ক্ষোভ ক্ষুধা প্রতিশোধ- সৌর শাইন

ছোট গল্প – সৌর শাইন

 

 ‘আজকে তোকে ছাড়বো না.. শালার পুৎ.. আইজকা তোরে হাতের কাছে পাইছি.. শুয়োরের বাচ্চা, কুত্তার বাচ্চা.. জানোয়ারের বাচ্চা.. আইজা তোর জান বরবাদ করে ফেলবো।’

বঞ্চিত তীব্র ক্ষোভে চেপে ধরে তাকে। কাকে চেপে ধরে?

সমাজের ছদ্মবেশী ভদ্রলোক, লোকচক্ষুর অন্তরালে দুর্নীতি যার আরাধ্য। তিনি এক সরকারি লোভী কর্মকর্তা। চাটুকার! ক্ষমতাসীনদের পা চাটা দাস। ঘুষখোর, ভোটচোর, লুটেদের দলভুক্ত একজন!

বঞ্চিতের হাতে পড়ে ভদ্রলোকের অবস্থা আজ নাজেহাল! কষ্টে চোখ বন্ধ করে কাতরাচ্ছে দুর্নীতি মহোদয়।

তার কাতরানো দেখে সুখ অনুভব করে বঞ্চিত। হাসতে হাসতে বলে,‘আজকে তোর রক্ষে নেই।’

আঁতকে ওঠে দুর্নীতি মহোদয়। আর এদিকে হাতে ভ্যাসলিন মেখে আষ্টেপৃষ্ঠে তীব্র ক্ষোভে তাকে প্যাঁচিয়ে ধরে বঞ্চিত।

হাতের পাঁচ আঙুলের ঘর্ষণে ফস্ ফস্ শব্দে ঢেকে যায় দুর্নীতি মহোদয়ের চিৎকার! হাতের তালুর ভেতর দম বন্ধ হয়ে আসে ভদ্রলোকের। বার বার বলে ওঠে,‘আমাকে ছেড়ে দাও। তুমি যা বলবে আমি তাই করব।’

‘এখন আর তোকে কিচ্ছু করতে হবে না।’

এটা বলেই ভদ্রলোককে তীব্র জোরে গলা চেপে ধরে বঞ্চিত। চলতে থাকে চাপের চলমান ঘর্ষণ! একটানা ব্যথা সইতে না পেরে ভদ্রলোকের মুখ দিয়ে পাতলা জল বেরোয়!

বঞ্চিত আঃ আঃ শব্দে হাঁপাতে থাকে। মারতে গিয়েও শরীরে ক্লান্তি জমা হয়। কিছুটা সময়ের জন্য বিরতি দেয় সে।

বঞ্চিত মুণ্ডুর উপর হাত বুলাতে থাকে। বলে,‘টাক মাথায় কি অনেক লেগেছে বাবা সোনা?’

ভদ্রলোক জবাব দেয় না, হাঁপাচ্ছে, তীব্র শ্বাসকষ্টে!

কিছুটা ব্যথা লাগবেই তো। মজা পেতে হলে কষ্টও পেতে হবে। এটাই ক্ষোভ রাষ্ট্রীয় নীতি।

পাতলা নোনা জলে ভেজা ঠোঁট জোড়া কাঁপিয়ে উপরের দিকে তাকিয়ে থাকে ভদ্র মহোদয়। আজ সে ভারি অসহায়, অথচ এসি রুমে, অফিস কক্ষে তার কি দাপটটাই না ছিল। একটা কলমের খোঁচায় পাল্টে যেত কত কিছু। কত লোক চাকুরির খাতা থেকে বাদ পড়তো, আর কত লোক টেবিলের তলায় হাত মেলাতে পারলে, হয়ে যেত সোনার হরিণের মালিক!

 

বিজ্ঞাপন বিরতির পর আবারো হাতে ভ্যাসলিন মেখে নেয় বঞ্চিত। খিস্তির ঝড় ওঠে মুখে।

‘শুয়োরের বাচ্চা, প্রিলি, রিটেন পেরিয়ে আমি গিয়েছিলাম তোর ভাইবা টেবিলে, একবার নয়, দুইবার নয়, চারবার গিয়েছিলাম.. আর তুই প্রতিবারই টাকা দাবি করেছিস। ঘুষ না দেবার অপরাধে, ভাইবা থেকে তাড়িয়েছিস! চুদমারানির পুৎ, আজ তোকে আমি ছাড়ছি না। অনেক খেলেছিস, অনেক খেলা দেখিয়েছিস.. আজ তোকে খেলা দেখাবো।’

প্রচণ্ড দস্তাদস্তিতে হাঁপাতে থাকে বঞ্চিত। চিৎকার বেরোয় গলা ফেটে। তবু হাত ছাড়া করে না ক্ষুধার্ত হয়ে পাওয়া বান্দাকে।

 

ফ্যান্টাসি এক বিস্ময়কর জাদু! বেকারত্বের রাজপুত্র বঞ্চিতকে না দেখলে তা বোঝার উপায় নেই। তার কাছে ঘুষখোর অফিসারের চেয়ে শক্ত একগুয়ে কিছু জগতে দ্বিতীয়টি নেই, আর সে শক্ত একগুয়ে বস্তুকে টাকার মতো মোলায়েম তরল দিয়ে ঘষতে পারলে বেরিয়ে আসে কাঙ্ক্ষিত চকচকে থকথকে সোনার হরিণ। মখমল তরলের ঘর্ষণে যে বস্তু রূপ বদলায়, তার প্রতিই বঞ্চিতের যত ক্ষোভ, যত শত্রুকামিতা! শক্তকে নরোম নয়, যমের দুয়ারে পাঠাতে চায় বঞ্চিত।

 

চলছে ঘর্ষণ, ঘর্ষণে জাগছে বিদ্যুৎ স্ফুলিঙ্গ!

 

ভদ্রলোকের মুখ কখনো ফ্যাকাশে হয়ে আসছে, কখনো রক্তে লাল হয়ে ওঠছে। এই বুঝি উগরে দিবে জান-মাল, কিন্তু না বঞ্চিত তা হতে দিচ্ছে না। সর্বোচ্চ শাস্তি দিতে চায় তাকে, যত বেশি যন্ত্রণা দিবে সে তত বেশি আনন্দ পাবে। রূপকথার মতো পিশাচীয় আনন্দ! এই আনন্দ যেন সঙ্গমের মতো সুখকর অনুভব!

ভদ্র মহোদয় হাঁফ ছেড়ে বাঁচতে চায়! বঞ্চিত আরো জোরে চেপে ধরে, ভ্যাসলিনের মিশ্রণে ঘষতে থাকে আরো জোরে, সুতীব্র জোরে!

সহস্রাধিক খিস্তির জোয়ার জাগে ছোট্ট এই ঘরটাতে।

বঞ্চিত চিৎকার করে বলে,‘যতক্ষণ পর্যন্ত না তোর জান বেরোবে, যতক্ষণ পর্যন্ত না তোর মাল বেরোবে.. ততক্ষণ তোকে ছাড়বো না। আমার জান-মাল সবকিছুকে জাহান্নামের দুয়ারে পাঠিয়ে দিয়েছিস, তোকে ছাড়ছি না বেঈমানের বাচ্চা.. হারামি হায়েনা..। মনে পড়ে, নিরুপায় হয়ে শেষ পর্যন্ত তোকে আট লাখ টাকা দিয়েছিলাম.. গাঁয়ের ধানী জমি বিক্রি করে, যে জমি ছিল আমার বাবার কাছে সন্তানতুল্য! সব মায়া ত্যাগ করে আমার হাতে বাবা টাকা তুলে দিয়েছিল শুধুমাত্র ন্যায্য চাকুরিটা পাবার জন্য, আর সে চাকুরিটা তুই বিক্রি করেছিস বারো লাখ টাকায়.. বাঞ্চোত মন্ত্রীর নির্দেশে। জমা দেয়া টাকা ফেরত পাবার জন্য তোর মতো হারামির পেছনে বছরের পর বছর আমি ঘুরেছি, তোর সেক্রেটারির পায়ে পর্যন্ত ধরেছি, আমার মা মারা গেল বিনা চিকিৎসায়, বাবা দু’বার স্ট্রোক করে এখন পঙ্গুর মতো বিছানায় কাতরায়। চিকিৎসা নামের কোনো বস্তু তাঁকে দিতে পারিনি। এতো কিছুর পর তোকে বাঁচতে দিতে পারি না.. শুয়োরের বাচ্চা।..খুন করে ফেলব..!

 

বঞ্চিতের চিৎকারে কেঁপে ওঠে চারপাশ। দরোজার ওপাশ থেকে নিপীড়িত বলে ওঠে,‘কী রে, এতো হৈ হুল্লোড় করে.. কাকে মারছিস?’

বঞ্চিত কণ্ঠ কাঁপিয়ে বলে,‘আমার সারা জনমের সেরা শত্রুকে হাতের কাছে পেয়েছি। দুর্নীতিবাজকে ধরেছি..’

ওপাশ থেকে নিপীড়িত উৎসাহের সুর ধরে বলে,‘মার আরো জোরে, মার.. ঐ শালারা আমার বাবার রিটায়ার্ডের টাকার উপর চোখ দিয়ে রেখেছিল কয়েক বছর, আড়াই লাখ খুঁইয়ে টাকাটা পেতে হয়েছে.. যেখানে যাই সেখানেই এই কুকুরেরা উৎ পেতে থাকে..’

বঞ্চিত এবার মুখ বিকৃত করে তীব্র ক্ষোভের লেলিহান শিখা জ্বালিয়ে বলে,‘উৎ পেতে থাকার আর সুযোগ দেবো না.. শুয়োরের বাচ্চাকে আজ ছাড়বো না.. জান বের না হওয়া পর্যন্ত চালিয়ে যাব।’

আনন্দ উন্মাদনায় নিপীড়িত কোরাসের মতো বলে,‘ যা পাগলা চালিয়ে যা.. খিঁচে যা.. খেঁচে যা.. যতক্ষণ না জানের আঠা বেরুচ্চে.. ততক্ষণ মার। ..আরো মার, ভালো করে মার..!’

বঞ্চিত এবার হাঁপানো রোধ করে জিহ্বা কামড়ে বলে,‘ভালো করে মারতে পারছি না, ভ্যাসলিনটা শেষ হয়ে গেছে.. লোশনটা এদিকে দে…’

নিপীড়িত এবার নিরাশ স্বরে বলল,‘লোশনটা দেয়া যাচ্ছে না.. পাগলা, একটু পর আমি ঢুকবো, ওটা আমার কাজে লাগবে..’

দুঃখভরা ভাব বজায় রেখে বঞ্চিত শেষে বলল,‘নারকোল তেলটা অন্তত দে..’

এবার নিপীড়িত ওকে আর নিরাশ করে না। তেলটা এগিয়ে দিয়ে বলে,‘নে..হাত বাড়িয়ে নে..’

বঞ্চিত কোমর বরাবর গামছা পেঁচিয়ে ওঠে এসে দরোজার কাছে যায়। ওর হাতে নারকোল তেলের বোতল দিয়ে নিপীড়িত দ্বিগুণ উৎসাহের ঘূর্ণিঝড়ে বলে,‘শালাকে এমনভাবে মারবি.. রিমাণ্ডটা যেন মরার পরেও মনে থাকে..

 

নারকোল তেলটা হাত বাড়িয়ে নিয়ে বঞ্চিত আবার কমোড আসনে বসে, শক্ত একগুয়ে শত্রুকে হাতের তালুতে বন্দি করে.. চেপে ধরে।

তোকে আর যন্ত্রণা দেবার চান্স দেবো না।

‘ক্ষমা করো আমায়.. তোমার টাকা ফিরিয়ে দেবো, সব ফিরিয়ে দেবো। বসকে বলে চাকুরির উপায়ও করে দেবো।’

‘সব ফিরিয়ে দিবি? তাহলে আমার মাকে ফিরিয়ে দে, দিতে পারবি? …পারবি না। আমার বাবাকে সুস্থ করে দে, বাবা কয়েকবার ব্রেইন স্ট্রোকের শিকার হয়েছে, শুধু তোর কারণে, তোদের কারণে.. সন্তানের কর্মসংস্থান না পাবার শোকে, সন্তানের মতো জমি হারিয়ে আর সে জমির টাকা তোদের হাতে অনিশ্চয়তার মাঝে ঠেলে দিয়ে। আমার প্রেমিকাকে ফিরিয়ে দে.. গতমাসে যার বিয়ে হয়ে গেল। কেবল বেকারত্ব অভিশাপের কারণে, জীবনের একমাত্র প্রেমটাও ভেস্তে গেল… তুই কী করে বুঝবি বেকার জীবনের কষ্ট? তুই কী করে বুঝবি ব্যাচেলরের ব্যথা! শুয়োরের বাচ্চা.. তুই তো বউ কোলে নিয়ে ঘুমাস.. তুই আমার যন্ত্রণা বুঝবি কীভাবে? জানিস, এ বেকার ব্যাচেলর জীবনটা কী করে কাটে? …জানিস না তাই তো.. তোর মতো নাইট ক্লাবে, মদ আর নারীর শরীর নিয়ে ফুর্তি করে কাটে না.. যন্ত্রণায় কাতরাতে কাতরাতে.. ক্ষতাক্ত হয়ে মাস্টারবেশন করে কাটে… ঠিক এইভাবে, যেভাবে তোকে খুন করছি..। আজ তোকে ছাড়বো না, তোর বডি থেকে ল্যাওড়াটা আলাদা করে ফেলব.. যত যন্ত্রণা এই অঙ্গকে কেন্দ্র করে..!’

 

বঞ্চিত বিক্ষুব্ধ হয়ে শত্রুকে আঁকড়ে ধরে নারকোল তেলের নির্যাসে। তীব্র চিৎকারে শীৎকারে ফস..ফস.. শব্দের যন্ত্রণা কাটিয়ে পত পত.. ফত.. ফত.. করে বেরোয় মৃত্যুর মতো গরম কষ..। মৃত্যু যন্ত্রণায় বিকৃত হয়ে আসে ভদ্রলোকের চেহারা, মুখ বেয়ে নামে বমি..সাদা ফেনা..!

মৃত্যুও কারোর জন্য সুখ বয়ে আনতে পারে।

 

স্নান শেষে বঞ্চিত বেরোয়। নিপীড়িত লোশন হাতে প্রবেশ করে.. ক্ষুব্ধ ক্ষুধা তীব্র প্রতিশোধ যন্ত্রণা জিপারের তলদেশে ধারণ করে।

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *