বনলতা সেন  : কবিতাচূড়ামণি

 সুজিত রেজ

বহুপঠিত , বহুচর্চিত , বহুকূটভাষিত , বহুবিতর্কিত , বহুফলিত , বহুনন্দিত  কবিতা জীবনানন্দের ‘ বনলতা সেন ‘ পুনর্পর্যালোচনার ইচ্ছাবেগ হাঁড়িকাঠে গলা সেঁদিয়ে আত্মহত্যাপ্রবণ মানসিকতারই পরিচয়। এবং তা বাস্তবায়িত হলে , জানি বন্ধু জানি , আমার হৃদয় শকুন ও শেয়ালের খাদ্যেই পরিণত হবে। ধরাজীবনে বাদুড় ও ছুঁচোর কামড় তো কম খেলাম না , ছিন্নভিন্ন হয়ে গেছে শরীরের চালচিত্তির ; এমনকি বিষ্ঠা-বিচ্ছুরণে নাসিকাগহ্বর মজা হাইড্র্যান্টের মতো চলৎশক্তিহীন। বাকি আছে শুধু  থুথু উদ্গীরণের , করোনার ভয় যে বড়। ভয় জয় করেই বলি , ইতিহাস – ভূগোল-রূপকথা-লোককথা-প্রকৃতির নানাবিধ উপকরণের সমন্বয়ে  , উপমা-চিত্রকল্পের ঐশ্বর্য ও সঙ্গীতধর্মিতায় জীবনানন্দের ‘ বনলতা সেন ‘ বাংলা ভাষার শুধু নয় , বিশ্বসাহিত্যের অন্যতম গুরুত্বপূর্ণ মৌলিক কবিতা। ” উপলব্ধির আগেই ভালো কবিতার সঙ্গে চেতনার সংযোগ স্থাপিত হয় ” ( টি এস এলিয়ট ), বনলতা সেন তেমনই একটি কবিতা।

‘ বনলতা সেন ‘ কাব্যগ্রন্থের (১৯৪২ ) নামকবিতা ‘ বনলতা সেন ‘  বুদ্ধদেব বসুর ‘ কবিতা ‘ পত্রিকার দ্বিতীয় সংখ্যায় ( পৌষ, ১৯৩৫ ) প্রথম প্রকাশিত হয়। ২০২ রাসবিহারী এভিনিউ , কলকাতা , কবিতা ভবন থেকে , বুদ্ধদেব বসুর তত্ত্বাবধানে , এক পয়সায় একটি গ্রন্থমালার দ্বিতীয় বই ‘ বনলতা সেন ‘ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশিত হয়  ১৯৪২ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বর মাসে। ডিমাই সাইজের ষোল পাতার বই। দাম চার  আনা। প্রকাশক জীবনানন্দ নিজেই। বিশেষ দ্রষ্টব্য , বইটি কারও উদ্দেশে উৎসর্গীকৃত নয়।  ‘ কালের পুতুল ‘ গ্রন্থে এই চটি বইটি নিয়ে বুদ্ধদেব লিখেছেন  : ” যদিও চার আনা দামের বই এবং এগারটি মাত্র কবিতা আছে , তবু এটি আমাদের বিশেষভাবে আলোচ্য।” কবিবন্ধু সঞ্জয় ভট্টাচার্য  ‘ কবি জীবনানন্দ দাশ ‘ গ্রন্থে জানিয়েছেন  : ” জীবনানন্দের ষোলটা কবিতা নিয়ে —- এক পয়সায় একটি সিরিজের পুস্তিকা বেরোয় বনলতা সেন নামে বুদ্ধদেব বসুর কবিতা ভবন থেকে।” প্রকৃতপক্ষে কবিতা ছিল বারোটা : বনলতা সেন , কুড়ি বছর পরে , ঘাস , হাওয়ার রাত , আমি যদি হতাম , হায় চিল , বুনো হাঁস , শঙ্খমালা , নগ্ন নির্জন হাত , শিকার , হরিণেরা , বিড়াল। বইটির প্রতি জীবনানন্দের গভীর অনুরাগ ছিল বলা যায় না। কারণ , ১৯৪৪ খ্রিস্টাব্দে কবি ‘ মহাপৃথিবী ‘ কাব্যগ্রন্থ প্রকাশ করেন। প্রেমেন্দ্র মিত্র ও সঞ্জয় ভট্টাচার্যকে উৎসর্গীকৃত এই কাব্যে ‘ বনলতা সেন ‘- এর বারোটি কবিতা ছাড়াও আরও তেইশটি নতুন কবিতা সংযোজিত হয়। বর্তমানে ‘ বনলতা সেন ‘ নামে যে- কাব্যগ্রন্থ প্রচলিত আছে , তার প্রকাশকাল ১৯৫২ খ্রিস্টাব্দ। এটি সিগনেট সংস্করণ। প্রকাশক কর্ণধার দিলীপকুমার গুপ্ত। কবিতা ভবন থেকে প্রকাশিত ‘ বনলতা সেন ‘-এর বারোটি কবিতা ছাড়াও , ‘ মহাপৃথিবী ‘-র দুটি এবং আরও ষোলটি নতুন কবিতা বইটিতে অন্তর্ভুক্ত হয়।

রবীন্দ্রনাথ স্বপ্নলোকে ” দূরে বহুদূরে উজ্জয়িনীপুরে শিপ্রা নদীতীরে পূর্বজনমের প্রথম প্রিয়ারে ” অনুসন্ধানে ব্যাপৃত থেকেছেন।’ বনলতা সেন ‘ কবিতার কথক ‘ আমি ‘  চির-সাধনার , চির-কামনার ধন অনন্ত প্রিয়ার নিবিড় সান্নিধ্য লাভের প্রত্যাশায় , পৃথিবীর পথে পরিভ্রমণে হাজার বছর অতিবাহিত করেছেন।    ” হাজার বছর ধরে আমি পথ হাঁটিতেছি পৃথিবীর পথে “-র মধ্যে লজিক নেই , এই পথ হাঁটা মগ্নচৈতন্যেই সম্ভব। এই ‘ আমি ‘ বিশেষ কোনও ব্যক্তি নন। তিনি প্রতিটি নিঃসঙ্গ মানুষের প্রতিনিধি। শূন্যতা , বিষাদ , ক্লান্তি বহন করে খুঁজে চলেছেন প্রেমের পরশপাথর।   সিংহল সমুদ্র , মালয় সাগর , বিম্বিসার অশোকের ধূসর জগৎ , বিদর্ভ নগরের দূর অন্ধকার ঘুরে , অদূরের নাটোরে ‘ আমি ‘ কাঙ্ক্ষিতা দয়িতা বনলতার দেখা পেয়েছেন। এবং তার কাছেই  ক্লান্ত প্রাণ দুদণ্ড শান্তি পেয়েছে। ‘ পৃথিবীর পথে ‘ জীবনানন্দের প্রিয় শব্দবন্ধ। ‘ রূপসী বাংলা ‘ কাব্যগ্রন্থের ‘ পৃথিবীর পথে আমি ‘ সনেটে তার পুনরাগমন :
” পৃথিবীর পথে আমি বহুদিন বাস করে
হৃদয়ের নরম কাতর
অনেক নিভৃত কথা জানিয়াছি ;
পৃথিবীতে আমি বহুদিন
কাটায়েছি ; বনে-বনে ডালপালা
উড়িতেছে—যেন পরি জিন
কথা কয় ; ধূসর সন্ধ্যায় আমি
ইহাদের শরীরের পর
খইয়ের ধানের মতো আমি
দেখিয়াছি ঝরে ঝরঝর। ”
‘ হাজার বছর ‘-ও কবির প্রিয় সংখ্যা। হয়ত অসীমতা , অনির্দিষ্ট বা আলোকবর্ষের দ্যোতনা ব্যঞ্জিত করতে ‘ হাজার ‘ কবির মুদ্রাদোষ যেমন অন্ধকার কিংবা নক্ষত্র  :
” হাজার বছর শুধু খেলা করে
অন্ধকারে জোনাকির মতো
চারিদিকে চিরদিন রাত্রির নিধান ;”
( হাজার বছর শুধু খেলা করে )
কিংবা  :
” যেন সব অন্ধকার সমুদ্রের ক্লান্ত নাবিকেরা
মক্ষিকার গুঞ্জনের মতো এক বিহ্বল বাতাসে
ভূমধ্যকালীন দূর এক সভ্যতার থেকে
আজকের নব সভ্যতায় ফিরে আসে। ”
(     সুরঞ্জনা  )

‘ বনলতা সেন ‘ কবিতায় কবি ‘ নগ্ন নির্জন হাত ‘- এর মতো কোনও বিলুপ্ত নগরীর কথা বলতে চাননি। সিংহল-মালয়-বিদর্ভ চির শাশ্বত স্থান , বৌদ্ধ অনুষঙ্গ বিজড়িত , যা কোনদিনই বিলুপ্ত নগরীতে পরিণত হবে না।।  সময়চেতনায় সময়হীনতার বিপন্নতায় হাজার বছরের পথ পরিভ্রমণ করে নাটোরের এক মানবীর কাছে কবি আশ্রয় পেয়েছেন। সেন পদবী যুক্ত হওয়ায় বনলতা রবীন্দ্রনাথের পূরবী-মহুয়া থেকে আলাদা হয়ে গেছে। বৈষ্ণব পাট সংযুক্ত নাটোরের ঠিকানায় প্রেম গভীরতা লাভ করেছে। নাটোরের বনলতার কাছে কবি দুদণ্ড শান্তি পেয়েছেন। প্রেমে চিরন্তন শান্তি নেই। এই অতৃপ্তিই মানুষকে চিরঅন্বেষী করেছে। কবির কর্ণকুহরে ফিসফিস করে কথা কয় আদিগন্ত বর্ণমালাময় জীবনের সমুদ্রসফেন। ব্যস্ত-ত্র্যস্ত সময়-কুহেলিকার ‘ হোক কলরব ‘। এ পাথুরে চোরাস্রোতের মাঝখানে কবিচিত্তে অগাধ—-  গভীর ভেসে চলার প্রশান্তি যদিও তা অলীক কুহক। তবুও—-

তাদের স্মরণ করো , আর দেখো জানলায়
কেমন শব্দ হয়  ঝড়
কেমন বৃষ্টি পড়লে আশ্চর্য সোঁদা গন্ধে
ভরে যায় বাতাস।      এর নাম জীবন , একে প্রণাম করো সময় পেলে।

প্রথম স্তবকে পরিব্রাজকের নির্ঘণ্টের সমাপ্তি। পরের স্তবকে বনলতা সেনের রূপবর্ণনা। রূপ নিয়ে সে দূরে চলে যায়নি , কাছেই এসেছে। নায়িকার চুল বিদিশার নিশার সঙ্গে উপমিত হওয়ায় কালিদাসীয় ঐতিহ্য পরিব্যাপ্ত হয়েছে। ক্রমাগত আর ধ্বনির অনুপ্রাস-অভিঘাত কেশমালার দৈর্ঘ্য ও প্রাচুর্যের অনুভূতি সঞ্চারিত করে। খোলা চুল যৌনতার আবহও তৈরি করে।  একইসঙ্গে বর্তমান জীবনের ক্লান্তি ও নৈরাশ্যও জাগায়। যার প্রতিক্রিয়ায় বনলতা সেনের কাছে কবির আশ্রয় চাওয়া-পাওয়ার আকুতি ঘন হয়ে ওঠে। শ্রাবস্তীর কারুকার্যের সঙ্গে মুখের তুলনায় বৌদ্ধস্তূপের স্থাপত্য-ভাস্কর্যের পরিমণ্ডল ব্যাপ্ত হয়ে ওঠে।

প্রাজ্ঞ সমালোচকদের অনেকেই বনলতা সেনের রূপবর্ণনায় আমেরিকান কবি এডগার অ্যালান পো-এর ‘ To Hellen ‘ কবিতার সাদৃশ্য দেখেছেন  :

To Helen

Helen, thy beauty is to me
Like those Nicéan barks of yore,
That gently, o’er a perfumed sea,
The weary, way-worn wanderer bore
To his own native shore.

On desperate seas long wont to roam,
Thy hyacinth hair, thy classic face,
Thy Naiad airs have brought me home
To the glory that was Greece,
And the grandeur that was Rome.

Lo! in yon brilliant window-niche
How statue-like I see thee stand,
The agate lamp within thy hand!
Ah, Psyche, from the regions which
Are Holy-Land!

দুটি কবিতার মধ্যে অনুরূপতা লক্ষণীয়। বিশেষত  ‘ Thy hyacinth hair ‘, ‘ চুল তার কবেকার অন্ধকার বিদিশার নিশা ‘। যদিও  ‘ hyacinth ‘-এর বঙ্গীকরণ অসম্ভব। এর অর্থ  এক ধরনের গুল্ম  অথবা গুচ্ছবিশিষ্ট সুগন্ধি ফুল কিংবা কচুরিপানা। তুলনায় জীবনানন্দের কেশচিত্রায়ণ অভিনবত্বে অসাধারণ। ‘ the classic face ‘ -এর সঙ্গে ‘ মুখ তার শ্রাবস্তীর কারুকার্য ‘। গ্রিক পুরাণের  জলপরির মতো হেলেনের চলনবৈশিষ্ট্য ( naiad airs ) – অনুষঙ্গে গ্রিসের প্রাচীন গৌরব ( the glory , that was Greece ) এবং রোমের অতীত ঐশ্বর্য ( the grandeur that was Rome )। জীবনানন্দে যা বিদিশা ও শ্রাবস্তী। যদিও বিষ্ণু দের অনুবাদে তার ছিঁটেফোঁটা সম্পর্ক লক্ষ করা যায় না  : ” তোমার অতসী কেশ, ক্ল্যাসিক বয়ান “। পো- এর উত্তাল সমুদ্র ( ‘ desperate seas ‘ ) জীবনানন্দে ‘ সমুদ্র সফেন ‘।

দুটি কবিতার সৃষ্টি- উৎস সম্পূর্ণ ভিন্ন। পো তাঁর কিশোরবন্ধু রবার্ট স্ট্যানার্ডের জননী জেন স্টিথকে নিয়ে ‘ To Hellen ‘ লিখেছিলেন। জীবনানন্দের ‘ বনলতা সেন ‘ ব্যক্তিপ্রেম উদ্ভাসিত কবিতা। ‘ কারুবাসনা ‘ উপন্যাসে বনলতার কথা আছে :
” কিশোরবেলায় যে কালো মেয়েটিকে ভালোবেসেছিলাম কোনো এক বসন্তের ভোরে , বিশ বছর আগে যে আমাদেরই নিকটবর্তী ছিল , বহুদিন যাকে হারিয়েছি—- আজ , সে-ই যেন , পূর্ণ যৌবনে উত্তর আকাশের দিগঙ্গনা সেজে সে এসেছে। দক্ষিণ আকাশের সে-ই যেন দিগবালিকা , পশ্চিম আকাশেও সে-ই বিগত জীবনের কৃষ্ণা মণি, পুব আকাশে আকাশে ঘিরে তারই নিটোল কালো মুখ। নক্ষত্র মাখা রাত্রির কালো দিঘির জলে চিতল হরিণীর প্রতিবিম্বের মতো রূপ তার—-প্রিয় পরিত্যক্ত মৌনমুখী চমরীর মতো
অপরূপ রূপ। মিষ্টি ক্লান্ত অশ্রুমাখা চোখ , নগ্ন শীতল নিবারণ দু’খানা হাত , ম্লান ঠোঁট , পৃথিবীর নবীন জীবন ও নবলোকের হাতে প্রেম বিচ্ছেদ ও বেদনার সেই পুরনো পল্লীর দিনগুলো সমর্পণ করে কোন দূর নিঃস্বাদ নিঃসূর্য অভিমানহীন মৃত্যুর উদ্দেশ্যে তার যাত্রা।
সেই বনলতা —- আমাদের পাশের বাড়িতে থাকত সে।”

‘ কারুবাসনা ‘-র রচনাকাল ১৯৩৩ , ‘ বনলতা সেন ‘-এর ১৯৩৪ ।পো-এর বর্ণনায় হেলেনের বাহ্যসৌন্দর্য , জীবনানন্দের বর্ণনায় বনলতার আন্তর্সৌন্দর্য। বিদিশা- শ্রাবস্তীর অনুষঙ্গে বৌদ্ধিক প্রশান্তি লগ্ন। পো-এর হেলেন ক্লান্তিহারিণী , আশ্রয়দায়িনী , শান্তিদায়িনী সৌন্দর্যের পরাকাষ্ঠা। ‘ own native shore ‘ -এ ফিরে এসে ক্লান্ত নাবিকের একান্ত আপন আশ্রয় পাওয়ার পরিতৃপ্তি জাগে।জীবনানন্দের নাবিকও স্বভূমিতে পৌঁছে ভালোবাসার অবকাশ পেয়ে অপার শান্তি অনুভব করেছে।  শেষ স্তবকে পো হেলেনকে খ্রিস্টীয় পবিত্রতা দান করেছেন। Holy Land -এর রত্নদীপ তার হাতে ( The agate lamp ) কিন্তু জীবনানন্দের বনলতা অপৌরাণিক- অনৈতিহাসিক চরিত্র। শুধু পো কেন প্রসঙ্গত ফরাসি প্রতীকবাদী কবি বোদলেয়ার-এর ‘ La chevelure ‘ এবং ইংরেজ রোমান্টিক কবি কিটসের ‘ On First Looking into Chapman’s Homar ‘- এর প্রভাবও দুর্লক্ষ্য নয়  :
” Much have I travell’d in the realms
of gold,
And many goodly states and
kingdoms seen ;
Round many westetn islands
have I been
তাছাড়াও ডব্লিউ বি ইয়েটস-এর ‘ Sailing to Byzantium ‘ কবিতার সঙ্গেও ‘ বনলতা সেন ‘ – এর সাদৃশ্য পরিলক্ষিত হয়। দুটি কবিতাই অন্বেষণের। জীবনযন্ত্রণা ও দুঃসহ ক্লান্তি থেকে  মুক্তিকামী দুই কবিই হালভাঙা দিশাহীন নাবিক।  ইয়েটস-এর কবিতায় যুগযন্ত্রণা অতিক্রম করার  মানসিক প্রয়াস আছে : ‘ Caught in that sensual music all neglect / Monuments of unageing intellect ‘।  বনলতায় ‘ আমি ‘ দু’দণ্ড শান্তি ‘ পেলেও ‘ থাকে শুধু অন্ধকার ‘ কিন্তু তারপরেও প্রাণের আলাপনের জন্য ‘মুখোমুখি বসিবার ‘ আগ্রহ।

পরবর্তী উপমায় সমুদ্রপথে দিশাহারা মৃত্যুমুখী নাবিকের চোখে জীবনাশ্বাস বহন করে আনে দারুচিনি দ্বীপের শ্যামময় তৃণভূমি। বনলতা সেনও আসে সেই আশ্বাস নিয়েই। ছিন্নমূল নাবিকের মতোই আধুনিক মানুষের জীবন দিশাহীন , নিরাপত্তাহীন।প্রেমই সেখানে ক্ষণপ্রশান্তির আশ্রয়। দারুচিনি দ্বীপ প্রাচীন ভারতের সমৃদ্ধির স্মৃতি জাগায়। মশলার সুঘ্রাণে ইন্দ্রিয়ঘন তৃপ্তির জগৎ প্রতিভাসিত হয়।সবুজ ঘাস সতেজ ,      সুস্নিগ্ধ , পেলব , মোলায়েম দেহ ও প্রাণের প্রতীক হয়ে ওঠে।

দিশাহারা নাবিকের প্রতীক্ষাতুর মানসটি নায়ক-নায়িকার মধ্যে প্রতিফলিত হয়। জীবনের সমুদ্র সফেন ঘেঁটে কবি যেমন ক্লান্ত প্রাণ , তেমনই প্রাণপ্রিয় মানুষটির জন্য অপেক্ষায় থেকে নারীটিও বিষণ্ণ ও অভিমানাহত। তাই সম্বোধনে তুমি নয় , আপনি। খেদ-বেদনা-সম্ভ্রম- আবেগ-অনুযোগ মিলেমিশে জিজ্ঞাসা  : ” এতদিন কোথায় ছিলেন ? অচিন্ত্যকুমার সেনগুপ্তের ‘ প্রথম যখন  ‘ কবিতার নায়িকাও বলেছিল :
” প্রথম যখন দেখা হয়েছিল
কয়েছিলে মৃদুভাষে
‘ কোথায় তোমারে দেখেছি বলো তো—-
কিছুতে মনে নি আসে।’
কাল পূর্ণিমা রাতে
ঘুমায়ে ছিলে কি আমার আতুর
নয়নের বিছানাতে ?
মোর জীবনের হে রাজপুত্র
বুকের মধ্যমণি ,
প্রতি নিশ্বাসে শুনেছি তোমার
স্তব্ধ পদধ্বনি।
তখনও হয়ত আঁধার কাটেনি—-
সৃষ্টির শৈশব—-
এলে তরুণীর বুকে হে প্রথম
অরুণের অনুভব !
আমি বলেছিনু জানি
স্তব্ধগুঞ্জন তুলি তোরে ঘিরে হে মোর                                                            মক্ষিরানি !
যাপিলাম কত পরশ তপ্ত রজনী নিদ্রাহীন
দু’চোখে দু’চোখ পাতিয়া শুধালে
‘ কোথা ছিলে এতদিন ? ‘

অচিন্ত্যকুমারের কবিতা যেহেতু আগে লেখা  ‘বনলতা সেন ‘-এ তার প্রভাব অস্বীকার করা যায় না। ‘ স্বপ্ন ‘ কবিতায় রবীন্দ্রনাথের মানসসুন্দরী বলেছে—-
মোরে হেরি প্রিয়া
ধীরে ধীরে দীপখানি দূরে নামাইয়া
আইল সম্মুখে—- মোর হস্তে হস্ত রাখি
নীরবে শুধালে শুধু , সকরুণ আঁখি ,
‘ হে বন্ধু, আছ তো ভালো ? ‘

এর পরেই সেই বহুবিতর্কিত বাকপ্রতিমার ব্যবহার  : ” পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে নাটোরের বনলতা সেন।” বুদ্ধদেব বসু ‘ কালের পুতুল ‘ গ্রন্থে এই উপমা-তাৎপর্য বিশ্লেষণ করেছেন।    দীপ্তি ত্রিপাঠী বলেছেন :” উপমাটি তুলনাগত নয় , মননগত।” ( আধুনিক কাব্য পরিচয় )
ক্লিন্টন বি সিলি ইমেজটির উৎস নিয়ে ‘ A poet apart ‘ গ্রন্থে লিখেছেন : ” Jibanananda employed the same image elsewhere….he did not much enjoy the time in 1929-30 when he taught at Delhi’s Ramjas College. Sudhir Kumar Datta , fellow Brahmo from Barisal and a year or so his junior provided some companionship. They saw each other frequently. When Jibanananda first arrived in Delhi. Sudhir Kumar met him at the railway station. Of Sudhir Kumar on that occasion , Jibanananda wrote , more than five years later “…. across his face , [ that smile ] of bird’s nest-like assurance and shelter ”
১৯৩৫ -এর জুন মাসে  সুধীরকুমারের মহাপ্রয়াণ ঘটে। ‘ বনলতা সেন ‘-এর প্রকাশ ওই বছরেরই ডিসেম্বরে।তাই সম্পর্কটি কাকতালীয় বলা যায় না।

১৯৪৫ খ্রিস্টাব্দের ডিসেম্বরে সিগনেট প্রেস থেকে মার্টিন কার্কম্যানের বাংলা কবিতার অনুবাদ সংকলন প্রকাশ পায়। গ্রন্থটিতে  অন্তর্ভুক্ত ‘ বনলতা সেন ‘ কবির অনুমোদনের জন্য পাঠানো হলে, দেবীপ্রসাদ বন্দ্যোপাধ্যায়কে জীবনানন্দ চিঠিতে জানিয়েছিলেন : ” Kirkman-এর Banalata Sen খুবই ভালো হয়েছে , সর্বান্তঃকরণে অনুমোদন করছি। এই কবিতাটির এক জায়গায় ‘ rising her birds-nest eyes ‘ আছে , ‘ পাখির নীড়ের মতো চোখ তুলে ‘-র এত বেশি literal translation না করে কিছুটা ভাবানুবাদ করতে পারা যায় না কি ? বাংলায় আমি নীড় নয়—- নীড়ত্বের সঙ্গে চোখের তুলনা করেছিলাম। ” ( ১৪/০৯/৪৪ )
কেতকী কুশারী ডাইসন আবার নীড়ের আকার-তাৎপর্য অস্বীকার করেননি। পূর্ব ভারতীয় নারীদের আয়ত টানা ডিম্বাকৃতি ডৌল চোখ সেই আকারগত সাদৃশ্যের উৎস। বনলতার চোখ পাখির নীড়ের মতো স্নিগ্ধতায় পরিপূর্ণ , কিটসের ‘ La Belle Dame sans merci ‘ কবিতার মতো সেখানে সর্বনাশের কোনও ইঙ্গিত নেই। বরং নীড়—- শাবক—- মনুষ্যেতর প্রাণীর মিথুন-লালিত জৈব আকাঙ্ক্ষায় , প্রেম ও শরীর ‘ স্বর্ণসুযোগে লুকোচুরি খেলা করে।’

গাছের দু’পাশে গাছ , ” ছায়া ঘনাইছে বনে বনে”, পায়ের পাতায় ঘাসেদের স্নানজল আর গাছের বাকলের খাঁজে জমা হয় জীবনযাপনের কূটরস। হলুদ বিবর্ণ পত্র ঝরে যাবার আগে লিখে রাখে দিনলিপির ক্ষয়। তার মাঝেই পাখির নীড়— দু’দণ্ড শান্তি। এ এমন এক তৃপ্তি , বিশেষত অস্তিত্ব রক্ষার গোপন কৌশল। দলা পাকানো অভিমানের পিছনে সুপ্ত ভালোবাসার চোরাটান—-
এ কেমন চোখ—- যার
চোখে আমি হৃদয় লুকানোর আশ্রয় পাই!
কাচ ভেঙে পড়ে কোন দূরের জানালায়
কত সরু রাস্তা হলে
তবে অন্ধগলি শুরু হয় ?

জীবনানন্দ শেষ স্তবকে আত্মমগ্নতার গভীরে সমাধিস্থ হয়েছেন। প্রথমেই দিনশেষের উপমায় পার্থিব জীবনের সমাপ্তির ইঙ্গিত  :  ” সমস্ত দিনের শেষে শিশিরের শব্দের মতন সন্ধ্যা আসে। ” শিশিরের শব্দ—- ইন্দ্রিয়-বিপর্যয়ে সন্ধ্যা প্রত্যক্ষ ও সজীব হয়ে ওঠে। হয়ে  ওঠে আরও কোমল , নম্র ও সুন্দর। আগত সন্ধ্যায় শিশিরের শব্দ জানিয়ে দেয়—- এবার ঘরে ফেরার পালা।  ” ডানার রৌদ্রের গন্ধ মুছে ফেলে চিল” দিনাবসানেরই ছবি যার মধ্যে ” দিনযাপনের প্রাণধারনের গ্লানি”-র মুক্তি।

শেষ স্তবকে মৃত্যু-মগ্নতার ছায়া আরও ঘন হয়ে আসে। একইসঙ্গে প্রবল জীবনাকুতির।  পৃথিবীর সব রং নিভে গেলে জীবনের পাণ্ডুলিপি রচিত হয়  :

আমাদের অভিজ্ঞতা নষ্ট হয় অন্ধকারে—
তারপর পাণ্ডুলিপি গড়ি /
পুরোনো জ্ঞানের খাতা রক্ত ক্লেশ
রোমহর্ষ চুপে চুপে করি সঞ্চয় /
অন্ধকারে ;

এই পাণ্ডুলিপি বাঁচার আশ্বাস নিয়ে আসে। কাঙাল সাধকের মতো কমণ্ডলুর গভীরে জীবনকে জমিয়ে রাখে এই পাণ্ডুলিপি।একটি জানলা থেকে আর একটি জানালায় পৌঁছে যাবার ভার বহন করে এই পাণ্ডুলিপি। হোক না তা যতই ধূসর। ” জীবন থেকে দূরে সরে যেতে যেতে জীবনের দিকে নোনাজল আছড়ে পড়ে।” ‘ বুনো হাঁস ‘-এ কবি লিখেছেন  :

” তবু এই পৃথিবীর সব আলো
একদিন নিভে গেলে পর      মানুষ রবে না আর , রবে শুধু
মানুষের স্বপ্ন তখন
সেই মুখ আর আমি রব এই স্বপ্নের                                                           ভিতরে।”
( বুনো হাঁস , বনলতা সেন )

” উড়ুক উড়ুক তারা পউষের জ্যোৎস্নায়
নীরবে উড়ুক
কল্পনার হাঁস সব ; পৃথিবীর সব ধ্বনি
সব রং মুছে গেলে
উড়ুক উড়ুক তারা হৃদয়ের জ্যোৎস্নার                                                      ভিতর।”

তৃতীয় স্তবকের পঞ্চম পঙক্তিতে ” সব পাখি ঘরে আসে।” যা দিনাবসানের ও গৃহ-অভিমুখিতার চিত্র। “সব নদী”-র ঘরে ফেরার মধ্যে নিঃসীম অস্তিত্বহীনতার রহস্যময়তার দ্যোতনা। নদী সমুদ্রে নিলীন হলে নিজের অস্তিত্ব হারায়। আবার এক নবতর জীবনের পূর্ণতার আস্বাদও পায়। সব নদীর ঘরে ফেরার মধ্যে জীবনচক্রের “ইতিহাসের অন্তে নবীন ইতিহাসের ক্রান্তি নীলিমা।” সেখানে—-
” চিরকাল ইতিহাস বহনের পথে
রক্ত ক্ষয় নাশ করে সে এক জগতে ,
মানুষের দিকচিহ্ন মাঝে মাঝে
মুক্ত হয়ে পড়ে ;
তা কোনো প্রশান্তি নয় , মৃত্যু নয় ,
অপ্রেমের মতো নয় ,
কোনো হেঁয়ালির শেষ মীমাংসার                                                           বার্তা নয়,
অচিহ্নিত সাগরের মতন তা , দূরতর
আকাশের মতো ;
পেছনের পার্শ্বের দ্রুতগতি চিহ্ন ও বলয়
অন্তর্হিত হয়ে গেলে কূলহীন পটভূমি
জেগে ওঠে ;
ব্যক্তি ও জাতির নাম সময়ের দিগন্তরে
শেষ হলে
শূন্য নীল আকাশের—- মহাসাগরের
শূন্যে মেশে ”

অ্যাসোসিয়েট প্রফেসর,বোলপুর, শান্তিনিকেতন

এই লেখাটি শেয়ার করুন

সম্পাদকের কথা

লেখালিখি ও সৃজনশীল সাহিত্য রচনার চেষ্টা খুবই সহজাত এবং আবেগের দুর্নিবার আকর্ষণ নিজের গভীরে কাজ করে। পাশাপাশি সম্পাদনা ও প্রকাশনার জন্য বিশেষ তাগিদে অনুভব করি। সেই প্রেরণায় ছাইলিপির সম্পাদনার কাজে মনোনিবেশ এবং ছাইলিপির পথচলা। ছাইলিপিতে লিখেছেন, লিখছেন অনেকেই। তাদের প্রতি আমার অশেষ কৃতজ্ঞতা। এই ওয়েবসাইটের প্রতিটি লেখা মূল্যবান। সেই মূল্যবান লেখাকে সংরক্ষণ করতে লেখকদের কাছে আমরা দায়বদ্ধ। কোন লেখার মধ্যে বানান বিভ্রাট থাকলে সেটির জন্য আন্তরিক দুঃখ প্রকাশ করছি। ছাইলিপি সম্পর্কিত যে কোন ধরনের মতামত, সমালোচনা জানাতে পারেন আমাদেরকে । ছাইলিপির সাথে থাকার জন্য ধন্যবাদ ।

Leave a Reply

Your email address will not be published. Required fields are marked *