নীল অধ্যায়

জোবায়ের রাজু

তিন ঘন্টার জার্নি শেষ করে খান সাহেব মধুপুর বস্তির পাশে এসে গাড়ি থামালেন। চারপাশটায় তাকিয়ে ধীরে ধীরে গাড়ি থেকে নামলেন। এটা যে এতই অজপাড়া গাঁও, তার ধারণা ছিল না। ধীর পায়ে খান সাহেব বস্তির দিকে এগিয়ে গেলেন। মানুষের জীবন এতই নিন্মস্তরের হতে পারে, এখানে না এলে বুঝতেন না। জীর্ণ পোশাক পরা কংকালসার দেহ নিয়ে বস্তির অসহায় মানুষগুলি ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে থাকে খান সাহেবের দিকে। এই বস্তিতে কেন এই লাট সাহেব, সবার চোখে মুখে এই প্রশ্ন ভাসছে। খান সাহেব তীক্ষè চোখে সব কিছু দেখছেন। ব্যাকুল চোখে খুঁজছেন দিনাকে। দিনা যে এখানে আছে, এটা তিনি গত সাত মাস ধরে জানেন।


ওই তো দিনাকে দেখা যাচ্ছে। পুষ্টিহীন শরীর নিয়ে একটি ভাঙাচুরা ঘরের দুয়ারে দাঁড়িয়ে। মেয়েটা তার এত নোংরা পরিবেশে থাকে, ভাবতেই বুকটা ভেঙে আসলো খান সাহেবের।
বাবাকে দেখতে পেয়ে দিনা চোখে মুখে রাজ্যের বিস্ময়তা নিয়ে হা করে তাকিয়ে থাকে। বাবা এখানে! খান সাহেব ইশারায় মেয়েকে ডাকতেই দিনা দৌড়ে এসে বাবাকে জড়িয়ে ধরে শিশুর মত কাঁদতে লাগল। চোখ ভিজে এল খান সাহেবেরও। কাঁপা গলায় বললেন,‘তুই এখানে থাকিস মা? আমি তোকে নিতে এসেছি।’ বাবার কথায় কান না দিয়ে দিনার অঘোর ধারার কান্নার গতি বাড়তে থাকল।
২.
গাড়িতে বাবার পাশে বসে আছে দিনা। খান সাহেব নিজেই ড্রাইভ করছেন। দিনা ছোট্ট করে বলল,‘নতুন এই গাড়িটা আবার কবে কিনেছো আব্বু?’ খান সাহেব নিচু গলায় বললেন,‘কিনিনি। কম্পানি গত মাসে গিফট করেছে।’ দিনা চুপচাপ বসে রইল। বাবাকে তার অনেকগুলি প্রশ্ন করতে ইচ্ছে করছে। মা, দাদুভাই, ইপ্তি আর ইভা দু বোন কেমন আছে? খাঁচার কাকাতুয়াটি আছে কিনা, তোতা পাখিটি কি এখনো কাউকে দেখলে ‘কে এসেছে কে এসেছে’ বলে কথা বলে? ইভার টবের গোলাপ গাছে ফুল এসেছে? তোমার কি এখনো শ্বাসকষ্ট হয়? ছোট মামা কি এখনো কানাডা থেকে সকাল সন্ধ্যা কল করে? নাহ, এসব প্রশ্ন বাবাকে করতে চেয়েও করতে পারছে না। দুই বছর আগের সেই অতীত যে তাকে আজ বোবা করে রেখেছে। ওই সোনার সংসার ফেলে যাদেরকে ছেড়ে সে এক কাপড়ে মিযানের কাছে চলে এসেছে, তাদের কথা কোন মুখে জিজ্ঞেস করবে বাবাকে! কিংবা বাবা কি এখনো তাকে ক্ষমা করেছে পুরোপুরি!


খান সাহেব চুপচাপ গাড়ি ড্রাইভ করে যাচ্ছেন। মেয়েকে বললেন,‘মিযানকে দেখলাম না যে?’ দিনা কোন কথা বলে না। খান সাহেব আবার বললেন,‘কোথায় মিযান?’ দিনা ¤øান গলায় বলল,‘বাজারে জুতা সেলাই করে। মুচি।’ চোখ বড় বড় করে খান সাহেব মেয়ের দিকে তাকিয়ে থাকেন। মনে মনে ভাবলেন জন্মের পর থেকে সোনার চামচ মুখে নেয়া তার মেয়েটা সব কিছু ছেড়ে সামান্য একটা মুচির কাছে এসেছে? হঠাৎ দিনা হাউমাউ করে কাঁদতে কাঁদতে বলল,‘ওই শূয়োরটা আমাকে সুখ দেখায়নি আব্বু। রোজ গায়ে হাত তোলে। অথচ ওর জন্যই আমি তোমাদেরকে ফেলে চলে এসেছি।’ কান্না বাড়তে লাগল দিনার। মেয়ের অবস্থা দেখে খান সাহেবও কাতর হয়ে গেলেন। তিন মেয়ের মধ্যে এই মেয়েকে বড় ভালোবাসতেন তিনি। জন্মের পর থেকে মেয়ের কোন আবদার অপূণ্য রাখেননি। নাচ গান শিখিয়েছেন। ভালো স্কুলে পড়িয়েছেন। ভরা আবেগের বয়সে এসে মেয়ে দিনা মিযান নামের একজনকে ভালোবেসে ঘর ছেড়েছে। আকস্মিক এই ঘটনায় খান বেশ আঘাত পেলেন। দিন দিন মেয়ের প্রতি তার রাগ বাড়তে থাকে।
কিন্তু গত ক’সপ্তাহ ধরে খান সাহেব বার বার মেয়ে দিনাকে স্বপ্নে দেখছেন। দিনা কোন এক নির্জন নদীর কূলে বসে গলা ফাটিয়ে কাঁদছে। কয়েক দফা এই স্বপ্ন দেখেন খান সাহেব। তার স্বপ্ন বেশীর ভাগ সত্যিই হয়। মন বলছে মেয়েটা ভালো নেই। সে কারণে মেয়ের উপর এতদিনের সমস্ত রাগ অভিমান ফিকে হতে থাকে।


গাড়ি থেকে নেমে দিনা বাবার সাথে ইসলাম মঞ্জিলের সামনে দাঁড়ালো। এটা দিনাদের বাড়ি। দু বছর পর আজ বাবার সাথে এই বাড়িতে এসে বুকটা হু হু করে উঠল দিনার। এই দু বছরে বাড়ির পরিবেশ খানিকটা বদলেছে। গেটের সামনে যে বাগান বিলাস গাছটা ছিল, সেটা আর নেই।
এতদিন পর বড় বোনকে দেখে ইপ্তি আর ইভার কোন ভাবান্তর হল না। দু বোনকে দেখে দিনা উচ্ছাস গলায় বলল,‘তোরা কেমন আছিসরে?’ ইপ্তি বোনের প্রশ্নকে পাত্তা না দিয়ে বলল,‘খারাপ লাগলেই বা তোর কি? কেন এসেছিস? এ বাড়ি থেকে তো একেবারেই চলে গেলি?’ ইপ্তির কথা শোনে ইভা ঠোঁট বাঁকিয়ে হাসলো কেবল। দু বোনের আচরণে ধাক্কার মত খেল দিনা। খান সাহেব সম্ভবত সেটা টের পেয়ে বললেন,‘তোকে প্রথমে কেউ স্বাভাবিকভাবে গ্রহন করবে না। কারো কথায় কিচ্ছু মনে করবি না।’ বাবার কথা শুনে বড় আনন্দে কান্না আসছে দিনার।



মিসেস রেবেকা সিঁড়ি বেয়ে নিচে নামলেন। আচমকা মেয়েকে দেখে তিনি হাইপাওয়ারের চশমার ভেতর থেকে হা করে তাকিয়ে রইলেন। দিনা মাকে দেখে ব্যাকুল হয়ে দৌড়ে গিয়ে জড়িয়ে ধরল। মা মেয়ের ঘর কাঁপানো কান্না দেখে খাঁচার তোতা পাখিটি বিকট গলায় বলল,‘কে এসেছে! কে এসেছে!’

.

.

.

.

আমিশাপাড়া, রাজু ফার্মেসী, নোয়াখালী।

এই লেখাটি শেয়ার করুন