বিষদাঁত

সাত সকালে মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙে তানিয়ার। সকালে ঝুন ঝুন করে নুপুর পায়ে করিডোর পেরিয়ে তুলসী তলার দিকে পা বাড়ায় সে। আচমকা পেছন থেকে গলার স্বর শুনে কিছুটা চমকে ওঠে তানিয়া। ঠাকুমা ভাঙা গলায় বলে, এমন সাত সকালে ঝুন ঝুন করতে করতে যাচ্ছিস কোথায় ছুড়ি? তানিয়া ভেঙচি কেটে বলে, সাত সকালে দিলে তো মাথাটা গরম করে? যাচ্ছি তুলসি তলায়।

তানিয়াদের বেশ পুরনো বাড়ি। পরিবারে গোটা চারেক সদস্যরা থাকে। এর বাইরেও উত্তর দিকের কয়েকটা ঘর ফাকা থাকে ভাড়াটিয়াদের জন্য। আজকাল ভাড়াটিয়াদের যেন অকাল পড়েছে। চারমাস যাবৎ কোন ভাড়াটিয়ার দেখা পায়নি, টু-লেট দেখে যারা এসেছে তারা কোন কারনে এ পুরনো বাড়িতে থাকার আগ্রহ প্রকাশ করেনি।

বেশ কয়েকদিন বাদে আজ একজন ভাড়াটিয়া পাওয়া গেলো। লোকটির ব্যাচেলর, শহরের কোন এক অফিসে চাকুরী করে। তানিয়ারা সাধারণত ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া বাড়িতে রাখে না৷ তবে ভাড়াটিয়ার এই অকাল দুর্দিনে ব্যাচেলর ভাড়াটিয়া রাখলো। লোকটির সাথে তানিয়ার দেখা হয় আজ সকালে। সকালে ঘুম থেকে উঠে দোতালার দিকে তাকাতেই ভদ্রলোকের দিকে চোখে চোখ পড়ে যায়।

২.
লোকটির নাম আনিস! লোকটির সাথে তানিয়ার পরিবারের সাথে অল্পসময়ে বেশ সখ্যতা হয়ে যায়। তানিয়ার মা সেদিন খাবার টেবিলে বলে, উপরের ব্যাচেলর ছেলেটার মুখখানা দেখে মায়া হয় ভীষণ৷ ছেলেটা কেমন যেন গম্ভীর, কথা বলে না। তানিয়ার বাবা খেতে খেতে বলে, গম্ভীর তো হবেই। ছেলেটা ছোটবেলা থেকেই অসহায়৷
তানিয়ার মা তানিয়ার খাওয়া থামিয়ে বলে, তোমার সাথে কথা হয়েছে নাকি?
‘কথা তো হতেই হবে, বাড়িওয়ালাদের তো খোঁজ খবর রাখতে হয়। ছেলেটার বাবা মা কেউই নেই। ছোটবেলা থেকে মামার কাছে থেকে বড় হয়েছে। মামাও নাকি মারা গিয়েছে কয়েকদিন আগে।’
‘আহা বেচারা!’ দুঃখিত কন্ঠে বলে তানিয়ার মা। ছেলেটাকে একদিন নিমন্ত্রণ করে খাওয়ালেই হয় । ত

‘এমন গম্ভীর লোক কখনো দেখিনি ‘, রাগে ছুঁটতে ছু্ঁটতে বলে তানিয়া। ঠাকুমা ভাঙা গলায় বলে, ‘কাকে দেখিসনি ছুঁড়ি?’ তানিয়া রাগীকন্ঠে জবাব দেয়, ‘তাতে কি তোমার কাজ আছে? ‘ সুপারি কাটছিলে, তাই কাটো না। ঠাকুমা কানে শুনতে পায়না ঠিকঠাক মতো। সে আবার একই প্রশ্ন করে। তানিয়া এবারও রাগী গলায় বলে, ‘ঐ যে ওপরের ভাড়াটিয়া লোকটা! এত গম্ভীর কেনো বলতো? সকালে সিড়িঘরে দেখা হলো৷ আমাকে দেখেই কেমন একটা ভাব করলো৷ ঠাকুমা তানিয়ার কথার পুরোটা শুনতে না পেয়ে বললো, কি জানি তোর বাবা কোন লোককে ঘর ভাড়া দিয়েছে৷ সেই সাত সকালে বের হয়৷ আসে রাত করে, ছুটির দিনে সারাদিন ঘরের দাঁড় বন্ধ করে রাখে৷ তানিয়া অবাক হয়ে বলে, ঠাকুমা! তুমি এত খোঁজ রাখো? ঠাকুমা তানিয়ার কথায় জবাব দেয় না। তানিয়া চিৎকার করে ওঠে৷ ওঘর থেকে বিড়ালের কর্কষ ডাকের শব্দ শোনা যায়, ম্যাও করে ওঠে বিড়ালটা, স্টিলের বাসন মেঝেতে গড়াগড়ি খাওয়ার কর্কষ শব্দে বাড়ির পাশের আমগাছ থেকে উড়ে যায় কয়েকটি পাখি৷

সেদিন ছুটির দিন থাকায়, আনিসের সারাবেলা গেলো আলস্যে। শীত পার করে বসন্তের স্নিগ্ধ সুবাসময় বাতাস তার বুকে নতুন আবেশের সৃষ্টি করছে। আলস্য ভেঙে খচ খচে খবরের পাতায় চোখ গেলো তার। প্রথম পাতা জুড়ে বসন্ত আর রাজনৈতিক খবর। কয়েকপাতা উল্টাতেই একটি শিরোনাম তার চোখ এড়ালো না – ‘ঠাকুরপাড়া থেকে এক যৌনকর্মীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার’ আনিস ভুরু কুঁচকালো। ঠোটের কোণে মুচকি হাসি আনতেই তার মনে পড়লো চারটা বেজে গেছে, আজ তার বেরোনোর কথা। খাট থেকে উঠে জানলার কাছে যেতেই তার চোখে পড়লো বাড়িওয়ালার মেয়ের দিকে। এই মেয়েকে সে চোখে চোখে রেখেছে অনেকদিন ধরেই।

৩.
অপরিচিত গম্ভীর লোকটা ধীরে ধীরে ভীষণ প্রিয় হয়ে উঠলো তানিয়ার। সেদিন সন্ধ্যায় তানিয়ার বাবা লোকটাকে নিমন্ত্রণ করলো। খাবারের টেবিলে আলাপচারিতার এক পর্যায়ে লোকটির ঠোঁটের কোনে হাসি বাকি সবাই দেখলো আঁড়চোখে। এর মধ্যে একজন বিশেষ দৃষ্টিতে দেখলো। তানিয়া এর আগে কোন পুরুষ মানুষকে এত সুন্দর করে হাসতে দেখেনি।

সময় গড়ালো, এলো বসন্তের দিন। তানিয়া সাত সকালে উঠে লোকটির ঘরের সামনে একটি চিঠি রেখে এলো। এত দিনে বসন্তের কোকিল জেনে গেছে, তানিয়া লোকটির প্রেমে পড়েছে। বসন্তের কোকিলের কুহু কুহু ডাকে ঘুম ভাঙলো আনিসের। সকালের দরজা খুলতেই এক ঝাপটা শীতল বাতাস এসে লাগলো তার মুখজুড়ে। ছেঁয়ে গেলো গোটা শরীর। আড়মোড়া দিয়ে মেঝের দিকে তাকাতেই চোখে পড়লো রঙিন খামে মোড়া একটি চিঠি। চিঠিতে লেখা –

“আজ বসন্তের দিন! আপনি কি জানেন বসন্ত কারো কারো খুব প্রিয়? লাল রঙ কি আপনার ভীষণ প্রিয়?
আপনি কি কখনো প্রেমে পড়েছেন, যাকে আপনার প্রথমে বিরক্তিকর মনে হয়ছে? আপনাকে ভীষণ প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করে জানেন। আজ বিকেলে’ নীল দর্পণ’ পার্কে আসতে পারবেন? আমি আপনার উত্তরের জন্য অপেক্ষা করবো।”

-আপনার অগোচরের কেউ।

সেদিন ছুটির দিন থাকায়, আনিসের সারাবেলা গেলো আলস্যে। শীত পার করে বসন্তের স্নিগ্ধ সুবাসময় বাতাস তার বুকে নতুন আবেশের সৃষ্টি করছে। আলস্য ভেঙে খচ খচে খবরের পাতায় চোখ গেলো তার। প্রথম পাতা জুড়ে বসন্ত আর রাজনৈতিক খবর। কয়েকপাতা উল্টাতেই একটি শিরোনাম তার চোখ এড়ালো না – ‘ঠাকুরপাড়া থেকে এক যৌনকর্মীর ক্ষতবিক্ষত লাশ উদ্ধার’ আনিস ভুরু কুঁচকালো। ঠোটের কোণে মুচকি হাসি আনতেই তার মনে পড়লো চারটা বেজে গেছে, আজ তার বেরোনোর কথা। খাট থেকে উঠে জানলার কাছে যেতেই তার চোখে পড়লো বাড়িওয়ালার মেয়ের দিকে। এই মেয়েকে সে চোখে চোখে রেখেছে অনেকদিন ধরেই।

৪.
এভাবে কেঁটে গেলো কতদিন। সময় গড়ালো, গড়ালো দিন,পেরোল মাস। আজ শ্রাবণের প্রথম দিন। প্রথম দিনে আকাশ নিরাশ করেনি প্রকৃতিকে। সকাল থেকেই ঝরছে অঝরে। তানিয়ার সাথে দোতালার ভাড়াটিয়া আনিসের সম্পর্ক খুব অদ্ভুত কারণে প্রণয়ে জড়িয়েছে। বৃষ্টির জল গড়ানোর ছন্দে। তানিয়া সেই অদ্ভুত লোকটির প্রেমে হাবুডুবু খায় ভীষণ। সেদিন বসন্তের বিকেলের প্রেমের প্রস্তাব পেয়ে অবশ্য তাকে ফিরিয়ে দেয়নি আনিস।

এই সম্পর্ক গড়ালো অদ্ভুত প্রণয়ে। যাকে প্রেম যুগলরা বলে সীমাহীন প্রেম। আবার কেউ কেউ প্রেমের হিসাব রাখে বৈধ-অবৈধর তালিকায়। সুযোগ পেলেই রাতের আঁধারে আনিসের রুমে চলে আসে তানিয়া। আনিস অবশ্য এসবকে মোটেও পাত্তা দেয় না। তানিয়ার চোখের চাহনী দেখে সে বুঝতে পারে। তার দুঃচোখে প্রচন্ড প্রণয়ের আগুন দাউ দাউ করে জ্বলছে। সেদিন বৃষ্টির রাত, অঝোড় বৃষ্টিতে চারদিক ঝম ঝন আওয়াজ। আসিফ তানিয়ের গায়ের গন্ধে আসিফ নিজেকে আটকে রাখতে পারে না দেড়শো বছরের অভ্যাসে। আনিস প্রচন্ড ক্ষুধায় তানিয়ার গলার কাছে নাকের স্পর্শ ঘটায়, সামনের দাঁত দুটো বেড়িয়ে পড়ে। মেয়েটার জন্য মায়া হয় ভীষণ, আনিস নিজেকে সামলে নেয়। তানিয়া ততক্ষণে চোখ বুজে নিয়েছে। আসিফের মুখের ভেতরে বিষদাঁত বাড়ে। খপ করে নিজের বাম হাতটা তানিয়ার গলায় চাপিয়ে নিজের হাতে কামড় বসিয়ে, চাপা স্বরে গর্জন দিয়ে ওঠে। ঠিক তখনই বজ্রপাতের আলোয় তানিয়া চোখ খুলে আনিসের যায়গায় আবিষ্কার করে অন্য কাউকে। তানিয়া অজ্ঞান হয়ে পড়ে যায় সেখানে। আনিস নামের বেশধারী রাক্ষসটা একছুঁটে বেড়িয়ে পড়ে বাড়ির বাইরে। শহর জুড়ে ভীষণ বৃষ্টি হয় সে রাতে, শহরের পথঘাট ভেসে যায় শ্রাবণের বৃষ্টির জলে।

এই লেখাটি শেয়ার করুন