ওর আর আমার গল্প

জোবায়ের রাজু

আমাদের সংসারে এসে সাবিনা প্রথমে দারুণ সংসারি ছিল। ঘর দোর পরিপাটি করে রাখতে ওর তুলনা সে কেবল নিজেই ছিল। এমন একটি বউ পাওয়া ভাগ্যের ব্যাপার, একথা আমি বেশীদিন ভাবতে পারিনি। সাবিনা দিন দিন বদলে যেতে থাকে। বদলে যাবার কারণ, আমাদের রোজদিনের অভাব আর টানাপোঁড়নের কঠিন বাস্তবতা। সাবিনার স্বপ্ন আর আকাঙ্খা আকাশ সমান। প্রতিনিয়ত নতুন শাড়ি গয়না থেকে শুরু করে অভিজাত রেস্টুরেন্টে মাঝে মধ্যে লা বা ডিনারের আবদার তুলতে তুলতে ভুলে যায় সে এই নিন্ম মধ্যবিত্ত ঘরের অতি সাধারণ এক গ্রাম্যবধূ। জোর গলায় কিছু বললে ওর অভিমান আর ক্ষোভ পাহাড় সমান জমে যায়। আমার বাবা মা দুজনে সাবিনার আপত্তিকর আচরণে মর্মাহত।
একদিন এই ঘর ছেড়ে বাপের বাড়ি চলে যায় সাবিনা। এখানে নাকি রোজ কাঁচকলা আর ডাল ভাত ওর গলা দিয়ে নামে না। যাবার বেলায় সে তাচ্ছিল্যে বলে যায় ‘তোমরা ফকিন্নি, এটা আগে জানলে কখনো বিয়েতে রাজি হতাম না।’ সাবিনার কথার জবাব দেয়ার ভাষা জানা ছিল না। সে তো এক অর্থে মিধ্যে বলেনি। কি আছে আমাদের! শুধু ঘরের ভিটা ছাড়া।



২.
দিন চলে যায়। মা বলেন ‘বউমাকে নিয়ে আয় বাবা। আমার মন বলছে সে আসবে।’ এক বুক আশা নিয়ে আমি সাবিনাকে আনতে যাই। আমাকে অপমান অপদাস্ত করে সে তাড়িয়ে দেয়। সে গল্প শুনে মা নিরবে দীর্ঘশ্বাস ছাড়েন।
দিন মাস বছর পার হয়। সাবিনার সাথে দূরত্বও ক্রমশ বাড়ে। আর্থিক সংকট আর বেকার সময়ের গøানি টানতে টানতে আমরা যে জীবনের সাথে যুদ্ধ করতে করতে কোনো রকম বেঁচে আছি, সাবিনা এই এতদিনে একবারও আমাদের খবর রাখেনি। এখন মনে হয় মধ্যবিত্তঘরের এই উচ্চবিলাসি মেয়েকে আমার বাবা তার ছেলের বউ করে বড় ভুলটা করেছেন। সাবিনার জন্য দরকার ছিল কোনো বড়লোকের ছেলে। আমি নই।

৩.
আলী মাষ্টার আমাদের বাড়ি এসেছেন। বাবার খুব প্রিয় শিক্ষক ছিলেন তিনি। প্রিয় শিক্ষককে দেখে আনন্দে বাবা চেয়ার পেতে দিলেন বসতে। আয়েসি ভঙিমায় আলী মাষ্টার চেয়ারে বসলেন।
তিনি এক মহৎ কাজের প্রস্তাব নিয়ে এসেছেন। নিঃসন্তান বলে তার সমস্ত বিষয় সম্পত্তি প্রিয় ছাত্রকে দান করতে চান। বাবা প্রথমে আপত্তি জানালেন। কিন্তু আলী মাষ্টার বাবার অপারগতাকে তোয়াক্কা না করে তার সমস্ত বিষয় সম্পত্তি বাবার নামে লিখে দিলেন।
রাতারাতি বদলে গেল আমাদের জীবনধারা। অল্প দিনে বাড়ির পরিবেশ বদলে গেল। ভাঙা ঘর ছেড়ে দাঁড়িয়ে গেল চোখ ধাঁধানো দালান। টাইলস্ লাগানো বাথরুম, সান বাঁধানো ঘাট, দৃষ্টি নন্দন বাড়ির গেইট আর দামি দামি আসবাব পত্রে সাজিয়ে উঠল আমাদের হঠাৎ বড়লোক হয়ে উঠা ঘরের প্রতিটি কক্ষ।



৪.
ভোর বেলায় দুয়ারে টোকা পড়ল। দুয়ার খুলে যাকে দেখে আমি থমতম খেলাম, সে সাবিনা। বিশাল এক স্যুটকেস হাতে নিয়ে আর মুখে রাঙা হাসি দিয়ে বলল ‘আমি সব শুনেছি। গোপনে তোমাদের সব খবর রাখতাম। কে আমাকে খবর জানাতো, তার নাম বলবো না।’ আমি ঘুমকেতুর চোখে বললাম ‘ও আচ্ছা।’ সাবিনা বোরকা খুলতে খুলতে বলল ‘তোমাদের এখন সব হয়েছে, এখন আর আমার এখানে থাকতে আপত্তি নেই। ওমা, কি সুন্দর ঘর করেছো।’
সাবিনার কথায় আমার গা জ্বলে উঠল। দুঃখের দিনে যে আমাদের পাশে ছিল না, অবহেলা করে চলে গেছে, আজ আমাদের সুখের দিনেও তার দরকার নেই। আন্দোলিত গলায় বললাম ‘ফিরে যাও। তুমি স্বার্থপর। সুযোগ সন্ধানী। তোমাকে বিশ্বাস করা যায় না।’
সাবিনা আমার কথায় যখন কেঁদেই দিচ্ছিলো, বাবা তখন পিছন থেকে এসে বললেন ‘বৌমা কোথাও যাবে না। এখানেই থাকবে।’ সাবিনা দৌড়ে গিয়ে বাবার পা ধরে কাঁদতে কাঁদতে বলল ‘আমাকে মাফ করে দেন আব্বা। আমি অন্যায় করেছি।’
এই ভোর বেলায় বাড়ির পরিবেশ এমন হবে, আমি ভাবতেই পারিনি। আমি চাই সাবিনা ফিরে যাক। আমার জীবনে ওর মত স্বার্থপর নারীর দরকার নেই।

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

এই লেখাটি শেয়ার করুন