নেহাল মাহমুদ এর গুচ্ছ কবিতা

প্রেমের কবিতা – নেহাল মাহমুদ

 

 অবশেষে

অবশেষে কতটা সহজে অতিক্রম করে ফেলেছো
সেই দাম্ভিক সীমানা, অধিকারের পাহাড়, গর্বের মানচিত্র!
কতটা সহজে এক নিঃশ্বাসে বলে ফেলতে পারলে
সেই গর্হিত, নির্লিপ্ত, অপমানের চরণগুলো!
অনেকবার হয়তো ভাবতে হয়েছিলো, হয়তো
অনেকবার কথাগুলো আবৃত্তি করেছিলে মিথ্যে আয়নায়।
ঠিক কিভাবে এতোটা শক্ত হয়েছ তুমি?
আর কিভাবে নিজেকে শান্ত্বনা দিয়ে যাচ্ছ দিনের পর দিন?
নিজের প্রতিষ্ঠিত কষ্টের পতাকা দণ্ডায়মান রেখেছ?
নিশ্চয় খুব প্রয়োজন ছিলো সম্পর্কটা ছিন্ন করার,
পরিস্থিতি তোমাকে নিশ্চয় বাধ্য করেছিলো।
হয়তো কেউই বাধ্য করেনি, নিজ থেকেই ইতি টানলে।
আমার বোঝাটা হয়তো খুবই ভারি হয়ে গিয়েছিল।
কি করি বলো! আমার সমস্ত আমিত্ব, সমস্ত হৃদয়
সমস্ত আকাশ নির্দ্বিধায় তোমাকে অর্পন করেছিলাম।
আমি ইচ্ছে করে এমনটা করিনি, তোমার চোখ,
তোমার স্নেহ, তোমার বিশ্বাস ও তখন জোর দাবি করেছিলো।

আজ হয়তো মেয়াদ উত্তীর্ণ হয়েছে সেসব স্নেহের।
ঘরে ফিরে গিয়েছে সমস্ত কাজল মাখানো মায়ারা।
তাই স্বপ্নের সূর্য ও শুধু সময়ের অপেক্ষা করছিলোম
সত্যিই তো, এতো আলো, এতো জোয়ার আমি কেন পাবো?
আমার মতো ক্ষুদ্র পর্যটকের দাবি প্রকৃতিই বা কেন রাখবে?

 পালাবদল 

পরাজয়ের ক্রোধে আজকাল আর কাবু হইনা।
বিঘ্নিত দৃষ্টিদের মুখোমুখি হবার সংকোচে
আজকাল নতজানু হয়ে থাকেনে যাবতীয় জীবন।
যাবতীয় ঋণ পরিশোধ করে আমি আদিগন্ত হয়ে যাই।
কতিপয় কুর্নিশ ও তৈলাক্ততা রোধ করতে পারেনা
রুদ্ধ করতে পারেনা অপরিমিত হৃদয়ের বিস্তার।
মিথ্যায় মুদ্রিত প্রেম, ধুরন্ধর চিলের বানিজ্যিক শিকার,
কবিতায় উপচে পড়া স্নেহ,নিরন্তর সুখের প্রলোভন
সবকিছু মুছে ফেলেছে উপর্যুপরি স্বপ্নের বুনন।
সে তৈলচিত্র ভেঙ্গে গেলেও ভাজঁহীন শব্দরা পুড়ে।
নিসর্গের নিমজ্জন ভুলে আসমুদ্র অন্ধকার হয়ে যায়।
তার মাঝেই জেগে উঠে কঠোর তবু মৃন্ময় এক কন্ঠস্বর।
হারিয়ে গেছি আমি আজ ক্ষুব্ধ রাতের সন্ত্রাসে,
এবার আমার বিকৃত, অস্পষ্ট হয়ে যাবার পালা।

 ক্ষতি নেই, হয়তো তাঁর আছে 

পথ হারাবার কত ঢেউ ছিলো প্রান্তরে প্রান্তরে
আকাশে ছিলো কত দীপ্ত রঙ্গের মূর্ছনা।
অরণ্যের আশীর্বাদও ছিলো একদা
সমস্ত শিউলির সৌরভে।

কেউ একজন এই আসবে বলে
যে ইশারা বার্তা পাঠিয়েছিলো জোছনার নীল খামে,
সে প্রতীক্ষা আজ
শ্রাবণের গাল বেয়ে শরতের শিশির আর
হেমন্তের পাকা ধান্যের সুবাসে আজ ক্রমাগত আবর্তিত।

সে কন্ঠের তরঙ্গিত ঐশ্বর্য বিচিত্র রুপে
অপেক্ষার পালে তোলে ভৈরবী সুর।
প্রকৃতি ফিরিয়ে নিয়েছে মুখ,নিক।
ভেসে গেছে হাওয়ায় জীবনের প্রাপ্য, যাক।

কোন এক সূর্যোদয়ে সে আসবেই।
তাকে অবিশ্বাস করার চেয়ে
প্রতীক্ষার সুমিষ্ট তিক্ততা আস্বাদনে
তাই আমার কোন আপত্তি নেই,
ক্ষতি নেই কাটিয়ে দিতে এমন অনেকটা জীবন!

 আজ প্রতিদিন 

আজ সূর্য উঠে ধূসর ও মলিন হয়ে
চাপ চাপ বেদনার ক্রোধের ভয়ে।
গান গাইতে ভুলে যায় ভোরের পাখি
শিশিরের সঞ্চয় নিয়ে ধুয়ে ফেলে আঁখি।
দুপুর জেনে গেছে পোড়ানোর উচ্ছ্বাস
ব্যর্থ হাহাকার অযথা করে উপবাস।
বিকেলের কাছে ছুটে গিয়েও লাভ হয়না
তীর্যক আলোতে ইচ্ছেদের নির্মম অবমাননা।
শব্দশূণ্য, স্নেহশূণ্য, প্রেমশূণ্য, শূন্য সমস্ত প্রান্তর
আলোর অপেক্ষায় পথভ্রষ্ট হৃদয়ের কন্ঠস্বর
নিরন্তর ঢেকে থাকে শুধু সন্ধ্যার কালোছায়া
খোঁজে ফিরে স্মৃতিদের শ্মশানে জীবনের মায়া।
ক্রমে গাঢ় হয় রাত, ক্ষুদ্র হয় পরিধি
কষ্টরা জমে নীল হয়, কাঁদে নিরবধি।
অগণিত বৃক্ষের প্রেতাত্মা তরঙ্গের নেমে আসে
ভ্রুক্ষেপহীন ঠোঁট চাঁদের পানে চেয়ে হাসে।
বিক্ষিপ্ত তারকারা এক হয় কোন প্রতিচ্ছবির প্রতিজ্ঞায়
ভেসে ওঠে সে মুখ,ফের অধরা রেখেই মিলিয়ে যায়।
বৃষ্টিহীন এই বালুচরে স্তব্ধ হৃদয়ের বন্দর
বহুকাল যে হচ্ছেনা তার স্নেহের নোঙ্গর।

প্রতিবিম্ব 

অথচ পৃথিবী সেরে উঠেছে, রোজকার জীবনে
মহামারীর সেই ভয়ও অতিক্রম করেছে স্বপ্নের সঞ্চয়।
সমস্ত ধূসর পাখিরাও রঙ্গিন ডানা মেলে উড়ে যায়
আমি, তুমি কিংবা আমাদের আকাশ জুড়ে।

এক দু ফোটা করে শিশির ভাজঁহীন শব্দের মতো
সাজিয়ে চলে শীতের আগমনী গানের মহড়া।
গোধূলীর অকৃত্রিম রক্তিম আভাও জ্বলে জ্বলে
রোজ আছড়ে পড়ে সমুদ্রের চিবুকে।

অথচ চলমান ছায়ার মতো অদৃশ্যে বলয়হীন মেঘমালা
অযথাই প্রতিফলন করে বিষাদের দর্পন।
এক এক করে সেই দিনগুলোর প্রতিটি মূহুর্ত কাল প্রসারিত হয়ে
শরাহত প্রতিধ্বনি তোলে বিন্দু থেকে বৈকুন্ঠে।

অথচ এই আমি সেলাই করি শব্দের বুননে
টুকে রাখা আস্ফালন, হিমাদ্রি সমান বেদনা
অবসরপ্রাপ্ত স্নেহের গান, উৎসর্গিত সময়ের কলকন্ঠ,
কিছুটা শরীরের তৈলচিত্র এবং কিছুটা অস্পষ্ট তুমি!

মুক্তির ছাড়পত্র

নিশীথের এই বিদঘুটে অন্ধকার, নিশ্চুপ নীরবতা
তার গভীরে আড়াল হওয়া একটা সমুদ্রের প্রস্থান।

শতবার ভাঙ্গনের পরেও ভেঙ্গেচূড়ে গড়া
একটা ধৈর্যশীল পাহাড়ের বিজয় গল্পে
শেষাবধি একটা গুরুত্বপূর্ণ চরিত্র থেকে যেতে পারলাম না।

সে পাহাড়ে জমেছে স্বভাবতই জেগেছে ভাঙ্গনের গান,
জমেছে বহু ক্লান্তির কালো মেঘ।
তাই হয়তো জয়ের লক্ষ্যে, জীবনের অক্ষে
ঝেড়ে ফেলতে চায় সে যাবতীয় পিছুটান,
কথিত মায়ার বাধঁন, সম্পর্কের বেড়াজাল।
এসব অঙ্কীকারের বোঝা থেকে,
প্রিয়জনের খাদহীন স্নেহ থেকে,
হয়তো পৃথিবীর কক্ষপথ থেকে
সকলের থেকে ‘মুক্তি’ই তার অনন্ত আরাধ্য আশ্রয়।

প্রিয়,
তবু তোমার কালজয়ী উপন্যাসে
একটা প্রধান চরিত্র হারানোর কন্ঠে
জমেছে এক এক করে সমূহ নিরানন্দ দীর্ঘশ্বাস।
আমার রৌদ্রদগ্ধ প্রান্তরে তোমায়
আর হয়ে থাকতে হবে না অপরিমিত ছায়া হয়ে।
ঠিকই তো, পৃথিবীর সমস্ত বিষন্নতার আবরণে
তুমিই কেন আনবে নীলিমার উচ্ছ্বাস?
সমস্ত প্রতিশ্রুতির ভার তোমাকেই কেন বইতে হবে?
আমিও তা চাইনা,চাইনা আমার ভালোবাসাও।
তাই তোমার ফুরিয়ে যাওয়া অবেলায়,একটু নির্ভার থাকার প্রত্যাশায়
তোমার এমন প্রয়োজনীয় ‘মুক্তি’র নিবেদন কি করে ফিরিয়ে দেই, বলো?

বেশ তো, তবে তাই হউক।
মুক্তি……দিলাম তোমায়।

 পরিসংখ্যা

তুমি চলে গেছ,রয়ে গেছে বিশ্বাসী বর্ষা
আজও ঝরে আগের মতোই অকাতরে
হাওয়ায় হাওয়ায় গড়ে বলেন বিষাদের নীলনকশা।

তুমি চলে গেছ,উত্তাল হয়েছে শব্দের স্রোত
আজও নামহীন নক্ষত্রের মতো আবৃত্তি করি
রুগ্ন,উদ্বিগ্ন চরণে নির্মিত হয় সব অস্বীকারে ক্রোধ।

তুমি চলে গেছ, ভাস্বর হয়েছে ভাঁজহীন সময়ের ছায়া
ক্ষুধার্ত হয়ে অনুভূতি ঘুরেফিরে চতুর্দিগন্তে তার
মুঠোভরা যন্ত্রণা প্রাপ্তিতে রোজ,লেগে গেছে মায়া।

তুমি চলে গেছ, জেগে আছে সে পথের ঘাসফুল
জর্জরিত চেতনা, প্রতিটি ইটের অবিচ্ছিন্ন প্রশ্নবাণে
নির্বাক, তাই উপেক্ষায় পতিত হয় শিশিরের কল্লোল।

তুমি চলে গেছ,রয়ে গেছে সে কাজলরেখায় প্রবল সাহস
আজও সলিল বিকিরণে দিগন্ত হারায় সেই দৃষ্টি করোতল
আমার তরে নয় জানি, তবু প্রাণটা তোমাতেই আজও অবশ।

তুমি চলে গেছ,জীবনের ক্ষয় এখনো মত্ত
আজও অনিদ্র হৃদয় হিসাব কষে তোমারি নীলিমার
নিঃশ্বাসের ঘৃণা অতিক্রমে আর চাইনা কোন উপাত্ত।

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *