বর্ষায় সাত গুরুং নদীর তীরে দুয়ারসিনিতে

বর্ষায় সাত গুরুং নদীর তীরে দুয়ারসিনিতে

ডঃসুবীর মণ্ডল

দুয়ারসিনি -ঘাটশিলা ও তাঁর আশপাশ অঞ্চলে বর্ষার  ছোঁয়া পেতে গিয়েছিলাম  গত সপ্তাহে   এক কাকভোরে  আমরা পঞ্চপাণ্ডব । খাতড়া থেকে ভোর ৫টায়   বেরিয়ে  পড়লাম।   জঙ্গলমহলের মসৃণ স্বপ্নের রাস্তা ধরে আমরা চলেছি  রানিবাঁধের দিকে, শহর ছাড়িয়ে একটু এগোতেই দ্রুত পাল্টে যেতে লাগলো দুুুপাশের  প্রকৃৃতি।ঢেউ  খেলানো মসৃণ স্বপ্নের রাস্তা।ল্যাণ্ডস্কেপ অনেকটাই মধুপুর-শিমূলতলার মতোই। রাস্তার দু পাশের গাছগুলো  গার্ড অব অনার প্রদান করছে যেন  আমাদের দেখে। এ- এক অন্যভুবন।
খুব  অল্প সময়ের মধ্যেই  ঝিলিমিলিতে পৌঁছলাম। ক্ষণিকের জন্য বিরতি, ধূূূমায়িত চায়ের কাপে চুমুক দিতে দিতে  এগোনর  প্রস্তুতি।   আবার  গাড়ি চলতে শুরু করে  দিল  বান্দোয়ান  হয়ে  দুুুয়ারসিনির দিকে,  অসাধারণ  রাস্তা , এক সময়ে  মাওবাদীদের ঘাঁটি   ছিল । এখন  পর্যটদের  স্বর্গরাজ্য। অল্প সময়ের মধ্যে  ভালোপাহাড় ছুুঁয়ে  দুয়ারসিনিতে পৌঁছলাম,সময় সকাল সাড়ে ছটা হবে মনে হয়। সূূর্য উঠে গেছে বেশ  কিছুটা, মনে হলো  দুুর্ভেদ্য জঙ্গল ছিন্ন করে উঠছে  রাজকীয় ভঙ্গিতে।

গতবছর শীতের  শেষে  অযোধ্যা  থেকে  ফেরার পথে  দুয়ারসিনির প্রেমে পড়ে লিখেছিলাম তার কথা এক দৈনিক সংবাদপত্রে।খাতড়া  থেকে ৬৩ কিমি, বান্দোয়ান  থেকে মাত্র ১৩-১৪   কিমি। পুরুলিয়া সদর থেকে ৬৫ কিলোমিটার দূরে পাহাড়ের পাদদেশে সাতগুরং নদীর ধারে ছোট্ট একটি অসাধারণ মন ভালো করার  জায়গা দুয়ারসিনি। আট থেকে আশির মানুষের  স্বপ্নপূরণের  আদর্শ  জায়গা বলে মনে হয়  আমার।   যদিও  এটা আমার নিজস্ব ভাবনা।   শাল, শিমুল, পিয়াল এবং পলাশের মতো বৃক্ষরাজি দিয়ে ঘেরা বন, পাহাড় ও নদীর খুব কাছাকাছি থাকতে শহরের ব্যস্ততাকে তুড়ি মেরে উড়িয়ে ছুটে গিয়েছিলাম দুয়ারসিনিতে, প্রথম বার। শহরের অনর্গল ডিজেল-পেট্টোলের  শ্বাসরোধী কালো ধোঁয়া, নাগরিক জীবনের এই সময়ের উৎকণ্ঠা থেকে বাঁচতে, ফুসফুস ভরে  অক্সিজেন নিয়ে প্রাণশক্তিকে পুনরুজ্জীবিত করতে চাইলে আস্তে হবেই এই লালমাটির স্বপ্নপুরী শাল-পিয়ালের সবুজ উপত্যকার মাঝে। পশ্চিমবঙ্গ ও ঝাড়খণ্ডের  সীমান্তে এক সবুজ উপত্যকা,সব ঋতুতেই অপরূপা।
।অল্পসল্প ট্রেকিং, রক ক্লাইম্বিং করার নেশায় এদিক ওদিক ঘুরে বেড়ানোর অভ্যাস বহুদিনের। এখানে এতদিন কেন আসিনি তা ভেবে কিছুটা সময় কেটে গেল..। কোনো জায়গা এত সুন্দরও হতে পারে…! কেউ কাউকে এত সুন্দর করেও সাজিয়ে রাখতে জানে? প্রতিদিন সকালে ঘুম থেকে উঠেই সদ্যস্নাতা মায়ের ভিজে চুলের মাঝে সিঁদুরের লাল টিপটা যেমন মায়াবী লাগে…এখানকার সূর্যোদয় তেমন ভাবেই চোখে নেশা ধরায়…যা হাজারবার দেখলেও পুরনো হয় না।

বর্ষায় সাত গুরুং নদীর তীরে দুয়ারসিনিতে

দুয়ারসিনির সূর্যোদয় দেখার সময় মায়ের মুখ মনে ভেসে এলেও এখানে কিন্তু দুয়ারসিনি ষোড়শী প্রেমিকা..। তবে  কয়েক ঘণ্টা  থেকেও কিছুতেই উপলব্ধি  করতে পারলাম না যে সে কার প্রেমিকা..! কখনো মনে হয় সাতগুরং নদীর সাথে তার অন্তহীন অমলিন ভালোবাসার  সখ্যতা; নদীর ঢেউয়ের সাথে দিনভর সে যেন ফিস ফিস করে  কথা কয়ে চলেছে, নদীর অফুরন্ত প্রাণশক্তিতে সে বুঁদ হয়ে সব রূপ-রস-গন্ধের ধারক ও বাহক হয়ে প্রকৃতির মাঝে নিজেকে মেলে ধরেছে। কিন্তু আঁধার নামলেই পাহাড়ের বিশালত্বের কাছে আছড়ে পড়া দুয়ারসিনির থমথমে মুখ দেখে মনে হয় সে বুঝি পাহাড়কেই…কি জানি..! মহাকাব্যের নায়িকার মতোই সে  বড় ছলনাময়ী-   কিছুটা হলেও রহস্যময়ী। রহস্যের বুননে তৈরি মায়াজালে পথিককে আটকে দেয় অনন্তকালের মতো। বলা বাহুল্য আমিও বাঁধা পড়েছি এই অনন্য ভালোবাসার  মায়াকুহকে…হয়তো কিছুটা ইচ্ছা করেই–

বর্ষায় সাত গুরুং নদীর তীরে দুয়ারসিনিতে

এই অঞ্চলটি ভূমিজ, মুন্ডা এবং খেরিয়া প্রভৃতি আদিবাসী  সম্প্রদায়ের  আবাসভূমি। সহজ- সরল মানুষগুলো। বড় ধরনের  স্বপ্ন দেখে না বলে মনে হয়। ছোট্ট  স্বপ্ন দেখে’  আমার  সন্তান যেন থাকে দুধে ভাতে’। সীমাহীন অসহায়তার চালচিত্রের কোন পরিবর্তন হয়নি আজও। অভাবের মধ্যেও  হৃদয় নিংড়ানো ভালোবাসা। এইসব  দেখতে মনটা খারাপ হয়ে গেল।    সন্ধ্যের দিকে স্থানীয় আদিবাসিদের ঘর থেকে মাদলের সাথে লোকগীতির মৃদু আওয়াজ মনকে বড়ই উদাসীন করে দেয়। বছর চারেক আগে  পূর্ণিমার রাতে পাহাড়ের কোলে তাঁবুতে শুয়ে চাঁদ দেখার সময় রবি ঠাকুরের কয়েকটা লাইন আপনমনেই আওড়াচ্ছিলাম- “আমার প্রজাপতির পাখা/ আমার আকাশ-চাওয়া মুগ্ধ চোখের রঙিন-স্বপন-মাখা। তোমার চাঁদের আলোয়/ মিলায় আমার দুঃখসুখের সকল অবসান। বর্ষা মুখরদিনে দুয়ারসিনিকে  দেখে  মন গুনগুনিয়ে উঠল। বাংলা চলচ্চিত্রের একটি অসাধারণ গান মনে পড়ে গেল– “বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি, এ কোন অপরুপ সৃষ্টি ।

