মা দিবসের দুটি গল্প

জোবায়ের রাজু

মায়ের স্বপ্ন

রাত সাড়ে এগারোটা। এত রাতে বাসায় ফিরেছি দেখে ভাবলাম মা রেগে মেগে আগুন হয়ে যাবেন। কিন্তু মায়ের মুখের মধুর হাসি দেখে আমার ধারনা বদলে গেল। হাসি মুখে মা বললেন ‘আয়, ডিম ভেজেছি। খাবি।’ হাসি হাসি মুখে আমি মায়ের মুখের দিকে তাকিয়ে আছি।
মা ভাত বেড়ে দিলেন। আমি খাচ্ছি। বিদ্যুৎ নেই। হাত পাখা দিয়ে মা আমায় বাতাস করছেন। উচ্ছাস গলায় বললেন ‘তুলির মা আজ ফোন করেছে। আমি চাই শিঘ্রই তুলিকে ঘরের বউ করে আনতে।’ তুলির এই প্রসঙ্গ মা আচমকা তুলতেই আজ আমার গলায় মনে হল ভাতের লোকমা আটকে গেল। আমি বলতে চেয়েও বলতে পারলাম না যে ‘মা, তোমার এই স্বপ্নটা আর কোনদিনও পূর্ণ হবার সম্ভাবনা নেই।’
রাতে বিছানায় গা হেলিয়ে দিতেই ইরার কল। রিসিভ না করেই লাইন কেটে দিলাম। জানি অভিমানে ওপারে ইরা গাল ফুলিয়ে থাকবে। মায়ের জন্যে আমার বুকের ভিতর খুব কষ্ট অনুভব হচ্ছে। আজ বা কাল যখন একটি চরম সত্য ঘটনা মা জানবেন, তখন তার মানষিকতা কোন পর্যায়ে গিয়ে ঠেকবে, সে চিত্র যেন আমি স্পষ্ট দেখতে পাচ্ছি। এই রাতের অবেলায় কেন জানি আমার বুক ফুলে কান্না আসছে।
মা দুই বছর আগে ঠিক করেছেন তার বড় ভায়ের মেয়ে তুলিকে ঘরের বউ করে আনবেন। দুই পরিবারের কথাও মোটামুটি যখন ফাইনাল, তখনই আমার জীবনে আবির্ভাব ঘটে ইরার। খুব অল্প সময়ে আমাদের সম্পর্কটা বিশ্বাস নামের এক নির্ভরযোগ্য জায়গায় পৌছে। চুকিয়ে প্রেম করার আগেই আমরা বিয়ের মত জীবনের কঠিন এই সিদ্ধান্ত নিয়ে ফেলি।
অকাল বিধাব মা আমাকে আকড়ে ধরে জীবনের বাকি দিন চলার স্বপ্ন দেখেছেন। প্রাইভেট কম্পানীতে আমার চাকরি হবার পরপরই মা তুলিকে এই ঘরের বউ করার স্বপ্ন দেখতে থাকেন। অথচ আজ এই আমি মায়ের সেই স্বপ্নকে ধূলিসাৎ করে আমার ভালোবাসার প্রেয়সী ইরাকে নিয়ে কাজী অফিসে গিয়ে বিয়ে করে ফেলেছি। এছাড়া আর উপায় ছিল না। ইরাকে হারাবার কথা ভাবতেই পারি না।
দ্বিতীয় বার ইরা কল দেবার পরও লাইন কেটে দিলাম। তারপরই ইরার ক্ষুদে বার্তা এলো ‘কি জনাব, আজ না আমাদের বাসর রাত! আমরা দুজন আলাদা কেন?’
আহ্লাদি ইরার ক্ষুদে বার্তার মধ্য দিয়ে তার মনের ভাব বুঝতে পারলেও আমার মন কেমন জানি বিষাদে চেয়ে আছে। মায়ের জন্যে।
সকালে নাস্তার প্লেট নিয়ে মা আমার ঘরে এসে বললেন ‘এভাবে রোজ নাস্তা বানাতে বিরক্ত লাগছে। আমি তুলিকে আগামি মাসে আয়োজন করেই আনতে চাই।’ মায়ের কথা শুনে আমার ভিতরটা মোচড় দিয়ে উঠল। আমি মাকে কি করে বলি ‘মা, তুমি যে স্বপ্নের প্রদিপ জ্বালিয়েছো, গতকাল সেটা নিভে গেছে।’ এ কথা ভাবতে গিয়ে খেয়াল করলাম আমার চোখে জল ছলছল করছে।

 

