চোখে নামে বৃষ্টি 

 চোখে নামে বৃষ্টি 

জোবায়ের রাজু 

পার্কের সবুজ ঘাসের গালিচায় দেড় ঘন্টা ধরে লিমার অপেক্ষায় বসে আছে নোমান। এই দেড় ঘন্টায় ফোনে বেশ ক’বার ওদের কথাও হয়েছে। অপেক্ষায় অস্থির হয়ে নোমান বার বার ফোন দেয় লিমাকে। প্রতিবার লিমা আহত গলায় বলে ‘কোনো গাড়ি পাচ্ছি না। একটি রিকশাও না। ধ্যাত্ ভাল্লাগছে না।’ লিমার মুখের বুলি শুনে বেশ রাগ হল নোমানের। আজ সত্যি যানবাহন খুঁজে পাওয়া যাচ্ছে না। এখানে আসতে নোমানেরও বেশ ঝাক্কি পোহাতে হয়েছে। আধা ঘন্টা অপেক্ষা শেষে অবশেষে কাঙ্খিত রিকশা পেয়ে এখানে আসতে সক্ষম হয়েছে সে। 

এখানে আজ আসাটাও জরুরি। নোমানের সাথে আজ জরুরি কথা আছে। আজই দুজনে পরিকল্পনা করবে তারা কি কোর্ট ম্যারেজ করবে, নাকি দুজনে আজ থেকে আলাদা হয়ে যাবে। বার বার বিয়ে ভেঙে দেয়াটা লিমার জন্যে এখন বড় কষ্টের হয়ে দাঁড়িয়েছে। বর্তমানে যেখানে লিমার বিয়ের কথাবার্তা চলছে, বাবা মা এখানেই লিমাকে বিয়ে দিতে চান। কিন্তু আপত্তি লিমার। আপত্তি থাকবেই না বা কেন! নোমানকে যে সে জীবন দিয়ে ভালোবাসে। কোনভাবেই নোমানকে সে হারাতে পারবে না। 

গতানুগতিক নিয়মে দুজনেই প্রেম হয়েছে দু বছর আগে। ব্যারিষ্টার বাবার একমাত্র মেয়ে লিমার স্বপ্ন পুরুষ হয়ে উঠতে সময় লাগেনি নোমানের। পারিবারিক আর সামাজিক মান মর্যাদায় লিমার পরিবার এগিয়ে থাকলেও নোমানের পরিবার তার বিপরীত। সামান্য এক রিকশাওয়ালার মেধাবী ছাত্র নোমান। কিন্তু মিথ্যার আশ্রয় নিয়ে সে লিমার কাছে নিজের পরিচয় গোপন রাখে। লিমা জানে নোমানের বাবা একজন সেনা কর্মকর্তা। এই শহরে তাদের দুটি ফ্ল্যাট আছে। এসব ভুল আর মিথ্যে সংবাদ লিমার কানে ঢুকিয়ে দিয়েছে স্বয়ং নোমান নিজেই। লিমাও নোমানের সেসব প্রভাবশীলতার গল্প শুনে নোমানদের সেসব ফ্ল্যাটের রাণী হয়ে উঠার গোপন স্বপ্ন দেখতে থাকে। 

আবারও লিমাকে ফোন দেয় নোমান।

 গাড়ি পেয়েছো?

 একটা রিকশা পেয়েছি। কিন্তু মেজাজ খারাপ।

 কেন?

 আর বলো না। কোথা থেকে যে এই বুড়ো রিকশাওয়ালা এসেছে। গায়ে বল শক্তি নেই। কচ্ছপ গতিতে রিকশা চলছে। তার চেয়ে হেঁটে গেলে এতক্ষণে তোমার কাছে পৌঁছে যেতাম। এই বেটা, আরো জোরে চালাতে পারো না? উফ! যত্তোসব। 

নোমান শুনতে পাচ্ছে লিমা রিকশাওয়ালাকে অশোভনীয় ভাষায় গালমন্দ করছে। আর দ্রæত গতিতে রিকশা চালাতে তেজী গলায় হুকুম জারি করছে। 

 

২.

পার্কের মূল গেটের দিকে তাকিয়ে নোমান দেখে নীল শাড়ি পরে লিমা রিকশা থেকে নামছে। কিন্তু রিকশাওয়ালার দিকে তাকিয়ে তার মাথায় যেনো বাজ পড়লো। এ কাকে দেখছে নোমান! বাবার রিকশায় চড়ে লিমা…? 

দূর থেকে নোমান দেখছে লিমা তার বাবার সাথে কি নিয়ে যেনো তর্ক করছে। তর্কের এক পর্যায়ে বাবার পকেটে টাকা না কি যেনো ভরে দিয়ে লিমা হনহনিয়ে মূল গেইট ক্রস করে ভেতরের দিকে চলে আসছে। ভাগ্যিস বাবা নোমাকে দেখেনি। আজ ধরা খেলে কি জবাব দিতো লিমাকে। 

টিস্যু পেপারে কপালের ঘাম মুছতে মুছতে নোমানের পাশে এসে বসে লিমা। ‘জানো, এই দেশের রিকশাওয়ালাগুলি বড্ড বেয়াদব হয়ে গেছে। সাথে ভাংতি রাখে না। এই বুড়োর কাছেও ভাংতি নেই বলে পুরো এক’শ টাকাই দিতে বাধ্য হয়েছি। এসব ওদের ভং।’ 

লিমার কথাগুলি শুনে বুকটা মোচড় দিয়ে উঠল নোমানের। লিমা জানে না সে কাকে বেয়াদব বলেছে! নোমানের বাবাকে। চোখে পানি চলে এলো নোমানের। এই সমাজে তার বাবাদের মত রিকশাওয়ালাদের স্থান কোথায়, লিমা দেখিয়ে দিয়েছে। না, নোমান আর তার পরিচয় গোপন রাখবে না। ব্যারিষ্টারের এই মেয়েকে বলে দিবে ‘আমি তোমার যোগ্য নই। আমি রিকশাওয়ালার ছেলে, যার রিকশায় চড়ে তুমি এখানে এসেছো, সে আমার বাবা।’ নোমান এসব যতই ভাবছে, তার বুকের ভেতরটা ততই চুরমার হয়ে যাচ্ছে। 

 

আমিশাপাড়া, নোয়াখালী। 

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
কদম বৃক্ষ

কদম বৃক্ষ

অমিত মজুমদার  কিছুদিনের জন্য ওপারে চলে যাও তুমি, চিন্তা কোরো না দেশ স্বধীন হবার তিন দিন পর বিকেল ঠিক চারটেয় এই কদম গাছের নিচে আমাদের দেখা হবে, ...
২০২৩ সালে ঘটতে পারে যেসকল বিপর্যয়

২০২৩ সালে ঘটতে পারে যেসকল বিপর্যয়

শ্রী রাজীব দত্তের সম্পাদনায় ভৌতিক সংকলন "প্রেতাত্মা"

শ্রী রাজীব দত্তের সম্পাদনায় ভৌতিক সংকলন “প্রেতাত্মা”

শ্রী রাজীব দত্তের সম্পাদনায় সৃষ্টি বই মহল প্রকাশনার তত্ত্বাবধানে সম্পূর্ণ একটি ভৌতিক সংকলন প্রকাশ হচ্ছে “প্রেতাত্মা” সংকলন, এই সংকলন তরুণ তরুণী লেখক লেখিকার নানান ভূত-প্রেত ...
সাহিত্য বিশারদঃ বাঙালির একতা

সাহিত্য বিশারদঃ বাঙালির একতা

হামীম রায়হান  বাংলা সাহিত্যের যে রেঁনাসার সৃষ্টি হয়েছিল তা সত্যিই কী সমগ্র বাংলা সাহিত্যের রেঁনাসা ছিল? এমন প্রশ্ন যদি উঠে তবে সে প্রশ্নের জবাব কিন্তু খুব ...
"২০ বছর পরে আবার দেখা"

“২০ বছর পরে আবার দেখা”

ফাল্গুনী খান সদ্য কিশোর থেকে যৌবনে পা দিলাম হাজারো রঙে এই পৃথিবী দেখা শুরু করলাম বন্ধুদের সাথে আড্ডা জমে উঠলো চায়ের টঙ্কে দেরি করে ঘরে ...
দেশের সব থেকে বড় সেতু নির্মাণ হবে ভোলায়

দেশের সব থেকে বড় সেতু নির্মাণ হবে ভোলায়

বাংলাদেশের একমাত্র দ্বীপ জেলা ভোলা। আয়তনের দিক দিয়ে এ জেলাটি প্রায় ৩৪০৩.৪৮ বর্গ কিমি। ৭ উপজেলা নিয়ে বিস্তৃত অপার সম্ভাবনার এই জেলাটি । ভোলা জেলার ...