অপয়া | অর্পিতা শিরিন স্বর্ণা

| অর্পিতা শিরিন স্বর্ণা

 

আমি নাকি অপয়া!

বাবা মায়ের ইচ্ছাতেই বিয়ে হয় আমার। শুরু হয় সংসার জীবন। আমার উনি ব্যবসা করে। ইদানিং ব্যবসায় লাভ হচ্ছে না।কেমন যান একটা ভাব। আমার বিয়ের ১১ মাস,২৮ এপ্রিল এপারের মায়া ত্যাগ করে নদীর ওপারে নাও ভীড়ায় আমার শ্বশুর।

শূন্যতা দেখা দেয় আমার ভরা ঘরে। শ্বাশুড়ি যেন আজ নিস্তব্ধ রাজ্যের রানী। সেই ১৬ বছর বয়স থেকে বোনা জালের প্রতিটি সুতোর সাথে জড়িয়ে থাকা স্মৃতিগুলো তাকে করেছে আজ নিস্তব্ধ।খাঁ খাঁ করছে চারিদিকে। শ্বশুরের শেষ ইচ্ছা ছিল গীতাপাঠ শোনা। উনি এতটাই ব্যস্ত ছিল যে গীতা পাঠ শেষ না করতেই এপারের মায়া ত্যাগ করে ওপারে রওনা হন। পারিনি পূর্ণ করতে তার শেষ ইচ্ছে।

 

বাবা চলে যাওয়ার পর সংসারে টানাপোড়া লেগেই আছে।ওর ব্যাবসা ক্ষতির সম্মুখীন হচ্ছে বার বার । সামনে কালীপূজো আসছে।কালী মায়ের মূর্তি কেনার মতো সামর্থ্য নেই।

শ্বাশুড়ি মা  ঘরের কোণে চুপ করে বসে আছে। তার কোন খেয়াল নেই এ সংসারে। তাই এবারের পূজটা মায়ের জন্যেই করব। কিন্তু পূজো করতে তো টাকা প্রয়োজন।

 

সেই কত বছর আগে বাবা আমাকে আমাকে মাটির এক লাল ব্যাঙ্ক কিনে দিয়েছিলেন।ওই ব্যঙ্কে রাখা প্রথম টাকা টাও বাবার ছিল। প্রতিদিনের জমানো একটু একটু টাকা থেকেই মাটির ব্যাঙ্ক প্রায় ভরে উঠেছে।তাই এ টাকা দিয়েই পূজো করব। তবে এতটুকু টাকা দিয়ে কি কালি মায়ের মূর্তি পাওয়া যাবে??

 

এবারের মূর্তি টা আমি গড়ব। অনেককাল আগে পাল বাড়ির সাথে ভালো সম্পর্ক ছিল সেই সুবাদে মূর্তি গড়াটা আয়ত্তে এনেছিলাম। এরপরই মূর্তি গড়ার কাজে লেগে পড়ি।

কয়েকদিন যাবৎ শরীর টা ভালো যাচ্ছে না। এরপর ও কাদা মাটি দিয়ে মায়ের গড়ন তৈরি করি।

পূজো শুরু হলো।ষষ্ঠী, সপ্তমী,অষ্টমী, নবমীর দিন গুলো কাটে মুখরিত ভাবে।তবে দশমীতে যখন মাকে বিষর্জন দিতে যায় তখ্ন মনের মাঝে কেমন যেন কু-ডাকছিল।

ও আর কিছু না মাকে আজ বিদায় দিব তো তাই হয়তো এমন পিছু টান। পরদিন কুয়াশা ভেঙে সূর্য উঁকি দিল আকাশে। এভাবে দিন কাটছে। সবার মাঝে একটু আনন্দের আলো দেখা  যাচ্ছে। কিন্ত দিন দিন কান্ত হয়ে পড়ছি আমি আমাকে ডাক্তারের কাছে নিয়ে গেলে ডাক্তার বলে আমি নাকি মা হতে যাচ্ছি।সবার মুখে আমার হাসি ফিরে আসে।যেন খটখটে মরূভূমিতে একফোঁটা জল এসে পড়েছে। হৃদয় আমার অচেনা  আলোতে উপচে পড়ল । ভেবে শিহরিত হয় আমার মাঝে জন্ম নিচ্ছে চোখ,কান,নাক, ছোট দুটি  হাত। শুনেছি কান্মা মিশে থাকে আনন্দে আর বেদনায়।আজ তার প্রমাণ মিললো কান্না যে শুধু বেদনার হয়না খুশির ঝড় ও হাজারো কান্নায় মিশে থাকে।স্বপ্ন হাজারো স্বপ্ন ঘিরে ফেলেছে আমায়। এ কেমন সুখ আমি পাচ্ছি অবাক  চোখে তাকিয়ে আমি  যেন স্বর্গ দেখছি, কল্পনার কান পেতে আমি জীবনের ছন্দোতোলা শুখের ক্ষণ অনুভব করছি ।কলমের কালি যেন এ অনুভূতি প্রকাশ করতে ব্যর্থ। ওর বাবা চাই একটা মেয়ে আর আমার শ্বাশুড়ি চাই তার জীবনের মূল্যবান শেষ সময়টুকু কাটানো র জন্য একজন সঙ্গী। রসিকতার সুরে বলে আমায় কিরে  বৌ বানাবিতো আমাকে । আমি ও সুরে সুর মিলিয়ে বলি সেই মেয়েকেই বৌ বানাবো যে রাঁধতে পারে আর চুল ও বাঁধতে পারে  । সে কি কাণ্ড ঘটল!!

 

মাগো মা ও কত্ত্ খেলনা কিনে আনল দোস যদিও ওর একার ছিল না  গত রাতে ড্রেসের কথা তো আমি বোলেছিলাম  ওকে।তাই হয়তো ও একাপড়গুলোএনেছে। শুনতে শুনতে দিন প্রায় শেষ হয়ে আসছে  পিঠার অনুষ্ঠান আজ  পিঠা আমার খুব পছন্দ আমার । তবে আজকে কি ভেবে যে পিঠার উপর থেকে অদৃশ্য লোভটা আমার আর নেই।পিঠা বানাতে বানাতে হাত  দুটো টক টকে লাল হয়ে গিয়েছে।তবুওএক আনন্দের ঘরে বসে আমি স্বপ্নের সমুদ্রে ডুবে আছি  ।এ কেমন সুখ প্রভু !

 

কেমন অনুভূতি দিচ্ছো আমাকে ক্রমশ দিন যাচ্ছে আর  আমার  মাঝে বাড়ছে আমার স্বর্থকতা । জীবনের তো সবচেয়ে  বড় স্বার্থকতা এটায়।১লা ডিসেম্বর আমার নতুন জীবনে পা দেওয়া র পালা  । দেখতে দেখতে সময় কাল মুহূর্ত সব অতিবাহিত হচ্ছে যেন দ্রুতগামী ছন্দ তুলে। আমার গর্ভে প্রায় ফুটবল প্রাকটিস করে। নিস্তব্দতা কী এটা জানেনা আমার ছোট্ট খোকা । ভাবতে ভাবতে নামেটা রেখেই ভেললাম শুধু বলার প্রতিক্ষা।যদি আমার মেয়ে হয়  নাম রাখবো লক্ষী আর ছেলে হলে জয় ।অফুরন্ত স্বপ্ন নিয়ে আলোর দিশার দিকে এগিয়ে যাচ্ছে প্রতি মুহূর্ত। প্রতিটি সূর্য দয় আমারে  জানান দেয় আমার প্রতিক্ষার  সময়  ফুরিয়ে আসছে। আমার সর্ব উওম উপহারের  দিনের  সীমার  কাছে  আজ আমি চলে   এসেছি। একেমন যন্ত্রনা  যেন  এই   দুঘন্টার কাছে কিছুই না ক্ষনেকের জন্য মনে  হলো মা ডাক শোনার মত ভাগ্য বোধ হয় আমার হবেনা  ক্ষণের মধ্যে আকাশ থেকে একটুকরো চাঁদ এসে পড়ে আমার ঘর শব্দের স্রোতে ভেসে আসছে  হাসির  গন্ধ। এর মাঝেও  কেউ কান্নায় ভেঙে  পড়েছে । শুনছি  আমি ওর কথা কানে বাজছে ওর শব্দের প্রতিদ্ধতি।ওর কান্নার শব্দ  যেন বলছে তোমার কোলে একটি বার ঠাঁই দাও আমাকে। একটি বার কোলে তুলে নিও আমাকে ওর করুন কন্ঠ যেন  শিহরিত করল তবে  আমি যেনিরুপায় আমার যে তোকে কোলে নেওয়ারক্ষমতা নেই রে। আমার  ধরনাকে সত্য প্রমান করতে জন্ম হলো আরেক ফুটফুটে বালকের। এই যে আমি ভাবতাম  ফূটবল খেলার কথা আসলে দুই ভাই মিলে ফুটবল খেলত। অনেক ভালো ফুটবল  প্লেয়ার না হলেও ওদের জুড়িটা  কয়েক ইঞ্চি  জায়গা তে ওরা খুব ভালো ফুটবল খেলতো  । সন্তানের কান্নার আওয়াজ  শোনা যেএক ভাগ্যের ব্যাপার  । তবে পূর্ণ ভাগ্যবান  যে আমি নয়। নিঃশব্দে পৃথিবীর মায়া ত্যাগ করে চলে গেল। আমার এক পারে শোকের ছায়া আর  এক পাশে রোদেলা মায়া। জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে অবিবরণীয়  অভিজ্ঞতা ।ক্ষণেরকের মধ্যে আমি বাক্যহীন হয়ে পড়েছি। কেন না যে অভিগতা বর্ণনা দেওয়া যাইনা এর প্রভাব এতো তীব্র হয় যে এর অনুভূতি কোন কাগজ সহ্য করতে পারে না । কলমের কালি ও সে অনুভূতি  ব্যাক্ত করতে ব্যার্থ। পরিবারের লোকজন গুলোর কেউ গেছে রঙিন। কাপড় আনতে আর কেউ বা নতুন বিছানা। আজ যদি নতুন   বিছানায় আমি উঠতাম তাহলে আমার কষ্ট থাকতো না। আজ  আমার ছোট্ট সোনা নতুন পোশাক পরতে হবে ।এই তোরা আমার সোনা টাকে আদর করে কাপর পড়াবি যেন কষ্ট না পায়।দেখিয়ে কিন্ত ও যেন কান্না না করে । কিছু সময় আগে যে ঘরে হাসির জোয়ার ছিল সে ঘরে কেন কান্নার স্রোত বইছ?

 

আমার পাশ থেকে আমার একটা বাচ্চার লাশ নিয়ে যাওয়া হলো অন্য পুঁচকে কান্না থামিয়ে পৃথিবী দেখছে। ওরা আজ বাড়িতে নিয়ে যাবে আমায়।সব কিছু প্যাক করে ওরা আমাকে নিয়ে যখন রওনা হবে তখনই দেখি একটা ছোট পাটিতে কি জান মুড়িয়ে নিয়ে যাচ্ছে?? দেখে মনে কেমন যেন একটা চাপা কষ্ট ভেসে উঠলো।

কী উঠাতে?? নিস্তব্দ ভাবে জবাব আসলো “লাশ”। আমার বুঝতে বাকি রইল না এটা আমারই নাড়ি ছেঁড়া ধন।দু’পা পিছিয়ে পড়লেও এগিয়ে যেতেই হলো। কিছু ক্ষনের মধ্যে বাড়িতে পৌঁছে দেখি আমার শ্বাশুড়ি মা বরন ডালা সাজিয়ে আর আমার গ্ৰাম বাসি মোড়ানো দেহটাকে নিয়ে কোথায় যেন যাচ্ছে?

কোথায় যাচ্ছ তোমারা??

কেন যাচ্ছ?? ওগো আমায় নিয়ে চলো।

হরিধ্বনী  দিয়ে বুঝি আমার নাড়ি কাটা ধন নিয়ে যাচ্ছ??

পুড়াবে ওকে??

কী কাঠ দিয়ে পুড়াবে??

ওতো ছোট্ট।মাত্র কয়েক ইঞ্চি।এই কয়েক রক্তবিন্দুকে পুড়াতে হলে যে সেগুন কাঠের অপালিশ করা আগুনের বিছানায় শুয়াতে হবে।

দাঁড়াও দাঁড়াও যেওনা।একটু দাঁড়াও। প্রথম বারের মত একটুখানি সাজিয়ে দেয় ওকে।ওর জন্য অনেক গুলো কাপড় কিনেছি।যাওয়ার আগে কাপড় যদি শরীরে না দেয় তাহলে টাকার দাম উঠবে না যে।

শুনছো না কেন তোমারা আমার কথা!! আমি অভাগী মা। তাই বলে কি আমর দেহের অংশ আমাকে দেখতে দিবে না!!

ভগবান তোমাদের মাফ করবেন না!

কোথা থেকে যেন কান্নার ধ্বনি বয়ে আসছে। ওর কান্নার ধ্বনি খুব মিষ্টি।আজ বড় উৎসবের দিন। তোরা সবাই আনন্দ কর। উৎসব কর তোরা।

বিকেল গড়িয়ে কালো রাত নেমে আসল। চাঁদের আলোতে পাটি মুড়ানো কিছু একটা দেখা যাচ্ছে। বুঝলাম ঐ কয়েক ফোঁটা রক্ত বিন্দু স্বর্গে  গিয়েছে।

বৌমা ও বৌমা এদিকে এসো,ও কাঁদছে।মা ডাকছে।এখন থেকে শুরু হলো আমার জয়ের লড়াই।এক জন তো আমায় ছেড়ে চলে গেছে,,অন্য জনকে আমায় আটকে রাখতে হবে।জয় খুব কাদে।ওর কান্নার ধ্বনিতে হিংসার প্রতিধ্বনি শোনা যায়।ও কান্নার আওয়াজ বলে মা, আমার ফুটবল খেলার পার্টনার কোথায়? কোথায় রেখেছ ওকে? আমি ও যাব‌ ওর কাছে! আমাকে ও নিয়ে চলো ওর কাছে।এ কথা বলে না বাবা। আদরের চাদর ঢেকে নিল মা। তুই আমাকে ছেড়ে যাস না বাবা। তাহলে এই পৃথিবীতে আমার ঠাঁই হবে না।

তিন দিনে হলো ওর বয়স।ও বোধহয় ভাবে ওর ভাইকে ফুটবল ফেডারেশনে ভর্তি করেছি। তাই ও ওর ভাইয়ে কাছে যাওয়ার জন্য আকুল হয়ে উঠেছে।ওর খুব জেদ,ওর এতটুকু বয়সে এত প্রতিহিংসা যে ভাইয়ের কাছে হারবে না প্রতিজ্ঞা সে ও ফেডারেশনের  পথে রওনা হয়।জয় ও আমাকে ছেড়ে চলে গেল।

সবাই বলাবলি করছে অপয়া,ও মেয়ে অপয়া। অলক্ষ্যি বাসা বেঁধেছে এই ঘরে।যে মেয়ে নিজের সন্তান খায় সে অলক্ষ্যি। সবাই দোহাই দিয়ে বলছে ও মেয়েকে গ্ৰামছাড়া করতে হবে না হয় ও আমাদের ও খেয়ে ফেলবে ।ওযে মানুষ খেকো।

 

নিস্তব্দ কষ্টের  মাঝে কতগুলো প্রসংশার ধ্বনি বিমোহিত  করল আমায়। আজ সবাই আমাকে তাড়িয়ে দিয়েছে গ্ৰাম থেকে। শেষ বারের মতো দেখতে দিল না আমার সন্তানকে। শুনেছি হায়াত শেষ হলে নাকি  জীবনের অবসান ঘটে আমার সন্তানের মৃত্যুর জন্য গ্ৰামের লোকের মুখধ্বনি আমি অপয়া  দায়ী।।

 

ঢাকা,বাংলাদেশ।

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *