আত্মজ

গৌতম সরকার

“নবমী নিশি পোহালো…………….
উমা আমার যাবে চলে…………….”
নবমীর রাত্রি এক আকাশ কান্নার ঝুলবারান্দা। এই রাত্রিটা আপামর বাঙালির বুকের মধ্যে লক্ষ-কোটি পিন ফোটায়। পঙ্কজ চৌধুরীর গানে উমার চলে যাওয়ার বেদনা মুর্ত হয়ে উঠলে ছোট্ট মহীতোষের মনে হত, বছরভর অপেক্ষার আনন্দের দিনগুলো এত শিগগির শেষ হয়ে গেল! সেইসময় আনন্দের দিনগুলো বড়ই হাতে গোনা ছিল, তাই কদরও ছিল অনেক বেশি। একবিংশ শতাব্দীতে পৌঁছে হাজার বিনোদনের ভিড়ে মানুষ অপেক্ষার আনন্দটাই ভুলে গেল। এখন শুধুই যাপন, আর সবকিছুর মধ্যে ইউটিলিটি বা সন্তুষ্টিকে খুঁজে নেওয়ার বেনিয়ান চেষ্টা। তবে সবটাই আবার নঞর্থকে নিলে জীবনপ্রবাহটাই থেমে যাবে। বেঁচে থাকতে হলে জীবনের সদর্থক দিকটাকেই আঁকড়ে ধরতে হবে৷
ছোটবেলায় মহীতোষকে সবাই ‘উধো’ বলে খেপাত, কারণ সব কাজেই সে উল্টোপাল্টা করতো, সে ঘরেই হোক বা বাইরে। দাদু হুঁকো সাজতে বললে টিকে-কলকে উল্টে নিজের কাপড়েই আগুন লাগিয়ে ফেলতো; আবার স্কুলের মাস্টারমশাই খাবার জল আনতে বললে কাঁচের গ্লাস-টাস ভেঙে সে এক কেলেঙ্কারি কান্ড ঘটাত। সেই মানুষটাকে ভগবান উচিত শিক্ষা দেওয়ার দায়িত্ব নিয়ে নিলেন। বিয়ের দুবছরের মাথায় ছ-মাসের ছেলেকে রেখে প্রভাবতী যেদিন ছুটি নিলেন সেদিন থেকেই মহীতোষের জীবনের আসল পরীক্ষা শুরু হয়ে গেল। প্রথম প্রথম দুধ খাওয়াতে গিয়ে কতবার ছেলের মুখে হেঁচকি তুলে দিয়েছে, পাশের বাড়ির ব্যানার্জী কাকিমা রীতিমতো বকুনি দিয়ে দুধের জায়গা সমেত তিতাসকেই নিজের বাড়িতে নিয়ে চলে যেতেন। আজ সেই তিতাসের ছেলে তুরীণ নাসা গবেষণা কেন্দ্র থেকে একমাত্র বাঙালি হিসেবে মঙ্গল গ্রহে পাড়ি দেবার জন্য নির্বাচিত হয়েছে।



আজ আবার সেই নবমী তিথি। তবে আজকের সন্ধ্যাটা একদম অন্যরকম, দু কামরার মলিন বাড়িটা আজ আলোর রোশনাইয়ে ঝলমল করছে। মুহুর্মুহু ক্যামেরার ঝলকানিতে রং জ্বলে যাওয়া দেওয়ালগুলির মালিন্য আরও বেশি করে প্রকট হয়ে উঠছে। তবে সেদিকে কারোর নজর নেই। টেলিভিশনে তুরীণ এবং বাড়ির লোকের ইন্টারভিউ লাইভ দেখানো হচ্ছে। রিসার্চ অ্যাসোসিয়েট হওয়ার পর তুরীণ একটা টিভি কিনেছিল, সেটাই এখন মহীতোষের ঘরে চলছে। সমবেত জনতার হর্ষধ্বনির মধ্যে একবার তুরীণ, একবার ওর মা, একবার এই ঘরের আশপাশ টিভির পর্দায় ফুটে উঠছে। তবে সবাইয়ের শত অনুরোধে মহীতোষ ক্যামেরার সামনে আসেননি। তিনি তাঁর সংক্ষিপ্ত বক্তব্য ‘অফ দ্য ক্যামেরা’-য় বলে দিয়েছেন। তারপর থেকেই মহীতোষ আস্তে আস্তে এই আনন্দমেলা থেকে দূরত্ব তৈরি নিচ্ছেন। আজকে তিনি কিছুতেই পরিস্থিতির সাথে নিজেকে মানিয়ে নিতে পারছেন না। ছাপোষা নিরীহ একজন মানুষ বিসর্জনের বেহাগের সাথে আবাহনের ইমনকল্যাণের যুগলবন্দী কিভাবে ঘটাবেন! তার চেয়ে আনন্দযজ্ঞ থেকে অগোচরে সরে আসাই ভালো। ঘর থেকে বেরিয়ে আসার সময় চোখ চলে গেল পুত্রবধু বিপাশার দিকে, চোখেমুখে কোথাও কোনও শোকের চিহ্ন দেখতে পেলেন না। সন্তানের সাফল্য কী জীবনের ব্যাথা-বেদনা-যন্ত্রণা-কষ্টের চড়াই-উৎরাই গুলোকে মসৃণ করে তুলতে পারে! হয়তো পারে! মহীতোষ ধীরে ধীরে পিছনের একচিলতে বাগানের শেফালী গাছটার নিচে গিয়ে দাঁড়ালেন। বেশিক্ষণ দাঁড়িয়ে থাকতে পারলেন না। আস্তে আস্তে বসে পড়লেন। একচিলতে বাগান জুড়ে কচি ঘাসের বিছানা। সেই ঘাসের বুকে হাত চালিয়ে মহীতোষ তিতাসের হৃদস্পন্দন ছোঁয়ার চেষ্টা করলেন। এই ঘাসের নিচে তিতাস একমুঠো ছাই হয়ে রয়ে গেছে।



“কোথায় গেল ওর স্বচ্ছ যৌবন
কোথায় কুরে খায় গোপন ক্ষয়!
চোখের কোণে এই সমূহ পরাভব
বিষায় ফুসফুস ধমনী শিরা!”
তিতাস সিগারেট খেত না, অন্য কোনও নেশা ছিলোনা। ছোটবেলা থেকে পড়াশোনার সাথে খেলাধুলাতে সমান উৎসাহী ছিল। নিয়মিত শরীর চর্চা করতো। সেই ছেলের চৌত্রিশ বছর বয়সে লাং-ক্যানসার ধরা পড়লো, তাও ফোর্থ স্টেজে। ডাক্তার, নার্স, আত্মীয়-স্বজন, সহকর্মী, বাড়ির লোক কাউকে কোনো সুযোগ না দিয়ে এক পক্ষকালের মধ্যে যৌবন দীপ্ত টগবগে ছেলেটা চলে গেল। তারপরই মহীতোষের বয়সটা আরও দশ বছর বেড়ে গেল। সেটা কেন? বেঁচে থাকতে ভয় পেয়ে গেল মানুষটা! নাকি মৃত্যুর পর স্ত্রী-ছেলের কাছে যাওয়ার এক নিহিত ইচ্ছা মানুষটাকে ময়াল সাপের মত আষ্টেপিষ্টে জড়িয়ে ধরলো।




“না কি এ শরীরের পাপের বীজাণুতে
কোনোই ত্রাণ নেই ভবিষ্যের?
আমারই বর্বর জয়ের উল্লাসে
মৃত্যু ডেকে আনি নিজের ঘরে?”
মহীতোষ অনেক ভেবেছেন, দিন-রাত ভেবেছেন, তার নিজের পাপের প্রায়শ্চিত্ত স্বরূপই কী সন্তানকে হারাতে হল! পাপটা নিশ্চয়ই তার, কারণ সন্তান বিয়োগের যন্ত্রনা যাতে সহ্য করতে না হয় তাই তার মা তো বহুকাল আগেই চলে গেছেন।
তুরীণ প্রথম থেকেই পড়াশোনায় অত্যন্ত ভালো, সেটা তার রেজাল্ট দেখলেই বোঝা যায়। তিতাস যখন মারা গেল মহিতোষ দুবছর অবসর নিয়েছেন। পেনশনের ওইটুকু পয়সায় সংসার চালিয়ে নাতিকে মানুষ করা সম্ভব ছিলোনা। তাই অবসর কাটিয়ে আবার উপার্জনের ধান্দায় রাস্তায় নেমে পড়তে হয়েছিল। বিপাশাও যথেষ্ট সাহায্য করেছিল, কিন্তু শুধু একটা বি.এ ডিগ্রি নিয়ে তার পক্ষে খুব বেশি কিছু করা সম্ভব ছিলোনা। ধরা করা করে একটা সেকেন্ডারি স্কুলে অশিক্ষক কর্মীর চাকরি জুটিয়েছিল, দশ বছর পর পার্মানেন্ট হয়েছিল। তিতাস ছেলেবেলা থেকেই টিউশন করে নিজের হাতখরচা যোগাড় করে নিত, তুরীণের সেই ইচ্ছে থাকলেও মহীতোষ করতে দেননি। আসলে তিতাস যা যা করতো বা করতে ভালোবাসতো মহিতোষ আপ্রাণ চেষ্টা করতেন তুরীন সেটা যেন না করে। তিনি কখনোই চাননি সাদাপাতায় ধাপে ধাপে ফুটে ওঠে পাশাপাশি দুটো অঙ্ক যেন কখনোই একই ফর্মুলা প্রবাহ বয়ে একইরকম উত্তরের দিকে ছুটে না যায়। মহীতোষ তুরিণকে জিমে ভর্তি হতে দেননি, তবে লেখাপড়ার ব্যাপারে কোনওরকম বাধা দেননি। তিতাসও বিজ্ঞানের ছাত্র ছিল, তুরীনও প্রেসিডেন্সি থেকে ফিজিক্সে মাস্টার্স করে অ্যাস্ট্রোফিজিক্স নিয়ে গবেষণা করতে নাসা পাড়ি দিল। তারপর তাকে আর পিছনে তাকাতে হয়নি। এখন সে ওখানেই জুনিয়র সায়েন্টিস্ট হিসেবে কাজ করে। আজকের সাফল্য তার কাজের প্রতি তিতিক্ষা আর দায়বদ্ধতার পুরস্কার। মহীতোষ ছোটবেলা থেকে নাতিকে শিখিয়েছেন, যে কাজটা তুমি করবে ভালোবেসে করবে। যে কাজটা করতে ভালো লাগবে না সে কাজটা করবে না। কোনরকমে দায়সারা ভাবে কাজটা করে কাজের মাহাত্মকে কখনোই ছোট করতে নেই। তুমি ছেড়ে দেবে, দেখবে অন্য কেউ এসে ভালোবেসে নিষ্ঠার সঙ্গে সেই কাজ শেষ করছে।
তিতাস শুনতে পাচ্ছিস জীবনের অন্তহীন কোলাহল? ঘাসের বিছানার নিচে নিশ্চিন্ত শয্যায় শুয়ে একবারও তোর ইচ্ছে করছে না সফল সন্তানের কপালে একটা আশীর্বাদের চুমু খেতে! তুই কি আমার হাতের স্পর্শ অনুভব করতে পারছিস? এই হাত কিছুক্ষণ আগেই তুরীনের মাথা স্পর্শ করেছিল, ওর রেশম সদৃশ চুলের শিরশিরানি এখনও আঙুলের শিরা-ধমনীতে বয়ে যাচ্ছে। তুই অনুভব কর, দ্যাখ এই বৃদ্ধ আঙুলগুলোর মধ্যে তোর ছেলের হৃদস্পন্দন খুঁজে পাবি। এই হাত দিয়ে ধরে তাকে পায়ে পায়ে হাঁটতে শিখিয়েছি, এই হাত দিয়ে তার ছোট্ট ছোট্ট হাত চালিয়ে স্বরবর্ণ, ব্যঞ্জনবর্ণ, ইংরেজি বর্ণমালা শিখিয়েছি। এই হাত এক কিশোর হাতের ভরা পাহারায় নদীর পাড় বরাবর কিংবা পাহাড়ি চড়াই পথে হেঁটে গেছে। আজকাল একটা দীপ্ত বলশালী হাতের পাঞ্জা আমার অশক্ত হাতটাকে শক্ত করে ধরে রাস্তা পারাপার করায়। তুই দেখ, ঠিক টের পাবি! আমার পঁচাত্তরের ঠান্ডা রক্তের মধ্যে উষ্ণ রক্তের যে ফোঁসফোঁসানি, সেটাই তোর ছেলে তুরীন।



“আমারই হাতে এত দিয়েছ সম্ভার
জীর্ণ করে ওকে কোথায় নেবে?
ধ্বংস করে দাও আমাকে ঈশ্বর
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”
মহীতোষ সেই একচিলতে ঘাসের বিছানায় বসে পরম করুণাময় ঈশ্বরের কাছে নিজের মৃত্যুর প্রার্থনা জানাতে জানাতে এক স্বপ্নের মধ্যে ডুবে গেলেন।
বেশ কিছুক্ষণ পর সমস্ত ব্যস্ততা, জটলা কমে এলো, নিভে গেল কৃত্রিম আলো। আবার ছাপোষা বাড়িটাকে নিজের বাড়ি বলে মনে হতে লাগল। ঠিক তখনই তুরীণের দাদুর কথা খেয়ালে এল। মাকে জিজ্ঞাসা করে কোনও উত্তর না পেয়ে পাড়ার মোড়ে গোপালকাকুর চায়ের দোকানে খুঁজে এলো। দাদু মাঝে মাঝে ওখানেও যায়। ওখানে না পেয়ে শেষ জায়গা হিসেবে পিছনের বাগানে গিয়ে পৌঁছল। ঘাসের বিছানায় শেফালী গাছটায় পিঠ দিয়ে বসে আছেন মহামতী বাবর। ডান হাতটা প্রসারিত করে হুমায়ূনের মাথা স্পর্শ করে রাখা। ঘাসের বিছানায় একটা দুটো ঝরে পড়া শেফালী ফুল।

“এই তো জানু পেতে বসেছি, পশ্চিম
আজ বসন্তের শূন্য হাত….
ধ্বংস করে দাও আমাকে যদি চাও
আমার সন্ততি স্বপ্নে থাক।”
সম্রাট আকবরের দুটো চোখ জলে ভরে উঠল।

এই লেখাটি শেয়ার করুন