যখন ট্রেনের বাঁশি বাজে

 আহমেদ উল্লাহ্

কুমিল্লার রাণীর বাজার রিপন আটা মিলের ফ্লোরে ঘুমিয়ে থাকা আবু বকর হঠাৎ প্রলাপ বকতে বকতে চিক্কুর মেরে ঘুম থেকে জেগে ওঠেÑ লা-ইলাহা ইল্লা আন্তা… জোয়ালেমিন।
ওর মা এই দোয়া শিখিয়েছিল; মা বলেছিল, এ দোয়া পড়লে বিপদ দূরে সইরা যায়।
ভয় ও শূন্যতায় জড়সড় হয়ে আবু বকর হাতরে খুঁজে বেড়ায় পানির বোতল..!
ওর পাশে শায়িত আজগর ঘুম থেকে জেগে ওঠে; ঘুমজড়ানো চোখে তাকিয়ে থাকে প্রলাপরত বকরের দিকে, কী রে বকর, কী হইছে তর? তরে এমন পেরেশানি দ্যহাইতাছে ক্যান?
আগে পানির বোতলটা দে ভেতরটা ওলটপালট হইয়া গেছে দোস্ত! মোবাইলের টর্চ জ্বেলে মশারির বাইরে হাত বাড়িয়ে বোতলটা এনে বকরের হাতে দেয় আজগর, কী রে, তর কি শরীর খারাপ? চল, সদর হাসপাতালে লইয়া যাই?
বোতলের ছিপি খুলে মুখ হা-করে ওপর থেকে পানি ঢালতে থাকেÑ মুখে, চোখে, মাথায়, আর মর্মস্পর্শী কণ্ঠে হেঁকে ওঠেÑ বাজান, কই রে সুহেল; সাজেদা.., কই গো বউ আমার…
বসা থেকে ওঠে মশারি খুলে সুঁইচ চেপে ঘরে আলো জ্বেলে বকরের সামনে গিয়ে দাঁড়ায় আজগর, কী রে বকর, কী হইছে তর? খুইলা কইবি তো!
ডুকরে কেঁদে ওঠে আবু বকর, কী কইতাম রে আজগর; একটু আগে
আমার বউ সাজেদা আর ছোটো পোলা সুহেল জোর গলায় আমারে ডাক দিয়া গেল!
দুশ্চিন্তার ঘাম চিকচিক করে ওঠে আজগরের কপালের বলিরেখায়, কস্ কী তুই? তর কি মাথা খারাপ হইয়া গেছে নাকি, কোনো খোয়াব দেখস নাই তো?
খোয়াব না রে আজগর, খোয়াব না; একটু আগে আমার বউ সাজেদা আর শিশুপোলা সুহেল চিৎকার কইরা ডাকতে ডাকতে কই চইলা গেল…!
কস্ কী তুই..? তর কোনো কথাই তো বুঝতাছি না।



কতদিন পর আইজ আবারো সেই ডাক শুনতে পাইলাম; ট্রেনের বাঁশির আমারে ঘুমাইতে দেয় না আজগর, ওই শব্দ কানে গেলেই উম্মাদ হইয়া যাই, ওই বাঁশির ডাকে যেন শুনতে পাইÑ আমার বউ সাজেদা আর সুহেলের ডাক!
তুই শান্ত হ, এত দুঃখ করিস না রে বকর, সবই মিছে মায়া; আমার গুরুজ্বি অধর মুসাফির কইতÑ বাছারে, এই দুনিয়া শুভঙ্করের ফাঁকি; তুই আর কান্দিস না দোস্ত; পেছনের কথা ভুইলা যা।
এই জন্যই তো আমি খগড়াছড়ির জঙ্গলে গিয়া পইড়া রইছি; ওইখানে রেলগাড়ির সাইরেন বাজে না। কিন্তু কই, ভুলতে পারলাম কই; কেউ এমন জ্বালা ভুইলা থাকতে পারব রে আজগর, কেউ পারব না..!
কী অপূর্ব সুন্দরী আর শান্তশিষ্টই-না ছিল ভবানীপুরের মতিন মোল্লার মেয়ে সাজেদা; পড়াশোনার দৌঁড় স্কুলের গÐি পেরোতে পারেনি; কৈশোর থেকেই গ্রামের ছেলেরা গিয়ে ওর রূপের ঘ্রাণে আমোদিত হতো, প্রেমজড়ানো স্বপ্ন দেখত!
গ্রামের একজন চাষাভুষা হলেও আত্মসম্মানবোধ নিচে নামতে দেয় না মতিন মোল্লা। জমিজিরাত, গৃহস্থ-সংসারে বেশ উন্নতি দেখেও অব্যক্ত কারণে জয়নাল আবেদিনের পোলা আবু বকরের কাছে সাজেদাকে বিয়ে দিতে রাজি ছিল না মতিন মোল্লা।
সাজেদাকে কাছে না-পাওয়ার দুঃখ সইতে না পেরে কলেজ ছেড়ে বিদেশে চলে যায় আবু বকর, কাজ খুঁজে নেয় আরবের এক মরুপ্রান্তরে, খেঁজুরের বাগানে। দেশ ছেড়ে গিয়েও সাজেদার প্রতি ওর মনের আকর্ষণ কিছুতেই কমাতে পারেনি, বরং খুব কাছে টানতে থাকে সাজেদাকে। প্রায়ই ফোনে যোগাযোগ করে থাকে ওর সাথে।
ছোটোবেলা থেকেই নিজেকে সবসময় বড় করে দেখানোর তীব্র প্রবণতা ছিল বকরের। আর ওর প্রতি মেয়েদের আকর্ষণ করার পরীক্ষায় পাস করে ফেলেছিল স্কুলে পড়ার সময়েই; কতই-না ছলিয়েভুলিয়েও সাজেদাকে রাজি করতে না পেরে কী কান্না আর আকুলিবিকুলিই করেছিল আবু বকর!
শেষবার মোবাইলে চিৎকার করে কেঁদে কেঁদে বকর বলেছিল, সাজেদা, তোমারে বউ কইরা ঘরে নিবার না পারলে, জীবনে আর বিয়াই করমু না; দেশেই আসমু না কোনোদিন।




আবু বকরের কান্নার ¯্রােতে ভেসে গিয়েছিল সাজেদা, বলেছিলÑ বাপে বিয়া না-দিলে, আমি কী করতাম; আমি কি আর বাপেরে গিয়া এই কথা কইতে পারি?
যেইভাবেই হউক চাচারে বোঝাইয়া কইও সাজেদা, নইলে কোনো একদিন শোনতে পাইবা, আরবের জনহীন নিথর কোনো মরুভূমিতে হয়ত পইড়া থাকব এই হতভাগা আবু বকরের লাশ; চাচারে বোঝাইয়া কইও তুমি; যেইভাবেই হউক ওনারে রাজি কইরো।
ছবছর পর দেশে ফিরে এসে সাজেদাকে বিয়ে করে পৃথিবী যেন জয় করে ফেলেছিল আবু বকর; গভীর প্রেম ও আনন্দে বল্গাহীন ঘোড়ার বেগে ছুটে চলে ওদের সুখের সংসার।
প্রবাসজীবনে প্রভূত অর্থের মালিক হয়ে গেছিল আবু বকর, আঙুল ফুলে কলাগাছ। বাড়িতে তিনতলা ডুপ্লেক্স দালান তুলে চমক লাগিয়ে দিয়েছিল গ্রামবাসীদের। এরপর কী থেকে কী হয়ে যায়!
