বাসরসকাল

বাসরসকাল
আনোয়ার রশীদ সাগর
আমার প্রথম বাসর হয়েছিল শ্বশুর বাড়ি। বাসর সাজাচ্ছে যারা তাদের কাউকেই চিনি না। হেমন্তের জ্যোৎস্নাপ্লাবিত রাত। উঠোনময় সরগম চলছে। আলোআঁধারিতে  ঘেরা পরিবেশ। আনন্দ ছায়া অথবা আনন্দ মায়ার সাথে রিমিঝিমি ও হৈহুল্লোড় চলছে। গুঞ্জণে আর গানে গানে মনে হচ্ছে, বাসরঘরে পরীদের নাচানাচি-হাসাহাসি। রাতময় কিশোরী-যুবতীদের কোলাহল। এরই মাঝে একটা তরুণ ছেলে এসে বার বার ম্যান-মেনে চোখে তাকাচ্ছে। চোখের চাওয়া যেন বিড়ালের নীরব জিহ্বার আকুতি। গভীর রাতের নীরব শৃগাল। ছেলেটি আমার থেকে একটু দূরত্ব বজায় রেখে রেখে থাকছে। অনেকটা বনবিলির মত মনে হতে থাকে তাকে। হঠাৎ ছেলেটির পিছন থেকে আর এক কিশোর হাত ইশারা করে ডেকে উঠলো,মজিদ ভাই,এই দিকে।
মনে মনে সন্দেহ হচ্ছিল,বাংলা সিনেমার মত আমার নতুন বউকে নিয়ে পালাবে নাকি? আবার একটা বিশ্বাসও আমার মনে কাজ করছিল,ওর মত ভীতু ছেলেটি হয়তো সেটি পারবে না। আমার শ্বশুর মশাই গো-বেচারা মাঠের শ্রমজীবী মানুষ। সারাদিন মাঠে-ঘাটে চাষআবাদ নিয়ে থাকে। প্রথম যেদিন দেখতে এসেছিলাম সেদিনই শ্বাশুড়ীর নেতৃত্ব এবং কথাবার্তায় বুঝেছিলাম।  মেয়েটি বেশ সুন্দরী।  তাই বিয়ে করার জন্য মত দিই।
যাহোক,ঘনঘন চোখে আমার নববিবাহিত বউয়ের দিকে তাকাচ্ছে মজিদ। আজকাল মোবাইলের যুগে একটু-আধটু প্রেম করবে ছেলেমেয়েরা এটা একটা স্বাভাবিক  বিষয় মনে করি। বিষয়টি সিরিয়াস না হলেই হলো।
 বউটির মুখ দেখা যাচ্ছে না। মেঘের আড়ালে থাকা চাঁদমুখ লাল ঘুমটায় ঢাকা। চাঁদের কাছে মেঘ ভেসে যাবে, মাঝে মাঝে আলো ঢেকে দেবে এটাও ঠিক। দীর্ঘ অমানিশা কষ্টদায়ক। মজিদ যেন দীর্ঘ অমানিশা না নিয়ে আসে সেদিকেই আমার দৃষ্টি চলে যাচ্ছিল বার বার।
অনেক রাত অবধি হাসি-ঠাট্টা,গান-বাজনা চলছে তো চলছেই। আমিও বেশ ক্লান্ত। বেসরকারি কোম্পানীতে চাকুরী করি। তিন দিন মাত্র  ঈদের ছুটি নিয়ে এসেছি। এরই রেশ ধরে বউকে কাছে পাওয়ার আবেগ থামাতে না পেরে বিয়ের দিনই বাসরঘর। তারপর মজিদের আনাগোনায় আরো আকর্ষিত হতে থাকি। মুরুব্বিরাও আমার মতের সাথে মত মিলিয়ে সমান্তরাল, একই কথা ও সম্মতি দিয়ে দেয় স্বস্তি ফিরে আসে মনে।
শেষমেষ,অনেক রাতে সাজানো ঘরে প্রবেশ করি। আগেই পাগড়ি খুলে রেখেছি। বউ তার ঘুমটা খোলেনি। বার বার লক্ষ্য করতে থাকি, মজিদ ঘুরঘুর করছে আশপাশেই। বউয়ের পাশে বসেছি মাত্র। অমনি মজিদ দরজা ঠেলে ভুলকি দেয়। বউ চোরায় চোখে তাকিয়ে তার ভীতুচোখ ফিরিয়ে নেয়। তখনই জিজ্ঞাসা করি ছেলেটি কে?
বউ কোনো উত্তর দেয় না,শুধু চোখ মোছে। কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়ে ফেলেছে। চোখের পাতা এবং পাপড়ি ও ভুরুতে কাজল দেওয়া। ভিজে গেছে। ভারি সুন্দর লাগছে। ইচ্ছে হচ্ছে জড়িয়ে ধরে চুমু দিই। ভিজিয়ে দিই ওর শরীর। নিজেকে সামলিয়ে নিয়ে ওর ভেজা চোখ মুছে দিতে চেষ্টা করি। গালে হাত বুলায়,ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে স্পর্শ করি। লজ্জাবতী পাতার মত ঝরঝর করে ঝরে পড়ে চোখের পলক। টপটপ করে কয়েক ফোটা পানি পড়ে বিছানায়। বিছানাটা বেরসিক,সাথে সাথে চুষে নেয় নোনা পানি। থেমে যাই আমিও।
জীবনটা কেমন যেন সন্দেহময় হয়ে ওঠে। যে মেয়ে স্নাতকে পড়ে তার এত সংশয় বা লজ্জা কেন? আবার ভাবি,অজপাড়াগাঁয়ে বসবাস এবং বেড়ে উঠা তার,হতেই পারে পরিবেশের কারণে। তবুও তো কাছে পেতে হবে। অনেক কথা বলি,চোখ মুছিয়ে দিই,ঠোঁটের লিপিস্টিক মুছিয়ে দিই। কিছুই বলে না। তারপর নিজেই আলোটা নিভিয়ে দিই। সকাল হয়। সূর্য তার হেমন্তীয় মিষ্টি আলো ছড়িয়ে দিয়েছে। পিঠাপার্বণের ঈদের আনন্দময় সময়। নাকে ভেসে আসে বিভিন্ন পিঠা ভাজার ঘ্রাণ। মুশকিলটা হচ্ছে উত্তর পাশের পুকুরে গিয়ে স্নান করতে হবে। বউ তো ঘুমিয়ে থাকার ভাণ করে শুয়ে আছে। মাঝে মাঝে তার নিঃশ্বাসের শব্দই বলে দিচ্ছে জেগে জেগে ঘুমাচ্ছে। অগত্যা আবার তার শরীরে হাত দিলাম।


ওরে বাবা!- সাথে সাথে প্রতিক্রিয়া হল। সাপের ফণার মত ফোঁস করে ওঠে,হাত দিবা না। অভিমান ঝরে পড়তে থাকে। রাতে তাজাপাতাও কম ঝরেনি। ঝরেছে অভিমানী আবেগও।হোহো শব্দ করে হাসতে লাগলাম। তখনই এক তরুণী এসে দরজায় ধাক্কা দিয়ে মিষ্টিচোখে তাকায়। চোখে চোখ পড়তেই যেন হাসিতে ডগো-মগো ফুল ফুঁটে ওঠে। দিলরুবা তরুণীটির নাম। সে আমার খালাতো শালিকা।  মুছকে হেসে ঠোঁটে ঠোঁট টিপে আমার হাতে ধরিয়ে দেয়, নতুন গামছা এবং লুঙ্গি।
নিতে নিতে বললাম, শামিনাও যাবে তো?
– হেয়ালি করে বলে,কোথায় দুলাভাই? বলেই খিলখিল করে হাসতে থাকে।
-বুবু,ও বুবু দুলাভাই কী কই?
শামিনা আমার বউয়ের নাম। সে ঝ্যাটকা মারা কথা বলতে থাকে, দ্যাক নানে কী কই?
দিলরুবাও কম না। সে বলে,বুবু গোসলে যাও দুলাভাইরে নিয়ে।
শামিনা বলে যা-না তুই।
এবার দিলরুবা বলে,যেতে পারি,দুলাভাইয়ের সাথে সাঁতারে পাল্লা দিবুনি, ডুব খেলবুনি,হিংসা করবা নানে তো?
শামিনা  গাঢ় ডাগর চোখ খুলে বাঁকা দৃষ্টিতে দিলরুবার দিকে তাকায়।
বোঝা গেল, প্রতিক্রিয়া একটা হয়েছে-শামিনা হিংসায় জ্বলে উঠেছে। অভিমানে ফুলে উঠেছে। আমি মনে মনে তৃপ্তি পেতে থাকি।
ইচ্ছাকৃতভাবেই দিলরুবার ঘাড়ে হাত রেখে পুকুরের দিকে যায়। দু,একবার পিছন ফিরে তাকাতে থাকি। ঠিকই ঔষধে কাজ হয়েছে। দেখি, শামিনাও নীরবে লজ্জাজড়িত মুখে ঘাড় নিচু করে, ধীরে ধীরে পা ফেলে ফেলে পিছে পিছে আসতেছে।
পুকুরে উত্তরপাশে সাতিয়ান গাছ,এলোমেলো ভাবে শিকড় বেরিয়ে রয়েছে। বাঁকা হয়ে গাছটি কষ্ট করে দাঁড়িয়ে আছে পানির উপর। ছুঁই ছুঁই করেও পানি ছুঁতে পারছে না তরতাজা পাতাগুলো। পূর্বপাশের ভেটুল গাছটিও একই ভাবে লড়াই করে টিকে আছে। এ গাছটিরও শিকড়গুলো  উঁচু দাঁত বেরানোর মত বেরিয়ে আছে। কয়েকটি ডাল পানির ভিতরও পৌঁছিয়ে গেছে। ঝরে পড়েছে পাতা। পাড়ার কিশোররা ভেটুলগাছের ওই ডালে উঠে খেলা করে লাফ দেয়, দেখেই বুঝা যাচ্ছে।
 আমি মনে মনে ভাবছিলাম যেকোনো দিকে পৌঁছিয়ে গাছের শিকড়ের উপর দাঁড়িয়ে পানিতে লাফ দিব।
কিন্তু দিলরুবা আমার হাত চেপে ধরে ভয় দেখায় , উহু দুলাভাই ওখানে ধুড়াসাপ রয়েছে। গা শিরশির করে ওঠে,লোমগুলো খাড়া হতে বাকি।
তারপর দিলরুবার কথা মত স্নানের পরিস্কার ঘাটে নামতে গিয়ে পিছলে হুড়মুড় করে ওকেসহ পানির ভিতর পড়ে গেলাম। দিলরুবাকে অপরুপ সুন্দরী লাগছিল। আমাকে ধরে খিলখিল করে হাসতে লাগলো। ওর শরীরের সব অঙ্গগুলো পানির ভেজা ছোঁয়ায় ঝলমল করে উঠেছে। শালিকার উপর অধিকার ফলাতে গিয়েই বিপদে পড়লাম।
বউ পানিতে নেমেই কাছে চলে এলো। তারপর জড়িয়ে ধরেই জড়াজড়ি ও সাঁতারখেলা। তখনই দিলরুবা দূরত্ব বজায় রেখে রেখে সাঁতার কাটছিল। বেশ সুচতুর শালিকাটি।
এই সময়ই মজিদ ম্লানমুখে তাকাতে তাকাতে পশ্চিমের বাঁশ বাগানের ভিতর পায়ে হাঁটা পথ দিয়ে চলে যাচ্ছিল।
দিলরুবা ওকে দেখেই চিৎকার শুরু করলো,এই অপকর্মা মজিদ আয় গোসল করি।
মজিদ যেন বাঁশঝাড়ের ফাঁকে ফাঁকে নীরবজলে ভীরু চোখে হারিয়ে যায় জঙ্গলের ভিতর।
আলমডাঙা, চুয়াডাঙা।

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
তবে তাই হোক | সাপ্তাহিক স্রোত । দশম সংখ্যা

তবে তাই হোক | সাপ্তাহিক স্রোত । দশম সংখ্যা

|মৌটুসী চাকমা . যদি শুধুমাত্র নিঃশ্বাস নেয়াকে বেঁচে থাকা বলে তবে তাই হোক যদি কেবল হেঁটে চলে বেড়ানোকে বেঁচে থাকা বলে তবে তাই হোক যদি ...
কবিতা - "কালোবতী"  | মেহেদী হাসান | সাপ্তাহিক স্রোত-১১

কবিতা – “কালোবতী” | মেহেদী হাসান | সাপ্তাহিক স্রোত-১১

|’মেহেদী হাসান‘   বেশ ক’দিন, মেয়েটি অবসন্নতায় নিঃশ্বাসরূদ্ধ- তাহার কোনো আওয়াজ নেই, সে কেঁদে কেঁদে চোখে পানি তোলে, চোখে তাহার নীলছে পানির সমুদ্র। বাহিরের আকাশে ...
শরৎ জোসনার রাত - বিপিন বিশ্বাস

শরৎ জোসনার রাত – বিপিন বিশ্বাস

বিপিন বিশ্বাস   প্রাণময় সতেজ জীবন বাতাসে নাচে, কাশফুলে দুলে, শ্বাস-প্রশ্বাসে খেলে অনন্ত ব্রহ্মের  সাথে পরম সৌন্দর্যে।   শরৎ জোসনার রাতে মা দুর্গার পা স্পর্শ ...
The Fascinating Science of Automobile

The Fascinating Science of Automobile

Cursus iaculis etiam in In nullam donec sem sed consequat scelerisque nibh amet, massa egestas risus, gravida vel amet, imperdiet volutpat rutrum sociis quis velit, ...
একদিন করোনা শেষে

একদিন করোনা শেষে

Iমোস্তাফিজুর রহমান হিমেল   একদিন আধার রাতের অন্তিমে অভিশপ্ত করোনার শেষে, আমরা সবাই স্বাধীন বেশে  মুখে হাঁসি বুকে বল, করবো মোরা আলিঙ্গন।   লাঙ্গল কাধে ...
'বলি' ওয়েবসিরিজ রিভিউ

‘বলি’ ওয়েবসিরিজ রিভিউ

আশিক মাহমুদ রিয়াদ  ওয়েবসিরিজ – ‘বলি’ পরিচালক – শঙ্খ দাসগুপ্ত সাগরের নোনাজলে ভেসে গেছে কত দেহ.. নোনাজলে চর জাগে..ভেসে আসে প্রাণ.. শুকায় চোখের জল পাপের ...