বই পর্যালোচনা / বুক রিভিউ- প্যারাডক্সিকাল সাজিদ

বইয়ের নাম : প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ

লেখক        : আরিফ আজাদ 

প্রকাশনী     : গার্ডিয়ান 

বই পর্যালোচনা- হাসিবুল ইসলাম শান্ত 

 

লেখক পরিচিতি; 

আরিফ আজাদ। জন্ম: ৭ই জানুয়ারি ১৯৯০, চট্টগ্রামে। উচ্চশিক্ষা সম্পন্ন করেছেন চট্টগ্রাম বিশ্ববিদ্যালয় থেকে। তিনি একজন স্যোশ্যাল মিডিয়া অ্যাক্টিভিস্ট। লেখেন বিশ্বাসের কথা। বিচূর্ণ করেন অবিশ্বাসের আয়না। অমর একুশে বইমেলা ২০১৭ -এ সাড়া জাগানো ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ তার প্রথম প্রকাশিত গ্রন্থ। 

 

বই সম্পর্কে কিছু কথা;

লেখক এই বইয়ে পাঠক সমাজের জন্য গল্পের মাধ্যমে আলোকিত জীবনের পথ দেখিয়েছেন। তিনি অবিশ্বাসের দেয়ালকে ভেঙে দিয়ে বিশ্বাস স্থাপন করেছেন। বিজ্ঞানের পিছনে পড়ে যারা আল্লাহকে বিশ্বাস করতে লজিক খুঁজে, যারা মনে করে যে, আল্লাহকে বিশ্বাস করতে লজিকের ভান্ডার দেখাতে হবে!  তাদের জন্য এই বইটি। 

মোটকথা-  অবিশ্বাসীদের কাছে বিশ্বাসের অক্সিজেন পৌঁছে দেওয়ার জন্য এই বইটি লেখা।

 

সংক্ষিপ্ত আলোচনা 

সাজিদ নামের একজন তরুণ। যে নিজেকে নাস্তিক মনে করে। তার কথা হলো- আল্লাহ কে বিশ্বাস করাতে হলে তাঁকে আল্লাহকে দেখাতে হবে। কারণ-

               ‘আন সিন ইজ নাথিং’

নতুবা যুক্তি দিয়ে তার সমস্ত চিন্তা চেতনা পাল্টে দিতে হবে। সাজিদের সাথের রুমমেট আবার আল্লাহকে বিশ্বাস করে। সে বিভিন্ন কথার মাধ্যমে সাজিদকে বোঝানোর চেষ্টা করে। কিন্তু সাজিদ সবকিছু তাচ্ছিল্য করে  উড়িয়ে দেয়।

 

কিন্তু আস্তে আস্তে সাজিদের বন্ধু তার যুক্তির শিকল দিয়ে সাজিদকে বেঁধে ফেলে। এবং সাজিদের মনোভাব পরিবর্তন করে তাকে সঠিক পথে আনতে সক্ষম হয়। একপর্যায়ে সাজিদ তার মধ্যে থাকা মিথ্যাকে বিশ্বাসের পানি দিয়ে পবিত্র করে। তার অন্তরে বিশ্বাসের দীপশিখা জ্বলে উঠে। সে তার বন্ধুর সাথে নামাজে শরীক হয়। নাস্তিক থেকে আস্তিক হয়েই তার সম্মুখপানে এগিয়ে চলা থেমে যায় না। এরপর থেকে সাজিদ নাস্তিকদের বিরূদ্ধে যুক্তি দিয়ে লড়তে থাকে। নাস্তিকদের বিভিন্ন প্রশ্নের উত্তর কুরআন, হাদিস দিয়ে দিতে থাকে। সে  ইসলাম কে প্রতিষ্ঠিত করতে ও ইসলামের মর্যাদা উঁচু করতে সর্বোচ্চ চেষ্টা চালিয়ে যায়।

 

 

বইটি ভালো লাগার কারণ; 

বইটিতে অল্প কিছু কাগজ ও সামান্য কালির মাধ্যমে ইসলামের কিছু চরম সত্য কথা তুলে ধরা হয়েছে। নাস্তিকদের সামনে সুন্দরভাবে কুরআন, হাদিসের দলিল যুক্তি সহকারে উপস্থাপন করা হয়েছে।

ইসলামের ভুল ব্যাখ্যা করে যুগান্তরে নাস্তিকেরা যে অপপ্রচার করে যাচ্ছে, যুক্তি-তর্কের মাধ্যমে তার সমুচিত জবাব দেওয়া হয়েছে। 

গল্প ও সাহিত্যের মধু দিয়ে নাস্তিকদের বিভিন্ন প্রচলিত প্রশ্নের উত্তর এত সুন্দরভাবে দিয়েছেন যে সেটা প্রশংসনীয়!

 

পাঠ প্রতিক্রিয়া

আরিফ আজাদ’র লেখা এটাই আমার প্রথম পঠিত বই। তিনি অত্যান্ত সাবলীলভাবে বইটাকে পাঠকের কাছে তুলে ধরেছেন।  একজন তরুণ লেখক এত চমৎকার ও যৌক্তিক ভাষায় নাস্তিকদের কে দাঁতভাঙা জবাব দিয়েছেন যে, তিনি অবশ্যই প্রসংশা পাওয়ার যোগ্য। 

 

  বইটা পড়তে পড়তে কখন যে শেষ হয়ে গেছে বুঝতেই পারিনি! প্রতিটি অধ্যায় শেষে আমি শিহরিত হয়েছি। মনে হয়েছে- আহা! এমন পরিস্থিতির সম্মুখীন তো আমিও অনেকবার হয়েছি, কিন্তু কখনো তো এভাবে ভেবে দেখিনি! নাস্তিকদের মনে বিশ্বাসের আওয়াজ পৌঁছে দেওয়ার জন্য গল্পকারে বিভিন্ন যুক্তির মাধ্যমে বইটা পরিপূর্ণ করেছেন লেখক। লেখকের যুক্তি, কুরআন হাদিসের রেফারেন্স এবং তার বর্ণনাশৈলীতে আমি রিতীমত মুগ্ধ!  বার বার মনে হচ্ছিল, বইটিতে আরো কিছু কালো অক্ষরে লেখা পৃষ্ঠা থাকলে ভালো হত।

 

 

 

বইটি অন্যদের কেন পড়া উচিত;

বর্তমান সামাজের ইসলাম বিদ্বেষী মানুষেরা অত্যান্ত বিচক্ষণতার সাথে তরুণ প্রজন্মের কাছে ইসলাম সম্পর্কে সন্দেহের বীজ বপন করছে। সন্দেহ থেকে হচ্ছে অবিশ্বাস। কথায় আছে ‘অর্ধেক সত্য মিথ্যার চেয়েও ভয়ংকর’। নাস্তিকেরা কুরআন-হাদিসের আংশিক আদেশ বা নিষেধের অপব্যাখ্যা করে সমাজে অবিশ্বাসের যে বিষবৃক্ষ রোপণ করতে চায়, সত্য উন্মোচন করে সেই নাস্তিকদের উপুর্যুপরি জবাব দেওয়া হয়েছে এই বইয়ে।

 

নাস্তিকদের অপপ্রচারের বিরুদ্ধে  অনেকেই জবাব দিয়েছেন । এই বইটা সেসব  জবাবের ভিত্তিকে আরো মজবুত করেছে। বইটি পড়লে নাস্তিকেরা ও ইসলাম নিয়ে চিন্তা করবে। সঠিক জ্ঞানের অভাবে ইসলাম থেকে যারা মুখ ফিরিয়ে নিচ্ছে এমন মানুষের জন্য বইটা অত্যান্ত জরূরী।

সুতরাং- জ্ঞানের আলোয় নিজেকে ও ইসলাম বিদ্বেষী সমাজে ইসলামকে প্রতিষ্ঠিত করার জন্য প্রতিটি মানুষের  ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ অবশ্যপাঠ্য বলেই আমি মনে করি।

 

 

যুব সমাজের মধ্যে সাজিদ হয়ে ওঠার প্রবণতা;

একটা সময় ছিলো, যখন প্রত্যেকটা যুবক হিমু হতে চাইতো! কিন্তু সময়ের পরিবর্তনের সাথে সাথে যুবক সমাজের চিন্তা চেতনাও পাল্টে গেছে। প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ যুবকদের সেই চেতনা পরিবর্তন করেছে। তারা এখন হিমু হওয়ার বদলে সাজিদ হতে চায়। সাজিদ হয়ে সমস্ত নাস্তিকদের কে উচিত শিক্ষা দিতে চায়। যুবক সমাজ এখন হুশিয়ার হয়ে গেছে। নাস্তিকদের বিরূদ্ধে প্রত্যেকটা যুবক এখন নিজেদের কে সাজিদ রূপে প্রতিষ্ঠিত করতে চায়।

 

লেখকের সফলতা;

‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ বইয়ের চমৎকার বর্ণনাশৈলী, ঝরঝরে, প্রাঞ্জল যুক্তির সমারোহ পাঠকের হৃদয়ের  মণিকোঠায় জায়গা করে নিয়েছে। বইটা পাঠক এত পরিমাণ ক্রয় করেছে যে ২০১৭ সালে বইটা প্রকাশ হওয়ার পরে সেই বছরেই রকমারি বেস্ট সেলার বইয়ের খেতাব অর্জন করেছে। লেখক যুবসমাজের ধর্মবিরোধী চিন্তাচেতনায় মোটাদাগে প্রশ্ন তুলে তাদের কুযুক্তিগুলো খন্ডন করেছেন দক্ষ হাতে।

বইটি পড়ার পর বিশ্বাস করতে কষ্ট হয় যে, এটা একজন লেখকের লেখা প্রথম বই! নাস্তিক মহলে ‘আরিফ আজাদ’ এখন আর শুধু একজন মানুষের নাম নয়, আরিফ আজাদ একটা ব্র্যান্ড। আরিফ আজাদ মানেই নাস্তিকদের আতঙ্ক। তরুণ লেখকের জন্য এর চেয়ে বড় পাওয়া/ বড় সফলতা আর কি হতে পারে!

 

এই বইয়ের মাধ্যমে ইসলামি প্রকাশনা জগতের নব উত্থান; 

একটা সময় ছিলো যখন-

বাচ্চা থেকে শুরু করে তরুণ, যুবক, বৃদ্ধ সবাই গল্প, উপন্যাস ছাড়া কোন বই চিনতো না। এসব বইয়ের বাইরেও যে ইসলামি বই বিভিন্ন প্রকাশনী থেকে প্রকাশ করে, সেটা খুব কম লোকেই জানতো! ইসলামি প্রকাশনা যে সৃজনশীল সাহিত্যের অঙ্গনেও স্বাচ্ছন্দ্যে বিচরণ করতে সক্ষম, তা ছিল পাঠকসমাজের কল্পনাতীত। কিন্তু ‘প্যারাডক্সিক্যাল সাজিদ’ সমাজের সেই গতানুগতিক চিন্তাধারা পাল্টে দিয়েছে।

ইসলামি বই পঠনপাঠন একটা ট্রেন্ড হয়ে দাঁড়িয়েছে। সবাই এখন আউট বইয়ের পাশাপাশি ইসলামি বইগুলো প্রচুর ক্রয় করছে। কোনওরকম ফ্যাসিলিটিজ ছাড়া, নানা বাধা-বিপত্তি সত্বেও ইসলামি প্রকাশনা প্রতিষ্ঠান এখন বাংলার বুকে দ্বিতীয় সেরা প্রকাশনী হওয়ার ক্ষমতা রাখে।  ইসলামি বইগুলোর চাহিদা এত পরিমাণ বেড়েছে যে, প্রায় প্রত্যেকটা প্রকাশনী এখন ইসলামিক বই প্রকাশের দিকে নজর দিচ্ছে। উপরোক্ত আলোচনার আলোকে বলা যায় যে, এই বইয়ের মাধ্যমে ইসলামি প্রকাশনা জগতের নব উত্থান ঘটেছে।

 

বিশেষ একটি বার্তা

বিশ্বাসের বিশুদ্ধ বাতায়নে অবগাহন করে সাজিদ হয়ে উঠবেন।

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *