মড়ক

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

এ গাঁ থেকে মানুষজন দিন দিন নাই হয়ে যাচ্ছে। কি ব্যাধি এসে ঢুকলো গ্রামে। সব মানুষজনকে ডলে মেরে ফেলছে। এই তো ক’দিন আগেও মানুষজনের মধ্যে কি হাবভাব ছিলো। এখন তার কিছু নেই। আগে সন্ধ্যে হলে লোকজন দরজা জানলা বন্ধ করে ঘরের কুঠুরীতে থাকতো। এখন দিনরাত চব্বিশ ঘন্টা দরজায় ছিটকানি মেরে বন্দী হয়ে থাকে৷ প্রয়োজন ছাড়া বের হয় না কেউ। সন্ধ্যে হলেই গ্রামে ভুতুরে কান্ড হয়ে যায়।

তখন প্রায় মাঝরাত্তির পেরোনোর পালা। মোরগের ডাকে ঘুম ভাঙছে কারো কারো। কারো পেটে ভীষণ ক্ষুধা। এই ক্ষুধার জ্বালা আর ক’দিন সহ্য করতে হয় কে জানে। চোখ দুটো খোলা রেখে সিলিং এর দিকে তাকিয়ে ভাবে সতীশ। পেটে ভীষণ ডাকাডাকি করছে। ক্ষুধা লেগেছে ভীষণ, দুপুরে সেই চাট্টি ভাত খেয়েছে৷ রাতে খাওয়া হয়নি, কৌটর ভেতরে ত্যানানো শুকনো মুটি চিবিয়ে খেয়েছে। একটু সরিষার তেল ছিলো, সেটুকুও খেয়েছে। কি এক দিন কাল পড়লো, বন্ধ হয়েছে সব। দোকানপাট, ব্যাবসা বানিজ্য সব থমকে আছে।

ক’দিন আগেই সতীশদের গ্রাম থেকে শহরে আসে কাজের জন্য। সতীশের মাসি তার কোন পিসতুতো ভাইয়ের ছেলের কাছে সতীশকে পাঠিয়েছে। সেই সাথে সতীশকে দিয়ে একখানা চিঠিও লিখিয়ে দিয়েছে। ছোটবেলা থেকে মা-বাপ হারা সতীশকে দেখে বড্ড মায়া হয় মাসির। এতদিন তার কাছে একখানা সম্বল ছিলো। স্বামী মারা যাওয়ার পর বড্ড বিপাকে পড়েছে বেচারি। সতীশকে আর নিজের কাছে রাখা সম্ভব হচ্ছে না। ছেলেটা বড় হয়েছে, শহরে গেলে পেটে দুটো দানা পানি পেটে দিতে পারবে।

যাবার সময় সতীশের জন্য চোখের জল ছেড়ে দিয়েছেন মাসি৷ তার সন্তানাদি নেই বলে সতীশকেই তো এদ্দিন নিজের সন্তান হিসেবে মানুষ করেছেন। ছেলেটার ভালো কিছু হোক এটাই তো চান তিনি। সতীশ অবশ্য মাসির সামনে বসে কাঁদেনি। বরং স্বান্তনা দিয়েছেন, বলেছেন শহরে গিয়ে কিছু একটা করতে পারলে মাসি কে টাকা পাঠাবে।

২.
মাসি যে শহরের কথা বলেছিলো এ শহর তো তেমন বড় শহর নয়। এ তো জেলা শহরের মতোই। শহরে এসে সতীশের সাথে পরিচয় হয় মাসির পিসতুতো ভাইয়ের ছেলে ভিখুর সাথে। ভিখু একটি মিষ্টির দোকানে মিষ্টি বানায়। ভিখুকে যেমন জুয়ান পুরুষ মানুষ ভেবেছিলো সতীশ। ভিখু দেখতে তার ঠিক উলটো, বয়স চল্লিশের কাছাকাছি। তবে ভিখুকে দেখতে ঠাকুরদাদের মতো। সারাদিন আগুনের কাছে থাকতে হয় বলে গায়ের রঙ তেলচুকচুকে। মাথায় সুখ টাক।

সতীশ গিয়ে ভিখুর হতে মাসির দেওয়া চিঠিখানা ধরিয়ে দিলো। ‘নিজে খতি কষ্ট হয়ে যাছে, তার মধ্যি আবার বিষফোঁড়া এইসে জুইটেছে।’ কথাটা স্পষ্ট শুনে সতীশ কিছুটা হতভম্ব হয়ে গিয়েছিলো কিছুক্ষনের জন্য। ভিখু কিছুটা ভাষণ দেওয়ার ভঙ্গিতে বললো, ‘শোনো হে ছোকরা! মাসি তোমাকে পাঠাইয়াছে দেইখে খুশি হলাম। তবে আমার পক্ষে এহন তোমার জন্যি কাজ জোগাড় করা মুশকিলের ব্যপার। তুমি তার চেইয়ে আমার সাথে থেইকে মিষ্টির কাজটা আগাইয়া নিয়া যাও। হামি মালিকের সাথে কথা বইলে তোমার কাজের ব্যবস্থা করতিছি।’

কয়েকদিনের মধ্যে অপরিচিত জায়গাটা পরিচিত হয়ে ওঠে সতীষের। জায়গাটার নাম শ্যামলপাড়া। ছোট্ট একটুকুকু জায়গা, পাশ থেকে বয়ে গেছে খালের মতো সরু নদী। সেই নদীর ওপরে শ্মশানে ঘাট। কয়েকদিনের মধ্যেই ভিখুর সাথে ভালো সম্পর্ক হয়ে গেলো সতীশের। ভিখু হাতে ধরে সতীশকে মিষ্টি বানানোর কাজ শেখালো। কাজ সেখানোর সময় বললো, “মিষ্টি বানানো এত সহজ কাজ নয় হে ছোকড়া। হামি মিষ্টি বানানো শিখিয়েছি বহু কষ্ট কইরে। ” প্রথম কয়েকদিন মিষ্টি বানাতে বেশ কষ্ট হয়েছে সতীশের। দু হাতের মাঝখানে মলে মিষ্টি বানানোকে সহজ মনে হতে পারে। তবে এত সহজ কাজ নয়। অবশ্য অল্প কিছুদিনের মধ্যেই সতীশ মিষ্টি বানানো শিখে গেলো। সতীশের হাতে জাদু আছে বটে। দোকানের সব রসগোল্লা সে ই বানায়। এতে দোকানের মালিক বেজায় খুশি।

৩.
এ বাজারে তিনটে মাত্র মিষ্টির দোকান। তবে আজকাল সমাহার মিষ্টান্ন ভান্ডারের আয়-রোজগার ভালো যাচ্ছে। সতীশ ছেলেটাকে মনে ধরে গেলো দোকানের মালিক চন্দ্রিল বাবুর। তিনি ছেলেটার ওপর ভীষণ খুশি।

দোকান বন্ধ হলেও বাড়ি ফেরা হয়না সতীশের। রাতে দই পাততে হয়। হপ্তায় একটা দিন মাত্র ছুটি পায়। ছুটির দিনে সারাদিন গড়াগড়ি খায় বিছানায়। এখানে এসে কাজ করার পর তার রোগাপাতলা শরীরটা আগের চে কিছুটা ভালো হয়েছে। ভিখুর সাথে সতীশ থাকে বাজার থেকে বেশ খানিকটা দূরের এক গ্রামে। বাজার থেকে বালিয়াড়ির রাস্তা ধরে হাটতে হয়। গ্রামটা ভালোই লাগে তার, সবগুলো ঘর টিনের। কিছু কিছু ঘর আছে খড়ের। ছুটির দিনে গ্রামটা ঘুরে দেখে সতীশ। হঠাৎ করে কি থেকে যেনো কি হয়ে গেলো। গ্রামের বাতাসে বিশ্রি গন্ধ ছড়িয়ে গেলো। কোত্থুকে এসছে এই গন্ধ তা কেউই জানে না৷ ঠিক তার কয়েকদিনের মধ্যেই গ্রামে শুরু হলো মহামারী। প্রতিঘর থেকে প্রতিদিন একজন না একজন মারা গেলো। বালিয়াড়ি গ্রামের লোকজনকে বাজারে উঠতে নিষেধ করে দিলো শ্যামলপাড়ার লোকজন। ভিখু আর সতীশের বাজারে যাওয়ার কোন উপায় নেই। তাও মালিকের কথায় রাত্রিবেলা গোপনে গ্রামের মেঠোপথ ধরে চাঁদের আলোয় শ্যামলপাড়া বাজারে গিয়ে কাজে লেগে পড়তো দুই ভাই।

শেষ রাত পেড়িয়ে তখন সকাল হওয়ার পালা। মিষ্টি বানানোর কাজ শেষ করে শ্যামলপাড়া বাজার থেকে বালিয়াড়ি গ্রামের দিকে হেটে আসছিলো ভিখু আর সতীশ। চাঁদটা তখন ঢলে পড়েছে৷ দূর থেকে মোরগের ডাক ভেসে আসে। হঠাৎ করে বিশ্রি গন্ধে ওদের চারপাশটা ঘিরে গেলো৷ ভিখু শঙ্কিত কন্ঠে বললো, জোরে হাট সতীশ। জোরে হাটতে হাটতে এক পর্যায় দৌড়ালো দূজন। বিশ্রি গন্ধ্যে নাড়ি ভুড়ি উলটে বমি আসার উপক্রম। দৌড়াতে দৌড়াতে ঘরের দরজার সামনে এসে ধুপ করে পড়ে গেলো ভিখু। প্রচন্ড জল পিপাসায় হাপাতে হাপাতে সতীশ খেয়াল করলো না তা। নিশ্বাস বন্ধ হয়ে যাওয়ার উপক্রম প্রায়, হাপাতে হাপাতে সতীশের হঠাৎ স্মরণে এলো ভিখুর কথা৷ সতীশ এগিয়ে গেলো ভিখুর দিকে। ভিখু তখন মৃত্যু যন্ত্রণায় ছটফট করছে। ভিখুর গা থেকে সেই বিশ্রি গন্ধটা আসছে৷ ক্লান্ত স্বরে সতীশকে বললো, পালা তুই। এখানে থাকিস না৷ তার আগে এক কাজ কর, ঘরের ট্রাঙ্ককের মধ্যে কিছু টাকা আছে। সেগুলো নিয়ে পালিয়া যা। সতীশ চোখের জল ছেড়ে দিলো। হঠাৎ করে এ কি শুরু হয়েছে? সতীশ হন্তদন্ত হয়ে ঘরের ভেতরে গিয়ে দুটো শুকনো মরিচ এনে দিয়াশলাই এর কাঠি দিয়ে পোড়ালো। এতে যদি ঐ বিষাক্ত রাক্ষুসে গন্ধটা যায়। তবে সেরকম কোন লাভ হলো না৷ গন্ধটা বাড়লো ।

সতীশ জীবন বাঁচানোর তাগিদে এক ছুট লাগালো। এক দৌড়ে গ্রামের শেষ প্রান্তে এসে কিছুটা জিরিয়ে নিলো। তবে সেই গন্ধটা তার পিছু ছাড়লো না। সতীশ পালিয়ে বেশিদূর যেতে পারলো না। ভিখুর টানে আবার উলটো ছুট লাগালো। ফিরে এলো গ্রামে। গ্রামের তখন পঁচা গন্ধে ভরে গেছে৷ তাও সতীশ সেই গ্রামে ফিরে ভিখুর লাশ নিয়ে ঘরের তালা মেরে বসে রইলো ঘাপটি মেরে।

দিন তিনেক হয়ে গেছে। ভিখুর মরদেহে পচন লেগেছে । মরদেহটাকে আর কিছু না হলেও মাটি চাপা দিতে হবে ৷ বিদঘুটে পচা গন্ধ বেড়িয়েছে। এই গন্ধ কেমন যেন সয়ে গেছে সতীশের। কয়েকদিন ধরে না খেয়ে নিজেই পড়ে আছে ঘরের ভেতরে। সেই সাথে পঁচা গন্ধ। হঠাৎ দরজায় কড়া নড়ে. সতীশ কোন রকম কাতরে গিয়ে দরজা খুলে দাঁড়ায়। বাইরে কেউ নেই। কোথা থেকে যেন সেই আশটে গন্ধটা আবার চলে এসেছে৷ আকাশে মেঘ করেছে ভীষণ। বৃষ্টি নামবে..সতীশের ভীষণ ইচ্ছে করছে এই বৃষ্টির জলে নিজেকে ভেজাতে। উঠান পেড়িয়ে..কে যেনো দৌড়ে আসছে এদিকে। সতীশের দরজার সামনে এসে লোকটি পড়তে পড়তে উঠে দাঁড়ায়৷ সতীশকে কাতর গলায় বলে, আমাকে এখানে থাকতে দে রে ছোকরা । বৃষ্টিতে ভিজে যাচ্ছি। একটু আশ্রয় দে। সতীশ দরজা থেকে সরে দাঁড়ায়। লোকটিকে..ভেতরে ঢুকতে দেয়। ততক্ষণে সন্ধ্যা গড়িয়েছে..কালো মেঘে অন্ধকার হয়ে আছে চারপাশটা। কিছুক্ষণ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে সতীশের মনে হলো লোকটির কথা৷ সেই লোক ঘরের ভেতরে ঢুকেছে বেশ কিছুক্ষণ৷ সতীশ ঘাড় ঘুরিয়ে চোখ রাখলো লোকটির দিকে। নিজের ভেতরে দম বন্ধ করে রাখলো সতীশ৷ লোকটি খাচ্ছে… লোকটি ভিখুর গলিত লাশ কামড়ে কামড়ে খাচ্ছে৷ বিদ্যুৎ চমকাচ্ছে , ঝলমলিয়ে উঠছে বিভৎস দৃশ্য। সতীশ নিজেকে ধরে রাখতে পারলো না৷ ঢলে পড়লো ঘরের দরজার বাইরে৷ ততক্ষণে….দরজা নাড়ার শব্দে সেই বিদঘুটে চেহারার মানুষটার চোখ গিয়েছে সতীশের দিকে৷ সতীশ উঠে দাড়ালো…দৌড় দিলো নিজের সর্বশক্তি দিয়ে। পিছন থেকে ভেসে আসলো…পালিয়ে বেশি দূর যেতে পারবি না, সবাই শেষ হয়েছে। তুইও হবি। সন্ধায় গড়িয়ে যাচ্ছে , দৌড়ে পালাচ্ছে সতীশ । সেই গন্ধটা ছুটে আসছে তার পিছু পিছু ।

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন