বই পর্যালোচনা-রেড হেয়ারড উওম্যান | গৌতম সরকার

বইয়ের নাম: রেড- হেয়ারড উওম্যান

লেখক: অরহান পামুক 

তুর্কি ভাষা থেকে অনুবাদ: একিন ওকল্যাপ

প্রকাশক: পেঙ্গুইন

বই পর্যালোচনায়- ডঃ গৌতম সরকার

 

” Oedipus, the murderer of his father, the husband of his mother, Oedipus , the interpreter of the riddle of the Sphinx! What does the mysterious triad of these deeds of destiny tell us? There is a primitive popular belief, especially in Persia, that a wise magician can be born only of incest.” 

— Nietzsche, The Birth of Tragedy.

 

খুব ভালো একটা বই পড়লাম….মনটা ভরে গেলো- Orhan Pamuk – র ” The Red-haired Woman “.

এই লেখকের ক্লাসিক সম্ভারের বেশ কয়েকটি বই পড়ার সৌভাগ্য হয়েছে, সেই তুল্যমূল্য বিচারে এই বইটি আমার পছন্দের তালিকায় ‘My Name is Red’ এবং ‘Snow’- এর পরেই থাকবে ।

তুরস্কের এক ছোট্ট শহর ইস্তানবুলের প্রেক্ষাপটে এক welldigger আর তার এক সতেরো বছরের apprentice কে নিয়ে এই কাহিনী। ঘটনার গতি-প্রকৃতি অন্বেষণে বহু চরিত্র বিভিন্ন সময়সীমায় উপস্থিত হয়েছে, কিন্তু কখনোই কোনো চরিত্র এই দুই কেন্দ্রীয় চরিত্রকে ছাপিয়ে যেতে পারেনি। গল্প শুরু হয়েছে ইস্তানবুলের পাথুরে মাটিতে কুয়ো খোঁড়ার মধ্যে দিয়ে, গল্পের যবনিকা পাতেও এই কুয়ো মুখ্য ভূমিকা পালন করেছে । তাই পাঠককে গল্প শেষে সন্দিগ্ধ হতেই হয় –উপন্যাসের মূল চরিত্র কে ! –গল্প শুরুর সেই সতেরো বছরের ছেলেটি, না তার মাস্টার মেহমুত , না সেই কুয়োটি ; যে কুয়ো যুগ যুগ ধরে রুক্ষ তুর্কিস্তানে করুনাধারার কাজ করে এসেছে ।

     

[  মেহমুত আর সেলিকের সম্পর্কের রসায়ন ইঞ্চি ইঞ্চি কুয়ো খননের মধ্যে দিয়ে গভীর থেকে গভীরতর…..প্রত্যাশার দিকে এগোতে থাকে। পাথরের স্তর ভেঙে বেরিয়ে আসে বালি, বালির পর ধূসর কালো মাটি, তারপর কিছুটা কাদা মাটি, জলের প্রত্যাশা জাগায়…….; এক প্রৌঢ় সন্তানস্নেহের স্বাদ পেতে থাকে, এক অযত্নে বেড়ে ওঠা মিডল স্কুলের বাচ্ছা বহু কাঙ্খিত পিতৃস্নেহের স্নিগধ স্পর্শ অনুভব করে আর ওদিকে স্বপ্নে- জাগরণে লাল কেশবতী কন্যার ছন্দে হেঁটে চলা যেন অ-পামুকচিত মিলনমুগধ এক সমাপ্তির দিকে নিয়ে চলে। পামুক পড়তে অভ্যস্ত মানুষদের স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের তালে তালে এই নিশ্চিত শেষ পথটা হাঁটতে ভালো লাগলেও কপালে একটা হালকা ভাঁজ থেকেই যায়…….. ]

 

এটি লেখকের দশম উপন্যাস, আদ্যন্ত পিতা-পুত্রের সম্পর্ক নিয়ে বর্ণিত এক আখ্যান, যদিও রক্তের সম্পর্কে তারা বাবা-ছেলে নয়। উপন্যাসের সতেরো বছরের ছেলেটি ইস্তানবুলের এক বামপন্থী ফার্মাসিস্টের ছেলে। রাজনৈতিক কারণে বাবার দীর্ঘ অনুপস্থিতিতির সময়ে কাকার ফলের বাগান নজরদারির কাজ ছেড়ে ইস্তানবুল শহর থেকে তিরিশ কিলোমিটার দূরে এক মধ্যবয়স্ক কুয়োখনকের সহকারীর কাজ নিয়ে চলে এসেছে। প্রাথমিকভাবে এই দুই অসমবয়সী চরিত্রের মধ্যে বিভিন্নধরণের আচরণগত এবং ভাবগত পার্থক্য থাকলেও ইস্তানবুলের রসকষহীন পাথুরে মাটি খুঁড়তে খুঁড়তে উভয়েই পরস্পরের মধ্যে এক নির্ভরতা খুঁজে পায়। বাবার রাজনৈতিক জীবন এবং দীর্ঘ অনুপস্থিতির কারণে ‘সেম সেলিকে’র যেমন পিতাপুত্রের সম্পর্ক সম্বন্ধে সঠিক ধারণা ছিলনা ; তেমনি পঞ্চাশোর্ধ অবিবাহিত মেহমুত অপত্য স্নেহ কাকে বলে আগে জানতোনা। কাজ থেকে ফিরে সন্ধ্যাবেলা তাদের অস্থায়ী আস্তানায় বসে গল্পের মধ্যে দিয়ে দুজনে দুজনকে আলাদা আলাদা জগতের সন্ধান দিত। আবার কখনোও কখনোও কাজের জায়গা থেকে কয়েক কিলোমিটার হেঁটে তারা পৌঁছত স্থানীয় এক বাজারে, সেখানে কফিহাউসে কফি পান করতে করতে পরস্পরের কাছে নিজেদের জীবনের সুখ দুঃখের গল্প করতো। এখানেই সেলিকের সাথে দেখা হয়ে যায় লালকেশবতী মহিলার । এই লাল চুলের মহিলা এক ভ্রাম্যমাণ থিয়েটার কোম্পানিতে কাজ করে। পামুক তাঁর অদ্ভুত দক্ষতায় এই মহিলাকে উপন্যাসের অনেকটা অংশ জুড়ে এক ধোঁয়ামাখা প্রেক্ষিতে ভাসিয়ে রেখে গেছেন…….কখনো কখনো সেই নারী আলোআঁধারী রাজপথে পিছন ফিরে সেলিককে এক মিষ্টি হাঁসির বিদ্যুতে আশ্বাস সংকেত পাঠায় আবার কখনোবা কুয়াশা-কুহেলিকায় দেখা দিয়েও ভীষণ অজানা কোনো পথ ধরে কোথায় যেন মিলিয়ে যায়।

 

” As a fatherless son, so a sonless father will be embraced by none.”

—Ferdowsi, Shahnameh.

 

 মেহমুত আর সেলিকের সম্পর্কের রসায়ন ইঞ্চি ইঞ্চি কুয়ো খননের মধ্যে দিয়ে গভীর থেকে গভীরতর…..প্রত্যাশার দিকে এগোতে থাকে। পাথরের স্তর ভেঙে বেরিয়ে আসে বালি, বালির পর ধূসর কালো মাটি, তারপর কিছুটা কাদা মাটি, জলের প্রত্যাশা জাগায়…….; এক প্রৌঢ় সন্তানস্নেহের স্বাদ পেতে থাকে, এক অযত্নে বেড়ে ওঠা মিডল স্কুলের বাচ্ছা বহু কাঙ্খিত পিতৃস্নেহের স্নিগধ স্পর্শ অনুভব করে আর ওদিকে স্বপ্নে- জাগরণে লাল কেশবতী কন্যার ছন্দে হেঁটে চলা যেন অ-পামুকচিত মিলনমুগধ এক সমাপ্তির দিকে নিয়ে চলে। পামুক পড়তে অভ্যস্ত মানুষদের স্বাভাবিক নিঃশ্বাসের তালে তালে এই নিশ্চিত শেষ পথটা হাঁটতে ভালো লাগলেও কপালে একটা হালকা ভাঁজ থেকেই যায় , আর সেই ভাঁজ যে কতটা সত্যি তা গল্পের শেষের পামুকচিত ট্যুইস্টটায় সম্যক প্রতীতি হয় । তখন পাঠকের বোধগম্য হয়, হ্যাঁ ‘পামুক আছে পামুকেই’, এই উপন্যাসেও কোথাও কোনো বিচ্যুতি ঘটেনি ।

 

[বই পর্যালোচক- ড. গৌতম সরকার ]

 

ইতিহাসের সরণি বেয়ে ….বর্তমান….আর বর্তমানের হাত ধরে অজানা…..অপেক্ষার ভবিষ্যৎ । ইতিহাস কিন্তু বিভিন্ন মানুষকে বিভিন্ন ভাবে বিদ্ধ করে—যারা ইতিহাস নিয়ে বাঁচে, ভালোবাসে, হাঁসে…. আবার সময়ে সময়ে কাঁদেও…. তাদেরকে কখনো কখনো ভুত-ভবিষ্যৎ মিলেমিশে ….. ইতিহাসের সরণি বেয়ে হাঁটতে শেখায়। তখন ইতিহাস হয় এদের দৈনন্দিন বিনোদন, যন্ত্রনা, আক্ষেপ, আভোগ, ঈর্ষা, ত্যাগ আর সান্ত্বনা।

এইভাবে ধীরে ধীরে ইতিহাস হয়ে ওঠে বর্তমান…. আর বর্তমান ক্রমশঃ বিলীন হয়ে যায় ইতিহাসে। যখন চরিত্ররা সময়ের সার্বিক দিশা হারায় ….তখন তারা সবকিছুকে ধাক্কা দেয়, ধাক্কা খায়, মাধ্যাকর্ষনের প্রয়োগ টানে অতীত-ভবিষ্যতের অনুবর্তী পথের দিশা হারায়। তাই যেমন কোনো সময় সে নিজেকে কোনো চরিত্রের ভাগীদার করে, তেমনি বহু চরিত্র তাকে খণ্ড-বিখন্ড করতেও সমান সাবলীল। আসলে উপন্যাসের মূল চরিত্র সারা জীবন ধরে ‘ন্যায় আর সততার’ অর্থই খুঁজে গেল—অনেকটা খ্যাপা খুঁজে ফেরে পরশ পাথরের মতন।

ইতিহাস কিন্তু বড় বেশি ছোঁয়াচে…. কি এক কুয়াশামাখা স্বপ্ন ঘোরে ‘অতীত-বর্তমান-ভবিষ্যতের’  স্বপ্নলোকের চাবির সন্ধানে নিজেকে মিশিয়ে দেয় মাটির সাথে। যে মাটিকে প্রণতি জানিয়ে আপনাকে কবুল করতেই হবে সত্যের সত্যিকারের কাঠামোকে। তারপর শুধুই শূন্যতা, ভার বহনের কোনো ভার থাকবেনা ; নিয়তিই নিয়ে যাবে যেখানে যাবার। তাই গল্পের শেষে লেখক সেই লাল কেশবতী কন্যার ভাষ্যে এতক্ষণকার গল্পের শক্ত বাঁধনের সূতা হালকা করে ছাড়তে চেয়েছেন, ঘটে যাওয়া অনেক অন্ধকার ঘটনার ওপর কৃত্রিম আলোর ঝলক ফেলে দ্রাঘা কমাতে চেয়েছেন, কিন্তু পেরেছেন কি ! গল্পের মূল চরিত্র কুয়োটি যেন লেখককে বুড়ো আঙুল প্রদর্শন করে উপহাস করেছে, আর গভীর থেকে উঠে আসা মন্দ্রিত ধ্বনিতে বলে উঠেছে–মানব বিজ্ঞান এখনো কোনো আলোক দিশারীর সন্ধান করতে পারেনি যে কুয়োর মধ্যেকার সব অন্ধকারকে চিনে নিতে পারবে । তাই প্রৌঢ় বয়সে সেম সেলিককে আবার সেই জায়গায় ফিরে আসতে হয় ; কিন্তু কিসের খোঁজে ! নিজের কৃতকর্মের প্রায়শ্চিত্ত করতে ! কিসের প্রায়শ্চিত্ত ! যে পাপ জীবনে সব দিক থেকে প্রতিষ্ঠিত হওয়া সত্ত্বেও তাকে কখনোও স্বস্তি দেয়নি, তাই ! নাকি সেই লোহিত-রক্ত নারীর নিশিডাক এখনো তাকে শহরতলীর পথ- বিপথ থেকে ডাক পাঠায় !

 

” Oedipus: Where would a trace of this old crime be found? 

– Sophocles, Oedipus the King.

 

বইপ্রেমীদের কাছে অনুরোধ বইটা পড়ুন।

                     

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *