একটি নৈশ ভ্রমণ

একটি নৈশ ভ্রমণ

মূল গল্প : শায়খা হুসেইন হেলায়ী (ইসরাইল)
অনুবাদ: আদনান সহিদ

প্রতিরাতে বাবা কবরখানার পথ ধরে আমাদের বাড়িতে আসেন। বাগানে তাঁর আগমনী পদধ্বনি শুনতে পাই। আমার আলমারিতে লুকিয়ে রাখা তাঁর ছড়িটি যখন তিনি খোঁজেন তখন আমি ঘুমের ভান করে পড়ে থাকি। তাঁর জন্য আমাদের ঘরের দরজাটা সবসময় খুলেই রাখি আর তাঁর সাথে একটা চমৎকার খেলা খেলি- যখনই তিনি তাঁর কবরে চোখ দুটো বন্ধ করেন, প্রতিবারই তাঁর ছড়িটা আলমারি থেকে সরিয়ে অন্যখানে লুকিয়ে রাখি। আড়চোখে দেখি তিনি ছড়িটি খুঁজতে খুঁজতে হাল ছেড়ে দেন। তারপর ক্লান্তশ্রান্ত হয়ে মেঝেতে একেবারে ভূলুণ্ঠিত হন। বাড়ির অন্য কেউ জেগে উঠার আগেই আমি বিছানা থেকে নেমে তাঁকে হাত ধরে পুনরায় কবরখানার প্রধান গেইটে এগিয়ে দেই। কবরখানার প্রধান গেইটে্র পথ ধরে তিনি আত্মবিশ্বাস ও স্বস্তি নিয়ে এগিয়ে যান । তাঁকে খুব কাছ থেকে খেয়াল করি । একসময় দেখি তিনি কবরখানার ভেতরে মিলিয়ে গেছেন।

আমি কখনোই তাঁর ছড়িটি হাতছাড়া করতে চাই নি- না চেয়েছি নদীর জলে ফেলে দিতে কিংবা বাগানে দেয়ালের সাথে আছড়ে ভেঙে ফেলতে বরং, বাবার কবরখানা থেকে আমাদের বাড়িতে এই নৈশ ভ্রমণ শুরু হলে ছড়িটির প্রতি বেশ যত্নবান হয়ে উঠি। প্রতিবার এখান থেকে বাবার প্রস্থানের পর আমার শরীরে বাবার আঘাতকৃত ছড়ির দাগ ক্রমান্বয়ে কমতে থাকে। আমার ডান কাঁধে, বাম পায়ে, শরীরের এখানে ওখানে, দৃশ্যমান ও অদৃশ্য, ছোট-বড় ছড়ির অসংখ্য আঘাত রয়েছে।
সব আঘাতের দাগ থেকেই আমি পরিত্রাণ পেয়ে গেছি কিন্তু একটা দাগ রয়েই গেছে।বুঝতে পারিনি দাগটা চামড়ার উপরে কিংবা ভিতরে ঠিক কোথায় রয়েছে!

আজ আমার এখানে বাবার শেষবারের মতো আগমনের মধ্যে দিয়েই সবকিছুর সমাপ্তি ঘটবে। চিরতরে সবকিছু মুছে ফেলতে সক্ষম হব আমি।এইবার আমি তাঁকে স্বাভাবিকের চেয়ে বেশিক্ষণ কক্ষের কোনায় দুর্বিষহভাবে শুইয়ে রাখব। আর ভোর হওয়া পর্যন্ত এভাবে অপেক্ষায় থাকব অথবা অপেক্ষা করব যতক্ষণ না তিনি সূর্যোদয় অবধি নিজ অহংকার বিসর্জন দিয়ে আমাকে তাঁর কবর পর্যন্ত এগিয়ে দিয়ে আসতে অনুরোধ না করেন। কিন্তু আশ্চর্য!এরপর তিনি টানা তিন দিন আর এলেন না! তাঁর অনুপস্থিতি আমাকে উদ্বিগ্ন করে তুলল। তিনি কি তাহলে এই খেলাটায় ধরা পড়ে গেলেন?নাকি তিনি তাঁর ছড়িটি খুঁজে পাওয়ার আশা ছেড়ে দিলেন?


চতুর্থ দিন নিজেই তাঁকে খোঁজার সিদ্ধান্ত নিলাম। হয়ত তিনি পথ হারিয়েছেন অথবা নিজ কবরে গভীরভাবে আচ্ছন্ন হয়ে পড়ে আছেন।তবে আমাদের কাছে এটাই হবে তাঁর শেষ আগমন। এরপর তাঁর ছড়িটি আমি ঠিক তাঁর কবরের উপরে রেখে আসব। এতে গভীর রাতে তাঁর মৃত ও অন্ধরূপে চারপাশে ঘোরাঘুরির আর দরকার হবে না।

রাত ২টায় নিরবে আমার ঘর থেকে বের হয়ে এলাম। নিজ শোয়ার ঘরের দরজা আধখোলা রেখে আমার ঘুমন্ত মাকে না জাগাতে সর্বোচ্চ সচেষ্ট থাকলাম। তারপর শোয়ার ঘরে এবং বাগান পার হয়ে সোজা কবরখানার দিকে হাঁটা দিলাম। ভেবে কূল পাচ্ছিলাম না কিভাবে শেষবারের মতো বাবাকে আমাদের সাথে একবার দেখা করতে প্রলুব্ধ করবো। মনে কোন নির্দিষ্ট পরিকল্পনাও ছিলো না। কিন্তু মৃতেরা কি রাতে তাদের চারপাশে ঘোরাঘুরি করার আমন্ত্রণ পেতে চায় না? ঠান্ডা সতেজ বাতাস উপভোগ করতে চায় না?

কবরখানার প্রধান গেইটে পৌঁছে দু’টো ছায়াকে একটু দূরে নড়াচড়া করতে দেখলাম। অন্ধকারে তাদের বৈশিষ্ট্য আঁচ করতে পারলাম না। তাদের আরেকটু কাছে এগিয়ে গেলাম আর একটা বড় গাছের পিছনে থেকে নিঃশব্দে তাদেরকে লক্ষ্য করতে লাগলাম।তখনই সেখানে আমার মাকে দেখলাম বাবাকে ছড়ি দিয়ে আক্রমণ করতে। বাবা মা’র ছড়ির আঘাতগুলো প্রতিহত করার চেষ্টা করছেন কিন্তু একেবারেই নাড়াচাড়া করছেন না, কোনও শব্দও করছেন না। লুকানো অবস্থান থেকে মা’কে বলতে শুনলাম,

“শয়তান কোথাকার!তোমাকে বলেছিলাম ছড়ি দিয়ে ওর মাথায় না মারতে! ওর মাথায় মারলে ও মারা যাবে!”

আমি আমার মাথা ছুঁয়ে শুকনো ও রক্তাবৃত গভীর একটা ক্ষত আবিষ্কার করলাম। কিছুক্ষণ পরে বাবা-মা দু’জনেই খুব ক্লান্ত হয়ে ভারী পায়ে বাসার দিকে রওনা দিলেন।

আমি কবরখানার প্রধান গেইট পার হয়ে গভীর অন্ধকার কবরগুলোর মাঝে নিমজ্জিত হলাম।

 

আদনান সহিদ-

কবি, অনুবাদক ও শিক্ষক, ঢাকা, বাংলাদেশ।

 

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
দুর্গাপূজা 2022- মা দুর্গার 10টি অস্ত্রের ইতিহাস ও তাৎপর্য

দুর্গাপূজা 2022- মা দুর্গার 10টি অস্ত্রের ইতিহাস ও তাৎপর্য

শিবাশিস মুখোপাধ্যায় দুর্গাপূজা দুর্গোৎসব বা শারদোৎসব নামেও পরিচিত। যদিও এটি একটি 10 দিনের উৎসব, তবে শেষ পাঁচটি দিনকে তাৎপর্যপূর্ণ হিসাবে বিবেচনা করা হয়। দেবী দুর্গা ...
প্রেমান্ধপাখি

প্রেমান্ধপাখি

সবুজ আহমেদ  ফেরারি পাখি ব্যথায় ভুলে গেছে ফেরার পথ- আলো প্রজ্জ্বলিত নক্ষত্রে নেমেছে ঘোর অমানিশা সুযোগে বয়ে যাওয়া নদীতে শিকারি মেরেছে শলা মনের মগডালে বসে ...
গরিব চাষি

গরিব চাষি

সেকেন্দার আলি সেখ   আগুন জ্বলে ক্ষেত খামারে গরিব চাষির বুকে পায়ে ফেলে মাথার ঘাম নেইকো কৃষক সুখে আগুন জ্বলে গ্রাম ছাড়িয়ে রুক্ষ মাঠের শেষে ...
এবার মরু: শেষ পর্ব

এবার মরু: শেষ পর্ব

গৌতম সরকার সব শুরুরই শেষ থাকে, নিয়মের নিগড়ে আমাদের ট্যুরও শেষ হল। ট্যুরটা খুব উপভোগ্য হল বলতে ভালো লাগছে, কারণ আমরা বাঙালিরা যেকোনো ট্যুরকে উপভোগ্য ...
"আমার দেহখান নিও না শ্মশান" কার জন্য লেখা?

“আমার দেহখান নিও না শ্মশান” কার জন্য লেখা?

আশিক মাহমুদ রিয়াদ “এক দুঃস্বপ্নে ফুঁটেছে ভোর বিলীন হয়েছে নির্ঝর নক্ষত্র নিরবে! যে নক্ষত্রকে খুঁজে পাবে না কেউ গানের প্রতিটা ছন্দে!” “Odd Signeture” ব্যান্ডের ভোকালিস্ট/গিটারিস্ট ...