অচিনপুরের দেশে: চতুর্থ পর্ব

পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় ও গৌতম সরকার

 

(পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায়)

চায়ের প্রসঙ্গে চাবাগানের দেশের মানুষের চাপাতার কথা মনে পরে গেল। সব চায়েতেই কি লপচু বা মকাইবাড়ী তকমা আঁটা থাকে ? না চায়ে- সমাদর, ভালবাসা, নিষ্ঠা মিলে মিশে একেকটি চা ঐসব লেবেল মার্কা চা-কেও ছাপিয়ে ওঠে কখনো কখনো, যেমন আজকের ঐ কিশোরীর আনা চা – টি। বৃদ্ধের দৃষ্টিতে কি লুকিয়ে ছিল ? অনেক ইতিহাস? অজানা গল্প ? না দিনযাপনের গ্লানিতে আচ্ছন্ন ঐ দৃষ্টি ? সব প্রশ্নের সমাধান পেলাম তাঁর পরম্পরাগত জ্ঞানে, পিতৃপুরুষের পালাবদলের ইতিহাসে। সত্যিই এইভাবেইতো পরিবর্তনের স্রোতে প্রেক্ষিত বদলে যায়, বদলে যায় যাপনচিত্র, বদলে যায় মানচিত্র, পরিবারের, সমাজের, রাষ্ট্রের। মহাকাব্যের রাক্ষস অধ্যূষিত মধ্যপ্রদেশের 

দণ্ডকারণ্য, কালাপানি পার করা দণ্ডিতের ঠিকানা আন্দামান, সুন্দরবনের লবণাক্ত মরিচঝাঁপি হয়ে ওঠে শস্যশ্যামলা, পূর্ববঙ্গ থেকে আসা উদ্বাস্তুদের জীবনসংগ্রামের ঘামে ভেজা অক্লান্ত পরিশ্রমে যেমন বদলে গেছে এই রুখু সুখু অচিনপুর। আসলে অস্তিত্বরক্ষার সংগ্রাম যেন এক অন্যমাত্রা পায় যখন তার সঙ্গে জড়িয়ে থাকে এক সম্প্রদায়গত স্বার্থচিন্তা, পরিবারকে টিকিয়ে রাখার প্রয়াস। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে মিত্রশক্তির ঐক্যবদ্ধ লড়াই, অতদূর যাই কেন সাম্প্রতিককালে ঐ কালব্যাধির সঙ্গে লড়াই করবার যে ঐক্যবদ্ধ মানসিকতা তারই প্রতিফলন নয় কি? দুর্যোগ দুর্দিনে সমস্ত পটচিত্র পাল্টিয়ে যায়। প্রবলকে হাত পেতে দাঁড়াতে হয় তার থেকে অনেক আপাতদুর্বলের কাছে, যেমন ঐ যে আমেরিকার হুমকি – আমাদের দেশকে জীবনদায়ী ওষুধ না দিলে ব্যবস্থা হচ্ছে তোর। (এখানে সংবাদ পত্রের সুলভ সংস্করণে দেখলাম) দুর্বলেরাই মাথা গরম করে বাহুবলকেই সম্বল করে বেশী। ক্ষমতা ঐশ্বর্য সব কিছুই মারণ রোগের কাছেই নতজানু হয়। কিন্তু প্রার্থীর বিনয় কোথায়? ক্ষমতার দম্ভতো সর্বদাই চড়া সুরে বাঁধা। তাই এখানেও তার ব্যতিক্রম নেই।

কিন্তু বৃদ্ধ ভদ্রলোকের কথায় অসহিষ্ণুতার সুর যেন ! একদা আশ্রয় দিয়েছে যে ভূমি তার স্বত্ব হাতছাড়া হয়ে যাবে তাই কি এই উদ্বেগ? আবার সেই অস্তিত্বের সংকট? হয়তো প্রজন্মান্তরের চিন্তার পার্থক্য এটাই। মানুষই সব পারে। সে ভাঙতেও পারে আবার গড়ে তুলতেও জানে। আবহমান কালের ইতিহাস কি তাই প্রমাণ করেনা? ধ্বংসের ওপরেইতো বার বার গড়ে উঠেছে সভ্যতার ইমারতগুলো। ঊষর শুকনো বন্ধ্যাজমিতে উর্বরতা এনেছেন তিনটি প্রজন্মের চেষ্টা ও শ্রমে দলে দলে শহুরে লোকেদের কুক্ষিগত হয়ে তা আবর্জনাস্তূপে পরিণত হবে এই চিন্তা গ্রাস করেছে হয়তো তাঁকে।

 

(গৌতম সরকার)

এখানকার আকাশ বড় বেশি নীল, এখানকার জল-বাতাস বড় বেশি আন্তরিক, এখানকার মনকাড়া সবুজ বড় বেশি স্নিগ্ধ, এখানকার মানুষ বড় বেশি সরল, সাধারণ, আপন। এখানে বেশ কয়েকদিন কেটে গেল। আমরা যারা অতিথি হয়ে এই অনিশ্চিতপুরে এসেছি তারাও আস্তে আস্তে নিজেদেরকে নতুন পরিবেশের সাথে মানিয়ে নিচ্ছি। প্রথমে আসার পর যে মানুষগুলো অতীত জীবনের বেড়াজাল ভাঙতে না পেরে মনমরা হয়ে ছিল, তারাও ধীরে ধীরে প্রাণচঞ্চল হয়ে উঠছে। নিজেদের বিভিন্ন কাজে-কর্মে ব্যস্ত রেখে ভুলতে চাইছে পুরানো দিনগুলির কথা। কাউকে নির্দিষ্ট ভাবে কোনো দায়িত্ব না দেওয়া হলেও সবাই নিজ নিজ পছন্দ অনুযায়ী ভালোবেসে একেকটা দায়িত্ব মাথায় তুলে নিয়েছে। আসলে এই অনিশ্চিতপুর এই কদিনে আমাদের নতুন করে বেঁচে থাকার প্রেরণা জুগিয়ে চলেছে– ঈশ্বর প্রদত্ত এই মনুষ্যজীবন যে শুয়ে বসে কাটানোর নয় সে পরম সত্যের সন্ধান আমরা পেয়েছি। আমি পেয়েছি চাষের জমির তদারকি। আমার স্ত্রী প্রথম কদিন ঘর থেকেই বেরোয়নি, ও এখন রান্নাঘরের দেখভালের দায়িত্বে। বয়স নির্বিশেষে নারী-পুরুষ-বাচ্ছা-বুড়ো সবাই এই বিশাল কর্মজগতের শরিক হতে পারে খুব খুশি। 

সকাল হলেই মুখ-হাত ধুয়ে আমি মাঠে চলে যাই। এখন সমস্ত জমিতে সবুজ ধানের চারা। হৈমন্তী হাওয়ায় দোল খেতে খেতে অষ্টাদশী তরুণীর লাস্যে ঢলে পড়ে এ-ওর গায়ে। আমি পরম মমতায় কচি পাতায় হাত রাখি। ওরা আলতো আদরে আমার হাতে সুড়সুড়ি দেয়। সূর্য পুব আকাশ ছাড়িয়ে ধীরে ধীরে মেঘের বুকে মুখ লুকোয়, আবার লুকোচুরি শেষে তার প্রখর আলোয় রাঙিয়ে দেয় চারপাশ। আস্তে আস্তে কৃষকেরা মাঠে আসতে শুরু করে। এখন জমি নিড়ানোর কাজচলছে – ধান জমিতে যে সব আগাছা জন্মায় সেগুলোকে তুলে ফেলতে হবে নচেৎ ধানগাছের পুষ্টি চুরি যাবে। এ কাজে আমিও হাত লাগাই। আমার সঙ্গে এক চাষি ভাইয়ের খুব আলাপ হয়ে গেছে। ওর কাছে আমির চাষের পাঠ নিচ্ছি। এই যে নিড়ানির কাজ শেষ হলে দেখতে হবে জমিতে প্রয়োজনীয় জল আছে কিনা। এইগ্রামে বড় বড় পুকুর আছে তাই জলের সমস্যা নেই। বিদ্যুৎ শক্তির সাহায্যে মাটি থেকে জল তুলে জমিতে জল যোগানোর প্রয়োজন পড়েনা। প্রত্যেক জমিতে জল দেওয়ার জন্য জমির পরিসীমা জুড়ে অপ্রশস্ত নালা আছে, যেটা জলের প্রাকৃতিক উৎসের সাথে যুক্ত। পুকুর থেকে জল তোলার জন্যে একপ্রকারের ডোঙা (ছোট নৌকার মতো) ব্যবহার করা হয়। বাঁশের কাঠামো আর দড়ির সাহায্যে (লিভার সিস্টেম অবলম্বনে) ডোঙাটিরএকটা দিক নিচু করে জল তুলে উল্টোদিকে কাত করে নালাতে (চ্যানেল) ফেলা হয়। তারপর জল নালাপথ অতিক্রম করে নির্দিষ্ট জমিতে যায়। যে জমিতে জল যাবে সেই জমি ছাড়া বাকি সব জমির নিজস্ব নালামুখ বন্ধ থাকে। ফলে এভাবে পাঠানো জল অন্য জমিতে চলে যাওয়ার ভয় নেই। এই সব জানা-শেখা মঈদুল ভাইয়ের কাছে। কি অদ্ভুত লাগে ! এই আপাত অশিক্ষিত মানুষগুলো শক্তির অপব্যবহার না করে বিজ্ঞানের তত্ত্বকে কাজে লাগিয়ে তার সাথে নিজেদের পরিশ্রম যোগ করে সাফল্যের সাথে কৃষিকাজ করে চলেছে। আমার কাজ হলো সব জমি ঘুরে ঘুরে দেখা, সব জমিতে আগাছা পরিষ্কার হয়েছে কিনা, জলের পরিমান কোন জমিতে কতটা। তারপর জমি ধরে ধরে প্রয়োজনীয় ব্যবস্থা নেওয়া হয়। আমি এই কাজটা খুব আনন্দের সাথে করি। সব কৃষকভাইই আমার চেয়ে শতগুনে জ্ঞানী, তবুও প্রতি সকালে ওরা এসে আমাকে জিজ্ঞাসা করে, তার মধ্যে মঈদুল ভাইও থাকে। তবে কয়েকটা ব্যাপারে আমি এখনো দক্ষ হতে পারিনি, যেমন, কোন গাছের পাতায় কখন পোকা লাগলো সনাক্ত করা, কখন জমিতে সার দেওয়া প্রয়োজন ইত্যাদি। মঈদুল ভাই বলেছে -আস্তে আস্তে সেটাও আমি বুঝে যাবো। আমি একদিন মঈদুল ভাইকে বললাম, আমাকে লাঙল চালানো শিখিয়ে দেবে? আমার কথা শুনে ও হো হো করে হেসে উঠলো। হাসি থামিয়ে আমার অসন্তুষ্ট মুখের দিকে চেয়ে একটু লজ্জা পেল। আপোষের স্বরে বললো, কিছু মনে করবেননা দাদা। একাজ বড় শক্ত। আপনারা লেখাপড়া জানা শহুরে মানুষ। আপনাদের কি একাজ মানায় ! তাছাড়া আপনারা পারবেনও না। আমরা ন্যাংটো বয়স থেকে এই মাটি চিনি, ফল চিনি, ফসল চিনি। সেই বয়স থেকে বাপঠাকুর্দাকে এইসব করতে দেখে দেখে শিখে গেছি। আমি তখনো নিজের জেদ না কমিয়ে বললাম, ইচ্ছে থাকলে সব কাজ শেখা যায়। ও আবার হাসতে হাসতে বলল, না দাদা, সব কাজ সবার জন্য নয়। লাঙল চালানো একটা ঝুঁকির কাজ। হাল একটু এদিক-ওদিক হলেই লাঙলের ফলা গরুর পা এফোঁড়-ওফোঁড় করে দেবে। সারাজীবনের মতো সেই গরু অকেজো হয়ে যাবে। আমাদের মধ্যেও সবাই একাজ করেনা, বিশেষ বিশেষ লোকে করে। কিছুক্ষণ সময় লাগলো ব্যাপারটা বুঝতে তারপর নিজের ভুল বুঝতে পারলাম। এখানকার মানুষেরা এরকমই, সরল মানুষগুলো সহজেই আপনা হয়ে উঠবে। ওদের মনের কথা আর মুখের কথা কখনও আলাদা হয়না। সেদিন থেকে মঈদুল আমার ঘনিষ্ঠ বন্ধু হয়ে গেছে।

আজ সকাল থেকেই ঝিরিঝিরি হাওয়া বইছে। ভোরের কুয়াশা দুপায়ে মাখতে মাখতে আলপথ ধরে এগিয়ে চললাম দখিনদাঁড়ির জমিগুলোর দিকে। আজ ওদিকের জমিগুলোতে জলের ব্যবস্থা করে ওষুধ ছেটাতে হবে। গত দুয়েকদিন ধরে একধরনের পোকা গাছের পাতা খেয়ে নষ্ট করছে। কয়েকদিনের মধ্যেই ধানে দুধ আসবে, এইসময়ে পোকা মারতে না পারলে সব ধান কালো হয়ে যাবে। কালই মঈদুল আর কজন চাষির সাথে কথা হয়েছে। আজ সবাই ওদিকটাতেই কাজ করবে। কিছুটা হাঁটার পর দূর থেকে বাতাসে ভেসে এলো একটা গান- ” আমার হাত বান্ধিবি, পা বান্ধিবি, মন বান্ধিবি কেমনে?

আমার চোখ বান্ধিবি, মুখ বান্ধিবি

পরান বান্ধিবি কেমনে?”

কয়েকটা আল ঘুরে দেখি মন দিয়ে জমির আগাছা সাফ করতে করতে নিজের মনে গেয়ে চলেছে এক চাষিভাই। মুখটা চেনা হলেও নামটা জানিনা। আমাকে দেখতে পেয়ে গান না থামিয়েই হাত তুলে নমস্কার জানালো। আমিও হাত তুলে ওর অভিবাদন গ্রহণ করে এগিয়ে গেলাম। দখিনদাঁড়িতে পৌঁছে দেখি ওরা ইতিমধ্যে কাজে লেগে গেছে। আমি পৌঁছতেই সবাই কাজ থামিয়ে আমাকে নমস্কার জানালো। আমিও প্রতি নমস্কার জানিয়ে ওদের দিকে এগিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণ পর খেয়াল করলাম মইদুল আসেনি। ওদের জিজ্ঞাসা করে জানতে পারলাম মইদুলের শরীর খারাপ, কাল রাত থেকে জ্বর আর মাথার যন্ত্রনা। আমি ভয় পেয়ে গেলাম। এই জ্বর, কাশি-সর্দির ভয়াবহ প্রকোপ থেকে রক্ষা পেতে সবছেড়ে পালিয়ে এসেছি এই অনিশ্চিতপুরে৷ এখানে এসেও আবার জ্বর-মাথার যন্ত্রণার কষ্ট শুনে পুরোনো আতঙ্ক আমাকে ভিতর থেকে নাড়িয়ে দিল৷ আমার মুখের চেহারা দেখে একটা অল্পবয়সের ছোকরা বলে উঠলো, ভাবিয়েননা স্যার, এ জ্বর আপনাদের শহুরে জ্বর নয়। দিনের পর দিন রোদ মাথায় কাজ করতে আমরা প্রায় সবাই মাঝেমাঝে এই জ্বরের কবলে পড়ি। দুটোদিন বাড়িতে শুয়ে বিশ্রাম নিলেই সেরে যাবে। আমি কিছুটা বোকার মতো মুখে হাসি এনে ঘাড় নাড়লাম। ওরা কাজে মন দিল, আমি ওদের কাজ দেখতে লাগলাম — কি নিখুঁত দক্ষতায় ওরা ঘন ধানজমির মধ্যে থেকে দ্রুত হাতে আগাছা টেনে টেনে ছিঁড়ছে। তাতে ধানগাছের একটা পাতাতেও টান পড়ছে না। এরপর ওরা জমিগুলোতে জল দেবে, তারপর ওষুধের ব্যবস্থা। সব কিছু শেষ করতে দুপুর একটা বেজে গেল। ওরা আমাকে অনেক আগেই চলে যেতে বলেছিল। আকাশে রোদ চড়া হচ্ছে। আমার কষ্টের কথা ভেবে ওরা রোজই আমাকে চলে যেতে বলে। আমি কোনো ছাতা আনিনা। বেরোনর সময় আমার স্ত্রী বারবার বলে, আনিনা বলে রাগ করে; তবুও আমি আনিনা। ওরা যদি এই রোদ মাথায় নিয়ে পরিশ্রমের কাজ করতে পারে, আমি কেন পারবোনা ! আমার ধ্যান, আমার চিন্তা দিনে দিনে এই গ্রামের ভূমিপুত্র হয়ে ওঠা। এই রোদ-জল-বাতাস আমার সারা শরীর শুষে নেবে, এই মানুষগুলোর গায়ের মাটিগন্ধ আমার প্রতিটি রোমকূপ গ্রহণ করবে, এদের প্রশ্বাস আমার নিশ্বাস হয়ে শরীরে ঢুকবে, এদের রোগ-শোক-আনন্দ-বেদনা আমার তন্ত্রীতে তন্ত্রীতে বিভিন্ন সুর রচনা করবে- কখনও আনন্দের, কখনও বিষাদের, কখনও সাফল্যের, কখনও ব্যর্থতার। সারা গায়ে সূর্যের প্রখর রোদ গায়ে মাখতে মাখতে কটেজে ফিরলাম। বিকেলে একবার মইদুলের বাড়ি যেতে হবে।

                                                                    (চলবে)

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *