এই গ্রাম – সেই গ্রাম

আশিক মাহমুদ রিয়াদ  

আমার শৈশবের খুব কম সময়ে কাঁটিয়েছি আমার গ্রামের বাড়িতে। গ্রামের নাম টেংরাখালী। এই গ্রামের নাম টেংরাখালী কেন- সে ব্যাপারে আমার জানাশোনা না থাকলেও আপাতত দৃষ্টিতে ভেবে নিতে পারি একদা এই গ্রামের খালে টেংরা মাছ বেশি পাওয়া যেত বলে এই গ্রামের নাম টেংরাখালী হয়েছে।এই গ্রামটি বাগেরহাট জেলার কচুয়া উপজেলার ০৯ নম্বর ওয়ার্ডের অন্তর্ভুক্ত একটি গ্রাম। 

খুব বেশি সময় এই গ্রামে আমার শৈশব না কাটালেও  যেটুকু সময় এই গ্রামে কাটিয়েছি সেটি ছিল নিঃসন্দেহে প্রানবন্ত এবং সুন্দর একটি সময়। আমি নির্দ্বিধায় বলতে পারি অংকে ফেল করা আর লেখা পড়ায় দূশ্চিন্তার বাইরে আমার এই শৈশব দারুণ ভালো কেটেছে।

 

আব্বুর চাকরীর সুবাদে  সাত বছর বয়সে এই গ্রাম ছাড়তে হয়। তবে মাঝেমধ্যেই আব্বুর ছুটি হলে চলে আসতাম এখানে। গ্রামের দূষণমুক্ত নির্মল বাতাস আর গ্রামের সহজ-সরল মানুষদের দেখলে প্রাণ জুড়িয়ে যায়। জুড়ানোরই কথা- গ্রামের মানুষদের সরলতাতেই মিশে আছে গ্রাম শব্দটি। এখানে সবাই আপন।আর্থিক দিক দিয়ে গ্রামের বেশিরভাগ মানুষই অস্বচ্ছল। তবে তারাই সত্যিকারের জীবন যোদ্ধা। মাঠে কাজ করে তারাই তো এ দেশকে হাসি দেয়। 

এই মানুষগুলোর সহমর্মিতা দেখে আমি দারুণ শান্তি পাই। এদের মুখের দিকে তাকালে শান্তির আবেশ বয়ে যায়।

 

এখানকার শিশুদের মধ্যে দারুণ আবেগ খেলা করে। গাছের পাতায় বৃষ্টির ফোঁটা পড়ার মতো এরা বেড়ে ওঠে খুব অল্প সময়ে। এদেরও কি কল্পনার জগৎ আছে? প্রত্যেকটি শিশুই তার পারিপার্শ্বিকতার সাপেক্ষে নিজেদের একটি জগৎ সৃষ্টি করে নেয়। গ্রামের শিশুরাও এর ব্যতিক্রম নয়। তবে তারা কল্পনার জগতের থেকে বাস্তব জগতে তার থেকে বেশিই সুখি। সারাদিন দৌড় ঝাপ আর খেলাধুলা শেষে দুপুর বেলায় অগভীর খালের পানিতে সাদা হাসের সাথে গোসলে নেমে পড়ে এরা। এখনেও চলে ঝাপাঝাপি। ডুব প্রতিযোগিতা; গাছ কিংবা পুলের উপর থেকে ঝাপ। 

 

[ছবি- খালের টইটম্বুর পানিতে গোসল করে উচ্ছ্বাসিত ছেলেটি। ]

[ছবি- খালের পানিতে সাতার কাটে এরা৷ খেলে ডুব ডুব খেলা। ছোটবেলা থেকেই এরা দারুণ ডানপিটে হয়৷ এদের শৈশব সরলতার আর ডানপিটেপনায় টইটম্বুর।]

 

 

কলাবতীর হাটের নাম শুনেছেন কখনো? ছোটবেলায় বইয়ের পাতায় কলাবতীর হাটের প্রচ্ছদ এবং গল্প পড়ে আমি আমার কল্পনায় আমাদের গ্রামের হাটের স্থান দিয়েছিলাম। বই খুলে বসলেই মাথায় ভেসে আসতো আমাদের গ্রামের হাট আর কলাবতীর হাটের মেলবন্ধনের কথা। সেই লেখক কি আমাদের গ্রামের হাট ঘুরে কলাবতীর হাটের কথা লিখেছিলেন? কে জানে। এই হাটে গ্রামীণ শাক-সবজি,মাছসহ নিত্যপ্রয়োজনীয় সামগ্রী বিক্রি হয়। ছোটবেলায় এই গ্রামের বিশেষ আকর্ষণ ছিল মুড়ি,মুড়কি কিংবা চিড়ার মোয়া অথবা গোলগোল্লা মুখে পুড়ে চক্কর দিতাম পুরো হাটে। তারপর চানাচুর মাখানো খেয়ে যেতাম খেজুরের মিঠার কাছে। সেখানে দাড়ালেই কায়দা করে ফ্রি তে মিঠাওয়ালার কাছ থেকে খেজুরের মিঠার ছোট্ট একটি অংশ পেতাম। ব্যস। তারপর এক দৌড়ে বাড়িতে চলে আসতাম। আমাদে গ্রামের বাড়ি থেকে গ্রামের হাট বেশ খানিকটা দূরে না হলেও শৈশবে সে পথ পেরিয়ে  বাড়ি আসতে সন্ধ্যে হয়ে যেত। অবশ্যি পথমধ্যে দুষ্টমির কারনেই এমন হতো হয়ত৷ 

 

[বিকেলের সূর্য তখন মেঘে আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। নৌকা পার হয়ে ওপারে হাটলাম। জায়গাটির স্থানীয় নাম বাঘমারা। এই বাঘমারা নাম কেন হয়েছে? সেটি  আন্দাজ করা যাক,সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকা হওয়াতে এখানে হয়তো কোন এক কালে কোন এক বাঘ এসে মানুষের উপর আক্রামণ করে। লোকজন সেটিকে পিটিয়ে মারে বলেই হয়ত এখানকার নাম বাঘ মারা। কিংবা……..]

 

অনেকদিন থেকেই ঘরে বন্দী থাকতে থাকতে মন বিষিয়ে উঠেছিলো। একটু মুক্তির সজীব বাতাস নেওয়া দরকার। বুক ভরে শ্বাস নেওয়া,যে বাতাসে কোন দূষণ নেই। তবে সেখানে গিয়েও যান্ত্রিকতা আমাকে পিছনে ছাড়লো না। আমাদের এই প্রজন্মের অস্বীকার করার উপায় নেই আমরা ইতিমধ্যেই ইন্টারনেট দুনিয়ার বেড়াজালে বন্দী হয়ে গিয়েছি। অবশ্য হওয়ারই কথা। এখন সবই তো ডিজিটাল প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল। গ্রামেও পৌছে গেছে এই যান্ত্রিকতা কিংবা ডিজিটালাইজেশন । মানুষ এখন গ্রামেও মুঠোফোনে বন্দী। বন্দী গেমিং এ। দোষের কিছু না৷ আমি কখনোই এগুলোকে দোষের কিছু বলব না। বিশ্বের সাথে দেশ আগাচ্ছে। প্রযুক্তির উপর নির্ভরশীল হচ্ছে শহর-জনপথ। শহরের সুবিধা পৌছে গিয়েছে গ্রামে। তবুও গ্রামের স্বাদ, ভেজা মাটির গন্ধ,পুকুর,খাল-বিলের পানির মিষ্টি গন্ধই বলে দেয়। গ্রাম বরাবরই প্রশান্তির জায়গা। 

[ছবি-গ্রামের হাট জমে উঠেছে৷ তবে শৈশবের সেই হাটের মতো এখন আর মজা পাওয়া যায় না। ]

শেষ বিকেলের রোদ্দুর গায় মাখতে মাখতে যাওয়া হয়েছে নদীর পাড়ে। নদীর নির্মল বাতাস, আর শান্তশিষ্ট বয়ে চলা। এ নদীর নাম বলেশ্বর।  বঙ্গোপসাগর থেকে উত্থান হওয়া খরস্রোতা বলেশ্বর এখানে এসে তার রূপ হারিয়েছে৷ চর পরে নদীটি তার স্রোত হারিয়েছে। এ নদী গিয়ে মিশেছে কালিগঙ্গা নদীর সাথে। 

 

[রোদ গড়ানো শেষ বিকেলে, শান্ত নদীতে সারাদিনের ক্লান্তি শেষে মাঝিও ঝিমিয়ে পড়েছে]

বিকেলের সূর্য তখন মেঘে আড়ালে মুখ লুকিয়েছে। নৌকা পার হয়ে ওপারে হাটলাম। জায়গাটির স্থানীয় নাম বাঘমারা। এই বাঘমারা নাম কেন হয়েছে? সেটি  আন্দাজ করা যাক,সুন্দরবনের পার্শ্ববর্তী এলাকা হওয়াতে এখানে হয়তো কোন এক কালে কোন এক বাঘ এসে মানুষের উপর আক্রামণ করে। লোকজন সেটিকে পিটিয়ে মারে বলেই হয়ত এখানকার নাম বাঘ মারা। কিংবা উল্টোটাও হতে পারে- বাঘ আক্রামণ করার পরে লোকটি মারা যাওয়ার পরে হয়ত এখানকার নাম হয়েছে বাঘমারা।

এই লেখাটি শেয়ার করুন

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *