অচিনপুরের দেশে: সপ্তম পর্ব

গৌতম সরকার

হেলথ সেন্টারটা গ্রামের উত্তর দিকে। এই গ্রামে সপ্তাহান্তিক যে হাট বসে, সেই হাটতলা পেরিয়ে যেতে হয়। মাঠ থেকে ফিরে খাওয়া-দাওয়া সেরে বেরোতে চাইছিলাম, কিন্তু ঘরণীর আপত্তিতে একটু বিশ্রাম নিয়ে বেরোতে বেরোতে বেলা প্রায় গড়িয়ে গেল। এদিকের রাস্তাতে মোরাম পড়েছে, তাই বৃষ্টি-বাদলায় কাদা হওয়ার সম্ভাবনা কম। আমাদের কটেজ থেকে মিনিট পাঁচেকের রাস্তা। সেন্টারে পৌঁছে দেখি ডাক্তারবাবুর রুগী দেখা শেষ। শেষ বিকেলে চেম্বারের বাইরে পলাশগাছের ছায়ায় বসে চা খাচ্ছেন। আমার সাথে আগে একদিন ডাক্তারবাবুর পরিচয় হয়েছে লীলামাসির কটেজে। আমাদের মধ্যে একজন এখানে আসার পরপরই অসুস্থ হয়ে পড়েছিলেন, তখন উনি কটেজে এসেছিলেন। দূর থেকেই উনি আমাকে দেখতে পেয়ে উঠে দাঁড়ালেন। আমি নমস্কার জানিয়ে কুশল সংবাদ নিলাম। উনি বসতে বলে আমাকে চা খাওয়ার আমন্ত্রণ জানালেন। এখানে চিকিৎসা ব্যবস্থা খুবই মার্জিনাল। ঘর বলতে দুটো ছোট ছোট খুপরি। তার একটাতে ডাক্তারবাবু রুগী দেখেন-একটা টেবিল, গোটা দুই চেয়ার। অন্য ঘরটাতে একটা কাঠের আলমারিতে ওষুধপত্র থাকে আর পাশে দেয়ালঘেঁসে একটা সংকীর্ণ বেড। খুব জরুরি প্রয়োজনে রুগীকে এখানে শুইয়ে পরীক্ষা করতে হয়। এই সেন্টারের সর্বক্ষণের সঙ্গী মুকুন্দ চা নিয়ে এলো সঙ্গে দুটো থিন অ্যারারুট বিস্কিট। চায়ে চুমুক দিয়ে আমি ডাক্তারবাবুর কাছে সুবলের কথাটা পাড়লাম। ডাক্তার বাবুর কথায় আশ্বস্ত হলাম যে সুবলের জ্বরটা নিছক ইনফ্লুয়েঞ্জা, তবে সরকারি নিয়ম মাফিক পনেরো দিন কোয়ারান্টিনে থাকতে হবে পরিবার সমেত। ডাক্তারবাবু জ্বরের ওষুধ দিয়েছেন। তিনি আশা করছেন এতেই কাজ হবে, তবে ভবিষ্যতে যদি অন্য কোনো উপসর্গ দেখা যায় তখন অবস্থা বুঝে ব্যবস্থা হবে। এখানে চিকিৎসার সরঞ্জামের এতটাই অভাব যে জ্বর-পেটখারাপের বেশি কিছু হলেই শহরের হাসপাতালে পাঠিয়ে দিতে হয়। তবে এখন জরুরিকালীন পরিস্থিতিতে এখান থেকে পাঁচ কিলোমিটার দূরে এক জুনিয়র স্কুলে অস্থায়ী সেন্টার গড়ে তোলা হয়েছে, যেখানে ডাক্তার- নার্সরা  এলাকায় যাতে রোগের প্রাদুর্ভাব দেখা না যায় তার জন্যে দিনরাত অক্লান্ত পরিশ্রম করে যাচ্ছেন। এখানে তিরিশ-চল্লিশ কিলোমিটার ব্যাসার্ধ্যের মধ্যে এখনও পর্যন্ত সংক্রমনের কোনো খবর পাওয়া যায়নি। এই মুহূর্তে সমস্ত ডাক্তার, নার্স, স্বাস্থ্য-সেবকদের চব্বিশ ঘন্টা ডিউটি দিতে হচ্ছে। বহু সাধারণ মানুষকে চটজলদি ট্রেনিং দিয়ে স্বাস্থ্যসেবায় কাজে লাগানো হচ্ছে। ডাক্তারবাবু আমাদের কটেজের একজনের প্রশংসায় পঞ্চমুখ হয়ে উঠলেন। আমার সহযাত্রী সেই স্কুল শিক্ষিকা, উনি এর মধ্যেই কাজ শিখে এই সেন্টারে ডাক্তারবাবুকে সাহায্য করছেন। শুনে খুব ভালো লাগলো। যে মানুষ কাজকে ভালোবাসে সে যেকোনো কাজেই নিজেকে নিবেদিত করতে পারে, কাজের মধ্যে  আনন্দ কুড়িয়ে নিতে পারে। মানবসেবাই শিক্ষকদের ধর্ম। তা সে শিক্ষাদানের মধ্যে দিয়েই হোক বা স্বাস্থ্যসেবা প্রদানের মধ্যে দিয়েই হোক। মনে মনে ভদ্রমহিলাকে নমস্কার জানালাম। আমি ডাক্তারবাবুকে বললাম, উনি যদি আমাকে কোনো কাজের উপযুক্ত মনে করেন, আমি প্রস্তুত। উনি আমাকে আশ্বস্ত করে বললেন, – আমি আপনার কথা শুনেছি, আপনি যে কাজ করছেন সেটাও খুব জরুরি। এই পরিস্থিতিতে মানুষের পেট ভরানোটাও বড় দায়িত্ব। আপনি সে দায়িত্ব নিষ্ঠার সাথে পালন করছেন। আমি ওনাকে ধন্যবাদ জানিয়ে বিদায় নিলাম।

  সূর্য বেশ কিছুক্ষণ ডুবে গেছে। পলাশ গাছের কামরাঙা লাল আস্তে আস্তে দিগন্তে ছড়িয়ে পড়ছে। সেই আবছা লালরঙে সামনের মোরামের রাস্তা এক স্বপ্ন পথ হয়ে এঁকে বেঁকে কোনো রূপকথা রাজ্যের সন্ধানে চলে গেছে। একটা ঘোরের মধ্যে ঘরে ফিরতে ফিরতে ভাবতে লাগলাম এই সব মানুষরূপী দেবতাদের কথা। দিনরাত এক করে গোটা বিশ্বে এই মানবসন্তানরা মহামারীর বিরুদ্ধে লড়ে যাচ্ছেন। ডাক্তারবাবুর মুখে শুনলাম উনি একমাস বাড়ি ফেরেননি। আগে শহর থেকে নিয়মিত যাতায়াত করতেন। এখন ওই রুগী দেখার একচিলতে সজ্জায় শুয়ে ওনার রাত কাটে। মুকুন্দ যা ফুটিয়ে দেয় দুবেলা হাঁসি মুখে খান। টয়লেট বলে কিছু নেই। পঞ্চায়েতের বারোয়ারি টয়লেটে কাজ সারতে হয়। এসব একজন নাগরিক অভ্যাসে অভ্যস্ত হয়ে পড়া মানুষের পক্ষে কতটা কষ্টকর ভাবলে অবাক হতে হয়। তারপরও কি অফুরান প্রাণশক্তি, অদম্য কর্মবাসনা ! না পাওয়ার কোনো অভিযোগ নেই, অক্লান্ত পরিশ্রমে আশপাশের বেশ কয়েকটা গ্রাম ঘুরে ঘুরে চিকিৎসা করছেন, মানুষকে সুস্থ থাকার শিক্ষাদান করছেন, প্রয়োজনীয় সরকারি সামগ্রী বিলি করছেন। আজ প্রায় এক ঘন্টার ওপর ওনার সাথে কেটেছে, একবারের জন্যেও ওনার মুখে শুনলামনা, শহরে স্ত্রী আর ছোট ছোট ছেলেমেয়ে কিভাবে দিন কাটাচ্ছে ! চিন্তা নিশ্চয়ই ওনারও হয়, কিন্তু ব্যক্তিগত চিন্তা চেপে রেখে সমগ্রের স্বার্থে নিজেকে সঁপে দেওয়াই বোধহয় ঈশ্বরত্বে উত্তীর্ণ হওয়ার প্রথম ধাপ। আমরা আর কি করতে পারি, শুধু হাত তুলে সেই সব ঈশ্বরের উদ্দেশ্যে প্রণাম জানানো ছাড়া !

 

পাঞ্চালী মুখোপাধ্যায়

  শকুন্তলা না আসায় ভালই হয়েছে। শহুরে বাবুরা গণ্ডীবদ্ধতা ছেড়ে তাঁদের কাজের পরিধি বাড়িয়ে তুলছেন।এখন কর্মক্ষেত্রটি আরো ব্যাপ্ত হচ্ছে। সেই 

” আমার এ ঘর বহু যতন ক’রে ধুতে হবে মুছতে হবে মোরে

আমারে যে জাগতে হবে, কী জানি সে আসবে কবে

যদি আমায় পড়ে তাহার মনে “৷ 

এই ছোট পরিসরটুকু সাফসুতরো করতে করতেই হয়তো একদিন পরিবার, সমাজ, পাড়া, প্রদেশ, দেশ ছাপিয়ে বৃহত্তর পৃথিবী পরিষ্কারের কাজে লাগতে পারবো, এখন যে সেটা বড় দরকার। “বড় ময়লা জমেছে মনে”৷ কটেজের সকলের সম্মিলিত যাপন কি মানুষকে সংগচ্ছধ্বম্, সংবদধ্বম্ একসাথে চলার, একসুরে মিলবার গান শেখাবেনা? আর শেষে সেই সবার মানসিকতা এক খাতে বইবার ঐক্যমতের চিন্তায় “সং নো মনাংসি”-তে উত্তরণ ঘটবেনা আমাদের? নিশ্চয়ই হবে। এইভাবেইতো ব্যষ্টি থেকে সমষ্টিগত চিন্তায় উন্নীত হই আমরা। অনিশ্চিতপুর কিন্তু নিশ্চিতভাবে আমাদের এগিয়ে দিচ্ছে সার্বিক উন্নতির দিকে। মঈদুলতো সুস্থ হয়ে উঠবেই এ বিষয়ে নিশ্চিত ছিলাম। জৈব সারের প্রয়োগ সে ভাল জানে। ক্ষতিকর রাসায়নিক বিক্রিয়ার কবলেতো কোনদিন পরেনি সে। ওর বড় হয়ে ওঠাইতো উদার মুক্ত জল হাওয়ায়।

    কিন্তু চিন্তায় ফেলেছে ঐ সুবল, শকুন্তলার স্বামীটি। লীলামাসীর উদারতার প্রতি আমার গভীর আস্থা আছে। তিনি ওর প্রতি নির্মম নন। তিনি ওর চিকিৎসার ব্যবস্থা করেছেন একজন মহানুভব চিকিৎসকের দায়িত্বে। বলাবাহুল্য আমাদের শহুরে বাবুদের দলেও একজন অবসরপ্রাপ্ত সুচিকিৎসক আছেন তাঁর কাছেই প্রথমে নিয়ে যাওয়া হয়েছিল সুবলকে। সেই চিকিৎসক বাবুটি আঁতকে উঠে সটান না করে দিলেন। তার সঙ্গে সঙ্গে ধুয়ো ধরলেন অন্যরাও। দূর করে দিন ওদের, আমরাও মরবো না কি ওদের জন্যে ? ঐ দেবশিশুর মতো বাচ্চাটি যে তার সারল্যে মন জয় করে নিয়েছিল তাদের তাকে ভুলে যেতে এক মুহূর্তও দেরী হলনা।

আর লীলামাসি? এইরকম লীলামাসি, লীলামেসোরা প্রত্যেকের জীবনেই থাকেন যাঁরা লীলায়িত বিভঙ্গে জীবনের শকটটিতে মবিল সঞ্চালন করে গতিময় রাখেন,কখনো সাময়িকভাবে, কখনো সারা জীবনজুড়ে। সেই ছোটবেলার মাষ্টারমশাই যিনি প্রাথমিক স্কুলে পড়াতেন, প্রায় দশ মাইল সাইকেল চালিয়ে প্রত্যন্ত গ্রাম থেকে প্রাইভেট টিউশনে পড়াতে আসতেন শহরে, বড় সংসারের চাহিদায়,বড়ো অভাবে। একদিন প্রাকৃতিক দুর্যোগে শহরে খাদ্য পানীয়ের অভাব, বিদ্যুৎসংযোগ ছিন্ন, তখন তিনি তাঁর দুই পড়ুয়ার জন্যে সাইকেলের ক্যারিয়ারে বেঁধে নিয়ে এসেছিলেন মোটা চালের ভাত, মুশুর ডাল আর মোটা মোটা আলুভাজা, পানীয় জল। সেই খাবারের স্বাদ, গন্ধ কি ভোলা যায়? এতো জীবনের এক চিরস্থায়ী অক্ষয় সঞ্চয়। এইরকম কতো লীলা ছড়িয়ে থাকে জীবনে, খুঁজলে সকলের জীবনেই পাওয়া যাবে হয়তো।

আমাদের দলের শিক্ষিকাটি হয়তো এইরকম কোন মাষ্টারমশায়ের শিষ্যা।শিক্ষকদের জীবন এক আদর্শের প্রতিফলন,যে আদর্শ ভাবী প্রজন্মকে সমৃদ্ধ করবে,সদর্থক ভাবনার বীজ বুনে দেবে মনে।এই গ্রামে রয়েছেন একজন কৃষিবিজ্ঞানী যিনি উচ্চ চাকরীর প্রত্যাশী নন,আছেন একজন নিজের পেশার তাৎপর্য গভীরভাবে আত্মস্থকারী চিকিৎসক যিনি ডলার,পাউন্ড বা ইউরোর মোহে দেশত্যাগ করেননি বা দুঃসময়ে বিদেশে বসে তৃতীয় বিশ্বের এই দেড়শো কোটি মানুষের ভবিষ্যৎ নিয়ে চিন্তান্বিত নন ?তবে?আর কি চাই?এইসব মানুষইতো আকর,এই সব খনিই দেশের সম্পদ, যাদের যত্নে আগলে রাখা দরকার।

সুবলের জ্বর সংক্রামক কিনা জানা যায় নি।আস্তে আস্তে নগ্ন বেআবরু হচ্ছে আমাদের শহুরেদের মেকী ভদ্রতা।অনেকেই বায়না ধরেছেন চোদ্দ দিন পরেও লীলামাসী যেন ওদের তিনজনকে এই অতিথিশালার ত্রিসীমানাতে ঢুকতে না দেন।কেউ কেউ প্রস্তাব দিয়েছেন ওদের ঐ বাসস্থান থেকেও উৎখাত করা হোক। একথা ওদের এখনই জানিয়ে দেওয়া হোক – এমন অত্যুৎসাহীদের প্রস্তাবও এসেছে।রোগ বালাই থাক না কেন,এখনই পাততাড়ি গোটাক ওরা।শিশুটিকে কে কবে আদর করেছেন তার হিসেব নিকেশ শুরু হয়ে গেছে।বাবার থেকে ছেলের মাধ্যমে রোগ ছড়াতে কতক্ষণ?

আমি ঠিক করলাম ডাক্তারবাবুর সাহায্য নিয়ে সহযাত্রীদের মানসিক উৎকণ্ঠা দূর করবার জন্যে একটা ব্যবস্থা নেওয়া দরকার।ভারী লজ্জা করছে, লীলামাসীর উদারতার সামনে মাথা হেট হয়ে যাচ্ছে যে।এখানে প্রশাসনের বা পুলিশের ভয় কোনটাই কার্যকর নয়।শুধু অনমনীয় উদ্ধত শিরদাঁড়া উঁচিয়ে এই প্রতিকূলতার মোকাবেলা করতে হবে,যেটা একমাত্র লীলামাসীর দ্বারাই সম্ভব।

          (চলবে…..)

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *