ছোটগল্প : আলো ছুঁয়ে

ছোটগল্প : আলো ছুঁয়ে

আশিক মাহমুদ রিয়াদ

বৃষ্টি পড়েছে বলে রাস্তাটা কর্দমাক্ত৷ বৃষ্টি থামেনি এখনো কাঁদছে আকাশ,প্রকৃতির নিয়মে,ঝর ঝর করে ।কালো মেঘ জমেছে আবার মেঘ সাদা হয়ে চারদিকে ধবধবে সাদা হয়ে গিয়েছে৷ সবুজ গাছপালা গুলো চকচক করছে, আকাশে ভেজা কাক উড়ে যাচ্ছে আর কাক ভেজা হয় ছপছপ করে পা ফেলে হাঁটছি আমি। বাজার থেকে মায়ের জন্য পান আর চুন নিতে হবে। বাজারের এ জায়গাটায় রাস্তাঘাট কাঁদায় ডুবে গিয়েছে। সামনেই মাছের বাজার, তারপাশে সবজি বাজার। এই বৃষ্টির দিনে সাদা পায়জামা পড়ে বের হওয়া উচিত হয়নি সেটা বুঝেছিলাম। আশেপাশে মানুষজন তাকিয়ে আছে আমার দিকে। তবে লোকজন বেশি নেই বাজারে। বৃষ্টিতে ঝুম বৃষ্টিতে কে ই বা অকারনে বাইরে থাকবে ?

বৃষ্টির বাদলের দিনে ঝুপ করে সন্ধ্যে নামে। আজও এমনটা হলো। সন্ধ্যের আগে আরো একপশলা বৃষ্টি শুরু হলো।আমি বসে রইলাম ক্ষিতিশের চায়ের দোকানে। সিগারেট টানলাম,চা খেলাম।সময় যেন যাচ্ছেই না,মোবাইল ফোনটাও সাথে নেই।সেদিন বাড়ির কাছাকাছি যেতেই ঝুপ করে বৃষ্টি নামলো। বৃষ্টি ভিজতে চাইছি না বলেই দৌড় দিলাম তারপর ধড়াম করে আছাড় খেলাম। কোমড়ে ব্যথা পেলাম দারুন, মোবাইল ফোনের স্ক্রিন ভেঙে গেলো। রিপায়ারে দিয়েছি সেটাকে। নড়াইল পাড়া হয়ে সিনেমা হলের সামনের রাস্তা দিয়ে বের হলাম। এখন হেটে যেতে হবে টিউশানিতে। দূরত্ব বেশি না। মিনিট পাঁচেক হাটলেই হবে। বৃষ্টি খুব একটা বেশি পড়ছে না এখন। কোন সতর্কতা সংকেত চলছে কি না কে জানে। শ্রাবন মাস,এখন ঝড় বাদলের সময়।

২.
দরজা খুললেন আফসার সাহেব। ভদ্রলোককে দেখে সবসময় দারুন সতেজ মনে হয়। তার হাতে পত্রিকা,আঙুলের ফাকে সিগারেট । লুঙ্গিটা পেটের ওপরে,গা খালি;চশমা টা নাকের ওপরে। বাজারে চা না খেলেই ভালো হতো। তবুও বৃষ্টিতে বন্দি হয়ে চা খেতে হয়েছে। পড়ার টেবিলে আমার সামনে চা আর পিঠা রাখা হয়েছে। পিঠার নাম দুধপুলি, আমি এই পিঠা অনেক পছন্দ করি। অর্পাকে অংক বুঝিয়ে দিয়ে পিঠায় কামড় বসালাম। সাথে একটু চায়ে চুমুক দিয়ে কিছুক্ষনের জন্য রিফ্রেশ হলাম। মাথাটা কাক ভেজা। হাঁচি আসলো,ঠান্ডা লেগেছে বোধয়। কোন মতে হাঁচিটা দমিয়ে রাখলাম,মুখে খাবার নিয়ে হাঁচি দিলে বিশ্রি এক কান্ড ঘটে যেত। অর্পা পড়ার টেবিল থেকে উঠে পাশের রুমে গেলো। এই ফাঁকে একসঙ্গে কয়েকটা হাঁচি দিলাম। অর্পা ফিরলো হাতে টাওয়াল নিয়ে।
‘স্যার! এটা দিয়ে মাথা মুছে নিন, না হয় ঠান্ডা লেগে যাবে। ‘,বলল অর্পা। আমি ইতস্তত বোধ করলাম। ছোটবেলা থেকেই বড্ড লাজুক ছেলে আমি। বড় হয়েও লাজ কমেনি আমার। অর্পার হাত থেকে টাওয়েলটা নিয়ে মাথা মুছলাম। টাওয়াল টা থেকে সুঘ্রান আসছে। এই টাওয়াল অর্পার বোধয়। চুল থেকে শ্যাম্পুর ঘ্রাণ আসছে। এখন আর আসছে না, নাক আটকে গিয়েছে। সর্দিজ্বর হওয়ার সম্ভবনা।
অর্পা মেয়েটা ভালো! কেয়ারিং টাইপ মেয়ে। ইন্টার পরিক্ষা দেবে এবার। ছাত্রীও ভালো।

