“বিস্মৃত সৈনিক” 

"বিস্মৃত সৈনিক" 

অন্যদিনের চাইতে আজ বেশি আগে ঘুম থেকে উঠেছেন মিঃ ওডারল্যান্ড। পার্থ শহরে তাঁর সমসাময়িক বন্ধু যারা আছেন তাঁরা এত ভোরে ঘুম থেকে উঠেন না, তাই ওডারল্যান্ড সাহেবও বন্ধুদের সাথে মিল রেখে মোটামুটি দেরি করেই ঘুম থেকে উঠেন, এরপর প্রাতঃভ্রমনে বেরিয়ে পড়েন। গতরাতে বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে একটা খাম এসেছে তাঁর বাসায়। অস্ট্রেলিয়ায় সেই কত বছর আগে চালু হয়েছে বাংলাদেশী দূতাবাস, কেউ কোনদিন তাঁর খোঁজ নিলেন না। অথচ হঠাৎ কী এমন ঘটল, স্বয়ং রাষ্ট্রদূত এসেছেন খাম নিয়ে! খাম খুলে ওডারল্যান্ড সাহেব যা দেখেছেন তার জন্য তিনি মোটেও প্রস্তুত ছিলেন না। খামে কী লেখা আছে তা পরে বলছি, এখন তাঁর মনের অবস্থার কথা বলব, পুরনো দিনের ঘটনাবলির কথা বলব।

ওডারল্যান্ড সাহেব জীবনের প্রতিটি কাজ করে থাকেন রুটিনমাফিক। ডিনার শেষে টুকটাক হাঁটাহাঁটি করে ঘুমাতে যান, মোবাইল ফোন সাইলেন্ট করা থাকে, ডিম লইট মাঝেমাঝে জ্বলে আবার মাঝেমাঝে ঘর অন্ধকার করে ঘুমিয়ে পড়েন দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধে অংশ নেয়া এই যোদ্ধা। বাংলাদেশ দূতাবাসের খাম হাতে পাবার পর রাতে তিনি ঠিকমতো ঘুমাতে পারেননি। প্রচন্ড মানসিক কষ্ট নিয়ে যেমন ঘুম হয় না ঠিকমতো, তেমনি মাত্রাতিরিক্ত আনন্দ নিয়েও মানুষের ঘুম হয় না। ভোররাতে হাল্কা ঘুমিয়েছেন, এরপর সূর্যোদয়ের আগে আগেই একটা স্বপ্ন থেকে ঘুম ভাঙে ওডারল্যান্ড সাহেবের। স্বপ্নের মধ্যে তিনি শুয়ে আছেন পুরনো একটা ভবনের সিঁড়ি ঘরে, চারিদিকে লোহা লক্কড়, সারি সারি বস্তা সাজানো আছে, বস্তার পাশে ফাঁকা জায়গায় দশ পনর জন সৈন্য পিটি করছেন লেফট্ রাইট লেফট্, লেফট্ রাইট লেফট্… । সৈন্যদের পিটি প্যারেডের এক পর্যায়ে শুনতে পান আজান হচ্ছে, আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম। ঘুম ভেঙে যায় ওডারল্যান্ড সাহেবের।
পার্থ শহরে তিনি যেখানে থাকেন সেখানে আজান শোনার কথা না, পুরোটাই স্বপ্নে ঘটেছে। ঘুম ভাঙতেই পুরনো দিনে হারিয়ে যান তিনি। ১৯৭১ সন। বাটা শু কোম্পানিতে তিনি ফিরে এসেছেন পূণরায়।  তখন ওডারল্যান্ড সাহেবের পোস্টিং বাংলাদেশে। ৭১’ এর মার্চ থেকেই ঢাকার অবস্থা সুবিধাজনক মনে হয়নি তাঁর কাছে। অথচ মাত্র এক বছর আগে তিনি যখন ঢাকায় এলেন তখন সবকিছুই স্বাভাবিক মনে হয়েছে। পাকিস্তানে তখন জাতীয় নির্বাচন হতে যাচ্ছে ক’দিন বাদেই। চারিদিকে একটা উৎসব উৎসব পরিবেশ বিরাজ করছে। টঙ্গীতে বসেই ওডারল্যান্ড সাহেব খবর পেতেন শহরে মিছিল হচ্ছে প্রতিদিন সন্ধ্যার পরে, গ্রামেগঞ্জে মানুষের  মুখে মুখে শেখ সাহেবের নাম। প্রাতিষ্ঠানিক শিক্ষা দীক্ষা তেমন একটা না থাকলেও ওডারল্যান্ড সাহেব ছিলেন প্রচন্ড রকমের রাজনীতি সচেতন একজন মানুষ। জাতীয় নির্বাচনে শেখ সাহেবের নিরংকুশ বিজয়ের পরও ওডারল্যান্ড সাহেবের আশংকা ছিল বাঙালিরা ক্ষমতার স্বাদ পাবে কিনা এসব নিয়ে। বাটার মতো বহুজাতিক প্রতিষ্ঠানে কাজ করার সুবাদে পাকিস্তানি অনেক জেনারেলের সাথে তাঁর ওঠাবসা ছিল, বলা চলে ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে ছিল তাঁর অবাধ বিচরণ। পাকিস্তানি সামরিক অফিসারদের খুব কাছ থেকে দেখার সুবাদে তিনি মোটামুটি নিশ্চিত হয়ে গিয়েছিলেন, আর যাই হোক বাঙালির হাতে ক্ষমতা দেয়া হবেনা কোনভাবেই। দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের অভিজ্ঞতা থেকে ওডারল্যান্ড সাহেব বুঝতে পারছেন শান্তিপূর্ণ কোন সমাধান বাঙালির হাতে নাই, আগামি দিনগুলোতে অস্ত্রের ঝনঝনানি দেখা যাবে, রক্তের বন্যা বয়ে যাবে পূর্ব পাকিস্তানের মাটিতে। সাত মার্চে শেখ সাহেবের ভাষনের পর থেকেই বারেবারে তাঁর মনে হয়েছে ব্যালটে মুক্তির পথ খোলা নেই বাঙালির সামনে,  তখন বুলেটই একমাত্র ভরসা। ২৫ মার্চের সপ্তাহ খানেক আগে ওডারল্যান্ড সাহেব যান ঢাকা ক্যান্টনমেন্টে। সেখানে তিনি কফি খেতে খেতে আড্ডা দেন জেনারেল টিক্কা খান, রাও ফরমান আলী, খাদিম রাজা প্রমুখ অফিসারদের সাথে। জেনারেল সাহেবদের কথাবার্তা তাঁর কাছে মোটেও সুবিধাজনক মনে হয়নি, নিশ্চিত ঝড়ের পূর্বাভাস।
ওডারল্যান্ড সাহেব বুঝতে পারেন ভয়াবহ কিছু একটা ঘটতে যাচ্ছে কিন্তু সেটা যে পঁচিশ মার্চ রাতেই তা তিনি জানতেন না। টঙ্গী ফ্যাক্টরি থেকে তিনি শহরে এসে উঠেছেন হোটেল ইন্টারকন্টিনেন্টালে। বাটার হল্যান্ড অফিস থেকে ছয় জনের একটা দল ঢাকায় এসেছেন, ২৬ মার্চ হোটেলে প্রোগ্রাম হবার কথা ছিল। ২৫ মার্চ রাতে গুলির শব্দে ঘুম ভেঙে যায় ওডারল্যান্ড সাহেবের। হোটেলের জানালার কাছে যেতেই তিনি দেখতে পান আলোর ঝলকানি। খুব সম্ভব আশপাশে কোথাও আগুন লেগেছে, গুলির বিকট শব্দে কান ঝালাপালা অবস্থা তখন। পরদিন ভোরের আলো ফুটতেই সাংবাদিক বন্ধু এন্থনি মাসকারেনহাসকে সাথে নিয়ে তিনি বেরিয়ে পড়েন শহরের পরিস্থিতি দেখতে। ঢাকার চিত্র দেখে ওডারল্যান্ড সাহেবের মনে পড়ে যায় দ্বিতীয় বিশ্বযুদ্ধের সময়কার সেই বিভৎস দিনগুলোর কথা, জার্মানির নাৎসি বাহিনীর কথা।
এন্থনি! তুমি দ্রুত হত্যাযজ্ঞের ছবি পাঠিয়ে দাও। দুনিয়ার মানুষ দেখুক, কী হয়েছে পূর্ব পাকিস্তানে! দৃঢ়কণ্ঠে বলতে থাকেন ওডারল্যান্ড সাহেব।
বি কুল ম্যান, প্লীজ বি কুল। পেশাদার ভঙ্গিতে জবাব দেন এন্থনি।
এন্থনি! তুমি ছবি পাঠাবে কিনা বল ঠিক করে। গলায় ঝাঁঝ স্পষ্ট হতে থাকে ওডারল্যান্ড সাহেবের।
অবশ্যই পাঠাব বন্ধু। প্লীজ, ওয়েট এন্ড সী। লেট মি চেইক এগেইন।
এন্থনি! প্লীজ ভনিতা রাখ। আমি আর সহ্য করতে পারছিনা। বাঙালিদের সাথে যা হচ্ছে তা চরম অন্যায়। উই ক্যানট টলারেট দিজ জেনোসাইড, নেভার এভার মাই ফ্রেন্ড।
মিঃ ওডারল্যান্ড! তুমি কি বাটার চাকরি ছেড়ে যুদ্ধে যেতে চাও?
ইয়েস এন্থনি, আই ক্যানট ওয়েট ফর এ সিংগেল মোমেন্ট। আমি আবার যুদ্ধে যেতে চাই।
এন্থনি মাসকারেনহাস বেশ অবাক হন বন্ধুর কথায়। এই বয়সে এসে একজন মানুষ কিভাবে যুদ্ধে যাবার কথা ভাবতে পারে? তাও আবার ভিনদেশী মানুষের জন্য!
ওডারল্যান্ড সাহেব সেদিন এন্থনিকে কেবল কথার কথা বলেননি, সত্যি সত্যিই তিনি মুক্তিযুদ্ধে নেমে পড়েন। গণহত্যার চিত্র তিনি পাঠিয়ে দেন গোটা পৃথিবীতে, মুক্তিযুদ্ধের পক্ষে জনমত গড়তে এটা খুব কাজে দিয়েছিল তখন। ওডারল্যান্ড সাহেব টঙ্গীতে বাটা শু ফ্যাক্টরির মধ্যে স্থানীয় জনগণকে যুদ্ধের প্রশিক্ষণ দিতে থাকেন, অস্ত্র জোগাড় করা, ওষুধপত্র আনা, খাবার সংগ্রহ করা, অর্থ সংগ্রহ করা সব সামলেছেন একা হাতে। বাটা শু ফ্যাক্টরির পাশেই একটি মসজিদ ছিল। ওডারল্যান্ড সাহেবের প্রতিদিন ঘুম ভাঙত আজানের সুরে।
আসসালাতু খায়রুম মিনান নাউম…
পার্থের বাড়িতে আজ ওডারল্যান্ড সাহেবের ঘুম ভেঙেছে বহুকাল আগে টঙ্গীতে শোনা সেই আজানের সুরে। বাংলাদেশ দূতাবাস থেকে পাওয়া খামের সাথে কি কোন সম্পর্ক আছে টঙ্গীর সেই মদজিদ থেকে ভেসে আসা আজানের সুরের? থাকতে পারে। ওডারল্যান্ড সাহেব সেসব বিশ্লেষণে এখন যেতে চাচ্ছেন না। দেরিতে হলেও বাংলাদেশ সরকার তাঁকে স্মরণ করেছেন, এটা ভাবতেই ওডারল্যান্ড সাহেবের কাছে খুব ভাল লাগছে এখন। মুক্তিযুদ্ধে তিনি যখন যোগ দেন, তখন তাঁর বিদেশি বন্ধুরা হাসাহাসি করত। পাগল না হলে কেউ নিজের জীবন বিপন্ন করে অন্যদেশের পক্ষে অস্ত্র ধরে?
বাংলাদেশ সরকার অনেক দেরিতে হলেও বুঝতে পেরেছেন একজন বিদেশি বন্ধু মুক্তিযুদ্ধের সময় অস্ত্র হাতে তুলে নিয়েছিলেন  যাকে আজ পর্যন্ত যথাযথ মর্যাদা দেয়া হয়নি। যে যুদ্ধে নিজ দেশের কিছু লোক বেঈমানী করেছে, পাকিস্তানি মিলিটারির সাথে হাত মিলিয়ে বাঙালি নিধন করেছে, মেয়েদের তুলে দিয়েছে খান সেনাদের ক্যাম্পে, সেই যুদ্ধে ভিনদেশের এক মানুষ বাঙালির পক্ষে যুদ্ধ করতে পারেন ভাবা যায়? সরকার এবার সিদ্ধান্ত নিয়েছেন কিছু একটা অবশ্যই করতে হবে সেই বিদেশি বন্ধুর জন্যে, কিঞ্চিৎ হলেও ঋণ তো শোধ হতো! ওডারল্যান্ড সাহেবের কাছে যে খাম এসেছে তার মধ্যে একটি চিঠি আছে। চিঠিটি তিনি বেশ কয়েকবার পড়েছেন আর চোখের পানি মুছছেন। স্ত্রী মারিয়া এত বছরের দাম্পত্য জীবনে কখনো ওডারল্যান্ডকে কাঁদতে দেখেছেন বলে মনে করতে পারছেন না। কী এমন ঘটল আজ?
ওডারল্যান্ড সাহেব ব্যায়াম করতে বের হবেন এমন সময় তিনি বাসার সামনে ভীড় দেখতে পান। দেশি বিদেশি সাংবাদিকদের ভীড় জমে গেছে। গত ছয় সাত ঘন্টার মধ্যেই সারা পৃথিবীতে খবর চলে গেছে একজন অস্ট্রেলিয়ান নাগরিককে বাংলাদেশ সরকার “বীর প্রতীক” খেতাবে ভূষিত করতে যাচ্ছেন এ বছর। ভিনদেশী কোন মানুষ মুক্তিযুদ্ধের জন্য এত বড় খেতাব আগে কথা কখনো পায়নি। স্বাধীনতা লাভের প্রায় সাতাশ বছর পর বাংলাদেশের মনে পড়েছে এই অকৃত্রিম বন্ধুর কথা!
ঢাকা,বাংলাদেশ ।

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
15 Shocking Elon Musk Tweets About Stock Market

15 Shocking Elon Musk Tweets About Stock Market

Cursus iaculis etiam in In nullam donec sem sed consequat scelerisque nibh amet, massa egestas risus, gravida vel amet, imperdiet volutpat rutrum sociis quis velit, ...
বিসর্জন

বিসর্জন

জোবায়ের রাজু আপন গতিতে ট্টেন ছুটে চলছে। আতিক ট্টেনে বসে আছে। সে গ্রামের বাড়ি গৌরীপুর যাবে। আগামী সপ্তাহে আতিকের বড় ভাই শওকতের বিয়ে। বিয়েটা কোথায় ...
নগ্নগন্ধ [পর্ব-০৩]

নগ্নগন্ধ [পর্ব-০৩]

আশিক মাহমুদ রিয়াদ গত পর্বটি পড়তে এখানে ক্লিক করুন { গত পর্বের পর থেকে] তমাল কি প্রীতিকে ভালোবেসে ফেলেছে? অথবা প্রীতির কি তমালকে ভালো লেগেছে? ...
ছোটগল্প - শ্যাওড়া গাছের বেদনা

ছোটগল্প – শ্যাওড়া গাছের বেদনা

আশিক মাহমুদ রিয়াদ মধ্যদুপুরে উঠানের শ্যাওলা পড়া গাছটার বাদাম দিকে তাকিয়ে ছিলাম। চোখে মুখে ঘুমের আবির্ভাব। বার বার হাই তুলতে হচ্ছে। হাত থেকে মাছের গন্ধ ...
চেতনায় মুজিব

চেতনায় মুজিব

জয় দীপ্ত চক্রবর্ত্তী ১৫ ই আগস্টে ঘাতকের বুলেটের আঘাতে হয়ত ছিন্নভিন্ন হয়েছিলো বঙ্গবন্ধুর দেহখানি, কিছু হিংস্র হায়নার দল ছিন্নভিন্ন বুকের রক্তপানে মেতে উঠেছিলো পৈশাচিক বর্বরতায়, ...
‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-স্মৃতিচারণে অমর্ত্য

‘হোম ইন দ্য ওয়ার্ল্ড’-স্মৃতিচারণে অমর্ত্য

ড. গৌতম সরকার ‘অমর্ত্য’ নামটি স্বয়ং রবীন্দ্রনাথ ঠাকুরের দেওয়া। শৈশবের কিছুটা সময় কেটেছে শান্তিনিকেতনের সাংস্কৃতিক পরিমণ্ডলে অসংখ্য গুণী মানুষের সান্নিধ্যে। বাবা ছিলেন ঢাকা বিশ্ববিদ্যালয়ের রসায়ন ...