পঞ্চম ব্যক্তি – তানভীর আহমেদ সৃজন

পঞ্চম ব্যক্তি - তানভীর আহমেদ সৃজন

তানভীর আহমেদ সৃজন

“ধুরর! শুধু শুধু সময় আর কতগুলো জ্বালানি অপচয় করে এলাম আমরা!” মুখ বাঁকিয়ে বলল রিকি, “কাজের কাজ কিছুই হলো না!”

রিকির কথা শুনে ঘাড় ঘুরিয়ে তার দিকে তাকালো পার্থ। রিকির চেহারায় হতাশার ছাপ-ই বলে দিচ্ছে, মুখে সময় নষ্ট কিংবা জ্বালানির অপচয়ের কথা বলে আফসোস করলেও প্রকৃতপক্ষে তার আফসোস ওসব নিয়ে নয়। তার আফসোসটা মূলত হচ্ছে এই কারণে যে এত আশা নিয়ে তারা যেই প্রজেক্টের কাজে মহাকাশে পাড়ি জমিয়েছিলো, সেই প্রজেক্ট পুরোপুরি ব্যর্থ হয়েছে। যেই মহাকাশযানে চড়ে তারা এসেছে, সেই মহাকাশযানের চারজন মহাকাশচারী-ই এই প্রজেক্টটা নিয়ে অনেক আশাবাদী ছিলো। কিন্তু চারজনের ভেতরে সবচেয়ে বেশি আশাবাদী ছিলো এই রিকি।

“আহা! এত হতাশ হচ্ছো কেন?” রিকিকে সান্ত্বনা দিয়ে বলল বিটা-৭১ মহাকাশযানের একমাত্র বাংলাদেশি নভোচারী পার্থ। “আমাদের প্রজেক্টটা ফেইল করেছে তো কী হয়েছে? নতুন একটা অভিজ্ঞতা তো আমাদের হলো!”

পার্থর দিকে তাকালো রিকি। তারপর শীতল গলায় বলল, “পার্থ, এত অর্থ ব্যয় করে এত জ্বালানি পুড়িয়ে এত সময়ক্ষেপণ করে আমাদেরকে যে পৃথিবী থেকে এত দূরে পাঠানো হয়েছে, সেটা কিন্তু স্রেফ কোনো নতুন অভিজ্ঞতা অর্জনের জন্যে নয়। কেন পাঠানো হয়েছে, সেটা তুমি বেশ ভালো করেই জানো।”

রিকির কথা উড়িয়ে দেবার ভঙ্গিতে পার্থ বলল, “আরে বাদ দাও না! এই অসীম ইউনিভার্সে আরো কোটি কোটি নক্ষত্রপুঞ্জ আছে, এবং সেসব নক্ষত্রপুঞ্জে আরো সহস্র কোটি গ্রহ আছে। এদের ভেতর একটা না একটা এমন গ্রহ তো পাওয়া যাবেই যেটা কিনা পৃথিবীর মতই মানুষের বসবাসের উপযোগী!”

ছোটরা অর্থহীন কিছু বললে বড়রা যেভাবে তাদের দিকে তাকায়, রিকি বেশ কিছুক্ষণ পার্থর দিকে ঠিক সেভাবেই তাকিয়ে রইলো। তারপর আর কোনো কথা না বলে অন্য দিকে তাকিয়ে চুপচাপ বসে কী যেন ভাবতে লাগলো।

মাত্রাতিরিক্ত জনসংখ্যায় ভারাক্রান্ত পৃথিবী দিনকে দিন বসবাসের অনুপযোগী হয়ে উঠছে। একদিকে জনসংখ্যা ক্রমশ বেড়েই চলেছে, আরেকদিকে পরিবেশ দূষিত হয়েই যাচ্ছে। একদিকে বিশেষ কিছু গোষ্ঠীর অন্তর্ভুক্ত মানুষেরা জন্মনিয়ন্ত্রণ করতে নারাজ শুধুমাত্র তাদের নানান রকম অন্ধবিশ্বাসের কারণে, আরেকদিকে বেশিরভাগ মানুষই প্রচণ্ড রকমের উদাসীন পরিবেশ দূষণ রোধের ব্যাপারে। গত প্রায় বিশ-পচিশ বছর ধরে এভাবেই চলছে পৃথিবী। বছর দুয়েক আগেই আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থা অর্থাৎ World Health Organization(WHO) ঘোষণা দিয়েছে, “যে হারে জনসংখ্যা বাড়ছে এবং পরিবেশ দূষিত হচ্ছে তা যদি এখনই নিয়ন্ত্রণের মধ্যে নিয়ে আসা না যায় তবে আগামী একশো বছরের মধ্যে পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ মানুষকে পৃথিবী থেকে অন্যত্র স্থানান্তরিত করা ছাড়া আর কোনো উপায় থাকবে না।”

কাকতালীয়ভাবে আন্তর্জাতিক স্বাস্থ্য সংস্থার সেই ঘোষণার কিছুদিন পরই ডব্লিউএসআরও অর্থাৎ ওয়ার্ল্ড স্পেস রিসার্চ অর্গানাইজেশন-এর একটি দলের চোখে ধরা পড়ে যায় সৌরজগত থেকে বেশ খানিকটা দূরের একটা নক্ষত্রপুঞ্জের একটি গ্রহ, যেটি দেখতে হুবহু পৃথিবীর মত! গ্রহটা আবিষ্কার হতে না হতেই ডব্লিউএসআরও থেকে সিদ্ধান্ত নেয়া হয় তিন-চারজনের একটা দলকে পাঠানো হবে গ্রহটা সম্পর্কে কিছু প্রয়োজনীয় তথ্য বিশেষ করে সেখানকার বাতাসে পর্যাপ্ত পরিমাণে অক্সিজেন আছে কিনা, অক্সিজেনের যোগান দেয়ার জন্য পর্যাপ্ত গাছপালা আছে কিনা ইত্যাদি তথ্য সংগ্রহ করে আনার জন্য। যদি দেখা যায় যে গ্রহটা মানুষসহ পৃথিবীর অন্যান্য প্রাণীদেরও বসবাসের উপযোগী, তাহলে যত দ্রুত সম্ভব পৃথিবীর এক তৃতীয়াংশ জনসংখ্যাকে সেখানে স্থানান্তরের ব্যবস্থা করতে হবে। সেই সঙ্গে অন্যান্য অনেক প্রাণীকেও পৃথিবী থেকে সেই গ্রহে স্থানান্তরিত করতে হবে বাস্তুসংস্থানের ভারসাম্য রক্ষার স্বার্থে। তা নাহলে পরবর্তী একশো বছরের মধ্যে পৃথিবীর যে অবস্থা দাঁড়াবে তাতে বর্তমান পৃথিবীর মোট জনসংখ্যার অর্ধেকেরও বেশি লাশ গুণতে হবে!

অতঃপর যেই ভাবা সেই কাজ। ৩১শে মার্চ, ২০৪১ তারিখে চারজন মহাকাশচারীর একটি দলসহ পৃথিবীর সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত মহাকাশযান বিটা-৭১কে পাঠানো হয় অজানা সেই গ্রহটির উদ্দেশ্যে। প্রায় নয় মাস সময় লেগে যায় মহাকাশযানটির সৌরজগতের সীমানা পেরোতে। তারপর আরো সাত মাসে বিটা-৭১ মহাকাশযানটি সেই অজানা গ্রহটির কাছে গিয়ে পৌঁছায়। গ্রহটির চারদিকে বেশ কয়েকবার প্রদক্ষিণ করে তারপর গ্রহটির মাটিতে অবতীর্ণ হয় বিটা-৭১। খুব আশা নিয়ে মহাকাশযানটির ভেতর থেকে বাইরে বেরিয়ে এসে অজানা গ্রহটির মাটিতে পা রাখে একে একে তারা চারজন।

কিন্তু মাটিতে পা ফেলতে না ফেলতেই একরাশ হতাশা গ্রাস করল চারজনকেই। দূর দূরান্ত পর্যন্ত প্রাণের কোনো ছিটেফোটাও নেই! গাছপালা কিছু আছে বটে, কিন্তু তাও মৃত। পায়ের নীচের মাটি চৌচির এবং প্রচণ্ড খড়খড়ে। এ মাটিতে গাছপালা জন্মানো কোনোভাবেই সম্ভব না!

পার্থ তবুও খানিকটা আশা নিয়ে বলেছিলো, “চলো সামনে এগিয়ে দেখি। সামনে হয়ত প্রাণের অস্তিত্ব পাওয়া যেতেও পারে।”

পার্থর প্রস্তাবে রাজি হয়ে গিয়েছিলো বাকি তিনজন। মহাকাশযানটি যেখানে দাঁড়িয়ে আছে, সেখান থেকে পায়ে হেটে একদিকে এগোতে শুরু করেছিলো চারজন একসঙ্গে। পার্থর হাতে বেরিয়ে এসেছিলো ছোট একটা অ্যান্টেনাসমেত একটা ট্যাব, সেটার স্ক্রীণের দিকে তাকিয়ে থেকেই বাকিদের সঙ্গে তাল মিলিয়ে হাটছিলো সে। তারা কতক্ষণ এভাবে হেটেছিলো সেটা তারা নিজেরাও জানে না। অনেকটা পথ হাটার পর তারা থেমে দাঁড়িয়েছিলো একটা পাহাড়ি এলাকায়। সেখানে দূর দূরান্ত পর্যন্ত দেখা যায় সুউচ্চ পর্বতমালা, কিন্তু প্রাণের ছিটেফোঁটা নেই সেখানেও! এমনকি পাহাড় পর্বতগুলোর গায়ে কোনো এককালে জন্মানো গাছপালাগুলোও মরে শুকিয়ে পড়ে আছে।

“স্যার, ঐ দেখুন!” চার নভোচারীর ভেতর একজন মারফি, সে তার ডানহাতের তর্জনী তুলে খানিক দূরে একটা পাহাড়ের দিকে দেখিয়ে বলেছিলো, “ঐ পাহাড়টার গায়ে একটা গুহা দেখা যাচ্ছে!”

রিকি মারফির আঙুলের ইশারা অনুসরণ করে সেদিকে তাকাতেই দেখতে পেয়েছিলো পাহাড়টা, সেই সঙ্গে দেখতে পেয়েছিলো পাহাড়ের গায়ের প্রকাণ্ড গুহামুখটাও। ওদিকে পার্থ যেন মারফির কথা শুনতেই পায় নি, তার পুরো মনোযোগ তখন তার ট্যাবের স্ক্রীণের দিকে।

এই গ্রহের মাটিতে পা রাখার পর থেকে তখনো পর্যন্ত যে একটি কথাও বলে নি, সে হচ্ছে চাইনিজ নভোচারী ইয়ান। সে প্রথমে পার্থর দিকে তাকালো। পার্থর চোখের দৃষ্টি তখনও সেটে আছে তার হাতে ধরে রাখা ট্যাবের স্ক্রীণের ওপর। এরপর সে তাকালো রিকির দিকে। বলল, “স্যার, আমরা কি একবার গুহাটার ভেতরে চেক করে আসব? মানে ওটার ভেতরে যদি কিছু পাওয়া যায় আরকি!”

“এতদূর এসেও তো কিছুই পেলাম না,” হতাশ গলায় রিকি বলেছিলো, “এখন এই গুহার ভেতরে গিয়ে আর কী পাবে?!”

“হয়ত কিছুই পাবো না স্যার।” জবাবে মারফি বলেছিলো, “কিন্তু তবুও একবার দেখে আসলে পরে অন্তত এই আফসোসটা হবে না যে ঐ গুহাটাতে একবার ঢুকে দেখলে কিছু হয়ত পেয়েও যেতে পারতাম।”

“হুম। এটা অবশ্য ঠিকই বলেছো।” গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে বলল রিকি। তারপর ইয়ানের দিকে তাকিয়ে বলল, “ইয়ান তুমি যাও গুহাটার ভেতরে। গিয়ে যদি কিছু পাও তবে তোমার যোগাযোগ মডিউল থেকে সবুজ আলোর সিগন্যাল পাঠাবে। আর যদি কোনো রকম বিপদের সম্মুখীন হও তবে লাল আলোর সিগন্যাল পাঠাবে। ঠিক আছে?”

“ঠিক আছে স্যার।” বলেই গুহাটার উদ্দেশ্যে হাটা ধরেছিলো ইয়ান। ওদিকে রিকির পাশে মুখ ভার করে দাঁড়িয়ে ছিলো মারফি। একজন মহাকাশচারী হিসেবে জীবনে বড় রকমের অন্তত একটা অর্জনের চিহ্ন রেখে যাওয়ার স্বপ্ন তার সেই ছোটবেলা থেকেই। এই স্বপ্ন পূরণের আশা নিয়েই এই গ্রহে নামার আগে একবার সে রিকিকে অনুরোধ করেছিলো এই গ্রহের মাটিতে তাকে প্রথম পা রাখতে দেয়ার জন্যে। রিকি কেবল চোখ গরম করে একবার তাকিয়েছিলো মারফির দিকে, তারপর থেকে দ্বিতীয় আর কোনো কথাই সে বলে নি পাহাড়ের গায়ে গুহাটা দেখার আগে পর্যন্ত। সে আশা করেছিলো, গুহাটার ভেতরে যদি প্রাণের অস্তিত্ব থেকে থাকে তবে তা আবিষ্কারের কৃতীত্বটা তারই হবে। কিন্তু পরমুহুর্তেই বিষদৃষ্টিতে তাকিয়ে সে দেখেছিলো, সেই কৃতীত্ব তার কাছ থেকে ছিনিয়ে নিতে গুহাটার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে ইয়ান!

“শুধু শুধু গুহাটার ভেতরে গেলো ইয়ান।” ইয়ান অন্ধকার গুহাটির ভেতরে মিলিয়ে যাওয়ার কয়েক মুহুর্ত বাদে ট্যাবের স্ক্রীণ থেকে মুখ তুলে পার্থ বলেছিলো, “ঐ গুহা কেন, পুরো গ্রহেই কোনো প্রাণীর টিকিটাও পাওয়া যাবে না।”

রিকি এবং মারফি জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে তার দিকে তাকালে সে তার ট্যাবটা রিকির দিকে এগিয়ে দিয়ে  আবার বলেছিলো, “দ্যাখো এই গ্রহের এটমোস্ফিয়ার টেস্টের রিপোর্ট। এতক্ষণ ধরে এটাই বের করলাম।”

ট্যাবটা হাতে নিয়ে স্ক্রীণের দিকে তাকাতেই চক্ষু চড়কগাছ হয়ে গিয়েছিলো রিকির। চোখ বড় বড় করে সে তাকিয়েছিলো পার্থর দিকে।

“একি! এখানকার বায়ুমন্ডলে অক্সিজেনের পরিমাণ মাত্র শূণ্য দশমিক শূণ্য এক শতাংশ?!”

“হ্যাঁ। অক্সিজেন একেবারে নেই বললেই চলে।”

“তো এই এটমোস্ফিয়ার টেস্ট করার কথা আমরা এত লম্বা পথ হাটা শুরু করার আগে মনে পড়ে নি তোমার?” বিরক্ত কণ্ঠে বলেছিলো রিকি।

“মনে পড়েছিলো।” পার্থ জবাবে বলেছিলো, “কিন্তু তখন টেস্ট করে রিপোর্ট পেয়ে গেলে আর এতটা পথ দেখতে দেখতে আসা হত না।”

“তাহলে আরো পরে টেস্ট করতে! আরো অনেকটা পথ হাটা হত, আরো ঘোরাঘুরি হত!”

“তা হত বটে। কিন্তু এখনই টেস্ট করলাম দু’টো কারণে।” রিকি চটে উঠলেও পার্থ অত্যন্ত ঠাণ্ডা মাথায় ব্যাখ্যা করার ভঙ্গিতে বলেছিলো, “প্রথমত, এতটা পথ এসেও যখন কোথাও প্রাণের কোনো অস্তিত্ব চোখে পড়ল না, তখন ভাবলাম যে একটু দেখি এই গ্রহের পরিবেশ আদৌ কোনো প্রাণীর থাকার উপযোগী কিনা। আর দ্বিতীয়ত, আমাদের সবার অক্সিজেন সিলিন্ডারেই অক্সিজেন কমে আসছে। তাই এটাও ভাবলাম যে দেখি অক্সিজেন মাস্কগুলো খুলে ফেললে এখানকার বায়ুমণ্ডলে নিঃশ্বাস নেয়ার মত পর্যাপ্ত অক্সিজেন আছে কিনা। মূলত এই দু’টো কারণেই টেস্টটা করা।”

পার্থর কথাগুলো শুনে বেশ কিছুক্ষণ স্থির দৃষ্টিতে তার দিকে তাকিয়ে থেকে শুধুই একটা দীর্ঘঃশ্বাস ফেলল রিকি, মুখে কিছুই বলল না। নিজের সহকর্মীর এহেন পাগলামী সে আজকেই প্রথম দেখছে, গত চার-পাঁচ বছর ধরেই দেখছে। এত বছর পরে তার নতুন করে আর কিছুই বলার নেই।

“স্যার, আমরা কি তাহলে এখন ফিরে যাবো?” মারফির প্রশ্ন।

“হ্যাঁ,” উত্তরে রিকি বলেছিলো, “হ্যাঁ, ইয়ান ফিরে এলেই আমরা আমাদের স্পেসশিপের দিকে রওনা হব।”

রিকির কথা শেষ হতে না হতেই গুহার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসে ইয়ান, তার চোখেমুখে হতাশার ছাপ স্পষ্ট। আর তা দেখে আনন্দে ঝলমল করে ওঠে মারফির সমস্ত মুখমণ্ডল।

“গুহার ভেতরে গিয়ে কিছুই পেলাম না স্যার!” ইয়ান পার্থ আর রিকির সামনে এসে দাঁড়িয়ে ক্লান্ত স্বরে বলেছিলো, “শুধু একটা ছোটখাট জলাশয় দেখলাম, যেখানে অল্প কিছু পানি ছিলো। কিন্তু হাত দিয়ে স্পর্শ করে দেখি যে সেই পানিও দূষিত। কেমন যেন আঠালো আর থকথকে!”

রিকি কিছুই বলল না। পার্থ বলল, “হুমম। এ গ্রহে আর কিছু পাবেও না। শুধু মানুষ কেন, আমাদের পৃথিবীর কোনো প্রাণী-ই এই গ্রহে এসে কয়েক সেকেন্ডের বেশি সময় বাঁচতে পারবে না।” পার্থর কথা শুনে ইয়ান অবাক হয়ে তার দিকে তাকিয়ে থাকলে পার্থ ইয়ানকে সব খুলে বলে। তারপর বলল, “অতএব বুঝতেই পারছো, এখানে আমাদের আর কোনো কাজ নেই। চলো ফিরে যাওয়া যাক।”

অতঃপর তারা চারজন হাটা ধরে তাদের মহাকাশযান বিটা-৭১ এর দিকে। বিটা-৭১ এর কাছে পৌঁছে আর এক মুহুর্তও দেরি না করে তারা উঠে পড়ে সেটাতে। তারপর রওয়ানা হয়ে যায় পৃথিবীর উদ্দেশ্যে।

অজানা সেই গ্রহটা ছেড়ে আসার পর থেকে দেখতে দেখতে এরই মধ্যে পাড় হয়ে গেছে আটানব্বই ঘণ্টা, অর্থাৎ পৃথিবীর হিসেবে চারদিন দুই ঘণ্টা। এই চারদিনেও কাটে নি রিকির হতাশা। সে আজও বিটা-৭১কে অটোপাইলট মোডে রেখে এসে নিজের কেবিনে বসে আক্ষেপ করছে তাদের অভিযান ব্যর্থ হওয়া নিয়ে, আর তার পাশে বসে তাকে সান্ত্বনা দিচ্ছে পার্থ।

“দ্যাখো ভাই, আমাদের কিন্তু এতটা ভেঙে পড়া একেবারেই উচিত না।” বেশ অনেকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার বলল পার্থ। “শত হলেও আমরা সিনিয়র। নতুন রিক্রুট হওয়া মারফি আর ইয়ান যদি তাদের সিনিয়রদেরকে এভাবে ভেঙে পড়তে দ্যাখে, তাহলে সিনিয়রদের থেকে ওরা কী শিখবে?”

এবারে একটু সোজা হয়ে বসলো রিকি। তারপর পার্থর দিকে তাকিয়ে গম্ভীর গলায় বলল, “এটা অবশ্য তুমি ঠিকই বলেছো।”

“ওদিকে ইয়ান ছেলেটা তো একেবারে ডিপ্রেশনে চলে গেছে!” আফসোসের সুরে বলল পার্থ, “জীবনের প্রথম মহাকাশ অভিযান এভাবে ব্যর্থ হলো, বিষয়টা হয়ত মেনে নিতে পারে নি। প্রচণ্ড ডিপ্রেশনে বেচারা তো অসুস্থই হয়ে পড়েছে!”

ইয়ানের কথা বলে সারতে পারল না পার্থ, কোথা থেকে যেন হন্তদন্ত হয়ে ছুটে এসে রিকির কেবিনে ঢুকে পড়লো মারফি। পার্থ এবং রিকি অবাক হয়ে তাকালো মারফির দিকে। তারা মারফিকে কিছু জিজ্ঞেস করবার আগেই মারফি হাপাতে হাপাতে বলে উঠলো, “স্যার! ই-ই-ই-ইয়ান! ইয়ান…!”

কথা বলতে গিয়ে তোতলামো এসে যাচ্ছে মারফির। পার্থ উঠে এসে মারফির পাশে দাঁড়ালো। তারপর তার কাঁধে হাত রেখে বলল, “মাথা ঠাণ্ডা করো মারফি। মাথাটা ঠাণ্ডা করে বলো তো কী হয়েছে? ইয়ানের কিছু হয়েছে নাকি?”

“ই-ইয়ান… ইয়ান… ইয়ান…” এখনো ঠিকমত কথা বলতে পারছে না মারফি, আগের মতই তোতলাচ্ছে। আর ভীত সন্ত্রস্ত চোখে একবার রিকির দিকে আর একবার পার্থর দিকে তাকাচ্ছে সে। রিকি এবং পার্থ অত্যন্ত ধৈর্যের সঙ্গে তাকিয়েই আছে তার দিকে। এক পর্যায়ে শক্তি সঞ্চয় করে সে বলেই ফেলল, “ই-ই-ইয়ান আর ন্-নেই স্যার!”

মারফির কথাটা শোনার সঙ্গে সঙ্গেই যেন রীতিমত বাজ পড়লো রিকি আর পার্থর মাথায়। দু’জনে একসঙ্গে চিৎকার করে উঠলো, “কী বললে?!”

“ঠিকই বলছি স্যার!” ভয়ার্ত এবং কাঁদো কাঁদো গলায় মারফি বলল, “আ-আমি ইয়ানের কেবিনে গিয়েছিলাম ইয়ানকে ডা-ডা-আকতে। গিয়ে দে-দেখি ও বি-ব্বিছানায় চিৎ হয়ে প-প্পড়ে আছে। ভেবেছিলাম ঘু-উমাচ্ছে। গত তিন-চারদিন ধরে ওর শ-শ-শরীরটা এমনিতেও ভা-ভালো যাচ্ছে না, তাই এই অ-অসময়ে কেন ঘুমাচ্ছে এটা নিয়ে তে-তেমন মাথা ঘামালাম না। ওর কা-কাছে গিয়ে অ-অনেকবার চেষ্টা করলাম ওকে জাগানোর, কিন্তু ও জা-জাগলো না! তারপর যেই না ওর না-না-নাড়ি দেখলাম…”

কথাটা শেষ করতে পারলো না মারফি, ফুঁপিয়ে উঠলো সে। রিকি আর পার্থ এক মুহুর্তও দেরি না করে ছুটে কেবিন থেকে বেরিয়ে গেলো। তাদের পেছন পেছন ছুট লাগালো মারফিও। মহাকাশযানের করিডরটা ধরে ঝড়ের বেগে দৌড়ে গিয়ে তারা দাঁড়ালো ইয়ানের কেবিনের খোলা দরজাটার সামনে।

বিস্ফারিত চোখে তারা দেখলো, কেবিনের এক কোণে বিছানার ওপরে চিত হয়ে পড়ে রয়েছে ইয়ানের ফ্যাকাসে, রক্তশূণ্য এবং রুগ্ন মৃতদেহ!

 

২.

“এসব আপনি কী বলছেন স্যার?!” বিস্ময়ঝরা কণ্ঠে বলল মারফি, “ইয়ানকে আমি…?”

বাকি কথাটুকু আর বেরোলো না মারফির মুখ দিয়ে। সে মানতেই পারছে না যে তাদের দলনেতা রিকি তার সহকর্মী ইয়ানের মৃত্যুর জন্যে তাকেই দায়ী বলে সন্দেহ করছে!

“দ্যাখো মারফি,” রিকি অত্যন্ত শান্ত স্বরে ধীরে ধীরে বলল, “ঐ গ্রহ থেকে ফেরার পরই তোমার আর ইয়ানের মধ্যে যে একটা বিশ্রী রকমের ঝগড়া হয়ে গিয়েছিলো, সেটা কিন্তু আমার কান এড়ায় নি। তারপর থেকে যে তোমাদের মধ্যে কথাবার্তা বন্ধ, সেটাও আমি লক্ষ্য করেছি। তা আজ হঠাৎ কী মনে করে তুমি ইয়ানের কেবিনে গেলে?”

মারফি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল, “স্যার, এটা ঠিক যে আমাদের মধ্যে একটা বিশ্রী ঝগড়া হয়েছিলো, কিন্তু সেটা কোনোভাবেই খুন পর্যন্ত গড়ানোর মত ঝগড়া ছিলো না! আমরা ওখান থেকে ফেরার পর আমি ইয়ানের সাথে খুব বাজে রকমের রসিকতা করেই যাচ্ছিলাম ওর ঐ পাহাড়ের গুহাটার ভেতর থেকে খালি হাতে ফিরে আসা নিয়ে। এটা নিয়েই মূলত আমাদের মধ্যে ঝগড়া বেঁধে গিয়েছিলো এবং আমরা একজন আরেকজনের সাথে কথাবার্তা বন্ধ করে দিয়েছিলাম। কিন্তু আজ আমার মনে হয়েছিলো, ইয়ানের কাছে আমার ক্ষমা চাওয়া উচিত। এবং ক্ষমা চাইতেই আমি ওর কেবিনে গিয়েছিলাম। আর গিয়েই দেখি ও মরে পড়ে আছে!”

“রিকি, আমার মনে হয় মারফি ঠিকই বলছে।” মারফির হয়ে সাফাই গাওয়ার ভঙ্গিতে পার্থ বলল, “ওদের মধ্যে হওয়া ঝগড়াটা খুবই ছেলেমানুষী একটা ঝগড়া ছিলো। সেই ঝগড়ার জের ধরে কেউ কাউকে খুন করে দিতে পারে বলে আমার মনে হয় না। আর তাছাড়া ইয়ান তো গত তিন চারদিন ধরেই অসুস্থ ছিলো। হতে পারে ওর সেই অসুস্থতার কারণেই ওর মৃত্যু হয়েছে।”

চোখ সরু করে পার্থর দিকে তাকালো রিকি। শীতল গলায় সে বলল, “হতে পারে, আবার নাও হতে পারে।” কথাটা বলে আবার মারফির দিকে তাকিয়ে সে বলতে শুরু করল, “মারফি, ইয়ানকে তুমি কী ধরনের পয়জন দিয়েছো এবং এর পেছনের কারণ যদি সেদিনের সেই ঝগড়াটা না হয়ে থাকে তবে কারণটা আসলে কী- এ দু’টো প্রশ্নের উত্তর যতক্ষণ পর্যন্ত তুমি নিজে থেকে না দিচ্ছো ততক্ষণ পর্যন্ত তুমি তোমার কেবিনের ভেতরেই বন্দী থাকবে। তারপর আমরা পৃথিবীতে পৌছে গেলে সেখানে আইন শৃঙ্খলা বাহিনী তোমার বিরুদ্ধে যথাযথ ব্যবস্থা নেবে। তবে সবচেয়ে ভালো হবে যদি তুমি তার আগেই নিজে থেকে সবকিছু স্বীকার করে ফেলো।”

  কথাগুলো বলা শেষ করে রিকি দরজার দিকে হাটা ধরল। দরজার কাছে পৌঁছেই আবার থেমে দাঁড়ালো সে। ঘুরে দাঁড়িয়ে পার্থর দিকে তাকিয়ে সে বলল, “আর পার্থ, হতেও পারে মারফি সত্যি কথা বলছে। তুমি একটু ইয়ানের মৃতদেহটা ভালো করে পরীক্ষা করে দেখো তো, ওর মৃত্যুর কারণটা বের করতে পারো কিনা। বিশেষ করে ওর পাকস্থলিটা ভালোমত স্ক্যান করে দেখো। আর হ্যাঁ, আমি স্পেসশিপের কন্ট্রোল রুমে যাচ্ছি। তুমি এখান থেকে বেরোনোর সময় দরজাটা বাইরে থেকে লক করে দিয়ো।”

বেরিয়ে গেলো রিকি। রিকি বেরিয়ে যাওয়ার পরেও বেশ খানিকক্ষণ হতবাক হয়ে রিকির গমনপথের দিকে তাকিয়ে রইলো মারফি। তারপর অসহায় ভঙ্গিতে তাকালো পার্থর দিকে। অনুনয়ের সুরে বলল, “স্যার, আপনি অন্তত আমাকে বিশ্বাস করুন! আমি খুন করি নি ইয়ানকে!”

“আমি তোমাকে বিশ্বাস করি মারফি।” মারফির কাঁধ চাপড়ে দিয়ে পার্থ বলল, “কিন্তু কী করব বলো? রিকি তো আমাদের দলনেতা, ওর নির্দেশ আমাদের মানতেই হবে। তবে তুমি একটু ধৈর্য ধরো। তুমি সত্যিই নির্দোষ হয়ে থাকলে আশা করি আমি খুব দ্রুতই তোমাকে নির্দোষ প্রমাণ করে ফেলব।”

“যাক! আপনার কথায় একটু হলেও ভরসা পেলাম স্যার।” ম্লান হেসে বলল মারফি। তারপর হঠাৎ কী হল কে জানে, দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরল সে।

“আরে কী হলো?!” শঙ্কিত গলায় বলে উঠলো পার্থ।

“জানি না স্যার।” দু’হাতে মাথা চেপে ধরে রেখেই মারফি বলল, “মাথাটা খুব ব্যথা করছে। আর শরীরটাও দুর্বল লাগছে!”

“হুমম। তোমার আসলে বিশ্রামের দরকার।” গম্ভীর ভঙ্গিতে মাথা নেড়ে পার্থ বলল, “তুমি বরং একটু শুয়ে বিশ্রাম নাও। আমি পরে আবার আসব।”

মাথা নেড়ে পার্থর কথায় সাঁয় জানালো মারফি। তারপর বিছানায় শুয়ে পড়ল সে। পার্থ হাটা ধরল কেবিনের দরজার দিকে।

বিটা-৭১ মহাকাশযানটি পৃথিবীর সর্বাধুনিক প্রযুক্তিতে নির্মিত। প্রাচীনকালের মহাকাশযানগুলোর ভেতরে মহাকাশচারীদের শূণ্যে ভেসে বেড়াতে হত। কিন্তু বিটা-৭১ এর ভেতরে আর্টিফিশিয়াল গ্র্যাভিটি অর্থাৎ কৃত্রিম মধ্যাকর্ষণ তৈরি করা হয়েছে, যার ফলে এর ভেতরে মহাকাশচারীরা এক জায়গা থেকে আরেক জায়গায় ঠিক সেভাবেই হেটে চলাফেরা করতে পারে, যেভাবে মানুষসহ অন্য সব প্রাণী পৃথিবীর মাটির ওপর দিয়ে চলাফেরা করে।

পার্থ মারফির কেবিন থেকে বেরিয়ে এসে কেবিনের দরজা বাইরে থেকে লক করে দিলো। তারপর সে করিডর ধরে হেটে চলে গেলো তার নিজের কেবিনের দিকে।

 

৩.

তিন দিন পর।

পার্থ কন্ট্রোলরুমে ঢুকে দেখলো রিকি বিটা-৭১ এর কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে চুপচাপ দাঁড়িয়ে আছে। সে কন্ট্রোল প্যানেলের সামনে আছে, তবুও মহাকাশযান অটোপাইলট মোডে চলছে। এর একটাই অর্থ- জটিল কোনো চিন্তার মধ্যে আছে সে।

“তুমি কি কিছু নিয়ে চিন্তিত রিকি?” রিকির পেছন থেকে জিজ্ঞেস করল পার্থ। পার্থর গলা শুনে রিকি ঘুরে দাঁড়ালো।

“হ্যাঁ পার্থ।” গম্ভীরভাবে মাথা দোলালো রিকি। বলল, “ভালোই হয়েছে তুমি এসেছো। নইলে আমিই তোমার কাছে আসতাম।”

“কেন? কী হয়েছে?” কৌতুহলী গলায় জানতে চাইলো পার্থ।

“ঐ দ্যাখো।” কন্ট্রোল প্যানেলের ওপরে মহাকাশযানের সেন্ট্রাল কম্পিউটারের মনিটরের স্ক্রীনটার দিকে আঙুল তাক করে বলল রিকি।

পার্থ তাকালো স্ক্রীণের দিকে। স্ক্রীণে ভাসছে মহাকাশযানের এটমোস্ফিয়ার টেস্টের রিপোর্ট। পার্থ অবাক হয়ে বলল, “এটা তো আমাদের স্পেসশিপের এটমোস্ফিয়ার টেস্টের রিপোর্ট। কিন্তু এখানে সমস্যাটা কোথায়?”

“ভালো করে লক্ষ্য করো।” রিকি বলল, “ইয়ান মারা যাওয়ার পর থেকে এই স্পেসশিপে আমরা শুধু তিনজনই আছি। কিন্তু এই রিপোর্টে গত তিনদিনের অক্সিজেনের ডিক্রিজিং রেটটা খেয়াল করো। একই সঙ্গে কার্বন ডাই অক্সাইডের ইনক্রিজিং রেটটাও।”

রিকির কথামত রিপোর্টটার দিকে তাকালো পার্থ। তারপর অক্সিজেনের ইনক্রিজিং রেটটা ভালোভাবে লক্ষ্য করে রীতিমত চমকে উঠলো সে। চোখ কপালে তুলে রিকির দিকে তাকিয়ে সে বলল, “একি! অক্সিজেনের ডিক্রিজিং রেট এত বেশি দেখাচ্ছে কেন? মাত্র তিনজন মানুষ নিঃশ্বাস নিলে তো এত পরিমাণে অক্সিজেন কমার কথা না!”

“শুধু তাই না, কার্বন ডাই অক্সাইডের ইনক্রিজিং রেটও অনেক বেশি দেখা যাচ্ছে।” রিকি বলল, “তারমানে এই স্পেসশিপের ভেতরে আমরা তিনজন ছাড়াও চতুর্থ কেউ অক্সিজেন নিচ্ছে এবং কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ছে!”

রিকির কথাটা শুনে হঠাৎ করেই আতঙ্কের একটা শীতল স্রোত বয়ে গেলো পার্থর শিরদাঁড়া বেয়ে। আতঙ্কিত গলায় সে বলল, “তারমানে এই স্পেসশিপে আমি, তুমি, মারফি আর ইয়ানের মৃতদেহ ছাড়াও পঞ্চম কেউ আছে?!”

“হ্যাঁ।”

“কিন্তু কে সেই পঞ্চম ব্যক্তি? আর আমাদের চোখ এড়িয়ে আমাদেরই স্পেসশিপে সে ঢুকলোই বা কীভাবে?”

“জানি না।” কাঁধ নেড়ে বলল রিকি। “আমি এই রিপোর্টটা দেখার পর থেকে গত আড়াই ঘণ্টায় পুরো স্পেসশিপে তন্ন তন্ন করে খুঁজেছি। কিন্তু পুরো স্পেসশিপের ভেতরে কোথাও পঞ্চম কারো টিকিটাও পেলাম না!” ক্ষণিকের জন্যে একটু থামলো রিকি। তারপর আবার বলল, “তবে আমার মন বলছে ঐ পঞ্চম ব্যক্তি এখানেই কোথাও আছে, আর আমরা তাকে দেখেও দেখতে পাচ্ছি না। এখন তো আমার মনে হচ্ছে যে মারফি আসলেই নির্দোষ, বরং ইয়ানের মৃত্যুর পেছনে ঐ পঞ্চম ব্যক্তিরই হাত আছে!”

  হঠাৎ করেই যেন কিছু একটা মনে পড়ে গেলো পার্থর। সে তৎক্ষণাৎ রিকির দিকে তাকিয়ে উত্তেজিত স্বরে বলে উঠলো, “অ্যাই রিকি! আমাদের মনে হয় এই মুহুর্তে মারফির কাছে যাওয়া উচিত! ছয় ঘণ্টা আগে ওকে খাবার দিতে গিয়ে শেষবার ওর সাথে দেখা হয়েছিলো, তখনই দেখে এসেছি ও ভয়ানক রকমের অসুস্থ! যদিও খাওয়ার পরে ওকে ওষুধ খাইয়ে দিয়ে এসেছি, কিন্তু তবুও এই অবস্থায় যদি সেই পঞ্চম ব্যক্তি ওর ওপর আক্রমণ করে বসে…!”

“আমি যাচ্ছি মারফির কাছে, তুমি এখানেই থাকো।” নিজের স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা তুলে নিতে নিতে রিকি বলল, “যদি আসলেই পঞ্চম কেউ থেকেও থাকে, তবে তাকে কোনোভাবেই কন্ট্রোলরুমের দখল নিতে দেওয়া যাবে না।”

কথাটা বলেই রিকি বেরিয়ে গেলো। পার্থ ঠায় দাড়িয়েই রইলো কন্ট্রোলরুমের ঠিক মাঝখানে। বেশ খানিকক্ষণ এভাবেই কেটে গেলো। এরপর একসময় হঠাৎ বেজে উঠলো পার্থর স্পেসস্যুটের পকেটে রাখা যোগাযোগ মডিউল। পার্থ তার যোগাযোগ মডিউলটা বের করে এনে সবুজ রঙের বোতামটা চেপে দিতেই সেটার ওপরে ভেসে উঠলো রিকির হলোগ্রাফিক ছবি। রিকিকে ভীষণ উদ্বিগ্ন দেখাচ্ছে।

“বলো রিকি, কী খবর?” পার্থ জানতে চাইলো, “মারফির ওখানে সবকিছু ঠিকঠাক আছে তো, না?”

“আমরা বড্ড দেরি করে ফেলেছি পার্থ!” রীতিমত হাহাকার করে উঠলো রিকি।

পার্থর মাথায় যেন আকাশ ভেঙে পড়লো। সে চিৎকার করে উঠলো, “মানে কী?!”

“মারফি আর বেঁচে নেই পার্থ!” রিকির গলা ধরে এলো কথাটা বলতে গিয়ে। “আমি এসে দেখি মারফিও ঠিক একই ভাবেই পড়ে আছে, যেভাবে সেদিন ইয়ান পড়ে ছিলো!”

 

৪.

আরো দুই দিন পর।

“মারফি আর ইয়ানের লাশ দু’টো পরীক্ষা করে কিছু পেলে?” জানতে চাইলো রিকি।

পার্থ হতাশ গলায় জবাব দিলো, “নাহ!”

“ওদের পাকস্থলিতেও কিছুই পাও নি?” অবাক হয়ে জিজ্ঞেস করল রিকি, “কোনো পয়জন বা এই জাতীয় কিছু?”

“উঁহু। প্রথমে ইয়ান, তারপর মারফির মৃতদেহ পরীক্ষা করে যা বুঝলাম, দু’জনের একজনও কোনো রকম বিষক্রিয়ায় মারা যায় নি।” পার্থ বলল, “এমনকি যতদূর আমি বুঝতে পারছি তাতে আমার মনে হচ্ছে যে ওদের দু’জনের মৃত্যুর পেছনে পঞ্চম কারোও হাত নেই। ওদের মৃত্যু মূলত অসুস্থতার কারণেই হয়েছে।”

“কিন্তু ওদের এরকম অসুস্থ হয়ে পড়ার কারণটা কী হতে পারে?” গম্ভীর হয়ে উঠলো রিকির মুখ। সে বলল, “সুস্থ, স্বাভাবিক, তরতাজা দু’জন মানুষের এভাবে হুট করে পর পর অসুস্থ হয়ে মারা যাওয়া তো মোটেও কোনো স্বাভাবিক ঘটনা না! ওদের মৃত্যুর পেছন সেই পঞ্চম ব্যক্তির হাত না থাকতে পারে, কিন্তু ওদের মৃত্যু ওদের যেই অসুস্থতার কারণে হয়েছে, সেই অসুস্থতার পেছনে নিশ্চয়ই সেই পঞ্চম ব্যক্তির হাত আছে!”

“কিন্তু এই পঞ্চম ব্যক্তিটি কে রিকি?!” পার্থ মরিয়া হয়ে জানতে চাইলো, “আমি আজও পুরো মহাকাশযান চষে ফেললাম, কিন্তু পঞ্চম কারো চিহ্ন মাত্র পেলাম না! পুরো যানে জীবিত বলতে কেবল আছি আমরা দু’জন, আর শীতলঘরে পড়ে আছে মারফি আর ইয়ানের মৃতদেহ। এছাড়া আর কে আছে এখানে?!”

“জানি নাহ। কিন্তু কেউ তো একজন আছে যে এখানকার বাতাসে নিঃশ্বাস নিচ্ছে!” রিকি ক্লান্ত স্বরে বলল, “পার্থ, স্টিয়ারিং টা তুমি একটু ধরো তো এবার। আমার শরীরটা ভালো লাগছে না, একটু বিশ্রাম নেয়া দরকার!”

“ঠিক আছে, কিন্তু তুমি এখানেই বসে বিশ্রাম নাও।” কন্ট্রোল প্যানেলের দিকে এগিয়ে যেতে যেতে বলল রিকি। “যতক্ষণ পর্যন্ত না আমরা পৃথিবীতে পৌঁছাচ্ছি, ততক্ষণ পর্যন্ত আমাদের এক মুহুর্তের জন্যেও আলাদা হওয়া চলবে না।”

ওপর-নীচে মাথা দুলিয়ে পার্থর কথায় সম্মতি জানালো রিকি। তারপর সে সরে দাঁড়িয়ে পার্থকে জায়গা করে দিলো। পার্থ এসে তার জায়গায় দাঁড়িয়ে স্টিয়ারিং ধরলে সে কন্ট্রোল রুমের এক কোণে গিয়ে বসলো।

বেশ কিছুক্ষণ কেটে যাওয়ার পর হঠাৎ করেই পার্থর কী মনে হলো কে জানে, সে স্টিয়ারিং-এর পাশে অটোপাইলট বাটনটা চেপে অটোপাইলট মোড চালু করে দিলো। এমনিতে কোনো মহাকাশচারীর মহাকাশযান চালিয়ে নিয়ে যাওয়া আর মহাকাশযানের অটোপাইলট মোডে আপনা আপনি চলতে থাকার ভেতরে খুব একটা আহামরি পার্থক্য নেই। মহাকাশযানের গন্তব্য যাত্রা শুরুর আগেই কন্ট্রোল প্যানেলে নির্ধারিত করে দেয়া হয়। তাই যখন অটোপাইলট মোড চালু করে দেওয়া হয়, তখন মহাকাশযানটি নিজে থেকেই সেই নির্ধারিত গন্তব্যের পথে এগিয়ে যেতে থাকে। কিন্তু সমস্যা একটা জায়গাতেই। যানটি যখন একজন মহাকাশচারীর নিয়ন্ত্রণে থাকে, তখন সামনে কোনো বিপদ দেখলে মহাকাশচারী বিপদ এড়াতে মহাকাশযানের গতিপথ পরিবর্তন করে অন্যদিকে নিয়ে যেতে পারে। কিন্তু অটোপাইলট সেটা করে না। সামনে থেকে যদি একটা উল্কাপিণ্ডও ছুটে আসে, তবুও অটোপাইলট যানটিকে নির্ধারিত গন্তব্যের দিকে ঐ একই পথেই নিয়ে যাবে, গতিপথ পরিবর্তন করে অন্যদিক দিয়ে নিয়ে যাবে না।

পার্থ অটোপাইলট মোড চালু করে দিয়ে রিকির সামনে এসে দাঁড়ালে রিকি অবাক হয়ে তাকালো পার্থর দিকে। বলল, “কী ব্যাপার?”

“তোমার শরীর খারাপ বললে যে?” ভ্রু কুচকে জিজ্ঞেস করল পার্থ, “কখন থেকে শরীর খারাপ? আর খারাপ বলতে কীরকম খারাপ?”

“গত দু’দিন ধরেই শরীরটা ভালো লাগছে না।” রিকি দু’হাতে নিজের মাথা চেপে ধরে দুর্বল স্বরে বলল, “মাথাটা খুব ব্যাথা করছে। আর সারা শরীরে এমন অদ্ভুত একটা অনুভূতি হচ্ছে যে বলে বোঝাতে পারব না!”

রিকির সামনে বসে পড়লো পার্থ। তার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার কালো মেঘ ক্রমশ জমাট বেঁধে উঠছে। সে জিজ্ঞেস করল, “অনুভূতিটা কীরকম?”

“বললাম তো, বলে বোঝানোর মত না।”

“তাও বলো শুনি।”

রিকি ব্যাখ্যা করার চেষ্টা করল, “শরীরটা সারাক্ষণই কেমন যেন ভারী ভারী মনে হয়। আর হঠাৎ হঠাৎ মনে হয় একটা অদৃশ্য কিছু যেন আমার শরীরের জায়গায় জায়গায় চামড়াগুলো টেনে ধরছে!”

এবারে দুশ্চিন্তার সঙ্গে সঙ্গে আতঙ্কের একটা ছাপও প্রকট হলো পার্থর চেহারায়। সে জানতে চাইলো, “এটা তোমার গত দু’দিন ধরে হচ্ছে, তাই না? মানে মারফির মৃত্যুর পর থেকে?”

“হ্যাঁ।” পার্থর ভাবভঙ্গি খুব একটা সুবিধার ঠেকছে না রিকির কাছে, ভয় পেয়ে গেলো সেও। ভয়ে ভয়ে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু তুমি হঠাৎ এসব কেন জিজ্ঞেস করছো?”

  পার্থ বিড়বিড় করে বলতে লাগলো, “প্রথমে ইয়ান অসুস্থ হয়ে পড়ল, তারপর তিন-চারদিনের মাথায় ইয়ান মারা গেলো। ইয়ানের মৃতদেহ প্রথম স্পর্শ করেছিলো মারফি। সেই মারফিও হঠাৎ অসুস্থ হয়ে পড়ল, এবং তিনদিনের মাথায় সেও মারা গেলো। মারফির মৃতদেহকে প্রথম তুমি স্পর্শ করেছিলে, আর এখন তুমিও অসুস্থ। এবং তোমারও ঠিক সেই একই রকম অনুভূতি হচ্ছে, যেরকমটা হয়েছিলো ইয়ান আর মারফির!”

“কী বলছো তুমি এসব?!” ভয়ার্ত গলায় রীতিমত চিৎকার করে উঠলো রিকি, “তুমি নিশ্চিত যে ওদেরও একই রকম অনুভূতি হয়েছিলো?”

“হ্যাঁ, কারণ ওদের সেই অনুভূতির কথা ওরাই আমাকে বলেছিলো।” চিন্তিত স্বরে পার্থ বলল, “তখন বুঝতে পারি নি, কিন্তু এখন বুঝতে পারছি।”

“কী বুঝতে পারছো?”

রিকির প্রশ্নের জবাব না দিয়ে রিকির কপালে হাত রাখলো পার্থ। তারপর তার শরীরের অন্যান্য জায়গা স্পর্শ করেও পরীক্ষা করল। শরীর প্রচণ্ড গরম হয়ে আছে রিকির। তবে পার্থ বিস্মিত হলো অন্য একটা বিষয় লক্ষ্য করে। রিকির সারা শরীর আঠালো থকথকে হয়ে আছে! কিন্তু কেন?

পার্থ রিকির সামনে থেকে উঠে চলে গেলো মহাকাশযানের কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে। তারপর কন্ট্রোল প্যানেলের নীচের ড্রয়ারটা খুলে সেখান থেকে একটা থার্মাল স্ক্যানার বের করে সেটা সঙ্গে নিয়ে ফিরে এলো রিকির কাছে। রিকি অবাক হয়ে তাকিয়ে পার্থর কাণ্ডকারখানা দেখছে।

“রিকি, জলদি তোমার স্পেসস্যুটটা খুলে এই থার্মাল স্ক্যানারটার সামনে দাঁড়াও।” থার্মাল স্ক্যানারটা চালু করে রিকির দিকে তাক করে বলল পার্থ।

“তুমি ঠিক কী করতে চাইছো বলো তো?!” পার্থর কাণ্ড কারখানা কিছুই বুঝতে পারছে না রিকি।

“সব বলবো তোমাকে।” রিকিকে আশ্বস্ত করল পার্থ, “কিন্তু তার আগে আমি যা বলছি তা করো।”

অগত্যা গায়ে চাপানো স্পেসস্যুটটা খুলে ফেলতে বাধ্য হলো রিকি। তারপর নগ্নদেহে পার্থর কথামত দাঁড়িয়ে গেলো থার্মাল স্ক্যানারের সামনে। পার্থ থার্মাল স্ক্যানারটা চালু করে স্ক্যানারের স্ক্রীণের দিকে তাকালো। তারপর সে যা দেখলো, তাতে বিস্ময়ে তার চোখ ছানাবড়া হয়ে গেলো।

স্ক্রীণে ভেসে ওঠা থার্মোগ্রাফিক ইমেজে দেখা যাচ্ছে, রিকির সমস্ত শরীর জড়িয়ে আছে অর্ধতরল থকথকে জেলীর মত পাতলা একটা আবরণে। থার্মোগ্রাফিক ইমেজটা জুম ইন করতেই পার্থ বুঝে গেলো, জেলীর মত ওটা স্রেফ একটা আবরণ নয়। ওটা কিলবিল করে নড়াচড়া করছে! শুধু তাই না, জিনিসটা একটু পরপর ওঠানামা করছে, শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে থাকলে মানুষের বুক যেভাবে ওঠানামা করে ঠিক সেভাবে!

পার্থ অস্ফুট স্বরে বলে উঠলো, “এই তাহলে সেই পঞ্চম ব্যক্তি!”

“কার কথা বলছো?” অধৈর্য ভঙ্গিতে জিজ্ঞেস করল রিকি।

“যে তোমাকে আষ্টেপৃষ্টে জড়িয়ে রেখেছে,” থার্মাল স্ক্যানারটা নীচে নামিয়ে রেখে পার্থ শুকনো গলায় বলল, “তোমার আগে মারফিকে যে একই ভাবে জড়িয়ে রেখেছিলো, আর তার আগে ইয়ানকেও যে একইভাবে জড়িয়ে রেখেছিলো এবং আমরা ছাড়াও অতিরিক্ত যে প্রাণীটি আমাদের মহাকাশযানের ভেতরে অক্সিজেন নিচ্ছে আর কার্বন ডাই অক্সাইড ছাড়ছে তার কথা বলছি।”

“মানে কী?!” রিকি আকাশ থেকে পড়লো।

“দেখাচ্ছি দাঁড়াও।” বলে পার্থ আবার চলে গেলো কন্ট্রোল প্যানেলের কাছে। তারপর থার্মাল স্ক্যানারটা আগের জায়গায় রেখে সেই একই জায়গা থেকে একটা টুলকিট বের করে আনলো পার্থ। সেই টুলকিটের ভেতর থেকে একটা চিমটা বের করে টুলকিটটা রেখে শুধুমাত্র চিমটাটা হাতে নিয়ে সে আবার ফিরে এলো রিকির কাছে।

“তুমি ঠিক কী করতে চাচ্ছো আমাকে একটু বলবে?” বিরক্ত হয়ে উঠলো রিকি। একে তো সে দুশ্চিন্তায় রীতিমত পাগল হয়ে যাচ্ছে, তার ওপর পার্থর এহেন কাণ্ডকারখানা দেখে তার দুশ্চিন্তার সঙ্গে বিরক্তিও যোগ হয়েছে।

পার্থ রিকির প্রশ্নের কোনো জবাব দিলো না। সে তার হাতের চিমটার সাহায্যে রিকির পেটের একপাশের চামড়ার খুবই সামান্য কিছু অংশ চিমটি দিয়ে ধরলো। তারপর রিকি কিছু বুঝে ওঠার আগেই একটা হ্যাঁচকা টান দিলো।

“আউচ!”

ব্যথায় চিৎকার করে উঠলো রিকি। কিন্তু মুহুর্তের মাঝেই এই ব্যথার কথা ভুলে যেতে হলো তাকে। কারণ চোখের সামনে সে যা দেখছে, এমন অদ্ভুত দৃশ্য শুধু সে কেন, পৃথিবীর কোনো মানুষ কখনো দেখেছে কিনা সন্দেহ! একটা পাতলা জেলীর মত থকথকে স্বচ্ছ জিনিসকে চিমটার সাহায্যে টেনে ধরে রেখেছে পার্থ। কিন্তু জিনিসটা রিকির শরীর থেকে আলাদা হচ্ছে না, কারণ জিনিসটার ভেতর থেকে অসংখ্য স্বচ্ছ তন্তু বেরিয়ে এসে রীতিমত গেঁথে রয়েছে রিকির শরীরের লোমকূপগুলোতে। জিনিসটার ভেতর থেকে একটা চিৎকারের মত শব্দ।

“এ-এটা কী?!” ভয়ার্ত স্বরে বলে উঠলো রিকি, “আর এই শ-শ-শব্দটাই বা কী-ক্কীসের??!!!”

“এটাই তো সেই পঞ্চম ব্যক্তি!” চিমটা দিয়ে জিনিসটাকে টেনে ধরে রেখেই বলল পার্থ। “আর যেই শব্দটা শুনতে পাচ্ছো, ওটা এর চিৎকার। একই সঙ্গে ব্যথা এবং রাগে চিৎকার করছে!”

কথাগুলো বলে পার্থ জিনিসটাকে চিমটা দিয়ে আরো জোরে টেনে আলাদা করে ফেলার চেষ্টা করল রিকির দেহ থেকে। কিন্তু কোনো লাভ হলো না। জিনিসটার ভেতর থেকে বেরিয়ে আসা তন্তুগুলো এত পাকাপোক্তভাবে রিকির শরীরের লোমকূপগুলোতে গেঁথে বসেছে যে টেনে আলাদা তো করা গেলোই না, উল্টো প্রচণ্ড যন্ত্রণায় গলা ছেড়ে চিৎকার করতে লাগলো রিকি। শেষমেষ পার্থ বাধ্য হলো হাল ছেড়ে দিতে। চিমটাটা ছেড়ে দিলো সে। সঙ্গে সঙ্গে জেলীর মত জিনিসটা আবার থ্যাপ করে গিয়ে পড়লো রিকির পেটের ঐ জায়গাটায়, যেখান থেকে চিমটা দিয়ে ধরে পার্থ ওটাকে টেনে এনেছিলো। আর সঙ্গে সঙ্গেই আবার মিলিয়ে গেলো রিকির শরীরে, একটা স্বচ্ছ পাতলা আবরণের মত!

“ও-ওটা কী ছিলো?!” আতঙ্কিত ভঙ্গিতে পার্থকে জিজ্ঞেস করল রিকি।

“আমার যদি ভুল  না হয়ে থাকে,” পার্থ গম্ভীর ভঙ্গিতে বলতে শুরু করল, “তাহলে আমরা যেই গ্রহটা থেকে ফিরছি, এটা সেই গ্রহের সর্বশেষ জীবিত প্রাণী। এই প্রাণী অন্য প্রজাতির প্রাণীদেরকে নিজের শিকারে পরিণত করে, তারপর সেই প্রাণীদের অজান্তেই ততক্ষণ পর্যন্ত পাতলা আবরণের মত তাদের দেহে লেপ্টে থাকে যতক্ষণ পর্যন্ত তাদের শরীরের সমস্ত পুষ্টি উপাদান শুষে নিয়ে নিঃশেষ করে না দেয়। আমার বিশ্বাস, ঐ গ্রহে আর কোনো জীবিত প্রাণী অবশিষ্ট না থাকার জন্যে এই অদ্ভুত প্রজাতির প্রাণীরাই দায়ী!”

“কিন্তু ঐ গ্-গ্রহে এরা বে-ব্বেঁচে ছিলো কীভাবে? ওখানে তো অক্সিজেন নেই বললেই চলে!”

“অক্সিজেন হয়ত ছিলো ওখানকার বায়ুমণ্ডলে, কিন্তু এই প্রাণীগুলোর কারণে এখন আর সেই অক্সিজেনও অবশিষ্ট নেই!” আবার বলতে লাগলো পার্থ, “আমার ধারণা, অর্ধতরল এই প্রাণীগুলো নিজেদের আকার-আকৃতি যেভাবে পরিবর্তন করতে পারে, ঠিক একইভাবে তারা যেকোনো পরিবেশে খুব দ্রুত খাপ খাইয়ে নিতে পারে। অর্থাৎ এদের অভিযোজনের ক্ষমতা অনেক বেশি! ঐ গ্রহের বায়ুমণ্ডল যখন ক্রমশ অক্সিজেনশূণ্য হয়ে আসছিলো, তখন তারা তার সঙ্গেই অভিযোজন করিয়ে নিয়েছিলো হয়ত। আর যখন ওদের ভেতর থেকে একটা প্রাণী আমাদের সঙ্গে করে আমাদের স্পেসশিপে চলে এলো, তখন সে স্পেসশিপের ভেতরে অক্সিজেন পেয়ে আবার এখানকার পরিবেশের সঙ্গে নিজের অভিযোজন করিয়ে নেয়। আবার আগের মত শ্বাস-প্রশ্বাস চলতে শুরু করে এই প্রাণীটার।”

হা করে পার্থর কথা শুনছিলো রিকি। পার্থর কথা শেষ হওয়ার পরেও অনেকক্ষণ পর্যন্ত কোনো কথা বলল না সে, যেন সে সম্বিৎ হারিয়ে ফেলেছে। বেশ খানিকক্ষণ পর সম্বিৎ ফিরে পেয়ে দুর্বল স্বরে সে জানতে চাইলো, “কিন্তু এই প্রাণীটা আমাদের সঙ্গে এলো কেমন করে?”

“আমাদের মধ্যে এই প্রাণীটার প্রথম শিকার হয়েছিলো ইয়ান। আমরা ভেবেছিলাম ও ডিপ্রেশনের কারণে রুগ্ন পড়েছিলো, কিন্তু আসলে ও রুগ্ন হয়ে পড়েছিলো এই প্রাণীটার আক্রমণে!” জবাব দিলো পার্থ, “তোমার মনে আছে ইয়ান ঐ গ্রহে একটা গুহার ভেতরে ঢুকেছিলো? আর ফিরে এসে সে বলেছিলো, সে গুহার ভেতরে ছোটখাটো একটা জলাশয় দেখেছে যার ভেতরে থকথকে আঠালো পানি ছিলো?”

ওপরে-নীচে মাথা দোলালো রিকি, মুখে কিছুই বলল না।

“ও যেটাকে জলাশয় ভেবে ভুল করেছিলো সেটা আসলে কোনো জলাশয় ছিলো না, ছিলো একটা খাঁদ।” পার্থ বলে যেতেই লাগলো, “সেই খাদের ভেতরে ছিলো অর্ধতরল, আঠালো, থকথকে এই প্রাণীগুলোর একটা দল, যাদেরকে দেখে ও দূষিত পানি বলে মনে করেছিলো। ও যখন সেখানে হাত দেয়, খুবই অল্প সময়ের ব্যবধানে একটা প্রাণী তার হাত বেয়ে উঠে আসে এবং তার শরীরে লেপ্টে যায়।”

“তারপর প্রথমে ইয়ান, তারপর মারফি আর তারপর আমাকে নিজের শিকারে পরিণত করে। তারমানে আর দুই-একদিনের ভেতর এই প্রাণীটা আমার দেহকে ছিবড়ে খেয়ে আমাকেও মেরে ফেলবে, আর তারপর তোমাকেও নিজের শিকারে পরিণত করবে!” বিড়বিড় করে কথাগুলো বলে পার্থর দিকে তাকালো রিকি। “এখন তাহলে উপায়?”

“উপায় তো একটা বের করতেই হবে!” গম্ভীর ভঙ্গিতে কথাটা বলল পার্থ। তারপর বেশ খানিকক্ষণ চুপ করে থেকে আবার তাকালো রিকির দিকে। বলল, “দুশ্চিন্তা কোরো না রিকি। আমি দেখছি কী করা যায়। তুমি বরং এখন তোমার কেবিনে গিয়ে একটু বিশ্রাম নাও। কন্ট্রোল প্যানেলে আপাতত আমিই দাড়াচ্ছি।”

সুবোধ বালকের মত মাথা নেড়ে সম্মতি জানালো রিকি। তারপর মেঝের ওপর থেকে নিজের স্পেসস্যুটটা তুলে নিয়ে সেটা গায়ে চাপিয়ে আর একটাও কথা না বলে চুপচাপ বেরিয়ে গেলো কন্ট্রোলরুম থেকে। পার্থ অবাক হয়ে লক্ষ্য করল, দলনেতা সুলভ ভারিক্কি চালটা রিকির ভেতর থেকে যেন একেবারেই উবে গেছে। সেই ভারিক্কি চালের জায়গাটা এখন নিয়ে নিয়েছে মৃত্যুভয়!

পার্থ মহাকাশযানকে অটোপাইলট মোডে রেখেই একটা চেয়ারে গিয়ে বসলো। তার চোখে মুখে দুশ্চিন্তার ছাপ ক্রমশ প্রগাঢ় হয়ে উঠছে। চোখ বন্ধ করে চিন্তার সাগরে ডুব লাগালো সে। তবে বেশিক্ষণ ডুবে থাকতে পারল না, অল্প কিছুক্ষণ না যেতেই তার স্পেসস্যুটের পকেটের ভেতরে রাখা যোগাযোগ মডিউলটা বেজে উঠে তার ধ্যান ভেঙে দিলো।

মডিউলটা বের করে সবুজ বাটনটা চেপে দিলো সে। তার সামনে ভেসে উঠলো রিকির ক্লান্ত মলিন চেহারা।

“কিছু বলবে রিকি?” জিজ্ঞেস করল পার্থ।

“পার্থ,” রিকি শুষ্ক মলিন স্বরে বলল, “তুমি যদিও আমাকে আশ্বাস দিয়েছো যে এই বিপদ থেকে উত্তরণের একটা উপায় বের হবেই, কিন্তু আমার মনে হয় না এত সহজে এই বিপদ থেকে উত্তরণের কোনো উপায় বের হবে। আর যদি বের হয়ও ততক্ষণে অনেক দেরি হয়ে যাবে।”

পার্থ কিছু একটা বলতে চাইলো, কিন্তু তাকে থামিয়ে দিয়ে রিকি বলে যেতে লাগলো, “তাই আমি সিদ্ধান্ত নিয়েছি, দেরি হয়ে যাওয়ার আগেই আমি স্বেচ্ছামৃত্যু বরণ করে নেব, তাতে যদি আমার সঙ্গে সঙ্গে ভয়ংকর এই প্রাণীটারও মৃত্যু হয়, তবে আমার মৃত্যু সার্থক হবে।”

“কী বলছো তুমি এসব?!” চিৎকার করে উঠলো পার্থ, “খবরদার রিকি, তুমি ভুলেও এরকম কিছু করবে না!”

“ভালো থেকো।” রিকি ম্লান হেসে কথাটা বলার সঙ্গে সঙ্গেই মডিউলের ওপর থেকে তার হলোগ্রাফিক ছবিটা অদৃশ্য হয়ে গেলো।

পার্থ তার যোগাযোগ মডিউলটা হাত থেকে ফেলে এক দৌড়ে বেরিয়ে গেলো কন্ট্রোলরুম থেকে। তারপর করিডর ধরে দৌড়াতে দৌড়াতে গিয়ে থামলো রিকির কেবিনের খোলা দরজাটার সামনে। সেখানে দাঁড়িয়ে বিস্ফারিত চোখে তাকিয়ে সে দেখলো, রিকি তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রটা উল্টো করে ধরে নিজের বুকে তাক করে রেখেছে। তার বুড়ো আঙুলটা অস্ত্রের ট্রিগারের ওপর রাখা।

“নাআআআআ……!”

চিৎকার করে পার্থ ছুটে গেলো রিকির দিকে রিকিকে থামাতে। কিন্তু বড্ড দেরি হয়ে গেছে! রিকি ততক্ষণে তার স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের ট্রিগার চেপে দিয়েছে!

“ধাঁআআই!!!”

রিকি আছড়ে পড়লো কেবিনের পেছনের দিকের দেয়ালে। তার বুকটা একদম ঝাঁঝরা হয়ে গেছে স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আঘাতে!

রিকির মৃতদেহের পাশে হাটু গেড়ে ধপাস করে বসে পড়ল পার্থ। বাকরুদ্ধ হয়ে সে তাকিয়ে রইলো রিকির নিষ্প্রাণ মুখের দিকে। তার ইচ্ছে করছে সমস্ত শক্তি দিয়ে একটা আর্তচিৎকার করে পুরো ব্রহ্মাণ্ড ধ্বংস করে দিতে!

রিকি ভেবেছিলো, তার মৃত্যুর সঙ্গে সঙ্গে সেই রহস্যময় অজানা গ্রহ থেকে তাদের সঙ্গে আসা প্রাণীটাও ধ্বংস হয়ে যাবে। কিন্তু না! রিকির ধারণা পুরোপুরি ভুল প্রমাণিত হলো! পার্থ দেখলো, স্বয়ংক্রিয় অস্ত্রের গুলির আঘাতে অর্ধতরল প্রাণীটা ছিন্নভিন্ন হয়ে টুকরো টুকরো জেলীর মত চারদিকে ছড়িয়ে পড়েছিলো ঠিকই, কিন্তু প্রতিটা টুকরো থেকে আবার নতুন একটা করে প্রাণীর জন্ম হয়েছে। রূপকথার গল্পে যেমন ফিনিক্স পাখির ভস্ম থেকে নতুন ফিনিক্স পাখির জন্ম হয়, অনেকটা সেরকমই। দুই চোখে একরাশ আতঙ্ক নিয়ে পার্থ দেখলো, স্বচ্ছ জেলীসদৃশ প্রাণীগুলো বিটা-৭১এর ধাতব মেঝের ওপর দিয়ে দ্রুতগতিতে গড়িয়ে গড়িয়ে তার দিকেই এগিয়ে আসছে!

“বিটা-৭১ যদি পৃথিবীতে পৌঁছে যায়, তবে এই প্রাণীগুলোও পৃথিবীতে পৌঁছে যাবে!” আপনমনে বিড়বিড় করে বলল পার্থ, “আর তখন পৃথিবীর অগণিত মানুষের জীবনের হুমকির মুখে পড়ে যাবে! আমি সেটা কোনোমতেই হতে দেবো না!”

পার্থর মনে পড়লো, ছয় বছর আগে সে এবং রিকি যখন প্রথম ডব্লিউএসআরও-তে যোগদান করেছিলো, তখন তাদের প্রশিক্ষণের একদম শেষের দিকে তাদেরকে পরিচয় করিয়ে দেয়া হয়েছিলো মহাকাশযানের “সেলফ ডিস্ট্রাকশান বাটন”-এর সঙ্গে। প্রত্যেক মহাকাশযানের কন্ট্রোল প্যানেলেই এই বাটনটা থাকে। বিটা-৭১এও আছে, কন্ট্রোল প্যানেলের ডানদিকে নীচে, লাল রঙয়ের একটা বাটন। এই বাটনটা সম্পর্কে তাদের প্রশিক্ষক বলেছিলেন, “যদি কখনো মহাকাশে এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন হতে হয় যে পুরো মহাকাশযানটিকে ধ্বংস করে দেয়া ছাড়া আর কোনো উপায় নেই, তখন ঐ বাটনের ওপর একটা চাপ-ই যথেষ্ট!” ছয় বছর আগের সেই সময়টায় পার্থ এই সেলফ ডিস্ট্রাকশান বাটনের মর্মটা ঠিক বুঝতে পারে নি। কিন্তু আজ ছয় বছর পরে এসে ঠিকই বুঝতে পারছে।

ধীরে ধীরে উঠে দাঁড়ালো পার্থ। একবার তাকালো মৃত রিকির মুখের দিকে।

“আমার বন্ধু রিকি তার জীবন দিয়েছে পৃথিবীর অগণিত মানুষের জীবন বাঁচাতে।” পার্থ বিড়বিড় করে বলল, “তার এই ত্যাগকে আমি বৃথা যেতে দেব না!”

 

পরিশিষ্ট.

চার বছর পর।

-জন, তুমি নিশ্চয়ই জানো যে তোমাকে আমি কেন এখানে ডেকেছি?

-জানি স্যার। বিটা-৭১ কীভাবে ধংস হলো সেই রহস্যের তদন্ত করার জন্য।

-চিন্তা করতে পারো? পৃথিবীর সবচাইতে এডভান্সড টেকনোলজিতে তৈরি মহাকাশযান বিটা-৭১ চার বছর নিখোঁজ থাকার পর জানা গেলো মহাকাশে তার ধ্বংসস্তূপ ভেসে বেড়াচ্ছে!

-ব্যাপারটা আসলেই খুব দুঃখজনক স্যার।

-ছয় বছর আগে পৃথিবী ছেড়েছিলো মহাকাশযানটা। যেই মিশনে মহাকাশযানটাকে পাঠানো হয়েছিলো চারজন অ্যাস্ট্রোনটসহ, সেই মিশনেরই বা কী হলো কে জানে!

-চারজনের ভেতর তো একজন বাংলাদেশীও ছিলো, তাই না?

-হ্যাঁ! আমি নিশ্চিত ঐ বাংলাদেশী অ্যাস্ট্রোনট-ই কোনো ঝামেলা করেছে!

-আমারও তাই ধারণা স্যার। খোঁজ করলে হয়ত জানা যাবে, ঐ বাংলাদেশি অ্যাস্ট্রোনট বাংলাদেশের কোনো জঙ্গি সংগঠনের সঙ্গে জড়িত!

-হুম।

-আপনি ঠিক আছেন তো স্যার? আপনাকে খুব অসুস্থ লাগছে।

-হ্যাঁ, আমার শরীরটা গত দু’দিন ধরে ভালো যাচ্ছে না। গত পরশুদিন বিটা-৭১ এর ধ্বংসস্তূপটাকে পৃথিবীতে নিয়ে আসার পর দেখতে গিয়েছিলাম। মূলত তারপর থেকেই শরীরটা খারাপ! আর একটা অদ্ভূত ব্যাপার কী জানো?

-কী?

-যারা যারা গত পরশুদিন ওখানে উপস্থিত ছিলো, তারা সবাই-ই গত দু’দিন ধরে অসুস্থ! এবং সবারই একই অবস্থা- মাথাব্যথা, শরীর ভারী মনে হয় আর হঠাৎ হঠাৎ শরীরের বিভিন্ন জায়গার চামড়ায় টান অনুভব হয়!

-ভারী অদ্ভূত ব্যাপার তো!

-হ্যাঁ, আসলেই অদ্ভূত ব্যাপার!

-ঠিক আছে স্যার, আপনি তাহলে বিশ্রাম করুন। আমি আজ থেকেই তদন্ত শুরু করে দেবো, আর আশা করি খুব শীঘ্রই আমার তদন্তের একটা বিস্তারিত রিপোর্ট আপনার কাছে জমা দিতে পারব।

-ঠিক আছে, যাও তাহলে। বিটা-৭১ এর ধ্বংসস্তূপের ওখানে যেই গার্ড আছে তাকে আমি বলে দিয়েছি, সে তোমাকে সবরকম সহযোগিতা করবে।

-ধন্যবাদ স্যার।

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
দুটি প্রেমের কবিতা

দুটি প্রেমের কবিতা

আশিক মাহমুদ রিয়াদ আধার রাত্রির প্রার্থনা রাতের আধারে সব মিইয়ে গেছে! দেয়াল খসা, রংয়ের মতো। জীবন বেঁধে গেছে, বাস্তবতার শেকলে। তারা জীবন খুঁজেছে রাতের আধারে। ...
সাড়ে ষোল: আসছে আফরান নিশোর নতুন সিরিজ

সাড়ে ষোল: আসছে আফরান নিশোর নতুন সিরিজ

বাংলাদেশ কাঁপিয়ে এবার আফরান নিশোর প্রথম সিনেমা সুড়ঙ্গ মুক্তি পাচ্ছে ওপার বাংলা অর্থাৎ কোলকাতায়…অনেকেই প্রত্যাশা করছেন কোলকাতায় সিনেমাটি মুক্তি পেলে বাংলাদেশের মতোই সাড়া পাবে। এ ...
উটকে কেন জীবন্ত সাপ খাওয়ানো হয়?

উটকে কেন জীবন্ত সাপ খাওয়ানো হয়?

মরভূমির জাহাজ উট! বহুকাল ধরে তৃষ্ণার্ত মরুর বুকে উট মরুর জাহাজ নামে ব্যবহৃত হয়েছে। এখনও আরব বিশ্বে মালামাল ও যাত্রী বহনে উট ব্যবহার করা হয়ে ...
আমার বউ

আমার বউ

জোবায়ের রাজু সুন্দরী সুরমাকে দেখে তার প্রেমে দিওয়ানা হয়ে তাকে একেবারে আমার বউ করে ঘরে নিয়ে এসেছি। সংসার করে এখন বুঝি এই বউ জন্মের কিপটে। ...
ছাইলিপি ই-শারদ সংখ্যা-২০২০

ছাইলিপি ই-শারদ সংখ্যা-২০২০

প্রিয় পাঠক, শারদীয়ার শুভেচ্ছা গ্রহন করুন! আশাকরি বিশ্বের এই খারাপ পরিস্থিতি আপনি এবং আপনার পরিবারের সবাই ভালো আছেন কিংবা ভালো থাকার চেষ্টা করছেন।  এসেছে শারদোৎসব। ...
অণুগল্প- মন ঘুড়ি উড়া

অণুগল্প- মন ঘুড়ি উড়া

  আরণ্যক   মাঝে মাঝে শুকনাে পাতায় খসখস শব্দ উঠে—তখন ধীর পা হেঁটে যায় ক্যান্সাসের দক্ষিণে—ছায়া দীর্ঘ হয়ে একসময় সন্ধ্যা নামে টিলা চূড়ায় কমরেডরা ফর্সা ...