৩.
বাড়ির কাছাকাছি আসতে মনে পড়লো ক্ষিতিশের দোকানে মায়ের জন্য কেন পান চুন রেখে এসেছি। বৃষ্টি মাথায় নিয়ে হাজির হলাম দোকানে। দোকান বন্ধ করছিলো সে। আমাকে দেখে বলল, ‘কিছুক্ষণ আড্ডা দেই, এদিকে বৃষ্টিও শুরু হয়েছে। ক্ষিতিশ আমাদের সাথেই পড়তো। অকালে বাবা মারা গেলেন। তারপর থেকে বাবার দোকান ক্ষিতিশ সামলায়।

বাড়ি ফিরতেই বাবা জিজ্ঞেস করলেন, ‘ফিরতে এত দেরী হলো কেন?’ আমি পা ধুতে ধুতে জবাব দিলাম,’বৃষ্টিতে আটকা পড়েছিলাম বাবা। ‘
বাবা গম্ভীর মানুষ।আগে শিক্ষকতা করতেন,অবসর নিয়েছেন গত চারমাস আগে।

রাতে গাঁ কাপিয়ে জ্বর এলো। মিনুকে অংক দেখিয়ে দিতে পারলাম না বলে সে ঘ্যান ঘ্যান শুরু করলো। একটু পর এসে ঘ্যান ঘ্যান করে বলল,’কাল আমার অংক পরিক্ষা, কোথায় একটু অংক দেখিয়ে দেবে। বাধিয়ে বসলে জ্বর। ‘ আমি জ্বরের ঘোরে বললাম,’আগে যেগুলো দেখিয়ে দিয়েছি সেগুলো করতে। মিনু আমার থেকে বয়সে ছোট হলেও যেন এই পরিবারেরই বড় মেয়ে সে। সবাইকে শাসনে রাখে। মাঝেমধ্যে বাবার ঝাড়ি খায়,তারপর ভেউ ভেউ করে কাঁদে,আমি হেঁসে হেসে ওকে পচাই।

৪.
শ্রাবন মাসে কটকটে রোদ আমার মোটেই ভালো লাগে না। কটকটে রোদ উঠেছে। গরম পড়েছে বেশ।
তিন চারদিন ধরে শরীর খারাপ করলো বেশ। জ্বরে শুকিয়ে গেলাম। খাবার মুখে দিতে পারলাম না। মুখ তেতো হয়ে গেলো। এ ক’দিন পড়াতেও যেতে পারলাম না। বিছানা থেকে উঠলেই মাথা ভনভন করতো।জ্বরের ঘোরে থাকতে ভালো লাগছে আবার লাগছে না।সারা শরীরে বিতৃষ্ণা। অর্পাদের বাসা দিয়ে ফোন এলো। বাবা বললেন অসুস্থ। আমি কথা বলতে পারলাম না।

হাসপাতালে ভর্তি হলাম, ডাক্তার বললেন ঢাকায় নিয়ে যান। বাবার মাথায় চিন্তার হাত। সারাজীবন তিনি সম্মানের সাথে চলেছেন। এলাকার মানুষজন তাকে শ্রদ্ধা করেন;ভালোবাসেন। বাবাকে চিন্তিত দেখাতেই আমিও চিন্তিত হলাম। চোখ বুজে ভাবতে রইলাম। শরীরে জোর নেই। হঠাৎ করে কেমন শক্তিহীন হয়ে পড়লাম।
পিরোজপুর থেকে ঢাকায় যেতে হয় বাসে কিংবা লঞ্চে৷ খুব করে শখ ছিলো চাকরি বাকরি পেলে বাবা মাকে নিয়ে লঞ্চ কিংবা স্টিমারের কেবিনে করে ঢাকায় যাবো৷ সেই শখ পুরন হলো। তবে চাকরী পাওয়া উপলেক্ষে না। আমার চিকিৎসার জন্য। মায়ের মুখ কালো। বাবার চোখেমুখে চিন্তার ছাপ। ছোটবোনটাকে খালার বাড়িতে পাঠিয়ে দেওয়া হয়েছে৷ বেচারার শখ ছিলো হয়ত,লঞ্চে করে ঢাকায় যাওয়ার। আনন্দ পাওয়ার, এটা যে আনন্দের বয়স।

৫.
চার মাস পরের কথা। আমার পরিবারের সবাই আমার থেকে আমার অজান্তে কি একটা লুকিয়ে ফেলছে৷ আমি দিনের বেশির ভাগ সময় চোখ বুজে থাকি। বাবার চোখের দিকে তাকাতে পারি না। মায়ের চোখ জলে ছলছল। ঢাকা থেকে ফিরে আমার আর বাইরে বের হওয়া হলো না। শ্রাবণ মাস শেষ হলো বন্য দিয়ে। আমাকে শুয়ে থাকতে হলো বিছানায়। কেউ আমাকে বলছেও না যে আমার কি রোগ হয়েছে।আমি নিজেও ধরে নিয়েছি আমার কোন বড় ধরনের রোগ হয়েছে৷ মাঝেমধ্যে মনে হয় অর্পাকে আমি পছন্দ করতাম,খুব বেশি পছন্দ করলে কী সেটাকে ভালোবাসা বলে? কি জানি! জ্বরের ঘোরে আজকাল অনেক কিছুই মাথায় আসে। অদ্ভুৎ অদ্ভুৎ সব কল্পনারা উঁকি দেয়। বিকেল হলে বিছানায় শুয়ে জানলা দিয়ে বিরস মুখে আকাশ দেখি। সুন্দর আকাশ! কতদিন নদীর পাড়ে যাওয়া হয় না।বলেশ্বরের হাওয়া গায় মাখা হয় না। পাখি উড়ে যায়,কখনো প্রচন্ড খারাপ লাগে। দম বন্ধ হয়ে আসে। মাঝেমধ্যে মনে হয় হঠাৎ করেই সব কেমন বদলে গেলো। আজ আমার ক্যান্সার আক্রান্ত হওয়ার দুই মাস পেড়িয়ে গিয়েছে৷ টাকার অভাবে চিকিৎসা না করাতে পেরে বাবা অনুশোচনায় ভুগছে। মায়ের চোখের জল ছলছল করছে৷ আমি জানলা দিয়ে তাকিয়ে থাকা আকাশের দিকে৷ মেঘে গুলো দেখতে বড্ড ভালো লাগে, আবার বিষাদ জমে হৃদয়ে। মন খারাপ হয়৷ আমিও যে চলে যাব ঐ মেঘের দেশে,দূর আকাশে, আলো ছুঁয়ে।

 

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
সমবয়সী

সমবয়সী

এন এইচ সংগ্রাম  * যখন তুমি গ্রীষ্মের প্রখর গরমেও কোর্ট, স্যুট, টাই পরে,  দুধ ডিম আর বাহারী ফলের ব্রেকফাস্ট করে ঘোড়ার খুরের মত বুটে শব্দ ...
বামায়ন

বামায়ন

আরজুদা আঞ্জুম জয়িতা   মনে আছে সেদিনের কথা?  যেদিন তোমাকে লাল আগুনে দাহ করা হচ্ছিল? সেদিন আমি সেখানেই ছিলাম সুতীব্র অনলে তোমার সাথে জ্বলছিলাম। তোমার ...
ঈদের সালাম নেবেন

ঈদের সালাম নেবেন

ইমতিয়াজ সুলতান ইমরান আজকে সবাই যাচ্ছে ভেসে হাসিখুশির বানে সবার সাথে আমারও খুব পুলক জাগে প্রাণে। কী হয়েছে? কী ঘটেছে? কিসের মাতামাতি? কিসের খুশি? জানতে ...
একটিবার-মনিরুজ্জামান অনিক

একটিবার-মনিরুজ্জামান অনিক

মনিরুজ্জামান অনিক     বুনোহাঁসের দল যখন ছুটে যায় জলে, আমি দীঘর্শ্বাস ফেলি কিছু ফেলে আসা অতীতে। আমার চোখ ঝাপসা হয়, চশমাটা খুলে রাখি টেবিলে। ...
শহীদ

শহীদ

ক্ষুদিরাম নস্কর যে দুপুরে ঘুম আসে না অসহ্য ডাক কুহু, উথলে ওঠে ঢেউ সমুদ্র বুকের মাঝে হু হু। সেই দুপুরে পড়লো ঝরে শিমুল,পাকুড়,পলাশ, জানতো কি ...
কবিতা-‌আকাশের রাজধানীর দিকে

কবিতা-‌আকাশের রাজধানীর দিকে

গোলাম রসুল   তোমার কবর অবধি পৌঁছুতে বেলা গড়িয়ে গেল তার ওপর আমার হাতে সমুদ্রের বই ছিল আর ঢেউগুলো হারিয়ে যাচ্ছিল   আমার পায়ের ডাঙা ...