ললাট লালসা

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

দুটি বিভৎস খুনের রহস্য উদঘটন উন্মোচনের শিরোনাম চলছে টিভিতে। শহরবাসী উন্মুখ হয়ে বসে আছে দু’টি হত্যাকান্ড উন্মোচনের ঘটনায়। হত্যাকান্ডের নৃশংসতা এতটাই বেশি যে পুলিশের ধারণা, এরকম হত্যাকান্ড সাধারণত কোন সুস্থ স্বাভাবিক মানুষের কাজ নয়।

“উথাল পাথাল অবস্থায় মানুষের জীবন বমি আসে। ঠিক এখন আমার তেমন সারা শরীর ভেঙে বমি আসছে। এ বমি ক্রোধের বমি..ক্রোধের বমি বলে কিছু থাকে? ঘৃণার বমি বলে কিছু থাকে? থাকে হয়ত.. মানুষের এসব নিয়েই তো থাকতে হয়। চারদিকে নোংরা জঞ্জালের ছড়াছড়ি..পাপ-মোহের বিভিষিকার আগুন..পৃথিবীর জাহান্নাম পেড়িয়ে, পরলোকে আরেক জাহান্নামের অপেক্ষা! এসব মানুষকে ভীষণ ভাবিয়ে তোলে..পৃথিবীটা পুঁজিবাদের দখলে গিয়েছে সেই কবে..মানুষ মরে। মরার পরে বিচার হয়। আমি মরি না কেন? ”

রাত তখন দু’টো। শুনশান রাত….গভীর রাতে নিজের কষ্টের কথাগুলো ডাইরিতে লিখছেন জামিরউদ্দিন খান। ওভেন থেকে টিং করে একটা আওয়াজে তার মনযোগ কিছুটা পথভ্রষ্ট হলো। চোখ মুখ খিচিয়ে খানিকটা ওভেনের দিকে তাকিয়ে আবারও ডাইরি লেখার দিকে মনযোগ দিলেন। তবে সেই মনযোগ ধরে না রাখতে পেরে..চেয়ার ঠেলে উঠে ওভেন থেকে গরম বার্গারটা বের করে একটা কামড় বসালেন। বার্গারের স্বাদে ততক্ষণে.. তার পথভ্রষ্ট হওয়া মনযোগ একটা দিক খুঁজে পেলো।

বাইরে গাড়ির হর্ণ শুনতে পেলেন, গেট খোলার আওয়াজও কানে গেলো। সুষমা ফিরেছে! রাত ঘনিয়েছে….অবশ্য শহুরে মানুষদের কাছে এসব সন্ধ্যে রাতই বটে। মদের বার গুলোতে এতক্ষণে পার্টি, ড্যান্স..আমদ-ফুর্তি শুরু হয়ে গিয়েছে।

সিড়িতে হাই হিলের টকটক আওয়াজে জামিরউদ্দিন সিড়ি ঘরের দিকে তাকানোর কিছুক্ষণ বাঁদে-ঘরে ঢুকলো সুষমা। জামিরউদ্দিন বিড়বিড় করে বললো,’এসেছে! কার সাথে যেন শুয়ে এসেছে। নটি আবার নতুন নাগর পাতিয়েছে! দেবো.. এটাকেও শেষ করে দেব।

সুষমার মুখভার….জামিরউদ্দিন হাতে বার্গারের অবশিষ্ট অংশ নিয়ে সুষমার দিকে এগিয়ে গেলো..সুষমা কাউচটাতে বসে আছে.. চোখ উচিয়ে তাকালো জামিরউদ্দিনের দিকে। ঠিক তখনই জামির উদ্দিন বার্গারের অবশিষ্ট অংশটুকু কামড় দিতে যাবে.. কামড়ে তার দাড়ি মোচে লেপ্টে গেলো বার্গারের চিজ। সুষমা হাত থেকে ভ্যানিটিব্যাগটা বিরক্তিকর ভঙ্গিতে মেঝেতে ছুড়ে উঠে গেলো বেডরুমে। আপাতত এখানেই অস্বস্তির গল্পের অর্ধাংশের শুরু!




২.
যতদূর চোখ যায় সাগরের নীল জলরাশি। রোদে পানি চিক চিক করছে। যাকে কাব্যিক ভাষায় বলা যায়, ‘টলমলে জলে ঝিলমিল রোদ হাসছে সমুদ্রের নোনা জলে’ কি একটা এলোপাতাড়ি ভাবনায় বুঁদ হয়ে আছে সে, গালের দাড়ি গলা বেয়ে নেমেছে। নাকের নিচে মোটা গোফের আস্তরণ, হাতের আঙুলের ফাকে একটা সিগারেট। খালি গা…ক্ষাণিক চোখ বুজলো সে। চৈত্র মাসের শেষ শেষ বৈশাখের ঝড়ের আভাস! দক্ষিণ দিক থেকে এক ঝাপটা দমকা হাওয়ায় চোখ দুটোর পাতা যেন আরও স্থির হয়ে এলো। ক্ষাণিক অসাড়তায় তন্দ্রাচ্ছন্ন ঘোরে সে হারিয়ে গিয়েছিলো কোথায় একটা। সমুদ্রের নোনা জলের গর্জন, শো শো ঠান্ডা বাতাস এসব মিলেমিশে যে সুখের ঢেউয়ে ভাসছিলো

মেঘের দলা সূর্যের ওপর থেকে সরে গেলে। রৌদ্রের ঝললে তেলরাঙা পিঠটা ঝলমলিয়ে উঠলো। ঝলসানোপ্রায় উত্তপে পিঠটা পুড়ে যাওয়ার উপক্রম।

সমুদ্র বালুতীর থেকে থেকে উঠে লোকলয়ের দিকে হাটলো সে, তার পায়ে একজোড়া চটি। বাম হাতে একটা ফিনফিনে হাওয়াই শার্ট। সেটাকে কাধে রেখে.. পা বাড়ালো বালুতীর ধরে, চৈত্রের উত্তাপে।

মনে কি একটা বিষণ্যতার স্তুপ ভর করেছে জামির সাহেবের। সেই স্তুপকে নামাতে তিনি এসেছেন.. সমুদ্রদর্শনে.. সমুদ্র আর আকাশের বিশালতায় মানুষের মন হালকা হয়েচ যায়। মনের অভ্যন্তরে জমে নতুন ভাবনার জাগরণ.. এসব কথা জানেন জামিরউদ্দিন। তবুও ঠিক কোথাও একটা খাপ খাচ্ছে না কিছু..বার বার তা’র মনে হচ্ছে তিনি মরে যান। বিষন্যতায় ভরা এসব দিন তার ভালো লাগছে না।

সিগারেটের শেষ টান দিয়ে বালুতে সিগারেটটা ফেলার পর পেছন থেকে এক তরুণী বললো,’এক্সকিউজ মি! হ্যালো। ‘

জামিরউদ্দিন পেছনের দিকে তাকালেন,’একটি অসম্ভব সুন্দরী মেয়ে তার সামনে দাঁড়িয়ে আছে। মেয়েটির চোখে চশমা, রোদের উজ্জ্বলতায় ফরসা গাল লাল হয়ে আছে। মেয়েটির মাথায় লেডিস হ্যাট! পড়নে টি শার্ট….।

মেয়েটি বিনয়ী গলায় বললো, ‘আপনি জামির সাহেব?’
জামির উদ্দিন মাথা নাড়িয়ে মেয়েটিকে জবাব দিলো,’ হ্যাঁ’
-আমি উষা!
-ও আচ্ছা! জামিরুদ্দিনের মধ্যে এতক্ষণ যে কোন্দল চলছিলো সেসব বোধয় নিমিষেই উধাও হয়ে গেলো।
-মেয়েটি বললো, আপনাকে আমি বেশ কয়েকবার আমাদের অফিসে আসতে দেখেছি। আমি জহির চৌধুরীর ছোট নাতি। আপনি বোধয় তা’কে চেনেন।
-ও হ্যাঁ। ভালো আছো তুমি? তোমাকে আগে কোথাও দেখেছি? বলতো?

সমুদ্রতটে হাটতে হাটতে মেয়েটির। মেয়েটির সাথে জামিরউদ্দিনের বেশ আলাপ হলো।



৩.
আমার চাকুরীজীবি সুশিক্ষিতা বউ আমাকে বলল,’ -ইউ আর এ সাইকো৷ ইউ আর টু মাচ উইক। ইউ আর এ মেন্টালি সিক, ইউ আর ফা**ং ইম্যাস্কুলেট, আই ক্যান্ট লিভিং উইথ ইউ এনিমোর’

অথচ আমরা কতই না ভালোবেসেছিলাম দুজন দুজনকে৷ ‘এই শহরটা সন্দেহ আর বিশ্বাস ভাঙনে খুব বেশি এফেক্টিভ। ‘ সন্দেহের বীজটা একবার নিজের মধ্যে বপন করলে সেটা থেকে গাছ হয়। আর গাছটা দিন দিন বাড়তে থাকে৷ ওকে বিয়েটা করলাম ধুমধাম করে৷ মা’য়ের শখ পূরন হলো। ২ বছরের মধ্যে মাও মারা গেলো দারুণ একা হয়ে পড়লাম। অফিস,বাসা এর মধ্যেই কাটতো। মাঝেমধ্যে বের হতাম৷ রেস্টুরেন্টে খেতাম।

রাতের সময়টুকুও ওকে দিতাম৷ সব করে যখন রাতে ঘুমাতে যেতাম তখন ও বলতো তোমার ঘামের গন্ধে আমার ঘুম আসে না।বডি স্প্রে মারলে বলতো অসহ্য৷ অথচ একটু আগেও ও আমার……

দীর্ঘশ্বাস ছাড়ে জামিরউদ্দিন..এভাবে আর ডাইরি লিখে কত? ডাইরিটাও ভীষণ নির্লজ্জ হয়েছে..নির্লিপ্ত ক্ষোভে জামির উদ্দিনের বুক কেপে ওঠে কোন অজানা কারনে। পুরুষ হিসেবে সে অক্ষম, সে কথা আগেই জানতে পেরেছে। জীবনে বহু সুযোগ এসেছে বহু সুন্দরী মেয়েদের সাথে রাত কাটানোর। সেসব….নেশা জামিরউদ্দিনকে ছোঁয়নি!

বাইরে আকাশে গুরুম গুরুম করে ওঠার সঙ্গে সঙ্গে বিকট শব্দে একটা বাজ পড়লো আশেপাশে কোথাও। ডাক্তারের কাছে টেস্ট করাতে গিয়ে জামিরউদ্দিনের জীবনেও ঠিক এরকম বাজ পড়েছিলো। ডাক্তার যখন বললো, জামির সাহেব.. আপনি কখনো বাবা হতে পারবেন না! সেদিন সেরকম..কোন কষ্ট না পেলেও, বাড়িতে ফিরে সুষমা যখন কাকতালীয় ভাবে সেদিনই সেই তার মা হওয়ার খবরটা দিলো..জামির সাহেব সেদিন অষ্টম আশ্চর্য হয়েছিলেন।

৪.
জামিরউদ্দিনের বিয়ের রাতের কথা.. সবাইকে বিদায় দিতে দিতে প্রায় রাত বারোটা বেজে গিয়েছে। আমি ক্লান্ত হয়ে পড়েছে জামির, বার বার হাই তুলছে। ড্রয়িং রুমে বসে হাই তুলতে তুলতে
জামিরউদ্দিনের বাম হাতে সিগারেট। ফেসবুক স্ক্রল করতে করতে সিগারেটে লম্বা টান দিচ্ছে। তার নিউজফিড জুড়ে তাদের বিয়ের ছবি। সিগারেট শেষে করে তার মনে পড়লো তার বেডরুমে আরো একজন আছে। সে জামিরউদ্দিনের সদ্য বিবাহিতা স্ত্রী সুষমা। জামির বেসিন থেকে হায় ধুয়ে ঘরের স্লাইড পড়ে থপথপ পায়ে বেডরুমের দিকে এগোয়। বেডরুমে ঢোকার আগে ফোনের পাওয়ার বাটন চেপে উজ্জ্বল স্ক্রিণে দেখে নেয় সময়।
রাত বারোটা ত্রিশ মিনিট। ড্রয়িং রুমে বসেই আধাঘন্টা কেটেছে তার। ড্রয়িং রুমের দরজায় হালকা গা এলিয়ে দিলে দরজা খুলে যায় নিঃশব্দে।

ক্লান্ত হয়ে পড়েছে সেও। আজ তাদের বিয়ের দিন, বাসর রাত, ফুলসজ্জার রাত। এই রাত নিয়ে শৈশব থেকে উথাল পাথাল গা গরম করা কত গল্প শুনেছে জামির। এ রাতের কত শ্লোক শুনে, ছাত্রজীবনের শেষ রাত পার করেছে কোলবালিশের সাথে ধ্বস্তাধস্তিতে।

জামির খাটের কোণে দাঁড়িয়ে ভাবলো। মেয়েটাকে কি সে জাগাবে? জাগানো কি তার উচিত হবে? জামির ডান হাত বাড়িয়ে দেয় মেয়েটির গায়ের দিকে। হাত সরিয়ে নেয়, মেয়েটার ঘন নিশ্বাস পড়ছে। সে ঘুমিয়ে পড়েছে। তাকে জাগানো ঠিক হবে না। জামিরের মস্তিষ্কে মধ্যে দুটো ভাগ তৈরী হয়ে যায়৷কনশাস আর সাব-কনশাস মাইন্ডের দ্বন্দ।
এই দ্বন্দ নিয়েই মেয়েটির পাশের বালিশে শুয়ে পড়ে জামির। চোখ বন্ধ করে, দ্বিধাদ্বন্দ্বে ভোগে।

জামিরের ঘুম ভাঙে চুড়ির রিনঝিন শব্দে। চোখ খুলে তাকায় । মেয়েটি ঘুম থেকে উঠে বসেছে। হাতের চুরি খুলছে। কানের দুল খুলছে। শ্লমা জড়ানো কন্ঠে জামির বলে, তুমি উঠেছো? আমায় ডাকলে না কেন? মেয়েটি হকচকিয়ে ওঠে। শ্লমা জড়ানো গলার স্বর শুনে কিছুটা বিব্রত বোধ করে জামির।

সে রাতে সুষমাকে মনে হয়েছিলো পৃথিবীর সব থেকে সুন্দর গন্ধের নারী..নারীর গায়ে যে স্নেহ আর ভালোবাসার গন্ধ থাকে তা পুরষের জন্যই।




৫.
জীবনে অনেক কথা থাকে যেগুলো লেখা যায় , কিন্তু কাউকে বলা যায় না৷ খুব কাছের কেউ? খুব কাছের কেউ কি আছে জামিরউদ্দিনের। একমাত্র ভালোবন্ধু শাকিলের সাথে তার ব্যবসায়ীক রেশারেশিতে বন্ধত্বে ভাটা পড়েছে সেই কবে। কিন্তু জামির কোন দিন বুঝতে পারে নি..শাকিল তার পিঢ়ে এত বড় দা মারবে। এই কথা কাউকে বলা যায় না। এই না বলা কথা একসময় পোড়ায়। ভেতরটা পুড়িয়ে ছাড়খাড় করে দেয়৷ মাঝরাতে যেমন ক্ষুণপোকা কটরকটর করে কাঠ কাটে৷ ঠিক তেমনি জীবন বিরহের পোকাগুলোও সময় কেটে নেয়,রাত জাগায়,চোখের নিচে কালি ফেলে দেয়। এই কথা কাউকে বলা যায় না,তিলে তিলে জ্বলতে হয়। এই কথা খুব গোপন৷ খুব খুব খুব গোপন।

সুষমার সাথে শাকিলের ঘনিষ্ট হওয়ার সম্পর্ক জামির জানতো… একদিন অফিস থেকে ওদের দুজনকে ঘনিষ্ট অবস্থায় দেখে কষ্টে নিজেকে মনে হয়েছিলো জামির বোধয় পৃথিবীর সবথেকে জঘন্য কীট। ইচ্ছে করেই সেদিন ঘর থেকে বেরিয়ে রাগ করে চলে এসেছিলো সমুদ্রতটে!

সেখানে পরিচয় হয় তৃষার সাথে..তৃষার সাথে তার ঘনিষ্টতা এত চমকপ্রদ হয়ে গিয়েছিলো যে, একসাথে একরুমে রাত কাটাতে দুজনের গায়ে বাধেনি! অবশ্য দু’দিন পরে তৃষার স্বামী এসে যাওয়ায় জামির সাহেবকে দু’রাত সেই বিষন্নতার জগতে ফিরে যেতে হয়েছিলো।

সমুদ্রতটের ভালো হোটেল গুলোতে খোঁজাখুজি করলে, তৃষার থেকেও…তবে জামির সাহেব সেরকম নন। নিজেকে ভীষণ আড়ালে রাখতে পছন্দ করেন। তৃষা অল্প বয়েসী মেয়ে….এসব ভুল করে হয়ে যায়। জীবন তো বার বার ভুল করার ব্যাপার।

সেদিনের পর থেকে জামির সাহেবও শক্ত হয়ে গেলেন। স্ত্রীকে দেখলে নিজের মনের মধ্যে উশখুশ করতো…নিয়মরক্ষার্থে সম্পর্কের হিসেব রক্ষণও করতেন সপ্তাহ নাগাদ। তবে সব মিলিয়ে জামির সাহেব ঠিক একটা খুশি নন।

সুষমার পে’টে যে সন্তান এসেছিলো সে সন্তান যে শাকিলের সে কথা জানতে পেরেছিলো জামির সাহেব। নিজের সন্তান না বলে, সুষমার গর্ভে তিনি তার পরিচিত বন্ধু..ভার্সিটি জীবনের পরম বন্ধু শাকিলের সন্তানকে নিজের সন্তান বানাতে চাইতেন না কখনোই। জীবনে বেঁচে থাকতে এতটুকু পাষন্ড, অমানবিক কিংবা পাশবিক মানুষকে হতেই হয়।

জামির সাহেব কায়দা করে সুষমার পেটের ভ্রুণটাকে মেরে ফেললেন। সে’রাতে সুষমা জামির সাহেবকে জড়িয়ে ধরে ভীষণ কেঁদে ছিলো! জামির সাহেবও এতে অবশ্য ভীষণ খুশি হয়েছিলেন।

এরপর সুষমা ইচ্ছে করেই কোন বাচ্চা নেয়নি! জামিরউদ্দিন কায়’দা করে একদিন ভাড়াটে খুনী লাগয়ে শাকিলকে গাড়ি চাপা দিয়ে মেরে ফেললেন।
এ’কথা জানার পর সুষমার অভ্যন্তরীণ অন্তর্দহনের লেলিহান আগুনে জামির সাহেবের বিভৎস হাসি দেখতে পাওয়া গেছে। সুষমা ভীষণ ভেঙে পড়েছিলো…জামির সাহেব তো সুষমার ভালো চেয়েছেন বারংবার!

৬.
আষাঢ়ের ভ্যাপসা গরম পড়া দুপুর..মাথার উপরে সূর্য বোধয় সর্বশক্তি দিয়ে পৃথিবীর দিকে তার তাপ ছড়িয়ে যাচ্ছে। হঠাৎ এক ঝাপটা ঠান্ডা বাতাসে সৌরভের কন্সন্ট্রেশন হালকা ব্রেক হলো। দক্ষিণ দিকে তখন কালবৈশাখের মতো মেঘ ঘনিয়ে এসেছে। সেদিকে খেয়াল করেনি সৌরভ! কলেজ জীবনে এ কালমেঘ দেখেই শ্রাবণের বহু কাব্যিক ছন্দের পসরা সাজিয়েছে নোটখাতায়, সেসব এখন ধূসর স্মৃতি।

ছাত্রজীবনে কত আশা ছিলো..কত স্বপ্ন ছিলো সেসব যেন আজ ফেলে আসা দিনের ভবিষ্যতের হাওয়াই মিঠাইয়ের মতো উবে গিয়েছে৷ জীবন জুড়ে নেমে এসেছে হাহাকারের বন্যা.. সৌরভ দীর্ঘশ্বাস নিলো একটা। মাথা ঠান্ডা রাখতে হবে.. এসময় ইমোশনাল হয়ে গেকে চলবে না। তিথিকে ফোন দেয়া যাক..তিথির সাথে কথা বলে যদি একটু হালকা হাওয়া যায়। মেয়েটার মধ্যে কেমন জাদু আছে! কথা বললে যেকোন ভ্রম কেটে যায়, মন ভালো হয়ে যায়।

বিকেল বেলা ঝেপে বৃষ্টি এলো….বৃষ্টিতে ভাসিয়ে দিয়ে গেলো সব। ঝড়ের বাতাসে মোড়ের টং দোকানের টিন উড়িয়ে নিয়ে গেলো। রাস্তায় পানি জমলো ক্ষানিক…. সন্ধ্যে গড়ানোর সাথে সাথে আরেক পশলা বৃষ্টি আসার আগেই সৌরভ ঘর থেকে বেরোতেই, একটা কালো বিএমডব্লিউ এসে দাঁড়ালো।



৭.
জামিরউদ্দিন কি একটা আধ-বোধগম্য বিষয় নিয়ে তার পার্সোনাল অ্যাসিস্টেন্টের সাথে আলাপ করছে।
পার্সোনাল অ্যাসিস্ট্যান্ট জামিরউদ্দিনের কথা মনযোগ দিয়ে শুনছে। মেয়েটার চুল পনিটেইল! ফিগার দেখে কোন উঠতী বয়েসী তরুনদের রাতের ঘুম উবে যেতে পারে। মেয়েটির নাম তিথি!

-জামিরউদ্দিন তাচ্ছিল্যের সুরে সুষমাকে উদ্দ্যেশ্য করে বললো, ‘তোমার নাগরকে নিয়ে এসেছো দেখছি। এ তো ভীষণ রোগা..তোমার চাহিদা মেটাতে পারে?’

-সুষমা বিরক্ত হলো..বিরক্ত হওয়ারই কথা। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে সুষমা দমানো আগুনে পেট্রল ঢেলে দেওয়ার মতো জ্বলে উঠে বললো, ‘হি ইজ মাই পার্সোনাল এসিস্টেন্ট…অ্যান্ড হি ইজ মাই পার্টনার এজ ওয়েল! ‘

-জামির নিচের দিকে তাকিয়ে ক্ষাণিক হেসে জবাব দিলো,’পার্সোনাল এসিস্টেন্ট আবার পার্টনারও? তাহলে আমি কে? আমি কি তোমার অন্নদাতা ধর্মপিতা? আমি কেন তোমায় টাকা দিয়ে পুষছি?’

-সুষমা এবার কিছুটা চেঁচিয়ে উঠেই বললো,’ বিকজ ইউ আর মাই ফাকিং হাজবেন্ড, নট মাই বেটার হাফ’
জামির শীতল গলায় বললো,’ এসবের শুরুটা তুমিই করেছিলে। কী হতো? শাকিলের সাথে না শুলে?

-শাকিলকে আমি ইচ্ছে করেই মেরে ফেলেছি! ভীষণ কষ্ট দিয়ে মেরেছি ‘

-সুষমার চোখে জল-টলমল..এবার সে শরীরের সর্ব শক্তি দিয়ে চিৎকার দিয়ে উঠে বললো,’শাকিলকে তুমি বিভৎসভাবে মেরেছো সেটা আমি আগেই টের পেয়েছি। শাকিল তো তোমার কোন ক্ষতি করেনি..তাহলে তুমি কেন ওকে মারলে?

-‘শাকিল আমার কোন ক্ষতি করেনি সেটা ঠিক! তবে তুমি আমার কাছে একজন ফুলের মত পবিত্র একজন স্ত্রী ছিলে। তুমি শাকিকের সাথে শু’লে। নাকি শাকিল তোমাকে ইচ্ছে করে শোয়ালো সেটি তো আমি জানি না। আমার কথা হচ্ছে তুমি শাকিলের সাথে কেন শুলে? আমার.. কোথাও ঘাটতি ছিলো না ‘

-সুষমা এবার জামিরউদ্দিনকে তাচ্ছিল্য করে বললো,’ ইউ আর ফাকিং ডেট ওভার মিস্টার জামির! আমি তোমাকে কখনোই পছন্দ করতাম না।

জামির উদ্দিনের মাথায় কি একটা চেপে গেলো। হঠাৎ নিজের অক্ষমতার কথা শুনে রাগে ক্ষোভে ড্রয়ার থেকে রিভালবারটা বের করতে যাবে অমনি গতিবিধি বুঝে সৌরভ শ্যুট করলো জামিরের পিঠে। ব্যাথায় শিউরে উঠলো জামির। সুষমার মুখে এবার অট্টহাসি..সে হাসি ছড়িয়ে পড়েছে সারা ঘর জুড়ে। যেন কোন দৈত্যকে বধ করে নগ্ন নৃত্যে মেতেছে প্রেতের দল। সুষমা কঠিন গলায় বললো,’তোমার কাজ শেষ করো সৌরভ। একটা একটা করে বুলেট খরচ করো। শেষের দিকে আমার জন্য দুটো বুলেট রেখো। জীবদ্দশায় সৌরভ এতটা পাশবিক কখনো হয়নি। কি একটা রাগ চেপে আছে তার সারা শরীরে। একেকটা করে গুলি জামিরউদ্দিনের শরীরের দিকে তাক করে ছুঁড়ছে সে। ভাবছে নগ্নজীবনের নির্লিপ্ততার কথা। কাজটা হয়ে গেলে সৌরভ যে টাকা পাবে সেসব নিয়ে তিথিকে নিয়ে উড়ে যাবে বিলেতে। সেখানে গিয়ে দুজন ঘর পাতবে। সৌরভ এসব ভাবনায় ডুবে গিয়েছিলো ক্ষাণিকক্ষন। ততক্ষণে জামিরউদ্দিনখানের সদ্য প্রাণহারানো দেহ লুটিয়ে পড়েছে ইজিচেয়ারের তলায়।




স্টপ..সুষমা নির্দেশ দেয় সৌরভকে। আদেশের সুরে বলে,’ এবার রিভালবারটা আমাকে দাও।’ সুষমা রিভালবারটা নিয়ে জামির উদ্দিনের কাছে এগোয়। জামিরউদ্দিনের বুকের সাথে রিভালবার ঠেকিয়ে রাখে কিছুক্ষণ। তৎক্ষণাৎ ঘুরে সৌরভের দিকে তাক করে ফটাস করে একটা গুলি ছুড়ে বসে সুষমা। এতক্ষণ এঘরের নিরব দর্শক ছিলো তিথি! তিথি সুষমার গতিবিধি বুঝতে পেরে সুষমা পেছন থেকে আচমকা ধাক্কা দেওয়ায় সৌরভের শরীর ঘেষে গুলি বের হয়ে পেছনের অ্যাকুরিয়ামে লেগে তা চুরমার হয়ে যায়। মাছগুলো লাফালাফি করে মেঝেতে! এসব দৃশ্য দেখার বালাই নেই ওদের তিন জনের।

সৌরভ খপ করে সুষমার হাত থেকে রিভালবারটা নিতে যাবে এমন সময় সুষমা নিজের গলার নিচে রিভালবার ধরে গুলি করে.. রক্তের ফিনিক ফোটার বিভৎস শব্দে নিস্তবধ ঘর যেন রক্তপিপাসায় চনমনে হয়ে ওঠে। মেঝেতে রক্ত গড়ায়!

ততক্ষণে তিথি এবং সৌরভ বুঝতে পেরেছে, যা হওয়ার হয়ে গিয়েছে। এসব নিছক কোন সহজ ঘটনা নয়। তবুও বিপদের সর্বচ্চোসংকেতে নিজের মাথা ঠান্ডা রাখতে হয়। সৌরভ পারে এসব, অভ্যাস হয়ে গিয়েছে। ওরা যখন দরজার দিকে এগোয় অটোমেটিক লকিং সিস্টেমের দরজা তখন লক হয়ে আছে। দরজার খুলতে ফিঙ্গারপ্রিন্ট লাগবে। জামির সাহেব এবং সুষমার মৃতদেহের দিকে তাকায় ওরা দুজন। নিস্তব্ধতা বয়ে যায়! ঘর থেকে বের হওয়ার আগে.. জামিরের বুড়ো আঙুল কেটে ঘরের লকার খুলে টাকাপয়সা হাতিয়ে ঘর থেকে বের হয়ে যায় ওরা দু’জন। বের হওয়ার আগে সিসিটিভি ফুটেজগুলো নষ্ট করে দিয়ে যায়!

বেলা গড়িয়ে গৌধূলীর আলো শেষে টিমটিমে আলোয় শহরটা নেচে উঠেছে নিশিনৃত্যে! শহরের আনাচে-কানাচে অপরাধের জাল ছড়িয়ে গিয়েছে। ললাট লালসার নৃত্যে মেতে উঠেছে উঠতী বয়স..!
মর্গের ফ্রিজারে শুয়ে আছে মানুষের মৃতদেহ….পাশাপাশি ফ্রিজারে শুয়ে আছে দু’জন মৃত মানুষ! রাত্রি আঁধিয়ারে ঘন নিঃশ্বাসের শব্দে স্তব্ধ হয় দুটি শরীর..ললাট লালসার নিগ্রহে..ভেসে যায় কত প্রাণ!

এই লেখাটি শেয়ার করুন