পাহারাদার

ঝকঝক শব্দে ট্রেন চলছে। সাত নাম্বার বগির বাম পাশের সীটে বসে আছি। আমার চোখ বার বার ভিজে আসছে দেকে পাশের সীটের মাঝবয়সি ভদ্রলোক প্রশ্ন করলেনÑ‘কি হয়েছে তোমার?’ ভদ্রলোকের প্রশ্নের জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না। আমাকে চুপ থাকতে দেখে আবারও প্রশ্নÑ‘কথা বলছো না কেন? কোন অসুবিধে?’ এবারও জবাব দিতে ইচ্ছে করছে না। তবুও কাতর গলায় সংক্ষেপে বললামÑ‘আমার মা হাসপাতালে জীবন মৃত্যুর সন্ধিক্ষণে।’ এটুকুই বলতে আমার গলার ভিতর এক দলা কান্না এসে আটকে গেল। ভদ্রলোক আর কথা না বাড়িয়ে নিচুস্বরে বললেনÑ‘আল্লাহকে ডাকো।’ ভিজে আসা চোখে আমি তার দিকে কিছুক্ষণ তাকিয়ে রইলাম।
আমার মা শাহনাজ বেগম। বয়স চল্লিশ পার হয়েছে। অসুস্থ শরীর নিয়ে হাসপাতালের কেবিনে শুয়ে আছেন। মাকে এসিড মারা হয়েছে। সমস্ত শরীর নাকি ঝলসে গেছে। গতরাতে এই অশুভ সংবাদটি শুনে ভোরের ট্রেন ধরে এখন মায়ের কাছে যাচ্ছি। অথচ মা নাকি সাতদিন আগে এসিডদগ্ধ হয়ে হাসপাতালে এসেছে। কেউ আমাকে খবরটা জানায়নি। কে জানাবে! কে আছে আমার! এই পৃথিবীতে আমি একা।
ট্রেনের জানালা দিয়ে হুহু করে আসা শীতল বাতাস আমাকে ছুঁয়ে গেল। মনে পড়তে লাগল আমার জীবনের লম্বা গল্প।
বেশ বড় ঘরে বিয়ে হয়েছে আমার মায়ের। আমার বাবা ছিলেন সে সময়ের নামকরা গায়ক। বেতার টেলিভিশনে তার গান প্রচার হত। বেশ জনপ্রিয় শিল্পী ছিলেন বাবা। দুনিয়া জোড়া তার ভক্ত। বিয়ের আগ থেকে মা ছিলেন বাবার গানের অন্ধভক্ত। প্রিয় শিল্পীর সাথে মায়ের পরিচয় হল এক সাংস্কৃতিক সংগীত সন্ধ্যায়। পরে দুজনের প্রেম। প্রেম থেকে বিয়েটাও হল দুই পরিবারের সম্মতিতে। বিয়ের ছয় মাস পর বাবা বিদেশে গান করতে যাবার সময় বিমান দূর্ঘটনায় মারা যান। অকালে বিধবা হলেন আমার মা।

জন্মের পর জানলাম আমার জন্মের আগেই বাবা আকাশের তারা হয়েছেন। শ্বশুর বাড়ির লোকেরা তাদের বিধবা বউকে খুব একটা মূল্যায়ন করতো না বলে মা আমাকে নিয়ে নিজের বাবার সংসারে চলে আসেন। পরে আমার বাবার সমস্ত সম্পত্তি তার ভায়েরা দখল করে নেয়।
স্বামীকে হারিয়ে মা আমার মাঝেই জীবনের ঠিকানা খুঁজতে চেয়েছেন। সেই চেতনায় আমাকে বড় করতে লাগলেন। ইচ্ছে ছিল আমাকে ডাক্তার বানাবেন। ছোট্ট সেই আমার একজন পাহারাদার হয়ে উঠলেন মা। আমি জলে ডুবে মরবো বলে আমাকে জলের ঘাটে আসতে দেয়া হতো না। পথিমধ্যে কোন দূর্ঘটনায় পতিত হবো বলে মা রোজ আমাকে প্রাইমারির আঙিনায় দিয়ে আসতেন।
মায়ের এমন নিরন্তর পাহারায় বড় হয়ে উঠতে থাকি আমি। বয়স যখন আমার তেরো, একদিন নানাজানের বাড়িতে অনেক মেহমান এলো। শহর থেকে এলো আমার মামারা। কাছের দূরের আত্মীয় স্বজনরাও আসতে লাগল দলে দলে। এত এত অতিথি আসছে কেন? আমি কিছু বুঝতে পারছি না। আমার নাকে ভেসে আসতে লাগল পোলাও কোরমার মিঠা গন্ধ।

আসলে সেদিন ছিল আমার মায়ের দ্বিতীয় বিয়ের দিন। মধ্যদুপুরে বর সেজে আসা একজন মাঝবয়সি ভদ্রলোকের সাথে বিয়ে হল আমার মায়ের। ভদ্রলোকের আগের স্ত্রী ক্যান্সারে মারা গেছেন। সে সংসারে ভদ্রলোকের পাঁচ ছেলে। বাবার বিয়েতে তাদের কারো মত নেই বলে তারা কেউ আসেনি।
যে লোকটার সাথে আমার মায়ের বিয়ে হচ্ছিলো, সেই লোকটা আমাকে জড়িয়ে ধরে কি ব্যাকুল হয়ে কাঁদলেন। শেষ বিকেলে বর যাত্রীরা আমার মাকে বধূ বেশে নিয়ে গেল। আমাকে ঘিরে মায়ের সেদিনের আকাশ পাতাল কান্না এখনো আমার মনে দাগ কাটে।
মা বিহীন নানাজানের সংসারে মামিদের অবহেলায় বড় হতে থাকলাম আমি। মাকে মনে পড়লে মাঝে মাঝে তার নতুন স্বামীর বাড়িতে চলে যাই। সেখানে গিয়ে দেখি মা কি অমানবিক পরিশ্রম করে করে নিজের স্বাস্থ্য শরীর বানিয়েছেন কংকালসার দেহ। খুব কষ্ট হয় আমার। বুঝতে পারি নতুন জায়গায় মা ভালো নেই। এরা মাকে সংসারের সর্বাধিক কাজে গাধা খাটুনি খাটায়।

দিন দিন আমি বুঝতে পারি মায়ের জীবন যন্ত্রণা। নিয়তি মাকে সুখী করবে, সে নিশ্চয়তাও নেই। এসব ভেবে ভেবে আমি ক্লান্ত হয়ে কেঁদে উঠি কোন কোন রাতে। কয়েক মাস পর পর মাকে দেখতে যাই। মা আমাকে পেয়ে পাগলের মত জড়িয়ে ধরলে আমি যেন পৃথিবীর যাবতীয় সুখগুলি খুঁজে পাই।
এক সময় জানতে পারি মায়ের সতী সন্তানরা মাকে সহ্য করতে পারে না। সৎ মা বলে তাদের সাথে মায়ের দূরত্বও অনেক। ওদের পাঁচ ভায়ের সাথে মায়ের প্রায়ই ঝামেলা হয়। কথা কাটাকাটি চলে। বড় ছেলেটা নাকি মাকে মারতেও তেড়ে আসে। মা নিরকে সব সহ্য করে যান। কখনো প্রতিবাদের ভাষা পান না। এরই মধ্যে মেজো ছেলেটা, যার নাম কবির, সে নাকি মায়ের গায়ে হাতও তুলেছে তরকারীতে মরিচের গুঁড়ো বেশী দেয়ার অপরাধে।
একদিন মাকে প্রশ্ন করিÑ‘কেমন আছো তুমি?’ নিরস গলায় মা বললেনÑ‘ভালো।’ তারপর আমি কোন কিছু বুঝে উঠার আগেই মা হুঁ হুঁ করে কাঁদতে লাগলেন। সেদিন মা কেন এত কেঁদেছেন, আজো আমি জানি না। তবে বাড়িতে আসার পর নানাজান বললেনÑ‘তুমি আর ওই বাড়িতে যাবে না। তোমার এভাবে যাওয়া ওরা ভালো ভাবে নিচ্ছে না।’ নানাজানের কথায় রাতভর খুব কাঁদলাম। গোপনে। কেউ জানতেই পারেনি। কাউকে কান্না দেখানোর অভ্যাস আমার নেই। আমি আর ওই বাড়িতে যাবো না।

মাঝে মাঝে মা তার কংকালসার দেহ নিয়ে বাপের বাড়িতে এসে বিলাপ করে কাঁদতো। তার বিলাপি কান্নায় থাকতো সতী সন্তানদের অবহেলার কষ্টময় কাহিনী। এই কাহিনী শুনে নানাজানও মায়ের সাথে গলাগলি করে কাঁদতেন। এত এত কান্না মাঝে মাঝে আমার ভালো লাগতো না।
এক সময় শেষ হল আমার শিক্ষা জীবন। ভালো চাকরী নিয়ে শহরের ব্যস্ত মানুষ হয়ে উঠলাম। গাঁয়ের সাথে আমার মায়ের সাথে দূরত্ব বাড়লো। নানাজান মাঝে মাঝে আমার কাছে শহরে আসেন। মায়ের গল্প বলেন। স্বামীর পক্ষ থেকে মায়ের কোন অসুবিধে না হলেও সতী সন্তানরা মাকে মানষিকভাবে কষ্ট দেয়। কারণ আমার আপন মা তাদের সৎ মা। ব্যবধান এইটুকুই।

মাঝে মাঝে ইচ্ছে হয় মাকে আমার কাছে চিরদিনের জন্যে নিয়ে আসি। কিন্তু কেন জানি মা ওই দোযখ থেকে আসতে চাইতেন না। হয়তো দ্বিতীয় স্বামীর প্রতি তার অগাধ ভক্তি বলে। হয়তো সংসার থেকে বিচ্ছেদি হবার আর ইচ্ছে নেই বলে।
গতকাল রাতে বড় মামি ফোন করে উৎকন্ঠে বললেনÑ‘তোর মাকে তার সতী সন্তানরা এসিড মেরেছে। সারা শরীর পুঁড়ে গেছে। বুবু এখন জেনারেল হসপিটালে।’ মামির কথা শুনে আমার গলা ফাটানো চিৎকার আসলো। কিন্তু পারলাম না। শুধু আমার ভিতরটা ভাঙ্গতে লাগল চরম বেদনাতে। মায়ের সারা শরীর এসিডে পুঁড়ে গেছেÑএই সংবাদটি যন্ত্রণা হয়ে আমাকে ক্ষতÑবিক্ষত করে দিল।
আমি আর থাকতে পারলাম না। ইচ্ছে হল পাখি হয়ে জেনারেল হসপিটালে ছুটে আসি। মায়ের কাছে আসবো বলে ভোরের ট্রেন ধরলাম।
দুপুর আড়াইটায় ট্রেন গন্তব্যে এসে পৌছলো। জেনারেল হসপিটালে এস দেখি ২০৭ নাম্বার কেবিনে মা অজ্ঞান হয়ে শুয়ে আছেন। তার সারা শরীর ব্যান্ডিজ।এ দৃশ্য দেখে দুনিয়া কাঁপানো কান্না এলো আমার।
ডাক্তার আলী হায়দার জানালেন মায়ের বেঁচে থাকার কোর নিশ্চয়তা নেই। যে কোন মূহুর্তে মারা যেতে পারেন। কিন্তু এই অবস্থায়ও তার কোন স্বজন এখানে থাকতে রাজী নয়। সবাই দু’একবার এসে চলে গেছে। কিন্তু রোগীকে পাহারা দেয়ার জন্যে তার খুব কাছের কেউ দরকার। নার্স বা সিস্টার কতক্ষণ পাহারা দিবে। তারা রাতভর অন্য রোগীর সেবা করবে।
না, খুব কাছের কেউ দরকার নেই। আমিই পাহারা দিব মাকে। ছোট বেলায় মা আমাকে যেভাবে পাহারা দিতেন যে কোন কাজে। একবার আমার খুব জ্বর হল। জ্বরের ঘোরে আমি সারা রাত আবোল তাবোল বকছি। মা তখন আমাকে সারা রাত মাথায় পানি ঢাললেন। প্যারাসিটামল খাইয়েছেন তিন ভাগের এক ভাগ করে। অসুস্থ আমাকে সারা রাত পাহারা দিয়ে রেখেছেন।
আজ আমি মায়ের পাহারাদার হবো। মাকে সারা রাত পাহারা দিব। নিথর নিস্তব্দ হয়ে কেবিনে শুয়ে আছেন। আমার বুক চিন চিন করছে।
রাতভর আমি বসে রইলাম মায়ের শিয়রে। ব্যান্ডিজে জড়ানো মাকে একবার খুব ইচ্ছে করছে বুকে জড়িয়ে নেয়ার। কিন্তু সে উপায় নেই।
জানি না মাকে কোন অপরাধে এসিডে ঝলসে দেয়া হয়েছে। জানতে চাইও না। শুধু আল্লাহর দরবারে এই অপকর্মের বিচার চাই। আল্লাহ এই অপরাধের বিচার একদিন করবেনই।

রাত যখন সাড়ে তিনটা, তখন মায়ের জ্ঞান এলো। কাতর চোখে মা এদিক সেদিক তাকাচ্ছেন। আমাকে যেন চিনতে পারছেন না, এমন ভঙ্গিমায় তাকিয়ে রইলেন। আমি ডাকলামÑ‘মা আমি এসেছি।’ বুঝতে পারলাম মা আমার ডাক শুনছেন না।
আমি আবারও ডাকলাম। মা এবার বড় বড় চোখ করে চোখ বন্ধ করে ফেললেন। একি! মা এমন করছেন কেন? মুখ থেকে সাদা ফেনা বের হচ্ছে। আমি ব্যাকুল গলায় ডাক্তারকে ডাকলাম। ঘুমকেতুর চোখে ডাক্তার আলী হায়দার এলেন। তিনি মাকে পর্যবেক্ষণ করে নিরস গলায় বললেনÑ‘রোগী আর নেই।’
ডাক্তারের কথা শোনে আমি চিৎকার দেয়ার আগেই টের পেলাম আমার চোখ দুটো জলে ভিজে গেছে।

 

এই লেখাটি শেয়ার করুন