রহস্যঘেরা শিমুলতলা: পর্ব-২

ড. গৌতম সরকার

অনুদিদার বাড়িটা একদম একপ্রান্তে বলা চলে। এরপর লাট্টু পাহাড়ের দিকে যেতে আরও কয়েকটা বাড়ি আছে বটে, তবে সেগুলো অধিকাংশই আর বাসযোগ্য নয়। শিমুলতলা একসময় স্বাস্থ্যোদ্ধারের জন্য জনপ্রিয় পর্যটন স্থান ছিল। প্রচুর বাঙালি তখন এই জায়গায় বাড়ি বানিয়েছিল। বছরে দুচারবার গোটা পরিবার মিলে এসে ছুটি কাটিয়ে যেত। আস্তে আস্তে বাঙালির ভ্রমন প্যাটার্নটাই বদলে গেল। মানুষ এখন দেশবিদেশে বহু জায়গা খুঁজে পেয়েছে। শিমুলতলা, দেওঘর, মধুপুর, নেতারহাট, ম্যাকলাস্কিগঞ্জের সেই কদর আর নেই। সেকারণেই অধিকাংশ বাড়ি রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে আর বাসযোগ্য নেই। আর ট্যুরিষ্ট না আসার কারণে এদিকে গাড়ি প্রায় চলেনা বললেই চলে। অথর্বের ভ্রু কুঁচকানোর কারণ এটাই, রাত্রে এদিকে গাড়ি আসার কারণ কি! ভাবতে ভাবতেই হালকা জগিং শুরু করল। চাকার দাগও তার সঙ্গে এগিয়ে চলল। বেশ কিছুটা গিয়ে বুঝল কাল তারা যে জায়গাটায় ক্রিকেট খেলছিল, সেই জায়গায় গাড়িটা এসে দাঁড়িয়েছিল। সেটা বোঝা গেল, কারণ লাল মাটির ওপর চাকার দাগ দেখে স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে গাড়িটা এখান থেকে ঘুরে গেছে। অর্থাৎ এখানে কোনো কাজ ছিল। কারণ শুধু ঘোরানোর থাকলে এতদূর আসার প্রয়োজন ছিলনা। এখানে রাস্তা যথেষ্ট চওড়া, তাই যেকোনো জায়গা থেকেই গাড়ি ঘোরানো যায়। অথর্ব দূরের দিকে তাকাতেই জঙ্গলটার দিকে চোখ চলে গেল, মনে পড়ল কাল বিকেলে ওখানেই লোকটা বাচ্ছা মেয়েটার পিছনে দৌড়চ্ছিল। একটু কৌতূহল বোধ করে জঙ্গলের দিকে এগিয়ে গেল। জঙ্গল খুব ঘন নয়, এখানে মূলত জারুল, সেগুন, ইউক্যালিপটাস গাছের জঙ্গল, আর সঙ্গে মনকাড়া পলাশ আর শিমুল। এখন যদিও ফুলফোটার মরশুম নয়। মায়ের মুখে শুনেছে মার্চ-এপ্রিলে তাদের রূপের বাহারে পাহাড়ে আগুন লেগে যায়। আর তার সাথে যোগ হয় মহুয়ার মাতাল গন্ধ। মহুয়ার গন্ধ যদিও বারোমাসই থাকে। কিছুটা যাবার পর জঙ্গলের মধ্যে একটা বাড়ি চোখে পড়ল। ভোলাও গড়গড় আওয়াজ করতে লাগল। জঙ্গলের ভিতর কোনো বাড়ি আছে সেটা অবশ্য অথর্বর জানার কথা নয়। এদিকে ওরা আসেনি, সঞ্জু-সবিতা হয়ত জানে। বাড়িটার একেবারে কাছে এসে বুঝল এটা একেবারে ভেঙে পড়েনি। ঘরগুলো এবং সাথে দরজা জানালাগুলো এখনও আস্ত আছে। তবে সব বন্ধ, বাড়িতে কেউ আছে বলে মেনে হলনা। অথর্ব ভাবতে লাগল কালকে কি লোকটা মেয়েটাকে এই বাড়ির দিকেই ধাওয়া করে নিয়ে আসছিল। লোকটা কি বদ লোক ছিল? এবার অথর্ব নিজেকে ছোট্ট করে ধমক দিল। কোথাও কিচ্ছু নেই, ও সাদা দেওয়ালে রহস্য খুঁজে বেড়াচ্ছে। ওরা তো বাবা-মেয়ে হতে পারে। মেয়েটি কোনো দোষ করে থাকতে পারে, বাবা রেগে গিয়ে মেয়ের পিছনে ধাওয়া করেছিল আর মেয়েটি মার খাওয়ার ভয়ে চিৎকার করতে করতে দৌড়চ্ছিল। ব্যাপারটা ভেবে সে হেঁসে ফেলল। গেটটা আটকানো, তবে কোনো তালা লাগানো নেই। ভিতরের উঠোন, বারান্দায় ময়লা জমে আছে। অথর্ব পাঁচিল বরাবর পিছনের দিকে এগিয়ে চলল, ওদিক থেকে যদি কিছু চোখে পড়ে। আসলে গেট পেরিয়ে চৌহদ্দিতে ঢুকতে ঠিক সাহস হচ্ছেনা। এদিকটায় জঙ্গল আরও ঘন, পিছনে এসে হতাশ হল অথর্ব। এদিকেরও সব জানালা টাইট করে বন্ধ করা। আরেকটু এগিয়ে দেখতে পেল একজায়গায় পাঁচিল ভেঙে গিয়ে একটা ফাটল তৈরি হয়েছে। ফাটলটার কাছে এসে একটু দাঁড়াল, তারপর এদিক ওদিক দেখে ফাটলের মধ্যে দিয়ে একটু কষ্ট করে ভেতরে ঢুকল। ইচ্ছে ভেতরটা একটু উঁকি মেরে দেখা। ঘাড়টা বাঁকিয়ে সবেমাত্র উঁকি মারতে গেছে ঠিক সেইসময় জঙ্গলের দিক থেকে একটা গম্ভীর গলা ভেসে এল, “ওখানে কি খুঁজছ, খোকা?”

অথর্ব এতটাই চমকে গেছে যে পিছন ফিরতে গিয়ে ভোলার সাথে ধাক্কা লেগে পড়েই যাচ্ছিল। কয়েক সেকেন্ড কোনো কথাই বলতে পারলোনা। সারা মুখে অপরাধবোধ মাখামাখি।

তারপর অনেক কষ্টে বলল, 

“না মানে দেখছিলাম, এবাড়িতে কেউ থাকে কিনা!”

“তাতে তোমার প্রয়োজন?”

এবার অথর্ব একেবারে চুপ।

“তুমি এখানে বেড়াতে এসেছ?”

অথর্ব ঘাড় নাড়ে।

“কলকাতা থেকে?”

আবার একইভাবে ঘাড় নেড়ে উত্তর দেয়।

“কোন ক্লাসে পড়?”

এবার মুখ খুলতে হয়, মাটির দিকে চোখ থেকে বলে, “ক্লাস টুয়েলভের পরীক্ষা দিয়েছি।”

“ও তাহলে তো তুমি বড় হয়ে গেছ। তোমার তো জানা উচিত অচেনা লোকের বাড়ির ভিতরে ওভাবে উঁকি দিতে নেই।”

অথর্ব কোনরকমে বলে, “স্যরি!”

ভদ্রলোক আরও গম্ভীর হয়ে বলে ওঠেন, “স্যরি বললে হবে না। তোমাকে শাস্তি পেতে হবে। যাতে এই অন্যায় কাজ ভবিষ্যতে আর না করো।” 

অথর্ব প্রমাদ গণল। সকালবেলায় এ কি ফ্যাসাদে পড়ল। সে একা, দিদি সঙ্গে থাকলে একটু ভরসা থাকে। 

     ভদ্রলোক এসে অথর্বর একটা হাত চেপে ধরল। বেশ শক্ত মুঠি। এতক্ষণ চোখ তুলে ভদ্রলোককে দেখল। বয়স আন্দাজ পঁয়ষট্টি হবে, কিন্তু চওড়া কব্জি আর হাতের চাপ থেকে বোঝা যাচ্ছে গায়ে বেশ জোর আছে। অথর্বকে প্রায় দৌড় করিয়ে বড় বড় পা ফেলে উনি এগিয়ে গেলেন। বাড়িটার সামনে এসে গেট খুলে ভিতরে ঢুকে হাঁক পারলেন, “রামলখন!” কয়েক সেকেন্ড পর ভিতরের বাড়ির দরজা খুলে যে বেরিয়ে এল তার চেহারা দেখে ভয় পেয়ে গেল অথর্ব। মিশমিশে কালো গায়ের রং, সারা শরীরে সাপের মত কিলবিল করছে পেশী। লাল চোখ। ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে জিজ্ঞাসা করল, “হজৌর!”

‘দো কুরশি লে আও।”

“জি’ হজৌর”

অথর্ব বুঝতে পারছেনা ভদ্রলোকের আসল উদ্দেশ্যটা কি। ও অনুরোধের সুরে বলল, “আঙ্কল, আমি খুব স্যরি। প্লিজ আমাকে যেতে দিন। আমার দিদি দেরি হচ্ছে দেখে চিন্তা করবে।”

ভদ্রলোক কয়েক সেকেন্ড ওর মুখের দিকে তাকিয়ে রইলেন। তারপর বললেন,

“তাহলে শাস্তির কি হবে? তুমি অন্দরমহল দেখতে চাইছিলে না! রামলখন তোমাকে সব দেখিয়ে দেবে।”

    রামলখন তখন চেয়ার নিয়ে এসেছে। অথর্ব ভয়ে ভয়ে তাকিয়ে দেখে এই সকালেই তার তেল চকচকে শরীর থেকে ঘামের স্রোত বয়ে যাচ্ছে। চেয়ারগুলো সামনে পেতে এমন একটা আগুন চোখে অথর্বর দিকে তাকালো, ওর ভিতরটা পুরো ফাঁকা হয়ে গেল। কোনো মানুষের দৃষ্টি এরকম ভয়ঙ্কর হতে পারে অথর্বর ধারণা ছিলনা। একটা ঘষাটে গলায় জিজ্ঞাসা করল, “মালিক কেয়া আপকি চা আভি দে দু ?”

“সিরফ মেরে লিয়ে নেহি, ইনকে লিয়ে ভি লে কর আও।” 

ভদ্রলোক অথর্বকে দেখিয়ে ইশারা করলেন। অথর্ব আপত্তি জানানোর আগেই ভদ্রলোক মুখে একটা অবহেলার হাঁসি এনে জিজ্ঞাসা করলেন,

“কেন চা খাওয়া অভ্যেস নেই নাকি! সকালবেলায় এখনও কি মায়ের কোলের কাছে বসে দুধের গ্লাসে চুমুক দেওয়া হয়!”

   অথর্বর মাথাটা গরম হয়ে উঠল, কিন্তু ও বুঝতে পারছে ওকে একটা প্যাঁচে ফেলার চেষ্টা করা হচ্ছে, এখন মাথা ঠান্ডা রাখা খুব জরুরি। অপমানটা হজম করে ও ভদ্রলোকের নির্দেশমত একটা চেয়ারে বসল। আর গুন্ডা লোকটা তার মালিকের রসিকতায় হা হা করে হেঁসে উঠে চা আনতে গেল। লোকটা চা নিয়ে আসার আগে ভদ্রলোক অথর্বের ঠিকুজি কুষ্ঠী সব জেনে নিলেন। তারপর জ্ঞানদান শুরু করলেন- শিমুলতলা আর আগের মত নেই। আগে ছিল শান্তির জায়গা। কত অসুস্থ মানুষ এখানে হাওয়া বদলাতে আসত। মাসের পর মাস থেকে এখানকার জলবাতাসে সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরে যেত। এখন জায়গাটা একদম বদলে গেছে। অনেক ঝামেলা লেগে থাকে, স্থানীয় মানুষগুলোও আর আগের মতো নেই। বিহার-ঝাড়খণ্ড ভাগ হয়ে যাওয়ায় এই বর্ডার শহরে অনেক অন্যায় কাজকর্ম হয়। তাই তার মতন বয়সের ছেলের এরকম যেখানে সেখানে উঁকিঝুঁকি মারা একদম উচিত নয়। কখন কোন বদ লোকের পাল্লায় পড়ে গেলে বিপদে পড়বে। লোকটা এরমধ্যে চা দিয়ে গেল, অথর্বের জন্যে কোকো ছড়ানো কফি আর সঙ্গে কুকিস। যাওয়ার আগে আবার সেই আগুন দৃষ্টি দিয়ে ভস্ম করে দিতে চাইল। ইচ্ছে না থাকলেও ভদ্রলোকের নির্দেশে কফিতে চুমুক দিতে হল। তবে একচুমুক খেয়েই বুঝল অপূর্ব স্বাদ হয়েছে কফিটার, আর কুকিসগুলোও ‘লা জবাব’। মনে মনে ভদ্রলোকের টেস্টের তারিফ করতেই হল অথর্বকে। কফি পর্ব শেষ হওয়ার পর আরেকবার সতর্ক করে ভদ্রলোক তাকে ফেরার অনুমতি দিলেন। অথর্ব ধন্যবাদ জানিয়ে গেটের দিকে ফিরতেই ভোলা হঠাৎ বিকট চিৎকার করে বাড়ির ভিতরের দিকটায় দৌড়ে গেল। লোকটা বাড়ির যে অংশ থেকে বেরিয়েছিল সেদিকে নয়। পিছনে একটা আউট হাউস আছে, ভয়ঙ্কর চিৎকার করতে করতে ভোলা সেদিকে দৌড়োল। অথর্ব হতভম্ব হয়ে দাঁড়িয়ে গেছে, যদিও চোখ ভোলার দিকে। ভোলা বন্ধ একটা দরজায় দুপা তুলে আঁচড়াতে লাগল আর ডাকতে লাগল। কুকুরটা নিশ্চয় ঘরের মধ্যে কিছু একটা টের পেয়েছে, অথর্বর স্নায়ু আবার টানটান হয়ে উঠল। ও আড়চোখে ভদ্রলোকের দিকে তাকালো। সাময়িক অস্বস্তি ঝেড়ে ফেলে উনি চিৎকার করে হাঁক দিলেন, “রামলখন! রামলখন!” লোকটা ফিরে গিয়ে বোধহয় আবার শারীরিক কসরত শুরু করেছিল। মনিবের ডাক শুনে তিরের গতিতে বেরিয়ে এসে কোনোদিকে না তাকিয়ে সোজা ভোলার দিকে দৌড়ে গেল। এক অদ্ভুত কায়দায় ভোলার টুঁটিটা বাঁ হাতে ধরে ওই অবস্থায় দৌড়ে এসে একহাত দিয়ে ভোলাকে গেটের বাইরে ছুঁড়ে দিল। ব্যাপারটা দেখে অথর্বের চোখ কপালে উঠে গেছে। কেউ একটা কুকুরকে এভাবে অনায়াসে চাগিয়ে তুলতে পারে, আর নিষ্ঠুরভাবে ছুঁড়ে ফেলতে পারে কল্পনাতেও ছিলোনা। ব্যপারটার বিভৎসতা আর ভয়াবহতা দেখে অথর্বের ভীষণ রাগ হল। ভ্রুটা আপনাআপনি কুঁচকে উঠল। খরচোখে লোকটার দিকে তাকাতেই, বয়স্ক ভদ্রলোক কঠিন মুখে ওকে আঙুল নেড়ে ইশারা করলেন বাড়ির চৌহদ্দি ছেড়ে বেরিয়ে যেতে। কয়েক সেকেন্ড সময় লাগল নিজেকে সংযত করতে, তারপর অপমানটা গিলে নিয়ে পায়ে পায়ে গেটের বাইরে এল অথর্ব। ভোলা তখনও আতঙ্কের ঘোর কাটিয়ে উঠতে পারেনি, তখনও মাটিতে পড়ে রয়েছে। ওকে দেখে কষ্ট করে উঠে দাঁড়াল। অথর্ব আরও একবার খর চোখে পিছন ফিরে দুজনের দিকে তাকিয়ে ভোলাকে নিয়ে জঙ্গল ভেঙে ফিরে চলল। দেখতে পেল ভোলার একটা পা মুড়ে গেছে, খোঁড়াতে খোঁড়াতে অথর্বের গায়ে গায়ে চলছে। কুকুরটা খুব ভয় পেয়ে গেছে। এতক্ষন ধরে চেপে রাখা রাগটা শরীরের সমস্ত রোমকূপ দিয়ে ফেটে বেরোতে চাইছে।

এবাড়ির ছাদে একটা কাঁচের ঘর আছে। ছোট্ট ঘর, দেওয়ালগুলো কাঁচের, আর দেওয়াল ঘেঁষে অর্ধবৃত্তাকারে বসার ব্যবস্থা। বসার গদিগুলো ছিঁড়ে গেছে, তবে বিশু দাদার বউ, শ্রীমতী বৌদি সেলাই করে জুড়ে দিয়েছে। এতে আরাম অনেকটা কমে গেলেও বসা যায়। অনুদিদাকে জিজ্ঞেস করে জানা গেছে প্রচন্ড ঠান্ডায় সূর্যোদয় দেখার জন্য এই ঘরটা দাদু তৈরি করেছিল। তখন ঠান্ডার প্রকোপ এখনকার চেয়ে অনেকগুন বেশি ছিল। আর ভোররাতের কনকনানি ঠান্ডায় খোলা ছাদ থেকে সূর্যোদয় দেখলে নির্ঘাত নিমুনিয়ায় মরতে হত। এই ঘরটা এখন অথর্বদের আড্ডাঘর হয়েছে। ওরা সময় পেলেই এই ঘরে বসে গল্পগুজব করে। আজও জলখাবারের পর চারজনে এই ঘরে এসে বসেছে। তবে আজকের আবহাওয়া একদম অন্যরকম। সকালবেলা ফিরেই অথর্ব বাকিদের জানিয়ে দিয়েছিল, ওর জরুরি কিছু বলার আছে, জলখাবার খেয়ে সবাই যেন আড্ডাঘরে চলে আসে। সেইমতো সবাই হাজির। বাড়ি ফিরে শ্রীমতী বৌদিকে দিয়ে চুনহলুদ গরম করে সঞ্জু আর অথর্ব ভোলার পায়ে লাগিয়ে দিয়েছে। কি করে ভোলার এই অবস্থা হল সঞ্জু জিজ্ঞাসা করলে অথর্ব বলেছে, সবকিছু সে মিটিংয়ে জানাবে। এখন আড্ডাঘরে তার কথা শোনার জন্য উদগ্রীব মুখে সবাই অপেক্ষা করছে। অথর্ব ধীরে ধীরে সকালে ঘটে যাওয়া সব ঘটনা বলল। কিভাবে জিপের চাকার দাগ দেখে সন্দেহ জাগায় জঙ্গলের মধ্যে বাড়িটায় গিয়ে পৌঁছল, তারপর উঁকি মারতে গিয়ে ধরা পড়া, ভোলার বন্ধ দরজা আঁচড়ানো এবং ওই ভয়ানক দর্শন লোকটার ভোলাকে ছুঁড়ে ফেলে দেওয়া, সব কিছু পরপর বলে গেল। সব শুনে সঞ্জু মন্তব্য করল, জঙ্গলের মধ্যে বাড়িটা সেও দেখেছে তবে ওই বাড়িতে কোনো মানুষজন কখনও দেখেনি। অথর্ব এবার জোর দিয়ে বলে, “ওই বন্ধ ঘরে নিশ্চয় কিছু গন্ডগোল আছে, নাহলে ভোলা ওরকম চিৎকার করে দৌড়ে যাবে কেন?”

কোজাগরী এতক্ষণ চুপ করে ভাইয়ের কথা শুনছিল। এবার মুখ খুলল,

“এত তাড়াতাড়ি এরকম কিছু ভেবে নেওয়া ঠিক হবে না। ভোলা মেঠো ইঁদুর দেখেও ওভাবে দৌড়ে যায়। আমি ভাবছি অন্য কথা…”

“আর ওই ভয়াল দর্শন লোকটা। ও ওই বাড়িতে কি করছে?”

দিদির কথা পছন্দ না হওয়ায় অথর্ব প্রতিবাদ করে ওঠে।

“চেহারা দিয়ে সবসময় সবকিছু বোঝা যায় না। হয়ত ওই ভদ্রলোক আমাদের মত ছুটি কাটাতে এসেছে। সঙ্গে কাজের লোক নিয়ে এসেছে। আমি ভাবছি রাতে গাড়ি আসার কথা। অত রাতে এই নির্বান্ধব জায়গায় কার আসার দরকার পড়ল।”

সবিতা বলল, “আচ্ছা কাল যে লোকটা বাচ্ছা মেয়েটাকে তাড়া করছিল, সেটা এই লোকটা নয়ত!”

সবাই সবিতার দিকে মুখ তুলে তাকাল, কেউ কোনো কথা বললো না।

পরে কোজাগরী বলল, “হতেও পারে আবার না ও হতে পারে। আর হলে ওই বাড়িতে বাচ্ছা মেয়েটিরও থাকার কথা।”

অথর্ব চেঁচিয়ে বলে উঠল, “আমি বলছি লোকগুলো বাচ্চাটাকে ওই ঘরে আটকে রেখেছে। ভোলা সেটা টের পেয়ে ওরকম চিৎকার করছিল।” এবার কোজাগরী কোনো কথা বলল না। সঞ্জু হঠাৎ বলে উঠল, “তাহলে চল, আমরা সবাই গিয়ে ওদের বলি ওই বন্ধ ঘরের দরজা খুলে দেখাতে। আমি হরিয়া, বিলু, মদন, সুখনকেও ডেকে নিচ্ছি। ওরা আমাদের এতজনকে কিছু করতে পারবেনা।”

কোজাগরী হাত তুলে সঞ্জুকে থামালো। বলল, “এত মাথাগরম করলে কোনো কাজ হবেনা। আমাদের আগে ভাবতে হবে, আমরা যা সন্দেহ করছি সেটা কতটা সঙ্গত। তুমি তোমার ইচ্ছে মতো একজনকে সন্দেহ করে তাকে চ্যালেঞ্জ করতে পারো না। সেটাও আইনের চোখে অন্যায়। এব্যাপারে আমাদের আরও সিওর হতে হবে।”

“সেটা কিভাবে ?” সঞ্জু প্রশ্ন করে।

“আমাদের আবার ওই বাড়িতে যেতে হবে। লুকিয়ে নজর রাখতে হবে সত্যিই ওখানে কোনো গন্ডগোল আছে কিনা।” 

অথর্ব মনে মনে কেঁপে ওঠে। ওই ভয়ঙ্কর লোকটার দৃষ্টির কথা মনে করলেই ওর সব সাহস নিমেষের ফুৎকারে উড়ে যাচ্ছে। তবু সে বলে ওঠে,

“নজর মানে, কিভাবে নজর রাখা হবে?” 

কোজাগরী বলে, “তুই তো বললি, বাড়িটার চারপাশে বড় বড় গাছ আছে। তুই আর সঞ্জু কাল সকালে অন্ধকার থাকতে থাকতে ঝাঁকড়া দুটো গাছে উঠে বসে থাকবি। ওখান থেকে নজর রাখবি বাড়ির ভিতরটা। আমি আর সবিতা বাড়িটার কাছাকাছি যাবোনা, জঙ্গলের একটু ভিতরের দিকে থাকব। কোনো গন্ডগোল দেখলে একবার কোকিলের ডাক ডাকবি। আর বড় গন্ডগোলে আমাদের সাহায্যের দরকার হবে তিনবার ‘কুহু কুহু’ ডাকবি, আমরা চলে যাবো।” এইরকম একটা প্ল্যান করে ওরা উঠে পড়ল। বেলা হয়েছে, এবার স্নান সেরে নিতে হবে।

                                                    (ক্রমশঃ……….)

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।