বর্ষায় সাত গুরুং নদীর তীরে দুয়ারসিনিতে

সত্যি যত দেখছিলাম ততই যেন মনের মধ্যে সেই একটা উথালপাতাল ভাব…! পার্থিব সব ভাবনা কর্পূরের মতো উবে যাওয়ার সাথে সাথে হাড়-মাংস-রক্তের মধ্যে আটকে থাকা উড়ুক মনটাকে সামলাতে বড্ড বেগ পেতে হচ্ছিল…! কাঁচা  সূর্যের  আলোর আদরে মাখা দুয়ারসিনিতে বন্য পাখির   কলকাকলিতে আমি নেশাতুর হয়ে পড়ছিলাম। পৃথিবীর সবচেয়ে কড়া মদ খেলেও বোধহয় এই নেশায় আচ্ছন্ন হওয়া যাবে না। আমরা যারা প্রকৃতিপ্রেমী, তাদের কাছে এই জায়গা স্বর্গ। স্বর্গের দুয়ার খুলেই যেন এই ষোড়শী কন্যা দুহাত বাড়িয়ে রেখে আমন্ত্রণ জানায় পথিককে।

দুয়ারসিনির ঠিকানা:

এটি পশ্চিমবঙ্গ এবং ঝাড়খন্ড সীমান্তে অবস্থিত। দুয়ারসিনির সাথে শহুরে ব্যস্ত মানুষের দূরত্বকে মোটামুটি চারভাবে প্রকাশ করা যায়। এটি সদর পুরুলিয়া থেকে ৬৫ কিলোমিটার ,খাতড়া মহকুমা শহর থেকে ৬৩কিমি, বাঁকুড়া  জেলা সদর থেকে ১০৬ কিমি , বর্ধমান থেকে ১৯৮কিমি এবং ঘাটশিলা থেকে ২০ কিমি দূরে অবস্থিত। কলকাতা ও দুয়ারসিনির দূরত্ব ১৭৮ কিলোমিটার। কলকাতা থেকে পুরুলিয়া বা ঘটশিলাগামী যেকোনো ট্রেন ধরে পুরুলিয়া বা ঘাটশিলা স্টেশনে নেমে দুই জায়গা থেকেই বাস বা ট্রেকার বা প্রাইভেট কার নিয়ে এখানে যাওয়া সম্ভব। পথনির্দেশ- খাতড়া  – রানিবাঁধ- ঝিলিমিলি– বান্দোয়ান- ভালোপাহাড়- দুয়ারসিনি– আসানপানি– গালুডি– ঘাটশিলা দূরত্ব ৯০  কিমি কম-বেশি।

দুয়ারসিনিতে থাকা-খাওয়ার ব্যবস্থা:

মাওবাদী আক্রমণের পর থেকে দুয়ারসিনির জঙ্গলের মধ্যে থাকা কটেজগুলি বন্ধ হয়ে যায়। সাম্প্রতিক সেগুলি খুলেছে। কোলকাতা থেকে  বুকিং হয়ে থাকে।কটেজগুলো আদিবাসী চিত্রকলা  দিয়ে  রাঙিয়ে তোলা হয়েছে। অত্যন্ত  দৃষ্টিনন্দন  ।
পাহাড় থেকে কিছু দূরে থাকা খাওয়ার ব্যবস্থায় কিছু লজ গজিয়ে উঠেছে। ভালোপাহাড় রিসোর্ট থাকার জন্য বেশ ভালো জায়গা। আবার বেশ কিছু হোমস্টেও আছে। সেই ব্যাপারে স্থানীয় মানুষজনের সাথে কথা বললে তারা ব্যবস্থা করে দিতে পারবেন। দুয়ারসিনিতে  বেড়াতে গেলে নিজেদের  গাড়িতেই সবচাইতে  ভালো। ইচ্ছা মত যখন খুশি  যে কোন জায়গায়  যাওয়া যায়।   বর্তমানে  নবসাজে  সজ্জিত হয়েছে। নিরাপত্তা ব্যবস্থা জোরদার করা হয়েছে। কিছু দূরে সি,,আর,পিএফের ক্যাম্প দেখলাম। আর একটি অসাধারণ ভালো লাগা জায়গা  আসানপানি।এক স্বপ্নপূরণের জায়গা। ঘাটশিলাতে  যাওয়ার পথে, এখানে একটু থামা উচিত।  ঘাটশিলাতে আধুনিক মানের বহু  লজ আছে।

দুয়ারসিনিতে বিভিন্ন ঋতুতে        বহু    বার গেছি,    তবে   বসন্তে যাওয়া উচিত,খুব ভালো  লাগবে । তবে  বর্ষার শুরুর  সময়টাই যে প্রকৃতির ভরা যৌবন..! আর মায়াবী ষোড়শী কন্যা দুয়ারসিনি যে এই সময়টায় নিজেকে উন্মুক্ত করে মেলে ধরবে সেটাও বলে দেওয়ার অবকাশ রাখে না..। বর্ষায় সবুজের সমারোহ।   সবচাইতে  উপযুক্ত সময়  বসন্ত  বলে মনে হয়  তখন ,দুয়ারসিনির গাছে গাছে ফুটে ওঠা লাল পলাশ যেন লজ্জায় লাল হয়ে যাওয়া মেয়ের মনের খবরই বয়ে নিয়ে আসে..লিখে ফেলে মন পলাশের এক পদাবলী..! দোলোৎসবের সময় তিনদিন ব্যাপী পালিত হওয়া পলাশ উৎসব, ছৌ নাচ ইত্যাদি বাসন্তীয়া দুয়ারসিনির অন্যতম প্রধান আকর্ষণ।

 

বর্ষায় সাত গুরুং নদীর তীরে দুয়ারসিনিতে
বসন্ত ছাড়া অন্য যে কোনো সময়েই যাওয়া যেতে পারে। তা বলে গরমে কখনোই যাওয়া উচিত নয়। মোটামুটি শীতের জায়গা হলেও প্রখর রোদ্দুরের কারণে গরমে দিনের বেলা বেরনো যায় না। বর্ষার দুয়ারসিনিও কিন্তু বেশ প্রাণচঞ্চলা। আমি যখন প্রথমবার দুয়ারসিনি গিয়েছিলাম সে ছিল এক বর্ষাতুর দিন। শরতের প্রাক্কালে হঠাৎ বৃষ্টিতে প্রথমে বেশ মুষড়ে পড়েছিলাম…দুয়ারসিনির কোলে নেমে আসা বৃষ্টির দিকে তাকিয়ে থাকতে থাকতে আর খারাপ লাগেনি। এখনও মনে আছে বৃষ্টিস্নাতা দুয়ারসিনির বুকে পড়ে থাকা এক পাথরে ক্লান্ত শরীর এলিয়ে সাতগুরুং নদীর জলে পা ডুবিয়ে উৎপলকুমার বসুর লেখা কবিতার কয়েকটা লাইন আপন মনে আত্মস্থ করতে চেষ্টা   করছিলাম- “মন মানে না বৃষ্টি হল এত/ সমস্ত রাত ডুবো নদীর পারে, আমি তোমার স্বপ্নে পাওয়া আঙ্গুল/ স্পর্শ করি জলের অধিকারে।”  মনে পড়ে গেল  চলচ্চিত্রের একটি অসাধারণ গান “বৃষ্টি বৃষ্টি বৃষ্টি, এ কোন অপরুপ সৃষ্টি :”
আবার  গাড়ি চলতে শুরু করে    দিল গালুুুডির দিকে। দূরত্ব মাত্র ১২কিমি।   সুবর্ণরেখার বুকে অনন্ত উচ্ছল জলরাশি আটকে রেখে কৃত্রিম জলাধার। বেশ কিছু সময় কাটালাম। তারপর বুুুরুডি লেক।দুপুরে খাওয়ার   পর্ব  সারলাম  ডিম ভাত দিয়ে ।পৌঁছলাম  ধারাগিরিতে।মুগ্ধতার আবেশে আচ্ছন্ন হয়ে পরেছিলাম। এক প্রাগৈতিহাসিক যুগের মুুখোমুখি আমরা। আরণ্যক  পরিবেশ, গা ছমছমে  ভয়াল পরিবেশ। বেশ কিছু  রাস্তা গভীর  অরণ্যে ঘেরা।লোকজনের  সংখ্যা কম।     জঙ্গলের ভিতর মানুষের পায়ে চলা পথ.. গাড়ি চলেছে পথ চিনে চিনে, দুপাশে লাল মাটির ধুলো, জানলার কাঁচ তুলে দিই। কই তবুও তো মাটির গন্ধ পাচ্ছি বুকের ভিতর.. পথের দুধারে ছোটো ছোটো জমি চাষ যোগ্য করে চাষ হয়েছে ধান, বাঁধাকপি। গাড়ির দুপাশ দিয়ে সরে যাচ্ছে সাঁওতাল বাড়ি.. কি অপূর্ব কৌশলে সাজানো, যেকোনো গ্রামের মাটির বাড়ি নয়, পরিপাটি করে নিকোনো.. কোথাও কোথাও রঙের প্রলেপ, কাঁচের কুচির অলঙ্করণ..ভেবেই অবাক হই, অভাবও এখানে এত পরিপাটি!

গাড়ি আর যাবেনা, থামতে হলো। এবার পায়ে হাঁটা পথ। বছর তিনেকের শিশু পয়সার বিনিময়ে পথ দেখাতে চায়, আমরা নিজেরাই হেঁটে চলি আবিষ্কারের নেশায়.. মানুষের পায়ে তৈরি পথ ছাড়া ঘন বনে কোনো দিক নির্দেশক নেই। পাখির অস্পষ্ট কিচির মিচির ছাড়া আওয়াজ নেই কোনো। শান্ত নীরব গাছেদের সবুজ গন্ধ, মেঠো পথে পাথরের সুর – এসবের মধ্যে আমাদের পায়ের আওয়াজ নীরবতা ভাঙছে। চুপ করে দাঁড়িয়ে পড়লে মনে হয় যুগ যুগান্তর ধরে সময় বৃক্ষরাজি আঁকড়ে থমকে গেছে, পৃথিবী সৃষ্টির আদিমযুগে এসে পড়েছি। কেও কথা বলার ভাষা খুঁজে পাই না.. ঝর্নার খোঁজে এগোতে এগোতে বার বার পথ ভুলের আশঙ্কা এতক্ষণে কাটলো … জলের শব্দ.. গায়ে কাঁটা দিয়ে উঠছিলো.. বিভূতিভূষণের শঙ্কর কী এভাবেই ‘চাঁদের পাহাড়’ খুঁজে বেরিয়েছিল? নাকি অপু-দুর্গা এমন ঘন জঙ্গলেই পথ হারিয়েছিল একদিন! জঙ্গল আর পাথর পেরিয়ে অবশেষে ক্ষীণ এক জলধারার উৎস আবিষ্কার করা গেল। ধারাগিরি ঝর্না এর নাম। গাছ-গাছালির ফাঁক দিয়ে দিয়ে যতটুকু আলো এসে পৌঁছেছে, নয়তো সত্যিই মনে হতো প্রকৃতি তার বুকের ভিতর বয়ে চলা স্রোতকে কত আলগোছে সযত্নে গোপন করে রেখেছে.. কিছু যন্ত্রণা আগলে  চিরকাল মনের গভীরে আঁকড়ে রাখার মতো..
মোটা মোটা গাছের শিকড় পাথরের উপর পাথর আঁকড়ে রেখেছে। বড়ো বড়ো পাথর আর গাছ, মাঝে নীরবতা। তাকিয়ে তাকিয়ে দেখি প্রকৃতির অপরূপ লীলা। কতকাল আগে পাথরের বুকে শিকড় চাড়িয়ে দিয়ে বসে আছে গাছেদের দল.. হয়তো গত জন্মে, কিংবা তার আগে, কিংবা তারও আগে.. এখানে এসে প্রকৃতির তাপমাত্রা কমে গেছে কত। ঘন হয়ে বসি আরও শীতলতার খোঁজে.. নাহ্, আশ্রয়, নিবিড় আশ্রয়ের খোঁজে বোধয়.. পাথরের উপর চুপ করে বসে আছি। শ্যাওলা ভরা পাথর আর শুকনো পাতার ফাঁক ফোঁকর দিয়ে কেমন তির তির করে বয়ে চলেছে জলধারা। জনমানুষের প্রতি তার কোনো ভ্রুক্ষেপ নেই। ‘ভাগীরথীর উৎস সন্ধানে’র লেখকের মতো প্রশ্ন করতে ইচ্ছে হয়, ‘তুমি কোথা হইতে আসিয়াছ?’

কোনো কিছু যে কেন স্থায়ী নয়! ফিরতে হয়.. জঙ্গলের বুকে রাত নামার অনেক  আগেই আমরা একই পথ ধরে পায়ে পায়ে ফিরে আসি, গাড়িতে উঠি। বিকেলের সূর্য গাছের ফাঁকে, মুখ বাড়ায়.. সূর্যের দিকে ফিরে চট করে একমুঠো নির্ভেজাল হাসি আর কৃতজ্ঞতা বিলিয়ে দিতে দিতেই পিছন থেকে সেই বছর তিনেকের মাটি মাখা ন্যাংটো শিশুটা বলে ওঠে ,”এই পয়সা দিয়ে যা না।” এরপর চলে এলাম  বুরুডি ড্যামে। -।ঝলক দর্শনেই মেলে স্হানীয়দের রোজ নামতার ছবি। গ্রাম ফুুঁড়ে় রাস্তা উঠেছে  বাঁধের উপরে। অবশেষে মুখোমুখি হলাম বুরুডির  সঙ্গে ।   চারদিকে শুধু সবুজের সমারোহ, পাহাড় থেকে আসা জলকে  বেঁধে   কৃত্রিম লেক। সবুুুজে ঘেরা এই লেকের দৃশ্য অতুলনীয়। একটি, দুটি পাহাড়    ঢুকছে দৃশ্যমান হয়ে।     আর দূরে সূর্যমুখী ফুলের  খেতটি যেন, পাহাড়ের পায়ের উপরে মেলে দেওয়া হলুদ  বর্ডারে সবুজ শাড়িটি মাঘের রৌদ্রে শুকোচ্ছে।   পথের ধারে  পাহাড়তলিতে শাল-পলাশের উপত্যকা । দূরে দলমা পাহাড়ের হাতছানি। গোধূূলির আলোয় মুরগুমা  বড় মায়াময়, অপার্থিব সুন্দর।  মায়াবী নীলাঞ্জন মাখানো ছবির মতো সুন্দর।অনায়াসে কাটিয়ে  দেওয়া যায়  গোটা রাত, স্বপ্ন অধরা থেকে গেল।মন চাইলেও  হাতে  সময় বড় কম ।আবার পথ চলা শুরু, অন্য দিকে-

পড়ন্ত বিকেলে তাড়াতাড়ি   বিভূূূবিভূতিভূষণে স্মৃতি বিজড়িত জায়গা গুলো  একে একে দেখলাম।  মা রক্মিণীদেবীর  মন্দির ঘুুরে  সুুুবর্ণরেখার তীরে রাতমোহনায় বেশ কিছু  সময় কাটালাম। বিস্তীর্ণ এলাকা জুড়ে যতদূর চোখ যায় সুবর্ণরেখা ছড়িয়ে.. পলি জমে জমে শিলা এখন উচুঁ উচুঁ টিলার সমান। এদেরই খোপে খোপে সুবর্ণরেখার জল জমাট বেঁধে আছে। ঘাসফুলেরাও সেইসব ফাঁকে নিজেদের জায়গা করে নিয়েছে। জমাট বাঁধা শ্যাওলা আর উপরে স্বচ্ছ জল। চুপ করে প্রকৃতির এই রূপের পাশে বসে থাকা যায় না। মনে হয় এই পাথর, না না ওটা, না না আরো উপরের ওই টিলা টায় যেতে পারলে জীবন সার্থক.. ছলাৎ ছলাৎ জল পেরিয়ে কেবল ‘হেথা নয় হেথা নয়, অন্য কোথা অন্য কোনোখানে’.. রোদ কমছে , আমরা নদীর চর ছেড়ে উপরে উঠে আসি। সন্ধ্যা নামতে চলেছে ধীরে ধীরে।  মনে পড়ছে আমার অত্যন্ত পছন্দের  গীতা দত্তের অসাধারণ একটি গান-“এই সুন্দর স্বর্ণালি সন্ধ্যায়
এ কি বন্ধনে জড়ালে গো বন্ধু।
কোন রক্তিম পলাশের স্বপ্ন
মোর অন্তরে ছড়ালে গো বন্ধু । ”
এ গান আজও জনপ্রিয়–
খাদ্যের  অভাবে তখন সবার পেটে ছুঁচোয় ডন-বৈঠক দিচ্ছে। অতএব উদর পূর্তি আশু প্রয়োজন। ড্রাইভার মশাই কোনো এক পাঞ্জাবি ধাবা চেনেন। ফলে আলু পরোটা আর চানা সহযোগে সহজ সমাধান, সাথে  ডিমের  পোজ।পরে আয়েশ করে  মোষের দুধের চা। মন চনমনে হয়ে উঠেছে বলে মনে হলো, ক্লান্তি দূর করে  পথে  নেমে পড়লাম।

এবার ফেরার পালা।  এক    দিনের  স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে  খাতড়া মহকুমা শহরের  দিকে এগিয়ে চললাম।  সময়ের হাত ধরে সূর্য ডোবার পালা এসে গেলো।   পড়ন্ত বিকেল
বেলায়  শাল- মহুয়ার  জঙ্গলের সঙ্গে আকাশের এই রঙের খেলার সাক্ষী আমরা ৫ জন।একে একে  ,ঘাটশিলা  আর  দুয়ারসিনির- সাতগুরুং-এর  বিরল স্মৃতিকে  সঙ্গী  করে গাইতে লাগলাম ঘরে ফেরার গান ।এই পথ যদি না শেষ  হয়–কিছুক্ষণ বাদে সবাই সমবেতভাবে বলে  উঠলাম’    আবার আসিব ফিরে, এই  দুয়ারসিনিতে  হয়তো বা  অন্যভাবে, অন্যসময়ে-
আমরা তখন ফেরার পথে, হঠাৎ কানে ভেসে আসে সাঁওতালি মেঠোসুর। মাদলের চাপা আওয়াজ দ্রিমি দ্রিমী। সে সুর কেমন যেন মাতাল করা। চেয়ে দেখি দূর  পাহাড়ের গায়ে গাছের ফাঁকে ফাঁকে আল পথ বেয়ে চলেছে একদল সাঁওতালি পুরুষ আর রমনী। মেয়েদের মাথায় গোঁজা বনফুল, নাকে নোলক পায়ে মল সহ ঘুঙুর। মাথায় জঙ্গলের ডালপালার বোঝা। দলের শেষে সাঁওতাল যুবকদের হাতে মাদল।যেন অবশ করা ঘুম পাড়ানি বোল। সবকিছু দেখে মনে হলো ঘুঙুর আর মলের শব্দে ঢাকার চেষ্টা করছে অভাব আর জীবনের অপ্রাপ্তির ক্ষত। গাড়ি চলছে দুরন্ত গতিতে।   ঝিলিমিলি   অতিক্রম করে রানীবাঁধের   ১২মাইল পেরিয়ে চলেছি। ঝিলিমিলি আর রানীবাঁধের পাহাড়ের পিছনে লাল রঙের পূর্ণিমার চাঁদ চুপিসারে উঠেছে, সবুজ অন্ধকারে। আমরা প্রায় বাড়ির কাছাকাছি চলে এসেছি।মাত্র  এক দিনের প্রাপ্তির স্মৃতি রোমন্থন করতে করতে বিভিন্ন জনপদভূমি অতিক্রম করছি। মন ভারাক্রান্ত। আবার সেই কেজো জীবনে প্রত্যাবর্তন। ঘড়িতে তখন রাত এগারোটা বেজে গেছে। মন জুড়ে একটা মুগ্ধতা ও বিষন্নতা। রাতবাড়ে, পাহাড়, জঙ্গল আর নদীর গান শেষ হয় না। আকাশ ভরা তারায় তারায়  শেষ হলো জঙ্গল জীবনের বর্ণময় এক ভ্রমণের কাব্য

কি কি দেখবেন-
ঘাটশিলাকে কেন্দ্র করে বেশ কয়েকটি  দিন আশপাশের অনেকগুলি দ্রষ্টব্য জায়গা গাড়ি নিয়ে ঘুরে নেওয়া যায় । তার মধ্যে  সিদ্ধেশ্বর পাহাড় , জাদুগোড়া রঙ্কিনি মন্দির , চন্ডিল ড্যাম , সুর্বনরেখা নদী , গালুডি ব্যারেজ , ফুলডংরি পাহাড় , বুরুডি লেক , চিত্রকূট পাহাড় , প্রকৃতি প্রেমি সাহিত্যিক বিভূতিভূষণের বাড়ি ইত্যাদি তেমনি ছিল জামসেদপুরের কাছে ডিমনা লেক ও দলমা পাহাড় ইত্যাদি । সারাদিন এই জায়গাগুলি ঘুরে এসে রাতে হোটেলে ফিরে একসাথে হৈ-উল্লোড় করে আনন্দে মেতে ওঠা  যায়, যেটা  একদিনে  সম্ভব নয়,  সময় হাতে  নিয়ে  আসা  উচিত   ।৮–১০  জন এক সঙ্গে গেলে অত্যন্ত কম খরচে  সারাদিন  ঘুরে আসা যায়।যাতায়াত ও ঘোরা ৩০০ কিমি ,তবে একদিন থাকলে  সবচেয়ে ভালো। অনেক খানি জায়গা  জুড়ে ঘুরে আসা সম্ভব বলে মনে হয়েছে। ঘাটশিলা থেকে টাটার দূরত্ব মাত্র ৩০-৩৫ কিমি।

 

বাঁকুুুড়া,পশ্চিমবঙ্গ, ভারত ।

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
Dhaka Metro-Rail Paragraph (For SSC, HSC, Class Five or Class Eight)

Dhaka Metro-Rail Paragraph (For SSC, HSC, Class Five or Class Eight)

**Revolutionizing Dhaka’s Commute: The Dhaka Metro Rail Project** (150 word) for  Class 5 Dhaka Metro Rail, a monumental infrastructure project in Bangladesh, stands as a ...
How Health Businesses Can Survive in a Post Coronaconomy

How Health Businesses Can Survive in a Post Coronaconomy

Cursus iaculis etiam in In nullam donec sem sed consequat scelerisque nibh amet, massa egestas risus, gravida vel amet, imperdiet volutpat rutrum sociis quis velit, ...
আ গু ন পা খি র গ ল্প 

আ গু ন পা খি র গ ল্প 

ম হী তো ষ গা য়ে ন একটু একটু করে প্রলুব্ধ করে চুরি করেছো মন, চুরি করেছো আকাশ। আকাশে ডানা মেলেছে পাখি গাছে ফুল ফুটতে ...
8 Powerful Habits to Master for Success in Health

8 Powerful Habits to Master for Success in Health

Cursus iaculis etiam in In nullam donec sem sed consequat scelerisque nibh amet, massa egestas risus, gravida vel amet, imperdiet volutpat rutrum sociis quis velit, ...
পাঁচটি কবিতা

পাঁচটি কবিতা

মুহাম্মদ রফিক ইসলাম কবিতাঃ (০১) প্রেম, শাড়িতেও বোনা যায়  অনাবৃষ্টির কোলে শালুক বোনা মাঠ। রোদ্দুর চিরে উত্তরীবায়ু পাখনা ম্যালে। ব্যাঙের নাকে গন্ধ মেঘ! মেঘ ওড়ে, বিড়ালপায়ে হাঁটে ...
বিসর্জন

বিসর্জন

জোবায়ের রাজু আপন গতিতে ট্টেন ছুটে চলছে। আতিক ট্টেনে বসে আছে। সে গ্রামের বাড়ি গৌরীপুর যাবে। আগামী সপ্তাহে আতিকের বড় ভাই শওকতের বিয়ে। বিয়েটা কোথায় ...