গয়াকুন্ড

তৌসিফ চৌধুরী 

চট্রগ্রাম শহরকে পেছনে ফেলে পাহাড়ি রাস্তা ধরে দ্রুত গতিতে ছুটে চলেছে আমাদের সাদা শেভ্রোলো। ড্রাইভিং সিটের পাশের ছিটে বসে জানালা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে আছে পৃথা ওর চুলগুলো উরছে, ভোরের সোনালি আলোতে হালকা সোনালি লাগছে ওর কালো চুলগুলোকে। কয়েকবার পলক ফেলল পৃথা, বড় বড় কালো চোখের পাপড়িতে যেন সৌন্দর্যের ঢেউ খেলে গেলো। আমার মাঝে মাঝে মনে হয় পৃথা ই হয় ত পৃথিবীর সবচেয়ে সুন্দর মেয়ে। খুব ইচ্ছে করছিলো ওকে কাছে টেনে ওর চোখের পাতায় চুমু দিতে। কিন্তু, রিয়ার ভিউ মিরোরে তাকিয়ে প্রবল ইচ্ছাটা দমন করলাম, পেছনের ছিটে বসে আছে আমাদের ই সবচেয়ে ভদ্র আর ভিতু বন্ধু আবির আর ওর বাকদত্তা তানজিলা।

সীতাকুণ্ড শহরে আমাদের রিসিভ করার জন্য অপেক্ষা করার কথা আমাদের ই আরেক বন্ধু সমির আলি খান এর। সে সাব ইন্সপেক্টর অব টুরিস্ট পুলিশ।
১ ঘন্টা দেরিতে আসলো সমির। ক্লিন সেভ নাকের তলায় জাদরেল গোপ চোখে কালো চশমা চেহারাটা রদে পুড়ে আগের চাইতে তামাটে হয়ে গেছে। আমি সিউর আসামিরা একে দেখলেই বুঝে যাবে এ বেটা পুলিশ।
আমার শেভ্রোলোর বনেটে বসে পকেট থেকে একটা পুরোনো এন্টিক টাইপের জিপ্পু লাইটার বের করে সিগারেট জালিয়ে লম্বা এক টান দিয়ে এক ঝাঁক নিকোটিন চালান করলো ফুসফুসে। কেমন একটা ফিল্মি সুপার কপ টাইপের ভাব ওর ভেতরে।
সিগারেট টা ঠোট থেকে নামিয়ে, পৌঁছতে বিলম্ব হওয়ার কারন বর্ননা করতে লাগলো সমির_
“আরে গত রাতে চন্দ্রনাথ থেকে ফেরার পথে স্থানিয় এক ডাকাতের লাশ পাওয়া গেছে অদ্ভুত ভাবে খুন হয়েছে লোকটা ক্রাইম স্পট হয়ে তোদের কাছে আসতে দেরি হয়ে গেলো। কে বা কারা যেনো তার দুটো চোখ ই তুলে নিয়েছে কণ্ঠনালি টেনে ছিড়ে ফেলেছে, লম্বা লম্বি বুক চিরে কলিজা বের করে নিয়েছে ”
সমির কে থামিয়ে দিয়ে আবির বলল
” ধ্যাত রাখ তোর ক্রাইম আর ট্রাইম এখন প্ল্যান কি সেইটা বল শর্ট টাইম টুর কাল অবস্যয় ঢাকায় ফিরতে হবে”

সন্ধ্যার আগেই আমরা চন্দ্রনাথ এর অপার সৌন্দর্য আর স্বর্নমন্দীর ঘুরে ফিরে আসলাম আর ফেরার পথেই প্রথম শুনলাম গায়াকুন্ডের গল্প ।

গয়াকুন্ড হলো একটি আদিবাসী পুরোনো পরিত্যক্ত শ্বশান। সীতাকুণ্ড পাহাড়ের নিচে এই গয়াকুন্ড অবস্থিত। মন্দিরের পুরোহিত থেকে জানা যায় যাদের অপমৃত্যু হয়ে থাকে (আত্মহত্যা) তাদের এই জায়গায় দাহ করা হয়  যাতে তাঁদের আত্মা মুক্তি পায়। আরো জানা যায় অমাবস্যার রাতে এখানে অলৌকিক শক্তিদের আনাগোনা বেড়ে যায়।

পৃথার যেদের কাছে বার বার হেরে যাওয়াটা আমার অভ্যাসে পরিনত হয়ে গিয়েছে হয়ত। অনেকটা সবার অনইচ্ছা থাকা সর্তেও কেবল পৃথার যেদ আর আমার রাজি হওয়ার কারনে আমরা প্লান করলাম যে, হ্যাঁ যাবো আমরা গায়াকুন্ড দেখতে এবং আজ রাতেই, ক্যাম্প ফায়ার করবো দারুন হন্টেড এডভেঞ্চারময় কিছু সময় কাটাবো।  বেশি টাকা দিয়ে মাঝ বয়সি এক স্থানিও গাইড কে রাজি করিয়ে আনলো সমির।  রাত ১০ টা নাগাদ আমরা বেরিয়ে পরলাম সাথে স্থানিয় গাইড, পুলিশ অফিসার বন্ধু সমির ওর কোমরে ঝুলছে সার্ভিস রিভেলবার তবে আজ কোন অমাবস্যার রাত না আজ পুর্ণিমা রাত পূর্ণ চাঁদ আকাশে উপচে পরা জোৎস্নার আলোয় ভাসিয়ে যাচ্ছে চারপাশ যেন বিশ্বচরাচর এ আজ জ্যোৎস্না উৎসব চলছে। পাহাড়ি বুনো জ্যোৎস্নার এই সৌন্দর্যে হারিয়ে গিয়েছে মনের সব ভয় আর অশরীরী আশংকা। চন্দ্রনাথ যাবার প্রধান রাস্তা থেকে বাঁ দিকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে নেমে গেছে গায়াকুন্ডের পায়ে হাটা রাস্তা  দ্যৈর্ঘ দিন মানুষ চলাচল না করায় প্রায় ঝোপঝাড়ে বন্ধ হয়ে গেছে রাস্তা। চাঁদের আলোয় মায়াময় এ রাতে অচেনা গাইডের পেছন পেছন চলতে লাগলাম আমরা ৫ জন অজানা ভৌতিক শ্বশানের উদ্যেশ্যে।

মূল সড়ক থেকে আমরা নেমে পরেছি গায়াকুন্ডের প্রায় পরিত্যক্ত রাস্তায়। ঝোপঝাড় আর বিশাল বিশাল গাছ কে পাশ কাটিয়ে চাঁদের আলোয় গাইডের পেছন পেছন হাটছি আমি, আমার গায়ের সাথে প্রায় সেঁটে হাটছে পৃথা তার পেছনে আবির আর তাঞ্জু সবার পেছনে সমির। ১০ মিনিটের হাটা রাস্তা ঝোপঝাড় এরিয়ে চলতে গিয়ে ৩০ মিনিট লেগে গেলো। ১০.৪৫ মিনিট এ আমরা এসে দাড়ালাম গায়াকুন্ডের বুকে। একেবারেই পরিত্যক্ত দৈর্ঘদিন অব্যাবহারিত একটা শ্বশান ।

চার পাশে হাজার হাজার গাছ পালা আর ঝোপঝাড়ের মাঝে মোটামুটি খোলা একটা চত্ত্বর। সবায় চুপচাপ দাড়িয়ে আছি দেখছি চারপাশ কারো মুখে কোন কথা নেই আমার হাতের কনুই চেপে ধরে রেখেছে পৃথা। চত্ত্বরের এক পাশে দেওয়াল বিহিন শুধু কয়েকটি খুটির উপর দাঁড়িয়ে আছে একটি ভগ্নপ্রায় চালা। তার নিচে লম্বা পাথর এটি হয়ত লাশ ধোয়ানোর কাজে ব্যাবহৃত হত। আর চত্ত্বরের মাঝে যে কোন কোথাও হয়ত শাব দাহো করা হত শেষ কবে এখানে শব দাহ করা হয়ে ছিলো তা বোঝার কোন উপাই নেই।

মোবাইল ফোনের ফ্লাস জালিয়ে চারপাশে দেখছিলাম পশ্চিম দিকে শ্বশানের শেষপ্রান্তে ফ্লাসের আলো পরতেই পিলে চমকে গেলো আমার। অস্পষ্ট আওয়াজ করে প্রায় আমার গায়ের সাথে সেটে গেলো পৃথা। আমাদের সবার দৃষ্টি আর ফ্লাস লাইট একসাথে গিয়ে পরলো  লতাপাতা পেচিয়ে প্রায় ঢেকে যাওয়া এক ভয়াল দর্শন মুর্তির উপর। আমাদের গাইড প্রায় মাটিতে সুয়ে উবু হয়ে প্রনাম করলো মুর্তিকে উদ্যেশ্য করে। একটা অপেক্ষাকৃত উচু পাথরের উপর দারিয়ে আছে মূর্তি টি। এমন কোন দেবতা মূর্তি আমি আগে কোথাও কখনো দেখিনি। আমরাও যথাযথ সন্মান দেখিয়ে যতটা সম্ভব অন্য প্রান্তে চালার কাছে এসে দাড়ালাম।

শ্বশানের চার পাশ ঘিরে অসংখ্য বড় বড় শাল আর করুই দু চারটে খয়ের আর অর্জুন গাছ ও আছে তারা একে অপরের গায়ে পাতা ঠেকিয়ে আদর করে প্রবল জ্যোৎস্নাময় এ রাতে ভেষে আসছে শুকনো শাল পাতার গন্ধ টুপটাপ হিম খসে পরছে কোন অনন্তলোক থেকে। শ্বশানের বাহির পথের ঠিক সামনে দুপাশে দুটো প্রকান্ড মহুয়া গাছ দাঁড়িয়ে আছে সেই বনপথের পাহাড়াদার হয়ে।

গাছের পাতা বেয়ে নেমে আসছে অনবরত উজ্জ্বল প্রবল মায়াময়ী জ্যোৎস্নার বন্যা  শ্মশান চত্ত্বর যেনো এক অতিকায় মঞ্চ। কোন অদেখা আলোকশিল্পি তৈরি করেছে এই অপরুপ আলোর অপেরা। আর ঝিঝি পোকার ডাক এ চরাচর ছাড়িয়ে বনান্তর ছাড়িয়ে অতিক্রম করে ভেসে যাচ্ছে কোন দূর উর্দ্ধলোকে কোন নিঃসীম নক্ষত্রের দেশে। এমন গহীন মায়ারাজ্য ছেড়ে ফিরে যেতে নেই কাউকে। আমার মনে হয় সেই-ত ভালো সবায় ত ফেরে, দু একজন না ফিরলে ক্ষতি কি!। কোথায় ভয়ের অনুভুতি? কোথায় সব আতংক? এ সৌন্দর্য যে ভুলিয়ে দিয়েছে সব অশরীরী আভাস।
ঠিক এই সময় আমার চিন্তায় ভাটা পরলো গাইডের কন্ঠ শুনে।
“বাবু যদি অনুমতি দেন ভয় তাড়ানোর মহা ঔষুধ আছে আমার কাছে” এ কথা বলেই সে কোমড়ের টের থেকে বের করে আনলো পাহাড়ি মদের বোতল আর দুটো গাঁজা ভর্তি সিগারেট। খুসিতে প্রায় লাফিয়ে উঠলো সমির প্রায় চেচিয়ে উঠে বলল “এবার জম্পেশ জমে যাবে শ্বশান বাস” বলেই গাইডের হাত থেকে অনেকটা কেরেই নিলো বোতলটা সমির।

ছড়িয়ে ছিটিয়ে বসেছি সবায় আমার খুব কাছেই বসে আছে পৃথা পাথরের উপর বসেছে সে চাঁদের আলোয় ওকে অপ্সরীর মত লাগছে। আচ্ছা, এই মেয়েটা এত সুন্দর কেন ওর চোখের দিকে তাকিয়ে কাটিয়ে দেওয়া যায় সপ্ত জন্ম  এত মায়া কোথা থেকে পেলো এই মেয়ে, কি দরকার ছিলো ওকে নিয়ে এখানে আসার নেশা কি হয়ে গেছে আমার নাহ আমি সাভাবিক ই ত আছি। আমাদের মাঝ বয়সি গাইড নেশায় চুড় হয়ে মাথা বুজে বসে ঝিমুচ্ছে। আমি মাথা তুল্লাম ঘড়ি দেখব বলে দেখলাম আবির অস্থির হয়ে সমিরকে ডেকে নিয়ে আমার দিকে আসছে ওদের অস্থিরতার মাঝে কেমন এক অশুভের  আসংকা স্পষ্ট বুঝতে পারলাম আমি। শিরদাঁড়া টান টান করে বসে সাভাবিক হতে চেষ্টা করলাম হ্যা আমি সাভাবিক আছি। প্রচন্ড ভয়ার্ত চেহারা নিয়ে অস্থির হয়ে বলছে আবির
” আমি ওই মূর্তির পায়ের কাছে একটি মাটির হাঁড়ি দেখে আসলাম আর তাতে সচ্ছ পানির ভেতর এক জ্যান্ত কই মাছ। কয়েকটি কাঁচা বেল পাতা ও আছে পাশে ” তখনো সবায় সাভাবিক সান্ত আবির ব্যাতিত কারো চেহারাতে কোন ভয়ের লেস মাত্র নেই।  সমিরকে অসহায় দেখাচ্ছে গাঁজার প্রভাবে ছোখ দুট ছোট হয়ে গেছে ওর। হটাত আমার মাথায় যেন বিদ্যুৎ খেলে গেলো কই মাছ, বেল পাতা জিনিশগুলো খুব পরিচিত লাগলো আমার হ্যা মনে পরেছে। তখনি আবির বলে উঠলো “আজ অঘরী পূর্নিমা”

হ্যাঁ আমি আর আবির একসাথে অসংখ্যক বই পড়েছি তার মধ্যে অন্যতম  বিভূতিভূষন বন্দোপাধ্যায় এর লিখা তারানাথ তান্ত্রিক সিরিজ। আমার আর আবিরের বুঝতে বাকি রইলোনা বিষয়টা। জ্যান্ত কই মাছ আর বেল পাতা অঘরী পূর্নিমার রাতে পরিত্যক্ত শ্বশানে এ আয়োজন কেবল সব সাধনার জন্যেই।
আবির সবায় কে খুলে বলল বিষয়টা

“সব সাধনা হলো ভয়ংকর পিশাচ সিদ্ধ কোন কাপালিক তান্ত্রিকের বিশেষ ক্ষমতা অর্জনের জন্য শয়তানের উদ্যেশ্যে এক তন্ত্র সাধনা, টাটকা মরার বুকের উপর যোগাসনে বসে ধুনো জালিয়ে ভয়ংকর এক সাধনা” পৃথা আর তাঞ্জু প্রায় আমার আর আবিরের গায়ের সাথে লেপ্টে গেলো ভয়ে চুপষে গেছে ওদের চেহারা। আবির আবার বলতে শুরু করলো ” এ ধরনের নাগা সাধুরা মরা মানুষের মাংস খেতে পারে এরা পিশাচ পোষে নিজের অধিনে আর অঘরী পূর্নিমা হলো অমবস্যার মতই তন্ত্র সাধকদের জন্য এক বিশেষ রাত”
হো হো করে হেসে উঠলো সমির। আবির কে উদ্যেশ্য করে বলল “আরে গাধার বাচ্চা ওসব কেবল ওই বিভূতিভূষণের কল্পনাতেই হয় এখানে আবার কে তন্ত্র সাধনা করতে আসবে”

আমিও ভাবলাম এসব ত লেখকের কল্পনা বাস্তবে আবার কে সব সাধনা করতে আসবে। কিন্তু বাস্তবেই যে কই মাছ আর বেল পাতা কোথা থেকে আসলো সে চিন্তা বেমালুম ভুলে গেলাম। ভাবলাম গাঁজা খেয়ে আবিরের কথায় কি সব উলটা পালটা ভাবছি হাসি পেলো আমারো। মনে পরলো হুমায়ুন স্যার তার মিসির আলি সিরিজের “যখন নামবে আঁধার” গল্পে লিখেছিলেন গাজা ব্রেইন কে মন্থর করে দেয় হ্যালুসুলেশন ঘটায়।
ঝিম ধরে বসে রইলাম নেশায় চুড় হয়ে যাচ্ছি চিন্তা শক্তি স্থির রাখতে পাচ্ছিনা জানিনা কতখন বসে ছিলাম হটাৎ সম্বিত ফিরে পেলাম পৃথার ঝাকুনিতে। চোখ মেললাম আমি, সবায় দড়িয়ে আছে নিশ্চুপ। কোথায় হাড়িয়ে গেছে প্রবল মায়াময়ী জ্যোৎস্না মেঘে ডেকে গেছে পুরো আকাশ, অন্ধকার দানা বেধেছে পুরো শ্বশান চত্ত্বরে।

ক্ষনিক আগেই যে শুন্য শ্বশান জ্যোৎস্না স্নান করছিলো, অপার্থিব সৌন্দর্য বিলিয়ে যাচ্ছিলো যে প্রবল মায়াময়ী জ্যোৎস্না, হটাৎ কোথায় যেনো হারিয়ে গিয়েছে সেই পূর্ণ চাঁদ। একটু আগের ঝলমলে আকাশ জুরে এখন কেবল একরাশ কালো মেঘের রাজত্ব। সামান্য আলো আর আঁধারের  ব্যবধানে ক্ষনিক আগেই যে মায়ারাজ্য ছেড়ে ফিরে যেতে ইচ্ছে করছিলোনা হটাৎ ই সেই মায়ারাজ্যকে এক মৃত্যুপুরির অতিকায় মৃত্যুর মঞ্চ বলে মনে হচ্ছে। চোখ মেলেছি খানিক আগেই ঝাপসা চোখেই দেখলাম সবার মুখ ফেকাশে আতংকিত চেহারা, আবিরের বুকের সাথে লেপ্টে আছে তাঞ্জু, নির্বিকার সাবধান পজিশনে সিনা টান করে দ্বাড়িয়ে আছে এস আই সমির আলি খান। আশ্চর্য সমিরের চেহারা বা চোখে কোন নেশার প্রভাব নেই।
আমার মাথা টা ঘুরছে প্রচন্ড যন্ত্রনা হচ্চে নাসারন্ধ্রের মাঝে। বাঁ হাত দিয়ে নিজের বুকের সাথে আকরে ধরলাম পৃথাকে চিরপরিচিত ওর শরীরের মিষ্টি গন্ধ আর আমার বুকে লেপ্টে থাকা ওর সুঢৌল স্তনের স্পর্শ আজ আমার ভেতরে যৌনতা জাগাতে ব্যার্থ। কেবল এক মায়া অসিম মায়া পৃথিবী উলটে গেলেও এই মেয়েকে নিয়েই ফিরতে হবে আমাকে।

চারপাশে তাকালাম সব কিছু নিরব শান্ত উধাও হয়ে গিয়েছে ঝিঝিপোকার ডাক কিংবা কোন রাতজাগা পাখির পাখা ঝাপটানি যেন এক অশুভ আতংকে সবায় পালিয়ে গেছে শ্বশান ছেড়ে। এতটা নিরবতা আমি কখনো দেখিনি পৃথার বুকের স্পন্দন শুনতে পাচ্ছি আমি নিজের বুকের স্পন্দন ও শোনা যায় এ কেমন অদ্ভুৎ নিরবতা। মস্তিষ্ক হতে জোর করে দূরে ঠেলে ফেলার চেষ্টা করছি মদ আর গাঁজার প্রভাব।
এতখনে বুঝতে পারলাম সবার আতংকের কারন, শ্বশানের বাহির বা প্রবেশ পথের দিক থেকে ভেষে আসছে শুকনো পাতার মর মর আওয়াজ কে যেন হাটছে, খুব দ্রুত হাটছে দু পায়ে হাঁটছে ভারি কোন জন্তু জানোয়ার কিংবা মানুষ অজানা কোন এক আতংক শব্দটা ধিরে ধিরে তিব্র থেকে তিব্রতর হচ্ছে খুব কাছে চলে এসেছে শ্বশানের ঠিক সেই সময় সমির তার তর্জনী নিজের ঠোঁটে চেপে চুপ করার ইশারা দিলো সবার উদ্দেশে।
ভগ্নপ্রায় চালার নিচে শব ধোয়ানোর পাথরের পেছনে লুকিয়েছি সবায় হাটু গেড়ে বসেছে সমির ওর ডান হাতে বেরিয়ে এসেছে রিভেলভার। পৃথা প্রায় আমার গলা জরিয়ে আছে অজানা কোন ভয়ের আশংকায় মুখ লুকিয়েছে আমার প্রসস্থ বুকে বড্ড মায়া লাগছে ওর জন্য রাগ, যেদ, অভিমান যৌনতা সব কিছু তুচ্ছ সুধু মায়ার কাছে।
শব্দটা এবার জঙ্গল পেরিয়ে শ্বশান চত্ত্বরে এসে থেমে গেলো।

মেঘের আরাল হতে আসা আবছা চন্দালোকের আলোয় স্পষ্ট দেখলাম একজন বিবস্ত্র প্রায় পুরুষ দাঁড়িয়ে আছে শ্বশানের ঠিক মাঝ বরাবর। আমাদের থেকে হাত ১৫ দূরে। লম্বা দাড়ি জটা ধরা চুল পুরো মুখ ঢেকে আছে অ সাভাবিক লম্বা গোপ দিয়ে পরনে গেরুয়া নেংটি।  আর তার কাধের উপর ধনুকের মত ভাঁজ হয়ে ঝুলছে একটি লাশ। লোকটি খুব দ্রুত কাজ করছে বৃষ্টি আসার ভয়ে তাড়াহুরো করছে সে

দৃশ্য টা একবার দেখেই দু হাতে নিজের মুখ চেপে আমার বুকের ভেতর মুখ লিকুয়েছে পৃথা আবিরের চেহারায় অসাভাবিক পরিবর্তন হয়ত ভয়ে তিব্র হৃদস্পন্দনে মুখ অস্যাভাবিক ফ্যাকাসে দেখাচ্ছে। আর সমির নির্বিকার ভংগিমায় শক্ত করে ধরে রেখেছে পিস্তল।

লোকটি দরাম করে কাধ থেকে মাটিতে ফেলল লাশ চাঁদের আলো আরো ফিকে হয়ে গেলো বোঝা যায় আফছা। চারিদিক নিরব নিস্তব্ধতার এক মলিন চাদর বিছেয়ে দিয়েছে যেন কেউ। বনের পশুপাখি,কিট -পতঙ্গ সমস্ত প্রানিকুল যেনো নিরোবতার মিছিল করে যাচ্ছে।  হটাৎ অন্ধকার আকাশ আর এই ভয়ংকর নিরবতাকে খান খান করে চিরে দিয়ে গেলো এক বিজলির ঝলক আর প্রচন্ড মেঘের গর্জন ছড়িয়ে গেলে পুরো বনান্তর জুরে। একঝলক বিজলির আলোতে স্পষ্ট দেখলাম লাশটাকে চিত করে ফেলেছে লোকটি, তার বুকের উপর যোগ আসনে বসেছে সে। লাশের মাথার কাছে ধুপ করে জালিয়ে ফেলল ধুনো আলোকিত হয়ে ঊঠলো পুরো শ্বশান চত্ত্বর। ঘটনার আকস্মিকতায় নির্বিকার ভাবে তাকিয়ে আছি আমরা তিন জন পৃথা ও তাঞ্জু এবারে মাথা তুলল আমি খেয়াল করলাম পৃথার পুরো শরীর ঠান্ডা সাপের গায়ের মত ঠান্ডা হৃদস্পন্দন প্রচন্ড জোরে চলছে। এই মুহুর্তে খেয়াল করলাম আমাদের গাইড লাপাত্তা হয়ে গেছে এত ভাবনার সময় নেই সমিরের দিকে তাকালাম সমির শুধু হাত দিয়ে আবারো চুপ থাকার ইশারা করলো।

লোকটির হাতে বেড়িয়ে এসেছে একটি ত্রিভুজ আকৃতির ধারালো ছুড়ি  আগুনের আলোয় চক চক করছে ছুড়ির ফলা। পৃথার মাথা শক্ত করে বুকের ভেতর চেপে ধরলাম। প্রথমে দুরবুদ্ধ ভাষায় মন্ত্র জব করতে শুরু করেছে সে অদ্ভুত শুনাচ্ছে সে দুর্বুদ্ধ মন্ত্র। ছুড়ির ফলা দিয়ে এক এক করে লাশের চোখ দুটো ঠিকরে তুলে ফেললো কথিত তান্ত্রিক। বুক চিরে বের করে আনলো আস্ত কলিজা রক্ত গড়িয়ে সবুজ ঘাস লাল না, বরং কালচে রঙ ধারণ করছে।
ধুনোর আগুনে শয়তানের উদ্যেশে উৎসর্গ করলো সেই টুকরো গুলো। মুখে হাত চেপে বমি আটকে রেখেছে আবির। এমন নির্জন শ্বশানের বুকে এ দৃশ্য সহ্য করা কঠিন। মাথা চক্কর দিলো আমার সমিরের কাধে হাত রাখলাম  সমির আমার দিকে একবার তাকি আবার তাকালো সে দৃশ্যের দিকে বন্দুকের সেফটি লক খুলল সে কস করে শব্দ হলো। সমিরের দৃষ্টিতে কি যেন এক দৈব শক্তি ছিলো অজানা সাহস ছিলো হৃদ স্পন্দন কমতে শুরু করেছে আমার। অনুভব করলাম পৃথার শরীর কাপছে ঘেমে গেছে ভয় পেয়ে বাচ্চাবাচ্চা লাগছে ওকে দেখতে।
ঠিক সেই সময় পূর্ব দিক থেকে এক দমকা হাওয়া এসে লাগলো গায়ে।
ধিরে ধিরে শ্বশানের চার পাশের গাছ গুলো প্রচন্ড নরতে শুরু করলো যেন মুক্তির জন্য ছটফট করছে তারা। মুহুর্তে আকাশ ভেঙ্গে বৃষ্টি নামলো তুমুল বৃষ্টি, বৃষ্টির ছাঁট এসে পরছে আমাদের গায়ে নিজেকে ধরে রাখা কঠিন প্রান পন চেষ্টা করে দমিয়ে রেখেছি ভেতরের সমস্ত ভয়কে।

হটাত গগন বিদারি চিৎকার করে উঠলো সেই তান্রিক লোকটি। পুরো শ্বশান, গাছপালা, আর আমাদের অন্তর আত্তা পম্পিত করে দিয়ে গেলো সে চিৎকার। ধুনো নিভে আসছে তার বৃষ্টি বাড়ছে দ্রত মন্ত্র পাঠ করে চলেছে ঘুট ঘুটে অন্ধকারের চাদরে ঢেকে গেছে পুরো বনান্তর। ঠিক সেই মুহুর্তে গর্যে উঠলো আকাশ। সেকেন্ড এর জন্য প্রচন্ড আলোর বন্যা ভেসে গেলো পুরো শ্বশান জুরে।
বিদ্যুৎ এর ঝলকে ক্ষনিকের জন্য স্পষ্ট যে দৃশ্য দেখলাম সঙ্গে সঙ্গে আমার শিরদাঁড়া বেয়ে নেমে গেলো ভয়ের এক শীতল শ্রত। চিৎকার করে উঠলো পৃথা গলা দিয়ে কোন শব্দ বুরুলোনা অদ্ভুত শুনালো ওর চিৎকার গলা জরিয়ে ধরেছে আমার।
একঝলকের জন্য দেখলাম ঠিক আমাদের হাত ১০ দূরে দুপায়ে ভর দিয়ে দাড়িয়ে আছে মানুষ সাদৃশ্য ভয়াল দর্শন এক লোমোস প্রানি লোম বয়ে বয়ে টপ টপ করে বৃষ্টির জল পরছে। একযোগে ফ্লাস জালিয়ে দিলো সবায় ২য় বার চিৎকার করে উঠলো পৃথা আর তাঞ্জু ফ্লাশের আলোয় দেখলাম নেকরে আর মানুষের সংমশ্রন বিষিস্ট একটি প্রানি দাড়িয়ে আছে অদ্ভুত তার মুখাবয়ব, ধিরে ধিরে হা করছে সে, মুখটা অসাভাবিক ভাবে লম্বা হা তে পরিনত হচ্ছে, তার চোখদুটো তে ভয়ংকর এক ক্রুর ভৎসনা স্পষ্ট।
তখনো এক মনে মন্ত্র পরে যাচ্ছে তান্ত্রিক আমাদের চিৎকার চেচামেচিতে যেন তার কোন আগ্রহ নেই যেন আগে থেকে আমাদের উপস্থিতি তার জানা।
পৃথাকে শক্ত করে চেপে ধরে সমিরের পাশে দাড়িয়েছি আমি। সবার সমান আতংকিত চেহারা দেখে আমি এটুকু নিশ্চিত যে আমার হ্যালুসুলেশন হচ্ছেনা যা কিছু ঘটছে সব বাস্তব চোখের সামনে, যেন মৃত্যু দূতের হাতছানি।
হটাৎ ই চিৎকার করে উঠলো সমির “সুউর এর বাচ্চা..” আর সঙ্গে সঙ্গে ওর হাতের ডগায় ঝলকে উঠলো একঝলক আগুন তিব্র বারুদের গন্ধ এসে লাগলো নাকে। সঙ্গে সঙ্গে পাসের ঝোপের মাঝে উধাও হয়ে গেলো অদ্ভুত প্রানিটি ওর গতি পথ অনুশর করে আরো দুবার গুলি চালালো সমির গুলির প্রচন্ড আওয়াজ আর ভয়ংকর কোন রাগি প্রানির গর্জন মিলিয়ে গেলো দূর বনান্তের মাঝে।
এবার
আমাদের দিকে ফিরে তাকিয়ে ছে তান্ত্রিক ভয়ংকর উজ্জ্বল চোখ তার। প্রচন্ড রাগী চেয়াহারা যেনো চোখ দিয়ে ধ্বংস করে দিতে পারে সব।

পৃথার হাত চেপে ধরে শ্বশানের বাহির পথের দিকে ছুটলাম আমার পিছনে ছুটছে আবির ও তাঞ্জু জানিনা কোন পথে যেতে হবে কত দূর যেতে হবে শুধু জানি দৌড়াতে হবে দিকবিদিকশুন্য ছুটছি পেছনে ফেলে এসেছি প্রাণের বন্ধু সমির কে। আবারো গুলির আওয়াজ হলো দরাম করে মাটিতে পরল কেউ সাথে সাথে বৃষ্টির ঝাপটা আর পিচ্ছিল রাস্তায় ধুপ করে আছার খেলো পৃথা, হাত ফসকে পাহাড়ের ঢাল বেয়ে হারিয়ে গেলো সে গহিন অরন্যের মাঝে। সেকেন্ডের জন্য হৃদয়ে এক আতং আর প্রচন্ড রাগ অনুভব করলাম চোখের সামনে ভেসে উঠলো ওর কাজল চোখ টোল পরা হাসি আর চিরপরিচিত ওর নিঃশপাপ মুখ। সাথে সাথেই ওর গড়িয়ে যাওয়ার দিক অনুশরন করে লাফ দিলাম আমি,ধুপ করে আছাড় খেলাম কোন ভেজা তবে শক্ত মাটিতে।

একটা সরু মেঠো রস্তা, তিব্র আলো এসে পরলো চোখে হেড লাইট, পুলিশ জীপের ছাইরেন, পৃথার হাত টা চেপে ধরলাম আবার এক ঝাটকায় ওকে বুকের সাথে চেপে ধরলাম ওকে। রাস্তায় ঘসা খেয়ে বিচ্ছিরি আওয়াজ করে থেমে গেলো একটি পুলিশ জীপ। জ্ঞান হাড়িয়েছে পৃথা নিস্থব্দ ভাবে পরে আছে আমার বুকের উপর কপাল বেয়ে রক্ত গড়াচ্ছে। ধুপ ধাপ বুটের আওয়াজ কানে আসছে গাড়ি থেকে লাফিয়ে নামছে সোলজাররা।

আফটার ডিউটি সার্ভিস ওয়েপন সাথে রাখা, অদেখা বন্য প্রানির উপর ফায়ার করা এবং এক তান্ত্রিক সাধুর ইনকাউন্টর এর দায়ে ৩ মাসের জন্য সাসপেন্স সমির। পৃথার কপালে ব্যান্ডেজ, আবির আর তাঞ্জুর এখানে ওখানে কাটা ঝোপে ছিলে যাওয়া ছাড়া বড় কোন ক্ষতি হয়নি আমিও সুস্থ সামান্য কাটা ছেড়া বাদে তেমন কোন ক্ষতি হয়নি। বন বিভাগ বা বন্যপ্রাণী সংরক্ষন অধিদপ্তরে কোথাও এমন বর্ণনার কোন প্রাণির নাম বা ছবি পাওয়া যায়নি।

এই লেখাটি শেয়ার করুন