শেষ যাত্রা

আবিদ হোসেন জয়

[১]

সি.এন.জি ড্রাইভার আব্বাস মিয়া পরপর দু’বার চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে হাত ঘড়ির দিকে তাকালেন। রাত সাড়ে এগারোটা বাজে। তিনি বড় রাস্তার ধারে একটি চায়ের দোকানে বসে আছেন। তার সি.এন.জিটি দোকানের পাশে পার্ক করে রাখা। চা খাওয়ার ফাকে ফাকে তিনি আশেপাশে কড়া নজর রাখছেন। ভাগ্যক্রমে আর একজন যাত্রী পেলে দিনের শেষ ট্রিপটি দিয়ে সোজা গ্যারেজে চলে যাবেন৷ মাঝে মাঝে রাত বেশি হলে তিনি গ্যারেজেই রাত কাটিয়ে দেন। আজ আব্বাস মিয়ার আয় রোজগার ভাল হয়নি। তিনি তাৎক্ষণিক একটি সিদ্ধান্ত নিয়ে নিলেন। শেষ একটি ট্রিপের জন্য তিনি প্রয়োজন হলে আরো আধ ঘন্টা অপেক্ষা করবেন৷ আজ আর তিনি বাড়ি যাবেন না। গ্যারেজেই রাত কাটিয়ে দিবেন। গ্যারেজের কেয়ার টেকার রহমত আলী ব্যক্তিগত কারণে ঢাকা গেছেন। আজ আর তার সাথে বিছানা ভাগাভাগি করে শুতে হবেনা। হাত পা ছড়িয়ে আরাম করে ঘুমানো যাবে। 

আব্বাস মিয়া উষ্ণতা হারানো শীতল চায়ে শেষবারের মত ঠোঁট ভিজালেন। বুক পকেটে গচ্ছিত পাঁচ টাকার নোটটি বাড়িয়ে দিলেন দোকানির দিকে। তারপর দোকানের কাঠের বেঞ্চি ছেড়ে অলস পায়ে হেটে এসে তার সি.এন.জির গায়ে হেলান দিয়ে দাড়ালেন। চারদিকটা বেশ অন্ধকার। যেখানে ফেলে আসা দোকানের ছাদে ঝুলন্ত বাতির অল্প আলো নিতান্তই তুচ্ছ। তবে বড় রাস্তায় বিকট শব্দ করে চলে যাওয়া যানবাহনের হেডলাইটের আলো, কিছুক্ষণের জন্য হলেও চারদিকটা আলোকিত করে দিয়ে যাচ্ছে। আব্বাস মিয়া সেই আলোতে একফাঁকে আবার হাত ঘড়িটা দেখে নিলেন। ঘড়িতে পনে বারোটা বাজে। তার মনে হচ্ছে আজ আর যাত্রী পাওয়া হবেনা। এখানে দাড়িয়ে থাকতেও তার আর ভাল লাগছেনা৷ চারপাশটা অন্ধকারের সাথে সাথে বেশ ঠান্ডাও। মাঘ মাস চলে গেছে অনেকদিন হয়৷ তবে মাঘের অবশিষ্ট শীতলতা প্রকৃতি এখনো আঁকড়ে ধরে আছে। আব্বাস মিয়া বাংলা মাসে আজ কত তারিখ তা মনে করবার চেষ্টা করলেন। কিন্তু কিছুতেই মনে পড়ল না। উল্টো তিনি খেয়াল করলেন ইংরেজি মাসে আজ কত তারিখ তাও তিনি মনে করতে পারছেন না। মুহূর্তেই তার চোখেমুখে বিরক্তির ছাপ চলে এলো। তিনি অপেক্ষার ইতি টেনে সি.এন.জির ড্রাইভিং সিটে উঠে বসলেন। প্যান্টের পকেট থেকে চাবি বের করতে করতে হতাশা মিশ্রিত দৃষ্টিতে শেষবারের মত চারপাশটা দেখে নিলেন। তার দু’পাশে লোহার দরজার ফাকতলে আর সামনের অসচ্ছ গ্লাসের ওপারে চোখে পড়ল শুধু রাতের আঁধারের গাঢ়ত্ব।

 

[২]

বাতাসের স্তর ছিন্ন করে একটি সি.এন.জি সামনের দিকে এগিয়ে যাচ্ছে। ড্রাইভিং সিটে বসে থাকা আব্বাস মিয়ার চোখ বন্ধ হয়ে আসছে ঘুমে৷ সে চোখ খুলে রাখার সর্বোচ্চ চেষ্টা করে যাচ্ছেন। তার মনে হচ্ছে আর এক কাপ চা বেশি খাওয়া দরকার ছিল। হঠাৎ হেডলাইটের আলোয় তিনি খেয়াল করলেন সামনে দু’জন মানুষ দাঁড়িয়ে আছেন। দূর থেকে চেহারা স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছেনা। তাদের মধ্যে থেকে একজন হাত তুলে সি.এন.জি থামানোর জন্য ইশারা করছেন। পরক্ষনেই আব্বাস মিয়ার চোখ জ্বলজ্বল করে উঠলো। তার বিক্ষিপ্ত মন যেন মুহূর্তেই দিশা ফিরে পেল। সময়ের সাথে সাথে সে সি.এন.জির গতি কমালেন। মন্থর গতিতে এসে দাড়ালেন মানুষ দুটির সামনে। হেডলাইটের আলোয়ে দেখলেন তাদের মধ্যে একজন পুরুষ আর একজন মহিলা৷ চেহারা দুটি এখন স্পষ্ট বোঝা যাচ্ছে। চেহারার মধ্যে এক অদ্ভুত মলিনতা। আর শরীর ভর্তি কিছুটা যান্ত্রিকতা প্রকাশ পাচ্ছে। পুরুষটির গায়ে কালো প্যান্ট আর সাদা শার্ট।  মহিলাটি শাড়ি পড়ে আছে। দেখতে রূপবতী। তবে চোখে মুখে সাজগোজের সল্পতা। পুরুষটি যন্ত্রের মত দু কদম এগিয়ে এসে সি.এন.জির দরজা ধরে দাড়ালেন৷ এক অদ্ভুত কণ্ঠে জিজ্ঞেস করলেন, “যাবেন?”। যেই কন্ঠে কোনো গাম্ভীর্যতা নেই। নেই ক্ষুদ্র পরিমাণ নম্রতা। বিকারহীন এক কন্ঠ। যা যে কারো মনযোগ ছিনিয়ে নিতে সক্ষম। কিন্তু আব্বাস মিয়া এত কিছু নজরে নিলেন না। তিনি তার জ্বলজ্বলে চোখ নিয়ে উচ্ছাস আড়াল করা কন্ঠে বললেন, ” যাব। কোথায় যাইবেন আপনারা?”।  লোকটি একটি কবরস্থানের নাম উল্লেখ করলেন। আব্বাস মিয়া কবরস্থানটি চিনেন। তবে সমস্যা হচ্ছে জায়গাটি তার গ্যারেজের রাস্তার বিপরীতে। তিনি হাত ঘড়ির দিকে তাকালেন। যাত্রী দু’জনকে তাদের গন্তব্যে পৌছে দিয়ে গ্যারেজে ফিরতে কতক্ষন সময় লাগবে তা অনুমান করে নিলেন। তারপর প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলতে খুলতে বললেন, “উঠেন। উইঠা বসেন”। যাত্রী দু’জন নিঃশব্দে উঠে বসলেন৷ আব্বাস মিয়া সি.এন.জির দরজাগুলো শক্ত করে লাগালেন। প্যাসেঞ্জার সিটের বাতি জ্বালালেন। তারপর ফের গাড়ি স্টার্ট করলেন। তার মনে হল তার ছোট্ট বাহনটির বিরক্তিকর শব্দ রাতের নিস্তব্ধতা ভেঙে ভেসে গেছে বহুদূর।

 

[৩]

যাত্রী সমেত সি.এন.জিটি কবরস্থানের প্রায় কাছাকাছি চলে এসেছে। আর মাত্র পাঁচ থেকে দশ মিনিটের রাস্তা বাকি। কিংবা তারও কম। হঠাৎ আব্বাস মিয়ার মনে পড়ল এই কবরস্থানের সামনে তিনি বেশ কিছুদিন আগে এসেছিলেন। তখন সেখানে কোনো লোকালয় চোখে পড়েনি। জায়গাটি ছিল একেবারেই জনমানবশূন্য নির্জন। এরকম নির্জন জায়গায় এত রাতে তার যাত্রীরা কেন যাচ্ছে তা বুঝে উঠতে পারছেন না। একবার মনে হল তারা হয়ত ভুল ঠিকানায় যাচ্ছেন। কিংবা এতদিনে হয়ত সেখানে কিছু বাড়িঘর গড়ে উঠেছে। আব্বাস মিয়া ঠিক করলেন সংশয় মুক্ত হবার জন্য তাদের সাথে কথা বলবেন। এই ভেবে তিনি ব্যাক লুকিং গ্ল্যাসের দিকে তাকালেন। সেখানে তাকাতেই ছোট্ট আয়নাটায় তার দৃষ্টি আটকে গেল। তিনি থমকে গেলেন। তার সম্মুখে সি.এন.জির গায়ে সংযুক্ত স্বচ্ছ লুকিং গ্লাস্টায় দেখলেন তার প্যাসেঞ্জার সিটে কেউ নেই।

 

[৪]

বিসমিল্লাহ গ্যারেজের কেয়ার টেকার রহমত আলীর আজ আর ঢাকা যাওয়া হয়নি। ঢাকার বাসে ওঠার আগ মুহূর্তে তার স্ত্রী সালমা খাতুনের ফোন পেলেন। সালমা খাতুনের গায়ে সকাল থেকে জ্বর৷ শরীরের তাপমাত্রা একশ ডিগ্রির গা ঘেঁষে ওঠানামা করছে। তিনি ছয় মাসের অন্তঃসত্ত্বা। বর্তমানে বাপের বাড়িতে আছেন। রহমত আলী স্ত্রীর অসুস্থতার সংবাদ পেয়ে তড়িঘড়ি করে শ্বশুর বাড়ি পৌছালেন। সেখানে পৌছে দেখলেন সালমা খাতুন দিব্যি এ ঘর থেকে ও ঘরে পায়চারি করছেন। তার চোখে মুখে অসুস্থতার কোনো আভাস নেই। উল্টো পান খেয়ে মুখ লাল করে রেখেছেন। এ দৃশ্য দেখে রহমত আলীর মাথায় রাগ চোটে বসলো। সে রাগ এখন অব্দি নামেনি। তিনি একটু আগে তার গ্যারেজে ফিরেছেন। গ্যারেজের কাঠের চৌকিটায় তিনি এখন আধশোয়া হয়ে বসে আছেন। তার হাতে সিগারেট। ঘন ঘন সিগারেটে লম্বা টান দিচ্ছেন। তিনি সিগারেট মুখে নিয়ে চৌকি ছেড়ে উঠে দাঁড়ালেন। তারপর বালিশের নিচ থেকে সস্তা চাবির রিং এর সাথে আটকানো একগুচ্ছ চাবি হাতে করে নিয়ে এসে দাঁড়ালেন গ্যারেজের দরজার সামনে। দরজায় তালা লাগাবার আগে মাথা সুদ্ধ ঘাড় ঘুড়িয়ে আশপাশটা দেখে নিলেন। তিনি খেয়াল করলেন আব্বাস মিয়া এখনো সি.এন.জি নিয়ে গ্যারেজে ফিরেনি। মুহূর্তেই রহমত আলীর রাগ দ্বিগুণ হয়ে গেল। রাগে গা শিরশির করছে। তিনি কম্পিত হাতে চাবিগুলো শার্টের আড়ালে কোমড়ে গুজলেন। মুখ থেকে সিগারেটে মাটিতে ফেলে দিয়ে পা পিষ্টে আগুন নিভালেন। তারপর তাকালেন হাত ঘড়ির দিকে। ঘড়িতে সময় রাত সাড়ে বারোটা। ঘন্টা আর মিনিটের কাটা একে অপরের বিপরীত দিকে আটকে আছে। 

[৫]

আব্বাস মিয়া ফের লুকিং গ্লাসটির দিকে তাকালেন। স্বচ্ছ সেই আয়নায় চোখে পড়ল মানবশূণ্য প্যাসেঞ্জার সিটের প্রতিচ্ছবি। এবার তিনি সরাসরি ঘাড় ঘুরিয়ে পিছনের দিকে তাকালেন। পিছনে তাকাতেই একটি বিস্ময়কর ঘটনা ঘটলো। তিনি দেখলেন যাত্রী দু’জন আগের মতই যে যার জায়গায় জড়সড় হয়ে বাসে আছে। প্যাসেঞ্জার সিটের বাতির আলোয় স্পষ্ট তাদের দেখা যাচ্ছে। অথচ লুকিং গ্লাসে তাদের কোনো প্রতিচ্ছবি নেই। আব্বাস মিয়া বুঝতে পারলেন তার সাথে অস্বাভাবিক কিছু ঘটছে। তিনি তাৎক্ষণিক তার সৃষ্টিকর্তার শরণাপন্ন হলেন। মস্তিষ্কের জ্ঞান ভান্ডারে সংরক্ষিত মুখস্থ দোয়াগুলো মনে করবার চেষ্টা করলেন।প্রায় সময় মানুষ বিপদে পড়লে দোয়া গুলিয়ে ফেলেন। কিন্তু আব্বাস মিয়ার সাথে এরকম কিছু হল না। তিনি নির্ভুলভাবে তার সৃষ্টিকর্তা আল্লাহ তা’য়ালার কাছে সাহায্য প্রার্থনা করে কিছুটা সাহস সঞ্চয় করলেন। তারপর পিছনের দিকে ঘাড় ঘুড়িয়ে জিজ্ঞেস করলেন,  “আপনারা কি সত্যিই কবরস্থানের দিকে যাবেন? ঐখানে তো কোনো ঘরবাড়ি নাই”।

প্যাসেঞ্জার সিটে বসে থাকা শার্ট প্যান্ট পরিধায়ী লোকটি আব্বাস মিয়াকে থামিয়ে দিয়ে বললেন, ” আপনি আমাদের কবরস্থানের সামনেই নামিয়ে দিন। আপনার আর কিছু জানতে হবে না।”

আব্বাস মিয়া আর কিছু জিজ্ঞেস করলেন না। সমগ্র মনযোগ আরোপ করলেন তার বাহনের গতিসীমার প্রতি। এক সময় তিনি কবরস্থানের সামনে এসে পৌছালেন। তার মনে হল সমগ্র অপেক্ষার অবসান ঘটেছে। তিনি যেন হাঁপ ছেড়ে বাঁচলেন৷ কিন্তু ঘটনার শেষ তখনও হয়নি। তিনি প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা খুলতে গিয়ে দেখলেন এবার তার ছোট্ট বাহনটিতে সত্যিই কেউ নেই। অথচ প্যাসেঞ্জার সিটের দরজা শক্ত করে লাগানো। তিনি তড়িঘড়ি করে সি.এন.জি থেকে নামলেন। চারপাশটা একবার দেখলেন তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে। চারদিক কালো আঁধারে আচ্ছন্ন। তিনি ছাড়া আর একটি মানুষও সেখানে নেই। যত দূর অব্দি চোখ যায় ততই যেন আঁধারের স্তরের ঘনত্ব বৃদ্ধি পেতে থাকে৷ তার ছোট্ট বাহনটির হেডলাইটের আলোয় শুধু চোখে পড়ে কবরস্থানের বৃহৎ দরজাটি। আব্বাস মিয়া ফের গাড়িতে উঠে বসলেন। দ্রুত ইঞ্জিন চালু করে গাড়ি ঘুরালেন। দূর থেকে একটি কুকুরের ডাক ভেসে এলো। বিষন্নতা মেশা এক স্বর। সেই স্বর এক সময় বিভাজিত হয়ে অসংখ্য স্বরে পরিণত হল। একটি থেকে দুটি, দুটি থেকে চারটি। এক সময় মনে হল একটি নয় বরং অসংখ্য কুকুর বিষন্ন এক সুরে একই সাথে ডেকে যাচ্ছে৷ আব্বাস মিয়া সি.এন.জির গতি বাড়ালেন। আইন ভাঙ্গা গতিতে ছুটলেন তার গ্যারেজের দিকে। কুকুরের ডাকগুলো এক সময় তীব্রতা হারিয়ে হাওয়ায় মিলিয়ে গেল। তিনি কিছুটা স্বস্তি পেলেন। তবে সেই স্বস্তির সময়টুকু বেশিক্ষণ স্থায়ী হল না। হঠাৎই কুকুরের ডাকগুলো তীব্রতা ফিরে পেল। বিরতিহীনভাবে আঘাত করতে শুরু করল আব্বাস মিয়ার অন্তঃকর্ণে। এই বিষন্নসুরের উৎস খুঁজতে সি.এন.জির দরজা দিয়ে বাইরে তাকাতেই তিনি আঁতকে উঠলেন। তার চিরচেনা গ্যারেজের রাস্তাটা যেন মুহূর্তেই বদলে গেছে। তিনি ফের পৌছে গেছেন কবরস্থানের ভয়ংকর সেই সরু রাস্তাটায়। সি.এন.জির হেডলাইটের আলোয় স্পষ্ট দেখা যাচ্ছে কবরস্থানের সেই বৃহৎ দরজাটি। 

 

[৬]

একই ঘটনার বেশ কয়েকবার পুণরাবৃত্তি ঘটল। কবরস্থানের সামনে থেকে গাড়ি ঘুরিয়ে গ্যারেজের দিকে কিছুদূর যেতেই আব্বাস মিয়া ফের নিজেকে কবরস্থানের সামনে আবিষ্কার করলেন। এক সময় তিনি এক অদ্ভুত বিষয় খেয়াল করলেন। যেখান থেকে তিনি সেই দু’জন যাত্রীকে উঠিয়ে ছিলেন সেই জায়গাটি অতিক্রম করতেই তিনি ফের কবরস্থানের সামনে উপস্থিত হচ্ছেন। তার ভয়ের অনুভূতির সীমা রইল না। বিড়বিড় করে দোয়া পড়তে লাগলেন। মস্তিষ্কের জ্ঞান ভান্ডারে সঞ্চিত সবকটি দোয়া খরচ করে এক সময় সত্যিই তিনি গ্যারেজে পৌছালেন। তখন কেয়ার টেকার রহমত আলী তালা চাবি হাতে অপেক্ষা করতে করতে ঘুমিয়ে পড়েছেন। আব্বাস মিয়া যতটুকু সম্ভব নিঃশব্দে গ্যারেজে প্রবেশ করলেন। কাঠের চৌকিতে শুয়ে থাকা রহমত আলীর পাশ থেকে তালা চাবি নিয়ে গ্যারেজের দরজা লাগালেন। তারপর রোগা রুক্ষ শরীরটা এলিয়ে দিলেন চৌকির অবশিষ্ট জায়গায়। 

 

সারারাত আব্বাস মিয়ার ঘুম হল না। এপাশ ওপাশ করেই রাতটা কাটালেন। তবে চোখ জোড়া বন্ধ হল ভোর রাতের দিকে এসে। গভীর এক ঘুমে তলিয়ে গেলেন তিনি। সেই ঘুম ভাঙ্গল সকাল আটটা নাগাদ। ঘুম ভাঙ্গতেই গ্যারেজের পাশ থেকে মানুষের চেচামেচির শব্দ ভেসে এলো। ট্যুথ পেস্ট মাখা ব্রাশ মুখে গুজে দিয়ে আব্বাস মিয়া চোখ কচলাতে কচলাতে বাইরে বের হয়ে এলেন। খানিকটা দূরে কিছু মানুষ একটি বাড়ির সামনে জটলা পাকিয়ে দাড়িয়ে আছে। তার কারণ বোঝা যাচ্ছেনা। হঠাৎ দেখা গেল রহমত আলী সেখান থেকেই বের হয়ে আসছে। তার চোখে মুখে চাপা উৎকন্ঠা। তার কাছ থেকে জানা গেল গতকাল রাত সাড়ে নয়টা নাগাদ একটি দূর্ঘটনা ঘটেছে। দূর্ঘটনায় দু’জন ব্যক্তি ঘটনাস্থলেই মারা যান। একটু আগে তাদের লাশ হাসপাতাল থেকে পাঠানো হয়েছে। সে লাশ দেখতেই মানুষের ভীড়। আরো জানা গেল একটুপর লাশ দুটিকে কবর স্থানে নিয়ে যাওয়া হবে। আব্বাস মিয়া দাঁত ব্রাশ করা বন্ধ করে ফ্যানা ভর্তি মুখে অস্পষ্ট স্বরে জিজ্ঞেস করলেন, ” কোন কবরস্থানে কবর দিব? আর কই এক্সিডেন্ট হইল?”

রহমত আলীর উত্তর শুনে আব্বাস মিয়ার ভুরু কুচকে গেল। গতকাল রাতে শেষ ট্রিপটি তিনি যে কবরস্থানে দিয়েছিলেন সেই কবরস্থানেই নাকি দাফন করা হবে। আরও অবাক করা বিষয় হচ্ছে যেখান থেকে তিনি ঐ যাত্রী দু’জনকে উঠিয়ে ছিলেন সেখানেই নাকি দূর্ঘটনাটি ঘটেছে। আব্বাস মিয়ার মনে হল বিস্মিত হবার মত ঘটনা আর একটু বোধ হয় বাকি আছে। কাল রাত থেকে ঘটে আসা অস্বাভাবিক ঘটনার পরিসমাপ্তি হওয়া উচিত। তাই তিনি কৌতুহল নিয়ে জটলা পাকিয়ে দাড়িয়ে থাকা মানুষগুলোর দিকে পা বাড়ালেন। মানুষের সেই ভীড়ে নিজের জায়গাটুকু করে নিয়ে ভীত চোখে উঁকি দিলেন মাটিতে পড়ে থাকা লাশ দুটির দিকে। তিনি স্পষ্ট দেখতে পেলেন, মাটিতে পড়ে থাকা লাশদুটি গতকালকের রহস্যময়ী সেই দুই যাত্রীর। 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *