আড়ালে

জোবায়ের রাজু

কোন এক অজ্ঞাত কারনে আমরা সালাউদ্দিনকে যেমন ‘ছালু’ নামে ডাকি, তেমনি কোন এক অজ্ঞাত কারনে আমাদের সংসারে ছালু কেমন জানি অবহেলার পাত্র হয়ে উঠল। ছালু আমার থেকে বয়সে আট বছরের বড়। বয়সে বড় হওয়ার কারনে সে আমার থেকে যতটুকু সম্মান পাবার কথা, ততটুকু সম্মান আমি সাধারনত তাকে দেখাই না। অন্য সবার মত সেও আমার কাছে অল্প দিনে গৌন হয়ে উঠে। আমাদের সবার কাছে ছালুর এই অবহেলিত হওয়ার কারন হচ্ছে তার বেকার জীবন। বাবার দাবী ছালু সংসারের বোঝা হয়ে তার অন্ন শেষ করছে। প্রায়ই বাবা আর ছালুর কথা কাটাকাটি এমনকি হাতাহাতিও চলে। রাগে ক্ষোভে ছালু তখন দু’চার দিনের জন্য বাড়ি থেকে উদাও হয়ে যায়। ছালুর অনুপস্থিতিতে সবাই যখন রাজ্যের চিন্তায় ডুবে থাকে, তখনই সে কলংকালসার দেহ নিয়ে বাড়ি ফিরে। অথচ তার এই বাড়ি ফেরায় সকলে কম বেশি খুশি নয়।

একদিন বাবা তার এক বন্ধুর মাধ্যমে ছালুর কি একটা চাকরীর ব্যবস্থা করলেন। কিন্তু ছালু তাতে নারাজ। এত কম মাইনের চাকরী সে করবে না। তার মত মাষ্টার্স পাশ করা ছেলের জন্য নাকি এই চাকরী নয়! সেই রাতে বাবা আর ছালুর আবারো হাতাহাতি চলল। ঘটনার এক পর্যায়ে ছালু বাবাকে ধাক্কা মেরে দরজার সাথে পেলে দেয়। এতে বাবা কপালে বেশ আঘাত পায় এবং কপালের বাম পাশটা ফুলে উঠে। মা কাঁদতে কাঁদতে যখন বাবার কপালে বরফ ঢলছেন, তখনই ছালু বেজার মুখে নিজের ঘরে গিয়ে স্বজোরে ধাক্কা মেরে দরজা বন্ধ করে দেয়।

সকাল হয়। বেলা বাড়ে। ছালু দরজা খোলে না। মা উদ্বিগ্ন হয়ে উঠেন। তিনি নাকি কাল রাতে ছালুকে নিয়ে খারাপ স্বপ্ন দেখেছেন। ছালুর ঘরের দরজায় সবাই গায়ের শক্তি দিয়ে টোকা মারে। তবু দরজা খোলে না। এক পর্যায়ে দরজা ভেঙ্গে আমরা দেখি ছালু গলায় দড়ি দিয়ে সিলিংফ্যানের সাথে ঝুলে আছে।
ছালুর আতœহত্যায় আমাদের পরিবার স্তব্দ হয়ে যায়। পাড়ার নানান জনে নানান কটু বাক্য বলতে থাকে। এই ঘটনায় অনেকে বাবাকে দায়ী করেন। বাবা কারো কথা কানে তোলেন না।

বছরের পর বছর যাবার সাথে সাথে ছালুর স্মৃতির সাথে আমাদের দূরত্ব বাড়ে। আমার তো তাকে কালে ভদ্রে মনে পড়ে। মা নামাযের লম্বা মোনাজাতে ছালুর জন্য প্রার্থনা করেন কি না কে জানে।
বাবার বয়স বাড়ে। চুল দাড়ি পাকতে থাকে। ছালুর মৃত্যুর পর বাবা বদলে যেতে থাকেন তিরতির করে। দেখা গেল বাবাকে সারাবাড়ি পাওয়া যাচ্ছে না, অনেক খোঁজার পর আবিষ্কার করি বাবা গোরস্থানে গিয়ে ছালুর কবরের পাশে চোখ বন্ধ করে বসে আছেন। পেছন থেকে আমি ডাকিÑ‘আপনি এখানে কি করছেন?’বাবা চোখ বড় বড় করে বলেনÑ‘কে ছালু? ওহ বাবু তুমি? যাও আমি পরে আসছি।’
আমি বুঝতে পারি বাবা ছালুর স্মৃতিকাতরতায় ভুগছেন। আমার ঘর থেকে ছালুর যে ছবিটা হারিয়ে গেছে, একদিন আবিষ্কার করি সে ছবিটি বাবার পাঞ্জাবির পকেটে যতেœ পড়ে আছে। সেদিন সারারাত আমি কেন জানি একা একা কেঁদেছিলাম।
একদিন মাঝ রাত। বাবা ঘরে নেই। আমি আর মা গিয়ে দেখি বাবা এই মাঝরাতে উঠোনের পাশে ডালিম তলায় বসে আছেন। আমরা তার পাশে যেতেই বাবা কাতর কন্ঠে মাকে বললেনÑ‘ছালেহা, আজ আঠারো তারিখ না? আমাদের ছালুরে আল্লায় এই দিনে না দুনিয়াতে পাঠাইছে?’
সেই রাতে আমি বাবা আর মা পাশাপাশি বসে ছালুর জন্য রাতভর কাঁদলাম। বাবা আর মা আমাকে সারারাত ছালুর বিভিন্ন বয়সের গল্প শোনালেন। আমরা সবাই বিছানায় গেলাম একেবারে শেষ রাতে। ঘুম ঘুম চোখে।

বার্ধক্যজনীত কারনে বাবাকে হাসপাতালে ভর্তি করানো হয়েছে। রাতদিন নার্সদের পাশাপাশি মাও বাবার সেবায় পড়ে রইলেন হাসপাতালে। প্রায় দুই সপ্তাহ চলল এইভাবে।
শেষদিন বাবাকে আনতে আমিই গেলাম হাসপাতালে। সেখানে গিয়ে দেখি বাবা কেবিনে ঘুমিয়ে আছেন। আমি পাশে বসলাম। নিচুস্বরে ডাকলামÑ‘বাবা, শুনছো আমার কথা?’ ঘুমকেতুর কন্ঠে বাবা বললেনÑ‘কে ছালু? এতবছর কই ছিলি বাপ?’ আমি জবাব দিলামÑ‘বাবা আমি বাবু, ছালু নই!’ কাতর গলায় বাবা বললেনÑ‘ওহ বাবু? তুমি এসেছো?’
তারপর বাবা আমাকে জড়িয়ে ধরে ‘ছালু ছালু’ বলে শিশুর মত কাঁদতে লাগলেন। আমি ভাবতে লাগলাম ছালুর সব স্মৃতির সাথে আমাদের তেমন যোগ না থাকলেও বাবা একা একা আড়াল থেকে ছালুর স্মৃতি বেদনায় নিজে নিজে গোপনে পুঁড়ছেন।

 

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

এই লেখাটি শেয়ার করুন