অচিনপুরের দেশে: ষষ্ঠ পর্ব

 

পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় এবং গৌতম সরকার

 

গৌতম সরকার:

বৃষ্টি এখন অনেকটা ধরেছে। চারদিক ঘন অন্ধকারে ছেয়ে গেছে। টর্চ আনা হয়নি, এখন এই কাদাপথ হাতড়ে হাতড়ে ফিরতে হবে। এই কদিনে এই গ্রামের সাথে এতটাই পরিচিত হয়ে গেছি যে আমার কোনো চিন্তাই হচ্ছেনা। কিছুদিন আগে হলে এই অন্ধকার পথ পেরোনোর কথা ভাবতেই পারতামনা। জন্তুজানোয়ারের ভয় না থাকলেও এখানে সাপের খুব উপদ্রব। আশেপাশে তল্লাশি চালিয়ে একটা লাঠি জোগাড় করে পথে নামলাম। লাঠিটাকে ঠুকতে ঠুকতে বাড়ি চলে যাবো। এটাও অনিশ্চিতপুরের শিক্ষা। অন্ধকারে লাঠির আওয়াজ করলে সাপখোপ (রাত্রে নাম নিতে নেই, বলতে হয় ‘লতা’) আপনার যাত্রাপথ থেকে সরে যাবে। বৃষ্টি একেবারে থামেনি, ঝিরঝিরে বৃষ্টিতে লাঠি ঠুকতে ঠুকতে এগিয়ে চললাম। আজ সন্ধ্যেবেলায় কিছু খাবার দরকার হবেনা। মঈদুলের বাড়িতে এক জামবাটি ভর্তি সর্ষের তেল মাখা মুড়ি আর আদা-চা খেয়েছি। কিছুক্ষণ কথাবার্তা চলার পরই ভিতরের ঘর থেকে কাঁচের চুড়ির রিনরিন আওয়াজ এসেছিল। সেই আওয়াজে মঈদুল আমার অনুমতি নিয়ে ভিতরে গিয়েছিলো। একটু পরে ফিরে এসে খুব কুন্ঠিত ভাবে জিজ্ঞাসা করেছিল, ওর বাড়িতে একটু চা খেতে কোনো অসুবিধা আছে কিনা ! আমি অবাক হয়ে ওকে কারণ জিজ্ঞাসা করায় ও আরও লজ্জা পেয়ে আমতা আমতা করে বলেছিলো, “না আমরা মুসলমান, ছোট জাত”৷ আমি সঙ্গে সঙ্গে ওকে থামিয়ে দিয়ে আবার বন্ধুত্বের কথাটা স্মরণ করিয়ে দিয়েছিলাম। আমার কথা শুনে যেন পাখির ডানায় ভর করে উড়তে উড়তে আমার জীবনের সবচেয়ে উপাদেয় খাবারটা সামনে এনে উপস্থিত করেছিল। অনেকদিন পর এত তৃপ্তির সাথে কোনো খাবার খেয়েছি। যতক্ষণ ধরে খেয়েছি টের পেয়েছি দরজার পিছনে মঈদুলের স্ত্রীর উপস্থিতি। সামাজিক নিয়মকে সম্মান দিয়ে সে অতিথির সামনে উপস্থিত হতে পারেনি ঠিকই কিন্তু অতিথি যতক্ষণ খাওয়া শেষ না করছে ততক্ষণ পরোক্ষ উপস্থিতির কর্তব্যকর্মে অবহেলা করতে তার সামাজিক শিক্ষা শেখায়নি। খাওয়া সেরে মঈদুলকে শরীরের ব্যাপারে যত্ন নিতে বলে বিদায় নিয়েছি। অন্ধকারে পথ চলতে আমার অসুবিধা হবে এই অজুহাতে আমাকে পৌঁছে দিতে চেয়েছিলো। কিন্তু আমি ওকে বকে নিরস্ত করেছি। এই শরীরে বাইরের ঠান্ডা হাওয়া লাগলে জ্বর আরও বাড়বে। ইচ্ছে না থাকলেও আমার বকুনিতে কাজ হয়েছে। তাই দরজা থেকেই আমাকে সাবধানে পথ চলতে বলে বিদায় দিয়েছে। মাঝখানে এই আকাশ ভাঙা বৃষ্টি আমার যাত্রাপথে অন্তরায় হয়ে উঠলো। মঈদুল নিশ্চয় বাড়িতে বসে দুশ্চিন্তা করছে। কিন্তু এই বৃষ্টি, কাদামাখা অন্ধকার পথে আমার এতটুকু অসুবিধা হচ্ছেনা। মনে হচ্ছে কতদিন আমি এই পথ পেরিয়ে চলেছি। রাস্তার প্রতিটি বাঁক, পুকুর-ডোবা, আশপাশের গাছপালা আমার বড় চেনা, বড় আপন। আমি যেন সত্যিসত্যিই দিনে দিনে ভূমিপুত্র হয়ে উঠছি। লাঠি ঠুকতে ঠুকতে পৌঁছে গেলাম, ওই তো দূরে আমাদের কটেজের আলো দেখা যাচ্ছে।

 

 পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায়

মইদুলের বাড়ি থেকে ফিরবার পথে বৃষ্টি – প্রকৃতি অঝোর ধারায়, এই অকৃপণদান মাথার ওপর ঝরে পরায় সেই চির আশ্রয়ের গানটা মনে পরল, “মেঘের কলস ভ’রে ভ’রে প্রসাদবারি পরে ঝ’রে,…. তোমার আশীর্বাদ হে প্রভু তোমার আশীর্বাদ।” এই অমূল্য জীবনটাইতো তাঁর আশীর্বাদ। এর মধ্যে জাতপাতের দূরত্ব কেন? একটি মারণব্যাধি যে সামাজিক দূরত্ব তৈরী করেছে তার থেকে মারাত্মক আর কি হতে পারে? শেষশয্যায় শায়িত পিতা দেখতে পারছেননা প্রিয় সন্তানকে, পুত্র সজলচোখে বিদায় জানাতে অনুপস্থিত, সে তখন তার প্রাণাধিক সন্তানের সংক্রমণের ভয়ে তটস্থ-  এই উৎকট স্বার্থকেন্দ্রিক দূরত্ব যা টাকা দিয়ে নয়, ক্ষমতা দিয়ে নয়, রক্তচক্ষু দেখিয়ে নয়, সমবেদনার চোখের জলে নয়, অতিগভীর আর্তিতে নয়-কোনভাবেই এই দূরত্বের ব্যাধি নিরাময়যোগ্য নয়। ছোঁয়া ছুঁয়ির রাজনীতি,জাতপাতের বেড়াজাল ভেঙে এই ছোঁয়াচ এখন অপ্রতিরোধ্য দুর্দম। ‘ছোঁয়া বাঁচিয়ে চল’ হল এখন জীবনমন্ত্র, এখন আত্মরক্ষার অস্ত্র, এক অমোঘ স্বার্থকেন্দ্রিক সংক্রমণ। অর্থ ও ক্ষমতার শক্তিতে দাম্ভিক মানবিকতার তথাকথিত ধ্বজাধারী আমেরিকা এখন ধরাশায়ী মারণরোগের আগ্রাসনে, ইরান, ইরাকে এর অপ্রতিহত গতি, ইটালি স্পেনে মারণযজ্ঞের আয়োজন,আহুতি অগণিত প্রাণ। এক কঠোর বাস্তবকে স্বীকার করে নিয়ে নিজেকে প্রিয়জনের কাছ থেকে দূরে রাখা, কাছের বন্ধুকে দূরে সরিয়ে দেওয়া, নিকটাত্মীয় থেকে নিজেকে বিচ্ছিন্ন, একঘরে করে নেবার সময়। কোন জাতকে মৃত্যু তোয়াক্কা করে না? জাতিধর্মবর্ণ নির্বিশেষে আজ মিলেমিশে এক হয়ে লড়ছে যুযুধান প্রতিপক্ষের বিরুদ্ধে। বিরোধিতা ভুলে চরম শত্রু হাত পাতছে পরম শত্রুর কাছে। পররাষ্ট্রনীতির সংজ্ঞা পাল্টে যাচ্ছে এক দুরন্ত মারির প্রেক্ষিতে। বল না মইদুল, তোমার আল্লা, আমার ভগবান, ঐ গীর্জার ঈশ্বর কি পারেন আমাদের বাঁচাতে? কিন্তু তাও নতজানু হই তাঁর কাছে কেন? আমাদের মন আর মস্তিষ্কের ফসল যে তাঁরই শক্তির,অনুগ্রহের দান। ঐ যে দেবদূতেরা যাঁরা জীবন তুচ্ছ করে লাগাতার যুদ্ধ জারী রেখেছেন তাঁরাও কি নতমস্তকে তাঁকে ডাকেননা? গবেষকরা, সঞ্জীবনীর খোঁজে যাঁরা নিরন্তর প্রাণপাত করে চলেছেন তাঁরাও কি নতমস্তকে তাঁদের পরীক্ষার সাফল্য কামনা করেন না এক পরম শক্তির কাছে? আমাদের ব্যাভিচারের ফলে আমরা অভিশাপের অন্ধকারাচ্ছন্ন জীবনে নির্বাসিত হয়েছি দোষ দেব কাকে? এখন শুধুই আকুতি, শুধুই প্রার্থনা শুধুই নতিস্বীকার। চোখের জলে, অনুতাপের অশ্রুবর্ষণে কি পরম নিবৃত্তি?না আরো মানসিক শক্তি আরো সহনশীলতা আরো জীবনের অবক্ষয়কে মেনে নেওয়ার অপেক্ষার প্রহর গোনা? কবে হবে এই দুঃখরাতের অবসান?

বৃষ্টিতে আটকে পরেছিলাম একটি অস্থায়ী গোয়ালঘরে ঐ গোবরের গন্ধ বড় চেনা ছোটবেলার আঘ্রাণ এনে দিলো যে। সেই বাঁধভাঙা জল রাতদুপুরে যখন উঠোনে। তিস্তা বয়ে চলেছে ঘরদোরে। দশ মিনিটে জল কোমর ছাড়িয়ে আগ্রাসী, ঠাকুমা চেঁচিয়ে সবাইকে সতর্ক করে দিলেন, আগে গোয়ালে গরুগুলোর দড়ি কেটে দাও নাহলে বাড়িতে গোহত্যা হবে। পাঠকবৃন্দ, না, এর মধ্যে কোন সাম্প্রদায়িকতার গন্ধ খুঁজতে যাবেন না। এ শুধু পোষ্যের প্রতি প্রতিপালকের সহানুভূতির অনুলেপন। শুধুই গোরু ? না। কোন সুদূর অতীতে মেয়েবেলায় সাঁতরে যেতেন নদীয়া জেলার ফেলে আসা গাঁয়ের চূর্ণী নদী, সেই সাঁতার ভোলেননি।পাহাড় উপচে পরা তিস্তার বরফগলা হাড় হিম করা জল সাঁতরে উঠোনের আরেক প্রান্তের হাঁসেদের ঘরের আগল খুলে দিতেও তাঁর সমান উৎসাহ। এইসব টুকরো টাকরা স্নেহময় বাঁধনই সঞ্চিত মণি মানিক হীরের দ্যুতি, বেঁচে থাকবার রসদ।

বেলাশেষে পাখির দল ফিরছে তাদের নিশ্চিন্ত নীড়ে। শকুন্তলার দুস্মন্তটির কাজ গেছে মালা আর বিকোচ্ছেনা অবহেলার হাটে, বন্ধ বেসাতি।ফুল আর রঙ ছড়ায়না মনে। দলে দলে শহর ছেড়ে আসা মানুষের ভিড়ে মিশে সেও ফিরেছে তার আদরের সংসারটির সুরক্ষানীড়ে। কিন্তু ঐ যে দলে দলে মানুষ যায়, পরিযায়ী পাখীর মতো যাদের সামনে অন্তহীন পথ, শেষ প্রান্তে পৌঁছতে পারবে কিনা নিশ্চয়তা নেই তবু পাখির নীড়ের মতো আশ্রয়ে কে না ফিরতে চায়?হয়তো দুবেলা সুখের অন্ন জোটেনা, তবুও সহযোদ্ধারা আছে সেখানে এই যা ভরসা। এই সব ভাবতে ভাবতে কখন এসে পরেছি, অদূরে আমার কটেজের আলোকিত সুখ, ভরসার অনিশ্চিতপুরে আলোর দিশা।

এসে সেই বয়স্ক মহিলার কাছে শুনলাম, শকুন্তলার স্বামীর জ্বর এসেছে সঙ্গে শুকনো কাশি। নীলামাসী ওদের কটেজে ঢুকতে বারণ করে দিয়েছেন।এ বড় দুঃসময়, এ বড় কঠিন ছোঁয়াচ। ঘটনাটি এখনো সবাই জানেনা, জানলে এই অনিশ্চিতপুর কি এতো নিশ্চয়তায় রমণীয় থাকবে? পলায়নপ্রিয় শহুরে বাবুরা কি করবেন?

 

 

 

গৌতম সরকার

কটাদিন চোখের পলকে কেটে গেল। শকুন্তলার কাজে না আসার কারণে ঘরের কাজেও হাত লাগাতে হচ্ছে। আমার স্ত্রী তো রান্নাঘরের কাজে নিজেকে সমর্পণ করেছেন, তার এই বয়সে ঘর ঝাড়-পোঁছ করতে শরীরও সায় দেয়না। প্রথমদিন মোছামুছি করতে আমারও অসুবিধা হয়েছে। এখানে বলতেই শহরের মতো ঘর মোছার লাঠি পাওয়া যায়না। অগত্যা লাঠির মাথায় কাপড় বেঁধে কাজ চালানোর মতো একটা বানিয়ে নিয়েছি। তাতে কাজ মোটামুটি হয়ে যাচ্ছে। শুধু আমি নয় কটেজের প্রায় সবাই এই পরিবর্তিত পরিস্থিতির সাথে মানিয়ে নিয়েছে। এমনকি বাচ্ছাগুলোও দেখলাম প্রবল উৎসাহে বাইরের উঠোন ঝাড় দিচ্ছে। কদিন টুকটাক বৃষ্টির কল্যানে জমিতে জল দেওয়ার ব্যাপারটা আপাতত নেই। এর মধ্যে ভালো খবর, মঈদুল সুস্থ হয়ে উঠেছে। গতকাল এসে আমার সাথে দেখা করে গেছে। ও বলছিল দিগসড়ার দিকের জমিগুলোতে কয়েক দিনের মধ্যে কম্পোস্ট সার ছড়াতে হবে। এই সময় ধানে দুধ আসছে, প্রয়োজনীয় সার ধানকে আরো পুরুষ্ট করবে। এগুলো আস্তে আস্তে শিখছি, আর খুব উত্তেজিত বোধ করছি। এ যেন অনেকটা নিজের সন্তানকে ধীরে ধীরে বড় হতে দেখা, সেখানে বাবা-মাকে প্রতি মুহূর্তে সন্তানপালনের পাঠ নিতে হয়। এরা কোনো সার বাজার থেকে কেনেনা, সবটাই নিজেরা বানায়। গ্রামের মধ্যেই মাঝে মাঝে গর্ত করা আছে, সেখানে গোবর, শুকনো লতা-পাতা, আনাজের খোসা সবকিছু ফেলে পচানো হয়। সেখান থেকেই উৎকৃষ্ট সার তৈরি হয়। একটাই শুধু চিন্তা দখিনের বেশ কিছু জমিতে ধান গাছে পোকা লেগেছে, ওষুধ দেওয়া সত্ত্বেও গাছের পাতা হলদে হয়ে যাচ্ছে, ধানের ভিতর চাল আসছেনা। গ্রামের মধ্যেই একটা কৃষি সমবায় আছে, সেখানে একজন কৃষি বিজ্ঞানী কাজ করেন। তাঁকে খবর দেওয়া হয়েছে, তিনি আজ -কালের মধ্যে এসে সরেজমিনে দেখে ব্যবস্থা নেবেন। আমি ঘরের দিকটা সামলাতে গিয়ে কয়েকটা দিন মাঠের দিকে যেতে পারিনি। আজ একবার যেতে হবে। সকালের কাজকর্ম সেরে, অল্প কিছু মুখে দিয়ে বেরোতে যাবো উঠোনে লীলামাসির সাথে দেখা। উনি রান্নাঘরের দিক থেকে আমার কটেজের দিকেই আসছিলেন। হাত তুলে নমস্কার জানিয়ে আমাকে জিজ্ঞাসা করলেন,

–বেরোচ্ছেন নাকি?

আমি হাঁসি মুখে ঘাড় নাড়লাম।

উনি যেন একটু কিন্তু কিন্তু করতে লাগলেন। কিছু একটা বলতে চান, কিন্তু কিভাবে বলবেন বুঝতে পারছেন না।

আমি জিজ্ঞাসা করলাম, 

— আমায় কিছু বলবেন ?

—না মানে, বলছিলাম, একবার যদি ডাক্তারবাবুর সাথে কথা বলে সুবলের শরীরের ব্যাপারে খোঁজ নিতেন…

আমি প্রথমে কে সুবল বুঝতে পারছিলাম না। তারপর চট করে মাথায় এলো শকুন্তলার স্বামীর কথা।

আমি বললাম, আপনি কি শকুন্তলার স্বামীর কথা বলছেন?

উনি ঘাড় নাড়লেন, চতুর্দিকে চকিতে চেয়ে নিয়ে গলার স্বর একটু নামিয়ে বললেন, —আসলে কটেজের সকলেই একটু ভয় পাচ্ছে। বুঝছেন তো জ্বর মানেই এখন আতঙ্ক। জমির কাজ নিয়ে আপনি সারাদিন ব্যস্ত থাকেন। তবুও যদি একটু সময় করে….!

আমি ওনাকে হাত তুলে আশ্বস্ত করলাম। বললাম,

আপনি একদম চিন্তা করবেন না, আমি মাঠ থেকে ফিরে বিকেলে ডাক্তারবাবুর সাথে দেখা করে আসবো। 

উনি আমাকে ধন্যবাদ জানিয়ে নিজের কাজে চলে গেলেন। আমিও একবার আকাশের দিকে তাকিয়ে ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানিয়ে বেরিয়ে পড়লাম।

                                                                  (চলবে……)

 

 

 

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *