সংকট মোচন

গৌতম সরকার

কম্বলটা আরেকবার ভালো করে জড়িয়ে নিয়ে পাশ ফিরতে যাবে এমন সময় ফোনটা বেজে উঠল। ভোরের দিকে একপশলা বৃষ্টি হয়েছে, আকাশ মেঘে ঢাকা, পরিবেশটা গুঁড়ি মেরে আরেক রাউন্ড ঘুমানোর জন্য প্রশস্ত, তাই ফোনের ঘন্টিকে পাত্তা না দিয়ে কম্বলটাকে বেশ কয়েক থাকে কানের উপর চাপিয়ে দিল। ঘন্টি থামতেই আয়েশ করে পাশ ফিরতে গিয়ে দ্বিতীয় দফায় ফোনটা বেজে উঠল। এবার না ধরে উপায় রইল না। ঘুমের ঘোরে প্রথমটা কিছু বুঝে উঠতে না পারলেও অবশেষে প্রতীতি ঘটল, তিনি হলেন বিরূপাক্ষ বজ্রবাহু, বাজেগোবিন্দপুর থানার বড়বাবু৷ এই মুহূর্তে থানা সংলগ্ন কোয়ার্টারে শুয়ে আছেন৷ ফোনের ওপারে কথা বলছে থানার একমাত্র হাবিলদার সরজুপ্রসাদ। সরজুপ্রসাদের বক্তব্য মগজে ঢুকতেই তড়াক করে খাট ছেড়ে কোনওরকমে মুখে চোখে একটু জল ছিটিয়ে ধরাচূড়া পড়তে পড়তেই থানার দিকে দৌড়লেন। 


 

থানায় ঢুকেই বজ্রবাহু দেখলেন সেপাই গোবিন্দ, ঝাড়ুদার লখনলাল আর সরজুপ্রসাদ গরাদঘরের সামনে অ্যাটেনশনের ভঙ্গিতে দাঁড়িয়ে আছে আর গাঁটকাটা মানিক, যাকে বহু চালাকির আশ্রয় নিয়ে কাল বিকেলে মীরগঞ্জের চড়কের মেলা থেকে ধরা হয়েছে, তাদের রীতিমতো ধমকাচ্ছে। দেখেশুনে অকালে ঘুমভাঙা মটকাটা আরও গরম হয়ে উঠল। তাকে দেখে সেপাই-ঝাড়ুদার-হাবিলদার একসঙ্গে বাংলা-হিন্দি-দেহাতি মিশিয়ে হাঁউমাঁউ করে কিছু বলতে উঠলে এক ধমকে সবাইকে চুপ করিয়ে দিয়ে সোজা গরাদের কাছে গিয়ে চোখ পাকিয়ে মানকেকে জিজ্ঞাসা করলেন, “তুই নিজেকে কি মনে করিস? মাতব্বর! তুই কি ভেবেছিস তোকে জামাইষষ্ঠীর নেমন্তন্ন খাওয়াবার জন্যে থানায় ধরে নিয়ে আসা হয়েছে?” বড়বাবুর চোখ রাঙানিতে বিন্দুমাত্র না ভড়কে মানকের সপাটে উত্তর, “তা বলে ছ্যার চায়ের দেশের মানুষ হয়ে সকালবেলা এই চায়ের ছিরি! ছ্যা ছ্যা ম্যাগো! যেমন তিতকুষ্টি তেমনই মোষের মত রঙ!” 



এত সকালে বড়বাবুর কপালে চা কেন একগেলাস জল পর্যন্ত জোটেনি, এখন এই নবাবপুত্রের মুখে চায়ের ব্যাখ্যান শুনে বজ্রবাহু হুঙ্কার ছাড়লেন, 

“এই প্রত্যুষে এই মহামান্যর জন্যে চায়ের ব্যবস্থা কে করেছে?” উপস্থিত তিনজন একবার এ-ওর মুখের দিকে তাকিয়ে চোখ নামিয়ে চুপ করে দাঁড়িয়ে থাকে। 

“কি হল উত্তর দিচ্ছ না কেন!”

তাদের উত্তর দেওয়ার আছেই মানিক গাঁটকাটা একইরকম তাচ্ছিল্য মেশানো গলায় বলতে থাকে, “আর বিস্কুট, রামো রামো! তেলগন্ধ ওই বিস্কুট তো রাস্তার কুকুরকে দিলেও ভৌ ভৌ করে খানিকটা মুখখারাপ করে মুখ ঘুরিয়ে চলে যাবে”৷ বড়বাবুর মেজাজের পারদ চড়ছে, তিনি মুখ ঘুরিয়ে গলায় অনেকটা মধু ঢেলে মানকের দিকে তাকিয়ে শুধোলেন, 

“তা জাঁহাপনার জন্য কোন চা আর কোন ধরণের বিস্কুটের ব্যবস্থা করলে আপ্যায়নের কোনও ত্রুটি হবেনা জানাতে আজ্ঞা হোক!” এতে একটুও না ঘাবড়ে মানকে বলে, 

“ছ্যার আমার ইস্তিরি নক্ষীকে যদি একটু খবর দ্যান, ওর হাতের তৈরি চা অমৃত। ওই চা খেয়ে দিন শুরু না করলে সারাদিন গা ম্যাজ ম্যাজ করে, কাজে মন বসে না, রোজগার পাতি কম হয়”৷ বড়বাবুর একটা প্রচন্ড ধমকে মানিক চুপ করে যায়, নাহলে ফিরিস্তি আরও কত লম্বা হত কে জানে! ধমক দিয়ে গটগট করে নিজের চেয়ারে গিয়ে বসলেন, কর্মচারীদের যে যার কাজে বহাল হতে নির্দেশ দিলেন। গোবিন্দ বড়বাবুর সামনে রাখা টুলে বসে হাজিরা খাতাটা টেনে নিয়ে মনোযোগ সহকারে কি সব দেখতে লাগল, সরজুপ্রসাদ নিজের লাঠিটা কুড়িয়ে নিয়ে দরজার পাশে গিয়ে দাঁড়ালো আর লখনলাল ঝাঁটা-বালতি নিয়ে বাথরুমে ঢুকল। কিছুক্ষণ সব চুপচাপ, সেই মানিকই আবার নীরবতা ভঙ্গ করল। গরাদের ভিতর থেকে বেশ উঁচুগলায় রাগত স্বরে বলে উঠল, “আমি একটা কম্পেন নেকাতে চাই ছ্যার!” বড়বাবু মুখ তুলে তাকালেন, বুঝলেন মানকে ‘কমপ্লেন’ বলতে চাইছে। জিজ্ঞাসা করলেন, “কার বিরুদ্ধে?”

“এই থানার বিরুদ্ধে”৷

“কার কাছে?”

“কেন? মহামান্য সরকারের কাছে”! এত রাগের মধ্যেও মনে মনে হেঁসে ফেললেন বড়বাবু।

“তা হেতুটা কি?”

এবার তো তো করতে লাগল মানিক।

“ওই কি বলে মানব অধিকার নঙ্ঘন না কি!” বড়বাবুর চোখ কপালে উঠে যায়, একেবারে ‘হিউম্যান রাইটস’ নিয়ে টানাটানি করতে শুরু করেছে। এবার একটু মজা করার জন্য জিজ্ঞাসা করলেন, “তা নঙ্ঘনটা কি হল?”

“হল নে? চোর হই আর ডাকাত-গাঁটকাটা হই না কেন, মানুষ তো বটে! তা থানা হোক বা কোর্ট আমাদের পয়োজনটা তো মেটাতে হবে। বিচার তোমরা করো, দোষ হলে শাস্তিও দাও, তাবলে খাবার সময় খাবার দেবেনা, বা দিলেও এমন খাবার দেবে যে মুখে তোলা যাবেনা, এমনতো চলতে পারেনা। আমাদেরও উনিয়ন আছে, সেথাও বছরে একবার দুবার কনফারনস্ হয়, আমাদের দাবিদাওয়া নিয়ে বিস্তর আলোচনা হয়। তাই আমি সরকারের কাছে কম্পেন নেখাবো, নিখে ন্যান!” বড়বাবু এবার বেড়ে মজা পেলেন, গোবিন্দকে বললেন গরাদের তালা খুলে মানিককে তাঁর সামনে আনতে। মানিক গটমট করে বড়বাবুর টেবিলের সামনে এসে দাঁড়াল। বিরূপাক্ষ ভাবলেন এবার বুঝি মানবাধিকারের কথা বলে তাঁর সামনে চেয়ারে বসতেও চাইবে। যাই হোক মানিক অতটা এগোলো না। বড়বাবু নকল গাম্ভীর্যে ডায়েরির ফাইল খুলে প্যাড আর পেন বের করলেন। তারপর বললেন, “বল মানিক তোর অভিযোগের বয়ানটা কি হবে। আমি লিখে নিচ্ছি”। মানিক চোখ বুজে সবে ভাবতে শুরু করেছে, এমন সময় সরজুপ্রসাদকে ঠেলে সরিয়ে সাদা থান পড়া এক বৃদ্ধা মহিলা খোঁড়াতে খোঁড়াতে থানায় ঢুকেই ধমকাতে লাগলেন, “কোথায় গেল সেই হারামজাদা!’ তারপর বড়বাবুর টেবিলের দিকে হ্যাঁচড়াতে হ্যাঁচড়াতে আসতে আসতে বলতে লাগলেন, “হ্যাঁ রে বিটলে, কাল রাতে তোকে যে বার বার বললাম সারাদিন চোর-ছ্যাঁচরের পিছনে দৌড়ে দৌড়ে শরীরের সব রক্ত ঘাম হয়ে বেরিয়ে যাচ্ছে, সকালে এই কুলেখাঁড়া ভেজানো জলটা খেয়ে পায়খানা যাস। পেটটা একেবারে সাফ হবে, খিদে লাগবে, রক্ত তৈরি হবে, শরীরে গত্তি লাগবে। আর তুই আমার কথা অমিন্যে করে না খেয়ে এখানে চলে এসেছিস!” থানায় তখন এক অদ্ভুত পরিস্থিতি। সরজুপ্রসাদকে ঠেলে ঢোকার জন্য সে পিছন পিছন, “এই বুঢ়িয়া, ক্যা হুয়া! কাঁহা যা রহি হ্যায়” বলতে বলতে ধেয়ে এসেছে। গোবিন্দ তো পাগল টাগল ভেবে দুহাত তুলে হাঁ হাঁ করে তেড়ে গেছে। বুড়ির বয়স হলে কি হবে! তাগড়াই চেহারা, বাতের কারণে পা একটু কমজোরি হলেও এখনও ফলতা থেকে ফালাকাটা আর ডানকুনি থেকে ডাল্টনগঞ্জ করতে পারে। অনায়াসেই গোবিন্দকে ডজ মেরে টেবিলের সামনে এসে ঠক করে একটা কাঁচের গ্লাস রেখে সামনের দিকে তাকিয়ে কৈফিয়ত তলব করলেন। এতক্ষণ ধরে তৈরি করা বড়বাবুর ইমেজ নিমেষে ধূলিসাৎ হওয়ার দশা। বিরূপাক্ষর এই দূর সম্পর্কীয় পিসির উদয় গতকালই হয়েছে। আর আসা ইস্তক অবিবাহিত ভাইপোর আগাপাশতলা দায়িত্ব নিজের হাতে তুলে নিয়েছে। বিরূপাক্ষ ভেবেছিলেন দায়িত্ব বা কর্তৃত্বটা শুধু অন্দরমহলের মধ্যেই সীমাবদ্ধ থাকবে, সেটা এত শিগগির থানা পর্যন্ত ধাওয়া করবে বুঝে উঠতে পারেন নি। বিরূপাক্ষ কিছু বলে ওঠার আগেই বুড়ি মানিককে সরিয়ে একটা চেয়ারে বসে ডুকরে কেঁদে উঠলেন, “হ্যাঁ রে বিটলে, তোর মা বেঁচে থাকলে এই অমান্যিটা করতে পারতিস? আঁ! আমার নিতাইটা বেঁচে থাকলেও সেও তার মাকে এমনটা করতে পারতো নি। আমি কাল রাত জেগে কুলেখাঁড়ার পাতা বেটে জল করে রাখলাম সকালে আমার বিটলে খাবে বলে! আর তুই!” বলে আরেকপ্রস্থ কান্নার ঢেউ উঠল। এই পিসি আসার কথা থানায় কারোর জানার কথা নয়, তবুও পরিস্থিতি বুঝে গোবিন্দ আর সরজুপ্রসাদ নিজেদের সামনে নিল, শুধু মানকে মিটিমিটি হাঁসতে লাগল। বড়বাবুর সঙ্গে চোখাচুখি হতে সেই হাঁসিতে একটু যেন ফিচলেমি মিশিয়ে দিল। বিরূপাক্ষ বলে উঠল, “আঃ পিসি, তুমি আবার এখানে এলে কেন! তুমি কোয়ার্টারে যাও, আমি একটু কাজ সেরে আসছি”। একথা শুনেই টেবিল ধরে বুড়ি বহু কষ্টে মাজা সোজা করে দাঁড়াল। এই বয়সেও বুড়ির গলার রেঞ্জ শোনার মতন। চোখ পাকিয়ে বলে উঠল, “দেখ বিটলে, আমাকে রাগাস নে আর তোর কাজও দেখাস নে। ঘুনসি পড়া ন্যাংটো বেলা থেকে তোকে কোলে পিঠে মানুষ করেছি। কতবার হেগে-মুতে কাপড়চোপড় নোংরা করে দিয়েছিস, বিধবাকে বারবেলায় চান করতে হয়েছে। আর তুই আমাকে কাজ দেখাচ্ছিস! আমি বুড়ো মানুষ খোঁড়াতে খোঁড়াতে এটা নিয়ে এলাম, আগে তুই খা, নাহলে এই গেলাস তোর খাতার ওপর ঢেলে আমি চলে যাবো”। বড়বাবু প্রমাদ গণলেন, এ তো তাঁর ইজ্জতের জামাকাপড় ধরে টানাটানি হচ্ছে। এখন শুধু মানিক নয়, বাকিদের মুখেও চোরা হাঁসি খেলে বেড়াচ্ছে। বিরূপাক্ষ আর দ্বিরুক্তি না করে টেবিল থেকে গ্লাসটা তুলে করে একচুমুকে শেষ করে দিলেন। এবার বললেন, “হয়েছে তো পিসি! এখন তুমি যাও, আমি একটা কাজ করেই আসছি”৷ বুড়ি পিছন ফিরে কোঁকাতে কোঁকাতে বললেন, “আর কাল তোকে যে বাতের তেল আনার কথা বলেছিলাম, সেটা আবার রাজ্যির কাজের চাপে ভুলে যাস না বাপ”। ঠিক সেই মুহূর্তে মানকে ছিটকে এসে পিসির পথ আটকে দাঁড়াল।



 গলায় একবোতল মধু ঢেলে বলল, “পিসি, আমার শ্বশুরবাড়ি চকগোবিন্দপুরে একজন কাঠিবাবা আছেন, তেনার মন্ত্রপুত তেলে বাত কেন, বাতের বাপ-ঠাকুর্দা, ঠাকুমা-জ্যেঠিমা চোদ্দপুরুষ সব দূর হয়ে যায়। আমার নিজের খুড়শ্বশুরের ভায়রা ভাইয়ের সেজ ভাইয়ের শেলেজ বাতের বেদনায় বিছানা ছেড়ে উঠতে পারতো না, সেই মানুষ ঠিক দু হপ্তা তেল মালিশ করে এখন দুমাস ধরে কাশী-বৃন্দাবন-মথুরা-বেনারস তিত্থি করে বেড়াচ্ছে”৷

 বুড়ি হইহই করে উঠল, “ও বাবা বিটলে, শুনছিস এ কি বলছে? আমার বিপদভঞ্জন মধুসূদন এয়েছে রে!” বলেই মানিকের থুঁতনি ধরে বেশ কয়েকটা চুমু খেয়ে নিলেন। এবার মানিকের তোবড়ানো গালের খসটে যাওয়া মুখটা দুহাতে ধরে আদর করতে করতে বললেন, “ও বাবা! কোথায় তোর কাঠিবাবা! আমাকে নিয়ে চল মানিক! তোর এই বুড়ো মা বাতের ব্যাথায় সারারাত দুচোখের পাতা এক করতে পারে না”। বিরূপাক্ষ এতক্ষণ দর্শকের ভূমিকায় ছিল, ব্যাপারটা হাতের বাইরে চলে যাচ্ছে দেখে নিজের কয়েক মণি শরীরটাকে চেয়ারের খাঁচা থেকে উদ্ধার করে এগিয়ে এলেন, 

“করো কি! করো কি পিসি! ও একটা গাঁটকাটা, ওর কথা একবিন্দুও বিশ্বাস কোরো না৷ 

আমি তোমাকে ভালো ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবো”৷ উনি সরজুপ্রসাদকে ইশারা করলেন মানিককে সরিয়ে নিয়ে যেতে। পিসি মানিকের একটা হাত শক্ত করে ধরে আছে, অন্য হাতে টান পড়তেই পিসি নিজ মূর্তি ধারণ করলেন, “খবরদার! আমার মধুসূদনকে নিয়ে কেউ টানাটানি করবি না। এর চোখে আমি বিপত্তারণকে দেখতে পেয়েছি। পীড়িত, দূর্বল, অসহায়দের উদ্ধার করতেই এনারা তাঁর দূত হয়ে ধরাধামে অবতীর্ণ হোন”। আগের ধাক্কার কথা স্মরণ করে সরযুপ্রসাদ কয়েক হাত সরে দাঁড়িয়ে বড়বাবুর দিকে কাতর নয়নে তাকায়। বাকিরা দর্শকের ভূমিকায়, শুধু মানকের মুখে হাসিটা অনবরত শেডস বদলে চলেছে। বড়বাবুর গা রি রি করে উঠলেও বুঝতে পারলেন, মাঝমাঠের দখল পুরোপুরি মানকে নিয়ে নিয়েছে, পিসিকে উইঙ্গারে খেলিয়ে যেকোনও মুহূর্তে গোলের বন্যায় অন্যদের ধুইয়ে দেবে, তাই অতি সত্বর ‘প্ল্যান এ’ বদলে ‘প্ল্যান বি’ তে শিফট না করতে পারলে ল্যাজেগোবরে হতে হবে। বিরূপাক্ষ এগিয়ে এসে পিসিকে জড়িয়ে ধরে আগে মানকের হাত ছাড়ালো, তারপর পিসিকে বলল, “পিসি তুমি একদম ভেবো না, আমি তোমাকে কাঠিবাবার কাছে নিয়ে যাবো। তুমি এখন ঘরে যাও, তোমার পূজো আছে না! দেখো গিয়ে লতার মা এলো কিনা! আমি আজ কিন্তু তোমার হাতের ফুলকো ফুলকো লুচি আর সাদা আলুর তরকারি খাবো বলে দিলাম। কতদিন খাইনি!” পেনাল্টি বক্সে ঢুকে পড়া বিপক্ষ ফরোয়ার্ডের পা থেকে নিখুঁত ট্যাকলে বলটাকে ক্লিয়ার করে যখন নিজের দলের খেলোয়াড়দের পিঠ চাপড়ানি খাওয়ার অপেক্ষায় বুকের সাথে পিঠটাও একটু ফোলানোর চেষ্টা করছেন বিরূপাক্ষ বজ্রবাহু ঠিক সেই সময়ে রিবাউন্ডে নিখুঁত পাসে বল আবার পেনাল্টি বক্সে উড়ে গেল, আর এক দুর্ধর্ষ শটে গোল হলনা বটে কিন্তু বিপক্ষ পেনাল্টি পেয়ে গেল। বিরূপাক্ষ তখন পিসিকে টানতে টানতে দরজার মুখে পৌঁছে গেছেন সেই মুহূর্তে শক্তিশেল এসে পিসিকে বিঁধল, 

“পিসি আমার বউ নক্ষীর কাছে বোধহয় সেই তেলের একটুক রয়ে গেছে, গত বছরে ওর বাপের ব্যারামের সময় নেয়েছিল। বড়বাবু যদি একটু খপর দিয়ে আনাতে পারেন তাহলে সুজ্জাস্তের পর  মালিশ করে দিলে আপনার ব্যাতা-বেদনা বেবাক গায়েব হয়ে যাবে”৷ এটা শুনে পিসি পুরোপুরি বধ হয়ে গেলেন।

এরপর যেটা শুরু হল সেটা হল মানকে গারদের তুলনায় বেশি সময় কাটায় বড়বাবুর কোয়ার্টারে। তার এখন অনেক কাজ। সকাল-সন্ধ্যায় পিসির শরীরে বাতের তেল মালিশ করা তো আছেই তার সাথে ঘরের কাজ, কুয়ো থেকে জল তোলা, বাগানের মাটি কুপিয়ে পিসির পছন্দের পুঁইশাক, ছাঁচি কুমড়ো, শিম, উচ্ছে, ঝিঙে ফলানো, পিসির ডাঁটি ভাঙা চশমা সারিয়ে দেওয়া থেকে শুরু করে সূঁচে সুতো পরানো, আতপ চালের কাঁকর বেছে দেওয়া। পিসির এখন মানিককে ছাড়া একদন্ড চলেনা। বিরূপাক্ষ যখন মানিক একটা গাঁটকাটা এবং আইনের চোখে ও কয়েদি, তাই জেলের বাইরে আইন মোতাবেক থাকতে পারেনা এইসব বলে পিসিকে নিরস্ত করতে চায়, পিসির ঝাঁঝালো উত্তর, “আমাকে আইন শেখাস না বিটলে। মনে রাখিস, আমি একজন ম্যাজিস্ট্রেটের ধর্মপত্নী ছিলুম। সেই মানুষও বাড়ির বিষয়ে আমার মুখের ওপর কোনও কথা বলতে সাহস করতো না”৷ বিরূপাক্ষকে একথা মানতেই হবে, ছোটবেলায় কানাঘুষোয় এসব কথা কানে এসেছে। তাই বেশি কথা বললে মানকের সামনে আরও ইজ্জত খুইয়ে পুলিশের চাকরি ছেড়ে নেংটি পরে কমন্ডলু হাতে হিমালয়ের পথে পা বাড়াতে হবে।

মানিকের চালাকি বুঝতে পারলেও পিসির জন্য কিছুই করতে পারছিলেন না বিরূপাক্ষ। কিছুদিন পর পিসি নতুন বায়না জুড়লো, রাত্রে মানিক কোয়ার্টারে থাকবে। কারণ টা কী? না রাত বারোটা পর্যন্ত ছেলেটা ঘুমে ঢুলতে ঢুলতে পিসিকে তেল মালিশ করে দেয় তারপর থানায় গিয়ে ওই মেঝেয় শুয়ে তার ঘুম আসে না। এর ফলে কদিনেই অজীর্ণ, অম্বল, খাওয়ায় অরুচি, বদহজম এইসব রোগ দেখা দিয়েছে। অগত্যা মানকে কোয়ার্টারে থাকতে লাগল। এদিকে ঘরে যত মানকের আধিপত্য বাড়তে লাগল বিরূপাক্ষ বুঝতে পারলেন থানায় অধঃস্তনদের কাছে ততই তাঁর গুরুত্ব কমতে শুরু করেছে। যদিও বাজেগোবিন্দপুর শান্তশিষ্ট জায়গা, খুব একটা ঝুটঝামেলা নেই, টুকটাক চুরি-চামারি থাকলেও, ডাকাতি, রাহাজানি, খুন-খারাপি নেই বললেই চলে, তাই কেউ কারুর ব্যাপারে নাক গলায় না। এলাকার রাজনৈতিক দলেরও খুব একটা থানায় আসার দরকার পড়ে না, তাই সেভাবে বিরূপাক্ষকে কারোর কাছে তেমনভাবে জবাবদিহি করতে হচ্ছে না কিন্তু নিজের কাছে, নিজের অধঃস্তনদের কাছে দিনদিন ছোট হয়ে যাচ্ছেন। 

শুধু এইটুকু হলেও ক্ষমা ঘেন্না করে দিন কেটে যাচ্ছিল, কিন্তু দুদিন যেতে না যেতেই বিরূপাক্ষের পেটে টান পড়ল। তার চোদ্দ বছরের কর্মজীবনে এইরকম কঠিন প্রতিপক্ষের সাথে কখনও পাঞ্জা কষতে হয়নি। এক সকালে পিসি ঘুম থেকে জাগিয়ে তার হাতে একটা কাগজের টুকরো ধরালো, তাতে অজস্র ভুল বানানে লেখা খাবারের ফিরিস্তি। পিসির দিকে জিজ্ঞাসার চোখে তাকালে পিসি উত্তর দেয়, “ছেলেটা বড় ভালো রে, সব দিকে নজর। কাল সন্ধ্যেবেলা এসে বলল, পিসি শুধু কি তোমাকে দেখলেই হবে, স্যারের দিকেও তো লক্ষ্য রাখতে হবে। আমি আর কদিন, স্যার আমাকে কোর্টে চালান দিলেই আমার দিন শেষ। শেষমেষ ওই স্যারই তো আপনাকে দেখবে। স্যারের শরীরটা দেখেছেন, দিন দিন চর্বির পাহাড় হয়ে উঠছে। স্যারকে একটু দৌড়াদৌড়ি করতে বলুন আর খাওয়া কন্ট্রোল করতে হবে। 

এখন তুই ওঠ দিকিনি। যা কুলেখাঁড়া ভেজানো জলটা খেয়ে আশপাশ কয়েক পাক দৌড়ে আয়, তারপর তোর জন্য গাঁদাল পাতার রস আর চারটে ভেজানো বাদাম রাখা থাকবে, এসে খেয়ে নিয়ে থানায় যাস”৷

   বিরূপাক্ষর মুখে কোনও কথা সরলো না। বুঝতে পারলেন এটা মানকে ব্যাটার মোক্ষম চাল। চোখটা একটু রগড়ে নিয়ে হাতের কাগজটায় নজর দিলেন। তাতে দুপুরের জন্য বরাদ্দ একমুঠ ভাত, একবাটি ডাল, সবজি আর এক টুকরো মাছ। বিকেলে কালমেঘ পাতা বাটা। সন্ধ্যেবেলা একটা ক্রিম ক্র্যাকার বিস্কুট আর এককাপ চিনি ছাড়া লিকার চা, রাত্রে দুটো রুটির সাথে একবাটি চিকেন স্ট্যু। বজ্রবাহু নিজের শরীরের দিকে তাকালেন, বুঝলেন এই খাবারে তার পেটের একটা কোণও ভরবে না। একথা সত্যি এই বাজেগোবিন্দপুরে পুলিশের কোনও কাজ নেই, বসে বসে শুয়ে শুয়ে শরীরটা একটু বেশিই আয়েসি হয়ে পড়েছে কিন্তু একটা গাঁটকাটার অঙ্গুলি হেলনে তাকে এই বয়সে এখন দৌড়াদৌড়ি করতে হবে  আর রোগীর পথ্য গিলতে হবে, এটা তো মেনে নেওয়া যায় না। কভি নেহি! মনে মনে হুঙ্কার ছেড়ে দাঁড়িয়ে উঠেই আবার বসে পড়লেন। পিছন থেকে মানকে কলকাঠি নাড়লেও মাঠে নেমে খেলতে হচ্ছে তো পিসির সাথে। পিসির সাথে পেরে ওঠা মুশকিল। কথা না শুনলেই চিৎকারে পাড়া মাথায় তুলবে, নয়তো উচ্চঃইস্বরে মরাকান্না শুরু করবে। অগত্যা তৈরি হয়ে বেরোতে হল। থানার সামনে এসে দেখেন সরজুপ্রসাদও ধরাচূড়া পরে তৈরি। তাকে দেখে মানিক সড়াৎ করে থানায় ঢুকে গেল। বিরূপাক্ষ বুঝলেন মানকে হারামজাদা কায়দা করে সরজুপ্রসাদকে তার উপর নজর রাখার জন্য জুড়ে দিল।



সাতদিনের মধ্যেই বিরূপাক্ষ বজ্রবাহু ডিসিশন নিয়ে ফেললেন এ চাকরি তিনি ছেড়ে দেবেন। নিজের খুশিমতো জীবন কাটাবেন বলে বিয়ে পর্যন্ত করলেন না আর তাকেই কিনা একটা বুড়ি আর তার চোর-চ্যাঁচর সাকরেদ নাকে দড়ি দিয়ে নাকানিচোবানি খাওয়াচ্ছে। আর এসবই হচ্ছে এই চাকরিটার জন্য। এই এক হপ্তায় তাকে সকালসন্ধ্যে পাঁচ পাঁচ দশমাইল করে দৌড়তে হচ্ছে, তারপর অত পরিশ্রমের পর ওই পাখির আহার! শরীরে তিনি আর কোনও জোর পাচ্ছেন না। কোনওরকমে শরীরটাকে টানতে টানতে থানায় নিয়ে গিয়ে ফেলেন, গিয়েই ধপ করে চেয়ারে বসে পড়েন, তারপর বসেই থাকেন। সারা শরীরে অজস্র ব্যাথা। মানকে একদিন ন্যাকামি করে বলতে এসেছিল, “ছ্যার, শরীরটা একটুকখানি দাবিয়ে দেব! দেকবেন ব্যাতা-বেদনা বেবাক গায়েব হয়ে যাবে”। এক ধমক দিয়ে বিদেয় করে দিয়েছিলেন। কিন্তু কাল রাত্রে আর পারেননি, মানকে প্রতিদিন রাতে শোওয়ার আগে একবার বড়বাবুর ঘর ঘুরে আসে। কাল বিরূপাক্ষ বিছায়ায় শুয়ে উঃ আঃ করছিলেন দেখে মানকে একটু জোর করেই ম্যাসাজ করা শুরু করেছিল। কি এক তেল চাপড়ে ওর সরু সরু আঙুলগুলো যেইমাত্র শরীরে খেলে বেড়াতে লাগল বিরূপাক্ষ বুঝতে পারলেন, এর আঙুলে জাদু আছে। তারপর আধাঘন্টা ধরে মনে হয়েছে শরীরের তন্ত্রিতে তন্ত্রিতে কোনও এক ওস্তাদ জলতরঙ্গ বাজিয়ে চলেছে। তারপর আর কিছু মনে নেই। ঘুম ভেঙেছে যখন বাইরে সূর্যের তেজ বেড়ে গেছে। আজ কেন কে জানে পিসিও তাড়া মেরে ঘুম থেকে ওঠায়নি। বিরূপাক্ষর শরীরটা বেশ ঝরঝরে লাগল। তবে আবার পাঁচমাইল দৌড়নোর কথা ভেবেই মনটা তেঁতো হয়ে গেল। রোদ উঠে গেছে, এর মধ্যে দৌড়নো মানে ডাবল কষ্ট। মনে মনে আজকের প্র্যাকটিসে ডুব দেওয়ার প্যাঁচ কষা শুরু করা মাত্রই ভগ্নদূতের মত সরজুপ্রসাদ এসে উপস্থিত। ঘরের ভিতর উঁকি মেরে স্যারকে বসা দেখে বলে উঠল, “স্যার ওর কোতো নিদ যাবেন! চলিয়ে চলিয়ে… রোদ ভি বহোত বাড় গিয়া। আভি তো জ্যাদা তকলিফ হো জায়েগা”। অগত্যা ধরাচূড়া পরে পাড়ার লোকেদের খোরাক হতে হতে শরীরের কসরত শুরু করতো হল। 

সারাদিন অফিসে চেয়ারে বসে থাকা ছাড়া আর কোনও কাজ নেই। কথায় বলে ‘অলস মস্তিষ্ক শয়তানের বাসা’। সেই মস্তিস্ক থেকেই দুটো মোক্ষম উপায় বেরিয়ে এলো। একটা তো আগেই বলা হয়েছে, চাকরি ছাড়া। তবে এটা বেশ একটু শক্ত কাজ। এইবয়সে চাকরি গেলে আর নতুন করে চাকরি পাওয়ার আশা নেই। আর এখন হিমালয়ের কোনও কোণেই কৌপীনসর্বস্ব সাধুর ঠাঁই হয়না, সেসব যুগ বহুকাল আগেই শেষ হয়ে গেছে। তাই দুনম্বর উপায়টাই মোক্ষম, পিসিকে যেকোনো ভাবেই হোক তাড়াতে হবে। কিন্তু মুশকিলটা হল, কিভাবে? পিসির নিজের বলতে কেউ নেই, তাই খুঁজেপেতে দূর সম্পর্কের আত্মীয় পরিজনের বাড়ি তল্পিতল্পা বগলে পৌঁছে যান। কিন্তু সব জায়গাতেই স্বভাবগত কর্তাত্বি করতে গিয়ে তাড়া খেয়ে চলে আসতে হয়। এখানে তাঁর উপর বলার কেউ কেউ, তাই আসার পর একশো সাতাত্তর বার বলা হয়ে গেছে, “বাবা বিটলে, আমার আর কদিন! আমাকে আর ঠাঁইনাড়া করিস না। আমি এখানেই তোর কোলে মাথা রেখে দুচোখ বুজতে চাই”৷ বিরূপাক্ষরও মায়া হয়। সেই ছোটবেলায় কবে মায়ের স্নেহ-ভালোবাসা পেয়েছে মনেও পড়ে না। এখন বাড়িতে কেউ আছে, তার ভালোমন্দ নিয়ে ভাবছে, তাকে শাসন করছে এটা তাকে একটা পরিবারের স্বাদ দিচ্ছে। যেটা থেকে বহুদিন বঞ্চিত ছিল। আর ওদিকে মানকেও সামনে না এলেও আড়াল-আবডালে থেকে বড়বাবুর সুবিধে-অসুবিধার দিকে নজর রাখে, সেটাও বিরূপাক্ষর চোখ এড়ায় না। তবে এসবের উপরে তার যে দৈনিক হয়রানি তার থেকে মুক্তি পেতে পিসিকে সরানো খুব দরকার। সেটার চিন্তাতেই এখন সারাটা দিন কাটে। কিন্তু মাথায় কিছুই আসে না। হেড অফিসে খবর নিয়ে জেনেছে আগামী পাঁচবছর ট্রান্সফারের কোনও খবর নেই। বিরূপাক্ষর ডাক ছেড়ে কাঁদতে ইচ্ছে করে। কিন্তু নিজের পদমর্যাদার কথা ভেবে চেয়ারে বসে কাঁদতেও পারেন না। 



অবশেষে উপায়টা বাতলে দিল ওই গাঁটকাটা মানকেই। ভেবে ভেবে কটা দিন খুব মনমরা কাটছিল। এখন রাতের বেলা মানকের ম্যাসাজ না পেলে বড়বাবুর ঘুম আসেনা। ম্যাসাজ নেওয়ার সময় স্যারের মেজাজটা নরম থাকে সেটা মানিক জানে। সেদিন ম্যাসাজ দিতে দিতে মানিক বলে উঠল, “ছ্যার, এবার একটা বিয়ে করে ফেলুন। কদিন আর পিসির টিকটিক শুনে দিন কাটাবেন। বৌদিদি এলে তিনি আপনার দেখভাল করবে। তাছাড়া পিসীমার বয়স হয়েছে। আজ আছে কাল নেই। আর আমিও তো সময় হলেই কোর্টে চালান হয়ে যাবো…..৷” মানকেটা বকেই চলল। বড়বাবু কোনও কথা বললেন না। বাবু ঘুমিয়ে পড়েছে ভেবে মানিক একসময় চলে গেল। অনেক রাত পর্যন্ত বিরূপাক্ষ জেগে রইলেন। 



মানিকের সন্ধানেই পাত্রী ছিল। পিসি নিজে গিয়ে পাত্রী দেখে দিনক্ষণ সব ঠিক করে এলো। ধুমধাম করে বিয়ে হয়ে গেল। এলাকার লোকেরা থানায় এসে কব্জি ডুবিয়ে খেয়ে গেল। পিসি তো বেজায় খুশি। এখন নতুন বৌমা পেয়ে ছেলের দিকে নজর দেওয়ার সময় নেই। ওদিকে মানিকের কেস কোর্টে উঠলে তাকে সদর জেলে চালান করা হয়েছে। বিরূপাক্ষের এখন সকাল নটার আগে ঘুম ভাঙে না। আর বৌমার জন্য মুখরোচক খাবার বানাতে গিয়ে পিসি চিরেতার জল, থানকুনি পাতার রস কিংবা ট্যালটেলে চিকেন স্ট্যু বানানোর সময়ই করে উঠতে পারেন না। বাজেগোবিন্দপুর থানা এখন আবার আগের মতো গমগম করতে শুরু করেছে।

     ..

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন