শূন্যতার নিশ্বাস – সৌর শাইন

শূন্যতার নিশ্বাস - সৌর শাইন

সৌর শাইন

গভীর রাত। সমুদ্র উপকূল ঘেঁষে অদূরে কুচকুচে কালো পিচঢালা হাইওয়ে রোড। মেঘাচ্ছন্ন চাঁদ, আলো-আঁধারিতে মগ্ন চারপাশ। দূরের জলরাশি বনের বাঘের মতো গর্জাতে গর্জাতে আছড়ে পড়ছে দরিয়ার কূলে। আগ্রাসী শব্দের ভয়ংকর গুঞ্জন এই হাইওয়ে রোড থেকেও শোনা যায়। ঘন চাপা সে শব্দের লহরী ভারি মধুর! খোলা আকাশে অগণিত তারা নিস্পলক চোখে দীপ্তিমান। রোডের পাশে দাঁড়িয়ে থাকা সারি সারি ঝাউগাছগুলো ঝাপ্টা বাতাসে দোলনার মতো অহরহ নড়ে ওঠে। প্রাকৃতিক সৌন্দর্যের মোহে অনেক পথচারিই এখানে থমকে দাঁড়ায়! প্রাণ ভরে নিশ্বাস নেয়।

তবে সমুদ্রের দিকে এগোবার সাহস পায় না, কারণ সবাই জানে এদিকটা পর্যটন মন্ত্রণালয় কর্তৃক রিস্কি জোন হিসেবে চিহ্নিত। সরকারি হিসেব মতে গত একশতকে উপকূলের এদিকটায় অগণিত ক্ষত বিক্ষত লাশ পাওয়া গেছে। বেসরকারি হিসেবটা এর চেয়ে বেশি। নারী পুরুষ সবার লাশ পাওয়া যায় উলঙ্গ অবস্থায়। অথচ, লাশের গায়ে ধর্ষণ বা যৌনতার কোনো আলামত পাওয়া যায়নি কখনো। এসব লাশ পাওয়ার ঘটনা জনমনে সুঁচের মতো গেঁথে আছে আতঙ্কের ছাপ হয়ে। এগুলো কি দুর্ঘটনা না খুন, নাকি কোনো বন্যপ্রাণীর আক্রমণ তা এখনো জানা যায়নি। এসবের প্রকৃত কারণ উদ্ধার করার জন্য বহু প্রচেষ্টা চললেও একটা সময় তা থমকে যায়। সবই মিষ্ট্রি আনসলভড হিসেবে বিবেচিত।

ঝাউগাছের পাশে গাড়িতে পিঠ ঘেঁষে দাঁড়ানো পায়েল। হাতে জলন্ত সিগারেট! ওর এলোমেলো চুল বাতাসের ধাক্কায় প্রায় উড়ন্ত! মূল থেকে খসে গেলেই ছুটে যাবে অজানা কোথাও। পায়েলের দৃষ্টি গাড়ির ভেতরে ঘুমন্ত টিউলিপের দিকে। বর্তমানের নিঃসঙ্গ জীবনের যে একমাত্র বন্ধু। এই পোষা কুকুরটির বয়স আট বছরের বেশি। এই তো সামনের অক্টোবরে নয় বছরে পা বাড়াবে। টিউলিপের মতো কোয়েলও নয় বছরে পা বাড়াবে আসছে নভেম্বরে। কোয়েল পায়েলের আত্মজা ও একমাত্র অস্তিত্ব চিহ্ন! পিতৃ শূন্যতা যার সবচেয়ে বড় কষ্ট! এদিকে স্বামীহীনতা পায়েলের যন্ত্রণাময় মরণ ব্যাধি।

এই দুঃসহ সময়ে কোয়েলকে কাছে রেখে কষ্টের গ্লানিতে প্রভাবিত করতে চায় না পায়েল। মেয়েকে দূরে সরিয়ে স্কুলের হোস্টেলে পাঠিয়ে নিজেকে নিমজ্জিত করে রেখেছে একাকিত্বের মোহনায়। কারণ, স্মৃতি মন্থন গতি ওকে বার বার মৃত্যুকে মনে করিয়ে দেয়। এক সময় পায়েল মৃত্যুকে ভুলে আনন্দে বেঁচে থাকতে চাইতো। অথচ, এই মানসিক অস্থিরতা ওকে বার বার আহত করে, ক্ষত করে তোলে হৃদয়ের ভেতরটা। ভেতর থেকে কেউ যেনো বলতে চায়, ফুরিয়ে আসছে সময়। সময় গমনের এই নির্দয় খেলায় কখনো মনে হয়, এই মৃত্যু অঞ্চলই হতে পারে তার বিদায় কালের সাক্ষী। এই প্রিয় সমুদ্রস্থান মৃত্যু সুখের সেরা অনুভূতি উপহার দেবে। হিংস্র প্রাণী বা যাই হোক অন্তত ঝাপটে ধরার মুহূর্ত তো এনে দেবে, শরীরের ক্ষুধা যন্ত্রণায় পিষে তো মারবে। যদি এমন হয়, সেই মৃত্যু কেন সুখের হবে না? এমন মৃত্যুই তো চায় পায়েল, ইচ্ছে পূরণে শরীরে শরীর মথে শ্বাসরুদ্ধ করে, স্তন কোটরে জমে থাকা বিষবাষ্পকে ছুটি দিয়ে, ক্ষত নকশায় পুরো শরীর সাজিয়ে সে ঢলে পড়বে অনন্ত ঘুমে।

*

হাতের সিগারেটটা ফুরিয়ে যাবার পর পায়েল জুতো খুলে বালির উপর পা বাড়ায়। ঝাউবন পেরিয়ে এগিয়ে যায় সমুদ্রের দিকে। মেঘের ওপাশ থেকে চন্দ্রালোক উঁকি দিয়ে উজ্জ্বল করে তোলে বালিপথের দৃশ্যরেখা। গাড়ির ভেতর থেকে টিউলিপ একদৃষ্টিতে তাকিয়ে থাকে মনিবের দিকে।

বাতাসের ঝাপ্টা পায়েলের শরীর মন চেপে ধরে পাগলের মতো। সে পাগলামিতে নিজেকে ভাসিয়ে দিয়ে ভাবে, এই পৃথিবীর বুকে এমন কি কেউ নেই, যে ভালোবাসতে পারে, ঘুচিয়ে দিতে পারে একাকিত্বের ব্যথা। অদৃশ্য কেউ বলে, অন্তত মৃত্যুই পারে এই অসাধ্যকে সফল করতে! আহ! কি ভয়ংকর সুন্দর! প্রতি উত্তরে পায়েল বলে, এসো, মৃত্যু এসো, শরীরের আনাচে কানাচে ছুঁয়ে দাও মমতা রশ্মি, বিনাশের বন্দনায় নিভিয়ে দাও দেহের দম্ভ!

সমুদ্র গর্জন পায়েলের মনে আনন্দ জাগায়, আশা জাগায়। আসবে, সে আসবে, মৃত্যুদূত আসবে। ভালোবাসার স্পর্শে বাজবে পৃথিবীর বিদায় ঘন্টা। চাঁদের আলোয় ঝলমলে বালির বুকে গা এলিয়ে দেয় পায়েল। দু’চোখের মাঝে ঘুমো মৃত্যুর স্বপ্ন আঁকে আদিম শিল্পীর মতো।

ঐ তো আসছে মৃত্যুদূত, ঝাপটে ধরবে পরম উষ্ণতায়, শ্বাস রোধের সৌজন্যতায়। নিস্তেজ হবার মোহে জাগাবে শেষ সঙ্গম পিপাসা। পায়েল বুঝতে পারে শীঘ্রই মৃত্যু সন্নিকটে এসে দাঁড়াবে। ওটা সেই হিংস্র প্রাণী, যার হাতে জীবন অর্পণ করেছে ওর মা, বাবা, স্বামী। আজকে তার পালা। ধারালো দাঁতে ক্ষত বিক্ষত করবে দেহটা, মিষ্টি হাসি মুখের প্রশংসা বিলীন হবে হিংস্রতার পরশে। পায়েল জানে জন্তুটার বিশেষ গুণ হলো, সে উলঙ্গ শরীর ভালোবাসে। কষ্ট করে জামা খোলার বিড়ম্বনা কেন পোহাতে হবে তাকে? এটা ভেবে পায়েল গায়ের জামা খুলে ফেলে। অপেক্ষা ফুরাতে আর কত ক্ষণ?

দূরে ও তাকিয়ে দেখে, অন্ধকারে একটা গাঢ় অন্ধকারের অবয়ব দেখা যাচ্ছে। নিশ্বাস ফেলে পায়েল।

মাথার চুলগুলো ছড়িয়ে দিয়ে শুয়ে পড়ে বালির বাসরে। চোখ বন্ধ করে অনুভূতির মাত্রাকে উঁচু লয়ে ধাবিত করে দূর দূরান্তে। গর্জন কম্পাঙ্কের অদূর থেকে পায়ের শব্দ শোনা যাচ্ছে, এই তো সে আসছে। থপ্ থপ্ দপ্ দপ্ শব্দ কীর্তন!

পায়েলের চোখের ভেতর অন্ধকার পেরিয়ে কাল্পনিক অবয়ব ভেসে ওঠে। হিংস্র সুন্দর মুখ, শক্তিশালী নির্দয় বাহুদ্বয়। অবয়বটা পায়েলের কাছে এসে থমকে দাঁড়ায়। এক অসাধারণ রোমাঞ্চ ছুঁয়ে যায় ওর শরীর জুড়ে। থাবার প্রথম স্পর্শ এসে ঠেঁকে কপালে, চিবুকে, গ্রীবার পার্শ্বে বুকের উপত্যকায়। দেহের আনাচে কানাচে বিদ্যুৎ খেলে। ভেতরটা মোচড় দিয়ে ওঠে। মৃত্যু ও কামনার মাঝখানে অদ্ভুত অনুভূতি! একটা শরীর আরেকটা শরীরকে ঝাপটে ধরে। একজন মৃত্যু পথিক হয়ে এসেছে, অন্যজন কামনার মৃত্যুদূত! পায়েলের শিরা উপশিরা জুড়ে অজানা কম্পন বয়। মৃত্যুর স্বাদ এতো মিষ্টি তা সে আগে জানতো না। ঠোঁট বেয়ে রক্ত গড়িয়ে পড়ে। কামড় ও কামনার নেশা একাকার হয়ে গর্জন তোলে, হেরে যায় সমুদ্রের চিরায়ত আস্ফালন।

মত্যু ও সুখ অনুভূতিকে দেখতে প্রচণ্ড ইচ্ছে জেগে ওঠে পায়েলের মনে। নিস্তেজ শরীর মৃত্যুকে চুমু খেতে চায়, ভালোবাসতে চায়। ভয় ও আনন্দে পায়েল চোখ খুলে।

কে তুমি?

একলা পথিক। তুমি কেন এলে এই মৃত্যুস্থানে?

মৃত্যুকে বরণ করতে।

মৃত্যুকে কেউ বরণ করে না। মৃত্যু মুহূর্তে যন্ত্রণায় দগ্ধ হয়ে সবাই তাকে প্রত্যাখান করে, তখন সময় ফুরিয়ে যায়, নির্মম মৃত্যুও পিছুপা হয় না।

তুমিই কি মৃত্যু?

আমি কে তা তো দেখতেই পাচ্ছো। অতি সামান্য জীব। মৃত্যু হতে যাবো কেন?

তবে কেন এই সুখের পরশ দিলে?

সুখ আত্মা তৃষ্ণার্ত ছিলো, তাই অপরাধ করে বসেছি। ক্ষমা চাইবো না, শাস্তি দিতে পারো।

পায়েল সোজা হয়ে বসে। একটি যুবক পুরুষের মুখোমুখি সে। যাকে মৃত্যু কল্পনা করে কাটিয়ে দিয়েছে অনেকটা সুখসময়।

শাস্তি নিবে?

যা দেবে মাথা পেতে নেবো।

সারাজীবন এই অপরাধের আগুনে বেঁধে রাখবে আমায়।

যুবক পুরুষ মাথা নিচু করে বলে, হ্যাঁ, তাই হবে।

ওরা এগোয়।

হঠাৎ ছুটতে থাকে যুবক পুরুষ। অদূরে রাখা একখণ্ড ঝাঁকি জাল সে প্রচণ্ড জোরে সমুদ্রের নোনা পানিতে ফেলে দেয়। পায়েলের সঙ্গী হয়ে পা বাড়ায় নতুন গন্তব্যে।

 

*****

পায়েলের বাবা যোসেফের মৃত্যু হয় এই সমুদ্র তীরে। সময় ফুরিয়ে আসা নিয়তির ডাকে তিনি ছুটে এসেছিলেনে এখানে। আর রক্তাক্ত ক্ষত নিয়ে পৃথিবী ছাড়েন। পায়েল তখনো পৃথিবীর আলো দেখেনি। যখন ও ভূমিষ্ঠ হলো তখন শুধু মায়ের মমতার জাল চারপাশে। বাবাহীন বেড়ে ওঠা ছোট্টগৃহ নারিকেল কুঞ্জে। অন্যসব ছেলে মেয়েদের মতো বাবা ডাকার সৌভাগ্য ওর হয়নি। যার ফলে হাহাকার করে কাঁদতো পায়েল।

পায়েলে মায়ের নাম ছিলো অপলা। একদিন পায়েলকে স্কুলে দিয়ে অপলা যায় বনের ভেতর মৌয়ালদের কাছ থেকে মধু কিনতে। সেখানে এক যুবকের সাথে পরিচয় হয়। যুবক জানায় ওর নাম জাহীন। ওর দু’চোখের অজানা আকর্ষণ অপলাকে কাছে টানছিল। ভালোলাগার প্রকাশ ঘটানো সম্ভব হয়নি তখন। অপলা ভীরু লাজুক হরিণীর মতো ধীরে ধীরে ফিরে, গোপন তৃষ্ণা মাটি চাপা দিয়ে। এর কিছুদিন পর সমুদ্রে ঘূর্ণিঝড় জাগে। নির্দয় প্রকৃতি চারপাশে চালাতে থাকে ধংসময় তাণ্ডব! সমুদ্র সৈকতের বনবাদাড়ের গাছপালা ভেঙে পাতার কুটির মিলিয়ে যেতে থাকে হাওয়ায়। ঝড়ের ভেতর জাহীন ছুটতে ছুটতে অপলার বাড়ির সামনে এসে গাছের নিচে চাপা পড়ে। ছোট নারকোল গাছ হওয়াতে প্রাণে বেঁচে যায়। ঝড়ের রাতে অপলা জাহীনকে উদ্ধার করে ঘরে আশ্রয় দেয়। সেবা ও প্রেমের স্পর্শে সুস্থ হয়ে উঠে ঝড়ের রাতের পথিক। অজানা আকর্ষণ ওদের টানতে থাকে নির্লিপ্ত ভঙ্গিতে। অপলার তৃষ্ণার্ত ঠোঁট পথিককে কাছে টেনে নেয় অফুরন্ত আবেগ ও ভালোবাসায়।

অপলা পায়েলকে বলেছিল, জাহীন তোমার বাবা, সে তোমাকে আদর করবে, ভালোবাসবে, সব সময় আগলে রাখবে। তারপর আনন্দে বিগলিত শিশু পায়েল জাহীনকে ‘বাবা’ বলে জড়িয়ে ধরেছিল। জাহীনও পায়েলকে কাছে টেনে নেয় মধুর স্নেহে। জাহীন ও পায়েলের বয়সের ব্যবধান ছিলো মাত্র দশ বছরের। জাহীন যেমন অপলাকে ভালবাসত, তেমনি পায়েলকেও। তাছাড়া অপলাও চাইতো জাহীন যেন সব অপূর্ণতাকে ছুটি দিয়ে সুখে রাখে সবাইকে। কিন্তু দিন কাটানোর ছলনা ভিন্ন রকম হয়।

কিশোরী পায়েল একদিন যুবতী হয়ে উঠলো। রূপের রোশনাই জাহীনের দু’চোখকে পুড়িয়ে দিলো কাগজের মতো, সেদিন থেকে সে পায়েলের প্রেমে অন্ধ হয়ে উঠে। দূরে ঠেলে দিতে থাকে অপলাকে। দুঃখ-কষ্ট ভরা অপলা চোখের ঝর্ণায় চিবুক ভেজায়, বুকে নামে নোনা স্রোত। একাকিত্বের দহন সইতে না পেরে অপলা ছুটে যায় সমুদ্রের কাছে, যেখানে আত্মাহুতি দিয়েছে তার স্বামী যোসেফ। অপলার ক্ষত-বিক্ষত উলঙ্গ দেহ পাওয়া যায় সৈকতে। মায়ের মৃত্যুতে সেদিন পায়েলের কি দুঃখবোধ জেগেছিল? ঠিক মনে পড়ে না ওর।

জাহীন ও পায়েলের দাম্পত্য জীবনের সুখের জাহাজ গোটা সমুদ্র জুড়ে ছুটতে থাকে। স্রোতে ফেনা জাগিয়ে পার হয় অনেকগুলো বছর। একদিন পায়েলের গর্ভে আসে কোয়েল। আর অমনি সমুদ্র তীরে মৃত্যুতে ভেসে যায় জাহীন। জাহীনের দেহ থেকে চোখদুটো পাওয়া যায়নি। সেই থেকে একাকিত্বের দরিয়ায় হাবুডুবু খেতে থাকে পায়েল। সঙ্গী বিহীন জীবন ঝড়ো বিষাদের আঘাতে ক্ষত বিক্ষত! কোয়েলের জন্মের পর অনেকগুলো বছর কেটেছে, যন্ত্রণাময় ব্যথা উপশমে কাউকে কাছে পায়নি পায়েল। তারপর মৃত্যু ভাবনায় ঠেলে দেয় নিজেকে, নিয়তির দোরগোড়ায়। কিন্তু মৃত্যু বড় দুষ্প্রাপ্য বস্তু, যার তার কাছে ধরা দেয় না, কেউ না চাইলেও আবার ঘাড়ে চেপে বসে।

মৃত্যুর তপস্যা করতে গিয়ে আজ পায়েল যে যুবক পুরুষকে পেলো ওর নাম আবির। মৎসজীবী শক্তিমান পেশী, সুদীর্ঘ দেহের পুরুষ। পায়েল বুঝতে পারে সে ভুল সময়ে মৃত্যুর পথে গিয়েছিল, আর আবিরকে পাওয়াও যেন এই ভুল সূত্রের সাথে নির্ভুলভাবে গাঁথা। হ্যাঁ সূত্র! কি এক অজানা সূত্র এখানে জড়িয়ে আছে আষ্টেপৃষ্ঠে!

অপলা তার মা সুপ্রীতির মৃত্যুর পরই যোসেফকে আপন করে কাছে পেয়েছিল। আর অপলার মৃত্যুর পর পায়েল জাহীনকে প্রথম যৌবনে পূর্ণভাবে বরণ করে। জীবনের দ্বিতীয় পর্বে পায়েল আজ আবিরকে পেয়েছে, যার কাছে সে নিজের ও তার কন্যার সুখ প্রত্যাশা করে।

কোয়েলকে স্কুলের হোস্টেল থেকে নিয়ে আসা হলো বাড়িতে। মায়ের সাথে একজন বাবা পেয়ে কোয়েল ভীষণ আনন্দিত! সংসার ঝলমল করছে হাসির উজ্জ্বলতায়। তিনটি প্রাণের উল্লাসে নারিকেল কুঞ্জ জেগে পুরনো আবেশে। আরো একটি প্রাণ এ আমোদে উল্লসিত, সে টিউলিপ। বারান্দায়, বসে ও সামুদ্রিক মাছের ফ্রাই খেতে খেতে দেখে ঘরের ভেতর ঘটে যাওয়া নানা ঘটনা প্রবাহ।

প্রতিরাতে সমুদ্রের গর্জন শুনতে শুনতে আবিরকে কাছে টানে পায়েল। আবির যখন ভালোবাসার ঝঞ্ঝা তোলে দোলাতে থাকে পৃথিবী, তখন পায়েলের কাছে ওর কিশোরসুলভ মুখটা শ্রেষ্ঠ অবুঝ যোদ্ধার মতো ঠেঁকে। প্রাণের কাছে প্রাণের আকুতি অপূর্ব মায়ায় মৃত্যুকে ছুটি দিয়ে ছড়ায় স্বর্গীয় হাওয়া। পায়েলের দু’চোখ বেয়ে নামে সুখ সরোবর।

সমুদ্রতীরে ভ্রমণের নেশা তিনজনকেই আকুল করে তোলে। তাই ওরা প্রায়ই ছুটে যায় ঝাউবন ছাড়িয়ে বন্দরের কাছে। সমুদ্র থেকে মাছ ধরার নেশা ও পেছনের পৃথিবীকে ভুলে যায় আবির। কারণ, ওর পশ্চাতে বর্তমানের মতো ভালো সুখস্মৃতি জমা পড়েনি কখনো। আবির একটি ঘোড়া কিনে আনে। দূর দূরান্ত থেকে আসা পর্যটকদের সমুদ্র ভ্রমণে শখ জাগে ঘোড়ায় চড়ে বেড়ানো, ছবি তোলা। আবির ওর ঘোড়া কাজে লাগিয়ে তৈরি করে চমৎকার আয়ের পথ। সংসারের হাল তোলে নেয় নিজ দায়িত্বে।

নারিকেল কুঞ্জকে সাজিয়ে তোলে নতুন আঙ্গিকে, নতুন পরশে।

এদিকে চোখের সামনে বেড়ে উঠছে কোয়েল। কৈশোর এসে ধরা দিচ্ছে শরীর ও মনের আনাচে কানাচে। যুবক পুরুষ আবিরের পরিপূর্ণতা শিখর ছুঁয়েছে। কোয়েল চঞ্চলতার দিগন্তে উন্মত্ত স্বাধীনতায় ছুটে বেড়ায় এদিকে ওদিকে। সমুদ্র তটে ওর সাথী হয়ে ছুটে আবির।

ঘোড়ার পিঠে চড়ে ওরা খোঁজে বেড়ায় সুখ লাবণ্য আবেশ। আবির কোয়েলের জন্যও একটি ঘোড়া কিনে। দু’জন এক সাথে সমুদ্র তীরে পর্যটকদের মনোরঞ্জনের পসরা সাজিয়ে ঘুরে বেড়ায়। স্বল্প আয়ে সুখের অনুসন্ধান করে ওরা। এক এক করে পাঁচটি পূর্ণিমা কেটে গেল, পায়েল শূন্য বিছানায় কাতরায়। আর পূর্ণ পুরুষ আবির নতুন পথের খোঁজে কোয়েলের অভিমান ভাঙাতে ব্যস্ত। আবির সুকৌশলে পায়েলকে এড়িয়ে যাচ্ছে। আর এড়িয়ে যাবেই না কেন? পায়েলের মনেও সরল প্রশ্নটা জাগে এই শুকনো খটখটে পথে কে আসবে? উষর রুক্ষতার কোনো সৌন্দর্য হয় না। ওটা কেবল পরিত্যক্ত, অগ্রাহ্য হবার যোগ্যতা রাখে। প্রায় একবছর হতে চলল, পায়েলের শরীরে ঋতুস্রাব অনুপস্থিত!

গোপন নিভৃতের কুঠুরি থেকে ওরা এখন প্রকাশ্যে। কোয়েল ও আবিরের এই নতুন ভ্রমণ শুরু হওয়া মাত্র পায়েলের চোখে নোনা স্রোত নেমে আসে। বুঝতে পারে সময়ের সীমা রেখা ফুরিয়ে আসছে। একদিন শূন্যতার ব্যথায় যে কামনায় কাতর হয়েছিল, সে মৃত্যু পিপাসা আবার স্বেচ্ছায় জাগায় মনের গহীনে। মনে পড়ে পায়েলের মা অপলার কথা, জাহীন যখন সম্পূর্ণরূপে পায়েলের মোহনায় বন্দি, অপলার প্রতি জাহীন তাকাতেও ভুলে গিয়েছিল। তখনই অপলা সমুদ্র তটে ছুটে গিয়েছিলেন। আর ফিরেছিলেন উলঙ্গ ঘুমের ক্ষত ধারণ করে।

চিরায়ত সূত্র পায়েলের কানে কানে বলে যায়, যেদিন আবির তাকে চিরতরে অগ্রাহ্য করে কোয়েলকে ভালোবাসবে সেদিনই হবে ওর সমুদ্র সৈকতে মৃত্যুস্থানে যাত্রা। আর যেদিন কোয়েল গর্ভে সন্তান আসবে সেদিন ফুরাবে আবিরের আয়ুষ্কাল। কিছুদিন পর পায়েলের ক্ষত-বিক্ষত উলঙ্গ মৃতদেহ পাওয়া যায় ঝাউবনের পাশে সমুদ্র সৈকতে। কোয়েল ও আবিরের সংসার স্বচ্ছন্দে চলতে থাকে সমুদ্র তটের শখের ঘোড়ার মতো। একদিন কোয়েলের গর্ভে সন্তান আসে। অনাগত সন্তান নিয়ে স্বপ্ন বিভোর হয়ে ওঠে মা। ঘুমিয়ে থেকে কি জেগে থেকে সবসময় কৌতূহলী ইচ্ছেরা জানতে চায়, দেখতে কেমন হবে সে শিশু? ওর কি নাম রাখবে? নানা কথা নানা বাসনা।

আবির কোয়েলের কথা শুনে আর হাসে। ঠিক সেই মুহূর্তে ওর কানের কাছে এসে একটি কণ্ঠস্বর বলে, চলো, তোমাকে যেতেই হবে।আবির যেতে চায় না, তবু বাধ্য করা হয়। এক অজানা শক্তি ওকে সমুদ্র পাড়ে নিয়ে যায়। পরদিন মৃত্যুস্থানে পাওয়া যায় ওর উলঙ্গ বিকৃত মৃতদেহ।

আবিরের চলে যাওয়ার বিষাদ কোয়েলকে ঘিরে ধরলেও গর্ভের সন্তানের জন্য ও নিজেকে ধৈর্যশীল করে তোলে। এক সময় কোয়েলের কোল আলো করে আসে একটি ফুটফুটে মেয়ে। কোয়েল নবাগত কন্যা শিশুর নাম রাখে কমল। কমলের প্রতি ভালোবাসা ও যত্নময় ব্যস্ততায় কোয়েলের জীবন থেকে পাঁচ ছয়টি বছর ফাঁকা গুলির মতো উড়ে যায়। স্কুলে যেতে শুরু করে কমল। এদিকে বাড়িতে কোয়েল একাকিত্বের মাঝে এসে দাঁড়িয়ে বুঝতে নিঃসঙ্গতার যন্ত্রণা!

পায়েলের মতো কোয়েলও সেই চিরায়ত পুরনো দহনে জর্জরিত হয়ে পুড়তে থাকে। মায়ের সেই পুরোনো গাড়ি নিয়ে কোয়েল ছুটে যায় পাহাড়ের দিকে। সবুজের গহীন অরণ্য থেকে কোয়েলের কাছে এসে হাজির হয় সুজাত নামের এক কাঁচা তরুণ।তারপর অনেক বছর পর, কমল ও সুজাতের কাছে আসার গল্প শুরু হলো। কোয়েলের উলঙ্গ ক্ষত মৃতদেহও পাওয়া যায় সমুদ্র তটে। অজস্র তদন্তের ঝড় বয়ে গেল, তবু আজো সুরাহা হলো না, এইসব মৃত্যুর প্রকৃত কারণ!

“বিনা অনুমতিতে এই ওয়েবসাইটের কোন লেখা কপি করা আইনত দণ্ডনীয় অপরাধ। কেউ যদি অনুমতি ছাড়া লেখা কপি করে ফেসবুক কিংবা অন্য কোন প্লাটফর্মে প্রকাশ করেন, এবং সেই লেখা নিজের বলে চালিয়ে দেন তাহলে সেই ব্যাক্তির বিরুদ্ধে আইনানুগ ব্যবস্থা গ্রহণ করতে বাধ্য থাকবে
ছাইলিপি ম্যাগাজিন।”

সম্পর্কিত বিভাগ

পোস্টটি শেয়ার করুন

Facebook
WhatsApp
Telegram
ভৌগলিক সীমানার ওপারে 

ভৌগলিক সীমানার ওপারে 

নিলুফা জামান    সেদিন আমি অন্তর আর পিনাকী… তিন বন্ধু ঘুরতে বের হয়েছি, গাড়ী ছুটছে সোঁ সোঁ করে উল্কা বেগে। মনে হচ্ছে বহু দীর্ঘ পথ ...
“গাঁয়ের মেয়ে” | এম-এ-রুদ্র

“গাঁয়ের মেয়ে” | এম-এ-রুদ্র

|এম-এ-রুদ্র   গাঁয়ের মেয়ে নিঝুম কাল, কালো তাঁর কেশ। কেশের মাঝেই চুম্বক টানে, মাঝে আমার বেশ। সূপ্তবর্না হ্রদয় তাঁর, অষ্টবর্না আশা। ধাতুর মাঝেই রয়ে গেলো, ...
মহানগর সিজন ৩ কবে আসবে?

মহানগর সিজন ৩ কবে আসবে?

মহানগরের সেই ওসি হারুণের কথা মাথায় আছে আপনার? যে হারুন খেলতে ভালোবাসে অপরাধীকে নিয়ে। যারা দুইটা কথা শোনানোর অভ্যাস আছে, যিনি বিশ্বাস করেন- অপরাধী আর ...
মাঝপথে- জয় কান্তি নাথ

মাঝপথে- জয় কান্তি নাথ

জয় কান্তি নাথ বদলে যাওয়া কিছু সময়, তাল মিলিয়ে দু’কদম চলা! হঠাৎ অজানা আভাসে থেমে যাওয়া, স্মৃতির সাথেই অগোচরে কথা বলা। যে স্মৃতির কাছে পাওনা ...
বর্ণমালারে তোর কথা

বর্ণমালারে তোর কথা

প্রিয় রহমান আতাউর  অ আ ক খ বর্ণমালা মোদের অধিকার মাতৃভাষায় কথা বলি বড়ই অহংকার। পাখি ডাকে যে ভাষাতে দোয়েল দেয় শিস বাংলা আমার জন্ম মৃত্যু করি যে ...
রেডরাম (Redrum) ওয়েবফিল্ম রিভিউ

রেডরাম (Redrum) ওয়েবফিল্ম রিভিউ

ব্যপ্তি- ১৩২ মিনিট পরিচালক-ভিকি জাহেদ শ্রেষ্ঠাংশে- আফরান নিশো, মেহজাবিন চৌধুরী, মনোজ প্রামাণিক ব্রিটিশ বিজ্ঞানী চার্লস ডরউইনের কথা আগে কখনো শুনেছেন? যারা শুনেছেন তারা জেনে থাকবেন ...