জীবনানন্দ দাশ : বাংলাভাষার শুদ্ধতম কবি

জীবনানন্দ দাশ : বাংলাভাষার শুদ্ধতম কবি
.
.
.
.
 আধুনিক কাব্য জগতে রবীন্দ্রনাথের পরই যাঁর নাম সবচেয়ে বেশি উচ্চারিত হয় তিনি হলেন কবি জীবনানন্দ দাশ যাঁকে বাংলা ভাষার “শুদ্ধতম কবি” হিসেবে আখ্যায়িত করা হয়। প্রকৃত অর্থে তিনি ‘বাংলা কাব্যে আধুনিকতার অন্যতম শ্রেষ্ঠ পথিকৃৎ’। তবে আশ্চর্যের বিষয় 1954 সালে মৃত্যুর পর থেকে শুরু করে বিংশ শতাব্দীর শেষ ধাপে তাঁর জনপ্রিয়তা বাড়তে শুরু করে। 1999 খ্রীস্টাব্দে যখন তাঁর জন্মশতবর্ষ পালিত হয়, তখন তিনি বাংলা সাহিত্যের জনপ্রিয়তম কবির শিরোপা অর্জন করেছেন — আর সেখানেই এক আশ্চর্য চমক, এক আশ্চর্য জাদু ! এখনও পর্যন্ত রবীন্দ্র-পরবর্তী বাংলা সাহিত্যের প্রধান কবি হিসেবে তিনি দ্বিধাহীনভাবে সর্বসাধারণ্যে স্বীকৃত।
          1899 খ্রিস্টাব্দের 17 ই ফেব্রুয়ারি বরিশালের এক ব্রাহ্ম পরিবারে জীবনানন্দের জন্ম হয়। শিশু বয়স থেকেই তাঁর পিতা সত্যানন্দ এবং মাতা কুসুমকুমারী তাঁকে ভালো সাহিত্য পড়তে উৎসাহ দিতেন। তাঁর মাতা কুসুমকুমারী দাশ সেই যুগে কবি হিসেবে বিশেষভাবেই প্রতিষ্ঠা পেয়েছিলেন। সাহিত্যিক মাতার কাছে জীবনানন্দ সাহিত্যের প্রথম পাঠ লাভ করেন। পিতার কাছে পান মৌলিক চিন্তা-ভাবনা ও বিশ্লেষণ ক্ষমতা। দাদু চন্দ্রনাথ এবং বন-বিভাগে কর্মরত কাকা অতুলানন্দের কাছে পান প্রকৃতির পাঠ —- গ্রাম বাংলার দৃশ্য, লতা-পাতা, ফুল-ফল, গাছ-পালা, পশু-পাখি, আলো-বাতাস … এ সবই শিশু জীবনানন্দের চোখে ধরা পড়তে থাকে ভিন্নতর বৈশিষ্ট্য নিয়ে। ভোরের নির্মল আকাশ, শিশির ভেজা ঘাস, ঘুঘু ডাকা নিঃসঙ্গ দুপুর, অলস বিষণ্ণ মধ্যাহ্ন, ধানের ক্ষেতে হাওয়ার লুকোচুরি, ডিঙি নৌকা, ঘাসফড়িং …. প্রকৃতির এই সব তুচ্ছাতিতুচ্ছ বিষয়গুলিও জীবনানন্দের ডাগর দু’চোখে অরূপ হয়ে ধরা দিতে থাকে। এভাবে বাল্যবয়স থেকেই রূপময় প্রকৃতির প্রতি আকৃষ্ট হয় তাঁর কবিমন যা পরবর্তীতে তাঁর কাব্য রচনার ক্ষেত্রে প্রথম এবং প্রধান নিয়ন্ত্রক হয়ে দাঁড়ায়। উত্তরকালে জীবনানন্দ তাঁর নিজের কাব্য-সত্তার উৎস এবং পরিচিতি দিতে গিয়ে বারবার তাঁর দেখা এই শৈশব ও কৈশোরের প্রাকৃতিক পরিবেশের কথা উল্লেখ করেছেন।
          জীবনানন্দের শিক্ষারম্ভ হয় ব্রজমোহন স্কুলে। পরবর্তীতে তিনি ব্রজমোহন কলেজ, প্রেসিডেন্সি কলেজ এবং কলকাতা বিশ্ববিদ্যালয়ে অধ্যয়ন করেন। 1919 খ্রিস্টাব্দে বি.এ. পাঠরত অবস্থাতেই বিভিন্ন পত্র-পত্রিকায় তাঁর কবিতা প্রকাশিত হতে শুরু করে। 1921 খ্রিস্টাব্দে তিনি প্রেসিডেন্সি কলেজে অধ্যাপনার কাজে নিযুক্ত হন —- এই সময়টা ছিল তাঁর প্রথম যৌবনের ভাবালু উচ্ছ্বাসমণ্ডিত কবিজীবনের প্রথম পর্ব যার অন্যতম শ্রেষ্ঠ ফসল  ‘ঝরা পালক’ কাব্যগ্রন্থ সংকলন। 1928 খ্রিস্টাব্দ নাগাদ পরিচয় পত্রিকায় প্রকাশিত হয় তাঁর বহু বিতর্কিত কবিতা ‘ক্যাম্পে’ যা তাঁকে অশ্লীলতার দায়ে অভিযুক্ত করে। মূলতঃ সেই সূত্রেই তাঁকে খোয়াতে হয় অধ্যাপনার চাকরি, শুরু হয় তাঁর জীবনে কর্মহীনতার এক নৈরাশ্যময় অধ্যায়। এ সময় তিনি কলকাতার কলেজ-স্কোয়ারের কাছে একটি সস্তার মেসে থাকতেন এবং তাঁর দিন গুজরান হতো গৃহশিক্ষকতার মাধ্যমে। 1929 থেকে 1933 পর্যন্ত সময়ে চাকরীহীনতাজনিত বিভিন্ন অনিশ্চয়তা ও চরম অর্থনৈতিক টানাপোড়েন তাঁকে বিপর্যস্ত করলেও তখন তাঁর একমাত্র চিন্তা — সাহিত্য চর্চার মাধ্যমে কবি হিসেবে স্বীকৃতি পাওয়া। কিন্তু আগামীতে যিনি বাংলা সাহিত্যের অন্যতম শ্রেষ্ঠ কবি হিসেবে চিহ্নিত হবেন তাকে এই ধূসর সময় পর্যুদস্ত করতে পারেনি। 1932 থেকে 1936 এর মধ্যে রচিত হয়েছে তাঁর অনন্য-সাধারণ কাব্যগ্রন্থ ‘ধূসর পান্ডুলিপি’।
          জীবনানন্দ তাঁর এই কর্মহীন জীবনে বারবার বরিশালে গিয়েছেন এবং উপলব্ধি করেছেন — কোনও শহর নয়, তাঁর এই চির পরিচিত গ্রাম-বাংলার সঙ্গেই তাঁর আসল নাড়ির টান। সেই টানে গভীরভাবে আচ্ছন্ন হয়ে 1932 সালে মাত্র কয়েক সপ্তাহেই রচনা করেছেন শ’খানেক কবিতা এবং চৌদ্দ-পঙক্তির সনেট যা পরবর্তীকালে তাঁর মৃত্যুর পর ‘রূপসী বাংলা’ কাব্যগ্রন্থ নামে প্রকাশিত হয়ে বাংলা কাব্যজগতে এক স্থায়ী ও চিরন্তন ছাপ ফেলেছে।
          ইতিমধ্যে তাঁর বিয়ে হয়েছে লাবণ্যের সঙ্গে। কর্মহীনতার সে সময় তিনি একইসঙ্গে সাহিত্যচর্চা ও চাকরির সন্ধানে ব্যস্ত থেকেছেন কলকাতার সস্তা মেসে এবং স্ত্রী-কন্যাকে রেখে এসেছেন বরিশালের যৌথ পরিবারে। কাজেই তাঁর দাম্পত্য জীবনে যে  এক অবশ্যম্ভাবী ফাটল ধরবেই — এ আর নতুন কথা কি !
        অবশেষে তিনি 1935 সালে বরিশালের কলেজে শিক্ষকতার কাজ পান এবং জীবনে ব্যক্তিগত নানা সমস্যা থাকা সত্ত্বেও একে একে রচনা করেন ‘সাতটি তারার তিমির’,  ‘মহাপৃথিবী’ ইত্যাদি কাব্যগ্রন্থ, গল্প। তারপর 1943 সালের মর্মান্তিক দুর্ভিক্ষ, 1946-47 এর হিন্দু-মুসলিম দাঙ্গা তাঁর মনোভূমিকে ভীষণভাবেই পীড়িত করে এবং দেশভাগের আগেই তিনি বরিশালের চাকরি ছেড়ে পাকাপাকিভাবে কলকাতায় চলে আসবার সিদ্ধান্ত নেন। কলকাতায় এসে তিনি আবার কর্মহীনতার কারণে চরম অর্থনৈতিক সমস্যায় দীর্ণ হতে থাকেন। অথচ এই সময়কালে কলকাতার লেখকগোষ্ঠী দ্বারা এতোটুকুও প্রভাবিত না হয়ে সম্পূর্ণ নিজস্ব ঘরানায় লিখে চলেন তাঁর সবচেয়ে চিন্তাশীল কবিতা, গল্প, উপন্যাস এবং প্রবন্ধসমূহ। 1953 সালে হাওড়া গার্লস কলেজে শিক্ষকতার কাজ পাবার পর তাঁর অর্থনৈতিক সংকট অনেকাংশে লাঘব হয় এবং সেই বছরই কাব্যরচনার স্বীকৃতি-স্বরূপ ‘রবীন্দ্র পুরস্কার’ লাভ করেন। কিন্তু হায় ! পরের বছরই অর্থাৎ 1954 সালের 14 ই অক্টোবর সন্ধ্যাবেলায় বালিগঞ্জে এক ট্রাম দুর্ঘটনায় তিনি গুরুতর আহত হন এবং বাইশে অক্টোবর রাত্রে মৃত্যুমুখে পতিত হন।
          জীবনানন্দকে অমরত্ব দিয়েছে তাঁর কাব্যগ্রন্থ ‘রূপসী বাংলা’, দিয়েছে তাঁর ‘বনলতা সেন’। বনলতা সেন বাংলা সাহিত্যে আজ এক প্রকৃষ্ট আইকন। তাঁর কাব্যের ইতিহাস চেতনা, নিঃসঙ্গ বিষণ্ণতা, সুররিয়ালিজম্  তথা অবচেতনাবেত্তা এবং অবশ্যই বিপন্ন মানবিকতার ব্যাখ্যা তাঁকে দিয়েছে অসামান্য বিশিষ্টতা। তাঁর কাব্যে যেমন এসেছে বিদিশার নিশা, শ্রাবস্তীর কারুকার্য, দারুচিনি-দ্বীপ, তেমনই এসেছে ধানের ছড়া, কার্তিক মাসের সন্ধ্যার কাক, মেঠো পথ, কিশোরের পায়ে দলা মুথাঘাস, কাঁচা বাতাবি লেবু, সবুজ ঘাস, কচি লেবু পাতা, ঘাসপাতা, সোনালী ডানার চিল, বুনোহাঁস, বেতের ফল, ঘাসের বিছানা, বটের ফল, চন্দ্রমল্লিকার রাত্রি, ঘুঘুর পালক, কাঁচপোকা, গঙ্গাফড়িং এবং অবশ্যই অসম্ভব বিষণ্ণতা, অতীত স্তব্ধতা, অমোঘ আমোদ অথবা অসম্ভব বেদনা।
          জীবনানন্দের কাব্যের এই আশ্চর্য স্বতন্ত্র বৈশিষ্ট্য এবং সুররিয়ালিজম্-এর জাদু চিরকাল কাব্যপ্রেমী মানুষকে আচ্ছন্ন করে রাখবে। বাংলা কাব্যজগতের ইতিহাস তাঁকে ছাড়া ভীষণভাবেই অসম্পূর্ণ। কাব্যভাবনার স্বতন্ত্রতায় তিনি যেন কোনও এক কবি নন, তিনি যেন নিজেই একটি প্রতিষ্ঠান। রচনার বিশালতায় নয়, সম্পূর্ণ ভিন্নধারার কাব্য-চেতনা আবিস্কারের বর্ণচ্ছটায় তিনি দেদীপ্যমান। যতোদিন বাংলা ভাষা থাকবে, যতোদিন বাংলা কাব্য থাকবে, ততোদিনই কাব্যপ্রেমীর হৃদয়ের মণিকোঠায় লেখা থাকবে জীবনানন্দের নাম।
  
  কৃষ্ণনগর, নদিয়া,পশ্চিমবঙ্গ, ভারত ।
 

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
১৫ ই আগস্টের অণুগল্প: উঠান

১৫ ই আগস্টের অণুগল্প: উঠান

অমিত মজুমদার  রাত বারোটা বাজার সঙ্গে সঙ্গেই মেসেঞ্জারে মেসেজটা ঢুকলো। “শুভ স্বাধীনতা দিবস”। মেসেজটা বাংলাদেশ থেকে পাঠিয়েছে মোহিনী চৌধুরী। মোহিনীর সঙ্গে পরিচয় ফেসবুকে। সে ওখানে ...
হালিম: A Little Love Story

হালিম: A Little Love Story

তানভীর আহমেদ সৃজন   বাটি থেকে গরম এক চামচ হালিম তুলে নিয়ে নিজের মুখে পুরে নিলো সৌরভ। সঙ্গে সঙ্গেই প্রচণ্ড তৃপ্তিতে দু’চোখ বুজে এলো তার। ...
বই পর্যালোচনা: ‘হোম ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড ‘– অমর্ত্য সেন

বই পর্যালোচনা: ‘হোম ইন দ্যা ওয়ার্ল্ড ‘– অমর্ত্য সেন

পর্যালোচনা- মিরাজুল হক  পুস্তক পর্যালোচনা :  Home in the World – A memoir by AMARTYA SEN  Publisher – ALLEN LANE (Penguin Books ) ; MRP ...
অণুগল্প - এইসব দিন রাত্রি

অণুগল্প – এইসব দিন রাত্রি

জোবায়ের রাজু  নিত্যদিনের অভাব আর টানা পেঁাড়নের সংসারে আমরা যে না খেয়ে কেমন করে বেঁচে আছি, এটাই একটা দুর্লভ রহস্য। আমাদের স্কুল টিচার বাবার কঁাধে ...
মুজিব কোটি হৃদয়ে গাঁথা

মুজিব কোটি হৃদয়ে গাঁথা

গোলাম রব্বানী আকাশ ভেঙে পড়লো বজ্রপাতের আঘাতে আকাশের বুক বিজলির চমকের মতন খণ্ডবিখণ্ড হয়ে গেলো কোনো ভাবেই আকাশের পতন ঠেকানো গেলো না দালাল-বাটপার-বিশ্বাসঘাতক-প্রতারকের হাতে ভোর ...
প্রিয়তমার রেকর্ড ভাঙবে রাজকুমার

প্রিয়তমার রেকর্ড ভাঙবে রাজকুমার

সিনেমানামা প্রিয়তমার মতো রাজকুমার সিনেমার প্রথম গানটিও দর্শকদের মধ্যে ব্যপক সারা ফেলেছে। মুক্তির পর পরই সিনেমাটির প্রথম গান ও টাইটেল ট্র্যাক ‘তোমার রাজকুমার’ শিরোনামের গানটি ...