বিপ্লবের পঙক্তিমালা

সাহিদ আনোয়ার

ছোটবেলার ডানপিটে,দুরন্ত,হার না মানা ছেলেটি যে রক্তের বিনিময়ে দেশকে স্বাধীন করবে এটিই ছিল পূর্ব পাকিস্তানের মনবাসনা।

১৯২০ সাল,১৭ই মার্চ অধুনা বাংলাদেশের গোপালগঞ্জ জেলার টুঙ্গিপাড়া গ্রামে লুৎফার রহমান ও সাহেরা খাতুনের ঘরে ফুটফুটে এক পুত্র সন্তান জন্ম নেয়।তিনিই হলেন বাঙালি জাতির পিতা বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবর রহমান।শৈশবে তিনি দুর্দান্ত দুরন্ত ও ডানপিটে ছিলেন।

জীবনের প্রথম হাতেখড়ি গিমাডাঙ্গা টুঙ্গিপাড়া প্রাথমিক বিদ্যালয়ে।তারপর গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুল থেকে ১৯৪২ সালে মেট্রিক পাশ করেন।দুই বছর পর তাঁর মেধার জোরে কলকাতা ইসলামিয়া কলেজ থেকে এইচ এস সি পাশ করেন।তিনি রাষ্ট্রবিজ্ঞান ও ইতিহাসে স্নাতক হন।তারপর ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ে আইন বিভাগে ভর্তি হন।কিন্তু ১৯৪৯ সালে চতুর্থ শ্রেণীর কর্মচারীদের ন্যায্য অধিকার আদায়ের আন্দলনে যোগদান করায় তাঁকে ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয় থেকে বহিষ্কার করা হয়।

তিন পুত্র ও দুই কন্যার পিতা শেখ মুজিব
১৯৩৯ সালে মাত্র ১৯ বছর বয়সে ফজিলাতুন্নেসার সাথে বিবাহ বন্ধনে আবদ্ধ হন।

তাঁর জীবনের বেশিরভাগ সময়টাই কেটে গেছে যুব আন্দোলন আর রাজনীতি করে।তার ফলে বেশ কয়েকবার তাঁকে জেলে যেতে হয়েছে ।
রক্তে যেন রাজনীতি মিশে আছে।গোপালগঞ্জ মিশন হাই স্কুলে থাকাকালীন ব্রিটিশ বিরোধী আন্দলনে যোগদান করার জন্য কারাভোগ করতে হয় তাঁকে।

তাঁর জীবনের প্ৰথম সংগ্রাম ছিল ব্রিটিশ বিরোধী সংগ্রাম।দ্বিতীয় সংগ্রাম ছিল পাকিস্তান বিরোধী মুক্তি সংগ্রাম।

“অধিকার চেয়ে পাওয়া যায় না,কেড়ে নিতে হয়”এই মতাদর্শে বিশ্বাসী ছিলেন তিনি।
তাই তিনি বার বার সংগ্রাম করে গেছেন অন্যায়ের বিরুদ্ধে।
বুদ্ধিদীপ্ততা আর নেতৃত্ব দেওয়ার অসাধরন দক্ষতার মাধ্যমে কলকাতায় থাকাকালীন কলেজের ছাত্র ইউনিয়নের সাধারণ সম্পাদক নির্বাচনে বিনা প্রতিদ্বন্দ্বিতায় নির্বাচিত হন।
তৎকালীন পূর্ব পাকিস্তানের তিনি ছিলেন তরুণ প্রজন্মের নেতা।
দেশে ফিরে ১৯৪৮ সালে বাংলাদেশ ছাত্রলীগ প্রতিষ্ঠা করেন।

সে বছর রাষ্ট্রভাষা সংগ্রাম এর পিকেটিংয়ের সময় গ্রেপ্তার হন।
পরের বছর মাওলানা ভাসানীর সাথে ভুখা আন্দলনে নেতৃত্ব দিতে গিয়ে গ্রেপ্তার হন।

১৯৪৯ সালে মাওলানা আব্দুল হামিদ খান ভাসানী কর্তৃক আওয়ামী লীগ প্রতিষ্ঠিত হলে কারাগারে থাকাকালীন মুজিব আওয়ামী লীগের যুগ্ম সম্পাদক নিযুক্ত হন।
১৯৫৩ সালে তিনি আওয়ামী লীগের সাধারণ সম্পাদক নিযুক্ত হন।

তাঁর জীবনের এক বৃহৎ অংশ মিথ্যা মামলার অজুহাতে করাবাসে কেটে যায়।
১৯৬৬ সালে লাহোর অধিবেশনে তিনি বাঙালীর মুক্তিসনদ ছয় দফা উপস্থাপন করেন।কিন্তু তাঁর কথার কোনো গুরুত্ব না দিয়ে ভুট্টোর কথা মেনে নেয় পশ্চিম পাকিস্তানের শাসক দল।

শেখ মুজিব ছিলেন জনমানুষের নেতা।
তিনি মানুষের যতই কল্যাণ করেছেন ততই মানুষের কাছ থেকে ভালোবাসা পেয়েছেন।
তাঁর মুক্তির দাবিতে রাজপথে বিশাল মিছিল,ছাত্র জনতা বিক্ষোভ অনশন হয়।
তিনি আসলেই জনগনের বন্ধু।
তৎকালীন ঢাকসুর ভিপি তোফায়েল আহমেদ ১৯৬৯ সালের ২০ ফেব্রুয়ারি ঐতিহাসিক রেসকোর্স ময়দানে তাঁকে,” বঙ্গবন্ধু “উপাধিতে ভূষিত করেন।

৫ ই ডিসেম্বর ১৯৬৯,হোসেন শহীদ সোহরাওয়ার্দীর  মৃত্যুদিবসে পূর্ব পাকিস্তানের নতুন নামকরণ করেন বাংলাদেশ।তাঁর এই অসামান্য কৃতিত্বের জন্য পরবর্তীতে ঢাকসুর ভিপি আ স ম আব্দুর রব শেখ মুজিবুর রহমানকে বাংলাদেশের “জাতির জনক” উপাধি দেন।

তাঁর জীবনের এক বিশেষ দিন ৭ই মার্চ,১৯৭১ ঐতিহাসিক ৭ই মার্চের ভাষণের দিন।
রেসকোর্স ময়দান তাঁর ভাষণে মুখর হয়ে ওঠে।
সেদিন হাজার হাজার জনতার সামনে তিনি বলেন-রক্ত যখন দিয়েছি আরো দেব।তবুও এদেশের মানুষকে মুক্ত করে ছাড়বো ইনশাআল্লাহ।এবারের সংগ্রাম মুক্তির সংগ্রাম,এবারের সংগ্রাম স্বাধীনতার সংগ্রাম।

দুঃখের বিষয় পাকিস্তানি বাহিনী ২৫ শে মার্চ সেনাবাহিনী দিয়ে ব্যাপক হারে গণহত্যা চালায় এবং সে রাতে তাঁকে গ্রেপ্তার করে।নিয়ে যাওয়া হয় পশ্চিম পাকিস্তানে।দীর্ঘ ৯ মাস কারাভোগ করার পর দেশে ফেরেন।
গ্রেফতারের আগে তিনি বলে যান-“This is my last message to you.From today Bangladesh is independent.”

৯ মাসের রক্তক্ষয়ী মুক্তিযুদ্ধ শেষে ১৯৭১ সালের ১৬ই ডিসেম্বর ভারত-বাংলাদেশ যৌথ বাহিনীর কাছে পাকিস্তানি সেনাবাহিনী আত্মসমর্পণ করে ও পূর্ব পাকিস্তানের নাম পাল্টে বাংলাদেশ নামে স্বাধীন রাষ্ট্রের প্রতিষ্ঠা হয়।
১০ জানুয়ারি ১৯৭২ শেখ মুজিব পাকিস্তানের কারাগার থেকে মুক্ত হয়ে স্বদেশে প্রত্যাবর্তন করেন এবং বাংলাদেশের প্রথম রাষ্ট্রপতির পদ লাভ করেন।
১৯৭২-এর ১২ই জানুয়ারি তিনি সংসদীয় শাসনব্যবস্থা প্রবর্তন করে প্রধানমন্ত্রীর দায়িত্ব গ্রহণ করেন।
মতাদর্শগতভাবে তিনি বাঙালি জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতায় বিশ্বাসী ছিলেন, যা ‘মুজিববাদ’নামে পরিচিত।
জাতীয়তাবাদ, সমাজতন্ত্র, গণতন্ত্র ও ধর্মনিরপেক্ষতাকে ভিত্তি করে সংবিধানপ্রণয়ন এবং সে অনুযায়ী রাষ্ট্র চালনার চেষ্টা সত্ত্বেও তীব্র দারিদ্র্যতা,বেকারত্ব, অরাজকতা,দুর্নীতি মোকাবিলায় তিনি কঠিন সময় অতিবাহিত করেন। ক্রমবর্ধমান রাজনৈতিক অস্থিরতা দমনের লক্ষ্যে ১৯৭৫ খ্রিষ্টাব্দে তিনি এক দলীয় রাজনীতি ঘোষণা করেন। এর সাত মাস পরে ১৯৭৫ সালের ১৫ আগস্ট তারিখে একদল সেনা কর্মকর্তার হাতে তিনি সপরিবারে নিহত হন।
২০০৪ সালে বিবিসি’র সম্পাদিত একটি জরিপে শেখ মুজিবুর রহমান “সর্বকালের শ্রেষ্ঠ বাঙালি” হিসেবে সর্বাধিক ভোটলাভ করেন।
মরণোত্তর এই সম্মান তাঁকে বাঙালী জাতির হৃদয়ে অমর করে রাখবে।

তিনি জীবনে অনেক ভালো কাজ করেছেন।মানুষের কল্যাণের জন্য সর্বদা নিজেকে নিয়োগ করেছেন।
তাঁর এহেন ভালো কাজের জন্য বিশ্বশান্তি পরিষদের দেওয়া সর্বোচ্চ সম্মাননা ‘জুলিও কুরি’ পুরস্কার লাভ করেন।

যে দেশের জন্য এতো কিছু করলেন,যে দেশের মানুষকে নিজের থেকেও বেশি ভালোবাসতেন সেই দেশের মানুষই তাঁকে প্রাণে বাঁচতে দিল না।আফসোস,অবেলায় বিদায় অনেক যন্ত্রণাদয়ক।

১৯৭৫ সালের ১৫ ই আগস্ট একদল সেনা কর্মকর্তা সেনা অভ্যুত্থান ঘটিয়ে জাতির পিতা বঙ্গবন্ধুর বাসভবন ঘিরে ফেলে ও সপরিবারে গুলি করে হত্যা করে।শুধু দুই মেয়ে শেখ হাসিনা ও শেখ রেহানা জার্মানিতে অবস্থান করায় তারা প্রাণে বেঁচে যায়।
তাই ১৫ই আগস্ট দিনটি বাংলাদেশের ইতিহাসে কালো দিন হিসেবে পরিচিত।

শেষ কথা-বঙ্গবন্ধু শেখ মুজিবুর রহমান তাঁর নিজের কৃতিত্বের জন্য মানুষের মনে যে জায়গা করে নিয়েছেন তা বেঁচে থাকবে আজীবন। কিউবার বিপ্লবী নেতা ফিদেল কাস্ত্রো বলেছেন- “আমি হিমালয় দেখিনি,কিন্তু শেখ মুজিবকে দেখেছি।” উপসংহারের তাই বলতেই হয়-এই দেশ এই মাটি আছে যতদিন,তুমি আছো হৃদয় মাঝে ততদিন।জয় বাংলা-জয় বঙ্গবন্ধু।।

উত্তর ২৪ পরগনা,পশ্চিমবঙ্গ,ভারত। 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *