দায়িত্ব

দায়িত্ব

জোবায়ের রাজু

সুখবরটা শোনার পর শ্যামা আনন্দে আত্মভোলা। বারবার আমার কাছে তার একই প্রশ্ন-‘ও দাদা, বলনা বাবা দেখতে কেমন? তাঁর গোঁফ আছে? সিগারেট খায়?’ শ্যামার কথা শোনে আমার মেজাজ খারাপ হয়। বাবা নামের এই মানুষটার প্রতি আমার অগাধ ঘৃণা বলে শ্যামার এমন প্রশ্নবিদ্ধে আমি মনে মনে আন্দোলিত হই। সেদিন ভর দুপুরে মামা আমাকে আর শ্যামাকে ডেকে বলল-‘শোন, ঈদের আগের দিন তোদের বাবা এখানে আসবে। মনে হয় তোদের নিয়ে যাবে। তোরা এবার থেকে নিজেদের বাড়ি থাকবি।’ তারপর থেকে শ্যামা সব ভুলে বাবার প্রতিক্ষায় দিন গোণে।
শ্যামার চার বছর বয়সে আমাদের মা মারা যাবার পর বাবা আবার বিয়ে করলে সৎ মায়ের অত্যাচারে যখন আমাদের জীবন দুর্বিষহ হয়ে উঠে, তখন বড় মামা আমাকে আর শ্যামাকে নিজের বাড়িতে এনে আশ্রয় দেন। আমাদের প্রতি মামার ¯েœহের কোন ত্রæটি না থাকলেও মামি সম্পর্ণ বিপরীত। মামির ইচ্ছা আমাদেরকে যেন এতিমখানায় দিয়ে আসা হয়। শ্যামা আমায় প্রশ্ন করে-‘ও দাদা, এতিমখানা কি?’ আমি তার জবাব দিতে পারি না। আমার চোখ ভিজে আসে।
মাস শেষে বাবা পোষ্ট অফিসের মাধ্যমে মামার কাছে আমাদের খরচের জন্য টাকা পাঠায়। সে টাকা দেখে মামি আনন্দে আটখানা হয়ে আমাদের সাথে ভালো ব্যবহার করেন। কিন্তু টাকা ফুরিয়ে গেলে তার আসল রুপ ফোটে উঠে। তখন শ্যামাকে প্রায়ই রাতে উপোস থাকতে হয়। আমার দুই মামাতো বোন রিমু ও শিমু গøাস ভর্তি দুধ খেলে শ্যামার দূর থেকে তাদের সেই দুধ খাওয়া দেখে। প্রতি ঈদে রিমু শিমুর দামী পোশাকের সাথে শ্যামার কমদামী ফ্রকের একটা তফাৎ থেকে রয়।
কিন্তু আমাদের মামা তার ভিন্ন। মাটির মানুষ। আমাদেরকে আশ্রয় দিয়ে তার দায়িত্ব পালন করেছেন। অথচ আমাদের বাবা তার দায়িত্ব পালন করছেন মাস শেষে টাকার বিনিময়ে। যা আমার ভালো লাগেনা।




২. ঈদে বাবা আমাদের নিতে আসছে-এ কথা শোনার পর ফোরে পড়–য়া শ্যামার আহ্লাদী আচরণ রীতিমত দেখার বিষয়। সেদিন আমাকে বলল-
-দাদা, আমরা এবার আমাদের বাড়িতে ঈদ করবো?
-জানি না।
-আমি কিন্তু ঈদের দিন সকালে মায়ের কবর জিয়ারত করবো।
-ও
-রিমু আর শিমুকে আমাদের সাথে নিয়ে যাবো?
-জানি না। এখান থেকে যা তো। ভাল্লাগে না।
কথা না বাড়িয়ে শ্যামা এক দৌড়ে রিমু শিমুর পুতুল খেলার আসরে যোগ দিল। এবার ঈদে বাড়ি যাবে বলে তার খুশির অন্ত নেই। কিন্তু আমি চাই না বাবা আমাদেরকে নিতে আসুক। এখানেই আমরা ভালো আছি। আমি নিশ্চিত বাড়িতে গেলে আমরা দুটি ভাই বোনকে না খেয়ে মরতে হবে। এখানে অন্তত এই ভয় নেই। থাক না মামির হাজার অত্যাচার।
ঈদের আগের দিন শেষ বিকেলে বাবা এলেন আমাদের জন্য কাড়ি কাড়ি ঈদ প্রসাধনী নিয়ে। আমার জন্য প্যান্ট, শার্ট, বাটা জুতা, শ্যামার জন্য তিন তিনটে ঈদের জামা। জামার দিকে শ্যামার নজর নেই। সে আমায় বিড় বিড় করে বলছে-ও দাদা, বাবা যে দেখতে এত সুন্দর তা আমায় আগে বলিসনি কেন? বাবাকে এই প্রথম দেখেছে শ্যামা। বাবা শ্যামাকে কোলে তোলে নিল। রিমু শিমু কৌতুহলী চোখে সে দৃশ্য দেখছে।
বাবা ইফতারির পর আমাদের নিয়ে চলে যাবেন-এমন খবর শোনার পর আমি সোজা শোবার ঘরে চলে এলাম। আমরা তাহলে আজ এখান থেকে চলে যাচ্ছি? এটা ভাবতে কেমন জানি অস্থির লাগছে।
হঠাৎ দেখি খাটের তলায় একটা ব্যাগ। তুলে এনে দেখি এটা শ্যামার কান্ড। এখান থেকে চলে যাবে বলে আগেই সে ব্যাগে তার জামা কাপড় ভরে রেখেছে। আমার বুকটা হু হু করে উঠল। এই পরিবারের এত দিনের মায়া ছেড়ে চলে যেতে শ্যামার কি খারাপ লাগবে না? আমার তো লাগবে। আচ্ছা, শ্যামা বাড়ি যেতে এত মরিয়া হয়ে উঠছে কেন? মামির অত্যাচার কি তার অসহ্য লাগে?




৩. ইফতারের পর শ্যামার বাড়ি যাবার স্বপ্ন ভেঙে গেল। বাবা মাগরিবের নামায পড়ে এসে মামাকে নিয়ে সোজা ডালিম তলায় চলে গেলেন। আমি শ্যামা আর মামি দুয়ারে দাঁড়িয়ে বাবা আর মামার আলোচনা শুনছি। বাবার হাতে টাকার মোটা মোটা বান্ডিল।
-কিছু বলবে রহমান?
-ইয়ে ভাইয়া…এই টাকাগুলি রাখেন। এখানে পুরো তিন লাখ আছে।
-টাকা দিচ্ছো কেন?
-এগুলি আমার ছেলে মেয়েদের খরচের জন্য আপনাকে এককালীন দিয়ে দিলাম। আমি আমার দায়িত্ব শেষ করতে চাই। আমার সন্তানদের সব দায়িত্ব আজ থেকে আপনার। ওরা আপনার কাছে সারা জীবন থাকবে। আমার ইংল্যান্ডের ভিসা হয়ে গেছে। ঈদের পরে ফ্লাইট।
-ও।
মামা আর বাবার কথা শোনে মামি ঠোঁট উল্টিয়ে আমাদের কাছ থেকে চলে যাবার পর শ্যামা হা করে আমার দিকে তাকিয়ে রইল। আমি শ্যামার দিকে তাকাতে পারছি না। আমার বুক ভেঙে যাচ্ছে। শেষ দায়িত্ব পালন করতে বাবা টাকা নিয়ে এসেছেন। এই ঘটনা আমাকে কেন দেখতে হল?
চলে যাবার বেলায় বাবা শ্যামাকে জড়িয়ে ধরতেই শ্যামা শিশুর মত কাঁদতে লাগলো। ডালিম তলায় দাঁড়িয়ে আছে মামা। তার চোখের জল গড়িয়ে পড়ছে তিন লাখ টাকায়। রিমু আর শিমু দরজার ওপাশে দাঁড়িয়ে আছে। একটু পর ঈদের মেহেদি হাতে দিবে বলে তাদের চোখে মুখে খুশির ঝিলিক।
সন্তানদের দায় ভার নেয়ার দায়িত্ব শেষ করে বাবা শেষ পর্যন্ত চলে গেলেন। শ্যামা অন্ধকার করে ঘরে ফিরে এল। ঈদের চাঁদ উঠেছে বলে বাইরে পাড়ার বালকদের দরাজ গলা। প্রতি বছর ঈদে শ্যামা চাঁদ দেখা নিয়ে এক এলাহী কান্ড ঘটিয়ে পেললেও এবার সে নিরব। শ্যামার এই নিরবতা আমাকে কাঁদাচ্ছে।। আমি চোখের পানি লুকিয়ে পেলি, কিন্তু আমার দীর্ঘশ্বাস বেরিয়ে আসে।

 

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
হে প্রিয় জন্মভূমি

হে প্রিয় জন্মভূমি

সাইফুল ইসলাম মুহাম্মদ আমি যদি আবার পূর্নজন্ম হয়ে ফিরে আসি শ‍্যামল সবুজ মায়ায় ভরা আমার এ ছোট্র গাঁয়ে। আমি মানুষ হয়েই বারবার ফিরব মাগো তোমার ...
ফ্রগমাউথকে পত্রী

ফ্রগমাউথকে পত্রী

গোলাম রববানী    প্রিয় ফ্রগমাউথ , সুপ্রিয় প্রিয় পাখি আমার্‌ আজকাল তোমাকে আর খুঁজে পাই না মাত্র । সবুজ বৃক্ষের সতেজ পাতার রক্তাক্ত ক্ষতে । ...
আশার বাতিঘর দেশরত্ন | কবিতা | মেহেদী হাসান

আশার বাতিঘর দেশরত্ন | কবিতা | মেহেদী হাসান

 I মেহেদী হাসান   কিশোরী বয়স, কতোরকম স্বপ্ন ডানা মেলে চোখের আকাশে। একটা ঈদ; নতুন শাড়ি, চুড়ি রঙিন ফিতা। সাবলীল সহজ কিছু চাওয়া-পাওয়া। সব চাওয়াতে ...
ইচ্ছে ছিল পূর্ণতা- ফজলে রাব্বী দ্বীন

ইচ্ছে ছিল পূর্ণতা- ফজলে রাব্বী দ্বীন

ফজলে রাব্বী দ্বীন   ইচ্ছে ছিল সুন্দর এই দুপুরে রঙিন পাখির মতো উড়ে বেড়াবো, পূর্ণতায় ভরে দেবো সবুজের প্রাণ। অরণ্যের দাবানলে যে আকাশের মুখটি সাজে ...
What Your Relationship With Stock Market Says About You

What Your Relationship With Stock Market Says About You

Cursus iaculis etiam in In nullam donec sem sed consequat scelerisque nibh amet, massa egestas risus, gravida vel amet, imperdiet volutpat rutrum sociis quis velit, ...