অচিনপুরের দেশে: নবম পর্ব

পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় এবং গৌতম সরকার

 

গৌতম সরকার

কদিন নাগাড়ে বৃষ্টি হওয়ার পর আকাশ আবার ঝকঝকে তকতকে। ঈশ্বরকে অশেষ ধন্যবাদ ধান গাছের তেমন কোনো ক্ষতি হয়নি। জল নেমে গেছে, গাছগুলি আমার লকলকে হয়ে উঠেছে, হেমন্তের নরম হাওয়া গায়ে মেখে গাছগুলি হৃদয়ের সব মধু ঢেলে দিয়ে ধানের দানাগুলোকে আরো পুরুষ্ট করে তুলছে। বলাবাহুল্য এ কদিন আমার নাওয়া-খাওয়ার সময় ছিলোনা। সকাল থেকে দুপুর পেরোনো পর্যন্ত মাঠে মাঠেই সময় কেটেছে। কোনো কোনোদিন দুপুরে কিছুক্ষণের জন্যে ফিরে স্নান-খাওয়া সেরে আবার বেরিয়ে পড়তে হয়েছে। তাই আমাদের আস্তানায় ইতিমধ্যে ঘটে যাওয়া অনেক কিছুই আমার নজর এড়িয়ে গেছে। সুবল সুস্থ হয়ে ওঠার নোটিশ আমি পেয়েছি। যদিও আমি আগেই জেনেছি সুবলের সুস্থ হয়ে ওঠার খবর। এর মাঝে বিকেলের দিকে একদিন ডাক্তারবাবুর চেম্বারে ঢুঁ মেরেছিলাম, সেখানেই খবরটা পেয়েছিলাম। এর মধ্যে শকুন্তলা আবার ছেলে কোলে নিয়ে কাজে যোগদান করেছে। ব্যাপারটার মধ্যে আমি কোনো অস্বাভাবিকত্ব দেখিনি। কিন্তু কয়েকদিন পর টের পেলাম শকুন্তলার কাজে যোগদান নিয়ে কটেজ উত্তাল হয়ে উঠেছে, কটেজ বলতে কটেজের কতিপয় লোকজন। সুবলের অসুখের পর তারা চাইছিল শকুন্তলা যেন কোনোভাবেই কাজে যোগদান না করে। কেউ কেউ তো এ প্রস্তাবও দিয়েছিল যে পরিবারটিকে গ্রাম থেকেই উচ্ছেদ করা হোক। কিন্তু গোটা ব্যাপারটায় লীলাদি ছিলেন অনড়। এই স্হিতধী, সমাহিত মহিলা ডাক্তারবাবুর চিকিৎসার ওপরে পুরোপুরি ভরসা রেখেছিলেন। ডাক্তারের নির্দেশমতো নিজের শত অসুবিধা সত্বেও শকুন্তলাদের গৃহবন্দীর ব্যাপারটা বিনা বাক্যব্যয়ে মেনে নিয়েছিলেন এবং যে মুহূর্তে ডাক্তারবাবু সুবলকে সম্পূর্ণ সুস্থ ঘোষণা করেছেন সেই মুহূর্তেই শকুন্তলাকে পুনরায় কাজে বহাল করেছেন। এব্যাপারটা নিয়ে তুমুল হট্টগোল হয়েছে। কিন্তু লীলাদি কারোর আপত্তিকে বিন্দুমাত্র পাত্তা দেননি। তিনি ঘোষণা করেছিলেন, শকুন্তলা এখানে কাজ করবে, তাতে কারোর আপত্তি হলে সে নিজের ব্যবস্থা নিজে করে নিতে পারে। কিন্তু কলহপ্রিয়, স্বার্থান্বেষী মানুষগুলো সে কথা শুনবে কেন? তারা মিলিত প্রতিবাদ জানিয়েছে–সরকার তাদের এই আশ্রয়ের ব্যবস্থা করেছে, এবং তাদের নিরাপত্তার ব্যবস্থা করেছে। সেই নিরাপত্তা বিঘ্নিত হওয়ার আশঙ্কা থাকলে সেটা তারা কোনোভাবেই মেনে নেবে না। আর লীলামাসী ( ছেলে-বুড়ো সবাই মহিলাকে এই নামেই সম্বোধন করে ) পয়সা নিয়ে সরকারের আদেশ পালন করছে, তাই তাঁর নিজের কোনো আইন তারা মানতে বাধ্য নয়। এই চাপানউতোর বেশ কয়েকদিন ধরেই চলছে। আমার কানে উড়ো উড়ো কিছু খবর এলেও পুরোপুরি জানা বা বোঝার সময় ও সুযোগ কোনোটাই হয়ে ওঠেনি। একদিন রাত্রে স্ত্রীর কাছে শুনলাম শকুন্তলাকে কটেজেই ঢুকতে দেওয়া হয়না। আজ মাঠের কাজ একটু তাড়াতাড়ি শেষ হওয়ায় বেলাবেলি ফিরে এলাম। কটেজে ঢোকার মুখে দেখি শকুন্তলা বাচ্চাটির হাত ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে, চোখে জল। আমি পাশ দিয়ে আসার সময় মুখটা নিচু করে নিল, বোধহয় চোখের জল লুকোলো। আমি বাচ্চাটির ঘন চুল এলোমেলো করে দিয়ে গেট পেরিয়ে ঢুকলাম। কটেজের চৌহদ্দির মধ্যে তখন তুমুল চেঁচামেচি চলছে। প্রায় জনা পনেরো নারীপুরুষ জমা হয়েছে, তারা উত্তেজিত ভঙ্গিতে যার উদ্দেশ্যে চোখা চোখা বাক্যবাণ ছুঁড়ে দিচ্ছে তিনি ডাইনিং হলের দরজার সামনে স্থির, অবিচল ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছেন, একটাও কথা বলছেন না। ওনার চুপ করে থাকায় জমায়েতে থাকা মানুষগুলো আরোও উত্তেজিত হয়ে উঠছে। আমি কিছুক্ষণ থমকে দাঁড়িয়ে রইলাম। এই পরিস্থিতিতে আমার কি করণীয় বুঝে উঠতে পারলাম না। লীলাদির পিছনে আমার স্ত্রী আর রান্নাঘরে কর্মরত আরো কয়েকজন মহিলাও নিশ্চুপে দাঁড়িয়ে। হামলাকারীদের মধ্যে অগ্রগণ্য তথাকথিত কটেজবাসী ডাক্তার মহোদয়, তার চেলা চামুন্ডারা আর তাদের পরিবার পরিজন। ডাক্তার মশাইয়ের প্রধান চেলা হয়েছেন অবসরপ্রাপ্ত এক সরকারি আমলা। তিনি চাকরি জীবনের দাপট ভুলতে না পেরে কটেজে আসা ইস্তক নিজ খুশিমতো বিভিন্ন নিয়মকানুন প্রণয়ন করার চেষ্টা করে যাচ্ছেন। কিন্তু লীলাদি একজন পোড় খাওয়া মহিলা। জীবন পথের বিভিন্ন ঘটনা-দুর্ঘটনা ওনাকে ভিতরে-বাহিরে শক্তপোক্ত করে তুলেছে। তিনি এই অযাচিত আহাম্মকিতে টলার মানুষ নন। কিন্তু আজকের ঘটনা একটু অন্যদিকে মোড় নিয়েছে। সমস্যাটা যে শকুন্তলাকে নিয়ে সেকথা বলাই বাহুল্য। এতদিন মেয়েটি যে যে কটেজ আপত্তি করতো সেগুলো বাদ রেখে বাকি কটেজ, উঠোন, রাস্তা পরিষ্কার করতো। কিন্তু আজ এই মানুষগুলো আপত্তি জানাচ্ছে- বাতাসেও এই মারণ রোগের জীবাণু ভেসে বেড়াতে পারে (তারা সুবলের সুস্থ হয়ে ওঠা সংক্রান্ত লীলামাসির কথা বিশ্বাস করেনি), তাই তাদের নিজ নিজ কটেজ সাফ না করা সত্বেও কটেজ চত্বরে শকুন্তলা আর তার বাচ্চার উপস্থিতি তাদের প্রাণ সংশয় ঘটাতে পারে৷ এই কারণে তাদের দাবি অবিলম্বে শকুন্তলার কটেজে আসা বন্ধ করতে হবে। লীলাদি যখন তাদের দাবি মানতে রাজি হননি, তখন নারী-পুরুষের দল রে রে করে শকুন্তলাকে চত্বর থেকে বের করে দিয়েছে। তখন থেকেই বেচারি রোদের মধ্যে ছেলের হাত ধরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে আছে। তাকেও তো বিচারের শেষ রায় শুনে যেতে হবে! এই কাজ চলে গেলে আপাত কর্মহীন স্বামী আর ছেলের মুখে