কবি

জোবায়ের রাজু

অরণ্য ভাবতেই পারেনি আজ এভাবে শাহবাগের মোড়ে দেশ বরেণ্য কবি সাহিত্যিকদের আলোচনা সভায় তার সব চেয়ে প্রিয় কবি রায়হান মাসুদের সাথে এভাবে দেখা হয়ে যাবে। এই সেই রায়হান মাসুদ, যে শুধু অরণ্যের প্রিয় কবি নয়, তার মা নাসিমা হকেরও প্রিয় কবি।
অরণ্য মূলত মায়ের অনুপ্রেরণায় এই কবির কবিতা পড়ার আগ্রহ পেয়েছে। সাহিত্যকে মনে প্রাণে ভালোবাসার পর থেকে দেখে আসছে তাদের বাসায় বুক সেলফে কবি রায়হান মাসুদের বই সব থেকে বেশী। মাÑই এই বইগুলি কিনেছেন। মা যে এই কবির একজন অন্ধ ভক্ত।
নাসিমা হক যখন দেখলেন ছেলেরও বেশ আগ্রহ আছে গল্প কবিতার বইয়ের প্রতি, তখন তিনি চাইতেন ছেলেটা যেনো কবি রায়হান মাসুদের জীবনমুখি কবিতাগুলি পড়ে।




সময়ের সাথে সাথে অরণ্যও মায়ের মত রায়হান মাসুদের কবিতার ভক্ত হয়ে উঠে। ততদিনে সে জেনে গেছে তার মায়ের সব চেয়ে প্রিয় কবি এই রায়হান মাসুদ।
শাহবাগের এই সাহিত্য আড্ডায় প্রিয় কবিকে দেখে এগিয়ে আসে অরণ্য।
‘আসসালামুয়ালাইকুম।’
‘ওয়ালাইকুম আসসালাম।’
‘ইয়ে মানে…, আমি আপনার একজন বড় মাপের ভক্ত।’
‘তাই নাকি? ধন্যবাদ।’
‘তার থেকে বড় কথা কী, জানেন?’
‘কী?’
‘আমার আম্মুও আপনার চরম ভক্ত। মূলত আম্মুর কাছে আপনার কবিতার অনুপ্রেরণা পেয়েছি।’
‘হা হা হা। তাই নাকি! তোমার আম্মুকে আমার সালাম দিও। ভালো লাগতো, যদি তাঁকে আজ তোমার সাথে দেখতাম। মা ছেলে আমার লেখার ভক্ত, এটা তো বিশাল ব্যাপার।’
হঠাৎ অরণ্যের মনে হল কবি রায়হান মাসুদকে তার মায়ের ছবি দেখানো যায়। যেহেতু তিনি বলেছেন মাকে দেখলে ভালো লাগতো। মোবাইলখানা বের করে অরণ্য তার মায়ের ছবি রায়হান মাসুদের সামনে এগিয়ে দেয়। হাসি মুখে মোবাইলে আরেকজন ভক্তের ছবি দেখে চমকে উঠে রায়হান মাসুদ বলেনÑ‘নাসিমার ছবি না? নাসিমা তোমার আম্মু?’ কবির কথা শোনে আকাশ থেকে পড়ে অরণ্য বললÑ‘ওমা! আপনি আম্মুকে চিনেন?’ রায়হান মাসুদ কোনো কথা না বলে অরণ্যের দিকে হা করে তাকিয়ে থাকেন। হঠাৎ মাইকে স লকের ডাকÑ‘এবার আমরা শুনবো কবি রায়হান মাসুদের বক্তব্য। আমি অনুরোধ করছি তিনি যেনো এক্ষুণি মে আসেন।’
না, থাকা গেল না। স লকের ডাকে ম মুখি হতে হতে রায়হান মাসুদ বললেনÑ‘তুমি আমার অপেক্ষায় থেকো। আমি মাইকের সামনে যাচ্ছি।’ অরণ্য মৃদু হাসলো। কিন্তু সে অবাক, রায়হান মাসুদ তার মাকে কিভাবে চিনেন!
রায়হান মাসুদ মে র কাছে আসতেই তার ফোনখানা বেজে উঠে। রিসিভ করতেই ওপার থেকে বাসার দারোয়ান জানালেন তার বড় ছেলে অ্যাক্সিডেন্ট করে হাসপাতালের বিছানায়। মাইকের সামনে আর না গিয়ে তিনি আলোচনা সভা ফেলে উন্মাদের মত হন্তদন্ত হয়ে ছুটলেন হাসপাতালে ছেলের কাছে। অরণ্যের সাথে শেষ সাক্ষাৎ হল না রায়হান মাসুদের।


২.
নাসিমা হক ছেলের কাছে সব বৃত্তান্ত শুনলেন। অরণ্য বললÑ‘উনি তোমাকে কিভাবে চিনেন? তোমরা কী আগে থেকে দুজন দুজনকে চিনতে?’ কোনো কথা বলছেন না নাসিমা হক। ছেলেকে তিনি কিভাবে বলবেন জনপ্রিয় এই কবি একসময় তার মনের মানুষ ছিলেন। প্রেমের সম্পর্ক ছিল তাদের। সে সম্পর্ক মেনে নেয়নি দুটি পরিবার। ফলে বিচ্ছেদটা অল্প দিনে হয়ে যাবার পর দুজনের আলাদা আলাদা বিয়ে হয়। রায়হান মাসুদ বিয়ে করেন শারমিনকে আর নাসিমা হক মোজাম্মেল হোসেনকে।
‘কী হল আম্মু, কথা বলছো না কেনো? কবি রায়হান মাসুদকে চিনতে কিভাবে?’
‘আমরা একই ভার্সিটিতে পড়তাম।’
‘সেকি! কখনো তো বলোইনি।’
মৃদু হাসলেন নাসিমা হক। ছেলেকে তিনি মিথ্যে বলেছেন। প্রেমের জন্য মিথ্যে বললে নাকি পাপ হয় না। এ কথা নাসিমা হক রায়হান মাসুদের কোনো এক কবিতায় পড়েছেন।

 

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

এই লেখাটি শেয়ার করুন