… এক সাথে  সবাই মিলে সালাম দেয়। আসসালামু আলাইকুম। পলাশ সালামের উত্তর দেয়। সবগুলো ছেলে মেয়েই পথশিশু। ছোট ছোট দু-একটা উলঙ্গ বাচ্চাও আছে।

ভীড়ের মাঝ থেকে বের হয়ে আসে একজন…সে বলে,’স্যার আমগো সবাইরে লেখাপড়া শিখাইতে হইবো’ সবাই একসাথে বলে- শিখাইতে হইব, শিখাইতে হইবো। স্যার আমরা সবাই স্কুলে যাইতে চাই….”হ হ আমরা সবাই স্কুলে যাইতে চাই” পলাশ ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে…পেটের অসহ্য ক্ষুধা আর রোদ সয়ে যায় তার শরীরে।

পলাশের বিভ্রম হয়..সে দেখতে পায় ছেলেগুলোর ভেতর থেকে আলো বের হচ্ছে। তারা পলাশের কাছে আলোর ইশকুল চাচ্ছে৷

*

প্রতিক্ষা 
পাবলিক লাইব্রেরির সিড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে ছেলেটির সাথে দেখা হয় তার। লামিয়ার হাত থেকে মোবাইল ফোনটি পরে গিয়ে.. ভেঙে যায়। শখের মোবাইল ফোনটি ভেঙে যাওয়ায় লামিয়ার মাথা গরম হয়ে যায়… লামিয়া চেঁচিয়ে উঠে বলে.. চোখ কি ব্যাগে ঢুকিয়ে রেখেছেন নাকি? নাকি চোখের মাথা খেয়েছেন? ছেলেটি আদ্র কন্ঠে বলে..সরি।আসলে আমি দেখতে পাইনি। লামিয়া চেঁচিয়ে উঠে বলে….তা দেখবেন কেনো? মেয়ে দেখলে মাথা ঠিক থাকে নাকি। ছেলেটি লামিয়ার মোবাইল ফোনটি মেঝে থেকে তুলে লামিয়ার দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়।
ফোনটি হাতে নিয়ে হন হন করে হাঁটা দেয়..
ছেলেটি অস্ফুট সুরে বলে…”ছ্যাঁচড়া কোথাকার!”
লামিয়া শুনেও দমে যায়। রাগ নিয়ন্ত্রণ করে। রাস্তায় গিয়ে রাগ ঝাড়ে বান্ধবীর সাথে। মেজাজ খিটখিটে হয় যায়..।
বসন্তের লাল নীল দুপুর পেরিয়ে চৈত্রের দাবদাহে জ্বলছে রাজপথ। হাতে সিগারেট আর ঝাকড়া চুল নিয়ে হাঁটছে সে। কিছুক্ষণ পর পর সিগারেট মুখে ওঠা নামা করছে। তার শরীর খারাপ লাগছে। হাতের সিগারেট ফেলে দিয়ে ইচ্ছে করছে। সে হাতের সিগারেট ফেলছে না।
ইটের টুকরো তে হোঁচট খায় সে। প্যান্টের লেগে সিগারেটের আগুন পড়ে যায়। পকেট থেকে লাইটার বের করতে করতে তার নজর যায় রাস্তার দিকে। একটি মেয়ে কানে ফোন চেপে রাস্তা পার হচ্ছে। ঠোঁটে চাপা সিগারেট পরে যায়। চেঁচিয়ে উঠে বলে,এইইইই….। মেয়েটির দিকে ধেয়ে আসছে একটি ব্যাটারি চালিত রিক্সা।
রিক্সার সাথে ধাক্কা লাগে মেয়েটির। রাস্তায় লুটিয়ে পরে। রিক্সাওয়ালা রিক্সা নিয়ে পালিয়ে যায়। ছেলেটি দৌঁড়ে যায়। মেয়েটি বাজে ভাবে আহত হয়েছে। ফোনের স্ক্রিন ফেঁটে গিয়েছে। কপাল থেকে রক্ত ঝরছে।
পাঁচ বছর পরের ঘটনা, আজ লামিয়ার বিয়ে। পারিবারিক ভাবে বিয়ে হচ্ছে না তাদের। তারা দুজন পালিয়ে বিয়ে করছে। আজ তার স্মৃতি মনে পড়ার দিন। কত স্মৃতি.. পাবলিক লাইব্রেরির ঘটনা? কিংবা রিক্সায় ধাক্কা লাগার ঘটনা। লামিয়া মুচকি হাসে..!
এই রাস্তাটি শহরের অন্যতম ব্যস্ত রাস্তা, রাস্তার ওপাশ থেকে আসছে ঝাকড়া চুলের ছেলেটি। তার হাতে ছোট্ট একটি বাক্স। রোদের আলোয় ঝলমল করছে সেটি। .. ছেলেটি রাস্তা পার হতে যাচ্ছে। গিফটের ঝলমলে আলো চোখে যায়।
রাস্তার ওপাশ থেকে একটি মালবাহী ট্রাক চলে যায়। ট্রাকে বাড়ির আসবাবপত্র।একটি ড্রেসিংটেবিলের আংশিক খোলা। সূর্যের আলো এসে পরে ড্রেসিং টেবিলের খোলা অংশের ওপর। প্রতিফলিত আলো পরে ছেলেটির মুখে। হঠাৎ আলোর ঝাপটায় চারদিক অন্ধকার দেখে সে। রাস্তার মাঝখানে আসতেই একটা মাইক্রোবাস ধাক্কা দেয় তাকে। সে মাটিতে লুটিয়ে পরে… লামিয়া দৌঁড়ে আসে। সে রাস্তা পার হতে পারছে না..রাস্তায় গাড়ি ছুটে যাচ্ছে সাই সাই করে। ছেলেটি রক্তাক্ত হাত বাড়িয়ে দিয়েছে…সে লামিয়ার হাত ধরবে বলে।

*

সংবেশন

সৌর সাহেব.. আপনি কখনো সম্মোহনে বিশ্বাস করেছেন? সৌর চুপ করে ভাবতে থাকে.. তার মাথায় সৌরজগতে অদ্ভুত চিন্তাভাবনা ঘুরতে থাকে। সম্মোহন… এ আবার কি জিনিস? সৌর কিছুক্ষণ চুপ থেকে উত্তর দেয়…সম্মোহন কি? ওপাশ থেকে অট্টহাসি ভেসে আসে। সম্মোহন কি সেটাই জানেন না? সম্মোহন হলো সংবেশন। যাক গে এত কঠিন কথা বুঝবেন না… সম্মোহন হলো..এই যে আমি আপনাকে প্রভাবিত করছি। আপনি চাইছেন আপনি এখান থেকে উঠে চলে যাবেন। আপনি পারছেন না। কারন আমি আপনাকে প্রভাবিত করছি। সৌর থতমত খেয়ে বলে..ভাই আপনি মজা করছেন না?

ওপাশের ব্যক্তিটি- হা হা হা, অট্টহাসি দেয়। আপনি সম্মোহিত হয়েছেন..আপনি পারলে এখান থেকে উঠে চলে যান। সৌর’র শরীর উঠে যেতে চাচ্ছে। তার মন সায় দিচ্ছে না। তার মন বলছে এখান থেকে উঠে গেলে ওপাশের ব্যক্তিটি অট্টহাসি দেবে। সৌরকে বোকা বানাবে। মজা করবে তাচ্ছিল্য করবে। লোকটি আবারও অট্টহাসি দেয়.. আপনি পারলে এখান থেকে উঠে যান তো। সৌর বসে থাকে.. তার খুব ইচ্ছে হচ্ছে এখান থেকে চলে যেতে.. তার আশেপাশে সব কিছু অপ্রকৃতস্থ লাগছে। কিচ্ছু ঠিক নেই। লোকটি আবারও তাকে বলে..আচ্ছা যান আপনাকে শেষ একটা প্রশ্ন করি…আপনি জানেন ওয়ার্মহোল কি? সৌর বলে- আমি জানি না। সৌর বলে আমি এখান থেকে চলে যেতে চাই। লোকটি বলে.. আপনি এখান থেকে চলে যেতে পারবেন না। আপনি ওয়ার্মহোলে আটকে গিয়েছেন।তবে ওয়ার্মহোলে কি আটকে যাওয়া যায়? কে জানে…।সৌর তার শরীরের সব শক্তি দিয়ে উঠে দাঁড়ায়। দৌঁড়ে গিয়ে রুমে ঢুকে খাটে শুয়ে থাকে… তার শরীরের প্রচন্ড জ্বর আসতে থাকে।
সকাল হয়..জ্বর সেরে যায়। মেস ম্যানেজার আসে। বলে,আপনাকে আর একা একা থাকতে হবে না মশাই। আপনার নতুন রুমমেট জোগাড় হয়েছে। লোকটি শুকনো..গাল ভাঙা। চোখে চশমা.. লোকটি সৌরকে সালাম দেয়। লোকটির কন্ঠস্বর সৌর গত রাতে শুনেছিলো।

 *
মিছিল
বৈশাখের সন্ধ্যা। আকাশে কালো মেঘ করেছে। ওমর দ্রুত পায়ে হাঁটছে। পায়ের জুতোটা হঠাৎ করেই ছিঁড়ে গেলো। জুতোটা হাতে করে সে হাঁটতে লাগলে। বাতাসে ঠান্ডা গন্ধ…ঝড় শুরু হবে। ওমর হাঁটছে…হাঁটতে হাঁটতে এবার দৌঁড় দিলো..তার পিছনে আলোর মিছিল ধেয়ে আসছে।  মিছিল তাকে ধরতে চাইছে… সে মিছিল থেকে বাঁচতে চাইছে। এই লোকগুলো তাকে ধরতে পেলে আস্ত রাখবে না৷ লোকগুলো তার খুব কাছে চলে এসেছে। ঝড় শুরু হয়ছে…ঝড়ে মিছিল দমছে না।
ঘুম ভেঙে গেলো দুঃস্বপ্নে। ওমর জেগে দেখলে তার দরজায় কড়া নাড়ছে কেউ। ওমর উঠে দরজা খুলে দিলো। দরজা খুলতেই সে ভিতরে এসে বললো…সেকি? তুই এখনো ঘুমাচ্ছিলি? মিছিলে যেতে হবে না?
কারণ?
বাইকের লুকিং গ্লাসে নিজের মুখটা দেখে নিল একবার। মাথার চুলগুলো আঙুল দিয়ে ঠেলে নিল সে। এবার বাইকে স্টার্ট দিলো। বাইক চালিয়ে রওনা হলো শহরের দিকে। শহর থেকে ওষুধ কিনে সে যাবে উত্তর পাড়ার দিকে।
শহরে মানুষজন খুব একটা নেই৷ দোকানে শার্টারগুলো সব আধখোলা। সোজা রাস্তায় চোখ বাড়ালে দেখা যায় রাস্তার মোড়ে টায়ার জ্বলছে। শহর কি কোন কারণে উত্তপ্ত? কোন কারণে? ঘটনাটা কি? বাইক থেকে নেমে নিচু হয়ে ডিসপেনসারির ভেতরে ঢোকে সে। ডিসপেনসারির গ্লাস ভাঙা। কর্মচারীরা গ্লাস কুড়োচ্ছে৷ ডাক্তার মাথায় হাত দিয়ে বসে। সে জিজ্ঞেস করলো…কি হয়েছে শহরে? ডাক্তার মুখ তুলে তাকালো..! তার মুখ কালো। কর্মচারীরা তাকে বলল,’আপনে এখন যান তো ভাই। মন মেজাজ ভালা নাই।’ সে দোকান থেকে বেড়িয়ে এসে অন্য ডিসপেনসারিতে ঢোকে। সেখান থেকে ওষুধ নেয়। ওষুধ নিয়ে রওনা হয়.. উত্তরপাড়ার দিকে। উত্তরপাড়ায় যেতেই ব্রিজের গোড়ায় তার বাইক থামায় একজন। “তার চোখে মুখ ভয়ার্ত” সে বলে… “মুন্না ভাই! আপনি ওদিকে কোথায় যাচ্ছেন?”
ওদিকে যাবেন না৷ ওদিকের অবস্থা খারাপ। সবাই ক্ষেপে আছে৷ আপনি বাড়িতে যান। চোখ থেকে সানগ্লাস খুলে সে বলে.. কেন কি হয়েছে ওদিকে?
ভয়ার্ত গলায় ছেলেটি বলে, “দাঙ্গা লেগেছে ভাই। দাঙ্গা লেগেছে৷ আপনি বাড়িতে যান৷ ওদিকে যাবেন না। ” এই বলে ছেলেটি দৌড়ে গেলো। মুন্না ঠায় দাঁড়িয়ে রইলো। তার হাতের ওষুধ গুলো ওপাড়ার এক বৃদ্ধের খুব দরকার৷

*

আলোর মশাল
চারদিকটা অন্ধকার হয়ে গেলো নিমিশেই। লোডশেডিং। সে রাগ চেপে বলল,”ধুর এই সময়ে লোডশেডিং কেন হলো?” সে হাতরে হাতরে দিয়াশলাইয়ের বাক্স খুঁজছে। টেবিল,ড্রয়ার,বালিশের পাশে, রান্নাঘর। কোথাও দিয়াশলাই পাওয়া যাচ্ছে না। আজ শহর উত্তপ্ত। মাঝেমধ্যে দু একটা গুলির শব্দ কানে ভেসে আসে। হাসান দাঁড়িয়ে আছে জানলার পাশে। বিছানায় কাতরাচ্ছে মেয়েটি। সে সন্তানসম্ভবা। এই মুহুর্তে ঘর থেকে বের হওয়া উচিত হবে কি না!.. ভাবছে হাসান। তার করুণ আর্তনাদ বাড়ছে।পাড়া-প্রতিবেশীরা সবাই দরজা জানলা বন্ধ করে দিয়েছে। মোড়ের দোকান গুলোও বন্ধ। হাসান পকেটে হাত দিলো..তার পকেটে সিগারেট আছে। অথচ দিয়াশলাই নেই। সে পকেট থেকে সিগারেটগুলো বের করে হাতের মুঠোয় চেপে ভেঙে ফেললো।
মোড়ের দিকে তাকাতেই চোখে পড়ল একটা আলোর মিছিল তার এদিকে ধেয়ে আসছে। মিছিলে বিক্ষুব্ধ জনতার স্লোগান। মিছিলটা তার ঘর অতিক্রম করছে। সিড়ি দিয়ে নিচে নেমে মিছিলের মধ্যে ঢুকে গেলো সে। লোকজনের ধাক্কাধাক্কিতে ঘর থেকে হেঁটে গেলো অনেকদূর।
“ভাই আমাকে একটি মশাল দিন। ভাই আমাকে একটা দিয়াশলাই দিন ” পাগলের মত হয়ে গেলো সে। অবশেষে পেলো একটি মশাল। মশাল নিয়ে পেছনের দিকে হেঁটে আসতেই বিকট শব্দে গ্রেনেড ফাঁটল। বিক্ষুব্ধ জনতা বিচ্ছিন্ন হয়ে গেলো..সে লুটিয়ে পড়লো মাটিতে… তার উঠে যেতে হবে এখান থেকে। গুলির শব্দ শোনা গেলো..গুলির শব্দে তারের ওপর সারি সারি বাবুই পাখির দল উড়ে গেলো সন্ধ্যে রাতের গোধূলির আলোয়।

*

বাই চান্স
ভাই আমি আমি এই দিকে…এই যে ভাই.. এদিকে তাকান। আমারে কি দেখতেছেন না? এইদিকে ছুঁড়েন…এইদিকে মারেন। স্টেজ থেকে ব্লেজারটা ছুড়ে মারা হলো। জনতার কাড়াকাড়িতে সেই ব্লেজার টুকরো টুকরো হয়ে। আকাশ ব্লেজারের একটি টুকরো পেলো। সেই টুকরো নিয়ে মদ্যপ হয়ে ঢুলতে ঢুলতে এগিয়ে গেলো মেস বাড়িতে৷ রাত এগারোটা। সে এসে ধুপ করে বিছানায় শুয়ে পড়লো। তার শোয়ার শব্দে ঘুম ভেঙে গেলো কারও কারও। মুখ কাঁচুমাচু করে..আবার নিস্পাপ শিশুর মতো ঘুমিয়ে গেলো তারা৷
সকাল বেলা বাথরুমে দরজা আটকে বসে আছে আকাশ।বসে বসে হাতে নাড়িয়ে একটি আংটি দেখছে সে। আংটি টি যে আঙুলে ছিলো সে আঙুলটা একটু আগে কমোডের মধ্যে ফেলে দিয়েছে সে। গোটা শহর আজ উত্তপ্ত। রাস্তায় রাস্তায় মানুষ নায়ক হত্যার বিচার চাইছে। তারা খুনীকে খুঁজে বেড়াচ্ছে৷ থানা ঘেরাও করছে। নায়কের হাতের একটি আঙুল খুঁজে পাচ্ছে না পুলিশ।

*

প্রণয়লহরী
“তুই আমাকে ভালোবাসিস না তনু? ” তনু এদিক ওদিক তাকায়। মাথায় হাত দেয়। হলুদ শাড়ি পড়া মেয়েটি রাগী গলায় বলে,কথা বলছিস না কেন? তুই আমাকে ভালোবাসিস না? তনু মুখ থেকে অস্ফুট সুরে বলে,বাসি তো। মেয়েটি তনুর দিক থেকে মুখ ফিরিয়ে অন্য দিকে তাকিয়ে বলে,কচু ভালোবাসিস। তনু ঠোঁটের কোনে স্মিত হাসি এনে বলে, কচু আমি আসলেই ভালোবাসি না। মেয়েটি রাগী গলায় বলে, মজা করা হচ্ছে না! মেয়েটি তনুর বুকে ঘুষি মারে। তনু ব্যথায় কাঁকিয়ে ওঠে। মেয়েটি ভীত গলায় বলে, ‘কী হলো?’ তনু হো হো করে হাসে৷ মেয়েটি তনুকে জড়িয়ে ধরে।
তনু মেয়েটিকে গা থেকে ছাড়িয়ে নেয়। আমাকে এখন যেতে হবে। মেয়েটি কাঁদো কাঁদো গলায় বলে,তুই আমাকে কথা দে তনু। তুই আর মিছিলে যাবি না ৷ তনু চুপ করে থাকে ওদের মধ্যে নিরবতা বয়ে যায়। মেয়েটি উচ্চস্বরে বলে,কথা দে। তনু ঠান্ডা গলায় বলে, আমি মিছিল ছাড়তে পারব না। যতদিন না আমাদের দাবী মেনে না নেওয়া হয়। আমি আন্দোলন ছাড়তে পারবো না৷ মেয়েটি ঠান্ডা গলায় বলে,তাহলে আমাকে ছেড়ে দে৷
তনু মুচকি হাসে! মেয়েটি চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ। মেয়েটি আবারও তাকে জড়িয়ে ধরে।কাঁদে কিছুক্ষণ। তনু মেয়েটিকে আরও কাছে টেনে নেয়৷ ঠান্ডা গলায় বলে…আমার রক্তে মিছিল বইছে, আন্দোলন বইছে। বইছে তোর প্রণয়লহরী ।

*

বারুদের জন্মদিন
“তুই পিস্তল চালাতে পারিস?” স্বদেশ থতমত খেয়ে যায়। অবাক সুরে বলে, “সে কি পিস্তল?”ওপাশ থেকে সে বলে.. শুনেই শুকিয়ে গেলি? হা হা হা। স্বদেশ বুঝতে পারে.. সে তার সাথে মজা করছে। তার বন্ধুটি তাকে বলে..আজ বিকেলে মাঠে আসছিস তো? ও পাড়ার সাথে খেলা আছে। স্বদেশ বলে আসবো আসবো। এখন আমি বরং যাই। তার বন্ধুটি বলে… যাবি? চল আমিও যাই। বাজার পেরিয়ে লক্ষণের দোকান থেকে মিষ্টি খায় দুজন। তারপর বাজারের শেষ প্রান্তে গিয়ে লেবু চা খেয়ে বাড়ির পথে হাঁটে স্বদেশ। তবে সে এখনই বাড়িতে যাবে না। বাড়িতে যাওয়ার আগে তার কাজ আছে একটা।
উর্বীদের বাড়ির আশেপাশে ঢুঁ মারতে হবে একটু। যদি দেখা পাওয়া যায় উর্বীকে। স্বদেশ উর্বীদের বাড়ির গেটের বাইরের বয়স্ক গাছটার নিচে দাঁড়িয়ে থাকে। বিকেলে মাঠে শামিল হয় দুজন। স্বদেশ এবং তার বন্ধু। তার বন্ধুটি তাকে বলে.. ‘আজ খেলা দেখতে ইচ্ছে করছে না। চল নদীর পাড়ে যাই।’ তারা দু’জন নদীর পাড়ে যায়। নদীর ফুর ফুরে হাওয়ায় তার বন্ধুটি তাকে বলে… শোন, তোকে আজ একটা জিনিস উপহার দেব। স্বদেশের চোখে-মুখে খুশির ঝলকানি। তাই নাকি? বাহ বেশ বেশ। কদ্দিন তোর কাছ থেকে উপহার পাওয়া হয় না। তার বন্ধুটি কোমড়ে হাত দেয়.. কোমড়ের কোঁচা থেকে একটি ধাতব জিনিস বের করে। বিকেলের অস্তের দিকে ধাবিত হওয়া সূর্যের আলো পরে সেটির ওপর। কালো বস্তুটি চক চক করে ওঠে। স্বদেশের চোখ কপালে উঠে যায়.. সে কি রে! এ তো পিস্তল।
তার বন্ধুটি তাকে অভয় দিয়ে বলে.. হ্যাঁ! রে পিস্তল।
তার বন্ধুটি হাত টেনে পিস্তলটি স্বদেশের হাতে দেয়। স্বদেশ চমকে ওঠে..পেলি কোথায় এটা? তার বন্ধুটি বলে… পেলাম পেলাম। স্বদেশ শঙ্কিত কন্ঠে বলে.. তুই চালাতে জানিস? তার বন্ধুটি মৃদু হেসে বলে,”এ তো আমার কাছে ডাল-ভাত। ” ফট করে পিস্তলটি কেড়ে নেয় সে….নদীর পাড়ে থাকা একটি ছাগলের পায়ে গুলি করে দেয় সে। ছাগলটি ব্যথায় বসে পড়ে।
বন্ধুটি স্বদেশকে নিয়ে চলে যায়। এখানে বেশিক্ষণ থাকা উচিত নয় তাদের। ছাগলটি ব্যথায়.. আর্তনাদের ডাকে ফেঁটে পড়ে।
২.
উর্বীদের সাথে স্বদেশদের পরিচয় অনেক দিনের। তারা পারিবারিক বন্ধু। আজ উর্বীর জন্মদিন। স্বদেশদের পরিবার আমন্ত্রিত উর্বীদের বাড়ি। স্বদেশ উর্বীকে খুঁজছে।অনেকক্ষণ ধরেই খুঁজছে তবে পাচ্ছে না। সিগারেট ধরাতে উর্বীদের বাড়ির ছাদে গেলো সে। সিড়ি বেয়ে ছাদে ঢুকতেই সে থমকে যায়। স্বদেশের বন্ধুটি উর্বিকে.. জড়িয়ে ধরে..! স্বদেশ থমকে যায়। থতমত খেয়ে যায়।
সিড়ি থেকে দৌঁড়ে নেমে আসে। সদর দরজা থেকে দৌঁড়ে বেড়িয়ে আসে বাড়ির বাইরে। এরপর বিকট শব্দে পিস্তলের গুলি ছোড়ার আওয়াজ আসে। স্বদেশ থমকে যায়৷ এই গুলির আওয়াজ স্বদেশের অতি পরিচিত।

*

রুদ্রঝড়
দোকানে তালা মেরে তালাটা টান দিয়ে দেখে। সাইকেলে চেপে ছুটলো অসীম। আকাশে কড়া রোদ। বৈশাখ মাস৷ কটকটে গরম। রোদের দেখা নেই। সাইকেল নিয়ে গ্রামের পথে চলতে রইলো অসীম। এক টুকরো ঢান্ডা হাওয়া এসে তার মুখে লাগলো। তাকিয়ে দেখল,দক্ষিণ আকাশে কালো মেঘ জমেছে। অসীম সাইকেলের প্যাডেল বাড়ালো।
একপশলা বৃষ্টি এসে ভিজিয়ে দিলো সব। মাটির পথ কাদা কাদা হয়ে গিয়েছে৷ সন্ধ্যে নামার জোগাড়। বৃষ্টির হবার পরে বৃষ্টির গন্ধ রয়ে গেছে সবুজ গাছপালায়। ঠান্ডা শির শির বাতাস বইছে। শিরশিরে বাতাস এসে অসীমের গায়ে লাগছে৷ এ বাতাসে অদ্ভুত শিহরণ। অসীম সাইকেলের প্যাডেলের দিকে জোড় দিলো। নদীর পাড়ের বাঁধের রাস্তা বেলে মাটির। কোথাও কোথাও ভাঙা। বৃষ্টি হবার পরে রাস্তার অবস্থা আরও খারাপ হয়ে গিয়েছে।
সন্ধ্যে নামার কিছুক্ষণ পরে সুদেবদের বাড়ির দো গলি দিয়ে কাঁদা মাড়িয়ে ঢুকলো বাড়ির ভেতরে ঢুকলো অসীম।
ঘরের বারান্দায় উঠতেই মাথায় ঝাড়া দিয়ে। ঘরের ভেতরে ঢুকতেও দরজার সাথে আঘাত খেলো সে।ভেতর থেকে মা বলে উঠলেন,অসীম এসেছিস নাকি? অসীম হাঁচি থামিয়ে বলল,”হ্যাঁ। মা। ”
অসীম জরুরী তলব জানতে পারলো সন্ধ্যের পরে। রায়চন্দ্র বাড়ির ওধারটায় এসেই ঝড়টর ছুটে একাকার অবস্থা। ঠান্ডা লাগেছে তার।
২.
রূপপুর বাজারে তার দোকান সামলানোর জন্য গ্রাম ছেড়েছে বছর খানেক আগে। মা হাতের বালা বিক্রি করে অসীমকে দোকানের মালপত্র কেনার টাকা জোগাড় করতে বলেছিলেন। সেই হাতের বালা, অসীম দু মাস আগেই ফিরিয়ে দিয়েছে। ব্যবসায় সোনার মুখ দেখছে৷
পরদিন সকালে ঘুম ভাঙতেই উঠোনের কাঁদে মাড়িয়ে অসীম রওনা হলো। অসীমের সাথে তার মামা, মামাতো ভাই এবং বাড়ির দুজন প্রতিবেশী। নদী পেড়িয়ে বেশ খানিক দূরের পথ। ফিরে আসতে আসতে সন্ধ্যা হয়ে গেলো।
মা জানতে চাইলেন,মেয়ে কেমন? পছন্দ হলো?
অসীম মাথা নেড়ে সায় দিলো.. হ্যাঁ। মা।
অসীমের বিয়ে হলো শ্রাবণ মাসের কোন এক শুভ দিনে। শ্রাবণ মাসের ঝোড়ো হাওয়া, ঝুপ বৃষ্টির মধ্যে অসীমের বাসর হলো। তবে এই বাসর অসীমের মাথায় আটকে রইলো। আচমকা বিপদ এসে জুড়ে বসলো অসীমের কাঁধে।
অসীমের জ্ঞান ফিরে, চোখ খুকে হা করে তাকিয়ে থাকে। একটা দীর্ঘশ্বাস নেয়। সবাই ধরাধরি করে অসীমকে মুখার্জি বাড়িতে নিয়ে আসছে। অনিন্দ্য মুখার্জি পেশায় ডাক্তার হওয়ায় অসীমের চিকিৎসা করে। সুস্থ হয়ে অসীম, বাড়ি ফিরতে জানতে পারে-তার মা আর নেই। সবাই অসীমের কথা শুনে হতভম্ব হয়ে যায়। অসীম কৌতুহলী হয়ে জিজ্ঞেস করে, সুদেষ্ণা কোথায়? সবাই আবারো হতভম্ব মুখে তাকিয়ে থাকে। একজন জিজ্ঞেস করে, সুদেষ্ণা কে?
অসীম গরম গলায় বলে, সে কি নিতাই দা। তুমি না গেলে আমার সাথে সেদিন গেলে? নিতাই শঙ্কিত কন্ঠে জবাব দেয়,কোথায় গেলাম? অসীম বলে,কেন আমার বিয়েতে? বাড়ির বয়জেষ্ঠ এক ভদ্রলোক বলে,তোর মাথাটাথা গেছে নাকি অসীম? তুই বাড়িতে ফিরিস না প্রায় চার বছর। তোর মা’কে দাহ করার পরে তুই আর ফিরে এলি না। কত খুঁজেছি তোকে। অসীম মাটিতে বসে পড়ে,তার পুরো পৃথিবীটা উল্টে যাচ্ছে। সব কিছু অচেনা লাগছে। ঘুরছে চারপাশ? অসীম ধীরে ধীরে চোখ বুজতে লাগলো। সবাই এগিয়ে এলো.. এই অসীম এই.. চোখ খোল। কি হলো ছেলেটার। দেখো দেখো..এই অসীম। এই কেউ পানি নিয়ে আয়…পানি আনতে ছুটে গেলো কেউ।
কাল বৈশাখী ঝড় ঘনিয়ে আসছে… অসীম ডুবছে সে ঝড়ের গভীরে।

*

মিনুর সংসার

সেবার মিনুর মা মারা গেলেন হঠাৎ করেই। মিনুর বার্ষিক পরিক্ষার ফলফল প্রকাশ হয়েছে, মিনু ক্লাস নাইনে প্রথম হয়েছে। মিনুর মনে কি আনন্দ! খুশি যেন উছলে পড়ে৷মাকে খবরটি জানালে কেমন হবে? খুশি হবেন হয়ত৷ মিনুকে বলবেন,’তোকে আরো বড় হতে হবে৷ বড় হয়ে ডাক্তার হবি। ‘ মিনু বাড়িতে আসলো লাফাতে লাফাতে৷ ‘এসে দেখলো সবার মুখ কালো। কেউ কেউ কাঁদছে! মিনু কেমন গম্ভীর হয়ে গেলো৷ছোট চাচিকে জিজ্ঞেস করলো,’ কি হয়েছে চাচি?’ ছোট চাচি শাড়ির আচল দিয়ে চোখ মুছতে মুছতে বলল,’শান্ত হ মা!’ বলে ভেউ ভেউ করে কান্না শুরু করে দিলো। মিনু বলল,’মা কোথায়?’ মিনু মা মা বলতে বলতে ছুটে গেল ঘরের ভিতর৷ ভিতরে কোরআন শরীফ পাঠ করা হচ্ছে৷ মিনু ঘরের ভিতর ঢুকতেই আর্তনাদের স্বরে চিৎকার দিয়ে উঠলো। মিনু ফুঁপিয়ে ফুঁপিয়ে কাঁদলো।

মিনুর মায়ের মৃত্যুর একমাসের মাথায় মিনুর বাবা বিয়ে করে নতুন বৌ ঘরে আনেন৷ প্রথম প্রথম মিনু তার সৎ মাকে সহ্য করতে পারতো না৷ মিনুর বাবার সাথে কথা বলত না। মিনুর ছোট চাচি মিনুর কাছে আসলে তাকে জড়িয়ে ধরে কাঁদতো। মিনুর সৎ মা মিনুকে আদর যত্ন করতো। মিনুর মন গললো একদিন৷ সৎমাকে সই মা বলে ডাকত সে৷ সৎ মায়ের বয়স বেশি না, মিনুর থেকে বয়সে পাঁচ-ছয় বছরের বড় হবেন।

কেঁটে গেলো কতদিন। মিনুর সৎমা মিনুকে আদর যত্নের বিপরিতে অসহ্য করতে লাগলো৷ মিনুর সাথে কথা বলতো তুচ্ছতাচ্ছিল্য  করে৷ মিনুর সাথে ইচ্ছে করে ঝগড়া বাধাতো৷ মিনুও কথায় ছাড়তো না৷ একদিন মিনুর বাবা এসে দেখলেন মিনু তার সৎ মাকে উদ্দ্যেশ্য করে কথা বলছে। ততক্ষনে সৎ মা থেমে গিয়েছে৷ মিনুর বাবা রহমত মিয়া মিনুকে ধমকালেন। মারতে এগিয়ে গেলেন। মিনুর ছোট চাচি এসে মিনুকে বাচালো৷

বছর দুই পরের কথা,মিনুর ছোট একটি ভাই হয়েছে৷ সেই ভাইকে সে দেখাশোনা করে৷ ভাইকে নিয়ে তার যত হুটিপুটি৷ কলেজ থেকে ফিরে ভাইকে নিয়ে বসে পড়তো সে৷ ছোট ভাইটি তখন বিছানায় শুয়ে শুয়ে কাঁদছিলো৷ মিনুর সৎ মা রান্না ঘরে ব্যস্ত। মিনু ভেজা কাঁথা পাল্টিয়ে ভাইটিকে নিয়ে হুটিপুটি শুরু করলো। আহা রে!  কাঁদে না আমার লক্ষী ময়না-টিয়া। কাঁদিস কেন এত? ছেলেদের এত কাঁদতে হয় নাকি? ছোট্ট ফুটফুটে শিশুটি কাঁদা বন্ধ করে ছোট ছোট মার্বেলের মতো দুটি চোখ দিয়ে মিনুর দিকে তাকিয়ে রইলো৷ মিনু চোখ বড় করে হঠাৎ বলে উঠলো ‘ভাউ’ শিশুটি হাসলো খিল খিল করে৷

ছেলেটির নাম রাখা হলো টুনু। সে হামাগুড়ি দিতে শিখেছে৷ তার মধ্যে আছে চঞ্চলতা! সারাদিন তিড়িং বিড়িং করে এখানে ওখানে হামাগুড়ি দিয়ে চলে যায়। একবার হামগুড়ি দিতে দিতে চুলার পাশে চলে গেলো৷ তার চোখেমুখে কেমন কৌতূহল। চুলায় আগুন জ্বলছে! ভাত ফুটতে শুরু করেছে৷ সৎমা তখন পুকুরে থালা-বাসন ধোয়ায় ব্যস্ত। টুনু তার ছোট্ট হাত বাড়িয়ে দিলো চুলার দিকে৷

দুপুরবেলা কলেজ থেকে ফিরছিলো মিনু। বাড়িতে ঢোকার পথটা জুড়ে সপ্তপর্ণা গাছের  সারি। বাড়িতে ঢুকেই মিনুর চোখ যায় রান্না ঘরে। ততক্ষনে টুনু হাত বাড়িয়ে দিয়েছে পাতিলের দিকে। ব্যগ ফেলে চিৎকার দিয়ে দৌড়ে এলো মিনু! টুনু কেঁদে দিলো। সৎমা ছুটে এলো।

পার হলো আরো তিন বছর।একদিন মিনুর সৎ মা মারা গেলো। পুকুর ঘাটে থালা বাসন ধুচ্ছিলেন তিনি। হঠাৎ নারকেল গাছ থেকে কাঁচা ডাব পড়ে তার মাথার উপর। সেখানেই অজ্ঞান হয়ে যায় সে। মাথা ফেটে রক্তপাত শুরু হয়। অজ্ঞান হওয়ার আগে চিৎকার দেয় গলা ফাঁটিয়ে। ছুটে আসে মিনুর ছোট চাচী। সে ও চিৎকার দিয়ে অজ্ঞান হয়ে যায়।মিনু তখন রান্নাঘরে সবজি কাটছিলো বাড়ির আরো কয়েকজন ছুটে আসে চিৎকার শুনে। ততক্ষণে মিনুর সৎ মায়ের দেহটি নিথর হয়ে গিয়েছে। মিনু সেদিন কেঁদেছিলো গলা ফাঁটিয়ে চিৎকার করে।

টুনুর তখন ছ’ বছর। সে ফ্যালফ্যাল করে তাকিয়েছিলো সবার দিকে। তার মাথায় রাজ্যের চিন্তা,’সবাই এত কাঁদছে কেন? কি হয়েছে? ‘

 

পনেরো বছর পরের ঘটনা,মিনুর বিয়ে হয়েছে দশ বছর আগে। আট বছর আগে মিনুর বাবা রহমত মিয়া একদিন স্ট্রোক করে মারা গেলো। টুনু বড় হয়েছে,সে এখন থাকে মিনুর সংসারে। মিনুর স্বামী পুলিশ অফিসার। মিনুর একটি সন্তান আছে। তার নাম শিমুল। শিমুলের বয়স পাঁচ বছর।

রহমত মিয়া মারা যাওয়ার পরে টুনু মিনুর সাথে থাকে। এতে মিনুর স্বামী রফিক কখনো আপত্তি করেনি৷ রফিককে ডিউটি করতে বেশিরভাগ সময় বাইরে থাকতে হয়। টুনু কলেজে পড়ে। মাঝেমধ্যে মিনু টুনুর দিকে তাকিয়ে থাকে! এইতো সেদিন তাকে কোলে করে হুটিপুটি করে সুজি খাইয়েছে। সেই টুনু আজ কত্ত বড় হয়ে গেছে। মুখজুড়ে তার খোঁচা খোঁচা দাঁড়ি। টুনুর জন্য তার কত মায়া। কে বলবে টুনু তার সৎ ভাই? টুনুকে সে সব সময় সে নিজের ভাইয়ের মতো দেখেছে। মিনু গালে হাত দিয়ে ভাবছে,টুনুকে বিয়ে দিতে হবে। টুনুর জন্য দেখে শুনে সুন্দর একটি বউ আনতে হবে। আচ্ছা বউ পেয়ে টুনু বোনকে ভুলে যাবে না তো? কে জানে! মিনুর আজকাল এসব কথা ভাবতে ভালো লাগে।

টনু আজকাল মিনুকে এড়িয়ে চলে। তার রুমে আসে কয়েকজন তরুন। তারা ফিসফিস করে কি সব বলে! মিনু কখনোই তাদের কথা শুনতে চায়নি। দরজার ওপাশ থেকে টুনুকে বলেছে, ‘টুনি চা নিয়ে যা! ‘ টুনু কখনো কখনো চা নিয়েছে। আবার কখনো বলেছে,’চা লাগবে না বুবু! তুমি এখন যাও তো। ‘

মাঝেমধ্যে রাতে ঘরে ফেরে না টুনু। মিনু উকি দেয় টুনুর ঘরে। সেখান থেকে কেমন বিদঘুটে ঘ্রান আসে। একদিন টুনুর টেবিলে একটি কাচের শিশি পায় মিনু। টুনুর কাশি হয়েছে বোধয়। তাই ওষুধ খায়। কিন্তু এতগুলো ওষুধের শিশি কেন? টুনুর কাশি কি বেশি হয়েছে?

শীত পড়েছে বেশ! কুয়াশায় পথঘাট ঢাকা পড়েছে। বাইরে তাকালে কিছু দেখা যায় না। গাছগাছিলির দিকে তাকালে মনে হয় বড় কোন পাহাড় দাঁড়িয়ে আছে৷ রাত হলে ট্যাপড় ট্যাপড় শিশির ফোটার শব্দ। নিস্তব্ধ রাত! মাঝেমাঝে শোনা যায় শেয়ালের ডাক। কুকুর কাঁদে। রাতটা বুঝি বড় বিষণ্য।

রাত তিনটার দিকে কড়া নাড়ে রফিক।মিনুর কাঁচা ঘুমটা ভাঙে। গেট খুলে। ভিতরে ঢোকে রফিক। লাইটের আলোতে মিনু অবাক হয়ে বলে,’এই! তোমার হাতে কি হয়েছে। ‘ রফিক বলে,’সব বলব। আগে হাতমুখ ধুয়ে আসি। ‘

রফিক ভাত মুখে দিতে দিতে বলে,’আজ একটা অপারেশন ছিলো! মাদক চালানের। সেখানে গোলাগুলি হয়। একটা গুলি এসে লাগে আমার হাতে। আরেকটা গুলি লেগে যায় আমার সহকর্মী আফজাল সাহেবের বুকে। তাকে আর বাঁচানো যায়নি। গোলাগুলিতে মারা যায় ঐ দলের সব।আমাকে স্যার নির্দেশ দেন, আমি হাসপাতালে চলে যাই। ‘

গত রাতে বাড়ি ফেরেনি টুনু। মিনু রফিককে বলে খোঁজ নিতে। রফিক খোঁজ নেয়।

এখন সময় দুপুর দুইটা বেজে পয়তাল্লিশ মিনিট! মাথার উপরে সূর্য। শরীর ঘামছে। সে ঘামে ভেজা শরীর শীত শীত লাগছে। ঠোট শুকিয়ে আসছে বার বার। মিনু এখন দাড়িয়ে আছে মর্গের বাইরে। টুনুর খোঁজ পাওয়া গিয়েছে। টুনু আর বেঁচে নেই। গত রাতে পুলিশের সাথে বন্দুকযুদ্ধে মারা যায় সে।

মিনু কাঁদে! রফিক মিনুকে সান্তনা দেয় মিনুকে।

মলয়ানিল
বারান্দায় কাঁচের জানলা দিয়ে তাকিয়ে ছেলেটিকে একবার দেখলো মিথুয়া৷ ছেলেটির চেহাড়া ফরসা।
ছেলেটি দাঁড়িয়ে জানলার দিকে তাকিয়ে দেখলো একবার। মিথুয়া সরে গেলো।
মিথুয়াকে যখন তাদের সামনে ডাকা হলো। মিথুয়া শান্ত পায়ে তাদের সামনে গিয়ে সালাম দিলো। তারা সবাই হাসিমুখে সালামের উত্তর দিলো। এরপর নিয়ম মাফিক মেয়ে দেখা পর্ব চলতে রইলো।
মিথুয়া বসে আছে, জানলার দিয়ে এক দৃষ্টিতে বাইরে তাকিয়ে আছে৷ পেছন থেকে মিথুয়ার বড় আপা এসে জিজ্ঞেস করলো,”ছেলেটাকে কেমন লাগলো তোর?” মিথুয়া চমকে উঠলো। থতমত খেয়ে বলল,”কিছু বললে আপা?” মিথুয়ার বড় আপা কপালে হাত দিয়ে দুশ্চিন্তাগ্রস্থ গলায় বলল,”বিয়ের আগেই টেনশনে পড়ে গেলি? বিয়ে হলে কি হবে বল তো? কি ভাবছিস এত?”
মিথুয়া শান্ত গলায় বলল,”কিছু না আপা।”
বড় আপা আবারও বলল,”তোর কি ছেলেটাকে পছন্দ হয়েছে?”
মিথুয়া শান্ত গলায় জবাব দিলো,”তোমাদের পছন্দই আমার পছন্দ।” মিথুয়া আবারও গালে হাত দিয়ে জানলার বাইরে তাকিয়ে রইলো।
বড় আপা এসে মিথ্যার কাঁধে হাত দিয়ে বলল,”তোর কি কোন পছন্দের মানুষ আছে মিথুয়া ?
মিথুয়া নিজেকে গুটিয়ে নিয়ে বলল,” না আপা। ”
দিন পেরিয়ে যায়, মিথুয়া নতুন জীবন শুরু করে। এক শ্রাবণের দুপুরে সে জানলা দিয়ে তাকিয়ে বৃষ্টি দেখছিলো। রাস্তার ওপাশে চোখ যায় তার। একজন ছাতা হাতে তার জানলার দিকে তাকিয়ে আছে। মুখটা তার খুব পরিচিত। রান্নাঘরে কিছু একটা পড়ার আওয়াজে তার ধ্যান কাটে৷ সে দৌড়ে যায় রান্না ঘরের দিকে। ফিরে এসে আবারও তাকায় রাস্তার ওধারটায়। সেখানে কেউ নেই।
কখনো সন্ধ্যের ল্যাম্পপোস্টর আলোতে ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে সে। কখনো ভরদুপুর কিংবা সন্ধ্যে রাতের আলোতে দাঁড়িয়ে থাকে। একদিন বিকেলে মিথুয়া, বাসার নিচে গিয়ে তাকে বলে-তুমি আর এখানে দাঁড়িয়ে থাকবে না। নতুন জীবন শুরু করো, আমিও নতুন জীবন শুরু করেছি। হঠাৎ ঝুপ করে বৃষ্টি নামে, লোকটি মিথুয়ার হাতে ছাতা ধরিয়ে দিয়ে কিছু না বলেই হন হন করে হাটা দেয়। মিথুয়া দাঁড়িয়ে থাকে।
প্রায় মাস খানেক পরে মিথুয়ার কাছে একটি চিঠি আসে। তোমার হাতে যেদিন এই চিঠি পৌছে। সেদিন আর আমি বেঁচে নেই। মিথুয়া চুপ করে থাকে কিছুক্ষণ।তার চোখ বেয়ে কান্নার জল ঝরতে থাকে। খোলা জানলা দিয়ে স্নিগ্ধ বাতাস এসে মিথুয়ার চোখের জল শুকিয়ে দেয়।

*

রঙ্গিলা ভিডিও

গেট দিয়ে নিচু হয়ে ঢোকার সময় মাথায় টাক খায় মঈন। মাথায় হাত দিয়ে ব্যথায় কাঁকিয়ে ওঠে। এরপর লাথি মারে গেটে।মুখ থেকে অস্ফুট শব্দে বলে,বাল। পায়ের বুড়ো আঙুল কেটে যায়। রক্ত বের হয়..খুড়িয়ে খুড়িয়ে এগোতে থাকে। সামনে দেখতে পায় শফিককে। শফিক বেঞ্চে বসে বসে সিগারেট টানছে।মঈন শান্ত গলায় বলে,কি হইছেরে শফিইক্কা?
শফিক মঈনের দিকে তাকায়। হাতের সিগারেট মুখে নিয়ে লম্বা একটা টান দিয়ে বলে,তুই কি মইরা গেসেস নাকি ব্যাটা? তোর তো কোন খোঁজ খবর নাই৷ মঈন ধমক দিয়ে বলে,ফাল পাইড়া কথা কবি না একদম। কি কাম ক? শফিক বেঞ্চ থেকে উঠে মঈনের কাধে হাত দিয়ে বলে,চ্যাতোস ক্যা? ঠান্ডা হ।
মঈন শফিকের হাত কাধ থেকে নামিয়ে বলে, কি হইছে ঘটনাডা ক। শফিক সিগারেটে লম্বা টানদেয়। ফিক করে হেসে বলে.. ভাইয়ের তো ভিডিও ভাইরাল হইছে। মঈন কৌতুহলী দৃষ্টিতে বলে…কোন ভিডিও? ঐ যে ঐদিন প্রোগ্রামে যেটা করলাম ঐটা? মিছিলের টা? শফিক সিগারেটটা ফেলে দিয়ে পায়ের তলায় পিষে জবাব দেয়, ‘আরে ব্যাটা না।ঘটনা পুরা মাক্ষন হইয়া গেছে। ভাইয়ের বিচুবুচি লক। মঈন মাথায় হাত দেয়। চুলগুলো টানে।
‘শফিক্ক্যা…ঠোটের আগায় বাজাইয়া কথা কবি না। ঘটনাটা ক৷
শফিক ঘটনা বলে না। চুপ করা থাকে।
হাত দিয়ে জিভ নিজের টেনে ধরে। উন্মাদ ভঙ্গিতে বলে.. আচ্ছা যা এই ঠোট টাইনা তোর লগে কথা কমু। তাইলে আর ঠোটের আগায় কথা বাইজা থাকবো না৷ আরে ব্যাটা ভাইয়ের রঙ্গিলা ভিডিও ভাইরাল হইছে। তুই একটা কাম কর। তুই ভাইয়ের কাছে চইলা যা। দোতালায় আছে। যা… চইলা যা।
মঈন বুঝতে পারে শফিক একটু আগে যে সিগারেট টেনেছে তাতে গাজা ছিলো। সে একটু একটু গাজার ঘ্রাণ পাচ্ছিলো।মঈন শফিককে ধরে বেঞ্চে বসিয়ে। দোতালার সিড়ি বেয়ে উপরের দিকে উঠে। ডান দিকের বারান্দা দিয়ে হাটতে থাকে।
দরজায় নক করে। কোন সাড়া শব্দ নেই। মঈন আবারো নক করলো। ভেতর থেকে কাশির শব্দ গলা পাওয়া এলো। ভেতর থেকে শ্লমা জড়ানো গলায় কেউ একজন বলল,কে? বাইরে থেকে মঈন জবাব দিলো৷ভাই আমি মঈন। ভেতর থেকে কঠিন গলায় নেতা বলল,ভেতরে আয়। মঈন ভেতরে ঢুকে,মাথা নিচু করে রইলো।
ভাই শ্লমা জড়ানো গলায় বলল,কি রে মঈন? তোর তো আজকাল রেখা সাক্ষাৎ ই নাই। থাকোস টাকোস কই?
মঈন মাথা নিচু করে শান্ত গলায় বলল,থাকমু আর কই ভাই। হিল্লোলের বোডিং এ পইর‍্যা থাকি।
ভাই বিছানা থেকে উঠে মঈনকে কাছে ডাকে। মঈন এক কদম আগায়। ভাই শান্ত গলায় বলে, ঐদিন রিসোর্টে তো তুই ই আমার লগে গেছিলি, তাই না?
মঈন মাথা নিচু রেখে, মাথা নাড়িয়ে জবাব দেয়..
জি ভাই। আমিই গেছিলাম,জবাব দেয় মঈন
ভাই বলে,আমি রুমে ঢোকার পর তুই কই ছিলি?
ভাই বলে..রুমকির লগে ভিডিওডা তুই নেটে ছাড়ছোস নটকির পোলা। তাই না?
মঈন হতভম্ব হয়ে ভাইয়ের চোখের দিকে তাকায়। চোখ দুটো লাল হয়ে আছে। মঈন লাফ দিয়ে ভাইয়ের পায়ের কাছে বসে পড়ে৷ আকুতি করে বলে,ভাই বিশ্বাস করেন। আমি এই ব্যপারে কিছুই জানি না। বিশ্বাস করেন ভাই।
ভাই বালিশের তলা থেকে রিভালবারটা বের করে মঈনের পিঠে ঠেকে রাখে। মঈন পিঠে রিভালভারের উপস্থিতি টের পেয়ে ভয় পেয়ে যায়। ভাইয়ের পা চেপে ধরে। মঈন আকুতি কন্ঠে বলে, ভাই আমারে মাইরেন না। বিশ্বাস করেন ভাই। আমি কিছু করি নাই। বিশ্বাস করেন।
দুপুর বেলা গুলির আওয়াজে, উড়ে যায় দুটো পাখি। কেউ কেউ ভাবে কোথাও ছোটখাটো শর্টসার্কিট হয়েছে।
মঈনের গলা শুকিয়ে আসছে। এতক্ষণ সে যা হয়েছে সবই তার কল্পনা। মঈনের মাথার গাম গাল বেয়ে পরে সিড়িতে। সে সিড়ির মাঝামাঝি অবস্থানে আছে৷ এখনও পাঁচটা সিড়ি আছে। সে এক পা এক পা করে সিড়িতে উঠছে। তাকে বিভৎস কল্পনা ঘিরে ধরেছে। শেষের সিড়িটায় পা রেখে কোমড় থেকে নিজের রিভালবারটা বের করে। এরপর শান্ত পায়ে করিডোরে হেটে, দরজার সামনে এসে চেক করে। আলগা করে ভেজানো। ধাক্কা দিয়ে ঢুকে.. গুলি চালিয়ে দেয় দেয়ালের দিকে শোয়া লোকটির পিঠে। আর্তনাদের শব্দ আসে। নেতার শাদা পাঞ্জাবি ভিজে যায় রক্তে৷ মঈন হন হন করে নিচে নেমে যায়…..শফিক অচেতন হয়ে পড়ে আছে। বমি করে ভাসিয়ে দিয়েছে সব। মঈন শফিকের হাতে রিভালবারটা ধরিয়ে দেয়। তারপর হন হন করে হাটা দেয়। মোড়ে গিয়ে এককাপ চা আর সিগারেট ধরায়।
কিছুক্ষণ পরে তার ফোন পকেটে বেজে ওঠে। ভাইয়ের নম্বরটা ভেসে ওঠে স্ক্রিণে। না.. এই মুহুর্তে ফোন ধরা যাবে না। কিছুদূর হেটে.. ডাস্টবিনে ফোনটা ফেলে দেয়। এরপর হন হন করে হাটতে থাকে….

*

অভয়

পরপর দুটো গুলির শব্দ শোনা যায়। তারপর প্রকট আর্তনাদে কেঁদে ওঠে গুমট বাঁধা চারপাশটা। হাসি-কষ্ট কান্নায় মিলেমিশে একাকার হয়ে যায় সব। থমকে যায়..গুলিবিদ্ধ মানুষটা বলে.. তুই পালিয়ে যা মহিদুল। মহিদুল কাঁদতে কাঁদতে বলে, আমি তোকে ফেলে পালিয়ে যাব কিভাবে? তোর এই অবস্থা৷ ঐ শুয়োরদের আমি ছাড়ব না। গুলিবিদ্ধ মানুষটা বলে,ওরা এদিকেই আসছে মহিদুল। তুই একা পারবি না, তুই পালিয়ে যা। গাছের পাতার শুকনো মর্মর শব্দ কানে আসে মহিদুলের৷ শত্রুপক্ষ বেশিদূরে নেই আর। মহিদুল গুলিবিদ্ধ মানুষটার, গালে সান্ত্বনার চাপড় দিয়ে বলে, তুই একটু কষ্ট করে এখানে থাক। আমি ওদের শেষ করে দেই। সরে যাওয়ার আগে গুলিবিদ্ধ লোকটির স্টেনগানটি সাথে নেয়।
নিরাপদ দূরত্বে সরে যায় মহিদুল, ওরা সংখ্যায় পাঁচজন হবে। পা’য়ের আওয়াজ শুনে বুঝতে পারে মহিদুল। প্রথম গুলি চালায়..সোজা মাথা বড়াবড়। কপালের ফুটো হয়ে বেড়িয়ে যায় । এরপর সেখান থেকে সরে পরে। ভাঙা কবরের ভেতরে গিয়ে বসে। শত্রুপক্ষ খাবড়ে গিয়েছে। মহিদুল ভেবেছিলো তারা সংখ্যায় পাঁচজন। এরপর দেখলে তারা তিনজন। যার মধ্যে একজনকে শেষ করে ফেলেছে ইতিমধ্যে।
দ্বিতীয় জনকেও শেষ করে ফেলে মহিদুল। শেষের জনকেও নৃশংস ভাবে মারে মহিদুল। এরপর ফিরে যায় তার বন্ধুর কাছে। তার বন্ধু আর বেঁচে নেই। শেষ আর্তনাদে ফেঁটে পড়ে সে। কাঁধে তার বন্ধুর লাশ তুলে অরণ্যের ভেতরে হাটতে সূর্যদয়ের শীতলষ্ণ আভা আলোতে সে কাঁদতে কাঁদতে হাটতে থাকে। ভাঙা গলায় বলে, তোর আর ভয় নেই, ওরা আর বেঁচে নেই।

*

ডাহুক

মেহেরুনের মন খারাপ। জানলার পাশে বসে তাকিয়ে ছিলো পুকুরের দিকে৷ বর্ষাকাল; পুকুরের চারপাশ কানায় কানায় পরিপূর্ণ। আকাশে মেঘ করে এসেছে। শ্রাবণ মাসের আকাশে কালো মেঘ জমা মানেই কিছুক্ষণ পর ঝুপ করে বৃষ্টি নামবে। মেহেরুনের বৃষ্টি দেখতে ভালো লাগে৷ বৃষ্টির ফোটা হাত দিয়ে ছুঁতে ভালো লাগে। মেহেরুনের মন ভালো নেই। লোকটা এখনো আছে না, বৃষ্টি বাদলের দিন। কোথায় আগে আগে আসবে। তা না! মেহেরুনের খুব ইচ্ছে করছে,পুতুল খেলা খেলতে৷ ছোটবেলায় সে পুতুল খেলা খেলতো। কাপড় দিয়ে পুতুল বানাতো, সেগুলোর বিয়ে দিতো৷ কত কি আয়োজন!
মেহেরুন চিন্তায় মগ্ন হয় আবাতো। পুকুরটা ঝোপড়ায় ভরা। মাঝেমধ্যে পুকুরে দু একটা জলঢোড়া সাপ চোখে পড়ে। মেহেরুনের সাপ দেখলে গা ঘিন ঘিন করে!
পুকুর পাড়ে দুটো ডাহুক কচুপাতার তলায় গুটিশুটি মেরে আছে৷ বৃষ্টি নামার জোগাড়, আকাশের কালো মেঘ সাদা হয়ে যাবার পরই ঝুপ করে বৃষ্টি নামলো…বৃষ্টি নামার শব্দের সাথে সাথেই কলিং বেল বেজে উঠলো। মেহেরুন ছুটে গেলো দরজা খুলতে,ঝুপ ঝুপ নুপুরের শব্দ আর বৃষ্টি শব্দ মিলে মিশে একাকার হয়ে গেলো। সে এসেছে…..

*

শশীঘোর

দেয়াল ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে নিশ্চুপে কি যেন ভাবছিলাম আনমনে। আজকাল এক ভাবনা থেকে আরেক ভাবনার লেয়ারে যেতেই পেছনের ভাবনা ভুলে যাই। আমার এই এক ঘোর মানসিক ব্যধি ঘিরে ধরেছে। তবে এই অসুখকে মানসিক ব্যধি না বলি। আমি পাগল হতে যাই না এতটুকু বিশ্বাস নিজের মধ্যে আছে। কি সব আবোলতাবোল ভাবছি দেখে, চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে চায়ের কাপে শিশির জড়ানো বরফ নেমে এলো। ঠান্ডা হয়ে গেছে। “শিশির জড়ানো বরফ” এই উপমা দেওয়া কি ঠিক হলো? কড়া চাতে আরো কয়েকবার চুমুক দিয়ে নিজের দাঁতকে বিশ্রি বানিয়ে ফেললাম। উপমা? ও হ্যাঁ উপমার কথাই তো মনে নেই। ভাবতে না ভাবতেই ফুটুং করে মেসেজ এলো। স্ট্রেইঞ্জ! আজকাল অনেক কিছুও তো ঘটে যাচ্ছে। মাইন্ড কি সিরিয়াস হয়ে গেলো?

আরেকবার চায়ে চুমুক দিতে দিতে আনমনে এসব কথা ভাবে রাশেদ। ফোন হাতে নিয়ে ঠোটের কোণে মৃদু সুরে হাসে। স্ক্রিণে ভেসে ওঠে, এই তোমার ভাইয়াকে মেরে ফেলার একটা বুদ্ধি দাও তো! রাশেদ হাসে। চায়ের কাপ টেবিলে রেখে, টাইপ করে। আজকাল ফোনের কিবোর্ডগুলো টাইপরাইটারের মতো আওয়াজ করে। ‘বিষ খাইয়ে মেরে ফেলো, চায়ের কাপে বিষ মিষিয়ে দিলেই তো পারো।’ তার আগে বলো এরকম নিরীহ মানুষকে কেন মারতে চাও? উপমার উত্তর আসে ওপাশ থেকে, আজকে কি করেছো জানো? বাজার থেকে কচু আর এক গাঁদা গুড়া চিংড়ি নিয়ে এসে আমায় বলে, কচু চিংড়ি মাছ রান্না করো। কি ভয়ংকর ব্যপার জানো? কচুর মধ্যে একটা চিনে জোঁকও ছিলো। ঢাকার কোন দূষিত জায়গায় এগুলো জন্মেছে সেগুলো আবার নিয়ে এসেছে আমার বাসায় ” রাশেদের ঠোটের কোণে মুচকি হাসি। আবারো টাইপরাইটারের আওয়াজ, বাহ বেশ ভালো কাজ তো। তুমি এক কাজ করো। আমার জন্যেও রান্না করো। তোমার বাসায় গিয়ে খেয়ে আসি। কচু রান্না করতে পারতো? বাসায় তেতুল থাকলে তেতুল দিও। তাহলে আর গলা ধরবে না৷ হা হা হা ‘

হাসির শব্দ কিবোর্ডের অন্তরালে হলেও, হাসির শব্দে চার দেয়াল কেপে উঠলো। রাশেদ বিব্রত হলো খানিকটা। সে অফিসে বসে আছে। চারদিকে কাজের মনযোগ। অফিসের বস ঘোরাঘুরি করছে। রাশেদের পাশের ডেস্ক থেকে চাপা স্বরে আওয়াজ এলো, কি হলো রাশেদ ভাই? এত ফুর্তি কেন?
রাশেদের কেন যেন মাথা গরম হয়ে গেলো হঠাৎ করেই, হুট হাট করেই এই মাথা গরমের স্বভাবটা তার অনেক দিনের। কি আবোলতাবোল বলছেন, আমি কখন বললাম আমি আপনাকে এত টাকা বেশি ভাড়া দেবো। কথার স্বরগুল অস্পষ্ট হয়ে যাচ্ছে। আপনি, আপনি, আমি, আমি,কোথায় ছিলাম একটু আগে? অফিসে। সবকিছু গুলিয়ে যাচ্ছে এই দুশ্চিন্তায়।

সাইকোলজিস্টের প্রশ্ন আসে কোত্থুকে, আশ্চর্য আমি তোমাকে নিউমারলজি বুঝাচ্ছি তুমি এলে সাইকোলজিস্ট নিয়ে। অদ্ভুত তো! শোনো রাশেদ তোমাকে একটা কথা বলি। আজকাল দেখছি তুমি অফিসে মনযোগী নও। এই ব্যপারটাকে শাস্ত্র মতে দেখলে তোমার উপরে ভর করেছে শশীঘোর। রাশেদ তুমি শেষ কবে চাঁদ দেখেছিলে?


২.
সিড়িতে উঠতে উঠতে পরে যাওয়ার উপক্রম হয়েছে তার৷ এত বিভৎস গরমে জ্যাম ঠেলে সাত তলায় সিড়ি বেয়ে উঠতে উঠতেই জান চলে যাওয়ার উপক্রম। সিড়ি বেয়ে সিগারেট ধরলে শ্বাস ঘন হয়ে আসে তার সিগারেট হাতে নিয়েই, বিছানায় গা এলিয়ে দেয়।
তার বিভ্রম কাটে চায়ের দোকানদারের ডাকে,”কি মামা কি ভাববার লইছেন? সিগারেট তো পুইড়া গেলো?” ও হ্যাঁ। রাশেদ হক চকিয়ে ঘটে। আজকাল তার সাথে কি ঘটছে সে বুঝতে পারছে না। তবে কি তাকে এবার সাইকোলজিস্ট দেখাতেই হবে?

সাইকোলজিস্টের প্রশ্ন আসে কোত্থুকে, আশ্চর্য আমি তোমাকে নিউমারলজি বুঝাচ্ছি তুমি এলে সাইকোলজিস্ট নিয়ে। অদ্ভুত তো! শোনো রাশেদ তোমাকে একটা কথা বলি। আজকাল দেখছি তুমি অফিসে মনযোগী নও। এই ব্যপারটাকে শাস্ত্র মতে দেখলে তোমার উপরে ভর করেছে শশীঘোর। রাশেদ তুমি শেষ কবে চাঁদ দেখেছিলে?

রাশেদের ঘুম ভাঙলো অসহ্য অস্বস্তি নিয়ে। বেশ কিছুক্ষণ ধরেই কলিং বেল বাজছে। রাশেদ অফিস থেকে সে মোজাও খোলেনি এখনো। তার যতটুকু মনে পড়ছে সে সিড়ি বেয়ে সাত তলায় এসে প্রচন্ড ক্লান্ত হয়ে বিছানায় গা এলিয়ে দিয়েছিলো।

পরিস্কার মেঝেতে হাটতে হাটতে দরজার সামনে গিয়ে দরজা খুলে দেখলো, উপমা দাঁড়িয়ে আছে।
উপমা বিরক্ত গলায় বলল, এত ক্ষণ লাগে নাকি তোমার দরজা খুলতে। আশ্চর্য ব্যপার তো! উপমা বলে, দরজার সামনে থেকে সরো। আমি ভেতরে ঢুকবো! রাশেদ চোখ ডলতে ডলতে বলল, হঠাৎ আমার বাসায় এলে? উপমা রাগী কন্ঠে জবাব দিলো, তোমার কাছে এসেছি তাতে কি দোষ হয়েছে নাকি? অদ্ভুত তো! না তোমার স্বামী যদি কিছু মনে করে। ভাইয়ার সাথে কিছু হয়েছে উপমা? উপমা ভুরু কুঁ উলটে তাকায় রাশেদের দিকে। রাশেদ? তুমি আমার সাথে মজা করছো? রাশেদ বলে, তুমি না আমাকে সকালে বললে ভাইয়ার সাথে তোমার ঝামেলা হয়েছে? কচু চিংড়ি মাছ নিয়ে? উপমার ভুরু কুঁচকে যায় আরও। সোফা থেকে উঠে দাঁড়ায়। রাশেদ প্লিজ আমার ভালো লাগছে না! সরো তো তুমি। আমি রান্নাঘরে গেলাম!চা বানিয়ে আনছি।

উপমা হাঁটা দেয়। রাশেদ খপ করে উপমার ওড়নার ধরে বসে। উপমা ঘুরে এসে রাশেদের গালে থাপ্পড় লাগায়।

৩.
অসভ্য, জানোয়ার কোথাকার! কি করলি তুই এটা? আরেকটা থাপ্পড় পড়ে রাশেদের গালে। ব্যস্ত রাস্তার লোকজন জড়ো হয়। দোকানের মালিক এসে মেয়েটিকে জিজ্ঞেস করে। কি হয়েছে আপা? রাশেদের গালে আরো কয়েকটা থাপ্পড় পড়ে।
দোকান মালিক আব্বাস উদ্দিন রাশেদকে থাপ্পড় দিতে দিতে দোকান থেকে বের করে দেয়। একেকটা থাপ্পড়ে বলে, তোরে আমি আগেই সন্দেহ করছিলাম হারামজাদা। তোরে আমার দোকানে কামে রাখাই ঠিক হয় নাই। আরে মাঙ্গির পুত! মাইয়া মাইনষ্যের গায়ে হাত দিতে ভালো লাগে? রাস্তায় ভীড় জমেছে বলে জ্যাম লেগে যায়। পুলিশ আসে। রাশেদ থতমত খেয়ে যায়! কি হচ্ছে এসব? আশ্চর্য। হন্তদন্ত হয়ে ভীড়ের মধ্যে উপমাকে খুঁজতে থাকে। উপমা.. উপমা তুমি কোথায় গেলে? আমায় চা খাওয়াবে না? পুলিশ এসে রাশেদের কলার ধরে। দাতে দাত চেপে বলে, ঐ জানোয়ারের বাঁচ্চা, মাইয়া মাইনষ্যের শরীর ছুইতে ভালো লাগে তোর? রাশেদের গালে ঘুষি পড়ে! রাশেদ লুটি পড়ে মাটিতে।

মানুষ এসে জড়ো হয়। রাস্তায় শুয়ে কাঁতরাতে থাকে রাশেদ। ভীড়ের মানুষগুলো সব উপমার মুখোশ পড়ে আছে। রাশেদের মুখ থেকে রক্ত ঝরছে। তার দিকে এগিয়ে আসছে না কেউ। তার দিকে এগিয়ে এলো একটি পা। ঠিক রাশেদ মুখ বরবার!

৪.
টেবিলে বসে উপন্যাসের লেখাটা শেষ করার আগ মুহুর্তে লেখকের গালে দাঁতের কামড় পড়লো। লেখক খানিকটা বিচলিত হলো। শুধু শুধু তো নিজের গালের চামড়া নিজের কামড় দেয়ার কথা না। খেতে গেলে ভুল করে কামড় পরে যায়। কিন্তু শুধু শুধু কেন কামড় পড়বে। কামড়টা গুরুতর, রক্তের নোনা স্বাদ টের পাওয়া যাচ্ছে। গরম রক্ত বেরিয়ে আসছে মুখ জুড়ে।

লেখক বললো, এই দ্যাখো! তোমার নামই ভুলে গেলাম। বলো না?
সে বললো, আমার নাম শশীলতা।
লেখক বললো, ওহ সরি! আমি তো ভুলে গেলাম। আসলে গিয়ে হয়েহে বলো! উপন্যাস শেষ করলাম। ওখানের মূল চরিত্রের নাম উপমা। তাই তোমায় ডাক দিলাম।

লেখক শ্লমা জড়ানো গলায় ডাকলেন, উপমা এই উপমা? গলায় শ্লমা থাকার কারনে সেই কন্ঠোস্বর বেশি দূর গেলো না। এবার দরাজ কন্ঠে ডাকলেন, উপমা, এই উপমা। এ ঘরে আসবে একটু?
পাশের থেকে এলো একজন। দরজার সামনে দাঁড়িয়ে বলল, উপমা বলে ডাকছো কাকে?
লেখক জবাব দিলো, কেনো তোমাকে?
সে বলল, আমার নাম উপমা?
লেখক বললো, সেকি? তবে তোমার নামক?
সে বললো, ফাজলামো করো না তো রাশেদ।
লেখক বললো, এই দ্যাখো! তোমার নামই ভুলে গেলাম। বলো না?
সে বললো, আমার নাম শশীলতা।
লেখক বললো, ওহ সরি! আমি তো ভুলে গেলাম। আসলে গিয়ে হয়েহে বলো! উপন্যাস শেষ করলাম। ওখানের মূল চরিত্রের নাম উপমা। তাই তোমায় ডাক দিলাম।
শশী বলল, তোমার উপন্যাসে কোন ছেলে চরিত্র আছে?
লেখক জবাব দিলো, আছে তো। নামটা ঠিক খেয়াল নেই!

লেখক রাশেদ শশীলতার সাথে কথা বলতে বলতে আবার কামড় দিলো গালের চামড়ায়। ব্যাথায় কাঁকিয়ে উঠলো। শশীলতা ছুঁটে এলো,হন্তদন্ত হয়ে বলল কি হয়েছে রাশেদ? রাশের উত্তর দেওয়ার সময় আবার কামড় বসালো। মুখ থেকে রক্ত বেরোলো। রাশেদ কথা বলার চেষ্টা করতে লাগলো। কামড় বসাতে লাগলো একের পর এক। মুখ রক্তে ভিজে গেলো। রক্তে ভিজে গেলো শশীলতার শাড়ি।

রাশেদের ঘরে চারটি আয়নার প্রত্যেকটি আয়নায় নিজেকে দেখলো রাশেদ। প্রত্যেকটা চরিত্রে নিজেকে দেখলো সে। শুধু একটি আয়না ফাকা। সে আয়নায় জানলা দিয়ে চাঁদ দেখা যাচ্ছে। গাছের ওপর দিয়ে থালার মতোন লাল চাঁদ।

কিন্তু, আজ তো অমাবস্যা ছিলো। এই তো একটু আগে রাশেদ লিখলো-
চাঁদ দিয়েছে আত্মহুতি!
অমাবস্যার ভয়ে।
আমিও দেখেছি কালরাত্রি,
সব হারানোর পরে।

*

গদ্যে লেখা পদ্য
ওদের প্রথম দেখা হয়েছিলো অডিটোরিয়ামে। তখন স্টেজে কবিতা আবৃত্তি করছিলো নুসাইবা। আবির তার বন্ধু ফাহাদের সাথে গিয়েছিলো অডিটোরিয়ামে৷ আবির মাথা নিচু করে ফোন টিপছিলো। এক পর্যায়ে সে তাকায় স্টেজের দিকে। চোখে চোখ পড়ে যায় নুসাইবার সাথে। বুকটা ধ্বক করে ওঠে৷ বুকের মধ্যে কেমন অচেনা সুখের স্রোত বয়ে যায়। এদিকে নুসাইবার ক্ষেত্রেও একই ব্যপার ঘটে কবিতা আবৃত্তির এক পর্যায়ে সে থতমত খেয়ে যায়।কবিতা আবৃৃত্তি জগা খিচুরি হয়ে যায়!
অনুষ্ঠান শেষে নুসাইবার বান্ধবীরা আফসোস করে। আজকে তোর এমনটা হলো কেন রে? নুসাইবার মন খারাপ৷ সে জানে সে অনেক ভালো কবিতা আবৃত্তি করে তবুও আজ যে কেন এমনটা হলো৷ নুসাইবার মাথায় তখন একটা কথা খেয়াল এলো। সে যখন কবিতা আবৃত্তি করছিলো তখন একটি ছেলে তার দিকে তাকিয়ে ছিলো। সেও তাকিয়ে ছিলো তার দিকে।
সেই ছেলেটি বেশ কিছুদিন ধরে নুসাইবাকে অনুসরন করে। নুসাইবার অবশ্য বেশ ভালো লাগে। নুসাইবা জানে ছেলেটা তাকে পছন্দ করে! নুসাইবা খুব বই পড়তে ভালোবাসে। ভালোবাসে কবিতা লিখতে। ইদানীং তার সবকিছুই ভালো লাগে৷ বুকের মধ্যে কেমন একটা সুখ সুখ অঅনুভূতি। এটাকে কি ভালোবাসা বলে? কে জানে।
২.
একদিন কলেজ থেকে বাসায় ফেরার পথে নুসাইবার পিছু নিয়েছিলো আবির। নুসাইবা সেদিন দাঁড়া করায় ওকে, ‘আপনি আমাকে ফলো করছেন কেন?’ আবির থতমত গলায় বলে,’কোথায় না তো!’ নুসাইবা ধমক দিয়ে বলে,’আপনি আমার বাবাকে চেনেন? আপনি যে আমাকে ফলো করেন সেটা যদি আমার বাবা জানতে পারে তাহলে আপনার একটা হাত পাও আস্ত থাকবে না ৷
নুসাইবা হন হন করে হেটে আসে। বাসায় এসে তার মনে হল, ‘সে কেন বলল এই কথা? ইসস! মাঝেমধ্যে কি যে করে ফেলি। ‘আবিরও সেদিন ভড়কে গিয়েছিলো৷ তারপরের দিন আবির সিদ্ধান্ত নেয় নুসাইবার পিছনে আর ঘুরবে না।
তিন দিন পরের ঘটনা,’আবির নুসাইবাদের বাসার সামনে দিয়ে আসছিলো৷ ওর খেয়াল ছিলো না নুসাইবার বাসা এদিকে। নুসাইবাদের বাসার সামনে আসা মাত্রই একটা দলামোচা করা রঙিন কাগজ এসে তার গায়ে পড়ে৷ আবির কাগজটি কুড়িয়ে নেয় এবং খোলে৷ কাগজে লেখা,’আপনি এত বুদ্ধু কেন? ভীতু কোথাকার! ‘ তার নিচে সুন্দর করে একটা চোখ আঁকা। আবির উপরের দিকে তাকায়৷ একটা মেয়ে সরে যায় বেলকুনি থেকে৷ আবির বুঝতে এটা নুসাইবাদের বাসা৷ হ্যাঁ হ্যাঁ এটাই তো৷ আবিরের তখন খুশিতে আত্মহারা হয়ে যেতে ইচ্ছে করে।
সেদিন ছিলো নুসাইবার জন্মদিন। আবির হোম ডেলিভারি ম্যানের বেশ নুসাইবাদের বাসায় হাজির হয়৷ নুসাইবা দরজা খুলেই অবাক। আবির সুন্দর করে বলল,’শুভ জন্মদিন ম্যাডাম! ‘ সঙ্গে সঙ্গে নুসাইবা মুখে হাত দিয়ে অবাক হলো। নুসাইবার বাবা ড্রয়িং রুমে পেপার পড়ছিলেন তিনি জোড়ালো কন্ঠে জিজ্ঞেস করলেন,’কে রে মা?’ নুসাইবা বলল,”ডেলিভারি ম্যান বাবা৷ ‘ নুসাইবা সেদিন ভীষন খুশি হয়ে ছিলো। আবির নুসাইবাকে বেশকিছু বই উপহার দিয়েছে৷ আর সাথে একটি চিরকুট৷ চিরকুটে লেখা,’আমি তোমাকে ভীষন ভালোবাসি। আমি তোমাকে সেদিন থেকে ভালোবাসি যেদিন অডিটোরিয়ামে তোমার চোখের সাথে আমার চোখ আটোকে গিয়েছিলো৷ আমি তোমাকে সারাজীবন ভালোবাসতে চাই। তুমি কি আমাকে ভালোবাসো?’ নুসাইবা চিঠিটাকে বুকে জাপটে ধরেছিলো সেদিন। খুশিতে কাঁদতে ইচ্ছে হচ্ছিলো। নুসাইবা আর আবিরের ভালোবাসার গল্পের শুরুটা হয়েছিলো এভাবেই।ধীরে ধীরে তারা ভালোবাসায় জড়িয়ে ফেলেছিলো নিজেদের। নুসাইবা আবিরকে বলেছিলো, ‘তুমি আমার গদ্যে লেখা পদ্য। ‘
৩.
নুসাইবার মা মারা যায় তখন নুসাইবার ছ’বছর বয়স। ছোটবেলা থেকেই বাবা কোলে পিঠে করে মানুষ করেছে নুসাইবাকে৷ নুসাইবা তার বাবাকে অসম্ভব ভালোবাসে।নুসাইবা আর আবিরের মেলামেশা চোখ এড়ায় না নুসাইবার বাবা আফজাল সাহেবের। একদিন নুসাইবা আর আবির রিক্সায় করে ঘুরছিলো।
সেদিন ছিলো পহেলা বসন্ত। চারদিকে গাছে গাছে নতুন ফুল ফুটে ছিলো। শহর হয়েছিলো নতুন। নুসাইবা সেদিন সখ করে লাল শাড়ি পড়ে ছিলো। আবির পড়ে ছিলো লাল পাঞ্জাবী। নুসাইবার মাথা ছিলো আবিরের কাধে৷ আবির নুসাইবার হাতটা ধরের রেখেছিলো শক্ত করে। নুসাইবার বাবা এলাকার প্রভাবশালী ব্যক্তিত্ব রাজনীতিতে তার অবস্থা সূদৃঢ়। দাপটের কারনে এলাকার সবাই তাকে সমীহ করে চলে।অপরদিকে,আবিরের বাবা একটি অফিসে চাকরী করে
সেদিন সন্ধ্যায় নুসাইবার বাবা বসে ছিলেন ড্রয়িং রুমে৷ তার মুখের উপর পেপার। আবিরের বাবা সামনে বসে আছে। তার সামনে চা নাশতা দেওয়া হয়েছে। নুসাইবার বাবা আফজাল সাহেব গম্ভীর গলায় বললেন,’এখানে কতদিন ধরে আছেন?’ আবিরের বাবা বললেন,’প্রায় দেড় বছর! ‘ নুসাইবার বাবা বলল,’ছেলেকে ভালো করে মানুষ করছেন তো?’ আবিরের বাবা বলল,’আমি আমার দিক থেকে চেষ্টা করছি আর তাছাড়া আমার ছেলে তো বড় হয়েছে। ভার্সিটিতে পড়ে৷ ‘ নুসাইবার বাবা মুখের সামনে থেকে পেপার সরিয়ে বলল,’চেষ্টা করেছেন মানে?কার সাথে কি বলি। যেমন বাবা তেমন ছেলে। ‘ আবিরের বাবা শঙ্কিত গলায় বলে, ‘কেন ভাইজান? আমার ছেলে কিছু করেছে?’ নুসাইবার কঠিন গলায় বলল,’আপনি দেখি আপনার ছেলের খবরও রাখেন না৷ কি করেছে মানে? জানেন না?’ আবিরের বাবা আস্ত গলায় বলল,’কি করেছে?’ নুসাইবার বাবা চিৎকার দিয়ে বলল,’চুপ! তোর ছেলে আমার মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়। তুই কয়টাকার চাকরী করিস? আমার মাসিক ইনকাম জানিস? তোর ছেলে আমার মেয়েকে নিয়ে ঘুরে বেড়াবে কেন? ‘ আবিরের বাবা আফজাল সাহেবের ব্যবহারের আহত হলেন। আফজাল সাহেব আবিরের বাবার দিকে ঝুকে এসে বলল,’সরি ভাই! আজকাল মাথা ঠিক রাখতে পারি না।আপনাকে একটা কথা বলি মন দিয়ে শোনেন। আগামী তিন দিনের মধ্যে এই এলাকা ছাড়বেন। এই এলাকা থেকে অনেক দূরে চলে যাবেন। আপনার ছেলে যদি আর আমার মেয়েকে ফুসলিয়ে ফাসলিয়ে ঘোরে তাহলে আপনাকে আমার ছেলেপেলেরা মুখে মবিল মাখিয়ে গোটা এলাকা ঘোরাবে। কথাটা মাথায় রাখবেন।
এরপর আফজাল সাহেব মুখের উপর পেপার ধরলেন৷ আবিরের বাবা আফজাল সাহেবের ব্যবহারে আহত হয়ে বেরিয়ে থেকে বেরিয়ে এলো। নুসাইবা সেদিন তার রুমে বসে সব শুনে ছিলো। তার বাবা এতটা নিষ্ঠুর সে আগে কখনোই জানেনি। সেদিন রাতে বাসা জুড়ে ভাঙচুর করলো নুসাইবা৷ নুসাইবার বাবার তার মেয়েকে কষিয়ে থাপ্পড় বসিয়ে দিলেন। নুসাইবা ছিটকে দেয়ালে আঘাত লেগে গিয়ে মাথা ফেটে গেলো।
এদিকে সেদিন আবিরের ছোটবোন নীতু আবিরের মোবাইলে নুসাইবার ছবি দেখে ফেলেছিলো। আবিরকে ভেঙচি কেটে বলেছিলো তোর ফোনে একটা মেয়ের ছবি দেখলাম। মেয়েটা কে রে? আবির বলল খবরদার কাউকে বলবি না।নীতু আবদার করলো তাকে চকলেট এনে দিতে হবে। আবির বলল সেদিনই তো এনে দিলাম৷ নীতু বলল হবে না । একপর্যায়ে আবির নীতুর কাছ থেকে ফোনটক ছিনিয়ে নিতে গেলো। নীতু ছুটলো, আবির ছুটলো নীতুর পিছু পিছু। দুইভাইবোনের খুনসুটি দেখে আবিরের মা বলছিলো,’থাম থাম এই তোরা থাম। দেখো দুইটার কান্ড দেখো। কে বলবে এরা বড় হয়েছে! এই থাম তোরা থাম। ‘
আবিরের বাবা তখন দরজা নক করছে। আবির গিয়ে দরজা খুলল। আবিরকে দেখে আবিরের বাবা কষিয়ে একটা থাপ্পড় দিলেন। আবির কিছু বুঝে ওঠার আগেই সব যেন থমকে গেল। আবিরের বাবা ক্লান্ত শরীর নিয়ে সোফায় গিয়ে বসে চোখের চশমাটা খুলে চোখ দুটো তে ডান হাত দিয়ে চোখ বোলাচ্ছিলো।আবিরের বাবা চিৎকার দিয়ে বলল পুরো ঘটনা। আবিরের তখন নিজের কাছে নিজেকে অসহায় মনে হচ্ছিলো। আবিরের বাবা আবিরের উপর রাগ ঝাড়ছিলো।আবিরের ছোটবোনের চোখটাও টলমল করছিলো জলে। আবিরের মা কাঁদছিলো।
তিন দিন পরে আবিররা ঐ এলাকা ছেড়ে চলে আসে। আসার সময় দূর থেকে দেখছিলো নুসাইবা এসেছে। সে ফুপিয়ে ফুপিয়ে কাঁদছে। আবিরের বন্ধু ফাহাদ এসে আবিরকে জড়িয়ে ধরে বলে যা হয়েছে ভুলে যা। এখানে আর আসিস না। ভালো থাকিস। নতুন জায়গায় গিয়ে আবিরের বোন আবিরের হাতে একটা চিরকুট দিয়ে বলে,’এটা আসার সময় নুসাইবা আপু দিয়েছে।’ আবির চিরকুটটি পড়ে।
চিরকুটে লেখা,’আমার জন্যেই তোমাদের এমন হলো। আমি কখনোই নিজেকে ক্ষমা করতে পারবো না। তোমরা ভালো থেকো। আর হ্যা জেনে রেখো আমি তোমাকে কখনোই ভুলব না। আমি তোমাকে ভালোবাসি। তুমি আমার গদ্যে লেখা পদ্য। আমাকে নিয়ে আর কখনো ভেবো না। নিজেকে আর পরিবারকে নিয়ে ভালো থেকো। ‘
– নুসাইবা।

৪.
চার বছর পরের ঘটনা,আবির স্কলারশিপ পেয়ে বিদেশে চলে যায়। আজ দুই বছর পর সে দেশে ফিরছে। ইরফান এয়ারপোর্টে আবিরের জন্য অপেক্ষা করছিলো। ইরফানের সাথে আবিরের পরিচয় বিদেশে থাকতে হয়।
ইরফান গাড়ি ড্রাইভ করতে করতে বলে,’আজ তোকে একটা সারপ্রাইজ দেব। ‘ আবির বলে কি সারপ্রাইজ? ইরফান বলে,’উহু! আগে তো সারপ্রাইজের কথা বলা যাবে না! ‘ ইরফানের জন্য সবাই অপেক্ষা করছিলো।আজ ইরফানের এনগেজমেন্ট। আবির এক মূহুর্তের জন্য থমকে যায়। ইরফানের সাথে যে মেয়েটির এনগেজমেন্ট হবে সে আর কেউ না;সে নুসাইবা। ইরফান পরিচয় করিয়ে দেয় দুজনের মধ্যে। আবিরের তখন ইচ্ছে করছিলো চিৎকার করে কাঁদতে। আবিরের বুকের মধ্যে তোলপাড় হয়ে যাচ্ছিলো। নুসাইবাও চিনতে পারে আবিরকে।
আবির ভাবে বিধাতা কেন এত বছর পরে তাদের আবার এক সাথে করলো? আর দেখা হয়েও কেন সমীকরণটা এত কঠিন হয়ে গেল? এরপরের ঘটনা লেখক জানেন না। কিছু গল্প অসমাপ্তই থেকে যায়।
এখান থেকে কোন গল্প নির্দ্বিধায় অন্য কোথাও পোস্ট করার আগে লেখকের অনুমতি নেওয়া আবশ্যক। বিনাঅনুমতিতে লেখা কপি করে অন্য কোন মাধ্যমে প্রকাশ করা হলে সেই কপিবাজের বিরুদ্ধে আইনগত ব্যবস্থা নেওয়ার জন্য বাধ্য থাকবেন লেখক। লেখা অন্য কোথাও প্রকাশ হলেও, লেখকের ফেসবুক পেইজের লিংক মেনশন করে দেওয়ার জন্য সুযোগ দেওয়া হলো।   আশিক মাহমুদ রিয়াদ

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
হাসির গল্প - পঙ্কু দাদু

হাসির গল্প – পঙ্কু দাদু

সাকিব হোসেন নাঈম এলাকার দশজন ধনী ব্যক্তির তালিকা করলে দু তিন নাম্বারে আসে পঙ্কু দাদুর নাম। তার প্রকৃত নাম কেউই জানেনা কারণ তার ‘পঙ্কু দাদু’ ...
ক্রিয়াচক্র

ক্রিয়াচক্র

তোফায়েল তফাজ্জল এগারো মাসের ক্রিয়াচক্র একে একে টান খায়, পালা পেয়ে পা রাখে বৈশাখ ঝাঁপটিয়ে সরল ডানা। ফলে, এর রেখাপাত পিচ ঢালা পথে, লোকালয়ে – ...
শিশুতোষ গল্প-দাদুর সাথে জঙ্গলে আরাফ

শিশুতোষ গল্প-দাদুর সাথে জঙ্গলে আরাফ

 ফজলে রাব্বী দ্বীন আরাফ খুবই অসুস্থ। চার দিন ধরে টানা বিছানায় পড়ে আছে। তার গায়ে প্রচণ্ড জ্বর। মুখে কোন কথা বলতে পারছে না। মাঝেমধ্যে দু’একটা ...

নগ্নগন্ধ [পর্ব-০৭]

আশিক মাহমুদ রিয়াদ গত পর্বের পর থেকে। গত পর্ব পড়তে এখানে ক্লিক করুন। সুদীপা আমি  আর এ কাজ করতে চাই না! বিষন্য গলায় বলে প্রীতি। ...
টাইরেস ডেভান হ্যাসপিল

টাইরেস ডেভান হ্যাসপিল

জোবায়ের মিলন সূর্যের গর্ভেও জন্ম নিতে পারে অন্ধকার, নেয়/ হরিণীর পেটেও আসে শুয়োর ভ্রূণ/ শুয়োর জন্মায়/ ‘টাইরেস ডেভান হ্যাসপিল’ তেমন একটি দীর্ঘপ্রাণ/ বিকৃত কুকুরের বীর্জ, ...
তোমার গায়ে হলুদে

তোমার গায়ে হলুদে

অমিত মজুমদার আমার ঘরে বাঘ এসেছে তোমার দেহে কুমীর কেটে খাল দাঁড়িয়ে আছি মাঝ আকাশে দেখতে পাচ্ছি আপেল রাঙা গাল। একটু না হয় দোলই খাবো ...