কিভাবে দুমুঠো খাবার তুলে দেবে সেই চিন্তায় ব্যাকুল হচ্ছে। আমি জমায়েতের পাশ দিয়ে আস্তে আস্তে খাবার ঘরের দিকে এগিয়ে গেলাম। সামনে থেকে একবার সবার মুখের দিকে তাকিয়ে লীলাদিকে ইশারা করলাম খাবার ঘরের ভিতরে যেতে। কোনো কথা না বলে লীলাদি দরজা ছেড়ে ভিতরে চললেন, আমিও ওনাকে অনুসরণ করে ভিতরে এলাম। আমাদের দুজনের মধ্যে কয়েক মিনিটের কিছু কথা হলো। তারপর লীলাদি আবার দরজার বাইরে বেরিয়ে সমবেত জনতার উদ্দেশ্যে দৃঢ় গলায় বললেন, ” ঠিক আছে আজ সন্ধ্যেবেলা ডাক্তারবাবুকে অনুরোধ করবো এখানে এসে আপনাদের সঙ্গে কথা বলতে। আপনাদের প্রশ্নের জবাব দিতে। তবে আলোচনা শেষে উনি যা বিধান দেবেন বিনা বাক্যব্যয়ে সেটা সকলকে মেনে নিতে হবে।” এই বলে কাউকে আর কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উনি নিজের কাজে খাবার ঘরের অন্দরমহলে গিয়ে ঢুকলেন।

সন্ধ্যেবেলা নয়, একটু রাতের দিকেই ডাক্তারবাবু কটেজে এলেন। চেম্বারের কাজ সারতেই তো তাঁর সন্ধ্যা পেরিয়ে যায়, তারপর ঘরে ফিরে স্নান করে পরিষ্কার হয়ে পোশাক বদলে আসতে প্রায় সাড়ে আটটা হয়ে গেল। অনিশ্চিতপুরে সাড়ে আটটা মানে একটু রাতই বটে, তবে আমাদের কটেজে শহুরে অভ্যাসে অভ্যস্ত বাবু-বিবিদের জন্যে লীলাদি ডাইনিং হল রাত দশটা পর্যন্ত খোলা রাখেন। আজকের ব্যাপারটা অবশ্য আলাদা। আজ সমস্ত কটেজবাসী ডাক্তারবাবুর জন্যে উদগ্রীব অপেক্ষা করছিলেন। তবে দেখলাম ডাক্তারবাবুর সাথে আরেকজন ভদ্রলোক এসেছেন। ভদ্রলোক যে এই এলাকারই সেটা লীলাদির সঙ্গে ঘনিষ্ঠ আলোচনায় প্রতীতি হলো। পরে পরিচয় পেলাম, উনি এখানকার পঞ্চায়েত সমিতির প্রধান। আমি আগেই শুনেছিলাম এখানকার স্থানীয় প্রশাসন, সরকার ও স্বাস্থ্য দপ্তরের সাথে কাঁধে কাঁধে মিলিয়ে কাজ করে চলেছে। তাই এই আলোচনা সভায় ওনার উপস্থিতি আমাকে মনে মনে অনেকটা স্বস্তি দিলো। প্রথমে ডাক্তারবাবু তাঁর বক্তব্য শুরু করলেন। উপস্থিত সবাইকে নমস্কার জানিয়ে তিনি তাঁর সুনির্দিষ্ট ও সুস্পষ্ট বক্তব্য ব্যক্ত করলেন। তাঁর বক্তব্যকে সংক্ষেপ করলে দাঁড়ায়: আমাকে আজ এখানে কেন আসতে হয়েছে সে ব্যাপারে আমি সম্যক ওয়াকিবহাল। সেই পরিপ্রেক্ষিতে আমার আপনাদের কিছু বলার আছে। আমার কথা শেষ হওয়ার পর যদি আপনাদের কিছু জিজ্ঞাস্য থাকে আমি আমার সাধ্যমত তাতে আলোকপাত করার চেষ্টা করবো। কিন্তু আমার বক্তব্যের মাঝে কেউ কোনো প্রশ্ন বা মন্তব্য করবেন না। প্রথমেই বলি এই মারণরোগ কি এবং কেন। এটা একটা ভাইরাস বাহিত রোগ, যেটার সংক্রমণ ঘটে মানুষের চোখ, কান বা মুখ দিয়ে। এই ভাইরাস শরীরে আসার পরও কেউ যদি স্বাস্থ্যবিধি মেনে সাবান বা স্যানিটাইজার দিয়ে হাত-মুখ-পা ধোয়, নাকে-মুখে হাত না দেয় তাহলে এর হাত থেকে রক্ষা পাওয়া সম্ভব। এই ভাইরাস শরীরে ঢুকে শ্বাসযন্ত্রকে বিকল করে। নিঃশ্বাসের কষ্ট, গলাব্যথা, কাশি ইত্যাদি হলো এই রোগের লক্ষণ৷ এই লক্ষণগুলি অনেকটাই সাধারণ ফ্লুয়ের লক্ষণের সাথে মিলে যায়। এই রোগ নির্ধারণের জন্যে নির্দিষ্ট পরীক্ষা আছে। তাতে রোগ ধরা পড়লে চিকিৎসা ব্যবস্থার সাহায্য নিতে হয়। তাই জ্বর, গলা ব্যাথা, খুকখুকে কাশি মানেই কিন্তু করোনা নয়। যেটা সুবলের ক্ষেত্রে প্রমাণিত হয়েছে। সুবলের নাসারস নিয়ে কলকাতার ল্যাবরেটরিতে দু দুবার পরীক্ষা হয়েছে এবং দুবারই পরীক্ষার ফল বলেছে সুবলের সাধারণ ফ্লু হয়েছে, করোনা নয়। আর তর্কের খাতিরে যদি ধরেও নিই আমাদের মধ্যে কারোর করোনা হলো, যদি সঠিক চিকিৎসা প্রণালীর মধ্যে দিয়ে গিয়ে সেই ব্যক্তি পুরোপুরি সুস্থ হয়ে ওঠে তাহলে তার থেকে অন্যদের সংক্রমণের ভয় থাকেনা। চিকিৎসাবিজ্ঞানী এবং অভিজ্ঞ চিকিৎসকরা নিরলস গবেষণার মধ্যে দিয়ে এই সিদ্ধান্তে উপনীত হয়েছেন। তাঁদের এই সিদ্ধান্ত আপনাদের মেনে নিতেই হবে। আপনারা নিজেদের খুশিমতো সিদ্ধান্ত নিতে পারেননা, তাতে আপনাদের ক্ষতি ব্যতীত লাভ হবেনা। আর সুবলের সাথে তার বাড়ির সমস্ত সদস্যদেরও এই রোগের পরীক্ষা হয়েছে। সকলের ক্ষেত্রেই ফল নেতিবাচক হয়েছে। তো এই পরিপ্রেক্ষিতে একজন চিকিৎসক হিসেবে আমি জোর গলায় বলতে পারি সুবল বা তার পরিবারের কারোর কাছ থেকে এই রোগ সংক্রামিত হওয়ার কোনো ভয় আপনাদের নেই। এটাই আমার বলার ছিল, এরপর যদি আপনাদের কোনো জিজ্ঞাস্য থাকে আপনারা জিজ্ঞাসা করতে পারেন। ও হ্যাঁ, আরেকটা কথা এই রোগের জীবাণু বাতাস বাহিত হতে পারে। তবে সেটা হওয়ার জন্য এই মহামারিকে যে ভয়াবহ স্তরে বিস্তারলাভ করতে হবে সৌভাগ্যক্রমে এখনও পর্যন্ত পৃথিবীর কোনো দেশে সেটা ঘটেনি, ভারতবর্ষে তো নয়ই। এই বলে উনি চেয়ারে বসে পড়লেন। লক্ষ্য করলাম সারা ঘর জুড়ে মৃদু গুঞ্জন শুরু হলো, কিন্তু ব্যক্তিগতভাবে কেউ ডাক্তারবাবুকে কোনো প্রশ্ন করলোনা। এই দোদুল্যমান সময়টুকুকে দীর্ঘায়িত করার কোনো সুযোগ না দিয়ে ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আসা ভদ্রলোকটি উঠে দাঁড়ালেন। নিজের পরিচয় সংক্ষেপে দিয়ে উনি ওনার বক্তব্য শুরু করলেন। প্রথমেই কটেজের সাম্প্রতিক ঘটে চলা অশান্তিজনক পরিস্থিতিকে তীব্র ভাষায় নিন্দা করলেন। তারপর বললেন–দেশ তথা সমগ্র জাতির এই বিপদের সময় আমরা সবাই হাতে হাত, কাঁধে কাঁধ মিলিয়ে কাজ করে চলেছি। এই সংগ্রামে সবাইকে কমবেশি অংশগ্রহণ করতে হবে। আমরা সেই ব্রত নিয়ে এগিয়ে চলেছি। সেই পথচলায় আগাছার মতো কেউ বা কারা যদি অকারণে বাধা দেওয়ার চেষ্টা করে, সেটা সমূলে উৎখাত করার লিখিত সরকারি নির্দেশ আমাদের কাছে আছে। এই অনিশ্চিতপুর শুধু অনিশ্চিতপুরের মানুষজনকে নিয়েই ভাবছেনা, ভাবছে সমগ্র মানবজাতির কল্যাণ নিয়ে, তার বড় প্রমান এই গ্রাম আপনাদের অতিথি হিসেবে বরণ করে নিয়েছে। অতিথি বলি কেন, এরা আজ আপনাদের পরিবারের আপনজন করে নিয়েছে, প্রতিনিয়ত আপনাদের খেয়াল রাখছে, ভালোমন্দ প্রয়োজন মেটাচ্ছে ইত্যাদি। আর এই মহান সামাজিক কর্মযজ্ঞে ‘লীলাদেবী’ একজন একনিষ্ঠ কর্মী। শুধু আজ এই বিপদের সময়ই নয়, সারাজীবন উনি সমাজের জন্যে কিছু না কিছু করে চলেছেন। এই কটেজ, মেয়েদের হাতের কাজ শেখার স্কুল হলো তার উদাহরন। কত মহিলা যে ওনার সংস্পর্শে এসে আর্থিকভাবে স্বাবলম্বী হয়েছেন, কত সংসার ভাঙতে ভাঙতে জোড়া লেগে গেছে তার ইয়ত্তা নেই। এই কটেজে যে নিয়ম বা সিদ্ধান্তের কথা উনি বলেছেন, তার কোনোটাই ওনার নিজের বানানো নয়। সরকারি নিয়ম মেনে, স্থানীয় প্রশাসনের সাথে কথা বলেই উনি কাজগুলো করছেন। এটা ভাবার কোনো অবকাশ নেই যে উনি নিজ খুশিমতো আপনাদের ওপর কিছু চাপিয়ে দিচ্ছেন। তাই ডাক্তারবাবুর কথার প্রসঙ্গ ধরেই বলি, স্বাস্থ্য দপ্তরের নির্দেশ ও সিদ্ধান্ত আপনাদের যেমন মেনে চলতে হবে, তেমনি প্রশাসনের নিয়মাবলীও মানতে হবে। আর এগুলো মানতে হবে কারণ এসব নিয়মকানুন আপনাদের মঙ্গলের জন্যই বানানো হয়েছে। আমি জানি আপনাদের মধ্যে একজন চিকিৎসক আছেন, যিনি সামাজিক দায়িত্ব পালন না করে এখানে লুকিয়ে আছেন। আমাদের দপ্তরে অনেক আগেই সে খবর এসে পৌঁছেছে।। তার বিরুদ্ধে সরকারি নির্দেশ খেলাপ করার চিঠিও তৈরি হয়ে গিয়েছে। কয়েকদিন পরই সে চিঠি তার কাছে এসে পৌঁছাত। কিন্তু আজ যখন আমার এখানে আসার সৌভাগ্য হয়েই গেল তখন আমি নিজে হাতেই চিঠিটা তাঁকে দিতে চাই। এই বলে জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তিনি সমবেত মানুষগুলির দিকে চেয়ে রইলেন। মুহূর্তের মধ্যে উপস্থিত সবাইয়ের দৃষ্টি ঘুরে গিয়ে উদ্দিষ্ট ব্যক্তির ওপর পড়লো। কাউকে আর বলে দিতে হলনা, কে সেই জন। তিনি চিঠিটি তাঁর দিকে বাড়িয়ে দিলেন। ডাক্তার মহাশয় একটিও কথা না বলে মাথা নিচু করে চিঠিটি গ্রহণ করলেন। গোটা ঘরে শ্মশানের স্তব্ধতা ফিরে এলো। পঞ্চায়েত সদস্য সেই ব্যক্তি ডাক্তারবাবুকে ইশারায় উঠতে বললেন, তারপর ভাবলেশহীন মুখে কটেজের ডাক্তার মহাশয়ের উদ্দেশ্যে বললেন, চিঠিতে নির্দেশ আছে আপনি আগামীকাল সকাল দশটায় স্থানীয় থানার ভারপ্রাপ্ত অফিসারের সঙ্গে দেখা করবেন। এই বলে ঘরের

নিস্তব্ধতাকে আরো কয়েক গুণ বাড়িয়ে দিয়ে দুজনে ঘর ছেড়ে বেরিয়ে গেলেন। কেউ কোনো কথা বললো না, শুধু লীলাদি দরজা পর্যন্ত এগিয়ে গেলেন।

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *