জোবায়ের রাজুর দু’টি গল্প [আজ রবিবার, পুত্র]

জোবায়ের রাজু

রকি আমার দশ বছরের ছোট। একটাই ভাই আমার। বোন নেই। আমরা মধ্যবিত্ত পরিবারের মানুষ। মেজো মামার বড় মেয়ে লামিয়ার সাথে আমার প্রেমের সম্পর্ক ভেঙে যাওয়ার পর আমি যখন জীবনে আর সংসারিই হবো নাÑএরকম একটি দৃঢ় সংকল্প মনে পুষে রেখে রেখে দুটো বছর পার করেছি, এই দুই বছরে আব্বা আমার জন্যে বহু পাত্রীর সন্ধান এনেছেন আমাকে সংসারি বানাতে। কিন্তু বিয়ে! না না। লামিয়াকে যখন জীবনে পাইনি, অন্য কাউকে বিয়ে করা সম্ভব না কখনো।
একদিন সকাল বেলায় রকি একটি মেয়েকে নিয়ে এসে আব্বা আম্মার সামনে এনে বলল, ‘ওর নাম নাজু। আমরা বিয়ে করেছি।’ কোনোরকম টু শব্দ ছাড়া আব্বা রকির এই বিয়ে মেনে নিলেন।
নাজুকে নিয়ে সংসার হলো রকির। আমাদের মধ্যবিত্ত পরিবার ভালোই চলছিলো যদিও, কিন্তু দিন দিন নাজুর উগ্র আচরণে সংসারে অশান্তি বাড়তে থাকে। নাজু চাচ্ছে রকিকে নিয়ে আলাদা থাকবে। আব্বা সোজা বলে দিলেন, ‘রকি বেকার। তোমাকে নিয়ে আলাদা থাকতে পারবে না। টাকা কোথায় পাবে?’ আমরা দুই ভাই কখনো আব্বার মুখের উপর তর্ক করিনি। কিন্তু নাজু সেদিন আব্বার সাথে তর্ক করে বলল, ‘টাকা পয়সা নিয়ে এতো ভাবতে হবে না। রকিতো আর রোবট নয়। একটা না একটা চাকরি খুঁজে নেবে।’ আব্বা শেষ কথা বলে দিলেন, ‘এই সংসার থেকে কেউ আলাদা হতে পারবে না। ব্যস।’
দিন দিন সংসারে ঝুটঝামেলা বাড়তে থাকে। সাধারণ বিষয় নিয়ে নাজুর সাথে আম্মার বিবাদ লেগে যায়। রকি স্ত্রীর পক্ষ নিয়ে সে বিবাদে জড়ায়। আব্বা নিরবে কাঁদেন। তার সোনার সংসারে অশান্তির বাঁশি বাজছে। নাজুর অনেক দাফট। ওর বাবা ভাইয়েরা সমাজের প্রতিষ্ঠিত মানুষ। ওদের তুলনায় আমরা বেশ গরীব বলে নাজুর ভেতর একটা বড়াই থাকে।
একদিন বাড়িতে রাজমেস্ত্রী এলো নতুন ঘর বানাতে। রকি উঠোনের ডানদিকে ঘর করবে। নাজুকে নিয়ে সেই ঘরে উঠবে। আব্বা নিরবে কাঁদলেন। তিনদিনের মধ্যে নতুন ঘর দাঁড়িয়ে গেল। রকি নাজুকে নিয়ে নতুন ঘরেও উঠে গেল। কিন্তু ঘর করতে এতো টাকা রকি পেলো কোথায়! পরে জানা গেল নাজু তার ভাইদের কাছ থেকে টাকা এনেছে।
একই বাড়িতে থেকেও রকি আলাদা হয়ে গেল। ওর এখন আলাদা ঘর। আলাদা বাজার সদাই। নাজুকে বড় খুশি খুশি দেখায়। যখন তখন সে দুয়ারে এসে গুনগুন সুরে গান গায়।
২.
সেদিন শুক্রবার। সকাল বেলায় রকি এলো আমাদের ঘরে। নতুন জামা কাপড়ে রকিকে বেশ ¯িœগ্ধ দেখাচ্ছে। রকির কাঁধে বিশাল এক ব্যাগ। তরল গলায় আব্বাকে বলল, ‘আমি ঢাকায় যাচ্ছি।’ আব্বা বললেন, ‘হঠাৎ ঢাকায়?’ রকির জবাব, ‘ইয়ে মানে…রবিবার দুপুরে আমার ফ্লাইট।’ আব্বা আকাশ থেকে পড়ে বললেন, ‘তুই বিদেশ যাচ্ছিস! আমরা জানিনা। তুই নিমকহারাম। যা আমার সামনে থেকে চলে যা।’ রকি চলে গেল।
আমরা পরে জেনেছি নাজুর ভাইয়েরা রকিকে কাতারে পাঠাচ্ছে। ভেতরে ভেতরে রকি বিদেশ যাবার সব প্রস্তুতি শেষ করলো। অথচ আমরা জানলাম না।
৩.
আজ রবিবার। সকাল থেকেই আব্বাকে বেশ অস্থির দেখাচ্ছে। বারবার আমাকে বললেন, ‘আজ না রবিবার! একটু রকিকে কল দে।’ আমি রকির নাম্বারে ডায়াল করি। ফোন বন্ধ। আব্বা বললেন, ‘ফোনে পেলে বলিস বিমানে শক্ত করে বসতে। ভয় যেনো না পায়। ছোটবেলায় বাড়ির উপর দিয়ে বিমান গেলে ও ভয়ে কাঁদতো।’ বলতে বলতে আব্বার গলাটা কেঁপে ওঠে।
পড়ন্ত দুপুর। উঠোনে চৈত্রের খাঁ খাঁ রোদ। আব্বা মাদুর পেতে রোদময় উঠোনে বসে গেলেন। আব্বার এই কান্ডে আমি অবাক। এই দুপুরে কেউ মাদুর পেতে উঠোনে বসে! আশ্চর্য!
আব্বা মাদুরে বসে বারবার আকাশের দিকে তাকান। ঘটনা কী! আমাকে ডেকে বললেন, ‘একটু আকাশের দিকে খেয়াল রাখিস তো কোনো বিমান যায় কি না! আজ রবিবার। রকি দুপুরে বিদেশ যাবে।’ বলতে বলতে আব্বা কেঁদে দিলেন। আমার বুকটা ভাঙতে লাগল। পড়ালেখা না জানা আমাদের আব্বা কতই না সহজ সরল।
হঠাৎ আমাদের মাথার ওপর দিয়ে একটি সাদা বিমান উড়ে চলে গেল। আব্বা সে বিমানের দিকে তাকিয়ে অঘোরে কাঁদছেন আর ব্যাকুল হয়ে বলছেনÑআমার ছেলে…আমার ছেলে…!

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী

বেশ কয়েকবার কলবেল বাজার পর দরজা খুলে রেবেকা শ্বশুরকে দেখে অবাক হয়ে গেলো। এই ভরদুপুরে শ্বশুরের আগমন প্রত্যাশা করেনি সে। এবার সহ হাসমত আলী বড় ছেলে হান্নানের এই আজিমপুরের বাসায় মোট চারবার এসেছেন। ফলে চেনা জানা পথে আসতে কোনো অসুবিধা হয়নি।
ড্রয়িংরুমের সোফায় বসা বাবাকে দেখে স্ত্রীর মত অবাক হলো হান্নানও। বাবাকে প্রশ্ন করে, ‘আব্বা, আপনি আসার আগে একবার জানাননি কেনো?’ হাসমত আলীর জবাব, ‘মোবাইলটা চুরি হয়ে গেছে বাবা। তাছাড়া কল কিভাবে করতে হয়, আমরা গাঁয়ের মানুষ কি ওতো বুঝি?’ রেবেকা তাচ্ছিল্যে বলে, ‘গাঁয়ে তো আমার বাবাও থাকেন, আমার বাবা ফেসবুকও ব্যবহার করেন। আসলে আপনি পারেন না, পড়ালেখা নেই তো!’ হাসমত আলী জানতেন এখানে এলে বউমার এসব কুট কথা শুনতে হবে। একবার ভাবলেন আসবেন না। কিন্তু মধুপুর গ্রামের একলা বাড়িতে এখন একা থাকতে ভয় পান তিনি। দুইমাস আগে স্ত্রীকে হারান। মায়ের মৃত্যুর খবর শোনে হাসমত আলীর দুই ছেলে হান্নান আর খালেক শহর থেকে ছুটে আসে। দাফন কাফন শেষে চারদিন পর বাবার হাতে হাজার দশেক টাকা দিয়ে তারা পুণরায় শহরে চলে যায়। স্ত্রীর মৃত্যুর পর বড় একা হয়ে গেলেন হাসমত আলী। সেই একাকীত্ব দূর করতে আজ তিনি এখানে এসেছেন।
দুপুরে ছেলের বাসায় পেট ভরে খেলেন। আহারে, কতদিন পর এসব ভালো খাবার পেটে পড়েছে। খাওয়া শেষে হাসমত আলী বিছানায় গা হেলিয়ে দিলেন। মাথায় উপর ভনভন করে সিলিংফ্যান ঘুরছে। পাশের ঘর থেকে রেবেকার স্পষ্ট কথাগুলি কানে আসছে হাসমত আলীর। রেবেকা অভিযোগের সুরে হান্নানকে বলছে, ‘দেখো, কাল আমার ফেসবুকের দশজন বন্ধু বাসায় আসবে। ওরা সবাই জানে এখানে তুমি আমি ছাড়া আর কেউ থাকে না। ওরা এসে যখন এখানে তোমার বুড়ো গেঁয়ো এই বাপকে দেখবে, তখন আমি মিথ্যাবাদী হয়ে যাবো। প্লিজ কিছু একটা করো।’ হান্নান চাপাকণ্ঠে বলল, ‘আস্তে বলো, বাবা শুনতে পাবেন।’
হাসমত আলী ছেলে আর ছেলের বউর সব কথা শুনলেন আড়াল থেকে। তার এখানে আর থাকতে ইচ্ছে করছে না। তিনি চলে যাবেন ছোট ছেলে খালেকের কাছে। খালেক বউ নিয়ে মিরপুরে থাকে। ওখানেই ব্যবসা করে। বিকেলে কাউকে কিছু না জানিয়ে হাসমত আলী মনে চাপা কষ্ট নিয়ে হান্নানের বাসা থেকে বের হয়ে মিরপুরের দিকে রওনা দেয়।
২.
খালেকের বাসার দরজায় তালা ঝুলছে। কিছু বুঝতে পারছেন না হাসমত আলী। তিনি ক্লান্তিতে হাঁপাচ্ছেন। পথের লম্বা জ্যাম পাড়ি দিয়ে এখানে পৌঁছোতে সন্ধ্যা সাড়ে সাতটা বেজে গেছে। এসে দেখেন ছেলের বাসায় তালা। দারোয়ান কামরুলের কাছে ছেলের কথা জানতে চাইলে কামরুল জানায়, ‘খালেক ভাই তো স্ত্রীকে নিয়ে সাতদিনের জন্যে গতকাল কক্সবাজারে বেড়াতে গেছেন।’
দীর্ঘশ্বাস ছেড়ে রাস্তায় নেমে আসেন হাসমত আলী। কি করবেন ভেবে পাচ্ছেন না। রাস্তার পাশে বসে গেলেন। তার কাছে অস্বস্তি লাগছে। কোথায় যাবেন বুঝতে পারছেন না। এতোবড় এই শহরে যাওয়ার মত তার আর কোনো জায়গা নেই।
একটি রিকশা এসে দাঁড়ায় হাসমত আলীর সামনে। রিকশা থেকে নেমে আসে লম্বা ফর্সা একটি ছেলে। ছেলেটাকে চিনতে পারছেন না তিনি। তবে মুখটা পরিচিত।
-স্যার, আপনি এখানে একা একা কেনো? আমাকে চিনতে পেরেছেন? আমি তোফায়েল।
-কোন তোফায়েল বাবা?
-আপনার গ্রামের রহিম ব্যাপারির ছেলে। ছোটবেলায় আমাকে টানা চার বছর প্রাইভেট পড়িয়েছেন। মনে আছে?
-মনে পড়েছে বাবা।
-তা আপনি এখানে কেনো?
হাসমত আলী তোফায়েলের কাছে সব কিছু বর্ণনা করেন। শোনে তোফায়েল আফসোসের সুরে বলে, ‘খুবই দুঃখজনক। স্যার, আপনি আমার সাথে চলুন। আমি স্ত্রীকে নিয়ে এখানেই থাকি। সামনে আমার বাসা। আপনি আমাদের সাথে থাকবেন। অনেক আগে বাবাকে হারিয়েছি। আজ থেকে আপনি আমার বাবা।’
হাসমত আলী প্রথমে তোফায়েলের আবদারে আপত্তি তোলেন। কিন্তু তোফায়েল তার স্যারকে এখানে একা রেখে যাবেই না। জোর করে রিকশায় উঠায় হাসমত আলীকে।
রিকশা দ্রæত চলছে সামনের দিকে। হাসমত আলী তোফায়েলের দিকে তাকান আর মনে মনে ভাবেন তোফায়েলের মত তার যদি একটি পুত্র থাকতো, তাহলে এতোবড় শহরে আজ তার এই পরিণতি হতো না।

 

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

এই লেখাটি শেয়ার করুন