ভালোবাসার দ্বিতীয় প্রহর [অন্তিম পর্ব]

ভালোবাসার দ্বিতীয় প্রহর [অন্তিম পর্ব]

ভালোবাসার দ্বিতীয় প্রহর [অন্তিম পর্ব]

ক্লাস শুরু হয়েছে এক সপ্তাহ হতে চলল। পারমিতা একদিনও ক্লাস বাদ দেয়নি। এবং প্রতিদিনই সৈকতের খোঁজে ওর ডিপার্টমেন্টে গিয়েছে দেখা পায় নি। আর রুচিরার ক্লাস এখনও শুরু হয় নি। পারমিতা এখন বাসা থেকে সরাসরি ক্লাসে আসে আবার বাসায়ই চলে যায়। হলে সম্ভবত আর আসা হবে না? হলে গিয়ে রুচিরাকে খুঁজেছে কিন্তু দেখা পায় নি? সৈকতকেও কয়েকদিন হলে খুঁজে এসেছে। রুম তালাবদ্ধ অবস্থায়ই পেয়েছে সবদিন। পাশের রুমে খবর রেখে এসেছে কিন্তু তবুও সৈকতের দেখা মিলছে না। পারমিতা বুঝতে পেরেছে  সৈকত ইচ্ছে করেই এমনটি করছে। আজও যেতে হবে।কিন্তু সৈকতকে না পেলেও রুমমেট অনিককে ক্যাম্পাসে পেয়েছে  পারমিতা। ওর কাছ থেকে জানতে পায় যে, সৈকত একটু উদ্ভট প্রকৃতির জীবনযাপনে জড়িয়ে পড়েছে। সকালে বের হয় আর গভীর রাতে রুমে ফেরে। আর সবকিছুতেই নিষ্পৃহ ভাব। আগের উৎফুল্ল সৈকত আর নেই।

অনিক বলল সকাল দশটায় মধ্যে আসলে সৈকতকে পাওয়া যাব।- এই বলে অনিক ঘড়ি দেখে বলে এখন অবশ্য গেলে পেতে পার।

পারমিতা ক্যাম্পাসে আর সময় ব্যয় করে না। রিকশা নিয়ে সোজা সৈকতের হলে। রিকশা থেকে নেমে পারমিতা খুব দ্রুতগতিতে হাঁটতে শুরু করল। কয়েকজন পেছন ফেরে পারমিতাকে লক্ষ্য করল, কিন্তু পারমিতার সেদিকে খেয়াল নেই। ওর একমাত্র লক্ষ্য এবং ভাবনা হল সৈকত। সিঁড়ি বেয়ে রীতিমতো দৌড়ে এল পারমিতা।

রুমের দরজা খোলা। সৈকত উপুড় হয়ে ঘুমুচ্ছে। একটা হাত ফ্লোর ছুঁই ছুঁই করে ঝুলে আছে। টেবিলের  উপর সিগারেটের প্যাকেট, একটা ম্যাচ এবং একটা কাঁচের ছাইদানী। ছাইদানীটায় সিগারেটের পরিত্যক্ত অংশে পুরো ঠাসাঠাসি। বইপত্রগুলো এলোমেলোভাবে ছড়িয়ে ছিটিয়ে পড়ে আছে। টেবিলের নিচটায় অসংখ্য আবর্জনা । আর মাথার ওপরের অংশে ভেন্টিলেটারে চড়ুই পাখির বাসা ঝুলছে। সবকিছু মিলিয়ে পারমিতা সৈকতের জীবনের ছন্দপতনের আঁচ পেল। এতক্ষণ খেয়াল ছিল না পারমিতার দরজাটা খোলা রয়ে গেছে। দরজাটা বন্ধ করে এল।

সৈকত ঘুমোচ্ছে। বিছানার ওপর চোখ বুলায়। বেডশিটটা খুব নোংরা হয়েছে। ঘামে ভিজে আবার শুকিয়ে তেল চিটচিটে হয়ে আছে। বালিশের কভারটাও একই অবস্থা। ঘুমন্ত সৈকতের দিকে তাকিয়েই পারমিতার মনটা খারাপ হয়ে যায়। চেয়ার টেনে পারমিতা বসে। তারপর টেবিলে বইপত্র গোছগাছ করে। হাতে লেগে ছাইদানীটা পড়ে ঝনাৎ শব্দে ভেঙে খান খান হয়ে যায়। সৈকত চোখ মেলে তাকায় । পারমিতাকে দেখতে পেয়ে নিষ্পৃহভাব নিয়ে উঠে বসে। তারপর বলে কখন এলে?- এই বলে আলনা থেকে জামাটা টেনে গায়ে জড়ায়।

পারমিতার উত্তর  অনেকক্ষণ হলো।

ডাকলে না কেন?

ঘুম ভাঙাতে খারাপ লাগে। তাছাড়া তুমি খুব ঘুমাচ্ছিলে।

রাত করে ঘুমিয়েছি তাই। একটু বস, হাত-মুখটা ধুয়ে  আসি।- বলে সৈকত রুম থেকে বের হয়ে যায়। তারপর হাত মুখ ধুয়ে তোয়ালেতে মুছতে মুছতে পারমিতার কাছাকাছি হয়ে বসে। সরাসরি তাকাতে পারমিতার কষ্ট হচ্ছে। সৈকতের চোখ দুটো কেমন যেন নিষ্প্রভ হয়ে আছে। চোখের কোণে জমে আছে কষ্ট কালি। চুলের ওপর যত্নশীল হাত হয়ত অনিক দিন ধরে পড়ে না। নীরবতা ভেঙে সৈকত বলে তারপর কী মনে করে?

পারমিতা কোন কথা বলে না। পলকহীন দৃষ্টি সৈকতের ওপর ফেলে গভীর হয়ে তাকায়। সৈকত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়। অবশ্য আড়ালে আড়ালে চকিতে চকিতে পারমিতাকে সৈকত দেখে। কপালে সিঁদুরের ছোট্ট ফোঁটা। সিঁথিতে সিঁদুর-রেখা। হাতে সোনায় বাঁধানো শাঁখা-চুড়ি। সেলোয়ার কামিজ পরলেও চেহারায় একটু অন্যরকম জৌলুস চেপে আছে, যা সৈকতের দৃষ্টিতে পড়েছে। হাতের অনামিকায় বসে থাকা আংটিটা সৈকতের দৃষ্টিকে বারবার টানে।

পারমিতা অভিযোগের সুরে বলে বিয়েতে গেলে না যে?

মন চায় নি তাই।

সৈকত তুমি আমাকে বোঝার চেষ্টা করোনি।

সৈকত জবাবে কোন কথা বলে না।

সৈকত, তুমি নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছ কেন? আমার ওপর রাগ করে নিজেকে শেষ করো না।

আমাকে নিয়ে তোমার এত ভাবনা কেন? কথা বলে যাচ্ছে ঠিকই, কিন্তু সৈকতের দৃষ্টি অন্য কোথাও।

পারমিতা অনেক চেষ্টা করে দৃষ্টিতে দৃষ্টি আটকাতে। সৈকত পারমিতার দৃষ্টিসীমা বুঝতে পেরেই আর এদিকে তাকায় না। পারমিতা নিরূপায় হয়ে বলে সৈকত তুমি আমার দিকে তাকাচ্ছ না কেন?

না তাকিয়ে হাসে। সৈকত নির্বিকার। পারমিতা সৈকতের হাত টেনে মুখোমুখি বসায়। কিন্তু তবুও সৈকত পারমিতার দিকে সরাসরি তাকায় না। সৈকতের দৃষ্টিতে অভিমানকে ছাপিয়ে কষ্টগুলো পারমিতাকে দগ্ধ করছে। ব্যাকুল হয়ে পারমিতা বলে সৈকত এমনটি আমি কখনও চাই নি।

যা হবার তা হয়ে গেছে। এসব নিয়ে চিন্তা করে অনর্থক নিজের দুঃখকে বাড়িও না । তুমি এখন পরস্ত্রী এভাবে হুটহাট আমার এখানে এসো না।

তোমার আমার সম্পর্ক কী এরকম নাকি ?

ছিল না, এখন হয়েছে এবং এটাই বাস্তবতা নয় কি?

আমি মানতে রাজী নই। অন্তত তোমার আমার সম্পর্ক তেমনটা হবে না।

আবেগ দিয়ে সব সম্পর্ক এক করা ঠিক নয়। তোমার এখন সংসার আছে। সুতরাং আমার চিন্তা তুমি কখনও করো না। করলে অমঙ্গল ছাড়া কখনও মঙ্গল হবে না। তুমি তোমার মত থাক আর আমাকে আমার মত থাকতে দাও।

সৈকত তুমি কী ভাবো? আমি কি তোমাকে একটুও ভালোবাসি না?

বাসতে এখন তুমি অন্য জগতের বাসিন্দা।

সৈকত তুমি জেনে রাখো। যতদিন বাঁচব ততদিন তোমাকেই ভালোবাসবো। থাকবো হয়ত দূরে দূরে কিন্তু তোমার ছায়া আমার বুকে সর্বক্ষণ গেঁথে রাখব। ভালোবাসার জগতে তুমি শুধু আমার।

কিছুটা রাগত কণ্ঠে সৈকত বলে মিথ্যে কথা। আমি মানি না, বিশ্বাসও করি না। তুমি আমাকে শান্তিতে থাকতে দাও। প্লিজ তুমি আমাকে একটু শান্তিতে থাকতে দাও।

পারমিতা অবাক হয়। দু’চোখ বেয়ে অশ্রু ফোঁটা গড়িয়ে পড়ে। তারপর কাঁপা কাঁপা কণ্ঠে বলে – সৈকত তুমি একথা বলতে পারলে?

কেন পারব না। তুমি আমার জীবনের পুরো অধ্যায়কে তছনছ করে দিয়েছ। আমার স্বপ্নের বাগানের সূর্যোদয় কেড়ে নিয়েছ। আর কী চাও তুমি?

আমি শুধু তোমার একটু ভালোবাসা চাই।

আমার বুকে ভালোবাসা  নেই । আর যেটুকু আছে সেটুকু আমার নিজস্ব জগতের ভেতর ঘুরপাক খাবে। কারও ধরাছোঁয়ার নাগালে আনবো না।

প্লিজ সৈকত তুমি আমাকে এভাবে কষ্ট দিয়ে কথা বলছ কেন? তোমার ভালোবাসা না পেলে আমি বাঁচতে পারবো না। কেউ না বুঝুক অন্তত তুমি আমাকে বুঝবে এই আমার বিশ্বাস।

সৈকত অভিমানভরা দৃষ্টিতে পারমিতার দিকে তাকায়। কথাতেও অভিমান ঝরে পড়ে আমি তোমার সবকিছু না হয় মেনে নিলাম। কিন্তু আমি তো একজন মানুষ। নিজস্ব একটা জগত নিশ্চয়ই থাকবে।  এবং এর পেছনে আবেগ-ভালোবাসা জড়িয়ে থাকাটাই স্বাভাবিক। আর না পাওয়ার একটা দুঃখ প্রত্যেকের থাকে। তুমি সুখে থেকো এতে আমি বাদ সাধবো না। শুধু আমাকে আমার মত থাকতে দাও।

পারমিতা হাত জোড় করে বলে তুমি আমাকে ক্ষমা করো সৈকত। তোমার আশীর্বাদ ছাড়া আমি বাঁচতে চাই না।

সৈকত  পারমিতার হাতে হাত রেখে বলে ছি!  পারমিতা, আমি কি তোমাকে অভিশাপ দিতে পারি?

তাহলে নিজেকে এভাবে কষ্ট দিচ্ছ কেন?- পারমিতা অভিমানের কন্ঠে বলে

সৈকত আর কথা বাড়ায় না। চুপচাপ বসে আছে। দৃষ্টি জোড়া চড়ুই পাখির বাসায়।

তোমার ক্লাস শুরু হয়েছে এক সপ্তাহ হল অথচ একদিনও যাওনি।- পারমিতা অভিযোগ করে বলে।

ইচ্ছে হয় না, যাই না।

ক্লাসগুলো অন্তত ঠিকভাবে করো।

না করতে গেলেই অনেক কথা বাড়বে এই ভেবে সৈকত বলে  হ্যাঁ করবো।

আজ ক্লাস নেই?

রুটিন জানা নেই।

তাহলে ক্যাম্পাসে চল।

একটু কাজ আছে। এখন ক্যাম্পাসে যাব না। ক্যাম্পাস হয়েই চলে যেও। সৈকত কোন কথা বলে না। উঠে গিয়ে সৈকত আলনার আড়ালে যায়। পারমিতা মিটিমিটি হাসে। আলনার আড়াল থেকে বেরিয়ে এসে কেডস জোড়া তুলে নেয়। ফিতা আটকাতে আটকাতে বলে তুমি আমার রুমে আর এসো না, দরকার হলে খবর দিও।

পারমিতা কোন কথা বলে না।

সিঁড়ি বেয়ে দু’জন নেমে আসে। সৈকত হালকা নাস্তা করে। পারমিতা শুধু এককাপ চা খেল। চায়ের শেষ চুমুক দিয়ে সৈকত সিগারেট ধরায়। পারমিতা শুধু তাকিয়ে থাকে। সৈকত বুঝতে পেরে দৃষ্টি অন্যত্র ঘুরিয়ে আপন মনে সিগারেটে দিল এক লম্বা টান।

রিকশায় বসে পারমিতা সৈকতের জন্য জায়গা ছেড়ে বলে- উঠে এসো।

সৈকত কোন কথা না বলে রিকশার হুডটা টেনে দেয়।

পারমিতা বলে- আবার কবে দেখা হচ্ছে?

দেখা হবে।- সৈকত অনির্দিষ্ট ভাবে বলে।

রিকশা চলতে শুরু করতেই সৈকত অন্য রিকশার জন্য ব্যস্ত হয়। পারমিতা পেছন ফিরে তাকয়িে থাকে।কিন্তু সৈকত একবারও তাকায় নি। সৈকতের রিকশাটা উল্টোদিকে রওনা হয়। দুজনার দূরত্ব ক্রমশ বাড়তে বাড়তে দৃষ্টিসীমা ছাড়িয়ে যায়। কষ্টের নিঃশ্বাস ফেলে পারমিতা দৃষ্টি ফিরিয়ে স্বাভাবিক হতে চেষ্টা করে।

*

ভোরের আজানের সুর ভেসে আসতেই সৈকতের সম্বিৎ ফিরে আসে। দৃষ্টি যায় হাতের আঙুলে। সিগারেট নিভে গেছে। সিগারেটের অংশটুকু ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দেয়। তারপর শ্রান্ত-ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দেয়।

আর এদিকে রুচিরারও একই অবস্থা। সৈকতের কাছ থেকে এসেই বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। সময় কেটে যায় একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে। রুচিরা চোখ বন্ধ করে অনুভব করে সৈকতের  হাত ধরে বসে থাকার মুহূর্তটুকু। সুখের আবেশটুকু রুচিরাকে এখনও পুলকিত করছে। রুচিরার সারা অঙ্গে ভালোবাসার ঝড় বইছে অবিরাম।

সৈকতকে রুচিরা ভালোলাগার আঙিনায় বহুদিন থেকেই ঠাঁই দিয়ে রেখেছে। যে স্থানে অন্য কেউ ঠাঁই পায়নি। কিন্তু এই ভালোলাগা যে মুহূর্তের নিঃশ্বাসে ভালোবাসায় পরিণতি পাবে সেটি রুচিরার ধারণায় ছিল না। অথবা এমনটি ভাববার সাহস করে ওঠতে পারে নি কোন দিনই। আবার এমনও হতে পারে ভালোলাগাটুকু ভালোবাসায় অংকুরতি হতে সময় নিয়েছে নিয়তির ডালা থেকে।

এত সুখ রুচিরা মনের ভেতর গোপন করে রাখতে পারে নি। সেই তখন থেকেই খুশীর জোয়ারে দু’চোখ প্লাবিত হচ্ছে। বালিশ ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। কোন রকম ভ্রুক্ষেপ নেই রুচিরার। রুচিরার মনের বাগানে এই  রোদ – এই বৃষ্টি। আজ অফিসে যায় নি র্পযন্ত।

পড়ন্ত বিকেলে এল পারমিতা। রুমে ঢুকে চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে।  ভাবছে রুচিদির ঘুমের মধ্যে ডিস্টার্ব করবে না।

রুচিরা বালিশে মুখ গুজে শুয়ে আছে। আর ভাবছে সৈকতকে নিয়ে। কিছুক্ষন পর পারমিতা বুঝতে পারল রুচিরা সজাগ। পারমিতা গলা খাকাড়ি দিয়ে উপস্থিতি জানান দিল। রুচিরা চমকে ওঠে ফিরে তাকায়।

অবাক হয়ে তাকায় পারমিতা এবং বলে-  তোমার কী হয়েছে রুচিদি?

রুচিরা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে না কিছু হয়নি। শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে তাই শুয়ে আছি।

তা বুঝতে পারলাম। কিন্তু তোমার চোখ বলছে অন্য কথা।

রুচিরার হঠাৎ খেয়াল হয় কান্নার জলে ভেজা বালিশের কথা। বালিশটা উল্টে রাখে।

রুচিদি সত্যি করে বলো তো তোমার কী হয়েছে?

রুচিরা হালকাভাবে বলে কিছু হয়নি।কিছুই হয় নি লক্ষী বোনটি আমার।

পারমিতা বুঝতে পারে যে, রুচিরা কিছু একটা লুকাতে চাচ্ছে। পারমিতা কাছাকাছি হয়ে বলে  রুচিদি তুমি কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়েছ। তোমার এত কষ্ট অথচ আমাকে কিছুই বলতে চাচ্ছ না। তোমরা সবাই  আমাকে এত অবিশ্বাস কর কেন?- পারমিতার কণ্ঠটা কান্নায় ধরে আসে।

রুচিরা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। পারমিতার হাতে হাত রেখে বলে-  সত্যি বলেছি আমার খারাপ কিছুই হয়নি। আমি সুখে কাঁদছি।

পারমিতা তাকিয়ে থাকে কিছু একটা শোনার জন্য।

রুচিরা বলে মনে কিছু করো না পারমিতা। এই কথাটি আমি তোমাকে বলতে পারব না।

ঠিক আছে, তুমি সুখী হলে তাতেই আমার আনন্দ। আমি শুনতে চাই না। কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল, তারপর আবার বলল চাকরিতে গেলে না।

ইচ্ছে হচ্ছিল না একদম। তারপর বল তোমার খবর কী?

তোমার কাছে একটা কাজে এসেছি রুচিদি। রুচিরা বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থেকে বলে-  বলো।

তৃষ্ণার বাবার প্রমোশন হয়েছে।

রুচিরা বেশ খুশী হয়।

পারমিতা বলে সেই সাথে বদলি। সম্ভবত কিছুদিনের মধ্যেই চলে যেতে হবে।

রুচিরা কোন কথা বলে না। শুধু চেয়ে থাকে। পারমিতা বলে-  শুনেছি সৈকত এখন ক্লাস রীতিমত করে। অথচ আমি ওর নাগাল পাই না। ও আমাকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলে। ওকে একটু দরকার ছিল এবং খুব শিগগির।

হলে গেলেই হয় তো পেতে পারো ।- রুচিরা স্বাভাবিক ভাবেই বলে।

পারমিতা জবাবে কোন কথা বলে না। রুচিরা বুঝতে পারে যে পারমিতা হলে যেতে চাচ্ছে না। একটু ভেবে রুচিরা বলে ঠিক আছে, তুমি আগামী কাল সকাল এগারটায় লাইব্রেরির সামনে থেকো।

পারমিতা খুশী হয়ে রুচিরাকে জড়িয়ে ধরে এবং বলে-  রুচিদি, তুমি আমার জন্য যা করলে তা কোনদিন ভুলতে পারব না। সৈকতকে তুমি নতুন জীবন দিলে। আমি কিছুটা হলেও সুখী হলাম। আর নয়ত সারাটা জীবন আমার মনের ভেতর দাগ পড়ে থাকত।

রুচিরা কথার মোড় ঘুরাবার প্রয়াসে বলে-  তৃষ্ণামণি কেমন আছে?

ভালো আছে। বাসায় আস না কেন? সময় করে একবার আস না রুচিদি। ক’দিন পরই-আবার ঢাকার বাইরে চলে যেতে হবে। তখন যে কতদিন পর দেখা হবে ভেবেই পাচ্ছি না।

রুচিরা বলে- চিন্তা করো না, সব সময় যোগাযোগ রাখব।

পারমিতা চলে যেতেই রুচিরা আবার বিছানায় গড়াগড়ি যায়। সুখের আচ্ছন্নতায় ডুবে ডুবেই সারাটি রাত কেটে যায়।

*

ঘুম থেকে উঠেই সৈকতকে নিয়ে ভাবে। গতকাল সুখের তোলপাড়ে আর লজ্জায় সৈকতকে কিছুই বলতে পারে নি। সৈকতকে দেখার জন্য মনটা ভীষণ রকম উতলা হয়ে আছে। রুচিরা আর দেরি করে নি। হালকা মেকাপ টেনেই বাইরে পা বাড়ায় রুচিরা। সৈকতের রুমের কাছে এসে রুচিরা ঘড়িতে চোখ রাখে। সাতটা বেজে পঁয়ত্রিশ। দরজার কাছে এসে খানিক দাড়ায়। তারপর করা নাড়ে। দরজা খুলে অনিক  সরে দাঁড়ায় এবং বলে আসুন রুচিদি ভেতরে আসুন।

শব্দহীন হাসি ছড়িয়ে  দিয়ে রুচিরা রুমের ভেতর ঢুকে। সৈকত উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।  চেহারাটাও দেয়ালের দিকে। পুরোপুরি দেখা যাচ্ছেনা। হাত দুটো এমনভাবে গুটিয়ে রেখেছে যেন একটা অসুখী মানুষ। রুচিরার মনটা খারাপ হয়ে যায়। গতকাল কষ্ট করে হলেও কিছু কথা বলার দরকার ছিল। রুচিরা এবার  অনিকের  দিকে তাকায় । অনিক জুতা জোড়া পরছে। রুচিরা বলে কোথাও যাচ্ছ নাকি অনিক?

আটটায় ক্লাস আছে।- এই বলে অনিক জুতার ফিতা বেঁধে টেবিলের উপর থেকে বইপত্র হাতে নেয়। তারপর রুচিরাকে বলে রুচিদি আপনি বসুন, আমি ক্লাসে যাচ্ছি। সৈকত গতরাতে সম্ভবত বেশি রাতে ঘুমিয়েছে।

অনিক চলে যায়। রুচিরা সৈকতের কাছাকাছি চেয়ারটায় গিয়ে বসে। চুপচাপ চেয়ে থাকে সৈকতের দিকে। সোয়া আটটা নাগাদ সৈকত ঘুমন্ত অবস্থাতেই টেবিলের ওপর হাত বাড়ায়। কিছু একটা সম্ভবত খুঁজছে। রুচিরা দেখে হাতের কাছেই সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা পড়ে আছে। রুচিরা সৈকতের হাতের  নাগালে পোঁছে দেয়। সৈকত চিৎ হয়ে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই সিগারেট ধরায়। এবার সৈকত ছাদের দিকে তাকায় । হাত একটা আড়াআড়ি করে কপালে ফেলে রাখে।

ভাবনার জালে আবদ্ধ হয়ে আপন মনে সিগারেট টানছে। অথচ স্বপ্নের রানী যে ওর পাশেই বসা সে কথা এখনও জানে না। রুচিরা পলকহীন দৃষ্টিতে সৈকতকে দেখছে। সিগারেট টানা বন্ধ করে সৈকত যেন কী ভাবছে। সিগারেটের ধোঁয়া কুগুলী পাকিয়ে ঊর্ধ্বমূখী হচ্ছে। সিগারেটে শেষ  টানটা বেশ লম্বা করেই দেয়। তারপর উঠে বসে। রুচিরার ওপর চোখ পড়তেই বিস্ময়াভূত হল সৈকত। পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রুচিরা মিটমিট হাসছে। কী বলবে সৈকত ভেবে পাচ্ছে না। কারণ রুচিরা আসবে একথা সৈকত ভাবে নি। রুচিরা প্রথম কথা বলে এত গভীর হয়ে কী ভাবছিলে?

ভাবছিলাম, ভাবছিলাম অনেক কিছু।

যেমন?

আমার নিজের কথা, স্বপ্নের কথা আর রাজকন্যার কথা।

উত্তরে কোন কথা বলে না রুচিরা । শুধু মিটমিট হাসে।

বিছানা ছেড়ে সৈকত নেমে আসে। তারপর বলে রুচিদি তুমি একটু বস, আমি হাত-মুখটা ধুয়ে আসি।

রুচিরা মাথা নাড়ে।

তোয়ালে নিয়ে সৈকত বাইরে যায়। বারান্দার জানালা গলে সৈকত বাইরে তাকায়। একটা পিচ্চিকে ডেকে নাস্তা দিতে বলে।

রুচিরা চেয়ার ছেড়ে উঠে। বিছানার চাদরটা তুলে ভালো করে ঝেড়ে একেবারে টানটান করে বিছায়।

সৈকত রুমে ঢুকেই গোছানো বিছানায় পলকহীন তাকিয়ে থাকে। দৃষ্টি ফিরিয়ে রুচিরার দিকে তাকাতেই রুচিরা বলে একটু গোছালো থাকা ভালো। এই বলে রুচিরা সৈকতের হাতের তোয়ালেটায় তাকিয়ে থাকে।

সৈকত লজ্জিত হয়ে বলে আজই পরিস্কার করব।

রুচিরা হাসে। তারপর হঠাৎ করেই রুচিরা মন খারাপ করে বসে থাকে।

সৈকত অবাক হয়ে বলে কী ব্যাপার রুচিদি আকাশে হঠাৎ মেঘের ঘনঘটা কেন?

অভিমানী রুচিরা বলে গত রাতে এত দেরি করে ঘুমোতে গেলে কেন?

সৈকতের ইচ্ছে হচ্ছিল সত্যি কথাটা বলতে কিন্তু কী যেন ভাবল, এড়িয়ে গিয়ে বলল আর রাত করে ঘুমোব না।

রুচিরা অবিশ্বাসী চোখে তাকায়। তারপর সাহসে ভর করে চোখে চোখ রাখে।  এই দৃষ্টিতে রয়েছে ভীষণ রকম আস্কারা।

কানে হাত লাগিয়ে দুষ্টুমিভরা হাসি ছড়িয়ে সৈকত বলে এই যে রাণী এবার কানে ধরে বলছি, ভুল আর কখনও হবে না।

রুচিরা আশ্বস্ত হয়ে বলে- দেখা যাবে কতটুকু বাধ্য হয়ে চলেন।

দরজার কড়া নড়ে ওঠতেই সৈকত এগিয়ে যায়। পিচ্চি নাস্তা নিয়ে ঢুকে।

পিচ্চি নাস্তা রেখে চলে যেতেই সৈকত দরজার খিল এঁটে দেয়। তারপর কাছে এসে সৈকত বলে আচ্ছা রুচিদি একটা কথা বলব ? সত্যি জবাব দেবে কি?

জিজ্ঞেস করতে পারো। তবে সেন্ট পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিতে পারব না।- দুষ্টুমি ভরা হাসি হেসে রুচিরা বলে।

চোখে চোখ রেখে সৈকত বলে-  আমি খালি পেটে সিগারেট টানলাম, কিছু বললে না যে?

তোমার দিনের প্রথম আমেজটায় বাঁধা দিতে ভালো লাগছিল না। ভাবলাম তোমার নিজস্ব ভুবনে অন্তত কিছুক্ষনের জন্য হলেও নিশ্চিন্তে বিচরণ কর।- এই বলে রুচিরা সৈকতের চোখে চোখ রেখে আবার বলে সিগারেটটাই ক্ষতিকর তার ওপর খালি পেটে। এযে বিষ পান । এভাবে আর টেনো না।

মহারানী যা বলবেন সবই মাথা পেতে নেব। টেবিলের ওপর একটা পেপার বিছিয়ে তাতে নাস্তাগুলো খুলে রাখে সৈকত। ডিম টোস্টের একটা টুকরো হাতে তুলে নিয়ে সৈকত রুচিরার দিকে বাড়ায়। রুচিরা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। সৈকত মুচকি হাসে। রুচিরা মনে মনে ভাবে সৈকতের এগিয়ে দেয়া ভালোবাসাটুকু আমাকে গ্রহন করতেই হবে। হাতে হাত ধরে সৈকতের এগিয়ে দেয়া ডিম টোস্টে ভাগ বাসায় রুচিরা । তারপর রুচিরাও একটা টুকরো হাতে নিয়ে সৈকতকে খাইয়ে দেয়। সৈকত দুষ্টুমি করে রুচিরার হাতের আঙুলে হালকা কামড় বসায়।

উঃ! বলে রুচিরা সৈকতকে মিছিমিছি মারতে আসে। সৈকত হাসে। তারপর কতক্ষণ নীরবতা। নাস্তা শেষে কৌটা থেকে চা গ্লাসে ঢেলে রুচিতাকে এগিয়ে দেয়।

সিগারেটের প্যাকেটেটা হাতে নিয়ে সৈকত বলে-  এই যে, মাহারাণী এবার একটা সিগারেট খেতে পারি?

রুচির মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। তবে বলে- সিগারেটটা ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলতে হবে।

আজকের শুরু থেকে সৈকতের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল গতকালের দুঃসহ মূহূর্তের কষ্টগুলোকে রুচিবার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু তেমন সাহস পাচ্ছিল না এবং বলতে গিয়েও যেন আগ্রহবোধ হচ্ছিল না। এমন সুযোগটা পেয়েই সৈকত বলল সিগারেটটা আসলে এই ক’দিনেই কমিয়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু গতকাল ভীষণ দুশ্চিন্তায় কেটেছে তো তাই।

রুচিরা উৎকণ্ঠচিত্তে জানতে চায়- কেনো, কি হয়েছিল তোমার?

‘না মানে গতকাল তোমার কথাগুলো বলার পর তুমি যেভাবে কাঁদলে ভাবলাম তোমাকে খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললাম। তারপর থেকে সত্যিই আমার খুব খারাপ সময় কেটেছে। তোমাকে আমি হারাতে চাই না রুচিদি। যে কোন সম্পর্কেই হোক তোমার সান্নিধ্য আমি সবসময় পেতে চাই। সৈকতের কণ্ঠেস্বরে বেশ আবেগ ছড়িয়ে পড়ে।

সৈকতের আবেগের মোহনায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় রুচিরা। কোন রকমে নিজের  অস্তিত্বকে তুলে এনে বলে-  ওটা আমার সুখের কান্না ছিল, সৈকত। আমি তোমার মতো একজন বন্ধু চাই। যে সবসময় সবকিছুই বুঝতে চেষ্টা করে। ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, সৈকত। গতকাল এতটুকু কথা বলতে পারছিলাম না যে, অন্তত বিদায় বাক্যটুকু বলি। সুখের বন্যায় আমি হাবুডুবু খাচ্ছিলাম সৈকত। আই লাভ ইউ। সৈকত, আই লাভ ইউ । আমাকে তুমি কখনও কষ্ট দিও না সৈকত। আই লাভ ইউ সৈকত।

কখন কে কাকে জড়িয়ে ধরেছে কেউ বলতে পারে না। রুচিরা খুশীতে আবার কেঁদে ফেলে। জড়িয়ে থেকে রুচিরা বলে তুমি আমাকে সব সময় ভালোবেসো।

হ্যাঁ রুচিদি, আমি  তোমাকে সারাজীবন ভালোবাসবো।

আর তোমার ভালোবাসাকে আমি বুকের গহীনে লুকিয়ে রাখব অনন্তকাল।- সুখের ভেলায় ভাসতে ভাসতে রুচিরার র্স্বগীয় উচ্চারণ।

আই লাভ ইউ, রুচিদি। আই লাভ ইউ।- আবেগে আপ্লুত হয়ে সৈকত ভালোবাসার মহাসমুদ্ররের কিনারায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বিনম্র সুখী উচ্চারণ করে।

রুচিদি নয়। একান্তে সবসময় রুচি বলেই ডাকবে। এখন একবার ডাক প্লিজ। শুনতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।- চোখে চোখ রেখে চাতকীর মতো একটু ভালোবাসার প্রত্যাশী রুচিরা সৈকতের মনের আকাশে তাকিয়ে থাকে।

দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে সৈকত বলে আই লাভ ইউ রুচি, মাই ডারলিং  , মাই হার্ট!- বলেই সৈকত ফিক করে হেসে ওঠে। সাথে সাথে রুচিরাও হাসে।

ভোরের আজানের সুর ভেসে আসতেই সৈকতের *সম্বিৎ ফিরে আসে। দৃষ্টি যায় হাতের আঙুলে। সিগারেট নিভে গেছে। সিগারেটের অংশটুকু ছুঁড়ে বাইরে ফেলে দেয়। তারপর শ্রান্ত-ক্লান্ত শরীরটাকে বিছানায় এলিয়ে দেয়।

আর এদিকে রুচিরারও একই অবস্থা। সৈকতের কাছ থেকে এসেই বিছানায় গড়িয়ে পড়ে। সময় কেটে যায় একটা ঘোরের মধ্য দিয়ে। রুচিরা চোখ বন্ধ করে অনুভব করে সৈকতের  হাত ধরে বসে থাকার মুহূর্তটুকু। সুখের আবেশটুকু রুচিরাকে এখনও পুলকিত করছে। রুচিরার সারা অঙ্গে ভালোবাসার ঝড় বইছে অবিরাম।

সৈকতকে রুচিরা ভালোলাগার আঙিনায় বহুদিন থেকেই ঠাঁই দিয়ে রেখেছে। যে স্থানে অন্য কেউ ঠাঁই পায়নি। কিন্তু এই ভালোলাগা যে মুহূর্তের নিঃশ্বাসে ভালোবাসায় পরিণতি পাবে সেটি রুচিরার ধারণায় ছিল না। অথবা এমনটি ভাববার সাহস করে ওঠতে পারে নি কোন দিনই। আবার এমনও হতে পারে ভালোলাগাটুকু ভালোবাসায় অংকুরতি হতে সময় নিয়েছে নিয়তির ডালা থেকে।

এত সুখ রুচিরা মনের ভেতর গোপন করে রাখতে পারে নি। সেই তখন থেকেই খুশীর জোয়ারে দু’চোখ প্লাবিত হচ্ছে। বালিশ ভিজে চুপচুপে হয়ে গেছে। কোন রকম ভ্রুক্ষেপ নেই রুচিরার। রুচিরার মনের বাগানে এই  রোদ – এই বৃষ্টি। আজ অফিসে যায় নি র্পযন্ত।

পড়ন্ত বিকেলে এল পারমিতা। রুমে ঢুকে চুপচাপ চেয়ারে বসে আছে।  ভাবছে রুচিদির ঘুমের মধ্যে ডিস্টার্ব করবে না।

রুচিরা বালিশে মুখ গুজে শুয়ে আছে। আর ভাবছে সৈকতকে নিয়ে। কিছুক্ষন পর পারমিতা বুঝতে পারল রুচিরা সজাগ। পারমিতা গলা খাকাড়ি দিয়ে উপস্থিতি জানান দিল। রুচিরা চমকে ওঠে ফিরে তাকায়।

অবাক হয়ে তাকায় পারমিতা এবং বলে-  তোমার কী হয়েছে রুচিদি?

রুচিরা নিজেকে সামলে নিয়ে বলে না কিছু হয়নি। শরীরটা একটু ম্যাজম্যাজ করছে তাই শুয়ে আছি।

তা বুঝতে পারলাম। কিন্তু তোমার চোখ বলছে অন্য কথা।

রুচিরার হঠাৎ খেয়াল হয় কান্নার জলে ভেজা বালিশের কথা। বালিশটা উল্টে রাখে।

রুচিদি সত্যি করে বলো তো তোমার কী হয়েছে?

রুচিরা হালকাভাবে বলে কিছু হয়নি।কিছুই হয় নি লক্ষী বোনটি আমার।

পারমিতা বুঝতে পারে যে, রুচিরা কিছু একটা লুকাতে চাচ্ছে। পারমিতা কাছাকাছি হয়ে বলে  রুচিদি তুমি কাঁদতে কাঁদতে চোখ ফুলিয়েছ। তোমার এত কষ্ট অথচ আমাকে কিছুই বলতে চাচ্ছ না। তোমরা সবাই  আমাকে এত অবিশ্বাস কর কেন?- পারমিতার কণ্ঠটা কান্নায় ধরে আসে।

রুচিরা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। পারমিতার হাতে হাত রেখে বলে-  সত্যি বলেছি আমার খারাপ কিছুই হয়নি। আমি সুখে কাঁদছি।

পারমিতা তাকিয়ে থাকে কিছু একটা শোনার জন্য।

রুচিরা বলে মনে কিছু করো না পারমিতা। এই কথাটি আমি তোমাকে বলতে পারব না।

ঠিক আছে, তুমি সুখী হলে তাতেই আমার আনন্দ। আমি শুনতে চাই না। কিছুক্ষণ কী যেন ভাবল, তারপর আবার বলল চাকরিতে গেলে না।

ইচ্ছে হচ্ছিল না একদম। তারপর বল তোমার খবর কী?

তোমার কাছে একটা কাজে এসেছি রুচিদি। রুচিরা বেশ আগ্রহ নিয়ে তাকিয়ে থেকে বলে-  বলো।

তৃষ্ণার বাবার প্রমোশন হয়েছে।

রুচিরা বেশ খুশী হয়।

পারমিতা বলে সেই সাথে বদলি। সম্ভবত কিছুদিনের মধ্যেই চলে যেতে হবে।

রুচিরা কোন কথা বলে না। শুধু চেয়ে থাকে। পারমিতা বলে-  শুনেছি সৈকত এখন ক্লাস রীতিমত করে। অথচ আমি ওর নাগাল পাই না। ও আমাকে পুরোপুরি এড়িয়ে চলে। ওকে একটু দরকার ছিল এবং খুব শিগগির।

হলে গেলেই হয় তো পেতে পারো ।- রুচিরা স্বাভাবিক ভাবেই বলে।

পারমিতা জবাবে কোন কথা বলে না। রুচিরা বুঝতে পারে যে পারমিতা হলে যেতে চাচ্ছে না। একটু ভেবে রুচিরা বলে ঠিক আছে, তুমি আগামী কাল সকাল এগারটায় লাইব্রেরির সামনে থেকো।

পারমিতা খুশী হয়ে রুচিরাকে জড়িয়ে ধরে এবং বলে-  রুচিদি, তুমি আমার জন্য যা করলে তা কোনদিন ভুলতে পারব না। সৈকতকে তুমি নতুন জীবন দিলে। আমি কিছুটা হলেও সুখী হলাম। আর নয়ত সারাটা জীবন আমার মনের ভেতর দাগ পড়ে থাকত।

রুচিরা কথার মোড় ঘুরাবার প্রয়াসে বলে-  তৃষ্ণামণি কেমন আছে?

ভালো আছে। বাসায় আস না কেন? সময় করে একবার আস না রুচিদি। ক’দিন পরই-আবার ঢাকার বাইরে চলে যেতে হবে। তখন যে কতদিন পর দেখা হবে ভেবেই পাচ্ছি না।

রুচিরা বলে- চিন্তা করো না, সব সময় যোগাযোগ রাখব।

পারমিতা চলে যেতেই রুচিরা আবার বিছানায় গড়াগড়ি যায়। সুখের আচ্ছন্নতায় ডুবে ডুবেই সারাটি রাত কেটে যায়।

*

ঘুম থেকে উঠেই সৈকতকে নিয়ে ভাবে। গতকাল সুখের তোলপাড়ে আর লজ্জায় সৈকতকে কিছুই বলতে পারে নি। সৈকতকে দেখার জন্য মনটা ভীষণ রকম উতলা হয়ে আছে। রুচিরা আর দেরি করে নি। হালকা মেকাপ টেনেই বাইরে পা বাড়ায় রুচিরা। সৈকতের রুমের কাছে এসে রুচিরা ঘড়িতে চোখ রাখে। সাতটা বেজে পঁয়ত্রিশ। দরজার কাছে এসে খানিক দাড়ায়। তারপর করা নাড়ে। দরজা খুলে অনিক  সরে দাঁড়ায় এবং বলে আসুন রুচিদি ভেতরে আসুন।

শব্দহীন হাসি ছড়িয়ে  দিয়ে রুচিরা রুমের ভেতর ঢুকে। সৈকত উপুড় হয়ে শুয়ে আছে।  চেহারাটাও দেয়ালের দিকে। পুরোপুরি দেখা যাচ্ছেনা। হাত দুটো এমনভাবে গুটিয়ে রেখেছে যেন একটা অসুখী মানুষ। রুচিরার মনটা খারাপ হয়ে যায়। গতকাল কষ্ট করে হলেও কিছু কথা বলার দরকার ছিল। রুচিরা এবার  অনিকের  দিকে তাকায় । অনিক জুতা জোড়া পরছে। রুচিরা বলে কোথাও যাচ্ছ নাকি অনিক?

আটটায় ক্লাস আছে।- এই বলে অনিক জুতার ফিতা বেঁধে টেবিলের উপর থেকে বইপত্র হাতে নেয়। তারপর রুচিরাকে বলে রুচিদি আপনি বসুন, আমি ক্লাসে যাচ্ছি। সৈকত গতরাতে সম্ভবত বেশি রাতে ঘুমিয়েছে।

অনিক চলে যায়। রুচিরা সৈকতের কাছাকাছি চেয়ারটায় গিয়ে বসে। চুপচাপ চেয়ে থাকে সৈকতের দিকে। সোয়া আটটা নাগাদ সৈকত ঘুমন্ত অবস্থাতেই টেবিলের ওপর হাত বাড়ায়। কিছু একটা সম্ভবত খুঁজছে। রুচিরা দেখে হাতের কাছেই সিগারেটের প্যাকেট আর লাইটারটা পড়ে আছে। রুচিরা সৈকতের হাতের  নাগালে পোঁছে দেয়। সৈকত চিৎ হয়ে চোখ বন্ধ অবস্থাতেই সিগারেট ধরায়। এবার সৈকত ছাদের দিকে তাকায় । হাত একটা আড়াআড়ি করে কপালে ফেলে রাখে।

ভাবনার জালে আবদ্ধ হয়ে আপন মনে সিগারেট টানছে। অথচ স্বপ্নের রানী যে ওর পাশেই বসা সে কথা এখনও জানে না। রুচিরা পলকহীন দৃষ্টিতে সৈকতকে দেখছে। সিগারেট টানা বন্ধ করে সৈকত যেন কী ভাবছে। সিগারেটের ধোঁয়া কুগুলী পাকিয়ে ঊর্ধ্বমূখী হচ্ছে। সিগারেটে শেষ  টানটা বেশ লম্বা করেই দেয়। তারপর উঠে বসে। রুচিরার ওপর চোখ পড়তেই বিস্ময়াভূত হল সৈকত। পলকহীন দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। রুচিরা মিটমিট হাসছে। কী বলবে সৈকত ভেবে পাচ্ছে না। কারণ রুচিরা আসবে একথা সৈকত ভাবে নি। রুচিরা প্রথম কথা বলে এত গভীর হয়ে কী ভাবছিলে?

ভাবছিলাম, ভাবছিলাম অনেক কিছু।

যেমন?

আমার নিজের কথা, স্বপ্নের কথা আর রাজকন্যার কথা।

উত্তরে কোন কথা বলে না রুচিরা । শুধু মিটমিট হাসে।

বিছানা ছেড়ে সৈকত নেমে আসে। তারপর বলে রুচিদি তুমি একটু বস, আমি হাত-মুখটা ধুয়ে আসি।

রুচিরা মাথা নাড়ে।

তোয়ালে নিয়ে সৈকত বাইরে যায়। বারান্দার জানালা গলে সৈকত বাইরে তাকায়। একটা পিচ্চিকে ডেকে নাস্তা দিতে বলে।

রুচিরা চেয়ার ছেড়ে উঠে। বিছানার চাদরটা তুলে ভালো করে ঝেড়ে একেবারে টানটান করে বিছায়।

সৈকত রুমে ঢুকেই গোছানো বিছানায় পলকহীন তাকিয়ে থাকে। দৃষ্টি ফিরিয়ে রুচিরার দিকে তাকাতেই রুচিরা বলে একটু গোছালো থাকা ভালো। এই বলে রুচিরা সৈকতের হাতের তোয়ালেটায় তাকিয়ে থাকে।

সৈকত লজ্জিত হয়ে বলে আজই পরিস্কার করব।

রুচিরা হাসে। তারপর হঠাৎ করেই রুচিরা মন খারাপ করে বসে থাকে।

সৈকত অবাক হয়ে বলে কী ব্যাপার রুচিদি আকাশে হঠাৎ মেঘের ঘনঘটা কেন?

অভিমানী রুচিরা বলে গত রাতে এত দেরি করে ঘুমোতে গেলে কেন?

সৈকতের ইচ্ছে হচ্ছিল সত্যি কথাটা বলতে কিন্তু কী যেন ভাবল, এড়িয়ে গিয়ে বলল আর রাত করে ঘুমোব না।

রুচিরা অবিশ্বাসী চোখে তাকায়। তারপর সাহসে ভর করে চোখে চোখ রাখে।  এই দৃষ্টিতে রয়েছে ভীষণ রকম আস্কারা।

কানে হাত লাগিয়ে দুষ্টুমিভরা হাসি ছড়িয়ে সৈকত বলে এই যে রাণী এবার কানে ধরে বলছি, ভুল আর কখনও হবে না।

রুচিরা আশ্বস্ত হয়ে বলে- দেখা যাবে কতটুকু বাধ্য হয়ে চলেন।

দরজার কড়া নড়ে ওঠতেই সৈকত এগিয়ে যায়। পিচ্চি নাস্তা নিয়ে ঢুকে।

পিচ্চি নাস্তা রেখে চলে যেতেই সৈকত দরজার খিল এঁটে দেয়। তারপর কাছে এসে সৈকত বলে আচ্ছা রুচিদি একটা কথা বলব ? সত্যি জবাব দেবে কি?

জিজ্ঞেস করতে পারো। তবে সেন্ট পার্সেন্ট গ্যারান্টি দিতে পারব না।- দুষ্টুমি ভরা হাসি হেসে রুচিরা বলে।

চোখে চোখ রেখে সৈকত বলে-  আমি খালি পেটে সিগারেট টানলাম, কিছু বললে না যে?

তোমার দিনের প্রথম আমেজটায় বাঁধা দিতে ভালো লাগছিল না। ভাবলাম তোমার নিজস্ব ভুবনে অন্তত কিছুক্ষনের জন্য হলেও নিশ্চিন্তে বিচরণ কর।- এই বলে রুচিরা সৈকতের চোখে চোখ রেখে আবার বলে সিগারেটটাই ক্ষতিকর তার ওপর খালি পেটে। এযে বিষ পান । এভাবে আর টেনো না।

মহারানী যা বলবেন সবই মাথা পেতে নেব। টেবিলের ওপর একটা পেপার বিছিয়ে তাতে নাস্তাগুলো খুলে রাখে সৈকত। ডিম টোস্টের একটা টুকরো হাতে তুলে নিয়ে সৈকত রুচিরার দিকে বাড়ায়। রুচিরা লজ্জায় লাল হয়ে ওঠে। সৈকত মুচকি হাসে। রুচিরা মনে মনে ভাবে সৈকতের এগিয়ে দেয়া ভালোবাসাটুকু আমাকে গ্রহন করতেই হবে। হাতে হাত ধরে সৈকতের এগিয়ে দেয়া ডিম টোস্টে ভাগ বাসায় রুচিরা । তারপর রুচিরাও একটা টুকরো হাতে নিয়ে সৈকতকে খাইয়ে দেয়। সৈকত দুষ্টুমি করে রুচিরার হাতের আঙুলে হালকা কামড় বসায়।

উঃ! বলে রুচিরা সৈকতকে মিছিমিছি মারতে আসে। সৈকত হাসে। তারপর কতক্ষণ নীরবতা। নাস্তা শেষে কৌটা থেকে চা গ্লাসে ঢেলে রুচিতাকে এগিয়ে দেয়।

সিগারেটের প্যাকেটেটা হাতে নিয়ে সৈকত বলে-  এই যে, মাহারাণী এবার একটা সিগারেট খেতে পারি?

রুচির মাথা নেড়ে সম্মতি দেয়। তবে বলে- সিগারেটটা ধীরে ধীরে কমিয়ে ফেলতে হবে।

আজকের শুরু থেকে সৈকতের খুব ইচ্ছে হচ্ছিল গতকালের দুঃসহ মূহূর্তের কষ্টগুলোকে রুচিবার সামনে তুলে ধরার। কিন্তু তেমন সাহস পাচ্ছিল না এবং বলতে গিয়েও যেন আগ্রহবোধ হচ্ছিল না। এমন সুযোগটা পেয়েই সৈকত বলল সিগারেটটা আসলে এই ক’দিনেই কমিয়েই দিয়েছিলাম। কিন্তু গতকাল ভীষণ দুশ্চিন্তায় কেটেছে তো তাই।

রুচিরা উৎকণ্ঠচিত্তে জানতে চায়- কেনো, কি হয়েছিল তোমার?

‘না মানে গতকাল তোমার কথাগুলো বলার পর তুমি যেভাবে কাঁদলে ভাবলাম তোমাকে খুব বেশি কষ্ট দিয়ে ফেললাম। তারপর থেকে সত্যিই আমার খুব খারাপ সময় কেটেছে। তোমাকে আমি হারাতে চাই না রুচিদি। যে কোন সম্পর্কেই হোক তোমার সান্নিধ্য আমি সবসময় পেতে চাই। সৈকতের কণ্ঠেস্বরে বেশ আবেগ ছড়িয়ে পড়ে।

সৈকতের আবেগের মোহনায় আচ্ছন্ন হয়ে যায় রুচিরা। কোন রকমে নিজের  অস্তিত্বকে তুলে এনে বলে-  ওটা আমার সুখের কান্না ছিল, সৈকত। আমি তোমার মতো একজন বন্ধু চাই। যে সবসময় সবকিছুই বুঝতে চেষ্টা করে। ইউ আর মাই বেস্ট ফ্রেন্ড, সৈকত। গতকাল এতটুকু কথা বলতে পারছিলাম না যে, অন্তত বিদায় বাক্যটুকু বলি। সুখের বন্যায় আমি হাবুডুবু খাচ্ছিলাম সৈকত। আই লাভ ইউ। সৈকত, আই লাভ ইউ । আমাকে তুমি কখনও কষ্ট দিও না সৈকত। আই লাভ ইউ সৈকত।

কখন কে কাকে জড়িয়ে ধরেছে কেউ বলতে পারে না। রুচিরা খুশীতে আবার কেঁদে ফেলে। জড়িয়ে থেকে রুচিরা বলে তুমি আমাকে সব সময় ভালোবেসো।

হ্যাঁ রুচিদি, আমি  তোমাকে সারাজীবন ভালোবাসবো।

আর তোমার ভালোবাসাকে আমি বুকের গহীনে লুকিয়ে রাখব অনন্তকাল।- সুখের ভেলায় ভাসতে ভাসতে রুচিরার র্স্বগীয় উচ্চারণ।

আই লাভ ইউ, রুচিদি। আই লাভ ইউ।- আবেগে আপ্লুত হয়ে সৈকত ভালোবাসার মহাসমুদ্ররের কিনারায় দাঁড়িয়ে চিৎকার করে বিনম্র সুখী উচ্চারণ করে।

রুচিদি নয়। একান্তে সবসময় রুচি বলেই ডাকবে। এখন একবার ডাক প্লিজ। শুনতে খুব ইচ্ছে হচ্ছে।- চোখে চোখ রেখে চাতকীর মতো একটু ভালোবাসার প্রত্যাশী রুচিরা সৈকতের মনের আকাশে তাকিয়ে থাকে।

দৃষ্টিতে দৃষ্টি রেখে সৈকত বলে আই লাভ ইউ রুচি, মাই ডারলিং  , মাই হার্ট!- বলেই সৈকত ফিক করে হেসে ওঠে। সাথে সাথে রুচিরাও হাসে।

পারমিতা এসেছে পৌনে এগারোটায় লাইব্রেরি বারান্দায় চুপচাপ বসে আছে। মোটামুটি সাজগোজ করেই এসেছে। পারমিতার আশপাশে ভীষণ ব্যস্ততা।  অথচ ও নির্বিকার চিত্তে বসে আছে। ডুবে আছে নিজস্ব ভুবনে। ভাবছে রুচিরার কথা, সৈকতের কথা। ফেলে আসা স্মৃতিগুলো হাতড়ে বেড়াচ্ছে পারমিতা। সৈকতের সাথে প্রথম সাক্ষাতের মুহূর্তটা মনে হতেই বুকের ভেতরটায় যেন একটা ঝড় বয়ে গেল। এমনই নানান নস্টালজিয়ায় ডুবে আছে পারমিতা । রুচিরা ও সৈকত খুব কাছাকাছি হলে পারমিতা  দৃষ্টি খুলে তাকায়। সৈকত ও রুচিরাকে বেশ সুখী সুখী মনে হচ্ছে।

সৈকতকে বেশ স্মার্ট দেখাচ্ছে। চুলগুলোতে যত্নের হাত পড়েছে। সবকিছু মিলিয়ে সৈকতকে মনে হচ্ছে বেশ পরিচ্ছন্ন যুবক । সেই আগের সৈকত যেন। রুচিরাও মোটমুটি ম্যাচ করেই পোশাক পরেছে। এবং ঠোঁটে হালকা লিপস্টিক রং। কাছাকাছি হতেই পারমিতা খুশী হয়ে বলে  রুচিদি তোমাকে বেশ সুন্দর লাগছে। এভাবে একটু সেজেগুজে থাকতে পার না?

রুচিরা উত্তরে কোন কথা বলে না। শুধু হাসে। ওরা এসেই পারমিতার খুবই কাছাকাছি হয়ে বসে। সৈকত রুচিরার শরীরের সাথে ঘেঁষে বসে।

কেমন আছ সৈকত? পারমিতা জিজ্ঞেস করে।

খুব ভালো।– সৈকত না তাকিয়েই বলে। কথায় যেন ছড়িয়ে দিচ্ছে প্রতিশোধ নেয়ার মুর্হূত।

শুনে খুশী হলাম।- পারমিতা বেশ সুখী কন্ঠেই  মন-মাতানো আবহ ছড়িয়ে বলে।

সৈকত কোন উত্তর দেয় না। সৈকত বলে অন্য কথা তৃষ্ণা মনি কেমন আছে?

সৈকতের কথা শুনে পারমিতা খুব খুশী হয়ে বলে ভালো আছে। পরে তো আর একদিনও দেখতে গেলে না?

যাবো। অবশ্যই দেখতে যাবো। সৈকত ইচ্ছে করেই আজ বেশ স্বাভাবিক হয়ে কথাবার্তা বলছে। তারপর তোমার খবর কী বল?-  পারমিতাকে বলে সৈকত অন্যদিকে তাকায়।

এখন খুব ভালো আছি।- পারমিতা বেশ খুশী হয়ে বলে।

এখন মানে?- এই বলে সৈকত প্রশ্নবোধক দৃষ্টি নিয়ে পারমিতার দিকে তাকায়।

এই তোমরা আসার পর থেকেই।

আমরা আসার পর থেকেই, কারণ?

তোমাকে দেখে আগের সেই সৈকতকে আমি খুঁজে পাচ্ছি।- এই বলে পারমিতা রুচিরার দিকে তাকায় এবং বলে রুচিদি, রুচিদিই, রুচিদির কোন তুলনা হয় না।

রুচিরা হাসিমুখে অন্যদিকে তাকায় ।

সৈকত বলে দেখতে ঠিকই আগের মত লাগছে কিন্তু আমি আগের চেয়ে অনেক বদলে গিয়েছি। অবশ্য শুধু বাইরেই নয় ভেতরেও।

পারমিতা অবাক হয়। সৈকতের দিকে একপলক তাকায়। সৈকত দৃষ্টি সরিয়ে রাখে। পারমিতা ভাবে সৈকত কী বলতে চাচ্ছে। কিন্তু কিছুই বুঝে ওঠতে পারছে না। কারণ সৈকতকে কেমন যেন একটু অদ্ভুত ঠেকছে। এত স্বাভাবিক হয়ে সৈকত কথা বলছে অথচ মনে হচ্ছে কোথায় যেন ছন্দের একটু হেরফের হচ্ছে।

নীরবতা ভেঙে রুচিরা বলে পারমিতা তোমরা কবে নাগাদ যাচ্ছ।

সপ্তাহ খানেকের মধ্যেই।

এত তাড়াতাড়ি।

হ্যাঁ কোন উপায় নেই রুচিদি।

সৈকত তাকিয়ে থাকে। হঠাৎ এ ধরনের কথাবার্তায় কোন মানে বুঝে না সৈকত । তাই জিজ্ঞাসু দৃষ্টিতে রুচিরার দিকে তাকায়। রুচিরা বুঝতে পেরে বলে-  পারমিতার হাজব্যান্ডের প্রমোশন হয়েছে এবং সাথে ট্রান্সফার । ঢাকার বাইরে চলে যেতে হবে। সৈকত মনের অজান্তেই পারমিতার দিকে তাকায়। চোখে চোখ পড়তেই সৈকত দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।

পারমিতা কথা বলে-  সৈকত রুচিদিকে নিয়ে একদিন বাসায় আস না। আবার কবে দেখা হয়, না হয় তার কোন ঠিক নেই।

সৈকত নির্দিষ্ট করে কোন কিছু বলে না। শুধু বলে হ্যাঁ, ঠিক আছে একদিন যাব।

কবে যাবে বল।

সৈকত কোন কথা বলে না।

পারমিতা তাকিয়ে থাকে উত্তরের প্রত্যাশায়।

রুচিরা বলে তুমি চিন্তা করো না। আমি নিয়ে যাব।

পারমিতা খুশী হয়ে রুচিরাকে জড়িয়ে ধরে। এবং এবার দুঃখী গলায় বলে সৈকত যোগাযোগ রেখো। আর যদি পার মনের মতন একজনকে বেছে নিও।

কথাটা শুনেই রুচিরা লজ্জিত হয়ে দৃষ্টি ফেরায় অন্যদিকে।

সৈকত রুচিরার দিকে তাকিয়ে বলে-  অলরেডি একজনকে বেছে নিয়েছি।

পারমিতা অবাক হয়। বুকের ভেতরটা কেমন যেন করে ওঠে। একটা ঘোর তন্ময়তায় ডুবে যায় পারমিতা। পরক্ষণেই *সম্বিৎ ফিরে পায় এবং বলে-  ভালো, তাহলে তো ভালই হল। কিন্তু আর কোন কথা বলে না পারমিতা।

সৈকত আবারও বলে কিছু বললে না যে!

সৈকত আমি চাই তুমি সুখে থাকো। যদি কাউকে বেছে নিয়ে থাকো তাহলে আমি খুবই খুশী হবো।

সত্যি বলছো?- এই বলে সৈকত পারমিতার চোখে চোখ রাখে।

হ্যাঁ সৈকত। আমার যে কী ভালো লাগছে। তুমি খুব সুখী হবে। তোমার মত স্বপ্নপুরুষ কজনের ভাগ্যে জুটে বলো?

সৈকত চুপসে যায়। ভেবেছিল কিছু বলে পারমিতাকে কিছুটা হলেও শায়েস্তা করবে। মনের ভিতর-বাগান ভেঙে তছনছ করে দেবে কিন্তু পারমিতার ভালোবাসা মিশ্রিত কথাগুলো সৈকতকে আহত করে তোলে। চুপচাপ বসে থাকে সৈকত।

রুচিরাকে উদ্দেশ্য করে পারমিতা বলে-  রুচিদি আমি না থাকলেও তুমি ওকে দেখে শোনে রেখো।

রুচিরা নির্বাক । কিন্তু সৈকত ইচ্ছে করেই এ সুযোগটা নেয় এবং  বলে এই কথা তোমাকে আর বলে দিতে হবে না। নিজের জনকে প্রত্যেকেই আগলে রাখে।

পারমিতা বিষ্ময়ে অবাক । কী বলবে ভেবে পাচ্ছে না। ফ্যালফ্যাল চোখে রুচিরার দিকে তাকায় পারমিতা। রুচিরা লজ্জায় আরক্তিম অবগুণ্ঠিতা যেন। চোখ জোড়া মাটিতে লেপটে আছে। পারমিতা একবার  সৈকতের দিকে আরেকবার রুচিরার দিকে তাকায়। সৈকত মিটমিট হাসছে। পারমিতা রুচিরার একটা হাত কোলে টেনে নেয়। পারমিতা স্পষ্ট টের পাচ্ছে রুচিরার হাতটা অসম্ভব রকমের কাঁপছে। পারমিতা জানে যে সৈকত আর ওর নিজের হওয়ার নয়। এখন যে কারও হতে পারে সৈকত। কিন্তু তবুও পারমিতা কেন যেন এত সহজে ব্যাপারটা মেনে নিতে পারছে না। চুপচাপ সবাই। অনেকক্ষণ কেটে যায় নীরবতায়। পারমিতা স্বাভাবিক হওয়ার চেষ্টা করে। তারপর রুচিরার চিবুকে হাত রেখে বলে রুচিদি কী ব্যাপার ডুবে ডুবে জল খাচ্ছো?

রুচিরা আরও লজ্জিত হয়ে যায়। একপলক তাকিয়েই দৃষ্টি সরিয়ে নেয়।

রুচিদি লজ্জিত হওয়ার কিছুই নেই। খুব ভালো হয়েছে। সৈকতকে তুমি নিজের মতো করে পাবে।

না মানে ইয়ে।- রুচিরার মুখে কথা ফুটছিল না।

পারমিতা রুচিরার কথা কেড়ে নিয়ে বলে-  রুচিদি, সৈকত খুব ভালো ছেলে। ও আমার স্বপ্ন-পুরুষ ছিল, আছে এবং থাকবে। শুধু তুমি ওকে নিজের মত করে আগলে রেখো। তুমি সুখী থাকলেই আমি সুখে থাকবো।

পারমিতার কথাগুলো শোনার পর সৈকতের ইচ্ছে হচ্ছে পারমিতাকে জড়িয়ে ধরে হাজারটা চুমোয় ভরিয়ে দেয়। কিন্তু বলে-  পারমিতা তুমি কি সত্যিই খুশী হয়েছো?

হ্যাঁ  সৈকত। আমি খুব খুশি । তুমি রুচিদিকে কোনদিন কষ্ট দিও না।

রুচিরা পারমিতাকে জড়িয়ে ধরে আবেগাপ্লুত কণ্ঠে বলে- তোমাকে কোন কষ্ট দেইনি তো পারমিতা?

রুচিরাকে আদর করতে করতে পারমিতা বলে রুচিদি, তোমার এবং সৈকতের ভালোবাসাতেই আমি বেঁচে থাকবো।

———————সমাপ্ত———————

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
শোনো হে মুজাহিদ

শোনো হে মুজাহিদ

আশিক মাহমুদ রিয়াদ শোনো হে মুজাহিদ, এলো মাহে রমজান সব কিছু ত্যাগ করে ইসলামে দাও ধ্যান-জ্ঞান বছরঘুরে এলো মাহে রমজান পাপের বোঝা নাও কমিয়ে নাও ...
অণুগল্প- মায়া  । সাদিয়া আফরিন প্রমা 

অণুগল্প- মায়া  । সাদিয়া আফরিন প্রমা 

।সাদিয়া আফরিন প্রমা বিকেল গড়াতেই বাচ্চারা মহল্লার মাঠ সাদৃশ্য খোলা জায়গায় খেলায় মেতে উঠেছে। পাশ ঘেষেই দোতলা বিল্ডিংটির নীচতলার বারান্দার গ্রিলের ফাঁক দিয়ে দুটি উৎসুক ...
অন্য মানুষ 

অন্য মানুষ 

জোবায়ের রাজু  জ্যামে আটকা পড়ে রিকশায় বসে আছে শিশির আর নাবিলা। নাবিলা শিশিরের হাত শক্ত করে ধরে আছে। এ হাতকে এভাবে সারা জীবনের জন্য শক্ত ...
দুর্গাপূজা 2022- মা দুর্গার 10টি অস্ত্রের ইতিহাস ও তাৎপর্য

দুর্গাপূজা 2022- মা দুর্গার 10টি অস্ত্রের ইতিহাস ও তাৎপর্য

শিবাশিস মুখোপাধ্যায় দুর্গাপূজা দুর্গোৎসব বা শারদোৎসব নামেও পরিচিত। যদিও এটি একটি 10 দিনের উৎসব, তবে শেষ পাঁচটি দিনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। দেবী দুর্গা ...
টাইরেস ডেভান হ্যাসপিল

টাইরেস ডেভান হ্যাসপিল

জোবায়ের মিলন সূর্যের গর্ভেও জন্ম নিতে পারে অন্ধকার, নেয়/ হরিণীর পেটেও আসে শুয়োর ভ্রূণ/ শুয়োর জন্মায়/ ‘টাইরেস ডেভান হ্যাসপিল’ তেমন একটি দীর্ঘপ্রাণ/ বিকৃত কুকুরের বীর্জ, ...
ভালোবাসার দ্বিতীয় প্রহর [পর্ব-০৫]

ভালোবাসার দ্বিতীয় প্রহর [পর্ব-০৫]

পার্থ সারথি স্লিপটা পাঠিয়ে সৈকত ওয়েটিং রুমে বসে আছে। পাশে আরও কয়েকজন বসে আছেন। এক ভদ্রলোক বসে আছেন। আরেক ভদ্রলোক স্ত্রী এবং বাচ্চাসহ অপেক্ষায় আছেন। ...