অজানা কারণে আরবে পুলিশের হাতে ধরা পরে আবু বকর। মাস ছএক জেল খেটে দেশে ফেরার পর উপার্জনের অঙ্ক মেলাতে গিয়ে ওর চোখ কপালে গিয়ে ঠেঁকেÑ বিরাট এক ঋণের বোঝা জগদ্বল পাথরের মত ওর মাথায় চেপে আছে। দালানসহ বসত বাড়ি বিক্রি করে দিয়েও ঋণ পরিশোধ হয়নি ওর।
এদিকে বউ, দুই ছেলে ও এক মেয়ের অন্ন-বস্ত্র-চিকিৎসার যোগান যেন ওর কাছে হিমালয়ের ভার হয়ে দাঁড়ায়! অভাব ও দারিদ্রতার বানে ওর জীবন থেকে কোথায় ভেসে গেলÑ মা-বাবার কথা, ভাই-বোনদের কথা; প্রিয় ছোটোবোন ফেরদৌসির কথা তো কালেভদ্রেও মনে পড়ে না ওর; যে বোনটি বড়ই হয়েছে বকরের কাঁধে চড়ে; আর ছোটোভাই আতিক? ওর কথাও আজ মনে পড়ে না আবু বকরের; সবাই যেন পর হয়ে গেছে।
ইদের কেনাকাটা করতে গিয়ে আগে শিশু আতিকের পাঞ্জাবি-পায়জামা, টুপি জুতো কেনার পর বাকি কেনাকাটা; তিনবছর বয়সে একবার আতিকের পাকস্থলি ফুডপয়জনে আক্রান্ত হয়েছিল; রাতভর কতই-না কান্না, একমাত্র বকরের কোলে চড়ে কাঁধে মাথা হেলিয়ে চুপ মেরে শোয়ে থাকত আতিক; আজ সবই কেবল ধুসর স্মৃতি; দারিদ্রতা সব ভুলিয়ে দিতে জানে!
বাবার মৃত্যুর পর থেকে পরিবারের সকলেই ধীরে ধীরে ওর কাছ থেকে দূরে চলে যায়, নিজেদের সংসার নিয়ে ব্যস্ত হয়ে ওঠে ওরা। অভাব অনটন ও দারিদ্রের ঘোর অন্ধকারে পড়ে একসময় গোটা পৃথিবীই ওর কাছ থেকে আলাদা হয়ে যায়।
বেঁচে থাকার কোনো পথ না পেয়ে বউ-বাচ্চা নিয়ে ঢাকার মালিবাগ রেলক্রসিংয়ের পাশে ছোটো একটি বাসায় গিয়ে ওঠে আবু বকর; খিলগাঁও মাটির মসজিদের সামনে ফুটপাতে দাঁড়িয়ে সবজি বিক্রির ব্যবসা শুরু করতে এতটুকুও লজ্জাবোধ করেনি আই.এ পাস আবু বকর। জীবন যদি পতিত হয় বিপন্ন ঝড়ের মুখে, লাজ-লজ্জা বলে কী আর থাকে!
সবজি বিক্রির উপার্জন দিয়ে সংসারের খরচ মেটাতে পারছে না দেখে স্বামীকে সাহায্য করতে এগিয়ে আসে সাজেদা; অর্থোপার্জনে ঝাঁপিয়ে পড়ে।
অর্থাভাবে ভালোবাসা পালিয়ে যাবার আগেই এখানেওখানে কাজ খুঁজে বেড়ায় সাজেদা; গ্রামের লাজরাঙা, শান্তশিষ্ট মেয়েটি অবশেষে শ্রমিকের চাকরি খুঁজে পায় পোশাক তৈরির কারখানায়।
সংসারের দৈন্যদশা আর ঋণের প্রবল চাপে দিন দিন কাÐজ্ঞানহীন হয়ে পড়তে থাকে আবু বকর; একসময় গতিময় জীবনের বেগ কমে আসে দেহ ও মনে। কদিন আগে বারডেম হাসপাতালে দশ টাকার টিকেট দিয়ে ডাক্তার দেখিয়েছিল আবু বকর, ডায়েবেটিস ধরা পড়েছে। ডাক্তার সাহেব আবু বকরকে ভাত কম খেতে পরামর্শ দেয়ায় মনে মনে খুব ক্ষেপে ওঠেছিল, বেটা, এমনিই তো ভাত জোটে না, বেশি খামু কইত্যে।
হামেশাই বউ-বাচ্চাদের সাথে বাকবচসায় লিপ্ত হয়ে পড়ে আবু বকর। খিটখিট মেজাজী হয়ে ওঠতে থাকে দিন দিন। এমন পরিস্থিতিতে বড় ছেলে ও মেয়েটি অপ্রাপ্ত বয়সেই কাজের সন্ধানে ছুট দেয়।
শত চেষ্টার পরও আর্থিক দৈন্যদশা থেকে ওঠতে না পেরে বড়ই অসহায় বোধ করতে থাকে আবু বকর; সবসময় তিরিক্ষি মেজাজ নিয়ে ঘরে আসে; ধমক, তর্ক-বির্তক, বেহুদা স্ত্রী সন্তানদের ওপর উদ্ধত আচরণ; দিন দিন সংসারটি নরকে পরিণত হয়ে ওঠে; প্রায়ই সাজেদা স্বামীর প্রতি অভিমানে ওর ছোটোবোন মাজেদার বাসায় চলে যেত, হাতির ঝিলের পশ্চিম পারে থাকে ওরা, বেগুনবাড়িতে।
গামছাটা ভিজিয়ে আবু বকরের মুখ, মাথা ও গলা মোছে দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে আলী আজগর, দেশে এত জায়গা থাকতে তুই কিনা গিয়া পইড়া রইছত কোন খাগড়াছড়িতে, পাহাড়-জঙ্গলের দেশে; এইখানে কি কামের অভাব?
ধীরে ধীরে শান্ত হওয়ার চেষ্টা করে আবু বকর, কত শহর নগর ঘুইরা বেড়াইলাম, কোথাও আমার ঘুম হয় না রে আজগর, কোনো শহরেই আমি ঘুমাইতে পারি না, কোনো শহর নগরই ঘুমাইতে দেয় না আমারে! সাইরেনের শব্দ এড়াইয়া চলতে কত শহরে গিয়া বসবাস করতে চাইছিÑ রাজশাহী, ঝিনাইদহ, খুলনা, বরিশাল। বরিশালেও লঞ্চের ভেঁপুর শব্দও ট্রেনের সাইরেনের মতো আমার কানে আইসা বজত; সেইখানেও থাকতে পারি নাই।
তর কথার কোনো খেঁই খুঁইজা পাই না; কী কস্, না কস।
মাছিমপুরের গোকর্ণ বাবুর তিন মাসের সুদ বাকি পইড়া গেছিল; গোকর্ণ বড্ড হারামজাদা সুদখোর; কেউ টাকা দিতে না-চাইলে, বাড়িঘর দখল করে বসে; টাকা দেয়ার আগেই স্ট্যাম্পে টিপ-স্বাক্ষর নিয়ে রাখে।
এরই মাঝে ইলিয়াসের মেয়ের বিয়ে; সে-ও বকরের কাছে লাখ টাকা পায়। বকরকে ফোন করে মেয়ের বিয়ের দাওয়াত দিয়ে পাওনা টাকা চেয়ে বসে ইলিয়াস। বকরের ঘনিষ্ট বন্ধু ইলিয়াস; একসঙ্গে পড়াশোনা; অন্তত কিছু টাকা হাতে দিলেও মান বাঁচবে।
নিরুপায় হয়ে সাজেদাকে ধরে বসে বকর, যেইভাবেই হউক তোমার বাবারে কও না বিশ হাজর টাকা লাভে আইনা দিতে; তিন মাসের মধ্যে শোধ কইরা দেমু।
বকরের অসহায়ত্ব সাজেদার প্রাণে গিয়ে বিঁধে ওঠে। বাবাকে ফোন করে দুমাসের জন্য বিশ হাজার টাকা ব্যবস্থা করে দিতে অনুরোধ করে সাজেদা।
দরিদ্র মতিনও নিরুপায়; কোত্থেকে এনে দিবে টাকা। ক্ষীণকায় দুর্বল একটিমাত্র ছেলেকে নিয়ে নিরলস পরিশ্রম করে খেতেখামারে; দুই মেয়ের এখনো বিয়ের বাকি। বেচারা কীভাবে সাজেদাকে সাহায্য করবে?



বারবার সাজেদার অসহায় আকুতি আবদারে মতিনের মন মানে না! দেশে এখন টাকা ধার পাওয়া যায় না, অথচ সুদের বাজার রমরমা।
বাবার কাছ থেকে টাকা পেয়েই আবু বকরের হাতে তুলে দেয় সাজেদা।
তিনমাস তো চলে গেল তিনটি ঘুমের আগেই; বছর পেরোনোর পালা। সুদ দিতে দিতে বেচারা মতিন কাহিল; বারবার সাজেদাকে ফোনে তাগাদা দেয়।
আজ দিব, কাল দিচ্ছি বলে বাবাকে প্রবোধ দিয়ে আসছে সেই কবে থেকে; সংসারের দৈন্যদশা দেখে স্বামীকে বলতে চাইলেও বলে না।
স্বপার্জিত মাসিক বেতনভাতা থেকে দশ টাকা সঞ্চয় কিংবা সংসারের বাইরে খরচের কোনো সুযোগ নেই সাজেদার। আর সবজির ব্যবসায় প্রায় প্রতিদিনই লোকসান গুনতে হয় বকরকে; প্রায়ই মাপে কম পড়ে; পঁচা অসতেজ সবজি কয়জনই-বা কিনে?
পরিস্থিতির কারণে বাবার টাকা পরিশোধ করতে বকরকে তাগাদা না দিয়ে পারে না সাজেদা। বকরও কখনো চুপচাপ থাকে, কখনো রেগে ওঠে। বাবার পাওনা টাকাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকবার বাসা ছেড়ে চলেও গেছিল সাজেদা; আজ দিচ্ছি, কাল দেব এই আশ্বাস দিয়ে বুঝিয়েসুঝিয়ে ওকে সংসারে ফিরিয়ে আনে বকর; কিন্তু এভাবে আর কত…

সাজেদার ঋণের টাকা পরিশোধ করতে গিয়ে একশতক বাড়ি বিক্রি করার সিদ্ধান্ত নেয় মতিন। তা শোনে রেগে ফুলেফেঁপে ওঠে সাজেদা।
সেদিন দুপুরের রোদ্দুরে ককিয়ে ওঠেছিল প্রকৃতি, ভ্যাপসা গরম পড়েছিল; কাজ ছেড়ে দুপুরের খাবার খেতে বাসায় ফিরেই স্ত্রীর তোপের মুখে পড়ে বকর, আজকের মধ্যে আমার বাপের ঋণের টাকা শোধ করন লাগব; নইলে বাড়ি বেঁইচা দিবে বাবা।
ঘাম মোছতে মোছতে ভেতর ঘরের দিকে পা বাড়ায় বকর, তোমার কাছে টাকা থাকলে, দিয়া দাও।
আমার বেতনের টাকা তো বাসাভাড়া ও সুহেলের অসুখের পেছনেই খরচ হইয়া গেছে; তুমি নিজহাতেই তো খরব করেছো।
তোমার সংসার, তোমার পোলা খরচ করব কেডায়?
তিরিক্ষি হয়ে ওঠে সাজেদা, আমার মানে? তোমার কি কোনো দায়দায়িত্ব নাই?
খিদের আগুনে পোড়া মানুষের মেজাজে সবসময় আগুন জ্বলে, যেন বহ্নিমাণ চিতা, না, আমার দায়িত্ব কীসের? সন্তান যার, দায়িত্ব তার।
তোমার দায়িত্ব না থাকলে, আমার দায় কীসের? অহনই তোমার সংসার ছাইড়া চইলা যামু, তুমি থাকো তোমার সংসারে, আর সহ্য হইতাছে না।
তুমি যাইবা ক্যন, আমিইতো পলাইবার পথ খুঁজতাছি।
চড়াৎ করে রাগের আগুনে তেল ঢালার মতো অগ্নুৎপাত ঘটে সাজেদার মনে; নিজেকে সংযত করে রাখতে পারেনি, বিষধর সাপের মতো ফোঁসফুসিয়ে দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে ভেতর ঘরে চলে যায়।
ময়লাটে চাদরাবৃত বিছানায় নিশ্চিন্তে ঘুমানো চার বছরের সুহেলকে কোলে নিয়ে বাসা ছেড়ে বেরুয় সাজেদা…
নিজের ওপর ঘৃণা, রাগ ও ক্ষোভে পেটের খিদে পেটে নিয়েই বাসা থেকে বেরুয় বকর, অলক্ষ্যে হেঁটে চলতে থাকে রাজপথের পাশঘেঁষে, রেল লাইনের ওপর দিয়ে হেঁটে চলেছে সর্বহারা উদাস বাউলের মতো…
খিদমাহ্ মেডিকেল পেছনে ফেলে শাহজাহানপুর মোড়ে আসার পর দেখা গেল, অগ্নিবীণা এক্সপ্রেস কমলাপুর স্টেশন ছেড়ে বিকট বাঁশি বাজিয়ে এগিয়ে আসছে।
দ্রæত রেললাইন থেকে সরে রাস্তার একপাশে গিয়ে খুব সাবধানে দাঁড়ায় ও। দপাস্ দপাস্ দাপুটে শব্দ করে ওর সামনে দিয়ে ট্রেন চলে যায় শহর ছেড়ে, তারাকান্দির দিকে…



দুপুর ঘনিয়ে বেলা বিকেল হতে দেখে রাজপথে নামতে শুরু করে লোকজন, বৈকলিক ভ্রমণ, কেনাকাটা, খেলাধুলো আরো কত কি-ই না দরকারে। সরগরম হয়ে ওঠতে থাকে শহরের রেঁস্তোরাগুলো; সুস্বাদু খাবারের সুঘ্রাণে আমোদিত আশপাশ।
খিলগাঁও রেলক্রসিংয়ের পাশে ওভার ব্রিজের নিচে চুপ মেরে বসে থাকে আবু বকর। জগতের সমূদয় অভাব ও অসহায়ত্ব ওকে এসে জড়িয়ে ধরেÑ ওর সংসার তো আসলেই সাজেদার, সে-ই তো সাজিয়ে-গুছিয়ে সুন্দর করেছে, সন্তান জন্ম দিয়েছে, আমি তো কিছুই করতে পারিনি; ওল্টো রাগারাগি ছাড়া, ওকে বেহুদা কষ্ট দেয়া ছাড়া।
অভিমান করে না জানি কোথায় গেছে? মাজেদার বাসা ছাড়া শহরে আর কেউ নেই ওদের। আগেও কতবার এমন করেছে; কখনো মোবাইলে কথা বলে, কখনো নিজে গিয়ে নিয়ে এসেছে সাজেদাকে।
লুঙ্গির কোচর থেকে মোবাইলটি বের করে সাজেদার নাম্বারে ডায়াল করে বকর। রিসিভ হওয়ার পর এক অপরিচিত কণ্ঠ শোনে হকচকিয়ে ওঠে বকর।
এখনো মান ভাঙেনি সাজেদার, তাই অন্য কাউকে দিয়ে ফোন রিসিভ করিয়েছে হয়তো! অল্পক্ষণ পর সাজেদার মোবাইল থেকে ফিরতি ফোন আসে; মুচকি হেসে ফোন রিসিভ করে হকচকিয়ে ওঠে দাঁড়ায়!
কথা বলতে বলতেই অবচেতনে রেল লাইনের ওপর দিয়ে মালিবাগের দিকে দৌঁড়াতে থাকে, কী হইছে..? কোথায়..? মগবাজার ও কাওরান বাজারের মাঝখানে? আমি আইতাছি, অহনই আইতাছি…
ত্রিপ্রহর রাতের স্তব্দতায় কাঁপন তুলে সিলেট থেকে ছেড়ে আসা উদয়ন এক্সপ্রেস দানবের মতো ছুটে যেতে থাকে বন্দর নগরীর দিকে। কুমিল্লা স্টেশনকে নাÑথামার সাইরেন বাজিয়ে দ্রæত এগিয়ে যায় সামনে দিকে…
ট্রেনের সাইরেন কতই-না বিচিত্র সুর হয়ে বাজে মানুষের মাঝে। কখনো বিদায় সংকেত, কখনো গন্তব্যে পৌঁছার প্রফুল্ল সুর, কখনো নবযাত্রায় চমকিত উচ্ছ¡ল হাসির সুর, কখনো-বা সুদূর গন্তব্যে ছুটেচলা অক্লান্ত পথিকের দূর্বার ছুটে চলার গতিময় আওয়াজ। একেক মানুষের কাছে ভিন্ন ভিন্ন সুর হয়ে সংকেত দেয় সাইরেন।
আতকে ওঠে আলী আজগরকে জড়িয়ে ধরে কান্নাভারী শব্দে হাঁক দিয়ে ওঠে বকর, ওই তো, ওই তো শোনা যাইতাছেÑ আমার বউ সাজেদার ডাক; ওই তো শোনা যাইতাছে সুহেলের ডাক; সুহেল.., কই রে বাজান; আমার কইলজার বাছাধন; সাজেদা.. কই গো বউ আমার…
তুই শান্ত হ বকর, শান্ত হ; এমন অস্থির হইয়া গেলে তুই তো পাগল হইয়া যাবি। আজগরের আবেগছোঁয়া সান্তনায় আরো আবেগিত হয়ে ওঠে বকর, আমি ক্যমনে ভুইলা থাকমুÑ রেললাইনের ওপর পইড়া থাকা আমার বউ আর শিশুপোলা সুহেলের এবড়োথেবড়ো লাশের ছবি; কোন জাদুমন্ত্রে এমন ছবি ভোলা যায়, ক তো দ্যহি দোস্ত?
আবু বকরের মাথায় হাত বুলিয়ে নিঃশব্দে কাঁদতে থাকে আজগর, ওই কথা আর মনে করিস না বকর।
এমন জাদুবিদ্যা কই আছে আমারে ক দ্যহি, গভীর রাইতে একসঙ্গে আমার বউ ও সুহেলের লাশ কবরে নামানোর ছবি ভুইলা থাকার জাদু কই আছে, তুই ক তো দ্যহি? ক্যমনে ভুইলা থাকা যায় সেই নিষ্ঠুর রাইতের কথা…
মা-পুত্রকে পাশাপাশি কবরে রেখে সকল প্রিয়জনেরা চলে গেলেও, ঠায় দাঁড়িয়ে থাকে অষ্টাদশী চাঁদ, মলিন চাহনিতে তাকিয়ে ছিল শোকার্ত রাতের দীর্ঘশ্বাসের দিকে…।
-সমাপ্ত-

কুমিল্লা, বাংলাদেশ ।

এই লেখাটি শেয়ার করুন