অপরাজিতা তুমি

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

একটি বৃষ্টিস্নাত দিন ।

১৪ ই শ্রাবণ ,১৪২৮

পশ্চিমপাড়া, বগালেক, কোলকাতা ।

জানলা দিয়ে এক ফালি কাগজ ছুঁড়ে মারলো কেউ। বৃষ্টিস্নাত দিন, চারপাশে ভেজা স্যাতস্যাতে কাদামাটি। বাতাসে স্নিগ্ধতার গন্ধের সাথে ড্রেনের উটকো পঁচা গন্ধ মিলেমিশে একাকার হয়ে গিয়েছে। আকাশের দিকে তাকিয়ে ঘোলাটে মেঘের দল বেধে পাক খাওয়া, কাকেদের কা কা কা আর হঠাৎ করে একটু আধটু গুরুম গুরুম আওয়াজ, রিক্সার টুংটাং আওয়াজ আর মাছের বাজারে ইলিশের সয়লাভ এ পর্যন্ত ছিলো এ বেলার তাজা খবর! ততক্ষণে নিম্নচাপ ঘনিয়েছে, বৃষ্টি হচ্ছে গুড়ি গুড়ি কখনো আবার মুষলধারে! দুপুর গড়িয়ে ও বেলায় বৃষ্টি কিছু থামলেও। মহাসড়কে অনাকাঙ্ক্ষিত সড়ক দূর্ঘটনা, কোথাও কোথাও বজ্রপাতে মৃত্যু আর ফিলিস্তিনিদের ওপর ইজরাইলের হামলা একটুও স্বস্তি এনে দিচ্ছিলো না কারো মনে। আপাতত এসব গুরুগম্ভীর কথা মন থেকে মুছে ফেলা যাক। এসব থেকে বেড়িয়ে আসার কয়েকটি উপায়ের মধ্যে সর্বপ্রথম উপায় হচ্ছে পেছনের মাঠে গিয়ে দলবেধে কাঁদায় ফুটবল খেলতে নামা। তবে আপাতত এ চিন্তা মাথা থেকে উড়িয়ে দেওয়াই ভালো। সন্ধ্যেবেলা ভেজা কাপড়ে ঘরে গেলে মায়ের হাত পাখা দিয়ে ধোলাই খাওয়ার পরে, নেহাত বাবার হাতে বেতের পিটুনি খাওয়ারও গুরুতর সম্ভাবনা আছে। এমন কথা ভাবতে ভাবতে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে ছেলেটি। অবচেতন মনের নিরাশ করা প্রশ্নের ঝাক মাথায় ঘুরে বেড়ায়, তাহলে এ বেলা কি আলসে বসে বসে পাড় করতে হবে? বিকেল গড়িয়ে সন্ধ্যে এলেই বইয়ের চাপ মাথায় জেঁকে বসবে। তারচে ভালো, রঞ্জুদা’দের বাড়ির ছাদ থেকে গোপনে পেয়ারা পেড়ে আনা । কিন্তু ওখানটায় যেতেই গা ছম ছম করে, ছাদের কোণে দাঁড়িয়ে যে বড় আমগাছ দেখা যায় সে আম গাছে এই তো দু চার বছর আগেই দড়িতে ঝুলে রঞ্জুদা’র বাড়ির কাজের মেয়েটি মরে গেলো। এই স্যাতস্যাতে বৃষ্টির বিকেলে সে চিন্তাও মাথা থেকে উড়িয়ে দেয়া যায়। সূর্য সবে ঢলে পড়ছে পশ্চিম আকাশে৷ সেই সূর্যের আলোর অসহ্য সুন্দর আভায় ছেলেটির মুখ লাল হয়ে গিয়েছে৷ পশ্চিমদিকে তাকানো যায় না। তবুও রোদের আলো যেন হাত নেড়ে নেড়ে সরিয়ে ছেলেটি দেখলো কাউকে। ছেলেটির বয়স তখন ১৬ বছর। সবে মাত্র নাকের নিচে গোফের  রেখা পড়েছে। গলার স্বর মোটা হওয়া শুরু করেছে। মনের মধ্যে অদ্ভুত অচেনা অনুভূতির সঞ্চার হয়েছে৷

২.
ছেলেটির নাম রবিন। এলাকার সব্বাই তাকে চেনে। গার্বেজ কালেক্টর থেকে, মোড়ের সবচে ভীড়ের চায়ের দোকানের চাওয়ালা। সবার সাথে সখ্যতা আছে তার বেশ। ফাক পেলেই কারো সাথে গল্প ফেঁদে বসে, খিল খিল করে হাসে। দু ফিতার চটি পায়ে ঘুড়ে বেড়ায় এদিক সেদিক। ততদিন পর্যন্ত তার দিনগুলো ছিলো এভাবে আটঘাট বাধা। হঠাৎ করে পাড়ায় এলো নতুন এক বাসিন্দা। ছেলেটি কৌতুহল বশত মুদি দোকানী নিমাইকে জিজ্ঞেস করলো,”কারা এসেছে গো?” নিমাইদা হাতের কাজ ফেলে, ‘এসছে নতুন এক ভাড়াটিয়া। দ্যাখ গিয়ে ‘। ছেলেটি কৌতুহল বশত রনজিৎ ডাক্তারের বিল্ডিংয়ের দোতালায় উঠতে গিয়ে হুড়মুড়িয়ে আছাড় খেয়ে! হাটুর ছাল খুইয়ে ব্যথায় কাঁকিয়ে উঠতে গেলেও পারলো না, ছেলেরা বড় হলে ব্যথা সহ্য করে নিতে পারে। দোতালার সিড়ি বেয়ে ওঠার সাথেই চোখ পড়লো, একটি মেয়ে। এত সুন্দর? অপূর্ব। মেয়েটির চোখে বেশিক্ষণ চোখ রাখতে পারলোনা ছেলেটি। অল্প বয়স! সমবয়সী মেয়েদের চোখের দিকে বেশিক্ষণ তাকিয়ে থাকলে হৃদয় সমুদ্র তালমাতাল হয়ে যায়। দৌড়ে নেমে গেলো দোতালা থেকে। এক দৌড়ে নদীর ধারের রাস্তায় দৌড়াতে লাগলো। ততক্ষণে দৌড়ে অনেকটাপথ চলে এসেছে! ছেলেটির হাটুতে ক্ষত হয়ে, ব্যথা অনুভূত হয়েছিলো। সেই অনুভূতি মিইয়ে গলা অজানা অচেনা এক অনুভূতির সঞ্চারে।

৩.
শরতের শুকনো মাটির গন্ধের দিন! কাশফুলের শুভ্রতা আর ধুপের ধোয়ার স্নিগ্ধতায় চনমনে চারপাশ। ছেলেটি সেই অচেনা মেয়েটির প্রেমে পড়েছে এ কথা বলার বাহুল্য রাখে না। ছেলেটি কি মেয়েটির মনে জায়গা করে নিতে পারলো? সামনে দুর্গাপূজো। চারদিকে উৎসব প্রিয়তা! এক সন্ধ্যে রাতের ঘটনা পাড়ার ছেলেবুড়োরা সবাই মিলে বাজি পোড়াচ্ছিলো, পটকার শব্দে চারদিকে কাঁপাকাঁপি। ছেলেটি তখন একরাশ কল্পনায় ভাসছিলো, ঘাড় ঘুরিয়ে কিছুক্ষণ পর পর তাকাচ্ছিলো ব্যলকনির আবছা আলোতে মেয়েটির মুখ দ্যাখা যাচ্ছিলো কিছুক্ষণ পর পর ৷ পাড়ার কচিকাচারা ছেলেটিকে ডাকছে, এসোনা রবিনদা! এসো না বাজি পোড়াও। তুমি না থাকলে মজা হচ্ছে না যে! রবিনের কি একটা হয়েছে আজকাল বুঝতে পারছে সবাই। তবে সেই কি একটা বুঝতে বুঝতে সময় লেগে যায়! রবিন পা বাড়িয়ে এগোয় সেদিকে! হঠাৎ করেই একটা বাজি এসে ফোটে ছেলেটির চোখের কাছে। চারদিকটা নিস্তব্ধ হয়ে যায়! ছেলেটি চোখে হাত চেপে ধরে বসে পড়ে মাটিতে! চারদিক অন্ধকার হয়ে যায়৷

পরের দিন সকালে ছেলেটি বাপাশের চোখটি খুলতে পারে। ডান চোখে অসহ্য জ্বালাতন আর ঝাপসা হয়ে গিয়েছে। তবে ডাক্তার বলেছে ছেলেটি আশঙ্কা মুক্ত।পুরোপুরি সুস্থ আরো কিছুদিন সময় লাগবে। ঘটনা শুনে পাড়ার সবাই ছুটে এসেছিলো। আসেনি শুধু এক পরিবার। এতক্ষণে জেনেছে ছেলেটি।
চমকে দিয়ে বেলা দশটার কিছু আগে এলো সেই পরিবারটি। সঙ্গে এলো সেই মেয়েটি। সিজনাল ফলফলাদি, হরলিক্স আরও কত কি। ছেলেটির পরিবারের সবাই মুগ্ধ হলো। শুভক্ষণ দেরী করে এলো। মেয়েটির মা ছেলেটিকে বলে গেলো, ‘রবিন, সুস্থ হলে আমাদের বাসায় এসো একদিন। ‘ মাথা নাড়িয়ে সায় দিলো ছেলেটি। ঘোলাটে চোখে মেয়েটি কানের পাশে চুল সরানোর মুহুর্তে চোখ এড়ালো না তার। সাথে ধুকপুকু হৃদয়ের রোমাঞ্চ তো আছেই।

৪.
কালিপুজোর ঘটনা, ততদিনে রবিন সুস্থ হয়ে গিয়েছে। এক ফাকে মেয়েটির বাসায়ও তার যাওয়া হয়েছে৷ পড়ন্ত বিকেলের এক উপখ্যান। ঐপাশের ছাদ থেকে রনজিত ডাক্তারের বাড়ির ছাদ এদ্দিন রবিনের ভালো লাগেনি। এই ছাদে উঠে সে দেখতে পেলো মেয়েটিকে। অচেনা অনুভূতির আর গোধূলীর আলোর উষ্ণতা ছড়িয়ে গেলো ছেলেটির শরীরে। সেদিন সে মেয়েটির নাম জানতে পারলো, মেয়েটির নাম তিশি। রবিনের কৈশর বুক ছেঁয়ে গেলো বিষকাঁটালির অসুখ সুখে। রবিন মেয়েটিকে ভীষণ ভালোবাসে। এই ভালোবাসাকে অনেকে উঠতি বয়সী অহেতুল ভালোবাসা বলে আখ্যা দেয় !

সেবার ডিসেম্বরে রবিনের জীবনে নেমে এলো নিকশ কালো অন্ধকার। রবিনের বাবা মারা গেলো হঠাৎ করেই। বাবা মারা যাওয়ার পর জানতে পারলো রবিনের বাবাও টাকা পয়সা তেমন কিছু রেখে যায়নি। রবিনের বাবার ডিসপেন্সরিতে যে ওষুধ ছিলো সেগুলো বিক্রি করে কিছু টাকা পেলো। রবিন যেন তার জীবনের তিমির ছোবলে পড়ে গেলো পার্কস্ট্রিটের ফুটপাতের ছেলে-মেয়েদের মতো ।

রবিনের মামা বাড়ি বাংলাদেশে। সেখানেই চলে যাওয়ার সিদ্ধান্ত নেয় তারা। বলে রাখা ভালো, রবিনের মা, রবীনের বাবার সাথে প্রেম করে পালিয়ে এসেছিলো ওপার থেকে এপারে। যাওয়ার আগে রনজিৎ ডাক্তারের ছাদে তিশির সাথে শেষ দেখা করেছিলো রবীন। ডিসেম্বরের কনকনে ঠান্ডায় তিশিও জানিয়েছিলো সে রবিনকে ভালোবাসে। ভালোবাসি এ কথা বলতে গিয়ে রবিনও মুষড়ে গিয়েছিলো কিছুটা।ছাদ থেকে বিদায় জানাবার আগে তিশি চোখ বন্ধ করেছিলো, রবিন কাছে এগিয়ে গেলো। তিশির কানের পাশে আলতো করে গুজে দিলো অপরাজিতা। তিশি রবিনকে রডোডেনড্রনের একটি চারা দিয়েছিলো। আর দিয়েছিলো রবিনকে নিয়ে তিশির লেখা কিছু চিঠি।

ভরদুপুর! আকাশে রোদ মেঘের খেলা বেনাপোল বর্ডার থেকে বাংলাদেশে প্রবেশ করেছে রবিনরা। রবিনের ভীষণ মন খারাপ, নতুন একটি দেশে থাকতে যাচ্ছে সে। রবিন জানলা দিয়ে চোখ বাড়িয়ে দেখে নেয় ভারতের ওপাশটা। তারপর তাকায় আকাশের দিকে। যেন এই নীল আকাশ মিশেছে দেশে দেশে। এই আকাশের নিচেই অপরাজিতার গায়ের রঙয়ের মতো নীল নীল দুঃখ নিয়ে রবিন তিশিকে ভালোবাসে। আকাশ জানে সেসব কথা।

 

দ্রষ্টব্য – এই গল্পটি কলকাতার যে স্থানের নাম উল্লেখ করা হয়েছে সেগুলো কাল্পনিক। গল্পের সাথে কোন স্থান, চরিত্র মিলে গেলে সেটি নিত্যান্তই কাকতালীয় এবং লেখক এর দায়মুক্ত।

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *