মৃধা আলাউদ্দিনের বই : সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে

আল হাফিজ

হাজার বছরের বাংলা কবিতার ক্রমবিকাশময় ইতিহাসের দিকে তাকালে বেশ কটি বাঁক বদলের চিত্র খুব সহজেই চিহ্নিত করা যায়। নদীর গতিধারার মতোই যা সতত রহমান। চর্যাপদ থেকে শুরু করে মধ্যযুগ পেরিয়ে আধুনিক যুগে এসেও তার গতিময়তা থেমে যায়নি। মাইকেল-রবীন্দ্রনাথ-নজরুল-জসীমউদ্দিন-জীবনানন্দ দাশ-ফখরুখ আহ্মদ-আহসান হাবীব-শামসুর রাহমান-আল মাহমুদ হয়ে ষাট, সত্তর, আশি এবং নব্বই দশকে এসেও গতি তার সাবলীল। কবিতার ইতিহাস মূলত কাব্য ভাষার সাবলিল গতিময়তারই ইতিহাস। কাব্য ভাষার নান্দনিক ভাঙচুরের মধ্য দিয়েই কবিতার নতুন ইতিহাস অমিত তেজ নিয়ে দাঁড়িয়ে যায়। বাংলা কবিতার ইতিহাসে নব্বই দশক একই স্বনির্ভর মাইলফলক হিসেবে এখনও সৃজনশীল-বিচরশীল নদীর মতোই বেগবান এই গতিধারার এক একনিষ্ঠ পরিব্রাজকের নাম মৃধা আলাউদ্দিন।

নির্জনতার নিভৃতে বসবাসকারী ছন্দসচেতন এই কবি সম্প্রতি প্রকাশ করেছেন তার ‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’ শীর্ষক কবিতার বই। দুটি অনূবাদসহ ৬০টি কবিতার ৮০ পৃষ্ঠার এ বইটির প্রকাশক মোহাম্মদ লিয়াকত উল্লাহÑ স্টুডেন্ট ওয়েজ। বইটির দৃষ্টি নন্দন প্রচ্ছদ এঁকেছেন শিল্পী নির্ঝর নৈঃশব্দ্য।
বাংলা কবিতার নব্বই দশক শুরু হয়েছে স্বৈরাচারবিরোধী আন্দোলন দিয়ে। নব্বইয়ের কবিরাও এ আন্দোলনে যুক্ত ছিলেন। তবে গণতন্ত্র প্রাপ্তি ও গণতান্ত্রিক অভিযাত্রা নিয়ে তারা সংশয়মুক্ত ছিলেন না। তাদের চোখের সামনে তারা দেখেছেন বিশ^ব্যাপী হানাহানি-নৈরাজ্যও অর্থনৈতিক বিপর্যয়ের তুমুল তুফান। দেখেনে মানবিক মূল্যবোধের বিপর্যয়। আর এসব কারণেই নব্বইয়ের কবিতায় আত্মোপলব্ধির চরিত্র ও বিমূর্ততার ছাপ বিশেষভাবে প্রাধান্য পেয়েছে। নব্বইয়ের কবি হিসেবে মৃধা আলাউদ্দিনের কবিতাও মৃত-বিমূর্ততার নান্দনিক মিশেলে গড়ে উঠেছে আত্মোপলব্ধির এক নতুন বয়ান হিসেবে। তার কাব্য প্রয়াসে ফুটে উঠেছে অর্জিত প্রেম, প্রেমের দহন আর হারানোর তিক্ততা। রোমান্টিক আবেগের আতিশয্যে তার কাব্যভাষা গোলাপগন্ধ জলে সিক্ত হয়েছে বারবার যেমন

ক. ওগো আমার আড়ষ্ট জিহ্বা!
মুসার মতো ক্রন্দন করো
কেননা, আমার একান্ত অভিলাষ
আমি সন্ধ্যার সুন্দর সঙ্গীতে মত্ত থাকি।
[অভিলাষ-১, পৃষ্ঠা ৩৭]

খ. আমি সেই সাঁকো ভেঙে চুরমার করে দেবো
যা আমাকে বারবার পৌঁছে দ্যায়
পিলসুজ প্রতারক পাপড়ির কাছে।
-[কষ্টসংক্রান্ত কাটলেট, পৃষ্ঠা ৩৬]

গ. আমি বিলীন হয়ে যাচ্ছি সন্ধ্যার শেষ সূর্যের মতো
মথিত সঙ্গমশেষে দিগন্ত যেখানে নুয়ে পড়ে
গোলাপি ঠোঁট, তোমার মায়াবী চোখের মিটিমিটি তারায়।

[কোনো এক শ্রাবণ সন্ধ্যায়, পৃষ্ঠা-১৩]

একজন কবির এই অস্তিত্বময় জগতে সে রোদের ক্লোরোফিলে সবুজ হতে চায়। তার আশা সামনের শীতে মানুষ নিজে রোদ হবে, উত্তাপ দেবে এবং পৃথিবীর গড়বে সবুজ সজীবতায়। এখানে সে সন্ধ্যার সুন্দর সঙ্গীত হবে, রাতের জোছনা হবে এবং একদিন মাটির গন্ধে ভরে উঠবে মন, মনের হিমায়িত ময়ূর। যেমন করে হরিণগুলো সমপ্ত মানুষের অবয়য়ে নামিয়ে দেয় দ্যুতিভরা দীপ্র দুপুরÑ সুন্দর সুর। ফলে নুয়ে আসে নরম ঘাসের মতো চোখ… সন্ধ্যার দৃশ্যমান শব্দগুলো। এভাবেই জীবনও জগতকে দৃশ্যমান করতে গিয়ে যে বিচিত্র শব্দকৌশল ও ভাষাচিত্র ব্যবহার করে মৃধা তার কাব্য জগতকে মূর্ত করে তুলেছে। এককথায় তাকে নতুন নান্দনিক কাব্যপ্রয়াস বলা যায়। ছন্দ-রূপ-গন্ধময় তার এ প্রয়াস বাংলাদেশের ঋতুবৈচিত্র্যের মতোই বৈচিত্র্যময়Ñ আবেগে টইটম্বুর, রঙধনুর রঙে উজ্জ্বল এবং সহজ সরল স্বীকারোক্তির মতোই আন্তরিক।

যেমন-
ক. বিরহের পেয়ালায় চুমুক দিয়ে আমি পথ হারিয়ে ফেলেছি।
এখন তোমরাই বলো, শুঁড়িখানা কোথায়Ñ
আর আমি যাবোই বা কোনদিকে?
আমার যে কলঙ্ক হবে।
বিরহের পেয়ালা, পৃষ্ঠা-৭৪]

খ. আমি নদীর ঘাটে যাই। উর্মিমালা দেখি। বাঁশি বাজাই…।
নৌকায় চড়ি বা বনপথে হাঁটিÑ আমি যা-ই করি, লোকেরা হাসে।

[আমার যতো দোষ, পৃষ্ঠা-৭৭]

মৃধা তার নরম কোমল হৃদয় ছোঁয়া অনুভবকে এমন এক অতিলৌলিক প্রতীতীঘন শব্দের মমতাজালে রূপময় লাবণ্য শোভায় উপস্থাপন করেনÑ যে বিস্ময়কর শিল্পসুষমার মধু দিয়ে অন্তর ছাপিয়ে যায়। কল্পচিত্রলোকে। ব্যক্তিগত-আনন্দ-বেদনা তখন সর্বমানবের আনন্দ-বেদনার সারোৎসার হয়ে ওঠে। তার কাব্যসংসারের কোথাও রেডিমেড কল্পনা প্রসূণ নেই। নেই আরোপিত জবরদস্তি। আছে সহজিয়া আনন্দকীর্তন, আছে সাবলীল হয়ে ওঠার পক্সক্ষীকূজনÑ হয়ে ওঠার এই সবিনয় বিকাশের অন্তরালে লুকিয়ে থেকে উদ্্যাপিত হয় কবি প্রতিভার আন্তর্জাতিক জটিল চিন্তাদর্শন।
রহস্যময় জীবনবোধের যৌথরসায়ন। বৌদ্ধিক ভাবনার প্রগাঢ়তা এবং যৌথ জীবন-যাপনের সরস সংঘবদ্ধতার ফলে তার কাব্যপাঠ হয়ে ওঠে নিবিড়তম আশ্রয়ধাম। আশাবাদী হয়ে ওঠে মানুষের প্রিয় মানচিত্র।

যেমন-
ক. মানুষ আর মানুষ থাকবে না
সামনের শীতে সে রৌদ্র হবে
ঝরনা হবে পৃথিবীর অর্ধেক।
[সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে, পৃষ্ঠা-১৯]

খ.
তোমরা নদীর জলে রৌদ্রের সার দাও
ঢেউ লাগাও মাটির মার্গন মউলে
এবঙ দেখে নিঅ রাত্রিরে, একদিন
নদী ও মাটিরা গর্ভবতী হলে
মানুষ ফিরে পাবে কল্যাণময় কস্তুরি রাত…
[পৃথিবী বাড়ন্ত বৃক্ষ ও ঝরনা হবে]  পৃষ্ঠা-২২

গ.
বৃষ্টির পানির সাথে ধুয়ে যাবে গন্ধের কিরিচ
ধুয়ে যাবে সব কিছু পোড়াবাড়িÑ দ্বিধার পিরিচ।
[বাজিকর  দ্বিধার কিরিচ, পৃষ্ঠা-৫৩]

রাজনীতি সচেতন, আশাবাদী কবি মৃধার কবিতায় রয়েছে স্বদেশ প্রেমের প্রগাঢ় আলিঙ্গন, রয়েছে মানবিক ভালোবাসাবাসি, নিঃসনঙ্গচেতনা, স্মতিক সমাজ ভাবনা ও সবুজ প্রকৃতির টান। নব্বই দশকের নিভৃতচারী এই কবি যখন উচ্চারণ করেন,
হ্যাঙ্গারে ঝুলে আছে বিশাল টি-শার্ট
বন্দুকে ঝাঁঝরা করা বুক আর বুকের ভেতরে মাটিতে দেখা যায় অস্যংখ লাশ।
-[এক সাথে ধ্বংস আর বর্ধিষ্ণু গ্রাম, পৃষ্ঠা-৪৪]

তখন বিবেকবান মানুষ নির্বাক পাথর হয়ে ওঠেন। হয়ে ওঠেন নিঃশ্চুপ নিষ্ঠুর বারুদ। কবির কণ্ঠে কণ্ঠ মিলিয়ে একসময় সমস্বরে বলে ওঠেন, ‘আমি ভেঙে দেবো পৃথিবীর পরচর্চা… ভেঙে দেবো রুগ্ণ রোদ মেশানো আজাজিল আসমান; কবি তখন আরও দৃঢ়তার সঙ্গে উচ্চারণ করেন,
একটি আলোময়, অলৌকিক হ্যাঙ্গারে
বিশাল ঝুল বারান্দায় অথবা সমমান সমুদ্রে
নীল সমুদ্রে আমি সিদ্ধ দেবো আজকের নিমজ্জিত সভতা।
=

প্রতিটি স্বাস্থ্যকর প্রজ্ঞাময় নুনের ফোঁটার মতো
সিদ্ধ হয়ে এই গ্রেনেড হামলা করা পৃথিবী।
পুঁজি আর সাম্রাজ্যবাদের বিরুদ্ধে আমাদের এই সিদ্ধ
অন্ধ ঈগলকে বোল শেখাবার জন্য সিদ্ধ।
আঁধার অথবা পোড়ো জমিতে ফুল ফোটাবার জন্য সিদ্ধ।
[সিদ্ধ পৃথিবীর জন্য পঙ্্ক্তি, পৃষ্ঠা-৩১]

‘সামনের শীতে মানুষ রৌদ্র হবে’ এই প্রত্যাশা শুধু কবি মৃধা আলাউদ্দিনের একার নয়, এই প্রত্যাশা সকল দেশের সব মানুষের। কবি মৃধা আলাউদ্দিন প্রকৃত অর্থে সকল মানুষের আত্মার কবি হয়ে উঠুন এই প্রার্থনা থাকলো নিরন্তর।
তার কাব্যভাষার প্রায়োগিক সৌন্দর্য আরো দ্যুতি ছড়াক দেশ থেকে দেশান্তরে সেই শুভ কামনাও করছি।

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *