এবার মরু: প্রথম পর্ব

গৌতম সরকার

তখন ওমিক্রনের ভয় জাঁকিয়ে বসেছে, ব্রিটেন-ইউরোপের বেড়া টপকিয়ে ভারতেও ঢুকে পড়েছে এই ভাইরাস, মানুষকে বাইরে বেরোতে হলেও প্রতি মুহূর্তে সন্ত্রস্ত থাকতে হচ্ছে, সেইরকম সময়ে এক দুপুরে একটা ফোন পেলাম। নম্বরটা পরিচিত, মানুষটাকেও হাড়ে হাড়ে চিনি; ফোনের ওপাশ থেকে মধুর ভাষণ ভেসে এল, “এই শোনোনা, আমার এক কলিগ বলছিল ওর একজন জানাশোনা আছে ট্রেনের টিকিট কেটে দেন। ও জিজ্ঞাসা করছে, তোমরা কোথায় যেতে চাও! নিউ জলপাইগুড়ি যাবারও টিকিট আছে, কি করবো!” আমি তো অবাক! আমার তো কোথাও যাওয়ার প্রোগ্রাম নেই, আমি সাধারণত যেখানে যাই তিন-চার মাস আগে থেকে সব ব্যবস্থাপনা শুরু করি। সত্যি কথা বলতে কি এই প্যান্ডেমিক পিরিয়ডে আমি নিজে কোনও প্ল্যান করিনি, যেটুকু হয়েছে আমার গিন্নির সাঁকো নাড়ানোয়। এবারেও তাই হল। তবে আমি নর্থ বেঙ্গলের ব্যাপারে রাজি হলাম না, কারণ ইতিমধ্যে খবর পেয়েছি লক্ষ লক্ষ লোক উত্তরবঙ্গ ঘুরতে যাচ্ছে, আর এখন গুগল আর ফেসবুকে বিভিন্ন ভ্রমণ গ্রূপের কল্যানে উত্তরবঙ্গের কোথাও আর কোনও কোনো ভার্জিন জায়গা নেই। যেখানে যাবেন সেখানেই হাজার হাজার মানুষের ভিড়। আমারও তখন পালে হাওয়া লেগে গেছে, তবে আমি ঠিক করলাম বেরোলে একটা ওয়ার্দি ট্যুর (worthy tour) করাই ভালো। তখন মনে এল রাজস্থানের কথা। বছর চারেক আগে রাজস্থানে আমরা মরুভূমির দিকটা বাদ দিয়ে বাকিটা করেছিলাম। এবার ঠিক করলাম মরুভূমির দিকটা করে ফেললে মোটামুটিভাবে রাজস্থান বেড়ানো সম্পূর্ণ করা যাবে। সেইমতো আগে ফোন লাগালাম কলকাতার রাজস্থান ট্যুরিজম অফিসে, ঘরের ব্যাপারে আশ্বাস পাওয়ার পর যাতায়াতের টিকিট এবং গাড়ির ব্যবস্থা করে বেরিয়ে পড়েছিলাম ২৩ ডিসেম্বর, ২০২১। তবে মরুভূমির সঙ্গে একরাতের জন্য জুড়ে নিয়েছিলাম রণথম্ভোর ন্যাশনাল ফরেস্ট, ব্যাঘ্র দর্শনের অন্যতম পীঠস্থান।

আমাদের এবারের কান্ডারি হলেন গুমান সিং। নিজের ইটিয়স গাড়ি নিজেই চালান। খুব বেশি আন্তরিক নন আবার নিজের দায়িত্ব সম্পর্কে উদাসীনও নন, মানে এককথায় প্রফেশনাল। আমার আবার একটু নন-প্রফেশনাল আন্তরিক ড্রাইভার বেশি পছন্দ, যিনি খুব সহজেই সামগ্রিক ট্যুরের একজন শরিক হয়ে উঠতে পারবেন। যাই হোক, সবসময় তো সব কিছু মনের মত হয়না। এবার বেড়ানোর কথায় আসি। গতকাল গুমানজির সাথে জয়পুর ছাড়লাম বিকেল সওয়া পাঁচটায়। জয়পুর থেকে সওয়াই মাধোপুর ১৯১ কিলোমিটার, আমাদের হোটেল বিনায়ক, আরটিডিসি, ওই সোয়াই মাধোপুরে।    মাঝে একটা ধাবায় চা-নাস্তার ব্রেক নিয়ে রাত পৌনে নটা নাগাদ হোটেলে ঢুকে চটপট ফ্রেস হয়ে সাড়ে নটার মধ্যে ডিনার সেরে সোজা বিছানায়। 

কথামতো সাফারির জন্য সাড়ে ছয়টার মধ্যে দুজনে তৈরি হয়ে বাইরে বেরিয়ে দেখি ‘তমসাঘন ভোর’, চোখের সামনে পরতে পরতে অন্ধকারের খোসা ছাড়িয়ে আলোর প্রকাশ দর্শন গোটা জীবনে কয়েকবার মাত্রই ঘটেছে। অন্ধকার যত কাটতে লাগল বিস্তৃত হোটেল চত্বর জুড়ে অজস্র পাখি আর ময়ূরের প্রভাতিক পদচারণ এক অনন্যসুন্দর অভিজ্ঞতা হয়ে রয়ে গেল। আমাদের সাফারির গাড়ি এল সাতটা নাগাদ।

স্বীকার করতেও দ্বিধা নেই আমাদের দুজনের কম্বিনেশন একটা ‘আনলাকি কম্বিনেশন’; আমরা যেদিন চেরাপুঞ্জি গিয়েছিলাম সেদিন সেখানে একফোঁটাও বৃষ্টি পাইনি, টাইগার হিলে গিয়ে একবারও সূর্যাস্ত দেখিনি, দার্জিলিং থেকে কাঞ্চনজঙ্ঘা বার-দশেক ট্রাই নিয়ে দু-একবার, ছয়বার সুন্দরবনে বাঘদর্শন একবার, তাই আমরা কোথাও গিয়ে কিছু আশা রাখিনা। বেড়ানোর স্রোতে বা নিয়মের নিগড়ে গা ভাসিয়ে যেখানে যাওয়ার যাই, কি পেলাম আর কি না পেলাম তার চুলচেরা বিচারে কক্ষনও যাইনা। কিন্তু এবারে কি হল, হায় ঈশ্বর!!! শত্রু-মিত্রের একসাথে চোখ কপালে তোলার মত পরিস্থিতি সৃষ্টি করে একই দিনে যাওয়া-আসার পথে দু-দুবার বাঘের দর্শন আমাদের কাছে রীতিমতো একটা ‘রেড লেটার্স ডে।’ সবচেয়ে বড় কথা সুন্দরবনের কল্যানে আমরা একটা কথা শুনেছি, সেটি হল ‘সাইটিং’, যার অর্থ হল বাঘের চকিত দেখা। মানে, বাঘ আচমকা রাস্তা পেরোলো, বা সুন্দরী-গরান-গেঁওয়া গাছের অরণ্যে নিজেকে ক্যামোফ্লেজ করে কয়েক সেকেন্ডের জন্যে দর্শন বা ক্যামেরা অন করে ছবি তোলার আগেই ভাগলবা। তবে যারা লাকি তারা নাকি দীর্ঘক্ষণ তাড়া করে বাঘের শিকার ধরার দৃশ্য চোখের সামনে দেখেছে। আমি আগেই বলেছি আমরা সেই পয়মন্তদের দলে পড়িনা। তবে আজকের ব্যাঘ্র দর্শন সাইটিং নয়, দু-দুবারেই ‘ইট ওয়াস আ শো,’ সে আপনারা বিশ্বাস করুন বা না করুন। কিন্তু সত্যি আজকের দিনটির শুরু যে বহোত বড়িয়া, সেটা স্বীকার করতেই হবে।

সাফারিতে বকবক খুশি হয়ে আজ ফিরে এলাম জয়পুর। রাজস্থানের রাস্তাকে বলা হয়, ‘স্টেট অব দ্য আর্ট’। যদিও টোল ট্যাক্স দিতে দিতে প্রাণ বেরিয়ে যাবে, তবে রাস্তার কন্ডিশন আপনার মন ভরিয়ে দেবে। গাড়ি সবসময় ৮০-১২০ কিলোমিটার বেগে চলছে। মাত্র আড়াই ঘন্টায় জয়পুর পৌঁছে পুরোনো স্মৃতির ধুলো ঝেড়ে বেশ কয়েকটা ঐতিহাসিক স্পট ঘুরে নিলাম- সিটি প্যালেস, যন্তরমন্তর, হাওয়া মহল, কণক গার্ডেন, আর শেষে জলমহল। কাল যাচ্ছি বিকানের, তখন অন্য গল্প, অন্য কোনোদিন৷

 আমার একটা ছেলেমানুষি আছে, সেটা হল পুরোনো স্মৃতিগুলিকে ছুঁয়ে ছুঁয়ে দেখা। যেখানেই দ্বিতীয়, তৃতীয় বা বহুবার বেড়াতে যাই, পুরোনো জায়গাগুলো আরেকবার না দেখলে বেড়ানোটা আমার কাছে কিরকম অসম্পূর্ন মনে হয়। তাই আজও ভোরবেলায় বেরিয়ে পড়লাম জয়পুরের আজমের গেট আর রেলওয়ে স্টেশন দেখতে। রাজস্থানের অবস্থান উত্তর পশ্চিমে হওয়ার কারণে সূর্য ওঠে অনেক দেরিতে। আমি বেরোলাম প্রায় সওয়া ছটা, তখন সূর্য তো ওঠেইনি, বরঞ্চ রাতের অন্ধকার চিরে হাইওয়ে দিয়ে হেডলাইটস জ্বালিয়ে দুরন্ত গতিতে গাড়ি চলাচল করছে। আমাদের হোটেল গাঙ্গুর একদম মেইন রাস্তার ওপর। হোটেল থেকে বেরিয়ে একটু এগিয়েই একটা চারমাথা, মনে পড়ছে বাঁদিকে গেলে রেলওয়ে স্টেশন আর ডানদিকে এগোলে আজমের গেট। ক্রসিং পেরিয়ে আজমের গেটের দিকে হাঁটা দিলাম। এই শীত রাত্রে প্রচুর মানুষ খোলা আকাশের নিচে কম্বল চাপা দিয়ে শুয়ে আছে, তবে চায়ের স্টলগুলো খুলে গেছে, দোকানের সামনে ধূমায়মান কাপ হাতে বিভিন্ন ধরণের মানুষ, তাদের মধ্যে বেশিরভাগ হল শ্রমিক শ্রেণী। সরকারি-বেসরকারি বাস পরিষেবা চালু হয়ে গেছে, অন্ধকার কিন্তু কাটেনি। হোটেল গাঙ্গুর থেকে আজমের গেট প্রায় চার কিলোমিটার রাস্তা, ইচ্ছে ওখানে পৌঁছে কয়েকটা ছবি তুলবো, কিন্তু হাঁটতে হাঁটতে মনে হচ্ছিল, যখন পৌঁছবো তখন ছবি তোলার মত যথেষ্ট আলো ফুটবে কিনা! অনেকটা সময় লাগলো পৌঁছতে আর ছবি তুলতেও সমস্যা হলোনা। ওখানে পৌঁছে ছবিটবি তুলে এককাপ ‘ফিকি চা’ খেয়ে ঘড়িতে দেখলাম, সাতটা তের। আজ আমরা নটা নাগাদ বিকানিরের উদ্দেশ্যে রওয়ানা হবো, বৈশালীকে বলে এসেছি আটটার মধ্যে ফিরবো। হিসেব করে দেখলাম এখান থেকে হেঁটে স্টেশন গিয়ে হোটেলে আটটার মধ্যে ফেরা সম্ভব নয়। তাই একটা অটো ভাড়া করে স্টেশনে এলাম। জয়পুর স্টেশনটির রাজকীয় স্থাপত্য দেখলে চোখ জুড়িয়ে যায়। গোলাপি শহরের ঐতিহ্য বজায় দেখে এই বিস্তৃত রেলওয়ে স্টেশন এই অপূর্ব গোলাপি রঙে নিজেকে রাঙিয়ে নিয়েছে। আজমের গেট আর রেলওয়ে স্টেশন রাজস্থানি রাজ ঐতিহ্যের যুগল প্রতীক, যুগ যুগ ধরে পরম্পরা মেনে এরকম বহু ঐতিহ্য এই রাজকীয় রাজ্যটিতে ছড়িয়ে ছিটিয়ে আছে, দুর্ভাগ্যবশত তার মধ্যে খুব অল্প কিছু সংরক্ষিত হচ্ছে, বেশিরভাগই কালের করাল গ্রাসে ধীরে ধীরে বিনষ্ট হচ্ছে। এব্যাপারে রাজ্য এবং কেন্দ্রীয় সরকারের আরও গঠনমূলক যোগদান খুবই জরুরি।

জয়পুর থেকে বিকানিরের দূরত্ব ৩৩৪ কিলোমিটার। সিকার, রতনগড়, ফতেপুর হয়ে পৌঁছতে মোটামুটি পাঁচ ঘণ্টা লাগবে। পথে সময় থাকলে ফতেপুর শহরে দেখে নেওয়া যায় ঢোলি সতী মন্দির, হাভেলি, আরও অনেক মন্দির আর নান্দিরে কালচারাল সেন্টার। মাঝে একটা টি ব্রেক আর লাঞ্চ ব্রেক নিয়ে তিনটে নাগাদ হোটেলে পৌঁছলাম। এখানকার রাজস্থান সরকারের হোটেলটির নাম ঢোলামারু, খুব প্রান্তিক হোটেল। রাজস্থান সরকারের যথেষ্ট রক্ষণাবেক্ষণের অভাবে বেশিরভাগ জায়গার হোটেলের অবস্থাই খুব সঙ্গীন। এখনও পর্যন্ত তিনটে হোটেলে টিভি থাকলেও কোনোটাই চালানো যায়নি, এসি চালানোর চেষ্টা করিনি কিন্তু আমি একশো দশ পার্সেন্ট নিশ্চিত সেগুলো ওয়ার্কিং কন্ডিশনে নেই। এই বেসিক ফেসিলিটিসগুলোর দিকে নজর না দিলে আগামী দিনে ট্যুরিস্ট কিন্তু সরকারি হোটেলকে সম্পূর্ণভাবে ‘টা টা গুডবাই’ করবে। 

হোটেলে ঢুকে আর বিশ্রাম নেওয়ার প্রশ্ন ছিলোনা। ইচ্ছে ছিল বিকেলে বেরিয়ে ‘ক্যামেল রিসার্চ সেন্টার’ দেখে ‘করণিমাতা মাতা মন্দির’টাও দেখে আসবো। কারণ কালকেও অনেক কিছু দেখা বাকি থেকে যাবে। তবে ক্যামেল রিসার্চ সেন্টার এত ভালো লেগে গেল এবং ক্যামেল রাইডে অনেকজনের পিছনে থাকায় ওখানেই দেড় ঘন্টা সময় লেগে গেল। গুমানজিও দেখলাম রাত্রি হয়ে যাওয়ার কারণে চাইছেন হোটেলে ফিরতে। আজ উনি অনেকটা গাড়ি চালিয়ে এসেছেন, ক্লান্তি আসা স্বাভাবিক তাই ফিরতি পথে আমরা মার্কেটে নেমে ওনাকে ছেড়ে দিলাম। বাজার মানে ছোট্ট একটা এস্টাব্লিশমেন্ট, একটু ঘোরাঘুরি আর এককাপ করে চা খেয়ে হোটেলে ফিরলাম।

                            

ছবি: লেখক

 

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন