জোবায়ের রাজুর যৌথগল্প

আকাশ কত দূরে

জিনিয়াদের আলিশান এই রাজমহলের মত বাড়িতে হোসেন সাহেবের সামনে এভাবে বসে থাকতে বড় অস্বস্তি লাগছে জুয়েলের। জিনিয়ার উপর তার বড্ড রাগ হচ্ছে। মেয়েটা বাবার সাথে প্রাণ খুলে কথা বলার জন্যে এভাবে তাকে রেখে ভিতরে চলে যাবে, ভাবতেই পারছে না জুয়েল। মনে মনে সে জিনিয়ার আগমন প্রত্যাশা করছে।
‘তোমার বাবা কি করেন?’ হোসেন সাহেবের নিচু গলার প্রশ্নে জুয়েল ম্লাণ কণ্ঠে বলল ‘আব্বা জমিনে বর্গা দেন। আমাদের বড় বড় দুটি গরুও আছে। ছোট ভাই বাড়ি বাড়ি দুধ দিয়ে আসে।’ জুয়েলের কথা শোনে হোসেন সাহেবের রাগে গা ঘ্যান ঘ্যান করে উঠলো। তার মা মরা মেয়েটা একজন চাষার ছেলের সাথে সম্পর্ক পাতবে, আশা করেননি তিনি। এই ছেলে কখনো জিনিয়ার যোগ্য না। তবে ছেলেটি দেখতে ভালো, বলতেই হবে। কিন্তু রুপ সুরত দিয়ে কি হবে! মেয়েকে তিনি ওই অভাবের সংসারে পাঠাবেন না। ইমরানই হচ্ছে জিনিয়ার উপযুক্ত।
-ঢাকা শহরে তোমাদের কয়টা বাড়ি আছে?
-নেই।
-গ্রামে জমি জমা কেমন?
-তেমন নেই। তবে মা জন্মসূত্রে নানা বাড়ির কিছু সম্পত্তি পাবেন।
রাগে হোসেন সাহেবের গা আবারও ঘ্যান ঘ্যান করে উঠলো। কি দেখে মেয়ে তার এই ছেলের জন্য পাগল হয়! না, তিনি বন্ধুর ছেলে ইমরানের সাথেই জিনিয়ার বিয়ে দিবেন।
-তুমি আমার কিছু কথা রাখবে?
-বলুন আংকেল।
-জিনিয়ার জীবন থেকে তুমি সরে যাও। তুমি জিনিয়ার যোগ্য নও। আবেগে আমার মেয়ে ভুল করতে পারলেও আমি তো পারি না। সন্তান ভুল করলে বাবারা তা শুদ্ধ করে দেয়। আমার মা মরা মেয়ে তোমাদের অভাবের সংসারে কখনো সুখি হবে না। ছোটবেলা থেকে সে আয়েসে বড় হয়েছে।
-ইয়ে মানে আংকেল…।
-আমার বন্ধুর ছেলে ইমরানের সাথে আগামি মাসে জিনিয়ার বিয়ে ফাইনাল করবো। তোমাকে একটা খারাপ কাজ করতে হবে।
-খারাপ কাজ?
-হ্যাঁ। তুমি জিনিয়াকে বলবে তার সাথে ভালোবাসার অভিনয় করেছো।
জুয়েলের মাথায় যেনো বাজ পড়ে। এমন পরিস্থিতি তার কাম্য ছিল না। জিনিয়ার অনুরোধেই সে আজ এখানে এসেছে। বাবা নাকি তার পছন্দের ছেলেকে দেখতে চেয়েছেন। কিন্তু হোসেন সাহেবকে তাকে রীতিমত অপমান করেছেন।
-তুমি এখান থেকে চলে যাও। জিনিয়া এসে যেনো তোমাকে না দেখে।
-আমি কি জিনিয়ার সাথে একটু কথা বলতে পারি?
-নো। আমি চাই তুমি এখনই বিদায় হও। জিনিয়া জানবে তুমি তার সাথে প্রেমের অভিনয় করেছো।

২.
একেলা পথে হাঁটছে জুয়েল। জিনিয়ার বাবা তাকে অপমান করেছেন সুক্ষ্নভাবে। কঠিন বাস্তবতা জুয়েলের সামনে এসে দাঁড়ালো। বড়লোকের এই মেয়ে আসলেই তার যোগ্য নয়। এই সমাজে ধনী গরীবের আলাদা আলাদা ভাগ আছে।
জুয়েলের ফোনে কল আসে জিনিয়ার। রিসিভ করতে ইচ্ছে করছে না। লাইন কেটে যায়। জিনিয়া আবার ব্যাক করে। রিসিভ করে জুয়েল।
-টে ভর্তি নাস্তা নিয়ে এসে দেখি তুমি নেই। অভদ্রের মত চলে গেলে কেনো?
-ভালো লাগছিল না।
-তাই বলে এভাবে না বলে চলে যাবে? তুমি একটা খারাপ ছেলে।
-আর কিছু বলবে?
-বলবো।
-বলো?
-আমি এই খারাপ ছেলেকে ছাড়া বাঁচবো না। হা হা হা।
ওপার থেকে জিনিয়ার বাঁধ ভাঙা হাসি জুয়েলের কানে বাজছে। এই মেয়ের সাথে একটা খারাপ কাজ করতে হবে। বলতে হবে সে এতোদিন যা করেছে, সব মিথ্যে অভিনয়।
হু হু করে এক ফালি মাতাল বাতাস বয়ে গেল। ভিজে আসা চোখে আকাশের দিকে তাকায় জুয়েল। আকাশে এক টুকরো নীল মেঘ। বড় ভালো লাগছে। ছুঁয়ে দেখতে ইচ্ছে করছে ওই নীল মেঘ। কিন্তু জুয়েল সেটা কখনোই ছুঁতে পারবে না। আকাশ যে কত দূরে। তাকে ছোঁয়া যায় না।

দিপ নিভে নাই

ইয়াসমিন এক পলক তাকিয়েই বুঝতে পারলো আজ বৃষ্টির মন ভালো নেই। বৃষ্টিকে এমন দেখাচ্ছে কেন! সদা হাস্যজ্জ্বল মুখখানা আজ অন্যরকম। তাছাড়া এই অবেলায় বৃষ্টি এখানেও বা কেন?
ইয়াসমিনের দিকে তাকিয়ে বৃষ্টি ম্লাণ কণ্ঠে বলল ‘তুষার কোথায়? বাসায় আছে?’ সামনে আসা চুলগুলি সরাতে সরাতে ইয়াসমিন বলল ‘না বাসায় নেই। টিউশনি থেকে এখনো ফিরেনি।’ ঘরের দিকে উঁকি দিয়ে বৃষ্টি বলল ‘ ও আসলে বলবেন আমাকে ভুলে যেতে।’ বৃষ্টির কথায় ইয়াসমিন আকাশ থেকে পড়লো।
-মজা করছো বুঝি?
-না আপা। মজা নয়। কিসের মজা! আপনার ভাই আমার যোগ্য নয়।
-কী বলছো তুমি?
-ঠিকই বলছি। কী আছে তুষারের! বিয়ে করে আমাকে খাওয়াবে কী! টানা দু বছর ওর সাথে আমার সম্পর্ক। এই দু বছরে আপনাদের নিত্য অভাব আর টানাপোঁড়নের গল্প শুনতে শুনতে আমি ক্লান্ত। এখানে এসে অভাবের সাথে আমার দিন শুরু করতে হবে। অনেক ভেবে চিন্তে সিদ্ধান্ত নিয়েছি আমি তুষারের জীবন থেকে সরে আসবো।
-কিন্তু তুমি কী তুষারের কথা একবারও ভাববে না! ও তোমাকে জীবন দিয়ে ভালোবাসে।
-স্যরি আপা। ওসব আবেগ দিয়ে জীবন চলে না। অভাব যখন আঁকড়ে ধরবে, ওসব ভালোবাসার আর মূল্য থাকবে না। তুষারের মত সুদর্শন ছেলেকে ভালোবেসেছি সত্য, কিন্তু বিয়ের পর সে আমাকে কতখানি বা আর সুখি করতে পারবে! আপনার মত বিধবা বোন ছাড়া ওর আর কী আছে! যাই হোক, এসব বলতে চাই না। তুষার এলে বলবেন আগামী শুক্রবার আমার বিয়ে। সাব্বির ইংল্যান্ড প্রবাসি। আমাকেও সেখানে নিয়ে যাবে। সব কিছু বিবেচনা করে সিদ্ধান্ত নিয়েছি সাব্বিরই আমার উপযুক্ত। তুষার নয়।
আর কোনো কথা না বলে বৃষ্টি হন হন করে চলে গেল। চোখে জল চলে এলো ইয়াসমিনের। এ কি করেছে বৃষ্টি! যে মেয়ে তুষারকে এতটা ভালোবেসেছে, সে মেয়ে আজ হঠাৎ এভাবে…! তুষারও বা ব্যাপারটি কিভাবে গ্রহণ করবে! বৃষ্টি নামের বড় লোকের এই মেয়েকে ভালোবেসে তুষার শেষ পর্যন্ত ভুল করেছে!
সন্ধ্যার আগে বাসায় আসে তুষার। বোনকে আজ বিষন্ন দেখাচ্ছে।
-কিরে আপা, মন খারাপ?
-না।
-এভাবে মুখ গোমড়া কেন?
-এমনি।
-একটু হাস।
ইয়াসমিন মরা হাসি দিয়ে তাকায় তুষারের দিকে। ভাইকে সে কিভাবে বলবে বৃষ্টির কথা! তুষার সহ্য করতে পারবে না। মা বাবাহীণ এই সংসারের সব দায়িত্ব তুষারের উপর। অকাল বিধবা বোনটাকে নিয়েই তার জীবন। সে জীবনে বৃষ্টি ছিল। আজ নেই। তুষার এখনও জানে না বৃষ্টি আজ কী সত্যটাই না জানিয়ে গেল।
রাতে তুষার ফেসবুকে ঢুকতেই আজ সকালে আপলোড করা তার মুখের খোঁচা খোঁচা দাঁড়িওয়ালা ছবিটাতে এক মেয়ে কমেন্ট করেছে-‘আপনি শেইভ করেন না কেনো? বান্দরের মত লাগছে।’ কমেন্টটি পড়ে আয়নার সামনে দাঁড়ায় তুষার। পেছন থেকে ভায়ের পাশে এসে দাঁড়ায় ইয়াসমিন।
-আপা, আমাকে কী এই দাঁড়িতে বান্দরের মত লাগছে?
-না। শেইভ করিস না কেনো?
-করবো না আপা। বৃষ্টি বলেছে আমাকে নাকি এই দাঁড়িতে ওর বড় ভালো লাগে। তাই শেইভ করছি না। বৃষ্টি যেদিন বলবে এই খোঁচা দাঁড়িতে আমাকে খারাপ লাগছে, সেদিনই শেইভ করবো। হা হা হা।
তুষার উচ্চস্বরে হাসতে থাকে। ইয়াসমিন মনে মনে বলল ‘বৃষ্টি তোকে সেটা কোনদিনও আর বলবে না ভাই। বৃষ্টি তোর জীবন থেকে চলে গেছে। তার জন্যে বুকের ভেতরে যে প্রদিপ জ্বেলেছিস, সেটা নিভে গেছে।’ ইয়াসমিন এসব কথা ভাবছে আর তার বুকের ভেতরটা খাঁ খাঁ করছে।

 

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী।

এই লেখাটি শেয়ার করুন