খুন | অগ্নি কল্লোল

খুন | অগ্নি কল্লোল

| অগ্নি কল্লোল

 

নবীন আজাদ একজন খুনি?

খুন। অসুন্দর। খুন। মিথ্যা। খুন। পৈশাচিক। খুন। অ-শৈল্পিক। খুন। অন্যায়।

শহরের রাস্তায় হাঁটতে থাকে নবীন আজাদ। মগজে খুনের বোঝা নিয়ে চলতে থাকে নবীন আজাদ।

শহর। মানুষ। শহর। ভীড়। শহর। বিজ্ঞাপন। শহর। আধুনিকতা। শহর। উল্লাস। শহর। বিষাদ। শহর। বন্দী। শহর। বিরক্তি। শহর। নোংরা। শহর। বস্তি। শহর। বিষাক্ত বাতাস।

নবীন আজাদ কি বেঁচে আছে এই শহরে?

নবীন আজাদ হাঁটে, একজন দুর্নীতিবাজ সত্যচোর ধর্মান্ধ মন্ত্রীকে দেখে অপবিত্র দুর্গন্ধে নাড়িভুঁড়িতে তীব্র ভূমিকম্পন অনুভূত হয়, পেটের ভেতর অপবিত্রতার লাঙ্গলের ব্যাকরণবহির্ভূত কর্ষণে বিবমিষা ছুটতে চায় অবাধ্য গতিতে। পায়ের পরিশ্রমে দ্রুত সংসদ ভবনের পবিত্র শরীর পেরিয়ে বাসে উঠে নবীন আজাদ। মুমূর্ষু বাসের অভ্যন্তরে একজন বিশুদ্ধ মানুষ বিশুদ্ধ কবির দেখা পেয়ে স্বস্তি পায় নবীন আজাদ, অপবিত্র গন্ধ সময়ের মাতৃগর্ভে তলিয়ে পবিত্র মানবিক সুগন্ধে ভরে ওঠে চতুর্দিক। নবীন আজাদ দেখে বিশুদ্ধ মানুষ নির্ঝর মুন্নির পাশের শূন্য আসন সন্তানহীন পিতার মতো সন্তান প্রাপ্তির জন্য কাঙাল হয়ে আছে। নির্ঝর মুন্নিরও একজন বিশুদ্ধ মানুষ প্রয়োজন। বিশুদ্ধ আলোচক প্রয়োজন। শাহবাগ মোড়ে বাস থেকে নেমে রিকশায় উঠে নবীন আজাদ। কোন নিকৃষ্টতম অজুহাতে রিকশা চালক দ্বিগুণ ভাড়া দাবী করে। হয়তো এতোদিন সে সুযোগের অনুপস্থিতিতে সৎ ছিল। আজ সুযোগ পেয়ে সে অসৎ হয়ে উঠেছে। রিকশা থেকে নেমে নবীন আজাদ বিশুদ্ধ অম্লজান খোঁজে। অপরাধী অভিশাপ শরীরের কাঁটা অংশে ঘামের ছিটে দেয়। নবীন আজাদের নিজেকে মৃত মনে হয়। নবীন আজাদের চারপাশের সবকিছুকে মৃত মনে হয়। নবীন আজাদ শিক্ষক দেখে। মৃত। নবীন আজাদ বুদ্ধিজীবী দেখে। মৃত। নবীন আজাদ কবি দেখে। মৃত। নবীন আজাদ গবেষক দেখে। মৃত। নবীন আজাদ জীবিতদের খুঁজতে থাকে। দেখে জীবিতরা এখানে মূল্যহীন, চারদিকে মনুষ্যত্বহীন মৃতদের জয়জয়কার। নবীন আজাদ নিঃশব্দে চিৎকার করে, শিক্ষাব্যবস্থা। মুমূর্ষু।  মানবধর্ম। মুমূর্ষু। গণতন্ত্র। মুমূর্ষু। সমাজতন্ত্র। মুমূর্ষু। আলোচনার টেবিল। মুমূর্ষু। আন্দোলন। মুমূর্ষু। নিজেকে প্রশ্ন করে নবীন আজাদ, তুমি কি বেঁচে উঠতে চাও? কি করে বেঁচে উঠবে? নিজেকে উত্তর দেয় নবীন আজাদ, চাঁদ দেখো, বেঁচে উঠবে। আকাশ দেখো, বেঁচে উঠবে। ফুল দেখো, বেঁচে উঠবে। অন্ধ হয়ে যাও, বেঁচে উঠবে। বধির হয়ে যাও, বেঁচে উঠবে। পঙ্গু হয়ে যাও, বেঁচে উঠবে।

 

নবীন আজাদ চলতে চলতে, টলতে টলতে,  ঢলতে ঢলতে মোড়ের চায়ের দোকানে এসে দাঁড়ায়। বসে। সিগারেট টানে। চায়ের কাপে চুমুক দেয়। চায়ের কাপ থেকে সাদা মেঘ উড়ে। সাদা মেঘ শূন্যে ভাসে। পাখির মতো উড়তে থাকে মেঘ। মুক্তির নেশায় ছুটতে থাকে মেঘ। অস্তিত্ব ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনী।

নবীন আজাদ বিশ্ববিদ্যালয় মাঠে এসে দাঁড়ায়। ঘাসের উপর বসে। সবুজ ঘাস মায়ের কোলের মতো শান্তিময় জীবন্ত সুখ, অনাবিল দুঃখহীন প্রহর। নবীন আজাদ খেলা দেখে। ছোটাছুটি দেখে। মিছিল দেখে। মিছিলের স্লোগান শিহরণ জাগায় মানব রক্তে। অমানুষদের রক্তে শিহরণ জাগে না, তাদের রক্ত নর্দমার জলের মতো নোংরা, শিহরণ বিযুক্ত, অবশ। কিন্তু নবীন আজাদের মনে হয় স্লোগান এখন পচনশীল তারস্বরে পরিণত হয়েছে, শুধুমাত্র দুর্গন্ধ ছড়াচ্ছে চারদিকে। সৃজনশীল, মানবিক, স্বাধীন স্লোগান এখন মুখস্থ দালালি অক্ষরের ঠোকাঠুকিতে বিলুপ্তপ্রায়। অধিকার প্রতিষ্ঠার স্লোগান এখন দাসত্বপ্রথার অলিখিত দলীল। নবীন আজাদ প্রেম দেখে। উচ্ছ্বাস দেখে। নীল আকাশ দেখে। গাছের ডালে পাখি দেখে। অনস্তিত্ব ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনি।

নবীন আজাদ কলাভবনের সামনে দাঁড়ায়। কলাভবন ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনি।

নবীন আজাদ গণগ্রন্থাগারের সামনে এসে দাঁড়ায়, গণগ্রন্থাগার ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনি।

নবীন আজাদ শাহবাগের মোড়ে এসে দাঁড়ায়, পুরো শাহবাগ ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনি।

 

অপরাধের বোঝা মাথায় নিয়ে নবীন আজাদ চারদেয়ালের ভেতর প্রবেশ করে। সিগারেটের কফিন থেকে একটি সিগারেটকে শেষকৃত্যের জন্য প্রস্তুত করে। টানে। আরেকটা। আরেকটা। আরো একটা…….।

 

নবীন আজাদ ভাবতে থাকে, রাস্তায় মানুষের ভিড়ে কিংবা জনশূন্যতায়, প্রকাশ্যে কিংবা অতর্কিতে, অন্ধকারে কিংবা আলোতে, চাপাতি কিংবা পিস্তল হাতে একজন জীবন্ত সতেজ রক্তমাংসের দেহ থেকে যারা রক্ত ঝরায়, প্রত্যক্ষ কিংবা পরোক্ষভাবে, তারাও কি তার মতো অপরাধের পোকা মস্তিষ্কে নিয়ে ঘুরে? না’কি মানুষ হত্যার পৈশাচিক আনন্দে উন্মত্ত থাকে? হত্যা কি আনন্দের? হত্যা কি সুখের? একজনের দেহে রক্ত ঝরলে কি আরেকজনের রক্তে পুলক জাগে? হত্যা কি কোন মহৎ শিল্প? রক্তশিল্প?

নবীন আজাদ বিছানায় শরীর বিছিয়ে দেয়। শরীরের তাজা মাংস লেগে থাকে বিছানায়। যে মাংসের লোভে ছুটে প্রাতিষ্ঠানিক হায়েনার দল।

নবীন আজাদ বিছানায় দন্ডায়মান বইয়ের সাড়ি থেকে একটি বই বের করে আনে। বিভূতিভূষণ বন্দ্যোপাধ্যায় এর পথের পাঁচালী। বইয়ের চরিত্রগুলো তার পরিচিত। নিয়মিত যোগাযোগ হয় তাদের সাথে। নবীন আজাদের মনে হয়, যৌবন এবং শিল্পিত বই কখনো উচ্ছিষ্ট হয় না। তৃষ্ণার্ত করে পাঠকের পর পাঠক, শ্রেষ্ঠত্বের পতাকা উড়ায় শতাব্দীর পর শতাব্দী।

 

নবীন আজাদ বই খুলে, যেন কোন প্রেমিকার দেহ থেকে কাপড় খুলছে। সন্তর্পণে। শৈল্পিকভাবে। যেন নারীর সৌন্দর্য ম্লান হয়ে না যায়। যেন লেখার সৌন্দর্য ম্লান হয়ে না যায়। । বই খুলে পড়াটাও একধরনের শিল্প? সবাই কি শৈল্পিকভাবে বই খুলতে জানে? না’কি পারে? শৈল্পিকভাবে খোলবার জ্ঞান কি সবাই অর্জন করে? বই অথবা কাপড়, যারা প্রেমিক শুধুমাত্র তারাই পারে শৈল্পিকভাবে খুলতে। ধর্ষকরা শিল্প বোঝে? লেখক, স্রষ্ঠা। বই, সৃষ্টি। সৃষ্টি কতোটা মূল্যবান সবার কি সে জ্ঞান থাকে? সৃষ্টির প্রতি সকলের শ্রদ্ধা থাকে? নবীন আজাদ একজন ছিঁচকে অ-কবিকে চিনতেন, যিনি পাছার তলায় নিজের বই রেখে নিজেকে মহান কবি ভাবতো। আর তার মুরিদেরা মাজার ভেবে লুটিয়ে পড়তো তার পাছায়।

নবীন আজাদ পড়তে থাকে। অপু ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনী।

নবীন আজাদ পড়তে থাকে। দুর্গা ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনী।

নবীন আজাদ পড়তে থাকে। সর্বজয়া ছুটে এসে বলে, নবীন আজাদ তুমি একজন খুনী।

স্মৃতির মুহুর্মুহু আক্রমণে অপরাধী পরিচয়পত্র বিস্মৃতির কারাগার ভেঙে ফুটন্ত জলের মতো নাচতে থাকে নবীন আজাদের মস্তিষ্কজুড়ে। নবীন আজাদ পড়তে পারে না। মস্তিষ্কের গ্রামোফোনে বিরতিহীন খুন-সংগীত বাজতে থাকে।  খুনীরা কি পড়তে পারে? খুনীরা কি সাহিত্য বোঝে? খুনীরা কি পথের পাঁচালী চিনে? খুনিদের মস্তিষ্ক নষ্ট ময়লাযুক্ত বিকৃত।

 

নবীন আজাদ কেন খুন করেছে? সে কি ক্ষমতার লোভে মাতাল হয়ে খুন করেছে? মাতালদের তো স্বাভাবিক জ্ঞান থাকে না। মাতাল হয়ে খুন করলে কি কেউ খুনি হয়? মাতালদের খুন করা বৈধ? মাতালরা খুন করলে তাদের কেউ অপরাধী বলে? অপরাধী বলার সাহস রাখে? নবীন আজাদ আকাশের বুকেপিঠে শূন্য অক্ষরে লিখে যায়, ক্ষমতাবান যখন নিজেকে ঈশ্বর ভাবতে শুরু করে তখনই অধঃপতন হয় একজন মহান নেতার। সেবক হয়ে ওঠে শোষক, লুটেরা, বেপরোয়া। সেবক অনন্তের, শোষক ক্ষণিকের।

নবীন আজাদ কি ঐশ্বরিক অক্ষর বাঁচাতে জ্যান্ত অক্ষর রক্ষাকারী বীরদের খুন করেছে? জ্যান্ত অক্ষর। যুক্তির অক্ষর। মুক্তচিন্তার অক্ষর। মুক্তির অক্ষর। যে অক্ষরে ভয় ঐশ্বরিক অক্ষরের পূজারীদের। অক্ষরে অক্ষরে যুদ্ধ চলুক, কিন্তু খুন কেন? খুন কি মহৎ করে কাউকে? খুন কি বাঁচিয়ে রাখে ঈশ্বরকে? খুন কি প্রয়োজনীয়? ধর্মান্ধতা। নিপাত যাক। মৌলবাদ। নিপাত যাক। মানব বিদ্বেষ। নিপাত যাক।

নবীন আজাদ কি সমাজের তুচ্ছ বিষয়গুলোর জন্য খুন করেছে? মতানৈক্য, খুন করো। জমি নিয়ে ঝামেলা, খুন করো, পারিবারিক দ্বন্দ্ব, খুন করো। নারী সান্নিধ্যের প্রতিযোগিতা, খুন করো। ব্যবসার দ্বন্দ্ব, খুন করো। খুন। খুন। খুন। যেন পৃথিবীব্যাপী খুনের মহোৎসব চলছে।

না। নবীন আজাদ এসব নোংরা বিষয়ে খুন করে নি। করতে পারে না। করা উচিত নয়।

নবীন আজাদ খুন করেছে সৌন্দর্যের জন্য।

নবীন আজাদ খুন করেছে ভালোবাসার জন্য।

নবীন আজাদ খুন করেছে প্রেমিকার জন্য।

নবীন আজাদ খুন করেছে প্রেমিক হওয়ারজন্য।

কিন্তু তবুও তার মনে হচ্ছে সে অপরাধ করেছে। হোক সৌন্দর্যের জন্য, ভালোবাসার জন্য, প্রেমিকার জন্য, প্রেমিক হওয়ার জন্য তবুও নবীন আজাদের মনে হচ্ছে সে একজন খুনি। নবীন আজাদ একজন খুনি, খুনি, খুনি, খুনি।

 

নবীন আজাদ সিঁড়ি দিয়ে উঠতে থাকে। এক, দুই, তিন, চার……..বিশ…….ত্রিশ……. সিঁড়ি……..সিঁড়ি…… সিঁড়ি। নবীন আজাদের মনে হয় সে আকাশে উঠছে। সে আজ হেঁটে হেঁটে আকাশে উঠবে। হেঁটে হেঁটে আকাশে ওঠা যায়? সিঁড়ি দিয়ে আকাশে যাওয়ার রাস্তা আছে? বিজ্ঞানের কাছে আছে? সাহিত্যের কাছে আছে? সাহিত্য। কল্পনা। সিঁড়ি। উঠতে থাকো। উঠতে থাকো। উঠতে থাকো। নবীন আজাদ ছাঁদে এসে দাঁড়ায়। ছোটখাটো একটা ফুটবল মাঠের মতো ছাঁদ। নবীন আজাদ ছাঁদের উপর বসে। ছাঁদের উপর ঘাস নেই কেন? সবুজ নেই কেন? সবুজের প্রতি এতো বিদ্বেষ কেন? ছাঁদটিকে তার কবিতার খাতা মনে হয়। ইটের টুকরো দিয়ে নবীন আজাদ লিখতে থাকে। পাতা উল্টানোর ক্লান্তি নেই। কাটাকুটির ঝামেলা নেই। নবীন আজাদ লিখতে থাকে। অনন্তকাল ধরে লিখতে থাকে। যেন লেখার জন্যই জন্ম হয়েছে তার। পৃথিবীর সমস্ত কিছুকে তার লেখার খাতা মনে হয়। পৃথিবীর বুকে লিখতে থাকে সে তার শিল্পিত কবিতা।

পৃথিবীর বুকে লেখার স্বাধীনতা আছে?

দূরালাপনি যন্ত্রটি বেজে ওঠে। সুরের ঝংকার কাঁটার মতো বিঁধে নবীন আজাদের শ্রবণেন্দ্রিয়ে। নবীন আজাদের ইচ্ছে হয় যন্ত্রটিকে পৃথিবীর গভীরতর গর্তে সমাহিত করতে। নবীন আজাদের ঘৃণা হয়। ঘৃণা হয় অপর দিকের দোপেয়ে জন্তুটিকে। ইচ্ছে হয় জন্তুটির মুখকে পৃথিবীর নিকৃষ্টতম পায়খানার মর্যাদা দিতে। জন্তুটি নবীন আজাদের নিকট আত্মীয়। উচ্চ শিক্ষিত দুর্নীতিবাজ আমলা।

নবীন আজাদ আয়নার সামনে দাঁড়ায়। আয়নায় নিজের প্রতিবিম্ব দেখে। নবীন আজাদের মনে হয় তার ভুঁড়ি অস্বাভাবিক বৃদ্ধি পাচ্ছে। পেটে কবিতা জমে থাকলে কি ভুঁড়ি কাঁঠাল কন্যা হয়ে ওঠে? নবীন আজাদ আবিস্কার করে নিজেকে। প্রতিবিম্ব হাসছে। নবীন আজাদ মুগ্ধ হয়ে হাসি দেখে। একজন কবির হাসি।

আনন্দঘন সময়ের প্রদীপ দমকা হাওয়ায় নিভে যায়। কর্পূরের মতো উড়ে যায় হাসি। প্রতিবিম্বের ঠোঁট চিড়ে বেরিয়ে আসে ধ্বনি। নবীন আজাদ তুমি একজন খুনি!

প্রতিবিম্ব প্রশ্ন করে নবীন আজাদকে, মানুষ কি শুধু মানুষ খুন করে? রক্তের স্রোতে কি মানুষ সন্তুষ্ট হয়? মানুষ কি বন হত্যা করে না? মানুষ কি প্রাণী হত্যা করে না? মানুষ কি নদী হত্যা করে না? মানুষ কি সাগর হত্যা করে না? মানুষ কি আকাশের ওজোনস্তর হত্যা করে না? হত্যা করে কি তাদের অপরাধ হয়? তারা কি ভাবে যে তারা বৃহৎ কোন অপরাধ করেছে? তারা কি নিজেদের ধ্বংসকারী ভাবে? বিনাশকারী ভাবে? খুনি ভাবে?

প্রতিবিম্ব ফাঁটা বাঁশের মতো চিৎকার করে উঠে, নবীন আজাদ তুমি অসুন্দের জন্য খুন করো নি অতএব তুমি খুনি। তুমি ধ্বংসের জন্য খুন করো নি অতএব তুমি খুনি। তুমি ঘৃণার জন্য খুন করো নি অতএব তুমি খুনি। তোমার খুন করা উচিত ছিল গরিবের পেটের ভাত। তোমার খুন করা উচিত ছিল শ্রমিকের ন্যায্য মজুরি। তোমার খুন করা উচিত ছিল সততাকে। তোমার খুন করা উচিত ছিল সত্যকে। তাহলে তুমি খুনের স্বাদে উল্লাস করতে। সভ্যতা খুন করো, উল্লাস। ইতিহাস খুন করো, উল্লাস। সংস্কৃতি খুন করো, উল্লাস। সাহিত্য খুন করো, উল্লাস। বিজ্ঞান খুন করো, উল্লাস। দর্শন খুন করো, উল্লাস। অধিকার খুন করো, উল্লাস। স্বাধীনতা খুন করো, উল্লাস। ভাষা খুন করো, উল্লাস। অন্যায় খুন করো, বিষাদ। মিথ্যা খুন করো, বিষাদ। বিচারহীনতা খুন করো, বিষাদ। পুঁজিবাদ খুন করো, বিষাদ। বর্ণবাদ খুন করো, বিষাদ।

 

কার্জনের সবুজ জমিনে স্থির দাঁড়িয়ে থাকে নবীন আজাদ। তৃষ্ণার্ত পথিকের মতো আকন্ঠ পান করতে থাকে নির্বাক কোলাহল। নিদ্রাহীন রাত্রির সমস্ত ক্লান্তি অবাধ্য ঝরনাধারার মতো ছুটে আসে। ক্লান্তির ঝাপটায় নবীন আজাদ প্রাকৃতিক নক্সী-কাঁথায় বসে। সবুজ ঘাস লাল দেয়াল জড়িয়ে ধরতে চায় তাকে। সে পালাতে চায়। সে অপবিত্র। সে খুনি। দেয়াল তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে অপবিত্র হবে। ঘাস তুমি আমাকে জড়িয়ে ধরলে অপবিত্র হবে। তমা এসে পাশে বসে নবীন আজাদের। রাতের ক্লান্তি অসভ্য প্রথা ভাঙবার মতো ভেঙে পড়ে। নবীন আজাদ তমার দিকে তাকায়।

শাড়ি। নীল। শাড়ি। নগ্ন চুল। শাড়ি। টিপ। শাড়ি। দুল। শাড়ি। নোলক। শাড়ি। ঠোঁটকাঠি। শাড়ি। চুরি। শাড়ি। স্তন। শাড়ি। নাভিকূপ। শাড়ি। নিতম্ব। শাড়ি। নূপুর। শাড়ি। প্রেম। শাড়ি। প্রেমিকা। শাড়ি। মুগ্ধতা। শাড়ি। মুগ্ধতা। শাড়ি। মুগ্ধতা।

তমা নবীন আজাদের কাঁধে মাথা রাখে। নবীন আজাদ দৌড়ে পালাতে চায়। তমা নবীন আজাদের হাত ধরে নবীন আজাদ দৌড়ে পালাতে চায়। তমা নবীন আজাদের গালে চুমু খায়। নবীন আজাদ দৌড়ে পালাতে চায়। নবীন আজাদের আত্মা চিৎকার করে উঠে, তমা তুমি জানো না আমি একজন খুনি। আমি অপবিত্র। আমাকে ছোঁয়া পাপ। আমাকে ছোঁয়া অন্যায়। নবীন আজাদ বুক পকেটে হাত দেয়। পকেটস্থ গর্ত থেকে বেড়িয়ে আসে শুভ্র পাতা। পাতার বুকে লকলক করে জ্বলতে থাকে কালো অক্ষরের সমাধিসৌধ। তমার ঠোঁটে মৃত অক্ষরগুলো হাঁপানি রোগীর মতো লাফাতে থাকে। মৃত্যুর কারাগার ভেঙে অক্ষরগুলো বেড়িয়ে পড়ে। ধ্বনিত প্রতিধ্বনিত হয়।

 

তোমার ঠোঁটে খুন যদি হয়

আমার সেনাপতি

ঊরুসন্ধিতে কবর দিও

হে ভাগ্যবতী।

কার্জনহলের সৌন্দর্য বিনাশকারী ফুলের দোকান কার্জনহলের সামনে শুয়ে আছে সৌন্দর্য বিক্রির জন্য। নবীন আজাদ দাঁড়িয়ে শ্রেষ্ঠতম চারাগাছটি খুঁজে। প্রশ্নবাণে ক্ষতবিক্ষত করতে চায় বিক্রয়কারীকে। তবে বিক্রেতা এসব বিষয়ে স্নাতক স্নাতকোত্তর গবেষণা চাটুকারিতা সমাপ্ত করে এসেছে, তাই তাকে পরাজিত করার স্বপ্ন দুঃস্বপ্নের চক্রে চক্কর দিতে থাকে। নবীন আজাদ একটি গোলাপের চারাগাছ কিনে। নবীন আজাদ সৌন্দর্য কিনে। টাকা ছাড়া সৌন্দর্য মিলে? টাকার চেয়ে অধিক সুন্দর কিছু আছে? টাকার চেয়ে অধিক নষ্ট কিছু আছে?

টাকা, সব নষ্টের মূল।

টাকায়, সঠিক মানুষ ভুল।

টাকা, গরীবের ঈশ্বর।

টাকায়, ধনী অধীশ্বর।

টাকা, সততার গোলাম।

টাকায়, সৎ মানুষ নিলাম।

নবীন আজাদ ছাঁদে উঠে। ছাঁদে তৈরী ফুলের বাগানে রাখে চারাগাছটি। সন্তান প্রসবের গৌরব হৃদপিন্ডের ভেতর উজ্জ্বল আলোকছটা হয়ে নৃত্য করতে থাকে। নবীন আজাদ সদ্য স্থাপিত চারাগাছের পাশের একটি যৌবনবতী গোলাপ গাছের দিকে তাকায়। যে গাছে একটি হৃষ্টপুষ্ট কাব্যিক গোলাপ ছিল, যে গোলাপ খুনের দায়ে নবীন আজাদ আজ খুনি।

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
মৃদুলা

মৃদুলা

শহীদুল ইসলাম মৃদুলা মৃত্যু উপত্যকায় দাঁড়িয়ে বলছি তুমি তোমার খেয়াল রেখ। তুমি তোমার যত্ন নিও। তুমি আরো বাঁচো। হাজার বছরের চেয়েও বেশি বাঁচো। তুমি আরো ...
কবিতা-মনে পড়ে

কবিতা-মনে পড়ে

গোবিন্দ মোদক  মনে পড়ে    ছোট্টবেলার সেই যে আমার গ্রাম, মনে পড়ে    সেই গ্রামটির ‘ফকিরতলা’ নাম! মনে পড়ে    গ্রামটি ছিল ‘কুসুম’ নদীর তীরে, ...
ভালোবাসা দিবসে সিঙ্গেল? - কি করবেন?

ভালোবাসা দিবসে সিঙ্গেল? – কি করবেন?

ছাইলিপি আর্টিকেল ডেস্ক ভ্যালেন্টাইন্স ডে, প্রেমের দিন হিসাবেও পরিচিত, প্রায়ই রোম্যান্স এবং সম্পর্কের সাথে জড়িত। যাইহোক, যারা অবিবাহিত তাদের জন্য, এই ছুটি তাদের অবস্থার একটি ...
ভালোবাসার দ্বিতীয় প্রহর [পর্ব-০৬]

ভালোবাসার দ্বিতীয় প্রহর [পর্ব-০৬]

পার্থসারথি রুচিরার পরীক্ষা শুরু হয়েছে। আরও পনের বিশ দিন লাগবে শেষ হতে। সৈকতের পরীক্ষা সামনের সপ্তাহেই শেষ হবে। আর আজই পারমিতার শেষ পরীক্ষা। রুচিরা ও ...
জোবায়ের রাজুর যৌথগল্প

জোবায়ের রাজুর যৌথগল্প

আকাশ কত দূরে জিনিয়াদের আলিশান এই রাজমহলের মত বাড়িতে হোসেন সাহেবের সামনে এভাবে বসে থাকতে বড় অস্বস্তি লাগছে জুয়েলের। জিনিয়ার উপর তার বড্ড রাগ হচ্ছে। ...
ঈদের খুশি

ঈদের খুশি

শুভ জিত দত্ত ওই উঠেছে আকাশে চাঁদ কালকে খুশির ঈদ। একটি মাস রোজা‌‍ শেষে আসে খুশির ঈদ, নামাজ শেষে কোলাকুলি ‌বড় ছোট নির্বিশেষে। নানা রকম ...