রক্তকান্না

সৌর শাইন

অরণ্যের বুক চিরে ঢাকার উদ্দেশ্যে ছুটে চলেছে সম্রাট পরিবহন! জানালার পাশে বসে নিশ্বাস নিচ্ছে সৌরুদ্র! সবুজের সাম্রাজ্য ভাওয়ালগড়, শালবৃক্ষের সমারোহ চোখে স্নিগ্ধতার ঝাপ্টা ছড়ায়। কপালে হাওয়ার ঘূর্ণি বাবরি চুলগুলোকে উড়ালপঙ্খির মতো বাঁধনহারা করে দেয়।

গ্রামে কটা দিন বেড়াতে এসেছিল সৌরুদ্র, দুদিন না যেতেই কিন্তু একটি ফোনকল ওকে চুম্বকের মতো টেনে নিয়ে যাচ্ছে শহরে। মায়ের বারণ উপেক্ষা করে সে ব্যাচেলর জীবনের অনুষঙ্গ কটা বই-কাপড় গুছিয়ে গাড়িতে চড়ল। সবে ওর স্নাতক দ্বিতীয় বর্ষ পা দেয়া! সেশনজটের শিক্ষা জীবন হলেও, এই শহর ওকে ভালোবাসা কম দেয়নি। এই ফোনকল সেই অসীম ভালোবাসারই এক অনন্য মাধুর্য বাঁধন!

চাপা আনন্দ ওর বুকে উথাল-পাথাল ঢেউ খেলছে। এর আগেও কয়েকবার ফোনকল এসেছিল, প্রথমবার মিস করার পর মাত্র দু’বার সাড়া দিতে পেরেছিল। যখন প্রথমবার সে সাড়া দিয়েছিল কিছু মানুষের কান্না জড়ানো ভালোবাসা এনে দিয়েছিল প্রশান্তির স্রোত! ওই লোকটা পরিপূর্ণ সুস্থ হয়ে বাড়ি ফিরেছিল। এতে কি যে আনন্দ তা বলে বোঝানো সম্ভব নয়!

দ্বিতীয় বার ডাক এসেছিল এক নিষ্পাপ শিশুর জন্য। অতঃপর সেই শিশুর মুখে হাসি ফিরে আসার সংবাদ ওকে সীমাহীন আনন্দ দিয়েছিল। এ যেন অনন্ত সুখের পাথেয়! ঐ শিশুর মায়ের তৃপ্তিভরা কণ্ঠস্বর ওকে দিয়েছিল জগতের সেরা উপহার!

হাতঘড়ির দিকে তাকায় সৌরুদ্র! শহরের যানজট একরকম বিদঘুটে লাগে, আবার থমকে থাকা গাড়ি যখন চলতে শুরু করে তখন স্বস্থি!

দুপুর ফুরিয়ে লালচে আভা বিকেল জুড়ে। গুলিস্তান এসে গাড়ি থেকে নেমে রিকশায় চড়ে সৌরুদ্র চাঁনখারপুল, হোসনি দালান রোড পৌঁছায়। ইমাম বাড়ার সামনেই ওর মেস, দোতলা বাড়ি। এখানেই ওর ব্যাচেলর জীবনের চলমান গতি রেখা!

ফ্রেশ হয়ে সে ছুটে যায় হোটেলে, দুপুরের খাবার খেয়ে নেয়। মেস সুপারকে কল করে রাতের খাবারের মিল কনফার্ম করে। হোটেল থেকে বেরিয়েই সে ঢাকা মেডিকেল ইউনিট বি নতুন ভবনের উদ্দেশ্যে পা বাড়ায়। এরই মাঝে ফোনকলে সে জানিয়ে দেয়, ও ঢাকায় চলে এসেছে। দুশ্চিন্তার কারণ নেই। স্রষ্টার ইচ্ছায় সবকিছু মঙ্গলজনক হবে নিশ্চয়ই।




গেইটের কাছে গিয়ে দ্বিতীয়বার কল দিতেই এক ভদ্রলোক এসে ওকে স্বাগত জানায়। পরনে প্যান্ট-শার্ট, উনি চাকুরিজীবীই বোধ হয়। লোকটা সৌরুদ্রকে ভালো মন্দ জিজ্ঞাসা, দুপুরের খাবার খেয়েছে কিনা, কোথায় পড়াশোনা প্রভৃতি কুশলাদি বিনিময় করে। সৌরুদ্র ভালো থাকার কথা নিশ্চিতভাবে জানায়। কথা বলতে বলতে লোকটা এক পলকে কয়েক প্যাকেট জুস, বিশুদ্ধ পানি ও খাবার স্যালাইন কিনে নেয়।

জুসের প্যাকেট সৌরুদ্রকে এগিয়ে দিয়ে বলে, ভাই খেতে থাকেন। আমি স্যালাইনটা পানিতে মিশিয়ে দিচ্ছি, ওটাও খেয়ে নিবেন।

কয়েক মিনিট পর গেইটের পাশে মসজিদ থেকে কাঁচা-পাকা চাপদাড়ি, পাঞ্জাবি পরা একটা লোক বেরিয়ে ওদের দেখেই এগিয়ে আসে। উনার বুঝতে দেরি হয় না, সৌরুদ্র কেন এসেছে।

‘বাবা, ভালো আছো?’ বলে লোকটা সৌরুদ্রের দিকে হাত বাড়িয়ে দেয়। অমায়িক হাসিতে ঝলমল করে উঠে চারপাশ।

-আমার ছোটো ছেলেটার পেটে একটা টিউমার হইছে। সবকিছু ঠিক থাকলে তার আজ রাইতেই অপারেশন হওয়ার কথা! বাকিডা আল্লার ইচ্ছা!

ওরা সৌরুদ্রকে নিয়ে চারতলায় পৌঁছায়। প্যান্ট-শার্ট পরা লোকটা অতি আন্তরিকতার সাথে অভয় দেয়, খাবার স্যালাইন পান করতে বলেন। একজন সিস্টার ওর বিপি, তাপমাত্রা ও ওজন মেপে নেয়। জিজ্ঞেস করে, ভরা পেটে আছেন তো?

সৌরুদ্র ‘হ্যাঁ’ বাচক সাড়া দেয়।
আপনার নাম বলুন।
সৌরুদ্র মজুমদার।
ডাক্তার ফরমে নাম লিখে। সেই সাথে বয়স ও কোনো ধরনের মেডিসিন খাচ্ছে কিনা সে ব্যাপারে নিশ্চিত হয়।

সৌরুদ্র বুঝতে পারে অভয় দেয়া সেই ভদ্র লোকটি ওর পাশ থেকে সরে গেল। বাইরে দাঁড়িয়ে পাঞ্জাবি পরা লোকটার সাথে কথা বলছে। ফরম পূরণ শেষ হতেই সে চেয়ার ছেড়ে পাশের বেঞ্চে বসে। হাতে থাকা বোতল থেকে খাবার স্যালাইন পান করতে থাকে। অপেক্ষা এখন বেডে যাবার। তারপর রক্তসূত্রের উৎসর্গে প্রশান্তি প্রাপ্তির অনুরণন! এবি পজেটিভ!
ঐ ভদ্রলোক ও কাঁচা-পাকা দাড়ির লোকটা দূরে দাঁড়িয়ে কথা বলছে। লোকজনের ভিড় কোলাহলে অস্পষ্ট ওদের কথা শোনা যাচ্ছে। সৌরুদ্র ওদের দিকে এগিয়ে যেতেই কথাগুলো আরো স্পষ্ট হয়।

পাঞ্জাবি পরা লোকটা বলছে,‘তুই কনফার্ম এই ছেলে বিধর্মী?
প্রতিউত্তরে পাশের ভদ্রলোক বলছে,‘নামে তো হেইডাই বোঝা যায়।’
‘বিধর্মীর রক্ত তো পোলার লাইগ্যা নিতে পারি না। দেশে তো রক্তের আকাল পড়ে নাই। দরকার হয় অপারেশনের ডেট পিছায়া দিমু। আর মউত অইলে অইবো, বিধর্মীর রক্ত দিয়া নিজের সন্তানরে জাহান্নামে যাওয়ার বন্দোবস্তু করনের দরকার নাই।’





সৌরুদ্র থমকে দাঁড়ায়! এদিকে দুজনই ফরম লেখা রক্তদাতা আগুন্তুকের নাম আবার দেখে। হঠাৎ ওদের নজর পড়ে পাশেই দাঁড়ানো সৌরুদ্রের উপর। পাঞ্জাবি পরা লোকটা সেই অমায়িক হাসি হেসে বলেন, বাবা আরেকজন এবি পজেটিভের ব্লাড ডোনার পাওয়া গেছে। তাই আর কি.. তোমার.. আর কষ্ট করতে হইবো না।’

অমায়িক হাসির আড়ালে কেমন তাচ্ছিল্য ঘৃণা ঠিকরে পড়তে থাকে ঝড়ের মতো।
সৌরুদ্র বলে, ঠিক আছে আঙ্কেল বুঝতে পেরেছি।
ঠিক আছে বাবা। তুমি যাও তাইলে।

সৌরুদ্র নিয়তি মেনে নেয়। ব্লাড ব্যাংক এরিয়া ছেড়ে সে একপা-দুপা করে এগোতে থাকে। ও কখনো ভাবতে পারেনি, নাম ওকে এতটা দূরে সরিয়ে দেবে, অমুসলিম হিসেবে সন্দেহ করবে।
অমায়িক হাসির কি চমৎকার কৌশল ওকে বিদেয় করে দিলো!
সৌরুদ্র মুহূর্তে একবার ভাবে, ওদের তো ব্লাডটা খুব প্রয়োজন, ফিরে গিয়ে কি সে বলবে ও মুসলিম, মুসলিম পরিবারেই ওর জন্ম, আর মজুমদার তো হিন্দু-মুসলমান সবারই বংশ পরিচয় হিসেবে পরিচিত। সৌরুদ্র ব্লাড ব্যাংকের দিকে আবার পা বাড়ায়। মনের ভেতর ঘূর্ণিঝড় উঠা-নামা করে। গিয়ে বললেই কি ওরা বিশ্বাস করবে? ছদ্মবেশী হাসির দেয়াল টপকাতে পারবে?

আবার সে থমকে যায়। ভাবে, না সে যাবে না। যেখানে ওর মানুষ পরিচয়েরই মূল্য নেই সেখানে স্বপ্রণোদিত হয়ে মুসলিম পরিচয় দেয়া কী এমন গুরুত্ব বহন করবে?
রোগীদের ভিড় ঠেলে হাঁটতে হাঁটতে ওর চোখ ঝাপসা হয়ে আসে। বৃষ্টির মতো কান্না নামতে চায়!
সৌরুদ্র লিফটে প্রবেশ করে, ও নামতে থাকে নিচে, জগতের অতল গহ্বরে!

সম্পাদক, গল্পপথিক ।

এই লেখাটি শেয়ার করুন