মরু বিভীষিকা

ড. গৌতম সরকার

হোটেলে পৌঁছে খাওয়া মিটতেই রিসেপশনের ছেলেটি এসে জিজ্ঞাসা করলো, “সাব, ক্যামেল রাইড করেগি?” ইচ্ছে আধাঘন্টাটাক বিশ্রাম নিয়ে তারপর বেরোব। একটু হেঁসে বললাম, “আভি নেহি, বাদ মে।’ ছেলেটি চলে গেল। আধঘন্টার জায়গায় একঘন্টা পর যখন ঘরের বাইরে এলাম তখন সূর্য ঢলতে শুরু করেছে।
আজ এসেছি জয়সলমের শহর থেকে ৪২ কিলোমিটার দূরে মরুভূমি ‘স্যাম ডিউনস’-এ। আমার জীবনে প্রথম মরুভূমি দর্শন। হোটেল থেকে একটা ঢালু পথ নেমে মূল রাস্তার সাথে মিশেছে। দীঘল কালো একটানা পিচরাস্তা দিগন্তে গিয়ে মিশেছে। রাস্তার ওপারেই বালিয়াড়ি শুরু, বহু মানুষ উটের পিঠে সওয়ারী  হয়ে বালির গভীরে যাচ্ছে…….।
পিচ রাস্তা ধরে পশ্চিম দিকে কিছুটা এগিয়ে গেলাম। ডানদিকে পরপর হোটেল, সব হোটেলেই টেন্টের ব্যবস্থা, এরা বলে সুইস টেন্ট। ভিতরে একটা করে শোবার ঘর আর সংলগ্ন স্নানঘর। টেন্টগুলো ক্যানভাসের হলেও বাথরুম কংক্রিটের। হাঁটতে হাঁটতে বেশ কিছুটা এগিয়ে এলাম। এদিকটা ভিড়ভাট্টা কম, দোকানপাট নেই বললেই চলে। ছাড়া ছাড়া এক-আধটা হোটেল চোখে পড়ছে। এদিকে উটওয়ালাদের দৌরাত্ম একেবারেই নেই। কালো পিচের রাস্তাটা নিশির মত টানছে। শেষ বিকেলের মৃদুমন্দ ঠান্ডা হাওয়া দিনভর পুড়তে থাকা মরুর সারা অঙ্গে শীতল পরশ বুলিয়ে দিচ্ছে। আনমনে হাঁটছিলাম, এমন সময় কানে এল, “বাবুসাব উট কা সওয়ার হোগি?” তাকিয়ে দেখি বালিয়াড়ির ভিতরে এক শীর্ণকায় উট আর ততোধিক জীর্ণ-শীর্ণ এক ব্যক্তি আমার দিকে তাকিয়ে আছে। একটু অবাক হই, লোকটি এই বিজনে সওয়ারির জন্য অপেক্ষা করছিল! তারপর ভাবলাম, হয়ত সওয়ারী না পেয়ে ফিরে যাচ্ছিল, আমাকে দেখে একবার জিজ্ঞাসা করছে। আমি মুখে কিছু না বলে বালি ভেঙে এগিয়ে যাই। জিজ্ঞাসা করি, ‘কাঁহা পর লে যাওগি?”
“বাবুজি, সানসেট পয়েন্ট চলিয়ে। আজ বহোত বড়িয়া সানসেট হোগি।” আমি একটু ইতস্তত করি। জায়গাটা নির্জন, আশপাশে কাউকে দেখছি না। তবে স্বভাবে আমি ভিতু নই, আর নানান অভিজ্ঞতা সঞ্চয়ের আশাতেই তো ঝাড়া হাত-পা বেরিয়ে পড়েছি। আমার তো কিছু হারাবার ভয় থাকার কথা নয়! দরদাম করে উটের পিঠে সওয়ার হলাম।
বশির মিয়াঁ খুব আলাপী মানুষ। যাত্রা শুরু করতে না করতেই জিজ্ঞাসা করলেন, “বাবুসাব, আপ একেলা আয়ি?” আমার তখন বেসামাল অবস্থা। জীবনে প্রথম উটে চড়েছি, মনে হচ্ছে উত্তাল সমুদ্রে একটা পানসি নৌকায় সওয়ার হয়েছি। নিজেকে সামলাতে সামলাতে কোনওরকমে উত্তর দিলাম, “হুঁ”। বুঝতে পারলাম মিয়াঁর মনে ঘোর কৌতুহল। নিচ থেকে আবার প্রশ্ন ধেয়ে এলো, “সাদি কিয়া নেহি?” আবার উত্তর দিই, “হুঁ”। এবার বেশ সওয়ালের ভঙ্গিতে শুরু করল, “তব! বিবি-বাচ্চা ছোড় কর একেলা চলা আয়ি!” বুঝলাম এবার আর হ্যাঁ বা হুঁ তে মিয়াঁ সন্তুষ্ট হবেনা। সংক্ষেপে কারণটা ব্যক্ত করে আবার উটের গলা খামচে ব্যালান্স সামলাই। বেশ কিছুক্ষণ পর এই ভয়ানক সফর শেষ হল, সানসেট পয়েন্টে পৌঁছে উটের পিঠ থেকে নেমে স্বাভাবিক শ্বাস-প্রশ্বাস নিতে শুরু করলাম।




এই জায়গাটায় বেশ কিছু পর্যটক সমাগম হয়েছে। বশিরজী লোকজনের ভিড় এড়িয়ে একটু তফাতে তার উটটিকে দাঁড় করিয়েছে। উটের পিঠ থেকে নেমে কোমর আর পিঠ একটু ঠিকঠাক করে বালির ওপর বসে পড়লাম। চোখের সামনে পশ্চিম আকাশ গোলাপি বর্ণ থেকে ক্রমশ লাল হয়ে উঠছে। সামনে দিগন্ত ছুঁয়ে সোনা রঙ বালির বিস্তার। বশির মিয়াঁ একটু তফাৎ রেখে উবু হয়ে বসল। বুঝলাম মানুষটা বেশিক্ষণ কথা না বলে থাকতে পারেন না। পাশে বসে বলতে শুরু করল, “থর মরুর খাস কি জানেন বাবুজি?” বলে পাশে বালির স্তরের দিকে আঙুল দেখিয়ে বলল, “হাওয়ায় সৃষ্টি হওয়া বালির বুকে এই ঢেউয়ের আল্পনা। এটা কিন্তু অন্য কোনও মরুতে পাবেন না। এই প্রাকৃতিক কারুকর্মের কারণেই সিনেমাওয়ালাদের কাছে এই মরু খুব জনপ্রিয়।”

সানসেট হতে আরও কিছু দেরি আছে। বশির মিয়াঁ বলল, “অর অন্দর যাযেগি সাব? রিজার্ভ ফরেস্ট তক! উস জায়গা সে ভি বড়িয়া সানসেট হোগি।” আমি আবার উটের পিঠে উঠতে হবে ভেবে আতঙ্কিত হলাম। মিয়াঁ বোধহয় আমার আতঙ্ক বুঝতে পারল, বলল, “পায়দল ভি যা সকতি।” আমি হাঁফ ছেড়ে বাঁচলাম। সঙ্গে সঙ্গে রাজি হয়ে গেলাম। বশির মিয়াঁ উঠে উটের উদ্দেশ্যে বলল, “লক্ষী, তুম হিয়া পর রুকো, থোড়ি বাদ মে মিলুঙ্গি।”
হাঁটতে গিয়ে বালির মধ্যে হাঁটু পর্যন্ত ডুবে যাচ্ছে। বশির মিয়াঁকে আমার গতির সাথে তাল মেলাতে গিয়ে মাঝেমাঝেই পিছিয়ে আসতে হচ্ছে। মিনিট পনের হাঁচরপাঁচর করতে করতে গন্তব্যে পৌঁছলাম। নামেই রিজার্ভ ফরেস্ট, চোখের সামনে কিছু কাঁটাগাছ, আর কাঁটাতারের বেড়া। শুনলাম এখানে নাকি বর্ডার ছবির শুটিং হয়েছে।
আশপাশে কেউ নেই। সন্ধ্যের মুখে এতটা ভেতরে কেউ আসেনি। চারদিকে একটা ঠান্ডা হাওয়া বইছে। আশপাশ অদ্ভুত শান্ত। বশির মিয়াঁ এই স্পটটা দেখানোর জন্য কোনও অতিরিক্ত পয়সা চায়নি। আমি জিজ্ঞাস করি, “মিয়াঁ তুমি যে বড় আমার সঙ্গে থেকে সময় নষ্ট করছো, অন্য সওয়ারী খুঁজবে না?” মিয়াঁ বলে ওঠে, “সওয়ারী তো জরুর মিলবে সাব, লেকিন মানুষ সবসময় মেলে না। কেন জানি আপনাকে দেখে আলাপ করতে মন করল। তাই আপনাকে নিয়ে চলে এলাম।”
“কিন্তু মিয়াঁ অনেক সওয়ারী তো সূর্যাস্ত দেখার জন্যে এখনও আসছে! ওদের কাউকে আনলে তোমার আরও দুটো পয়সা হত।”
“বাবুজী, সাম কো সময় ম্যায় সওয়ারী নেহি লেতা। আমি অন্য উটওয়ালাদের সাথে কম্পিটিশন করিনা। একান্তে দাঁড়িয়ে থাকি। যদি কোনও ট্যুরিস্টকে মনে ধরে ডেকে নিই। তাতেই চলে যায়। সনসারে আমি আর আমার লক্ষ্মী ছাড়া আর তো কেউ নেই বাবুজী।”
এবার আমার প্রশ্ন করার পালা। “কেন? তোমার স্ত্রী…ছেলেমেয়ে!”




“উও বড় লম্বী কাহিনী বাবু। চলিয়ে বাবুজি.. সাঁঝ ঢল রাহা হ্যায়।” বুঝতে পারলাম রশিদ মিয়াঁর ঝুলিতে গল্প আছে। প্রথম দিনের আলাপের আড়ষ্টতায় ভাঙতে চাইছে না।
বালিয়াড়ির সীমানা ছাড়িয়ে পিচরাস্তায় ফিরে এলাম। ওনার পাওনা মিটিয়ে দিয়ে পিছন ফিরতেই বশির মিয়ার কন্ঠ ভেসে এল, “বাবুসাব, সিধা হোটেল চলা যাইয়ে, বিচমে মাত রুকিয়ে।” এই প্রথমবার লোকটার কথায় বিরক্ত হলাম। আরে আমি তো বাচ্ছা ছেলে নয়। চোখেমুখে সেই রেশ নিয়ে ফিরে তাকাতেই বশির মিয়াঁ বলে উঠলেন, “বাবু সাব, আন্ধেরে মে ইয়ে জাগা বহোত খতরনাক হ্যায়। খবরদার!” বলেই আমাকে কিছু বলার সুযোগ না দিয়ে উল্টো দিকে তার উটকে নিয়ে হনহন করে অন্ধকারে মিলিয়ে গেল।
পরের দিন একটা গাড়ি ভাড়া করে এখান থেকে একশো বিশ কিলোমিটার উজিয়ে তানোট মাতা মন্দির আর লাঙ্গেওয়ালা ঘুরে এলাম। বিকেলে ফিরে রশিদ মিয়াঁর পাত্তা লাগালাম। কাল রিসেপশনের ছেলেটিকে বশির মিয়াঁর চেহারার বর্ণনা দিতে চিনতে পারলো না। ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে গতকাল যেদিকে গিয়েছিলাম সেদিকে এগিয়ে গেলাম। কিছুক্ষণের মধ্যেই দোকানপাট, হোটেলের ভিড়ভাট্টা এড়িয়ে জনহীন প্রান্তরে পৌঁছলাম। আজ আকাশে মেঘ, আজকের সূর্যাস্ত মন কাড়তে পারবে না বোঝাই যাচ্ছে। বেশ কয়েক কিলোমিটার পথ অতিক্রম করতেই চোখে পড়ল দূরে মেদুর আলোয় বালিয়াড়ির বুকে একটা সিল্যুয়েট। সূর্যের দিকে মুখ করে একটি মানুষ আর উটের ক্যানভাস। তড়িঘড়ি এগিয়ে যাই। ঠিক ধরেছি, চোখ বুজে বশির মিয়াঁ অস্তগামী সুরিয়াদেবকে সুক্রিয়া জানাচ্ছে। আমি চুপচাপ দাঁড়িয়ে রইলাম। সূর্য দিগন্তরেখার পাড়ে মুখ লুকোলে মিয়াঁ মুখ তুলে তাকালো। আমাকে দেখে বিন্দুমাত্র অবাক হলনা। যেন আমার আসার অপেক্ষাতেই ছিল। মুখে এক অপার্থিব হাঁসি ফুটিয়ে বলল, “বাবুসাব, দুনিয়ামে সবসে আচ্ছা দৃশ্য কেয়া মালুম হ্যায়?” আমি অর্বাচীন মুখে চুপ করে থাকি। উত্তরের অপেক্ষায় না থেকে উনি বলে চলেন, “সুরজ দেওতা কা আগমন ওর বিসর্জন।” আমি একজন সাধারণ উটওয়ালার জীবন দর্শনে অবাক হয়ে যাই। আমাকে চুপ করে থাকতে দেখে বলে ওঠেন, “সুরজ ডুব গিয়া। আভি ইয়ে জাগা খতরনাক বন জায়েগা।” আমি বলি, “কেন বশিরজী, সন্ধ্যার পর এখানে কি হয়?” “মাত পুছিয়ে সাব, জো শো রাহা হ্যায় উসকো মত জাগাও।” আমি একটু ক্ষুন্ন হয়েই বলে উঠি, “এটা ঠিক হচ্ছে না মিয়াঁ। আমি যদি বিপদটা কি না জানি , তাহলে সাবধান কেন হবো?” কয়েক সেকেন্ড নিস্পলক চেয়ে থেকে কিরকম এক ভাঙা গলায় মিয়াঁ বলল, “কাল আপ মেরে ফেমিলিকি বারে মে জাননা চাতে থে না! শুননা চাতে হো? তব চলিয়ে মেরে ঘর।”
বশির মিয়াঁর ঘর বলতে একটা কুঁড়ে, মাথার খড়ের ছাউনি। দরজা এত নিচু যে মাথা নুইয়ে ঢুকতে হয়। ভিতরে কিছু অতি জীর্ণ কাঁথা-কানির বিছানা, তার উপরেই মিয়াঁ আমায় আহ্বান করে বসালো। টুপি আর লাঠি রেখে আমার পাশে বসলো। কিছুক্ষণ চুপ করে থাকার পর তার ঘড়ঘড়ে গলায় উঠে এল এক মর্মান্তিক ইতিহাস।
প্রায় হাজার বছর আগে এই জায়গা থেকে ২৪ কিলোমিটার দূরে থর মরুর কোলে একটা গ্রামের পত্তন হয়েছিল, যার নাম ছিল ‘কুলধারা’। জনশ্রুতি কড়হান নামের এক পালিওয়াল সম্প্রদায়ের ব্রাহ্মণ প্রথম সেই গ্রামে বসত স্হাপন করেছিলেন। তারপর আস্তে আস্তে পালিওয়াল সম্প্রদায়ের অন্যান্য ব্রাহ্মণদের আগমনে আশপাশে কুলধারাসহ আরও ৮৩টি গ্রাম গড়ে ওঠে। ১৮২৫ সালের রাখি পূর্ণিমার এক রাত্রে সমস্ত গ্রাম কি এক ভোজবাজিতে সম্পূর্ণ জনশূন্য হয়ে পড়ে। রাতারাতি কর্পূরের মত মিলিয়ে যায় প্রায় ১৫০০ অধিবাসী। এখন প্রশ্ন, এতগুলো মানুষকে কি কারণে সবকিছু ছেড়ে অনির্দিষ্টের পথে ভেসে যেতে হল? এর পিছনে আছে এক দুর্নিভ রাজনীতি। সেই সময়ে জয়সলমিরের সামন্ত শাসক ছিলেন সালিম সিংহ। সেই কামুক শাসক কুলধারা গ্রামের একটি মেয়ের প্রেমে পড়েছিলেন। তিনি মনস্থির করলেন, সেই কন্যাকে বিবাহ করবেন। খবর পেয়ে গ্রামবাসীরা তাঁর কাছে একরাতের জন্য সময় ভিক্ষা করেন। গ্রামবাসীদের চালাকি বুঝতে পারেলেন না সামন্ত। তিনি গ্রামবাসীর প্রস্তাবে সম্মতি দিলেন। পরের দিন অকুস্থলে পৌঁছে বাড়ির পর বাড়ি, গ্রামের পর গ্রামে একটিও মানুষ দেখতে পেলেননা; এমনকি কুকুর, শুয়োর গবাদি পশুগুলোও স্রেফ গায়েব হয়ে গেছে।
প্রায় সাড়ে পাঁচশো বছর ধরে তিলে তিলে গড়ে ওঠা কুলধারাসহ গ্রামগুলি রাতারাতি ভৌতিক গ্রামে পরিণত হল। লোকবিশ্বাস এই অঞ্চলে বিশেষ বিশেষ রাতে অলৌকিক সব ঘটনা ঘটে। সেই সময়গুলোতে আচমকা আশপাশের তাপমাত্রা কমে যায়। রাতের গহন অন্ধকার চিরে শোনা যায় মানুষের আর্ত চিৎকার। স্থানীয় মানুষদের বিশ্বাস, অতৃপ্ত আত্মারা এখনও তাদের গাঁয়ের মায়া কাটাতে না পেরে এলাকার চৌহদ্দিতে ঘুরে বেড়ায়।

এই কুলধারা গ্রামের সবচেয়ে কাছের গ্রাম হল সিলিকা। বেশি বড় নয়, খুব জোর কুড়ি-পঁচিশ ঘর মানুষের বাস। এদের মূল জীবিকা হল পশুপালন আর বালিয়াড়ির বুকে ট্যুরিস্টদের উটের পিঠে চড়ানো। বশির মিয়াঁর এই গ্রামেই জন্ম আর বেড়ে ওঠা। বয়ঃকালে বিয়ে হল চাচাতো বোন নাফিসার সঙ্গে, আর দু-বছরের মধ্যে আল্লা তাদের ফুলের মত এক শিশু উপহার দিলেন, আমিনা। আমিনাকে পেয়ে বশির-নাফিসা দুজনের জীবনে আর কোনও ক্ষোভ-খেদ রইলো না। দারিদ্র্য ছিল ভয়ানক, কিন্তু ছোট্ট আমিনার আধো আধো বুলি আর দিলখুস হাঁসি তাদের সব অভাব-কষ্ট-যন্ত্রনা দূর করে দিল। ছোট্ট আমিনা আস্তে আস্তে বড় হতে লাগল। দেখতে দেখতে একদিন সে এগারো বছরের কিশোরী হয়ে উঠল। আল্লা যেন প্রতিদিন তাঁর সাজঘরে বেটিকে সুন্দর থেকে সুন্দরতর করে সাজিয়ে তুলতে লাগলেন। একদিন মেয়ে বায়না ধরল, মেলা দেখতে যাবে। তাদের গাঁও থেকে পাঁচকিলোমিটার দূরে বারুনি গাঁয়ে প্রতিবছর মাঘের শুক্ল পঞ্চমীতে মেলা বসে। বহু দূর দূর থেকে মানুষ আসে সওদা করতে আর সামান বিক্রি করতে। দিন পনেরো ধরে এই মেলা চলে। মেয়ের আবদার রাখতে বশির মিয়াঁও বিবি-মেয়েকে সঙ্গে নিয়ে মেলা দেখতে চলল। গোরুর গাড়ি ভাড়া করার সামর্থ্য নেই, তাই পায়ে হেঁটেই বারুনি গ্রামের দিকে রওনা দিল। মেয়ের আনন্দ দেখে বশির মিয়াঁর পথ চলার কোনও কষ্ট রইলো না। ভোরবেলা রওয়ানা হয়ে তারা সকালসকালই মেলাপ্রাঙ্গনে পৌঁছে গেল। আড়েবহরে বেশ বড় মেলা, যাবতীয় জিনিসপত্রের কেনাবেচা হয়, গোটা মেলা এক চক্কর দিতেই একবেলা কেটে যাবে। তার ওপর মেয়ের আবদার নাগরদোলা চড়বে, পুতুল নাচ দেখবে। মেয়ের আবদার আর মেয়ের মায়ের সাংসারিক চাহিদা সওদা করতে করতে বেলা পড়ে এল। এবার বশির মিয়াঁ তাড়াহুড়ো শুরু করলেন, এতটা পথ ফিরতে হবে। অবুঝ মেয়েকে বুঝিয়েসুঝিয়ে বাড়ির পথে রওয়ানা হলেন।
দিনের আলোয় পথ যতটা আসান, রাতের অন্ধকারে ঠিক ততটাই খতরনাক। তাছাড়া বালির রাজ্য রাজস্থানে অধিকাংশ এলাকায় পথ বলে তো কিছু নেই, সূর্যের অবস্থান দেখে দিকনির্ণয় করতে হয়। তাই রাতের অন্ধকারে বেশ অসুবিধা হয়। তার উপর আমিনার শত সওয়ালের উত্তর দিতে দিতে বশির মিয়াঁ যে ভয়টা করছিল সেটাই ঘটল, তারা পথ হারিয়ে ফেলল। আজ আকাশ মেঘলা, গ্রহ-তারার অবস্থান দেখে পথ খুঁজে নেওয়াও যাচ্ছে না। কান্নাকাটি করার ভয়ে মিয়াঁ বিবি-বেটিকে কিছুকে জানালো না, শুধু আল্লাকে স্মরণ করে সামনের দিকে এগিয়ে চলল। পথ সমতল, তাই চলতে অসুবিধা হচ্ছেনা, তবে প্রায় একঘন্টা হাঁটার পরও বশির মিয়াঁ চেনা পথের হদিশ পেলেন না। আরও মিনিট পনের পর ছোট্ট আমিনা হতক্লান্ত হয়ে বালির ওপর বসে পড়লো, চোখ তুলে জিজ্ঞাসা করল, “আব্বু, অর কিতনে দূর? হামারা ঘর কেয়া গুসসা করকে দূর চলি গ্যয়ি!” মিয়াঁ প্রমাদ গনলেন। বিবির চোখেমুখেও জিজ্ঞাসা ফুটে উঠেছে। পরিস্থিতি সামলাতে মিয়াঁ বলে ওঠে, “জ্যাদা দূর নেহি বেটি, থোড়ি জলদি পা চালাও, তুরন্ত পৌঁছ যাউঙ্গি”। কিছুটা পর দূরে আলো দেখা গেল, মনে হল কোনও গ্রাম আসছে। বশির মিয়াঁ এখন একদম নিশ্চিত তারা পথ হারিয়েছে। এ পথে তো কোনও জনপদ ছিলনা। তবে একটা আশা, মানুষের সাথে মোলাকাত হলে পথের কোনও সুরাহা হতে পারে। আর বাড়ি ফিরতে না পারলে কোনও একটা আশ্রয়ও জুটে যেতে পারে।
গ্রামে পৌঁছে দেখল মানুষজন খুব উত্তেজিত। সবাইয়ের মধ্যে একটা ভীষণ তাড়া, ইতস্তত কয়েকজন দাঁড়িয়ে বা বসে ফিসফিস করে কিসব আলোচনা করছে। বশির মিয়াঁ কার কাছে পথের হদিশ জানতে চাইবে বুঝে উঠতে পারলো না৷ তিনজন ভিনদেশীকে দেখে কেউ কোনও কৌতূহল দেখাচ্ছে না। তাদের দিকে সেভাবে কেউ ধ্যানই দিচ্ছে না। মানুষগুলোর পোশাক-পরিচ্ছদ একটু অদ্ভুত ধরণের। বশির মিয়াঁরা যখন পৌঁছল তখন কাছের কোনও মন্দির থেকে শাঁখ ও ঘন্টাধ্বনি ভেসে এল। এত মানুষের মধ্যেও গোটা এলাকা জুড়ে একটা আদিম শূন্যতা বিরাজ করছে। এদিকে ওদিকে কিছু বিক্ষিপ্ত জটলা, মিয়াঁ সাহেব মরিয়া হয়ে একটা জটলার দিকে এগিয়ে নিজের সমস্যার কথা বললেন। মানুষগুলো যেন মৃত মানুষের চোখে তার দিকে তাকিয়ে রইল, কারোর চোখের পলক পড়লো না। তাদের মধ্যে একজন অদ্ভুত গলায় বলে উঠল, “ফেরার কোনও উপায় নেই!” তারপর আঙুলের সংকেতে একটা দিক দেখিয়ে বলল, “সরাইখানায় চলে যাও, রাতের আশ্রয় মিলবে।” ব্যাপারস্যাপার কেমন অদ্ভুত লাগল। কথা না বাড়িয়ে মিয়াঁসাব স্ত্রী-মেয়েকে নিয়ে সরাইখানার দিকে এগিয়ে গেল।




এর মধ্যেই সরাইখানা ঘিরে মধ্যরাতের স্তব্ধতা। বেশ কয়েকবার দরজার কড়া নাড়ার পর যে মানুষটা দরজা খুলে দিল তার বয়স আন্দাজ করা মুশকিল। শীর্ণ জীর্ণ শরীরে কোটরাগত চোখে তিনি ওদের কথা শুনলেন। তারপর বিনা বাক্যব্যয়ে হাত বাড়িয়ে একটা ঘর দেখিয়ে দিয়ে হাতে ঝোলানো লণ্ঠন নিয়ে অন্ধকারে মিলিয়ে গেলেন।
ঘরটি বেশ বড়। আসবাবপত্র পুরোনো ধরণের। সবকিছুতেই কেমন এক পুরোনো মনখারাপের গন্ধ আছে। তারা জীবনে কোনওদিন বাড়ির বাইরে রাত কাটায়নি। সঙ্গে যা চিড়েমুড়ি ছিল তাই খেয়ে তাড়াতাড়ি শুয়ে পড়ল। সারাদিনের পরিশ্রমে ঘুমও চলে এল। কতক্ষন ঘুমিয়ে ছিল জানেনা। একটা আওয়াজে মিয়াঁর ঘুম ভেঙে গেল। বাইরে প্রচুর মানুষের চিৎকার চেঁচামেচি শোনা যাচ্ছে, মনে হল কোথাও যেন আগুন লেগেছে। মানুষসব প্রাণভয়ে ছুটে পালাচ্ছে। মিয়াঁ ঘরের ভিতর থেকে কিছু বুঝে উঠতে পারলো না। নাফিসা-আমিনা নিশ্চিন্তে ঘুমোচ্ছে। ওদের ডাকবে না বাইরে গিয়ে ব্যাপারটা একবার দেখে আসবে বোঝার আগেই তাদের দরজায় জোর ধাক্কা। বাইরে কারোর উত্তেজিত গলা, “তুরন্ত ভাগ যাইয়ে….শয়তান আ রাহা হ্যায়।” মিয়াঁ প্রচন্ড ভয় পেয়ে দরজা খুলে দেখল, রাতের সেই বুড়ো ভদ্রলোক দৌড়ে বেরিয়ে গেলেন।

নাফিসার ঘুম ভেঙে গেছে, ঘুম ভাঙা চোখে আতঙ্ক। তাঁর নীরব জিজ্ঞাসার কোনও উত্তর না দিয়ে ঘুমন্ত মেয়েকে কাঁধে তুলে নিয়ে শুধু বললেন, “মেরে পিছে আ যাও।” রাস্তায় বেরিয়েই বুঝতে পারলো ভয়ংকর কিছু একটা ঘটেছে। মানুষজন উর্ধ্বশ্বাসে ছুটে চলেছে। তারাও কিছু না বুঝে ছুটন্ত মানুষগুলোকে অনুসরণ করলো। কিছুক্ষণ পর পিছনে ঘোড়ার খুরের আওয়াজ পেতেই মানুষজন ভয়ানক আতঙ্কে চিৎকার করে উঠল। মিয়াঁ পিছন ফিরে দেখল বড় বড় ঘোড়ায় চড়ে কিছু সৈন্য ঝড়ের গতিতে ভিড় লক্ষ করে এগিয়ে আসছে। অন্ধকারেও তাদের রাজকীয় পোশাক ঝলমল করছে। তাদের হাতে শোভা পাচ্ছে ইস্পাতের ঝকঝকে তলোয়ার। নিষ্ঠুরের মত সেই কৃপাণ চালাতে চালাতে মুহূর্তের মধ্যে দুর্বৃত্ত দল তাদের উপর ঝাঁপিয়ে পড়ল। বশির মিয়াঁ মেয়েকে কাঁধে নিয়ে নাফিসাকে একটা হ্যাঁচকা টানে পাশের জমিতে লাফ দেওয়ার আগেই কিছুতে হোঁচট খেয়ে পড়ে গেলেন। কাঁধ থেকে আমিনা ছিটকে পড়ল আর হাত ফসকে নাফিসা কোথায় গেল দেখতে পাওয়ার আগেই তাঁর মাথাটা শক্ত কিছুতে গিয়ে ধাক্কা খেল। তারপর কিছু মনে নেই, সব অন্ধকার।
কুঁড়েঘরের মধ্যে বরফ জমা ঠান্ডা। সেই ঠান্ডায় বশির মিয়াঁর গলাও আস্তে আস্তে জমে আসছে। কিছু পর একটা শব্দও গলা থেকে বেরোলোনা। বুঝলাম মিয়াঁ এখন বেশ কিছুক্ষণ অতীতে আটকে থাকবে। আমি উঠে পড়লাম। পিছন থেকে কেউ বললোনা, “বাবুজী সাবধান! রাত মে ইয়ে জাগা বহোত খতরনাক হ্যায়।”
“কুলধারা বিশেষ বিশেষ দিনে জেগে ওঠে। মানুষের বিশ্বাস এক রাতের মধ্যে সামন্তসেনাদের চোখে ধুলো দিয়ে অতগুলো মানুষ পালিয়ে গিয়েছিল। কিন্তু মাঝেমাঝে ঘটে চলা অতিপ্রাকৃত ঘটনা অন্য কথা বলে। জীবিত অবস্থায় হয়ত গ্রামবাসী সামন্ত সেনাদের চোখে ধুলো দিতে পেরেছিল, তাই মৃত্যুর পরে দ্বিগুন জিঘাংসায় তারা প্রতিশোধ নিতে ফিরে ফিরে আসে। তবে কবে কখন কুলধারা জেগে উঠবে কেউ বলতে পারে না। যে সমস্ত দুর্ভাগা মানুষ সেই অলৌকিক ঘটনার মধ্যে পড়ে যায় তাদের আমার মত নাফিসা-আমিনাদের হারাতে হয়।” মিয়াঁ চুপ করে যায়, আবার তার দৃষ্টি বালিয়াড়ির সীমানা পেরিয়ে দিগন্তে হারিয়ে গেল। স্তব্ধতা ভেঙে আমি জিজ্ঞাসা করি,
“মিয়াঁ আমাকে একবার ওই গ্রামে নিয়ে যাবে?”
বশির মিয়াঁর চোখে বিস্ময়, “কিউ?”
কেনর উত্তর না দিয়ে বলে উঠি, “সামনেই কৃষ্ণ চতুর্দশীর অমাবস্যা, তুমি আমাকে ওইদিন নিয়ে যাবে ওই গ্রামে?”
মিয়াঁ এতটাই অবাক হয়ে গেছে যে কিছুক্ষণ কথাই বলতে পারল না। আমি সেই সুযোগে আবার বলি, “কে বলতে পারে ওই রাত্রেই হয়ত কুলধারা জেগে উঠবে। যাবে মিয়াঁ?”
বিস্ময় গিলে ফেলে শেষপর্যন্ত বৃদ্ধ মানুষটা আমার চোখের দিকে তাকিয়ে প্রশ্ন করেন,
“বাবুজি আপ কা তবিয়ত তো ঠিক হ্যায় না!” আমি মিয়াঁকে উত্তেজিত করার জন্যে বলি,
“মিয়াঁ তুমি যদি আমাকে জীবন্ত কুলধারা দেখাতে পারো তবেই আমি তোমার সব কথা বিশ্বাস করবো। এরকম গল্পতো সব অঞ্চলেই কিছু না কিছু চালু থাকে। কি করে বুঝবো তুমিও আমাকে গল্প শোনাচ্ছ কি না?”
এই প্রথম মিয়াঁর কোটরাগত চোখ দপ করে জ্বলে উঠলো। আমার দিকে তাকিয়ে কেটে কেটে বললেন, “রাজপুতরা মিথ্যে কথা বলেনা। কিন্তু আপনি আমাকে চ্যালেঞ্জ করছেন। আমি আপনাকে নিয়ে যাবো। তবে কুলধারা ওই রাতে জেগে উঠবে কি উঠবেনা আমি গ্যারান্টি দিতে পারবো না। আর যদি কিছু ঘটে যায় তার দায়িত্ব আপনার”৷
আলো পুরোপুরি নিভে যেতে সাড়ে সাতটা বেজে গেল। বিস্তীর্ণ অঞ্চল জুড়ে শয়ে শয়ে বাড়ি ভাঙা কাঠামো নিয়ে দাঁড়িয়ে আছে। এইসব বাড়ির কঙ্কাল এলাকা জুড়ে আধিভৌতিক পরিবেশ তৈরি করেছে। আমরা এরকম একটা ভাঙাচোরা বাড়ির মধ্যে পাঁচিলের ওপর বসে আছি। আমিই কথা বলে যাচ্ছি, বশির মিয়াঁ এখানে আসার পর থেকেই একদম চুপ। প্রথম থেকেই তার চোখ চারদিকে কি যেন খুঁজে বেড়াচ্ছে। কতক্ষণ বসেছিলাম খেয়াল নেই, একসময় কিরকম ঘুম ঘুম পেতে লাগল। বাতাসে জুঁই ফুলের অপূর্ব সুগন্ধ। একটা ঘোরের মধ্যে ভাসতে ভাসতে যখন চেতনায় ফিরলাম তখন দেখলাম একটা মন্দির, আরতি হচ্ছে। ধুপ-ধুনোর গন্ধে চারদিক মথিত, ঘন্টা আর সংস্কৃত মন্ত্রের প্রাকৃত ধ্বনি পুরোনো মন্দিরের দেওয়ালে দেওয়ালে প্রতিধ্বনিত হচ্ছে। বশির মিয়াঁকে আশপাশে কোথাও দেখতে পেলাম না। আরতি থামতে সবাই একসাথে “জয়, ঐশী মাতা কি জয়!” ধ্বনি দিয়ে উপুড় হয়ে প্রণাম করল। আমি হাত তুলে প্রণাম করে দাঁড়িয়ে রইলাম। হঠাৎ খেয়াল হল এতক্ষন যে হালকা হাওয়াটা বইছিল সেটা বন্ধ হয়ে গেছে। চারদিকে একটা দমবন্ধ করা অনুভূতি। সবাই এত চুপ হয়ে গেল কেন দেখতে গিয়ে নজরে পড়ল, উপুড় হওয়া অবস্থাতেই কাত হয়ে সবাই একচোখে আমার দিকে চেয়ে আছে। সেই দৃষ্টির মধ্যে যে বীভৎসতা আছে সেটা আমাকে কাঁপিয়ে দিল। এতক্ষণ মন্দিরের মূর্তির দিকে চোখ পড়ল। দেবীর মাথাটা সিংহীর, আর সেই সিংহীর দুচোখ দিয়ে দুটো আগুনের পিন্ড গোল হয়ে ঘুরতে ঘুরতে আমার দিকে ধেয়ে আসছে। আমি প্রচন্ড ভয় পেয়ে পিছন ফিরে সিঁড়ি দিয়ে নামতে গিয়ে পায়ে পায়ে জড়িয়ে যখন একটা সিঁড়ি থেকে আরেকটা সিঁড়িতে ছিটকে পড়ছি, তখন উপস্থিত জনতার সমবেত কণ্ঠের পৈশাচিক হাঁসি আমার শরীরের সবটুকু জান নিংড়ে নিল।

চেতনায় ফিরে দেখলাম গ্রামের কেন্দ্রস্থলে বহু মানুষ জমায়েত হয়েছে। সবাই খুব উত্তেজিত হয়ে কিছু আলোচনা করছে, তাদের চোখেমুখে একইসঙ্গে গভীর চিন্তা ও ভয় খেলে বেড়াচ্ছে। কিছুটা দূরে অল্পবয়সী একটি মেয়ে আর একজন বয়স্কা মহিলা দাঁড়িয়ে। মেয়েটি মহিলার কাঁধে মাথা রেখে কেঁদে চলেছে। একজন ভদ্রলোক মাঝে মাঝে উঠে মেয়েটির মাথায় হাত বুলিয়ে সান্ত্বনা দিয়ে আসছেন। সময় পার হয়ে যাচ্ছে, এবার মনে হল মানুষগুলো কোনোকিছুর জন্য অপেক্ষা করছে। মাঝেমধ্যেই দূর প্রান্তরের দিকে তাকিয়ে কিছু দেখছে। বেশ কিছুক্ষণ পর দিগন্তের কাছাকাছি একটা ধুলোর ঝড় উঠল। কিছুক্ষণ পর বুঝলাম ওটা ধুলিঝড় নয়, কিছু ঘোড়সওয়ার দুরন্ত গতিতে ঘোড়া ছুটিয়ে এই গ্রামের দিকেই এগিয়ে আসছে। মেয়েটি আতঙ্কে চিৎকার করে মহিলাকে আঁকড়ে ধরল। ভদ্রমহিলা ওকে আড়াল করে পিছনের দিকে ছুটে পালিয়ে গেলেন। উপস্থিত মানুষগুলো উত্তেজনায় দাঁড়িয়ে পড়ল। দশ থেকে বারো জন সৈন্য ঘোড়া নিয়ে ঝড়ের মত সভার মাঝে এসে উপস্থিত হল। প্রত্যেকের হাতে উন্মুক্ত তরবারি, সূর্যের আলোয় ঝকমক করছে। ঘোড়ার পায়ের ঝাপটায় কত মানুষ ছিটকে পড়ল, আহত হল, সেসব ভ্রুক্ষেপ না করে অদ্ভুত ভাষায় শাসানির সুরে তাদের বক্তব্য বলে কঠিন চোখে তাকাতে তাকাতে ফিরে গেল। গ্রামের মানুষগুলোর চোখেমুখে ঘৃণা, ক্রোধ, প্রতিশোধ ইত্যাদি খেলে বেড়াতে লাগল। হঠাৎ সবার নজরে পড়ে গেলাম। সঙ্গে সঙ্গে প্রত্যেকের চোখে আগুন জ্বলে উঠল। ভুল করে আমাকে সামন্তের লোক ভেবে সবাই আমার দিকে একপা একপা করে এগিয়ে আসতে লাগল। আমি আতঙ্কে আশপাশে বশির মিয়াঁকে খুঁজলাম কিন্তু কোথাও তার পাত্তা পেলামনা। প্রাণভয়ে চিৎকার করতে করতে বালির উপর দিয়ে দৌড়তে লাগলাম। কিছুটা পর বুঝলাম আমি বালির মধ্যে ডুবে যাচ্ছি। চোরাবালি! আমি চোরাবালির মধ্যে আটকে পড়েছি! এতক্ষণ যাদের হাত থেকে বাঁচার জন্য ছুটছিলাম এখন তাদেরই কাছে হাত বাড়িয়ে কাতর চিৎকার জানালাম, “প্লিজ এখান থেকে আমাকে টেনে তোল, আমাকে বাঁচাও”। কেউ এগিয়ে এলোনা। সবাই মিলে কিছুটা দূরত্ব রেখে আমাকে ঘিরে গোল হয়ে দাঁড়ালো। আমি ক্রমশঃ ডুবে যাচ্ছি, আমার বুক, গলা, চিবুক, এবার নাকও ডুবে গেল। যখন চোখও ডুবে যাচ্ছে তখন তাদের সমবেত পৈশাচিক হাঁসি মরুভূমির আকাশ-বাতাস বিদীর্ণ হয়ে উঠল৷




সারা গ্রাম তটস্থ, এখানে ওখানে ছোট ছোট জমায়েত। নিজেদের মধ্যে ফিসফিস আলোচনা চলছে। কেউ দৌড়ে ঘরে ঢুকে আবার তড়িঘড়ি বেরিয়ে আসছে। সবাইয়ের শরীরী ভাষা বলছে কিছু একটা ব্যাপারে তারা খুব ভয় পেয়েছে। ভয়ানক কিছু একটা ঘটার প্রতীক্ষায় প্রহর গুনছে৷ সূর্য যত পশ্চিম আকাশে ঢলে পড়ছে, তত তাদের ব্যস্ততা বাড়ছে। সারা এলাকা জুড়ে কোনও কিছুর চরম প্রস্তুতি চলছে। একসময় সূর্য অস্ত গেল, অন্ধকার ঘন হয়ে এলো। কোনও বাড়িতে একটাও প্রদীপ জ্বললোনা। অন্ধকারের মধ্যেই মানুষগুলোর যেন আরও ব্যস্ত হয়ে উঠল। হঠাৎ চোখে পড়ল রাস্তা দিয়ে তিনজন মানুষ হেঁটে আসছে। তাদের হাতে বেশ কিছু জিনিসপত্র, দেখেই মনে হচ্ছে ভিনদেশী। একজন পুরুষমানুষ, একজন স্ত্রীলোক আর একটা বাচ্চা। লোকটি খুব ইতস্তত ভঙ্গিতে একটা জমায়েতের কাছে গিয়ে কিছু একটা জিজ্ঞাসা করল। কি জিজ্ঞাসা করল এত দূর থেকে শোনা গেলোনা। অন্ধকার এখন আরও গাঢ় হয়ে উঠেছে। তিনজনে আমি যেখানে দাঁড়িয়েই আছি সেদিকেই আসছে। কাছে আসতে আমি হতবাক হয়ে দেখলাম, বশির মিয়াঁ! সঙ্গে ওর বিবি আর বাচ্ছা! এটা কি করে সম্ভব? আমি স্থানকাল ভুলে চেঁচিয়ে উঠলাম, “মিয়াঁ আমি এখানে, তুমি কোথা থেকে আসছো?” মিয়াঁ আমার কথা শুনতে পেলোনা। কোনো উত্তর না দিয়ে আমাকে ছাড়িয়ে এগিয়ে গেল। আমি ওদের পিছু নিলাম। কিছুটা এগিয়ে একটা জীর্ণ বাড়ির কড়া নাড়ল বশির মিয়াঁ। বেশ কিছুক্ষণ পর এক অতি বৃদ্ধ ভদ্রলোক দরজা খুলে দিলেন। ওরা ভিতরে ঢুকে গেল, দরজা বন্ধ হয়ে গেল। আমি হতভম্ব হয়ে রাস্তায় দাঁড়িয়ে রইলাম।

কিছুক্ষণ পর চোখে পড়ল অন্ধকারের মধ্যে দলে দলে মানুষ মাঠ পেরিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে। গোটা এলাকায় একটাও আলো জ্বলেনি। অন্ধকারের মধ্যেই হাতড়ে হাতড়ে তারা যেন আত্মরক্ষার জন্য পালিয়ে যাচ্ছে। রাত যত বাড়ছে রাস্তায় পলাতক মানুষের সংখ্যা বাড়ছে। এমন সময় দূর থেকে অশ্বক্ষুরের শব্দ ভেসে এল। এতক্ষণকার কৃত্রিম স্তব্ধতা ভেঙে খানখান হয়ে গেল। মানুষ আতঙ্কে চিৎকার করতে করতে দিগ্বিদিক দৌড়তে লাগল। আমিও তাদের সঙ্গী হলাম। কিছুটা এগিয়ে দেখলাম বশির মিয়াঁও মেয়েকে কাঁধে নিয়ে আর বিবির হাত ধরে প্রাণভয়ে দৌড়চ্ছে। মুহূর্তের মধ্যে সেই কালান্তক ঘোড়সওয়ারের দল রে রে করতে করতে ঝাঁপিয়ে পড়ল। আমার চোখের সামনে রক্তের বন্যা বয়ে গেল। সেই রক্তস্রোতে ছিটকে গেল বশির মিয়াঁ, বিবি আর মেয়ে। তাদের রক্তাক্ত শরীর মাড়িয়ে শত শত ঘোড়া ছুটে গেল। স্রোত কমতে আমি এগিয়ে গিয়ে দেখলাম অজস্র ছিন্নভিন্ন মৃতদেহের মধ্যে মিয়াঁ, বিবি আর বাচ্চাটা শুয়ে আছে। আমি পথের উপরই বসে পড়লাম। আবার নাকে জুঁই ফুলের গন্ধ ভেসে এলো।
কথা হচ্ছিল যোধপুর বিশ্ববিদ্যালয়ের পুরাতত্ত্বের অধ্যাপক ড. ভরদ্বাজের সঙ্গে। আমি গতকাল যোধপুর এসেছি। এখানে পৌছেই ফোনে ওনার সাথে যোগাযোগ করেছি। ওর কাছেই শুনলাম কুলধারা নিয়ে লৌকিক, ঐতিহাসিক, রাজনৈতিক এবং সামাজিক বিশ্বাসগুলো। সবগুলোই আলাদা আলাদা। ঐতিহাসিকরা এখনও ঠিক করতে পারেননি কোনটা আসল কারণ। উনি আমার গল্প বিশ্বাস করলেন কিনা জানিনা। শুধু স্যাম ডিউনসের কেউই বশির মিয়াঁর কোনও সন্ধান দিতে পারেনি। মরু ছেড়ে আসার সময় আমি বাতাসের উদ্দেশ্যে স্যালুট ঠুকে মনে মনে বলেছি, মিয়াঁ তুমিই তাহলে চ্যালেঞ্জটা জিতে নিলে। তোমাকে আমি ভুলবো না৷

 

কলকাতা, পশ্চিমবঙ্গ, ভারত।

এই লেখাটি শেয়ার করুন