ছোটগল্প: সাঁঝদুয়ারী

 আশিক মাহমুদ রিয়াদ 

সন্ধ্যে নামার আগেই গাঢ় অন্ধকারে ডুবে গেছে চারপাশ। বুনো মশার বুন বুন শব্দ। বারান্দায় নামাজ পড়ছেন আব্বা। সুর করে সূরা পড়ছেন। দাদীর ঘরে উঁকি দিয়ে দেখলাম তিনি সেজদায় গিয়েছেন। মা বাইরে হাস মুরগীকে খোপে ঢোকাচ্ছে। রুনু বুবু মায়ের সাথে আছে। রুনু বুবুর চুল খোলা, মা রুনু বুবুর মাথায় চাটি মারলো। দাঁতে দাঁত পিষে রুনু মা রুনু বুবুকে বলল,’সন্ধ্যে বেলা শাকচুন্নির মতো চুল খোলা কেন তোর? ঘরে যা !  আমাকে নজরদারী করতে হবে না। ‘ রুনু বুবু মাঠিতে হাত-পা ছেড়ে ছেড়ে ঘরের ভেতরে ঢুকলো। ঘরে ঢোকার আগে আমার গাল ধরে টেনে গেলো। আমি বিরক্ত হয়ে মুখ থেকে- উফফ করে শব্দ করলাম। মা আমার দিকে তাকালেন।আমি খুটি ধরে মায়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। মাকে বললাম-মুরগি কি ডিম দিয়েছে? মা উঁচু গলায় বললেন- আরেকজন আসছে খবরদারী করতে। যা ঘরে যা।  আমি ঘরে গেলাম না, রান্নাঘরের খুটি ধরে দাঁড়িয়ে রইলাম।ঘুট ঘুটে অন্ধকারে মধ্যে ফয়সাল ভাইয়াকে দেখতে পেলাম। সে ঘরে ঢোকার আগে আমার মাথায় চাটি মেরে গেলো। আমি ফয়সাল ভাইয়ের দিকে তাকিয়ে রইলাম। রাগ করতে শুরু করলাম।  ফয়সাল ভাইয়াকে আমার মোটেও ভালো লাগে না। আমাকে দেখতে পেলেই শুধু শুধু মারে আমাকে। আমাদের ছোট একটি পরিবার।আমরা তিন ভাই বোন। আমি ক্লাস এইটে পড়ি। রুনু বুবু কলেজে উঠেছে। কিন্তু তার স্বভাব এখনো ক্লাস ফাইভে পড়ুয়া মেয়েদের মতো। ফয়সাল ভাইয়া আর রুনুবুবু একক্লাসেই পড়ে। তবে ফয়সাল ভাইয়া রুনুবুবুর থেকে বয়সে বড়। রুনু বুবু আর ফয়সাল ভাইয়া প্রায়ই ক্লাসে ফেল করে। আমি এখন পর্যন্ত একটি ক্লাসেও ফেল করিনি। তাই আব্বা আমাকে ভালোবাসে। 

২.

সন্ধ্যেবেলায় পাশের বাড়ি থেকে ঝুমুরের রুম ঝুম শব্দে আমার আর পড়ায় মনোযোগী হওয়া ওঠে না। আমি চিন্তায় মগ্ন হয়ে ঝুমুরের রুমঝুম শুব্দ শুনি। এ ঝুমুরের শব্দ আসে যার পা থেকে তার নাম মৃণাল। মৃণালদা দেখতে কিছুটা মেয়েদের মতো স্বভাব-চরিত্রও কিছুটা মেয়েদের ছাপ পাওয়া যায়। মৃণালদা ভালো মানুষ,নরম মনের মানুষ। আমাকে দেখলেই আমার মাথায় হাত বুলিয়ে দেয়। মৃণালদা মাঝেমধ্যেই আমাদের বাড়িতে আসে। বুবুর সাথে গল্প করে। দাদী এতে তার গাম্ভীর্য প্রকাশ করেন।ভুরু কুঁচকে বলেন,আমার বয়স হয়েছে। আমি কি আর এসব বুঝি? দুদিন পরে যাব কবরে। রুনু বুবু দাদীকে ভেঙচি দেয়। দাদী এতে রেগে যান- রগরগে গলায় মৃণাল দা’কে বলেন ,ছেলেটাও হয়েছে ঢের। হলে রগরগে পুরুষ মানুষ হতি। হয়েছিস পুরুষ মানুষ,ঢং মেয়েদের মতো।মৃণালদা গলায় আহ্লাদের সুর এনে বলেন,কেন গো? পুরুষ মানুষ হলে আমায় বিয়ে করতে বুঝি? বুড়ো বয়সে বিয়ে হতো? মৃণাল দা আমাকে বলল,এই শুভ তুই আজ থেকে আমাকে দাদা বলে ডাকবি।  দাদী মুখ ভেঙচি দিয়ে বলেন,উহহহ! মরণ। তা কোন খাতিরে এ বাড়িতে আসিস? বুঝি না বুঝেছিস। রুনুবুবু, দাদীর উদ্দেশ্য গরম কথা বলে। মৃণাল দা’কে নিয়ে চলে যায়। চলে যাওয়ার মৃণালদা দাদীকে মুখ ভেঙচি দেয়। আমি খিলখিল করর হাসি। দাদী আমাকে ধমক দিয়ে বলে,তুই হাসছিস কেন চোখের সামনে থেকে বিদেয় হ? 

৩.

ফয়সাল ভাইয়া মৃণালদাকে দু চোখে দেখতে পারে না। মৃণালদা আর ফয়সাল ভাইয়া একই বয়সের। মৃণালদা লেখাপড়ায় ভালো হওয়াতে বাবা প্রতিদিনই ফয়সাল ভাইয়াকে ধমক দিয়ে বলে- যা- গিয়ে মৃণালের পাধোয়া পানি খা। সারাদিন টইটই করে ঘুরবি, বদ ছেলেদের সাথে মিশে বিড়ি-সিগারেট খাবি,লেখাপড়া ভালো হবি কিভাবে? বদ পয়দা করছি একটা।  মৃণালদা বাইরে বসে বাবার কথা শুনে হাসে।ফয়সাল ভাইয়া মুখ কালো করে ঘর থেকে বেরিয়ে আসে। মৃণালদাকে হাসতে দেখে দাঁত খিচিয়ে অস্পষ্ট স্বরে কি যেন বলে, হাটা দেয়। মৃণালদা হাত নাড়িয়ে বলে- আমি আজ হাসতে হাসতে মরে যাব। 

৪.

শরতের স্নিগ্ধতা;টিনের চালে ট্যাপড় ট্যাপড় শব্দ।  কাঁচা ঘুম ভেঙেছে সবে। হাত ঘড়িটার দিকে তাকিয়ে দেখলাম সকাল হতে এখনো অনেক বাকি।   মুরগির খোপে মুরগির ডাকাডাকি। আমি চোখ বুজে তন্দ্রার মতো পড়েছি। সকালবেলার ঘুম, মধুর ঘুম।  ঘুম ভাঙে যখন,তখন সূর্য উঠেছে সবে। টিনের ফুটো দিয়ে রোদ এসে পড়েছে আমার মুখে। অসহ্য গরম লাগছে। গলাটা ব্যথায় টনটন।   পাশের বাড়িতে ভাঙাচোরার শব্দ। হঠাৎই ভেসে আসে কান্নার সুর। আমি ধড়মড়িয়ে উঠি। আব্বা কাঠের দরজা খুলে দৌড়ে যায়। আমিও বিছানা ছেড়ে সদর দরজার সামনে গিয়ে দাড়াই।  মৃণালদার গলায় দড়ি। গলাটা লাল হয়ে আছে। মৃণালদার শরীর ঝুলে আছে।হাতের মুষ্টি শক্ত করে লেগে আছে! নিচের চেয়ারটা উল্টে পড়ে আছে। মৃণালদার দিকে তাকাতে পারলাম না। বিভৎস দৃশ্য। 

৫.

আব্বাকে কিছুদিন দুশ্চিন্তায় থাকতে দেখা গেলো। মায়ের সাথে কিছুক্ষণ বিড়বিড় করতে দেখা গেলো।  আমি কান পেতে শুনলাম কিছু কথা- এমন ছেলে কেন পয়দা করেছো? সব শেষে এই কাজ? ছিহ! ভাবতেই লজ্জা লাগে৷  আব্বা বসে আছেন বারান্দায়। তার মাথায় হাত। চোখে চশমা। আমি বাবার শরীরে হাত রাখলাম। বাবা ধমকের সুরে বললেন-ভেতরে যা। 

বিকেল বেলায় আমি আর রুনুবুবু মৃণালদাদের বাড়িতে গেলাম। মৃণালদার মা মুখে খাবার দাবাড় তুলছে না।রুনুবুবু ভাতের থালা নিয়ে মৃণালদার মাকে ভাত খাওয়াতে গেলো। তিনি কাঁদছেন। পুত্র হারানোর শোক কত বেদনার? এক বুক পাহাড় ধ্বসের মতো? এ পৃথিবীর সব দুশ্চিন্তা, উৎকন্ঠা, দূঃখ মায়ের বুকে। সব মায়েরাই চান, তাদের সন্তান যেন থাকে দুধেভাতে। মৃণালদার মা রুনুবুবুর হাত থেকে ভাত মুখে নিলো। শুধুই সাদা ভাত। তারপর হু হু করে কাঁদতে শুরু করে দিলো।আমারও মন খারাপ হয়ে গেলো। আমার দুচোখে কান্নার জল চলে এলো। কান্না লুকাতে আমি সরে এলাম ওখান থেকে। মৃণালদাদের বাড়ি বেশ বড়। হাটতে হাটতে মৃণাল দার ঘরের সামনে গেলাম। ঘরে উঁকি দিতেই অজানা কারনে গা ছমছম করতে লাগলো। 

একটু হেটে সদর দরজার দিকে এগোলাম। বারান্দায় এসে এ দৃশ্যপট দেখার জন্য আমি মোটেও প্রস্তুত ছিলাম না।  আব্বা মৃণালদার বাবা অনীল কাকুর কাছে হাত জোড় করে মিনতি করছে। আমি অবাক হলাম। বাবা হাত জোড় করতে করতে অনীল কাকুর পায়ের কাছে পড়ে গেলো- বাবা কান্নাজড়ানো কন্ঠে বলল,’দাদা আমার ছেলেটাকে মাফ করে দিন। ওর  পরিচয় দিতে আমার লজ্জা লাগে। দাদা ওকে থানা পুলিশে দেবেন না। ‘ অনীল কাকু আব্বাকে পায়ের কাছ থেকে তুলে আনলো- হু হু করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,’আমার ছেলেটাকে হারিয়েছি। তুমি কি বুঝবে আমার ছেলে হারানোর কষ্ট?।তিনি আব্বাকে জড়িয়ে ধরলেন। আমার মন আরো খারাপ হয়ে গেলো। আমিও হুহু করে কেঁদে ফেললাম।  বাড়ির ভেতর থেকে চিৎকার ভেসে আসলো। ধালাবাসন ভাঙাচোরার শব্দ শোনা গেলো। মৃণালদার মা থালাবাসন ছুঁড়ছে। রুনুবুবুকে ধাক্কা দিয়ে ফেলে দিয়েছে। রুনুবুবুর কপাল ফেঁটে গিয়েছে। মাকড়শার পায়ের মত রক্ত ছড়িয়ে গিয়েছে কপাল জুড়ে। 

৬.

ফয়সাল ভাই মৃণালদার মৃত্যূর সাথে কোন ভাবে জড়িত। ফয়সাল ভাইকে বাড়িতে দেখতে পেলাম না বেশ কয়েকদিন। তার পর একদিন এসে উপস্থিত হলো বাড়ির দরজায়। বাবা তার বানানো মোটা লাঠি দিয়ে ফয়সাল ভাইকে মারলেন। ফয়সাল ভাইয়ের কপাল ফেঁটে গেলো।অজ্ঞান হয়ে পড়ে রইলেন বাড়ির সামনের উঠোনে। রক্ত গড়ালো উঠোন জুড়ে।  মা উঠোনে এসে পাগলে মতো কাঁদলেন। ফয়সাল ভাইকে হাসপাতালে নেওয়া হলো। ফয়সাল ভাই হাসপাতাল থেকে বাড়িতে ফিরলেন কয়েকদিন পর। তার মাথায় ব্যান্ডেজ। কারো সাথে কথা বলেন না।  একদিন বিকেলে উঠোনে বসে আমি আর রুনুবুবু কথা বলছিলাম। হঠাৎ হকচকিয়ে উঠলাম। ফয়সাল ভাই শাড়ি পড়েছেন। কপালে বড় একটি টিপ। বাবা ফয়সাল ভাইকে আবারো মারলেন। 

এক বছর পরের ঘটনা,  এভাবে কেঁটে গেলো কতদিন। দুর্গোপূজো এলো। মৃণালদাদের বাড়িতে প্রতি বছর ধুমধাম করে পূজো হয়৷ আমরা যেতাম, কত আনন্দ হতো। মৃণালদা কাশফুল নিয়ে ছুঁটে বেড়াতো। ঢোল বাজাতো। ধুনুচি  নাচতো।  একদিন সাত-সকাল বেলা আমার ঘুম ভেঙে গেলো। শরৎ এর সকাল। মিষ্টি গন্ধ। টিনের চালে টুপটুপ আওয়াজ। আমি জানলা খুলে বাহিরে তাকালাম। সেই সকালটি ছিলো আমার জীবনের আরো একটি বেদনাময় সকাল। ফয়সাল ভাই ঝুলে আছে ছবেদা গাছে। তার পড়নে মায়ের বিয়ের শাড়ি। আমি কেন যেন অবাক হলাম না। বাবার দোর খোলার শব্দ কানে আসলো। বাবার চিৎকারে জামরুল গাছ থেকে উড়ে গেলো দুটো হলদে পাখি।

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *