অচিনপুরের দেশে : পঞ্চম পর্ব

পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায় এবং গৌতম সরকার

 

(পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায়)

কল্লোলিনী তিলোত্তমার মাথার ওপরেওতো এমনই গাঢ় নীল শামিয়ানা আছে; বর্ষার শেষে আর ভরা বসন্তে সেই নীলিমা মায়া ছড়ায় মনে কিন্তু নজর কাড়তে পারেনা৷ সময় কোথায়? ব্যস্ত মহানাগরিকরা নিজেদের বৃত্তে মশগুল। মাঝে মাঝে এই গণ্ডী পেরিয়ে যাওয়া দরকার নাহলে বিন্দুতে সিন্ধুদর্শন হবে কি করে? এক মহাবৃত্তের আবর্তে ঘুরছি কিন্তু টেরটি পচ্ছিনা। যখন মহাবৃত্তের অন্যত্র ঢেউ ওঠে তখন সেই দোলায় আমাদের নিজস্ব বৃত্ত কেঁপে ওঠে। আমরা তখন ঐ যে ছবিতে দেখা শহুরে বাবুদের লাইনে দাঁড়িয়ে জিনিস সংগ্রহের তাগিদ, সেইসঙ্গে সরকারের দেগে দেওয়া বৃত্তে অপেক্ষমান নাগরিক শৃঙ্খলাবোধ। মারণ রোগের ত্রাসে নিজস্ব লক্ষ্মণরেখায় আবদ্ধ হই। পালাই পালাই রব ওঠে। কিন্তু পালাবার পথ রুদ্ধ। আমরা শহুরে আত্মকেন্দ্রিক মানুষেরা নিজস্ব আবর্ত তৈরী করে নিই তখন। এই অনিশ্চিতপুরে নিশ্চয়তার খোঁজ, এ বোধ হয় বিলাসিতার নামান্তর। যাক যতক্ষণ না এখানেও ওই ত্রাসের আঁচ এসে পৌঁছচ্ছে ততক্ষণ হোক না নতুন কিছু সে চাষ বা রান্না যা হোক কিছু। আসলে অনিশ্চিতপুর নামটাই কেমন যেন কুহেলিকাময়। অনিশ্চিতপুরের আবহের সংক্রমণ এখন সর্বত্র। মানে কুহেলিকার ছায়া ছায়া অস্পষ্ট অনিশ্চয়তা। এরমধ্যেই খুঁটে খুঁটে সুখ খুঁজতে আসা।

আমার সহযাত্রী ভদ্রমহিলা চিরকাল পড়িয়ে অভ্যাস তাই তিনি পড়ুয়া খুঁজে নিয়েছেন, সেই যে সেই শকুন্তলা আর তার ক্ষুদেটিকে। তাদের নিয়েই তার ব্যস্ততা। নিজের পছন্দের কাজটি পেয়ে মহাখুশী তিনি। কৃষিবিদ্যা এখন এখানে হয়ে পরেছে ‘এগ্রিয়েবল কালচার’, প্রীতিপ্রদ সমঝোতার বিজ্ঞান। প্রকৃতিকে অনুভব করতে হলে তার মুখোমুখি হতে হয় কারণ তার ওই উপাদানগুলো মাটি, জল, তেজ, বায়ু , শূন্যতা সবকিছুইতো আমাদের অন্তরাত্মায় মিশে আছে, সেই আমি যেমন আত্মবীক্ষণে নিজের মুখোমুখি হই সেইরকমই মনে হয়। সূর্যোদয় তার এতো বহুমাত্রিক সৌন্দর্যে কি কখনো ধূসর প্রেক্ষিতে প্রকট হয়? না মানুষের সেটা অনুভব করবার চোখ বা মন আছে? ধূসর ক্যানভাসে রঙ ফোটাতে পারে শুধু নিপুণ শিল্পী আমাদের মতো পোড় খাওয়া পাণ্ডুর মনে কি ভালবাসার রঙ ফোটে যদি না থাকে আত্মিক সম্বন্ধ। সেই যে ছোটবেলার দেখা চাটুকাকু যিনি অসীম মমতায় আগলে রাখতেন আমাদের পৈতৃক জমি, মালিক হয়েও কি সেই মমত্ববোধ আমাদের পরিবারের কারো ছিল? তাই মাটির কাছাকাছি নেমে কাছ থেকে তার সন্তান ফসলের বড় হয়ে ওঠা দেখবার আনন্দই আলাদা। ফসলক্ষেতের এই আগাছা নিড়ানোর কাজটি কিন্তু বেশ। একেকটি আগাছা যেমন গ্রাস করে জীবনের রঙ, রূপ, পুষ্টি কিন্ত ইচ্ছে থাকলেও তাদের উপরে ফেলা যায়না যে, পরিবেশ পরিস্থিতি বাধা দেয়। ভাগ্যিস চাষের ক্ষেত্রে এই নিড়ানোয় কোন বাধা নেই। সজল জমি চাষের অনুকূল। জল ছলছল মনে চারাগাছ ফনফনিয়ে বেড়ে ওঠে। আজকাল সজল মনের বড়ই অভাব। আগাছার আধিক্যে সতেজ লাবণ্যময় সুঠাম শালপ্রাংশু হৃদয় খুঁজে পাওয়া ভার। তাই জল ঢালো যত পারো মানবজমি স্নেহসজল না হলে ভাল ফসল হবে কি করে?

এক জমির জল অন্য জমিতে যাক না ক্ষতি কি? আদান-প্রদানেইতো উন্নত, সংস্কৃত হয়ে ওঠা যায়। একের উর্বরতা অন্যকে সমৃদ্ধ করে, জারিত করে “দিবে আর মেলাবে মিলিবে যাবে না ফিরে”-র মতো। মঈদুলের জ্ঞান আমাকে মুগ্ধ করে। বিজ্ঞানের তাত্ত্বিক দিক আর ভূমিপুত্রদের আবহমানকালের পুরুষানুক্রমে পরম্পরাগত জ্ঞানের মেলবন্ধনে আরো কত সবুজ বিপ্লব হতে পারতো আমাদের দেশে ভাবলে গায়ে কাঁটা দেয়।

মইদুলকে দেখতে গেলাম ওর বাড়িতে। এই স্বশিক্ষিত মানুষের কাছে আমার পুঁথিগত জ্ঞান তুচ্ছ। একবার শহুরে বিপন্নতাবোধ আর স্বার্থপর নিরাপত্তাচিন্তা আমাকে বাধা দিল। ঐ জ্বর মাথাব্যথা ছোঁয়াচে নয়তো? পরক্ষণেই কেজো বিশ্লেষণী শক্তি ফিসফিসিয়ে বললো, ধুর বোকা এখানে ঐ মারণব্যাধির সংক্রমণ হবে কোথা থেকে? কারুরই তো সাম্প্রতিককালে বিদেশভ্রমণের ইতিহাস নেই। আর ঐ রোগটা নাকি এসেছে বিদেশ থেকেই।

বেচারা মইদুল ছেঁড়া কাঁথা চাপা দিয়ে শুয়ে। কাছেই খেলা করছে ওর দুটো ছেলে মেয়ে। এরাও হয়তো কোনদিন আমার পরবর্তী প্রজন্মকে তাদের অমূল্য কৃষিজ জ্ঞান উপহার দেবে অনায়াসে আর নিজেরা থাকবে অনাদরে অবহেলার অন্ধকারে। মনটা বিষণ্ণ হয়ে উঠলো আবার।

আজ কেন যে লালন ফকিরের গানটা গুনগুনিয়ে উঠছে জানিনা। “এমন মানব জনম আর কি হবে। মন যা কর, ত্বরায় কর এই ভবে।” উদাস বিবাগী মনকে লাগাম দিতে পারছেনা মইদুলের এই সুখী ঘর গেরস্থালীর নিশ্চিন্ত যাপনচিত্র। ঘাড়ের কাছে থাবা বাড়িয়ে আছে মারণরোগ। কি নিশ্চিন্ত এই উদ্বেগহীন যাপন। সুখের খুদটুকু পরম যত্নে রান্না হচ্ছে ঘরোয়া মালসায়, চারিদিকে ছড়িয়ে পরছে অপার্থিব নির্যাস। ভীষণ হিংসে হল মইদুলকে। আমরা কেন সরল হতে পারিনা ওদের মতো? নিজের আত্যন্তিক বিশ্বাসের ওপর সমর্পণের মন্ত্র কেন এই জীবনে অধরা থেকে গেল এখনো? নিজের বিশ্বাসকে নির্ভরতায় কেন আঁকড়িয়ে ধরতে পারিনা? প্রচ্ছন্ন বিষাদ বয়ে বেড়াই নিজের অগোচরে

 

 (গৌতম সরকার)

মঈদুলের বাড়িতে যখন বসে ছিলাম তখন থেকেই আকাশ ডাকছিল। বিকেল থেকেই সারা আকাশ জুড়ে মেঘ। এখন ফেরার সময় সেই মেঘের সাথে আরোও কিছু কালো মেঘের দল মিলেমিশে সন্ধ্যে নামার বহু আগেই চারপাশ কালো চাদরে ঢেকে দিয়েছে। মঈদুলের বারণ উপেক্ষা করে বেরিয়ে পড়েছিলাম, এখন মাঝ রাস্তায় বজ্র-বিদ্যুৎসহ বৃষ্টি শুরু হলো। দৌড়ে গিয়ে একটা চালার নীচে আশ্রয় নিলাম। ঢুকেই বুঝলাম এটা একটা অস্থায়ী গোয়ালঘর, চারদিকে কোনো দেওয়াল নেই, মাথাটা খড়ে ছাওয়া। বুঝলাম এটা গরুদের দিনেরবেলা বিশ্রামের জায়গা। সারা জায়গা জুড়ে উগ্র গোবরের গন্ধ, অন্ধকারে আমারও হয়তো পায়ে লেগেছে। প্রথম প্রথম এসবে খুব অসুবিধা হতো, আস্তে আস্তে নিজেকে সইয়ে নিয়েছি। গোময়-গোমূত্রের গন্ধে প্রাথমিকভাবে গাটা গুলিয়ে উঠলেও, ধীরে ধীরে সয়ে গেল। এই গ্রামে থাকবো, গায়ে কাদামাটি, গোবরগন্ধ লেগে থাকবেনা, তা কি হতে পারে ! আমার এখন ভূমিপুত্র হয়ে ওঠার প্রাথমিক পাঠ চলছে। বৃষ্টির বেগ ধীরে ধীরে বাড়ছে। মনে মনে খুশি হলাম। কালই দীঘির পাড় আর সুলতানপুরের দিকের জমিগুলোতে জল দেবার কথা ছিল, আজ প্রকৃতি সেই কাজ নিজেই করে দিলো। মানুষগুলোর একদিনের পরিশ্রম বাঁচলো। আপনাআপনিই ডান হাতটা কপালে উঠে এলো। এই অভ্যাসটা আগে ছিলোনা, এখানে আসার পর হয়েছে….এটাও অনিশ্চিতপুরের শিক্ষা। যত দিন যাচ্ছে আমি ধীরে ধীরে এই জায়গা, এখানকার মানুষদের কাছে কৃতজ্ঞতার বাঁধনে বাঁধা পড়ে যাচ্ছি। হাসি মুখে মানুষগুলো আমার সমস্ত ভুল ত্রুটি শুধরে দিয়ে আমাকে নিজেদের লোক হিসেবে গড়ে তুলছে। এই যে মঈদুল –ও স্বপ্নেও ভাবেনি আমি ওর শরীর খারাপের কথা শুনে আজই ওকে দেখতে চলে আসবো। আমাকে দেখে প্রায় চমকেই উঠেছে। বারবার বারণ করা সত্বেও অসুস্থ শরীরে উঠে বসে বাড়ির লোকজনকে তটস্থ করে তুলেছিলো। আমার তো লজ্জাই লাগছিলো। বাইরের বারান্দায় একটা চৌকিতে ছেঁড়া কাঁথা চাপা দিয়ে শুয়েছিল; আমাকে দেখে কাঁথা-টাথা ফেলে উঠে দাঁড়ালো। তখনও ও বিশ্বাস করতে পারেনি, আমি ওর বাড়িতে এসে উপস্থিত হয়েছি। আমি যখন ওর শরীরের কথা জিজ্ঞাসা করলাম তখন ওর ঘোর কাটলো। আমার কথার জবাব না দিয়েই চিৎকার-চেঁচামেচি করে আমার জন্যে একটা চেয়ারের ব্যবস্থা করলো। আমি যখন একটু রাগ করেই মৃদু ধমক দিলাম তখন লজ্জা লজ্জা মুখে চৌকির এক কোনে বসলো। আমার দিকে তাকিয়ে বললো,  দাদা আমি বিশ্বাস করতে পারছিনা, আপনার পায়ের ধুলো আমার গরীবখানায় পড়েছে। কথাটায় আমি খুশি হব না রাগ করবো বুঝে উঠতেই সময় চলে গেল। আমি বললাম, মঈদুল ভাই, যতই তুমি আমাকে দাদা বলে ডাকো এখনও আমাকে নিজের লোক বলে ভাবতে পারোনি ! মঈদুল অবাক চোখে বললো, কেন দাদা?

আমি বললাম- আমাকে দাদার মতন ভাবলে তুমি আমাকে দেখে এত অবাকও হতেনা আর বাড়ির লোকজনকে ব্যতিব্যস্ত করে তুলতে না৷ 

মঈদুল কোনো উত্তর না দিয়ে আমার মুখের দিকে তাকিয়ে রইল।

আমি বললাম- আসলে মঈদুল, তুমি এখনও আমার অতীত পরিচয় ভুলতে পারছোনা, আমি কোনকালে কি লেখাপড়া শিখেছি, কি চাকরি করেছি—সেসব এখন অতীত। তুমি যদি সেসব ভুলে আমাকে নিজের দাদার মতো, বন্ধুর মতো গ্রহণ না করো তাহলে আমি কিভাবে পায়ের নিচে মাটি পাবো মঈদুল? আমি তো প্রতিটা মুহূর্তে নিজের সাথে যুদ্ধ করে অতীত ভুলে তোমাদের সাথে তোমাদের হয়ে বাঁচতে চাইছি। তুমিই এই গ্রামে আমার প্রথম বন্ধু, তুমি নিজের হাতে আমাকে গাছ চিনিয়েছো, মাটি চিনিয়েছো, ফসলের বিবর্তনের ইতিহাস শুনিয়েছ, আমি তো তোমার কাছে মায়ের পেটের ভাইয়ের মতোই ব্যবহার প্রত্যাশা করি মঈদুল ! আবেগের কারণে শেষের দিকে গলাটা ধরে এল। মঈদুল সঙ্গে সঙ্গে উঠে আমার হাতটা জড়িয়ে ধরে ব্যথিত কণ্ঠে বলল, দাদা, মনে কিছু কইরেন না, আমারে ক্ষমা কইরা দ্যান। আমার কুনো কসুর নাই। পরে মঈদুলের কথা মন দিয়ে শুনলাম। মঈদুলের বক্তব্যকে সহজ ভাষায় ব্যক্ত করলে দাঁড়ায়–ভদ্রলোক আর ছোটলোকের সংজ্ঞা এই সমাজ ছোটবেলা থেকেই তাদের গিলিয়ে দিয়েছে। তাদের মতো ছোটলোকদের কি করা উচিত-অনুচিত তা যেন শিশুপাঠ্যের নীতিজ্ঞানের মতো তাদের রক্ত-অস্থি-মজ্জায় মিশে গেছে। তাদের ছায়া মাড়ালে অশুচি দোষ কাটাতে ভদ্রলোকদের স্নান করতে হয়, এটা তারা ছোটবেলা থেকেই শিখে এসেছে, তাই ভদ্রলোকদের এড়িয়ে চলার অভ্যাসটা কখন যেন আপনাআপনি তৈরি হয়ে গেছে। কয়েকদিন আগে যখন ট্রেন বোঝাই করে ঝাঁকে ঝাঁকে ভদ্রলোক এই গ্রামে এলো তখন তারা রীতিমতো ভয় পেয়ে গিয়েছিল। প্রথমদিন আমার সাথে পরিচয়ের সময়ও ও যথেষ্ট সন্ত্রস্ত ছিল। চাষবাষ- গাছপালা নিয়ে আমার আগ্রহকে শিশুর সাময়িক কৌতূহল বলেই ভেবে নিয়েছিলো। কিন্তু তারপর আমার পরিশ্রম, জানার আগ্রহ, কাজের নিষ্ঠা, সর্বোপরি তাদের সাথে বন্ধুত্বপূর্ণ ব্যবহারে আমার সম্বন্ধে তাদের সাবেক ধারণা বদলাতে শুরু করেছিলো। কিন্তু সামান্য জ্বরে একদিন মাঠে না যাওয়ার খবর পেয়ে একেবারে সশরীরে বাড়িতে দেখতে আসার ব্যাপারটা আমার সম্বন্ধে ধারণা একদম বদলে দিয়েছে। সে এত অবাক এবং একইসাথে খুশি হয়েছে যে নিজের উচ্ছাস চেপে রাখতে পারেনি। বারবার বলতে লাগলো, তার ব্যবহারে আমি কিছু মনে করলে সে যারপরনাই অনুতপ্ত। আমি ওর কাঁধে হাত রেখে বললাম, বন্ধু একটা অনেক বড় সম্পর্কের নাম। বন্ধুত্ব অনেকগুলো ভালো গুনের সমষ্টি–ভালোবাসা, বিশ্বাস, নির্ভরতা, কষ্ট, ক্রোধ, অভিমান, সবশেষে সবভুলে পরস্পরকে ক্ষমা করে বুকে টেনে নেওয়া। আমি তার শরীর খারাপের কথা শুনে উদ্বিগ্ন হয়েছি, তার খবর নিতে ছুটে এসেছি, আমার আসায় সে আনন্দ পেয়েছে, তাই আমরা পরস্পরের বন্ধু। এরপর উঠে দাঁড়িয়ে সোশ্যাল ডিস্ট্যান্সিইং ভুলে দুহাত বাড়িয়ে দিলাম। মঈদুল সঙ্গে সঙ্গে উঠে দাঁড়ালো। কিন্তু সংকোচে কাছে আসতে লজ্জা পেতে লাগলো। আমি একটু এগিয়ে গিয়ে গভীর আবেশে দুহাতের আলিঙ্গনে ওকে জড়িয়ে ধরলাম।

 

 (চলবে…)

 

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *